নাঙ্গলকোট প্রতিনিধি

ফেনী সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী জুলাই যোদ্ধা আনোয়ারুল আজিম (২০)। হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে আজিম ২৪-এর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশ নিয়ে ছাত্রলীগ ক্যাডারদের গুলিতে ফেনীর মহিপালে গুলিবিদ্ধ হন।
গুলিতে তার পায়ের গোড়ালির লিগামেন্ট এবং হাঁড় ফেটে যায়। গুলিবিদ্ধ বাম পায়ের গোড়ালির চিকিৎসা অবহেলায় তার বাম পা হারাতে বসেছেন। তার বাম পা ধীরে-ধীরে চিকন হয়ে যাচ্ছে। পায়ের শক্তি নেই। হাঁটা-চলা করতে কষ্ট হয়। খুঁড়িয়ে-খুঁড়িতে হাঁটেন। বসলে এবং বিছানায় শুতে গেলেও পায়ে ব্যথা করে। পা ঘুরানো যায় না। পায়ের মুভমেন্ট বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
জুলাই আন্দোলন শেষ হওয়ার দীর্ঘ দুই বছরেও গুলিবিদ্ধ পায়ের তীব্র যন্ত্রণা এবং পা হারোনোর আশঙ্কায় আজিমকে প্রতিনিয়ত দিন কাটাতে হচ্ছে। তার সহপাঠীরা ডিপ্লোমা পাস করে চাকরি করলেও আজিমকে ডিপ্লেমা পাস করে শিক্ষিত বেকার হিসেবে কর্মহীন এবং অসুস্থ অবস্থায় মানবেতর জীবন-যাপন করতে হচ্ছে। দরিদ্র বাবার তার চিকিৎসার ব্যয়ভার এবং পরিবারের ভরণ পোষণ মিটাতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে। আজিম জানান, কোন চাওয়া-পাওয়ার জন্য আমি জুলাই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করিনি। কিন্তু আজকে পরিস্থিতির শিকার হয়ে আমি কর্মক্ষম হয়ে যাচ্ছি।
আজিম কুমিল্লার নাঙ্গলকোট উপজেলার জোড্ডা পূর্ব ইউনিয়নের নারায়ণকোট গ্রামের আবদুল হাইয়ের একমাত্র ছেলে। আজিমের পিতা আবদুল হাই বলেন, জুলাই আন্দোলনে আমার ছেলে আহত হয়েছে। এতে আমার কোনো দুঃখ নেই। আমার ছেলের পুনরায় সু-চিকিৎসা এবং কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দেওয়ার জন্য সরকারের নিকট দাবি জানাচ্ছি।
সাবেক ঢাকা পি জি হাসপাতালে আজিমের গুলিবিদ্ধ পায়ের দীর্ঘ ১৩মাস চিকিৎসায়ও পায়ের কোন উন্নতি না হওয়ায় পি জি হাসপাতালের মেডিকেল বোর্ডের সিদ্ধান্তে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে পাঠানো হয়। সিঙ্গাপুরের হাসপাতালে গিয়ে সিঙ্গাপুর বাংলাদেশ অ্যাম্বাসির কর্মকর্তাদের হয়রানি ও অবহেলার শিকার হয়ে তার পায়ের অপারেশন করাতে সক্ষম হন। কিন্তু তার পিছনে অনেক টাকা ব্যয় হয়ে যাচ্ছে এ অজুহাতে সিঙ্গাপুরের বাংলাদেশ অ্যাম্বাসির কর্মকর্তা এবং মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের অপারেশন পরবর্তী ১২ সপ্তাহের থেরাপির মধ্যে মাত্র দুই সপ্তাহের থেরাপি দিয়ে তাকে না জানিয়ে আগে থেকে বিমানের টিকিট কেটে জোরপূর্বক দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। দেশে এসেও সরকারি হাসপাতালগুলোতে থেরাপিসহ অন্যান্য চিকিৎসা না পেয়ে তার গুলিবিদ্ধ বাম পা সম্পূর্ণ অকেজো হওয়ার পথে রয়েছে বলে জানান আজিম।
