দেবীদ্বারে

পুরনো এক্সরে ফিল্মে আয় রোজগার

দেবীদ্বার প্রতিনিধি
Thumbnail image

চিকিৎসা শেষে ডাস্টবিনে ফেলে দেয়া হতো এক্সরে ফিল্মের বর্জ্য। যেগুলো ছিল একেবারেই অর্থনৈতিক গুরুত্বহীন। কখনো কেউ প্রয়োজনও মনে করত না। কিন্তু সেই এক্সরে ফিল্মগুলো ধুয়ে-মুছে অর্থ আয়, কর্মসংস্থান, স্বাবলম্বী হওয়া এবং জীবিকা নির্বাহে ভূমিকা রাখা! এটিতো কল্পনাতীত ঘটনা। তবে এমন অসাধ্যই সাধন করেছে কুমিল্লার দেবীদ্বার উপজেলার মোহনপুর ইউনিয়নের প্রত্যন্ত অঞ্চলের ভৈষেরকোট গ্রামে।

ওই গ্রামের আবুল হোসেন নামে একজন উদ্যোক্তা প্রায় দুইযুগ পূর্বে অর্থাৎ ২০০১ সালে ‘আল আমীন পেপার এজেন্সী’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেন। ঢাকা কোতয়ালীর বাবুবাজার, পিকে ঘোষ ষ্ট্রিটে। সেখানেই এ প্রতিষ্ঠানটির প্রধান কার্যালয়। পরে নিজ এলাকায় প্রতিষ্ঠানটির কাজ শুরু করেন অর্থনৈতিক সাশ্রয়ের কারণে।

জানা গেছে, তিনি দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পুরাতন, ব্যবহৃত ও পরিত্যক্ত এসব এক্সরে ফিল্ম সংগ্রহ করেন। সেগুলো পানিতে ভিজিয়ে ঘষেমেজে ধুয়ে মুছে, তেজস্ক্রিয় পদার্থ (রশ্মি), রেডেশিয়ান, প্রিন্ট তুলে ফেলেন। পরে শুকিয়ে বানিয়ে ফেলেন একদম ঝকঝকে নতুনের মতো। তারপর প্যাকেটে প্রক্রিয়াজাতের মাধ্যমে গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে বাজারজাত করেন। এ ব্যতিক্রমী উদ্যোগ তাক লাগিয়ে দিয়েছে স্থানীয়দের মধ্যে। পরিত্যক্ত ফিল্ম সংগ্রহের চ্যালেঞ্জ ও কাজটি নিয়ে অনেকে উপহাস ছিল বড় বাঁধা। সময়ের ব্যবধানে তিনি আজ সফল।

পরিত্যক্ত এসব এক্সরে ফিল্ম যেগুলার কোন অর্থনৈতিক মূল্য না থাকলেও প্রক্রিয়াজাতকরণে এক বিরাট বাজার দখল করতে সক্ষম হয়েছে। যেখানে এক্সরে ফিল্মের কারণে বেশ কিছু লোকের গড়ে ওঠেছে কর্মসংস্থান। ভৈষেরকোট গ্রামের নির্জন এলাকায় একটি ছোট্ট আধাপাকা ভবনে প্রতিনিয়ত চলছে ফেলে দেওয়া এক্সরে প্লেট ধোয়ামোছার কাজ। এসব সামগ্রী গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিগুলোর বকরম, কাপ, ক্যাপসহ নানা সামগ্রীর কাজে আজ এক বিরাট বাজার দখল করে নিয়েছে।

‘আল আমীন পেপার এজেন্সী’র ব্যবস্থাপক মো. শামিম হোসেন জানান, সারাদেশে ভাঙ্গারি দোকান, বিভিন্ন প্রাইভেট এবং সরকারি হাসপাতাল থেকে এসব পরিত্যক্ত এক্স-রে ফিল্মগুলো সংগ্রহ করেন একশ্রেণীর লোকজন। এ ছাড়াও সিএমএইচর ব্যবহৃত এক্স-রে ফিল্মগুলো টেন্ডারে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয়।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সারাদেশ থেকে সংগৃহ করা ফিল্মগুলো পরিবহনে এলাকায় এনে নিজ ফ্যাক্টরীতে একসাথে জমা করছেন একদল শ্রমিক। কেউবা ধোয়ামোছার কাজে, কেউবা রোদে শুকিয়ে করছেন প্যাকেটজাত। প্রতিদিন সেখানে কাজ করেছেন ১০-১২ জন শ্রমিক।

তিনি আরও জানান, পরিত্যক্ত ফিল্ম ঘষেও যে আয় করা যায় শুরুতে কেউ বিশ্বাস করত না। কিন্তু এখন একজন শ্রমিক প্রতিদিন ৮০০-৯০০ টাকা পর্যন্ত আয় করছেন। ব্যাপক চাহিদা রয়েছে আমাদের ধোলাই করা পণ্যের। কিন্তু চাহিদা অনুযায়ী পরিত্যক্ত ফিল্ম সংগ্রহ করতে পারছি না। চাহিদা অনুযায়ী সংগ্রহ করতে পারলে কমপক্ষে শতশত শ্রমিক কাজে লাগানো যেত। দেশের অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারত।

দেবীদ্বার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক ডা. মঞ্জুর হোসেন বলেন, এক্সরে হলো এক ধরনের রেডিয়েশন যা রোগ নির্ণয়ের জন্য ব্যবহৃত হয়। তবে ব্যবহৃত এক্সরে ফিল্মে কিছু পরিমাণ তেজস্ক্রিয় পদার্থ (রশ্মি), সিলভার হ্যালাইড এবং অন্যান্য রাসায়নিক পদার্থ থাকে যা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তবে এ কাজে স্বাস্থ্য ঝুঁকিও রয়েছে। এগুলো পরিস্কার করার সময় মাক্স, হ্যান্ড গ্লাবস পরিহিত অবস্থায় সঠিকভাবে না করলে নিজ দেহের ও পরিবেশের ওপর খারাপ প্রভাব ফেলতে পারে। এক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিধি মেনে এবং সরকারী সহযোগিতায় প্রতিষ্ঠানটি এগিয়ে গেলে দেশের অর্থনীতিতে ভালো অবদান রাখতে পারবে।

দেবীদ্বার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবুল হাসনাত খাঁন বলেন, পরিত্যক্ত এক্সরে ফিল্ম, যেগুলোর অর্থনৈতিক কোন গুরুত্বই নেই। সেগুলো সংগ্রহ করে, পরিস্কার করে বাজারজাতকরণে ‘আল আমীন পেপার এজেন্সী’ কর্তৃক ফেলে দেয়া এক্সরে ফিল্ম ধুঁয়ে-মুছে অর্থ আয় খুবই ব্যতিক্রমী চিন্তার কাজ, এ ছাড়া ফিস্মের রং, পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে কিনা, বর্জ্যগুলো কোথায় ফেলা হচ্ছে সকল বিষয়ে খবরাখর নিচ্ছি।

বিষয়:

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

সম্পর্কিত