• কুমিল্লা সিটি করপোরেশন
  • কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়
  • আদর্শ সদর
  • বরুড়া
  • লাকসাম
  • দাউদকান্দি
  • আরও
    • চৌদ্দগ্রাম
    • সদর দক্ষিণ
    • নাঙ্গলকোট
    • বুড়িচং
    • ব্রাহ্মণপাড়া
    • মনোহরগঞ্জ
    • লালমাই
    • চান্দিনা
    • মুরাদনগর
    • দেবীদ্বার
    • হোমনা
    • মেঘনা
    • তিতাস
  • সর্বশেষ
  • রাজনীতি
  • বাংলাদেশ
  • অপরাধ
  • বিশ্ব
  • বাণিজ্য
  • মতামত
  • খেলা
  • বিনোদন
  • চাকরি
  • জীবনযাপন
  • ইপেপার
  • ইপেপার
facebooktwittertiktokpinterestyoutubelinkedininstagramgoogle
স্বত্ব: ©️ আমার শহর

সম্পাদক ও প্রকাশক : মো. গাজীউল হক ভূঁইয়া ( সোহাগ)।

নাহার প্লাজা, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা-৩৫০০

ই-মেইল: [email protected]

ফোন: 01716197760

> কুমিল্লা জেলা
> নাঙ্গলকোট

নাঙ্গলকোটে গণহত্যার স্মৃতিচিহ্নগুলো পড়ে আছে অযত্নে—অবহেলায়

পাভেল রহমান, নাঙ্গলকোট
প্রকাশ : ১১ ডিসেম্বর ২০২৫, ১১: ৪৭
logo

নাঙ্গলকোটে গণহত্যার স্মৃতিচিহ্নগুলো পড়ে আছে অযত্নে—অবহেলায়

পাভেল রহমান, নাঙ্গলকোট

প্রকাশ : ১১ ডিসেম্বর ২০২৫, ১১: ৪৭
Photo

নাঙ্গলকোটের বিভিন্নস্থানে স্বাধীনতা যুদ্ধে বর্বর পাকবাহিনীর মুক্তিযোদ্ধাসহ নিরীহ সাধারণ জনগণকে গণহত্যার স্মৃতিচিহ্নগুলো অবহেলা-অযত্নে পড়ে আছে। স্বাধীনতার প্রায় ৫৪ বছরেও স্বাধীনতার স্মৃতিচিহ্নগুলো সংশ্লিষ্ট প্রশাসন সংরক্ষণ এবং স্মৃতিফলক নির্মাণ করেনি। স্থানীয় এলাকাবাসী স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মৃতিচিহৃগুলো সংরক্ষণের পাশাপাশি স্মৃতিসৌধ নির্মাণ এবং নিহত শহীদদের স্মৃতিফলক স্থাপনের দাবি জানান।

স্বাধীনতা যুদ্ধে বর্তমান নাঙ্গলকোট, চৌদ্দগ্রাম এবং লাকসামের বীর মুক্তিযোদ্ধা ও নিরীহ জনগণের ওপর পাকসেনাদের বড়ধরনের গণহত্যা এবং বর্বর নির্যাতনের এক নীরব সাক্ষী হয়ে আছে লাকসাম-চৌদ্দগ্রাম সড়কের ডাকাতিয়া নদী তীরবর্তী নাঙ্গলকোট উপজেলার বাঙ্গড্ডা ইউনিয়নের পরিকোট সেতু সংলগ্ন ভূঁইয়া পুকুর পাড়। এছাড়া হাসানপুর রেলস্টেশন এলাকা, তেলপাই মনু দিঘীরপাড় ও ঢালুয়ার তেজেরবাজার এলাকায়ও পাকসেনারা গণহত্যা চালায়। অন্যদিকে নাঙ্গলকোট বাজার ও বটতলী বাজারেও পাকসেনারা ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়।

