নেপথ্যে বর্তমান অধ্যক্ষকে সরিয়ে আরেকজনকে অধ্যক্ষ পদে বসাতে ' মব 'সৃষ্টি

কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজ

নিজস্ব প্রতিবেদক
আপডেট : ১৬ জুলাই ২০২৫, ১২: ০৩
Thumbnail image

কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের বর্তমান অধ্যক্ষ মো আবুল বাসার ভূঁঞাকে সরিয়ে আরেকজনকে অধ্যক্ষ পদে বসাতে একটি চক্র গত সোমবার মব সৃষ্টি করেছিল। কিন্তু সরকারের উচ্চ পর্যায়ের নির্দেশে অধ্যক্ষ মব সৃষ্টিকারীদের দেওয়া চাপ সত্বেও সাদা কাগজে সই করেননি। প্রশাসনই গত সোমবার রাত ১১ টা ৩২ মিনিটে তাঁকে কলেজের ডিগ্রি শাখার মসজিদ থেকে বের করে নেয়।

এর আগেও চত্রুটি গত বছর আরেকজন অধ্যক্ষকে হেনস্তায় জড়িত ছিল বলে বিভিন্ন সংস্থা সূত্রে জানা গেছে।

বর্তমান অধ্যক্ষ মো আবুল বাসার ভূঁঞা গত বছরের ১২ সেপ্টেম্বর এ কলেজের অধ্যক্ষ পদে যোগদান করেন। তিনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিপত্র ও নিয়ম মেনেই কলেজ পরিচালনা করছেন।

কলেজ সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের ১২ সেপ্টেম্বর চট্রগ্রাম কলেজ থেকে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ পদে যোগদান করেন। যোগদানের কয়েকমাস পর ডিগ্রি শাখার মসজিদের ইমাম অপসারণ নিয়ে বহিরাগতরা তাঁর পদত্যাগ দাবি করেন। এ নিয়ে নানামুখী আন্দোলন হয়। কিন্তু শৃঙখলা, তদন্ত কমিটির সুপারিশ ও নিয়মের ক্ষেত্রে অধ্যক্ষ ছিলেন অবিচল। ওই কারণে অধ্যক্ষকে অবরুদ্ধ ও গায়ে হাত তুলেও সরাতে পারেনি।

এদিকে নয় দফা দাবি নিয়ে কলেজের কিছু সংখ্যক শিক্ষার্থী গত কয়েকদিন আগে অধ্যক্ষের কাছে স্মারকলিপি দেন। এতে তাঁরা কলেজে পর্যাপ্ত সংখ্যক লাইটিং লাগানো, জলাবদ্ধতা দূরীকরণ, ছাত্রসংসদ নির্বাচন, তিনটি নতুন বাস কেনা, সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনসহ আরও কয়েকটি বিষয় তুলে ধরেন। অধ্যক্ষ বিষয়গুলো নিয়ে কলেজের উপাধ্যক্ষ অধ্যাপক মো আবদুল মজিদ ও শিক্ষক পরিষদের সম্পাদক গাজী সোহবার উদ্দিন কে দায়িত্ব দেন। গত সোমবার শিক্ষক পরিষদের সম্পাদক কলেজের অধ্যক্ষকে বলেন, স্যার ছেলেরা আসবে। আপনিও থাকেন। আলোচনা করি। তখন সময়টা ছিল যোহরের নামাজের পর। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনার এক পর্যায়ে সাবেক দুইজন শিক্ষার্থীও কথা বলেন। তাঁরা জুলাই আন্দোলনে আহত তামিম হোসেনের ওপর হামলাকারীদের বহিষ্কার ও বিচার দাবি করেন। আলোচনার এক পর্যায়ে পাল্টাপাল্টি যুক্তিতর্ক হয়। এক পর্যায়ে অধ্যক্ষ বলেন, নিয়মের মধ্যে আমি কাজ করব। এরপর অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষ আসরের নামাজ পড়তে যান। নামাজ পড়া শেষ হওয়া মাত্র মসজিদের বাইরে স্লোগান ওঠে- এক দফা দাবি, অধ্যক্ষের পদত্যাগ। এক পর্যায়ে কিছু সংখ্যক সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীরা তাঁকে মসজিদের ভেতরে অবরুদ্ধ করে রাখেন। অবরুদ্ধ অবস্থায় অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষ মাগরিব ও এশার নামাজ পড়েন। তখন উপাধ্যক্ষকে বার বার মসজিদ থেকে বের হতে দেখা যায়। কিন্তু অধ্যক্ষ বের হতে পারছেন না। আন্দোলনকারীরা সাদা কাগজ এনে অধ্যক্ষ মো আবুল বাসার ভূঁঞার কাছ থেকে সই নেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করেন। অধ্যক্ষ কোন অবস্থাতেই সই করতে রাজি হননি। তাঁর বক্তব্য, তিনি শিক্ষার্থীদের কাছে কেন পদত্যাগ করবেন? এরই মধ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে খবর আসে, কোন ভাবেই যেন অধ্যক্ষ সই না করেন সাদা কাগজে। তিনি যেন মবে পড়ে সই না করেন। পরে কোতোয়ালি মডেল থানার ওসি গিয়ে রাত ১১ টা ৩২ মিনিটে তাঁকে মসজিদ থেকে বের করে বাসায় পৌঁছে দেন।

