• কুমিল্লা সিটি করপোরেশন
  • কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়
  • আদর্শ সদর
  • বরুড়া
  • লাকসাম
  • দাউদকান্দি
  • আরও
    • চৌদ্দগ্রাম
    • সদর দক্ষিণ
    • নাঙ্গলকোট
    • বুড়িচং
    • ব্রাহ্মণপাড়া
    • মনোহরগঞ্জ
    • লালমাই
    • চান্দিনা
    • মুরাদনগর
    • দেবীদ্বার
    • হোমনা
    • মেঘনা
    • তিতাস
  • সর্বশেষ
  • রাজনীতি
  • বাংলাদেশ
  • অপরাধ
  • বিশ্ব
  • বাণিজ্য
  • মতামত
  • খেলা
  • বিনোদন
  • চাকরি
  • জীবনযাপন
  • ইপেপার
  • ইপেপার
facebooktwittertiktokpinterestyoutubelinkedininstagramgoogle
স্বত্ব: ©️ আমার শহর

সম্পাদক ও প্রকাশক : মো. গাজীউল হক ভূঁইয়া ( সোহাগ)।

নাহার প্লাজা, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা-৩৫০০

ই-মেইল: [email protected]

ফোন: 01716197760

> মতামত

নববর্ষের ঐতিহ্য : শহর ও গ্রাম

সফিকুল বোরহান
প্রকাশ : ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ১১: ৪৪
logo

নববর্ষের ঐতিহ্য : শহর ও গ্রাম

সফিকুল বোরহান

প্রকাশ : ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ১১: ৪৪
Photo

দেশের ঐতিহ্য, উৎসব, আনন্দ, সংস্কৃতি শেষ হয়ে গেল বলে আমরা আক্ষেপ করি। আসলেই কি সব শেষ হয়ে গেছে? আমি মনে করি শেষ হয়নি, বরং বিবর্তন হয়েছে। আধুনিকতা ও বিজ্ঞানের প্রভাবে ধরন, সময় ও মানসিকতায় পরিবর্তন এসেছে। তারপরও একটা তৃষ্ণা থেকে যায়, নববর্ষ- তার অতীতগুলো নিয়ে।

ঐতিহ্য স্থির নয়- এটি জীবন্ত। সমাজ, সময়, প্রযুক্তি- সবকিছু সময়ের সাথে এটি বদলায়। আগে গ্রামবাংলার নববর্ষ মানেই ছিল হালখাতা, মেলা, পান্তা-ইলিশ, লোকগান, আর সামাজিক মেলামেশা। এখন শহুরে জীবনে আমরা দেখি- র‌্যালি, কনসার্ট, সামাজিক মাধ্যমে শুভেচ্ছা, ফ্যাশন, রেস্টুরেন্ট কালচার। এগুলো আলাদা- কিন্তু একেবারে বিচ্ছিন্ন নয়। পুরোনোর ছায়া নতুনের মধ্যে থেকেই যায়।

পরিবর্তনের কারণ: আধুনিকতা ও প্রযুক্তি- ডিজিটাল যুগ আমাদের জীবনযাপন, সময়ের ব্যবহার, এমনকি উৎসব উদযাপনের ধরনও বদলে দিয়েছে। এখন নববর্ষের শুভেচ্ছা অনেক সময় সরাসরি নয়, অনলাইনে পৌঁছে যায়। শহুরে জীবন ও ব্যস্ততা- আগে মানুষের হাতে সময় ছিল বেশি, সামাজিক বন্ধনও ছিল ঘনিষ্ঠ। এখন ব্যস্ততা বেড়েছে, ফলে উৎসবের রূপ কিছুটা সংক্ষিপ্ত ও পরিকল্পিত হয়েছে। বিশ্বায়ন- বিশ্বের বিভিন্ন সংস্কৃতির প্রভাব আমাদের ওপর পড়ছে। ফলে আমাদের উৎসবেও নতুন নতুন উপাদান যুক্ত হচ্ছে।