স্বাধীনতার দীর্ঘ ২৯ বছরে এসে বিগত ২০০০ সালের ১৬ ডিসেম্বর তৎকালীন কুমিল্লা-১১(নাঙ্গলকোট) সংসদ সদস্য মরহুম জয়নাল আবেদীন ভূঁইয়া পরিকোটে গণহত্যা ও নির্মম নির্যাতনের স্থানটি চিহ্নিতকরণ করে পরিকোট বধ্যভূমি নামকরণ করে একটি ফলক উন্মোচন করেন। ২০২০ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর নাঙ্গলকোট উপজেলা এলজিইডি সার্বজনীন সামাজিক অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় বধ্যভূমির চতুর্দিকে বাউন্ডারি ওয়াল, মটি ভরাট ও রক্ষাপদ নির্মাণ করেন। কিন্তু উপজেলা প্রশাসনের তদারকি না থাকায় স্থানীয় লোকজন বধ্যভূমিটি ধান মাড়াই এবং ধান শুকানোসহ খড়ের গাদা নির্মাণ কাজে ব্যবহার করছেন। এছাড়া কোমলমতি ছেলেরা স্থানটিকে খেলার মাঠ হিসেবেও ব্যবহার করছেন।

অন্যদিকে উপজেলা প্রশাসন পাকবাহিনীর হাসানপুর রেলস্টেশন এলাকা, তেলপাই মনু দিঘীরপাড় ও ঢালুয়ার তেজেরবাজার এলাকার গণহত্যার স্থানগুলো সংরক্ষণের কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। সেগুলোও অবহেলা-অযত্নে পড়ে আছে। পাকিস্তানি বাহিনী তাদের এদেশীয় দোসর রাজাকারদের সহযোগিতায় বিভিন্ন এলাকা থেকে মুক্তিযোদ্ধাসহ নিরীহ লোকজনকে ধরে এনে পরিকোট ভূঁইয়া পুকুর পাড়ে তাদের ক্যাম্পে কখনো প্রকাশ্যে গুলি করে আবার কখনো নির্মম নির্যাতনের মাধ্যমে নদীতে ফেলে প্রায় ৪-৫শ লোককে হত্যা করেন। এছাড়া, তাদের পাশবিকতার শিকার হয়েছেন দুই শতাধিক নারী।

সরেজমিনে ঘটনার প্রতক্ষ্যদর্শী অনেকের সঙ্গে কথা বললে পরিকোট ক্যাম্পে পাকবাহিনী এবং তাদের এ দেশীয় দোসরদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় মুক্তিযোদ্ধা, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও এলাকার নিরীহ জনগণকে হত্যা, নারীদের প্রতি নির্মমতা, বাড়িঘর ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ এবং লুটপাটের মর্মস্পর্শী ও করুণ কাহিনি ফুটে ওঠে।

১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হলে জুনের ১ম দিকে লাকসাম-চৌদ্দগ্রাম সড়ক যাতায়াতের জন্য সুবিধাজনক হওয়ায় পরিকোট সেতু সংলগ্ন ভূঁইয়া পুকুর পাড়কে পাকসেনারা কুমিল্লার ময়নামতি ক্যান্টনম্যান্টের পর দ্বিতীয় ক্যান্টমেন্ট হিসেবে বেছে নেন। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন গেদ্দারজি, ক্যাপ্টেন জং, শরীফ মোহাম্মদ এবং হানিফ খাঁনের নেতৃত্বে পাকসেনারা ক্যাম্প গড়ে তোলেন। পাকবাহিনী পরিকোট ক্যাম্পে ৭/৮টি আর্টিলারি, কামানসহ ভারী অস্ত্র-শস্ত্রের বিশাল বহর নিয়ে তৎকালীন লাকসাম, চৌদ্দগ্রামের বৃহত্তর এলাকায় গণহত্যা, নির্মম নির্যাতন এবং ধ্বংসযজ্ঞে মেতে ওঠেন।