এদিকে বিভিন্ন সংস্থা সূত্রে জানা গেছে, দাবি দাওয়ার বিষয়টি ছিল সামনে। নেপথ্যের ঘটনা হল বর্তমান অধ্যক্ষ মো আবুল বাসার ভূঁঞাকে সরিয়ে একই কলেজের তিনজন অধ্যক্ষ হতে চান। বর্তমান অধ্যক্ষ বিএনপি, জামায়াত ও আওয়ামী লীগের সমর্থিত নন। ওই কারণে একটি গোষ্ঠী তাঁকে সরিয়ে নিজেদের লোক অধ্যক্ষ পদে বসাতে চান। এইক্ষেত্রে ম, ম আদ্যক্ষরের দুইজন ও ' শ' আদ্যক্ষরের একজন তদবির করছেন বলে কলেজে প্রচার রয়েছে।

কলেজের অন্তত ১২ জন শিক্ষক ও সাতজন নিয়মিত শিক্ষার্থী বলেন, বর্তমান অধ্যক্ষ নীতিবান। তাঁকে সরাতে ওইসব দাবি সামনে আনা হয়। আসলে অধ্যক্ষ বদল মূল লক্ষ্য।

কলেজের তিনজন জ্যৈষ্ঠ শিক্ষক বলেন, এভাবে দাবি দাওয়ার নামে একজন অধ্যক্ষকে হেনস্থা করা অন্যায়। এটা প্রকাশ্যে ছাত্রদের, নেপথ্যে পদ প্রত্যাশী শিক্ষক, রাজনৈতিক দলের নাম ব্যবহার করে সুবিধা্াদী কিছু ব্যক্তির স্বার্থ ছাড়া আর কিছুই নয়। বৃটিশ আমলে প্রতিষ্ঠিত কোন সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ নিয়ে কোন ঝামেলা হয় না। এখানে হচ্ছে। এটা কুমিল্লাবাসীর জন্য লজ্জার, অপমানের। অধ্যক্ষ অনিয়ম করলে তাঁর কতৃপক্ষ আছে। তারা বিচার করবেন। কিন্তু সাজানো কিছু করে কাউকে অপদস্থ করা ঠিক নয়।

অধ্যক্ষ মো আবুল বাসার ভূঁঞা বলেন, দাবিগুলোর যেগুলো করা এখনই সম্ভব তা করে দিচ্ছি। কিছু দাবি পূরণ করতে সময় লাগবে, চিঠি চালাচালির বিষয় আছে। জলাবদ্ধতা এই কলেজের পুরানো সমস্যা। আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি। সরকারও জানেন। ছাত্রসংসদ নির্বাচন নিয়ে সর্বস্তরে আলোচনা করতে হবে। কিন্তু আমার কাছে মনে হয়, এইগুলো সামনে এনে তলে তলে কেউ কলকাঠি নাড়ছে। আমাকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, সরকার বসিয়েছে। সাহস নিয়েই অধ্যক্ষগিরি করি। কোন অন্যায়ের সঙ্গে জড়িত থাকলে, আমি তো আইনের উর্ধে না। মব করবে কেন? যে দাবি এগুলোর জন্য তো মব করতে হয় না।

সরকারের একটি গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তা জানিয়েছেন, কারা কি উদ্দেশ্যে কেন অধ্যক্ষকে অবরুদ্ধ করেছে, তা সরকারকে জানানো হয়েছে। আমরা আদ্যপান্ত তদন্ত করছি।

বিষয়:

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

সম্পর্কিত