বিদ্যার দেবীর আরাধনা আজ

স্বর্গ রায়
আপডেট : ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২: ১৮
Thumbnail image

হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্যতম ধর্মীয় উৎসব সরস্বতী পূজা আজ শুক্রবার। ইংরেজি নববর্ষ আসা মানেই, বাঙালির নজর থাকে সরস্বতী পূজার দিকে। শাস্ত্রীয় বিধান অনুসারে মাঘ মাসের শুক্লা পঞ্চমী তিথিতে সরস্বতী পূজা আয়োজিত হয়। তিথিটি শ্রীপঞ্চমী বা বসন্ত পঞ্চমী নামেও পরিচিত। এই পূজার জন্যে সকলে সারা বছর ধরে অপেক্ষা করে থাকেন। বিশেষত শিক্ষার্থীদের জন্যে সরস্বতী পূজা খুবই স্পেশাল। সকাল থেকেই উপবাস থেকে বাগদেবীর উদ্দেশ্যে অঞ্জলি দেন তারা। বিদ্যা, বুদ্ধি, জ্ঞানের প্রার্থনা করেন সরস্বতী মায়ের কাছে।

আজ শুক্রবার (বাংলায় ৯ মাঘ) সরস্বতী পূজা। গতকাল ২২ জানুয়ারি রাত ১:৩৯ মিনিট থেকে আজ ২৩ জানুয়ারি রাত ১২:২৯ মিনিট পর্যন্ত থাকবে পঞ্চমী তিথি।

সরস্বতী পূজা উপলক্ষে চোখ ধাঁধানো আলোকসজ্জায় সেজে উঠেছে পুরো কুমিল্লা শহর। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়, কুমিল্লা ভিক্টোরয়িা সরকারি কলেজ, রাজ রাজেশ্বরী কালী মন্দির, কালীতলা কালী মন্দির, কুমিল্লা সরকারি কলেজ সহ নগরের বিভিন্ন মন্দির ও বাড়িতে প্রতিমা স্থাপন করা হয়েছে। বিভিন্ন মন্দিরের মোড়ে মুড়ি, বাতাসা, জিলাপি, খই, নানা ধরনের ফল বিক্রি হচ্ছে।

বাণী অর্চনা ও নানা আয়োজন দিয়ে বিদ্যা, বাণী ও সুরের দেবী সরস্বতীর পূজা শুরু হয়। ধর্মীয় বিধান অনুসারে সাদা রাজহাঁসে চড়ে বিদ্যা ও সুরের দেবী সরস্বতী পৃথিবীতে আসেন।

সরস্বতী বৈদিক দেবী হলেও সরস্বতী পূজা বর্তমান রূপটি আধুনিক কালে প্রচলিত হয়েছে। তবে প্রাচীনকালে তান্ত্রিক সাধকেরা সরস্বতী-সদৃশ দেবী বাগেশ্বরীর পূজা করতেন বলে জানা যায়। ঊনবিংশ শতাব্দীতে পাঠশালায় প্রতি মাসের শুক্লা পঞ্চমী তিথিতে ধোয়া চৌকির উপর তালপাতার তাড়ি ও দোয়াতকলম রেখে পূজা করার প্রথা ছিল। শ্রীপঞ্চমী তিথিতে ছাত্রেরা বাড়িতে বাংলা বা সংস্কৃত গ্রন্থ, শ্লেট, দোয়াত ও কলমে সরস্বতী পূজা করত। গ্রামাঞ্চলে এই প্রথা বিংশ শতাব্দীতেও প্রচলিত ছিল। শহরে ধনাঢ্য ব্যক্তিরাই সরস্বতীর প্রতিমা নির্মাণ করে পূজা করতেন। 'সরস' শব্দের অর্থ হলো জল। সুতরাং সরস্বতী শব্দের অর্থ হলো জলবতী বা নদী। অনেক পণ্ডিতই মনে করেন দেবী সরস্বতী প্রথমে ছিলেন নদী। পরে তিনি দেবী হিসেবে পূজিত হন। তিনি চেতনা ও জ্ঞানের দেবী। দূর দুরান্ত থেকে মানুষ এই পূজার বিসর্জন দেখতে আসত। পূজা উপলক্ষ্যে দুই ঘণ্টা আতশবাজিও পোড়ানো হত। আধুনিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সরস্বতী পূজার প্রচলন হয় বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে।

সরস্বতীর পূজা সাধারণ পূজার নিয়মানুসারেই হয়। তবে এই পূজায় কয়েকটি বিশেষ উপচার বা সামগ্রীর প্রয়োজন হয়। যথা: অভ্র-আবির, আমের মুকুল, দোয়াত-কলম ও যবের শীষ। পূজার জন্য বাসন্তী রঙের গাঁদা ফুলও প্রয়োজন হয়। লোকাচার অনুসারে, ছাত্রছাত্রীরা পূজার পূর্বে কুল ভক্ষণ করে না। পূজার দিন কিছু লেখাও নিষিদ্ধ। যথাবিহিত পূজার পর লক্ষ্মী, নারায়ণ, লেখনী-মস্যাধার (দোয়াত-কলম), পুস্তক ও বাদ্যযন্ত্রেরও পূজা করার প্রথা প্রচলিত আছে। সরস্বতী পূজার সময় দেখা যায় খাগের কলম। কাঁচের দোয়াতে কালির বদলে থাকে দুধ। এইদিন ছোটোদের হাতেখড়ি দিয়ে পাঠ্যজীবন শুরু হয়।পূজান্তে পুষ্পাঞ্জলি দেওয়ার প্রথাটি অত্যন্ত জনপ্রিয়।

কুমিল্লায় সরস্বতী পূজার দ্বিতীয় দিন নগর পরিক্রমা অর্থাৎ ঐতিহ্যবাহী ট্রাক মিছিল বের হয়, যা এই অঞ্চলের পূজার একটি বিশেষ আকর্ষণ। ট্রাকগুলো আলোকসজ্জায় সজ্জিত থাকে এবং দেবীর প্রতিমা নিয়ে গান-বাজনা ও নাচের মধ্য দিয়ে এক আনন্দমুখর পরিবেশ তৈরি হয়, যা পূজার আনন্দকে দীর্ঘায়িত করে। সরস্বতীর জ্ঞান, বিদ্যা ও সুরের দেবীর প্রতিমা নিয়ে নেচে গেয়ে হিন্দু ধর্মাবলম্বীর শিশু-কিশোর, তরুণ-তরুণীসহ সকল বয়সী মানুষ এ ট্রাক মিছিলে অংশগ্রহণ করেন। এই আয়োজন কুমিল্লায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের প্রতীক হিসেবে পরিচিত। অন্যান্য জায়গার তুলনায় কুমিল্লায় সরস্বতী পূজার আমেজ ট্রাক মিছিলের কারণে দীর্ঘস্থায়ী হয়, যা এখানকার পূজার একটি ভিন্ন মাত্রা যোগ করে।

গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাইস্কুলের সহকারী শিক্ষক গোপাল চন্দ্র ভৌমিক বলেন, এই দিনে বিদ্যা দেবীর কাছে বই নিয়ে হাজির হন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এই পূজা বেশি হয়। এছাড়া পাড়া মহল্লায় পূজা।

বিষয়:

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

সম্পর্কিত