এদিকে, আজিম ক্ষোভ প্রকাশ করে আরো বলেন, সিঙ্গাপুরে চিকিৎসার উদ্দেশ্যে যাওয়ার পূর্বে তার পাসপোর্ট, ভিসাসহ আনুষাঙ্গিক কাজে অনেক টাকা ব্যয় হয়। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে তাকে পাসপোর্ট, ভিসাসহ অন্যান্য খাতে ব্যয় নিয়ে তাকে ভাউচার জমা দিতে বলা হয়। আজিম এ পর্যন্ত কয়েকবার ভাউচার জমা দিলেও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের অবহেলায় গত এক বছরেও তার ব্যয়ের জন্য বরাদ্দকৃত ২০হাজার টাকা উত্তোলন করতে পারেননি।
আনোয়ারুল আজিম আরো জানান, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার সরকারের বিরুদ্ধে জুলাই-২৪ এর ১৬জুলাই ফেনী শহরের রেলগেট এলাকায় ছাত্রদলের একজন কর্মী হিসেবে অন্যান্য আন্দোলনকারীদের সঙ্গে প্রথম আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। পরে ফেনী শহরের বিভিন্নস্থানে প্রতিনিয়ত আন্দোলনে অংশগ্রহণ করতেন।
আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে ৪ আগস্ট ফেনীর মহিপাল ফ্লাইওভারের নিচে আন্দোলনের জন্য অন্যান্যদের সাথে জড়ো হন। এক পর্যায়ে ওইদনি দুপুরে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে ফ্লাইওভারের নিচের সড়কে যোহরের নামাজ আদায় করতে থাকেন। এসময় ছাত্রলীগের সশস্ত্র ক্যাডাররা নামাজরত আন্দোলনকারীদের ওপর অতর্কিতভাবে হামলা করে হাতবোমা নিক্ষেপসহ সরাসরি গুলি করতে থাকেন। একপর্যায়ে আন্দোলনকারীরা দিগ্বিদিক ছোটাছুটি করতে থাকেন। এসময় ছাত্রলীগ ক্যাডারদের গুলিতে ১১জন আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতা নিহত হয় এবং তিনিসহ ৫ শতাধিক শিক্ষার্থী শরীরের বিভিন্নস্থানে গুলিবিদ্ধ হন। আজিম বামপায়ের গোড়ালিতে গুলিবিদ্ধ হন। প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা ছাত্রলীগ ক্যাডাররা তাণ্ডব চালায় ।
পরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়করা নিহত ও আহতদের উদ্ধার করে ফেনী সদর হাসপাতাল ও ডায়াবেটিক হাসপাতালে নিয়ে যায়। আজিম ফেনী সদর হাসপাতালে ৮দিন চিকিৎসা নেন। কিন্তু কোনো উন্নতি না হওয়ায় তাকে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসাপাতালে রেফার্ড করা হয়। এখানে তার চিকিৎসার উন্নতি না হওয়ায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়করা মহাখালী স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালকের সহযোগিতায় তাকে ঢাকার সাবেক পি জি হাসপাতালে ভর্তি করেন। পি জি হাসপাতালের চিকিৎসকরা তাকে প্রতিদিন ৩৫-৪০টি ওষুধ সেবন করাতেন। পি জি হাসপাতালে দীর্ঘ ১৩মাস চিকিৎসায় তার পায়ের কোনো উন্নতি না হওয়ায় মেডিকেল বোর্ডের সিদ্ধান্তে তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়।
আজিম জানান, সিঙ্গাপুর এয়ারপোর্টে পৌঁছার পর থেকে তার হয়রানি শুরু হয়। সিঙ্গাপুর বাংলাদেশ এ্যাম্বাসির একজন অফিস সহকারী এসে এয়ারপোর্ট থেকে তাকে নিয়ে ফিলিপস হোটেলের একটি ছোট কক্ষে নিয়ে রাখেন। পরেরদিন অ্যাম্বাসির ওই অফিস সহকারী তাকে সিঙ্গাপুর ন্যাশনাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে নিয়ে যান। কিন্তু অনলাইনে টিকিট কেটে চিকিৎসক দেখাতে দেরি হওয়ায় অ্যাম্বাসির অফিস সহকারী তাকে রেখে চলে আসে। পরে সে নিজে চিকিৎসকের সাথে দেখা করেন। কিন্তু সিঙ্গাপুরের চিকিৎসক বাংলাদেশের পি জি হাসপাতালের রিপোর্ট এবং প্রেসক্রিপশন দেখে রোগ অনুযায়ী তাকে চিকিৎসা দেওয়া হয়নি বলে জানান।