তবুও কেন ‘তৃষ্ণা’ থেকে যায়? এটাই সবচেয়ে মানবিক অংশ। আমরা শুধু উৎসব উদযাপন করি না- আমরা স্মৃতি উদযাপন করি। শৈশবের নববর্ষ, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো, মেলার গন্ধ- এসব আমাদের আবেগের অংশ। এই তৃষ্ণা আসলে সরলতার জন্য, আন্তরিক সম্পর্কের জন্য, ধীরগতির জীবনের জন্য। অর্থাৎ, আমরা উৎসবের রূপ নয়, তার অনুভ‚তিটাই খুঁজি।

অতীত বনাম বর্তমান : দ্ব›দ্ব না সমন্বয়? এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- আমরা প্রায়ই অতীতকে ‘রোমান্টিসাইজ’ করি। অতীতে যেমন সৌন্দর্য ছিল, তেমনি সীমাবদ্ধতাও ছিল। আর বর্তমানেও যেমন যান্ত্রিকতা আছে, তেমনি নতুন সম্ভাবনাও আছে। তাই এটাকে দ্ব›দ্ব হিসেবে না দেখে সমন্বয় হিসেবে দেখাই ভালো, পুরোনো ঐতিহ্যের মূল মূল্যবোধ (সম্প্রীতি, আনন্দ, মিলন) এবং নতুন যুগের সুবিধা (প্রযুক্তি, সৃজনশীলতা, বৈচিত্র্য) ইত্যাদি।

করণীয় হচ্ছে, সচেতনভাবে ঐতিহ্যকে ধারণ করা, যেমন- পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো, লোকসংস্কৃতিকে গুরুত্ব দেওয়া। নতুন প্রজন্মকে যুক্ত করা, তাদের ভাষায়, তাদের মাধ্যমে ঐতিহ্যকে উপস্থাপন করা। ব্যক্তিগত উদ্যোগ- ছোট ছোট উদ্যোগ- বন্ধুদের নিয়ে আড্ডা, ঘরোয়া আয়োজন- এসবই বড় পরিবর্তন আনতে পারে।

ঐতিহ্য হারিয়ে যায় না, যদি আমরা তাকে বাঁচিয়ে রাখতে চাই। নববর্ষের সেই ‘তৃষ্ণা’ আসলে আমাদের ভেতরের মানবিকতা, সংযোগ আর শিকড়ের প্রতি টান। তাই বলা যায়- নববর্ষ বদলেছে, কিন্তু তার আত্মা এখনো বেঁচে আছে- আমাদের ভেতরেই।

নববর্ষ নিয়ে যে অনুভ‚তি- তা আসলে এক প্রজন্মের সম্মিলিত স্মৃতি। একটু ফিরে যাওয়া যায় সেই সময়ের নববর্ষে- ভোরের শুরু: শুদ্ধতা আর নতুনের আহŸান, আগে নববর্ষ মানেই ভোরে ঘুম থেকে ওঠা। পুকুরে বা নদীতে গোসল- এক ধরনের মানসিক শুদ্ধতা, নতুন কাপড় পরা, বাড়ির বড়দের সালাম/প্রণাম করা। এটা শুধু রীতি ছিল না- একটা মানসিক প্রস্তুতি, ‘নতুন বছরটা ভালোভাবে শুরু করবো’ এই অনুভ‚তি। পাড়াময় ডাকাডাকি, সম্পর্কের উচ্ছ¡াস, ছোটরা দলবেঁধে শোর তুলতো, ‘এই বাড়ির বালা, সেই বাড়িতে যা’, এগুলো নিছক মজা নয়- এগুলো ছিল সামাজিক সংযোগের এক অনন্য প্রকাশ। পাড়ার সবাই একে অপরকে চিনতো- মজা, খুনসুটি, ডাকাডাকি- সব মিলিয়ে এক জীবন্ত সমাজ। এখনকার শহুরে জীবনে এই স্বতঃস্ফ‚র্ততা অনেকটাই কমে গেছে।

নববর্ষ মানেই ছিল গ্রামবাংলার মেলা- তালপাতার সেপাই, হাতে বানানো খেলনা, খুব সাধারণ- কিন্তু কল্পনার জগৎ তৈরি করত। বাঁশি, মাটির খেলনা, ডুগডুগি, রঙিন ঘুড়ি, মিষ্টি, বাতাসা, জিলাপি, কাঁচামিঠে আম, বেথুন, গাব- এগুলো ছিল স্পর্শযোগ্য আনন্দ- ডিজিটাল নয়, বাস্তব। নাগরদোলা- ছোট্ট স্বপ্নের উড়ান, নাগরদোলায় চড়া ছিল এক বিরাট উত্তেজনা। একটু ভয়, একটু আনন্দ, ওপর থেকে পুরো মেলা দেখা। আজকের দিনে বড় বড় অ্যামিউজমেন্ট পার্ক আছে, কিন্তু সেই সরল রোমাঞ্চটা অন্যরকম ছিল।