জুনের প্রথমদিকে একদিন রাতে পাকবাহিনীর একটি দল বাঙ্গড্ডা বাজারের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী রামেরবাগ গ্রামের দুই ভাই আলী মিয়া এবং মোহাম্মদের বাড়ি এসে একটি অনুষ্ঠান থেকে তাদের ধরে নিয়ে বাঙ্গড্ডা পূর্ব বাজারে এনে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করে। ওইদিন ভোররাতে রায়কোট গ্রামের প্রয়াত মৌলভী আফছার উদ্দিন মোল্লার বাড়িতে ঢুকে তার ছেলে আওয়ামী লীগ নেতা এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তাকারী রুহুল আমীন মোল্লাকে না পেয়ে তাদের বাড়ি-ঘর আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়। একইদিন রাতে পাকসেনাদের অন্য একটি গ্রুপ রায়কোট ইউনিয়নের ছগরিপাড়া গ্রামের আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল গণি দারোগার বাড়ি-ঘর আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয় এবং আব্দুল গণি দারোগাকে গুলি করে হত্যা করে। তাদের আরো একটি গ্রুপ কুকুরিখিল গ্রামের আওয়ামী লীগ নেতা মাস্টার ছিদ্দিকুর রহমান মজুমদারের বাড়িতে ঢুকে তাকে না পেয়ে বাড়ি-ঘর আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়। একই গ্রামের হিন্দু রণজিত সূত্র ধরের বাড়িতে ঢুকে তাকে গুলি করে হত্যা করে। এভাবে মন্তলী গ্রামের মুফতি হাবিবুর রহমানের বাড়িও আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়। আঙ্গলখোঁড় গ্রামের আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল হালিম মজুমদারকে না পেয়ে তার বাড়িতে আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয় এবং তার বাবা আব্দুর রহিম মজুমদারকে গুলি করে হত্যা করে। পাকসেনারা পরিকোট ক্যাম্পে হেসাখালের মুক্তিযোদ্ধা মজিবুল হক, জোড্ডা ইউনিয়নের বাহুড়া গ্রামের আবদুল মতিনকে বাঁশ দিয়ে চিপে ডাকাতিয়া নদীতে ফেলে গুলি করে হত্যা করে।

রায়কোট ইউনিয়নের ছুপুয়া গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা মমতাজের স্টেনগানের সন্ধান পাওয়ার পর সাপ্তাহিক হাজিরার অংশ হিসেবে মমতাজ পরিকোট ক্যাম্পে আসার সময় পাকবাহিনীর হাতে ধরা পড়েন। এসময় পাকবাহিনীর ক্যাপ্টেন গেদ্দারজি বলেন, রাষ্ট্রবিরোধী কাজ করলে ইসলামের দৃষ্টিতে কি শাস্তি হতে পারে তার সিদ্ধান্ত দেবেন, পরিকোট ক্যাম্পের পাকবাহিনীর পরামর্শদাতা চারজানিয়া গ্রামের মাওলানা মোস্তফা হামিদী। পরে পাকবাহিনী মমতাজকে ক্যাম্পে এনে শারীরিক নির্যাতনের পর উপুড় করে শুইয়ে এবং পা বেঁধে গলায় রশি দিয়ে হাত-পা পেছনে নিয়ে বেঁধে নদীতে ফেলে হত্যা করে।

এছাড়া বেরী গ্রামের ছেরাজুল হক, পরিকোট গ্রামের রুস্তম আলী, নুরুল হক মোল্লা, গান্দাছী গ্রামের হিন্দু দুই ভাই লাল মোহন, বংক বারই, লাকসামের কেদারদুয়ার গ্রামের হরেকৃজ্ঞ এবং সুরেশকে পরিকোট ক্যাম্পে এনে হাত-পা বেঁধে নদীতে ফেলার পর ভেসে উঠলে ব্রাশফায়ার করে তাদের হত্যা করা হয়। চাউলভান্ডার গ্রামের ডা. নটবরকে নদীতে ফেলে গুলি করে হত্যা করা হয়।