এক পর্যায়ে সিঙ্গাপুরের চিকিৎসকরা নতুন করে আবার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ধাপে-ধাপে তার চিকিৎসা শুরু করেন। কিন্তু অ্যাম্বাসির লোকজন তার চিকিৎসার দিকে প্রাধান্য না দিয়ে তারা তার পিছনে অনেক টাকা ব্যয়ের হিসাব করছেন এবং আজিমের সাথে প্রতিনিয়ত খারাপ আচরণ করছেন। পরে চিকিৎকরা তাকে প্রথমে মেডিসিন দিয়ে চিকিৎসা শুরু করেন। এতে পায়ের উন্নতি না হওয়ায় থেরাপি শুরু করেন। থেরাপিতেও উন্নতি না হওয়ায় ইনজেকশন দিয়ে চিকিৎসা শুরু করেন। এতেও উন্নতি না হওয়ায় চিকিৎসকরা তার পায়ের অপারেশন করেন। অপারেশনের ৮সপ্তাহ পর তার পায়ের প্লাস্টার খোলা হয়। প্লাস্টার খোলার পর চিকিৎকরা তার পায়ের অপারেশন সাকসেসফুল হয় বলে তাকে জানান। পরে চিকিৎসকরা তাকে অপারেশন পরবর্তী ১২ সপ্তাহের থেরাপির সিদ্ধান্ত দেন।
কিন্তু সিঙ্গাপুরের বাংলাদেশ অ্যাম্বাসির কর্মকর্তারা এবং মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা তার পিছনে অনেক টাকা খরচের অজুহাত দেখিয়ে মাত্র ২সপ্তাহের থেরাপির পর তাকে না জানিয়ে বিমানের টিকিট কেটে জোরপূর্বক দেশে পাঠিয়ে দেন। বাংলাদেশে এসে সাবেক পি জি বর্তমানে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে যাওয়ার পর সাধারণ রোগীর মতো তাকে চিকিৎসক দেখাতে হয়। চিকিৎসকরা তাকে সিঙ্গাপুরের চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী পায়ের ব্যায়াম করতে বলেন। নতুন করে তাকে কোনো চিকিৎসা দিচ্ছে না। সিঙ্গাপুরের চিকিৎসকরা তাকে আশ্বাস দিয়েছিলেন থেরাপি শেষে তার পায়ের ৬০ থেকে ৭০ভাগ সম্পূর্ণ চিকিৎসা হবে।
সিঙ্গাপুরে তার ফলোআপ চিকিৎসার বিষয়ে শহীদ জুলাই স্মৃতি ফাউন্ডেশনে যোগাযোগ করলে তারা বলছে, বরাদ্দ না থাকায় সরকারিভাবে ফলোআপ চিকিৎসা বন্ধ রয়েছে। বেশি সমস্যা হলে ব্যাক্তিগত উদ্যোগে তাকে চিকিৎসা করতে বলছেন। আজিমের বাবা একজন কৃষক। আজিমদের গ্রামের বাড়িতে একটি টিনশেড ঘর রয়েছে। যে ঘরে আজিম, তার মা-বাবা এবং বোনেরা শ্বশুর বাড়ি থেকে আসলে গাদাগাদি করে বসবাস করেন। আজিমদের সম্পত্তি বলতে কিছুই নেই। এদিকে, আজিমের দরিদ্র পিতার পক্ষে ছেলের উন্নত চিকিৎসা করা সম্ভব হচ্ছে না। যার ফলে আজিমকে তার পা হারোনোর আশঙ্কায় প্রতিনিয়ত দিন কাটাতে হচ্ছে।
আজিম বলেন, আমরা বৈষম্যবিরোধী নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দিয়ে ফ্যাসিবাদ বিদায় করেছি। কিন্তু তা পুরোপুরি বাস্তবায়ন হচ্ছে না। তরে বর্তমান সরকার ধীরে-ধীরে অনেকটা বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে। সরকার জুলাই যোদ্ধাদের জন্য পুনর্বাসনের ঘোষণা দিয়েছেন। আমি চাই। আমার পরিবারকে যেন পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হয়।