হালখাতা: অর্থনীতি আর সম্পর্কের মেলবন্ধন, দোকানিরা নতুন খাতা খুলত- পুরোনো হিসাব মিটানো, মিষ্টি খাওয়ানো, গ্রাহকদের সঙ্গে সম্পর্ক নবায়ন, এটা শুধু ব্যবসা নয়- একটা সামাজিক বন্ধনও ছিল। সাংস্কৃতিক পরিবেশ : লোকগান, পালাগান, গ্রামীণ নাটক, কখনো কবিগান- এগুলো ছিল লোকজ সংস্কৃতির প্রাণ। স্বতঃস্ফ‚র্ততা, আগে সবকিছুই ছিল স্বাভাবিক, আয়োজনবিহীন। এখন অনেক কিছুই ‘ইভেন্ট’ হয়ে গেছে। ঘনিষ্ঠ সামাজিক সম্পর্ক, পাড়ার সবাই ছিল এক পরিবারের মতো। এখন সেই বন্ধন শিথিল। সরল আনন্দের ক্ষমতা- তালপাতার সেপাই, বেলনু-বাঁশি বা নাগরদোলায় যে আনন্দ পাওয়া যেত, এখন অনেক বড় কিছু পেয়েও সেই অনুভ‚তি হয় না। প্রকৃতির সঙ্গে সংযোগ- পুকুর, মাঠ, খোলা আকাশ- এসবের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক কমে গেছে।

তবুও পুরোপুরি সব হারায়নি- আজও নববর্ষে মানুষ লাল-সাদা পরে, আনন্দ/মঙ্গল/বৈশাখি শোভাযাত্রা করে, গান গায়, ছবি তোলে, শুভেচ্ছা জানায়। কিন্তু পার্থক্যটা হলো- নববর্ষ আসলে বাইরে নয়, আমাদের ভেতরেই থাকে।

গ্রাম ও শহরে আগে বিস্তর ফারাক ছিল। আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে এখন গ্রাম ও শহরের ফারাকটা কিছু কমেছে। কিন্তু যোগাযোগ লভ্যতা, আর্থিক সাযুজ্য ও আধুনিক মানসিকতা, কুসংস্কার, ধর্ম ইত্যাদিতে শহর-গ্রাম এখনও নদীর দুই কূলের মতোন। গ্রাম এখনো অনেক ক্ষেত্রে উন্নয়নের দিক থেকে পিছিয়ে আছে। তাই নববর্ষ গ্রামে পালিত হয় সীমিত আকারে। শহরে জাঁকজমক করে।

শহুরে নববর্ষ আসলে এক আকর্ষণীয় অনুভ‚তি- এখানে ঐতিহ্য, আধুনিকতা, বাণিজ্য, প্রযুক্তি- সব একসাথে মিশে গেছে। ফলে এর আবেদন যেমন বেড়েছে, তেমনি তার প্রকৃতি বদলেছে। শহুরে নববর্ষের আবেদন: উৎসব থেকে ‘অভিজ্ঞতা’, গ্রামের নববর্ষ ছিল জীবনঘনিষ্ঠ; শহরের নববর্ষ হয়ে উঠেছে ‘ইভেন্ট-নির্ভর’। বড় বড় আয়োজন (যেমন মঙ্গল শোভাযাত্রা, কনসার্ট) ইত্যাদি। সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, কর্পোরেট অংশগ্রহণ, সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক প্রচার। এখন নববর্ষ শুধু পালন নয়- এটা ‘দেখা’, ‘শেয়ার করা’, ‘অংশগ্রহণ করা’- এক ধরনের নাগরিক অভিজ্ঞতা। ফলে শহরে এর দৃশ্যমানতা ও ব্যাপ্তি অনেক বেশি।