এভাবে পাকবাহিনী এলাকার নাম না জানা অনেককে দিনে-দুপুরে আবার কখনো রাতের আঁধারে ধরে নিয়ে নির্মম নির্যাতনের পর বস্তা বন্দী করে গুলি করে হত্যা করে ডাকাতিয়া নদীতে ফেলে দেয় । ডাকাতিয়া নদীর পানি মানুষের রক্তে রঞ্চিত হয়। অনেককে হত্যা করে লাশ মাটিতে পুঁতে ফেলা হয়। আবার অনেক লোককে নির্যাতনের পর ছেড়ে দেয়া হয়।

এদিকে ১৯৭১ সালের ২৪ আগস্ট উপজেলার দৌলখাঁড় গ্রামের সিরাজুল আলম ওরফে আকমত আলী দারোগাকে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী ধরে নিয়ে দুই দিন পাশবিক নির্যাতনের পর ২৬ আগস্ট নাঙ্গলকোট হাসানপুর রেলস্টেশন সংলগ্ন নতুন মসজিদের সামনে গুলি করে হত্যা করে লাশ মাটিতে পুঁতে ফেলেন। মুক্তিযোদ্ধা আকমত আলী দারোগার কবরটি এখনো চিহ্নিত করা যায়নি। সেখানে কোনো স্মৃতিফলক নির্মাণ করা হয়নি। শুধুমাত্র ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথের হাসানপুর রেলস্টেশনের সংলগ্ন রেলপথের দক্ষিণ পাশে আকমত আলী দারোগার নামে একটি সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেয়া হয়। এখনো সাইনবোর্ডটি রয়েছে। স্থানীয় এলাকাবাসী জানান, আকমত আলী দারোগার পরিবারের লোকজন হাসানপুর রেলস্টেশন এলাকা থেকে কবরের মাটি নিয়ে তার গ্রামের বাড়ি দৌলখাঁড় গ্রামে আকমত আলী দারোগাকে পুনরায় কবর দেন।

এছাড়া পাকসেনারা পাঁচজন অজ্ঞাত লোককে হত্যা করে মৌকরা ইউনিয়নের তেলপাই গ্রামের মনু দিঘীরপাড়ে মাটির নিচে পুঁতে ফেলেন। তাদের গণকবরটি এখনো চিহ্নিত করা হয়নি এবং সেখানে কোনো স্মৃতিফলক নির্মাণ করা হয়নি।

পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গণহত্যার আরেকটি স্থান হচ্ছে, উপজেলার ঢালুয়া ইউনিয়নের তেজেরবাজার এলাকা। পাক সেনারা তেজের বাজারে দুইজন অজ্ঞাত নিরীহ লোককে হত্যা করে তেজের বাজার-সিজিয়ারা সড়কের পাশে কবর দেয়। চিওড়া গ্রামের মনা মিয়া এবং তনু মিয়াসহ ৮-৯জন লোক এ দুইজনকে দাফন করেন। তাদের কবরটি পুরনো দেয়াল ঘেরা অবস্থায় অবহেলা-অযত্নে পড়ে আছে।

স্থানীয় এলাকাবাসী নাঙ্গলকোটে পাকবাহিনীর নির্মম গণহত্যার স্মৃতিচিহ্ন পরিকোট বধ্যভূমি, হাসানপুর রেলস্টেশন এলাকা, তেলপাই মনু দিঘীর পাড় এবং তেজের বাজার এলাকাগুলো সংরক্ষণসহ নিহত শহীদদের নামফলকসহ স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের দাবি জানান।

নাঙ্গলকোট উপজেলা নির্বাহী অফিসার লিজা আক্তার বিথী বলেন, পরিকোট বধ্যভূমি এলাকায় গিয়ে আমি স্থানটি দেখব কি অবস্থায় আছে। পরবর্তীতে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