ফেনী সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী জুলাই যোদ্ধা আনোয়ারুল আজিম (২০)। হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে আজিম ২৪-এর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশ নিয়ে ছাত্রলীগ ক্যাডারদের গুলিতে ফেনীর মহিপালে গুলিবিদ্ধ হন।
গুলিতে তার পায়ের গোড়ালির লিগামেন্ট এবং হাঁড় ফেটে যায়। গুলিবিদ্ধ বাম পায়ের গোড়ালির চিকিৎসা অবহেলায় তার বাম পা হারাতে বসেছেন। তার বাম পা ধীরে-ধীরে চিকন হয়ে যাচ্ছে। পায়ের শক্তি নেই। হাঁটা-চলা করতে কষ্ট হয়। খুঁড়িয়ে-খুঁড়িতে হাঁটেন। বসলে এবং বিছানায় শুতে গেলেও পায়ে ব্যথা করে। পা ঘুরানো যায় না। পায়ের মুভমেন্ট বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
জুলাই আন্দোলন শেষ হওয়ার দীর্ঘ দুই বছরেও গুলিবিদ্ধ পায়ের তীব্র যন্ত্রণা এবং পা হারোনোর আশঙ্কায় আজিমকে প্রতিনিয়ত দিন কাটাতে হচ্ছে। তার সহপাঠীরা ডিপ্লোমা পাস করে চাকরি করলেও আজিমকে ডিপ্লেমা পাস করে শিক্ষিত বেকার হিসেবে কর্মহীন এবং অসুস্থ অবস্থায় মানবেতর জীবন-যাপন করতে হচ্ছে। দরিদ্র বাবার তার চিকিৎসার ব্যয়ভার এবং পরিবারের ভরণ পোষণ মিটাতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে। আজিম জানান, কোন চাওয়া-পাওয়ার জন্য আমি জুলাই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করিনি। কিন্তু আজকে পরিস্থিতির শিকার হয়ে আমি কর্মক্ষম হয়ে যাচ্ছি।
আজিম কুমিল্লার নাঙ্গলকোট উপজেলার জোড্ডা পূর্ব ইউনিয়নের নারায়ণকোট গ্রামের আবদুল হাইয়ের একমাত্র ছেলে। আজিমের পিতা আবদুল হাই বলেন, জুলাই আন্দোলনে আমার ছেলে আহত হয়েছে। এতে আমার কোনো দুঃখ নেই। আমার ছেলের পুনরায় সু-চিকিৎসা এবং কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দেওয়ার জন্য সরকারের নিকট দাবি জানাচ্ছি।
সাবেক ঢাকা পি জি হাসপাতালে আজিমের গুলিবিদ্ধ পায়ের দীর্ঘ ১৩মাস চিকিৎসায়ও পায়ের কোন উন্নতি না হওয়ায় পি জি হাসপাতালের মেডিকেল বোর্ডের সিদ্ধান্তে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে পাঠানো হয়। সিঙ্গাপুরের হাসপাতালে গিয়ে সিঙ্গাপুর বাংলাদেশ অ্যাম্বাসির কর্মকর্তাদের হয়রানি ও অবহেলার শিকার হয়ে তার পায়ের অপারেশন করাতে সক্ষম হন। কিন্তু তার পিছনে অনেক টাকা ব্যয় হয়ে যাচ্ছে এ অজুহাতে সিঙ্গাপুরের বাংলাদেশ অ্যাম্বাসির কর্মকর্তা এবং মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের অপারেশন পরবর্তী ১২ সপ্তাহের থেরাপির মধ্যে মাত্র দুই সপ্তাহের থেরাপি দিয়ে তাকে না জানিয়ে আগে থেকে বিমানের টিকিট কেটে জোরপূর্বক দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। দেশে এসেও সরকারি হাসপাতালগুলোতে থেরাপিসহ অন্যান্য চিকিৎসা না পেয়ে তার গুলিবিদ্ধ বাম পা সম্পূর্ণ অকেজো হওয়ার পথে রয়েছে বলে জানান আজিম।