Thumbnail image

নাঙ্গলকোটের বিভিন্নস্থানে স্বাধীনতা যুদ্ধে বর্বর পাকবাহিনীর মুক্তিযোদ্ধাসহ নিরীহ সাধারণ জনগণকে গণহত্যার স্মৃতিচিহ্নগুলো অবহেলা-অযত্নে পড়ে আছে। স্বাধীনতার প্রায় ৫৪ বছরেও স্বাধীনতার স্মৃতিচিহ্নগুলো সংশ্লিষ্ট প্রশাসন সংরক্ষণ এবং স্মৃতিফলক নির্মাণ করেনি। স্থানীয় এলাকাবাসী স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মৃতিচিহৃগুলো সংরক্ষণের পাশাপাশি স্মৃতিসৌধ নির্মাণ এবং নিহত শহীদদের স্মৃতিফলক স্থাপনের দাবি জানান।

স্বাধীনতা যুদ্ধে বর্তমান নাঙ্গলকোট, চৌদ্দগ্রাম এবং লাকসামের বীর মুক্তিযোদ্ধা ও নিরীহ জনগণের ওপর পাকসেনাদের বড়ধরনের গণহত্যা এবং বর্বর নির্যাতনের এক নীরব সাক্ষী হয়ে আছে লাকসাম-চৌদ্দগ্রাম সড়কের ডাকাতিয়া নদী তীরবর্তী নাঙ্গলকোট উপজেলার বাঙ্গড্ডা ইউনিয়নের পরিকোট সেতু সংলগ্ন ভূঁইয়া পুকুর পাড়। এছাড়া হাসানপুর রেলস্টেশন এলাকা, তেলপাই মনু দিঘীরপাড় ও ঢালুয়ার তেজেরবাজার এলাকায়ও পাকসেনারা গণহত্যা চালায়। অন্যদিকে নাঙ্গলকোট বাজার ও বটতলী বাজারেও পাকসেনারা ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়।

স্বাধীনতার দীর্ঘ ২৯ বছরে এসে বিগত ২০০০ সালের ১৬ ডিসেম্বর তৎকালীন কুমিল্লা-১১(নাঙ্গলকোট) সংসদ সদস্য মরহুম জয়নাল আবেদীন ভূঁইয়া পরিকোটে গণহত্যা ও নির্মম নির্যাতনের স্থানটি চিহ্নিতকরণ করে পরিকোট বধ্যভূমি নামকরণ করে একটি ফলক উন্মোচন করেন। ২০২০ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর নাঙ্গলকোট উপজেলা এলজিইডি সার্বজনীন সামাজিক অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় বধ্যভূমির চতুর্দিকে বাউন্ডারি ওয়াল, মটি ভরাট ও রক্ষাপদ নির্মাণ করেন। কিন্তু উপজেলা প্রশাসনের তদারকি না থাকায় স্থানীয় লোকজন বধ্যভূমিটি ধান মাড়াই এবং ধান শুকানোসহ খড়ের গাদা নির্মাণ কাজে ব্যবহার করছেন। এছাড়া কোমলমতি ছেলেরা স্থানটিকে খেলার মাঠ হিসেবেও ব্যবহার করছেন।

অন্যদিকে উপজেলা প্রশাসন পাকবাহিনীর হাসানপুর রেলস্টেশন এলাকা, তেলপাই মনু দিঘীরপাড় ও ঢালুয়ার তেজেরবাজার এলাকার গণহত্যার স্থানগুলো সংরক্ষণের কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। সেগুলোও অবহেলা-অযত্নে পড়ে আছে। পাকিস্তানি বাহিনী তাদের এদেশীয় দোসর রাজাকারদের সহযোগিতায় বিভিন্ন এলাকা থেকে মুক্তিযোদ্ধাসহ নিরীহ লোকজনকে ধরে এনে পরিকোট ভূঁইয়া পুকুর পাড়ে তাদের ক্যাম্পে কখনো প্রকাশ্যে গুলি করে আবার কখনো নির্মম নির্যাতনের মাধ্যমে নদীতে ফেলে প্রায় ৪-৫শ লোককে হত্যা করেন। এছাড়া, তাদের পাশবিকতার শিকার হয়েছেন দুই শতাধিক নারী।

সরেজমিনে ঘটনার প্রতক্ষ্যদর্শী অনেকের সঙ্গে কথা বললে পরিকোট ক্যাম্পে পাকবাহিনী এবং তাদের এ দেশীয় দোসরদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় মুক্তিযোদ্ধা, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও এলাকার নিরীহ জনগণকে হত্যা, নারীদের প্রতি নির্মমতা, বাড়িঘর ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ এবং লুটপাটের মর্মস্পর্শী ও করুণ কাহিনি ফুটে ওঠে।

১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হলে জুনের ১ম দিকে লাকসাম-চৌদ্দগ্রাম সড়ক যাতায়াতের জন্য সুবিধাজনক হওয়ায় পরিকোট সেতু সংলগ্ন ভূঁইয়া পুকুর পাড়কে পাকসেনারা কুমিল্লার ময়নামতি ক্যান্টনম্যান্টের পর দ্বিতীয় ক্যান্টমেন্ট হিসেবে বেছে নেন। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন গেদ্দারজি, ক্যাপ্টেন জং, শরীফ মোহাম্মদ এবং হানিফ খাঁনের নেতৃত্বে পাকসেনারা ক্যাম্প গড়ে তোলেন। পাকবাহিনী পরিকোট ক্যাম্পে ৭/৮টি আর্টিলারি, কামানসহ ভারী অস্ত্র-শস্ত্রের বিশাল বহর নিয়ে তৎকালীন লাকসাম, চৌদ্দগ্রামের বৃহত্তর এলাকায় গণহত্যা, নির্মম নির্যাতন এবং ধ্বংসযজ্ঞে মেতে ওঠেন।

জুনের প্রথমদিকে একদিন রাতে পাকবাহিনীর একটি দল বাঙ্গড্ডা বাজারের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী রামেরবাগ গ্রামের দুই ভাই আলী মিয়া এবং মোহাম্মদের বাড়ি এসে একটি অনুষ্ঠান থেকে তাদের ধরে নিয়ে বাঙ্গড্ডা পূর্ব বাজারে এনে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করে। ওইদিন ভোররাতে রায়কোট গ্রামের প্রয়াত মৌলভী আফছার উদ্দিন মোল্লার বাড়িতে ঢুকে তার ছেলে আওয়ামী লীগ নেতা এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তাকারী রুহুল আমীন মোল্লাকে না পেয়ে তাদের বাড়ি-ঘর আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়। একইদিন রাতে পাকসেনাদের অন্য একটি গ্রুপ রায়কোট ইউনিয়নের ছগরিপাড়া গ্রামের আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল গণি দারোগার বাড়ি-ঘর আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয় এবং আব্দুল গণি দারোগাকে গুলি করে হত্যা করে। তাদের আরো একটি গ্রুপ কুকুরিখিল গ্রামের আওয়ামী লীগ নেতা মাস্টার ছিদ্দিকুর রহমান মজুমদারের বাড়িতে ঢুকে তাকে না পেয়ে বাড়ি-ঘর আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়। একই গ্রামের হিন্দু রণজিত সূত্র ধরের বাড়িতে ঢুকে তাকে গুলি করে হত্যা করে। এভাবে মন্তলী গ্রামের মুফতি হাবিবুর রহমানের বাড়িও আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়। আঙ্গলখোঁড় গ্রামের আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল হালিম মজুমদারকে না পেয়ে তার বাড়িতে আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয় এবং তার বাবা আব্দুর রহিম মজুমদারকে গুলি করে হত্যা করে। পাকসেনারা পরিকোট ক্যাম্পে হেসাখালের মুক্তিযোদ্ধা মজিবুল হক, জোড্ডা ইউনিয়নের বাহুড়া গ্রামের আবদুল মতিনকে বাঁশ দিয়ে চিপে ডাকাতিয়া নদীতে ফেলে গুলি করে হত্যা করে।