এদিকে, আজিম ক্ষোভ প্রকাশ করে আরো বলেন, সিঙ্গাপুরে চিকিৎসার উদ্দেশ্যে যাওয়ার পূর্বে তার পাসপোর্ট, ভিসাসহ আনুষাঙ্গিক কাজে অনেক টাকা ব্যয় হয়। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে তাকে পাসপোর্ট, ভিসাসহ অন্যান্য খাতে ব্যয় নিয়ে তাকে ভাউচার জমা দিতে বলা হয়। আজিম এ পর্যন্ত কয়েকবার ভাউচার জমা দিলেও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের অবহেলায় গত এক বছরেও তার ব্যয়ের জন্য বরাদ্দকৃত ২০হাজার টাকা উত্তোলন করতে পারেননি।
আনোয়ারুল আজিম আরো জানান, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার সরকারের বিরুদ্ধে জুলাই-২৪ এর ১৬জুলাই ফেনী শহরের রেলগেট এলাকায় ছাত্রদলের একজন কর্মী হিসেবে অন্যান্য আন্দোলনকারীদের সঙ্গে প্রথম আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। পরে ফেনী শহরের বিভিন্নস্থানে প্রতিনিয়ত আন্দোলনে অংশগ্রহণ করতেন।
আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে ৪ আগস্ট ফেনীর মহিপাল ফ্লাইওভারের নিচে আন্দোলনের জন্য অন্যান্যদের সাথে জড়ো হন। এক পর্যায়ে ওইদনি দুপুরে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে ফ্লাইওভারের নিচের সড়কে যোহরের নামাজ আদায় করতে থাকেন। এসময় ছাত্রলীগের সশস্ত্র ক্যাডাররা নামাজরত আন্দোলনকারীদের ওপর অতর্কিতভাবে হামলা করে হাতবোমা নিক্ষেপসহ সরাসরি গুলি করতে থাকেন। একপর্যায়ে আন্দোলনকারীরা দিগ্বিদিক ছোটাছুটি করতে থাকেন। এসময় ছাত্রলীগ ক্যাডারদের গুলিতে ১১জন আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতা নিহত হয় এবং তিনিসহ ৫ শতাধিক শিক্ষার্থী শরীরের বিভিন্নস্থানে গুলিবিদ্ধ হন। আজিম বামপায়ের গোড়ালিতে গুলিবিদ্ধ হন। প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা ছাত্রলীগ ক্যাডাররা তাণ্ডব চালায় ।
পরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়করা নিহত ও আহতদের উদ্ধার করে ফেনী সদর হাসপাতাল ও ডায়াবেটিক হাসপাতালে নিয়ে যায়। আজিম ফেনী সদর হাসপাতালে ৮দিন চিকিৎসা নেন। কিন্তু কোনো উন্নতি না হওয়ায় তাকে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসাপাতালে রেফার্ড করা হয়। এখানে তার চিকিৎসার উন্নতি না হওয়ায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়করা মহাখালী স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালকের সহযোগিতায় তাকে ঢাকার সাবেক পি জি হাসপাতালে ভর্তি করেন। পি জি হাসপাতালের চিকিৎসকরা তাকে প্রতিদিন ৩৫-৪০টি ওষুধ সেবন করাতেন। পি জি হাসপাতালে দীর্ঘ ১৩মাস চিকিৎসায় তার পায়ের কোনো উন্নতি না হওয়ায় মেডিকেল বোর্ডের সিদ্ধান্তে তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়।
আজিম জানান, সিঙ্গাপুর এয়ারপোর্টে পৌঁছার পর থেকে তার হয়রানি শুরু হয়। সিঙ্গাপুর বাংলাদেশ এ্যাম্বাসির একজন অফিস সহকারী এসে এয়ারপোর্ট থেকে তাকে নিয়ে ফিলিপস হোটেলের একটি ছোট কক্ষে নিয়ে রাখেন। পরেরদিন অ্যাম্বাসির ওই অফিস সহকারী তাকে সিঙ্গাপুর ন্যাশনাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে নিয়ে যান। কিন্তু অনলাইনে টিকিট কেটে চিকিৎসক দেখাতে দেরি হওয়ায় অ্যাম্বাসির অফিস সহকারী তাকে রেখে চলে আসে। পরে সে নিজে চিকিৎসকের সাথে দেখা করেন। কিন্তু সিঙ্গাপুরের চিকিৎসক বাংলাদেশের পি জি হাসপাতালের রিপোর্ট এবং প্রেসক্রিপশন দেখে রোগ অনুযায়ী তাকে চিকিৎসা দেওয়া হয়নি বলে জানান।
এক পর্যায়ে সিঙ্গাপুরের চিকিৎসকরা নতুন করে আবার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ধাপে-ধাপে তার চিকিৎসা শুরু করেন। কিন্তু অ্যাম্বাসির লোকজন তার চিকিৎসার দিকে প্রাধান্য না দিয়ে তারা তার পিছনে অনেক টাকা ব্যয়ের হিসাব করছেন এবং আজিমের সাথে প্রতিনিয়ত খারাপ আচরণ করছেন। পরে চিকিৎকরা তাকে প্রথমে মেডিসিন দিয়ে চিকিৎসা শুরু করেন। এতে পায়ের উন্নতি না হওয়ায় থেরাপি শুরু করেন। থেরাপিতেও উন্নতি না হওয়ায় ইনজেকশন দিয়ে চিকিৎসা শুরু করেন। এতেও উন্নতি না হওয়ায় চিকিৎসকরা তার পায়ের অপারেশন করেন। অপারেশনের ৮সপ্তাহ পর তার পায়ের প্লাস্টার খোলা হয়। প্লাস্টার খোলার পর চিকিৎকরা তার পায়ের অপারেশন সাকসেসফুল হয় বলে তাকে জানান। পরে চিকিৎসকরা তাকে অপারেশন পরবর্তী ১২ সপ্তাহের থেরাপির সিদ্ধান্ত দেন।
কিন্তু সিঙ্গাপুরের বাংলাদেশ অ্যাম্বাসির কর্মকর্তারা এবং মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা তার পিছনে অনেক টাকা খরচের অজুহাত দেখিয়ে মাত্র ২সপ্তাহের থেরাপির পর তাকে না জানিয়ে বিমানের টিকিট কেটে জোরপূর্বক দেশে পাঠিয়ে দেন। বাংলাদেশে এসে সাবেক পি জি বর্তমানে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে যাওয়ার পর সাধারণ রোগীর মতো তাকে চিকিৎসক দেখাতে হয়। চিকিৎসকরা তাকে সিঙ্গাপুরের চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী পায়ের ব্যায়াম করতে বলেন। নতুন করে তাকে কোনো চিকিৎসা দিচ্ছে না। সিঙ্গাপুরের চিকিৎসকরা তাকে আশ্বাস দিয়েছিলেন থেরাপি শেষে তার পায়ের ৬০ থেকে ৭০ভাগ সম্পূর্ণ চিকিৎসা হবে।
সিঙ্গাপুরে তার ফলোআপ চিকিৎসার বিষয়ে শহীদ জুলাই স্মৃতি ফাউন্ডেশনে যোগাযোগ করলে তারা বলছে, বরাদ্দ না থাকায় সরকারিভাবে ফলোআপ চিকিৎসা বন্ধ রয়েছে। বেশি সমস্যা হলে ব্যাক্তিগত উদ্যোগে তাকে চিকিৎসা করতে বলছেন। আজিমের বাবা একজন কৃষক। আজিমদের গ্রামের বাড়িতে একটি টিনশেড ঘর রয়েছে। যে ঘরে আজিম, তার মা-বাবা এবং বোনেরা শ্বশুর বাড়ি থেকে আসলে গাদাগাদি করে বসবাস করেন। আজিমদের সম্পত্তি বলতে কিছুই নেই। এদিকে, আজিমের দরিদ্র পিতার পক্ষে ছেলের উন্নত চিকিৎসা করা সম্ভব হচ্ছে না। যার ফলে আজিমকে তার পা হারোনোর আশঙ্কায় প্রতিনিয়ত দিন কাটাতে হচ্ছে।
আজিম বলেন, আমরা বৈষম্যবিরোধী নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দিয়ে ফ্যাসিবাদ বিদায় করেছি। কিন্তু তা পুরোপুরি বাস্তবায়ন হচ্ছে না। তরে বর্তমান সরকার ধীরে-ধীরে অনেকটা বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে। সরকার জুলাই যোদ্ধাদের জন্য পুনর্বাসনের ঘোষণা দিয়েছেন। আমি চাই। আমার পরিবারকে যেন পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হয়।