রায়কোট ইউনিয়নের ছুপুয়া গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা মমতাজের স্টেনগানের সন্ধান পাওয়ার পর সাপ্তাহিক হাজিরার অংশ হিসেবে মমতাজ পরিকোট ক্যাম্পে আসার সময় পাকবাহিনীর হাতে ধরা পড়েন। এসময় পাকবাহিনীর ক্যাপ্টেন গেদ্দারজি বলেন, রাষ্ট্রবিরোধী কাজ করলে ইসলামের দৃষ্টিতে কি শাস্তি হতে পারে তার সিদ্ধান্ত দেবেন, পরিকোট ক্যাম্পের পাকবাহিনীর পরামর্শদাতা চারজানিয়া গ্রামের মাওলানা মোস্তফা হামিদী। পরে পাকবাহিনী মমতাজকে ক্যাম্পে এনে শারীরিক নির্যাতনের পর উপুড় করে শুইয়ে এবং পা বেঁধে গলায় রশি দিয়ে হাত-পা পেছনে নিয়ে বেঁধে নদীতে ফেলে হত্যা করে।

এছাড়া বেরী গ্রামের ছেরাজুল হক, পরিকোট গ্রামের রুস্তম আলী, নুরুল হক মোল্লা, গান্দাছী গ্রামের হিন্দু দুই ভাই লাল মোহন, বংক বারই, লাকসামের কেদারদুয়ার গ্রামের হরেকৃজ্ঞ এবং সুরেশকে পরিকোট ক্যাম্পে এনে হাত-পা বেঁধে নদীতে ফেলার পর ভেসে উঠলে ব্রাশফায়ার করে তাদের হত্যা করা হয়। চাউলভান্ডার গ্রামের ডা. নটবরকে নদীতে ফেলে গুলি করে হত্যা করা হয়।

এভাবে পাকবাহিনী এলাকার নাম না জানা অনেককে দিনে-দুপুরে আবার কখনো রাতের আঁধারে ধরে নিয়ে নির্মম নির্যাতনের পর বস্তা বন্দী করে গুলি করে হত্যা করে ডাকাতিয়া নদীতে ফেলে দেয় । ডাকাতিয়া নদীর পানি মানুষের রক্তে রঞ্চিত হয়। অনেককে হত্যা করে লাশ মাটিতে পুঁতে ফেলা হয়। আবার অনেক লোককে নির্যাতনের পর ছেড়ে দেয়া হয়।

এদিকে ১৯৭১ সালের ২৪ আগস্ট উপজেলার দৌলখাঁড় গ্রামের সিরাজুল আলম ওরফে আকমত আলী দারোগাকে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী ধরে নিয়ে দুই দিন পাশবিক নির্যাতনের পর ২৬ আগস্ট নাঙ্গলকোট হাসানপুর রেলস্টেশন সংলগ্ন নতুন মসজিদের সামনে গুলি করে হত্যা করে লাশ মাটিতে পুঁতে ফেলেন। মুক্তিযোদ্ধা আকমত আলী দারোগার কবরটি এখনো চিহ্নিত করা যায়নি। সেখানে কোনো স্মৃতিফলক নির্মাণ করা হয়নি। শুধুমাত্র ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথের হাসানপুর রেলস্টেশনের সংলগ্ন রেলপথের দক্ষিণ পাশে আকমত আলী দারোগার নামে একটি সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেয়া হয়। এখনো সাইনবোর্ডটি রয়েছে। স্থানীয় এলাকাবাসী জানান, আকমত আলী দারোগার পরিবারের লোকজন হাসানপুর রেলস্টেশন এলাকা থেকে কবরের মাটি নিয়ে তার গ্রামের বাড়ি দৌলখাঁড় গ্রামে আকমত আলী দারোগাকে পুনরায় কবর দেন।

এছাড়া পাকসেনারা পাঁচজন অজ্ঞাত লোককে হত্যা করে মৌকরা ইউনিয়নের তেলপাই গ্রামের মনু দিঘীরপাড়ে মাটির নিচে পুঁতে ফেলেন। তাদের গণকবরটি এখনো চিহ্নিত করা হয়নি এবং সেখানে কোনো স্মৃতিফলক নির্মাণ করা হয়নি।

পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গণহত্যার আরেকটি স্থান হচ্ছে, উপজেলার ঢালুয়া ইউনিয়নের তেজেরবাজার এলাকা। পাক সেনারা তেজের বাজারে দুইজন অজ্ঞাত নিরীহ লোককে হত্যা করে তেজের বাজার-সিজিয়ারা সড়কের পাশে কবর দেয়। চিওড়া গ্রামের মনা মিয়া এবং তনু মিয়াসহ ৮-৯জন লোক এ দুইজনকে দাফন করেন। তাদের কবরটি পুরনো দেয়াল ঘেরা অবস্থায় অবহেলা-অযত্নে পড়ে আছে।

স্থানীয় এলাকাবাসী নাঙ্গলকোটে পাকবাহিনীর নির্মম গণহত্যার স্মৃতিচিহ্ন পরিকোট বধ্যভূমি, হাসানপুর রেলস্টেশন এলাকা, তেলপাই মনু দিঘীর পাড় এবং তেজের বাজার এলাকাগুলো সংরক্ষণসহ নিহত শহীদদের নামফলকসহ স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের দাবি জানান।

নাঙ্গলকোট উপজেলা নির্বাহী অফিসার লিজা আক্তার বিথী বলেন, পরিকোট বধ্যভূমি এলাকায় গিয়ে আমি স্থানটি দেখব কি অবস্থায় আছে। পরবর্তীতে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

বিষয়:

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

১

ভাষাসৈনিক অজিত গুহ মহাবিদ্যালয়ে বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার উদ্বোধন

২

দাউদকান্দিতে সড়ক দুর্ঘটনায় চারজনের মৃত্যুতে বাস মালিক গ্রেপ্তার

৩

হোমনা ও তিতাস উপজেলা নিয়েই কুমিল্লা-২ আসন, সীমানা নিয়ে ইসির সিদ্ধান্ত বহাল

৪

এ দেশের মানুষ নিজেদের অধিকার রক্ষায় বারবার রক্ত দিয়েছে : ড. সায়মা

৫

কুমিল্লাস্থ বরুড়া উপজেলা উন্নয়ন সমিতির সভাপতি মোজাম্মেল সম্পাদক জাহিদ

সম্পর্কিত

ভাষাসৈনিক অজিত গুহ মহাবিদ্যালয়ে বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার উদ্বোধন

ভাষাসৈনিক অজিত গুহ মহাবিদ্যালয়ে বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার উদ্বোধন

১০ ঘণ্টা আগে
দাউদকান্দিতে সড়ক দুর্ঘটনায় চারজনের মৃত্যুতে বাস মালিক গ্রেপ্তার

দাউদকান্দিতে সড়ক দুর্ঘটনায় চারজনের মৃত্যুতে বাস মালিক গ্রেপ্তার

১৫ ঘণ্টা আগে
হোমনা ও তিতাস উপজেলা নিয়েই কুমিল্লা-২ আসন,  সীমানা নিয়ে ইসির সিদ্ধান্ত বহাল

হোমনা ও তিতাস উপজেলা নিয়েই কুমিল্লা-২ আসন, সীমানা নিয়ে ইসির সিদ্ধান্ত বহাল

১৫ ঘণ্টা আগে
এ দেশের মানুষ নিজেদের অধিকার রক্ষায় বারবার রক্ত দিয়েছে : ড. সায়মা

এ দেশের মানুষ নিজেদের অধিকার রক্ষায় বারবার রক্ত দিয়েছে : ড. সায়মা

১৮ ঘণ্টা আগে