আনন্দের উপকরণে কী কী যোগ হলো? ফ্যাশন ও পরিচয়ের প্রকাশ- লাল-সাদা পোশাক এখন এক ধরনের সাংস্কৃতিক স্টেটমেন্ট ডিজাইনার পোশাক, থিমভিত্তিক সাজ। খাবারের বৈচিত্র্য- ঐতিহ্যবাহী পান্তা-ইলিশের পাশাপাশি রেস্টুরেন্টে বিশেষ নববর্ষ মেনু, ফিউশন খাবার। ডিজিটাল উদযাপন- ফেসবুক/ইনস্টাগ্রামে শুভেচ্ছা, লাইভ ইভেন্ট, অনলাইন কনসার্ট, ছবি তোলা ও শেয়ার করা- উৎসবের বড় অংশ। বিনোদনের আধুনিক রূপ- ব্যান্ড কনসার্ট, টিভি শো, বিশেষ অনুষ্ঠান, আর্ট এক্সিবিশন, ফটোওয়াক অর্থাৎ আনন্দ এখন বহুমাত্রিক- শুধু অংশগ্রহণ নয়, উপভোগের ধরনও বদলেছে।

আত্মিক সম্পর্ক বেড়েছে না কমেছে? উত্তরটা সরল না- দুই দিকই আছে। যেগুলো বেড়েছে: বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে আউটিং, গ্রæপ সেলিব্রেশন, সামাজিক মাধ্যমে সংযোগ (দূরের মানুষও যুক্ত হচ্ছে)। যেগুলো কমেছে: পাড়া-প্রতিবেশীর সঙ্গে স্বতঃস্ফ‚র্ত সম্পর্ক, পরিবারের সাথে দীর্ঘ সময় কাটানো, আন্তরিক, অনানুষ্ঠানিক মেলামেশা। শহরে সম্পর্ক সংখ্যায় বাড়লেও, গভীরতায় অনেক সময় কমে গেছে।

শিশু-কিশোরদের কাছে ঐতিহ্যের সাড়া, এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ দিক। ইতিবাচক দিক: স্কুল, মিডিয়া, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তারা নববর্ষ সম্পর্কে জানছে। বৈশাখি, আনন্দ কিংবা মঙ্গল শোভাযাত্রা, গান, পোশাক- এসব তাদের কাছে আকর্ষণীয়, তারা গর্ব অনুভব করে- ‘এটা আমাদের সংস্কৃতি’। সীমাবদ্ধতা: ঐতিহ্যের ‘অভিজ্ঞতা’ কম, ‘দেখা’ বেশি, অনেক কিছুই তাদের কাছে ফটো তোলার বিষয়, গ্রামীণ ঐতিহ্যের সরাসরি সংস্পর্শ নেই। ফলে তারা ঐতিহ্যকে ‘অনুভব’ কম করে, ‘প্রেজেন্ট’ বেশি করে।

শহুরে নববর্ষকে এক কথায় বলা যায়- ‘উৎসবের বিস্তার ঘটেছে, কিন্তু গভীরতা কিছুটা হালকা হয়েছে। তবুও এটাকে নেতিবাচকভাবে দেখার সুযোগ নেই, কারণ: নতুন প্রজন্ম যুক্ত হচ্ছে, সংস্কৃতি দৃশ্যমান হচ্ছে, বৈচিত্র্য বাড়ছে।’ শহরের নববর্ষ আমরা কি শুধু উদযাপন করছি, নাকি সত্যিই অনুভব করছি? ঐতিহ্য টিকে থাকে তখনই, যখন তা শুধু পোশাকে নয়, সম্পর্কে, আচরণে, স্মৃতিতে জায়গা করে নেয়। আর সারল্যপূর্ণ গ্রাম্য পরিবেশে এখনো গাছালীঘেরা মাঠে বৈশাখি মেলা হয়, বাড়িতে পিঠা-পুলি হয়, আম আঁটির ভেঁপুতে শিশু-কিশোররা মাতোয়ারা হয়, কৃষক তার কাস্তে আর নাঙ্গল ফলায় নতুন শান দেয়। পুরনো খড়ের ছাউনিতে নতুন খড় বাঁধা হয়।

নববর্ষের আসল শক্তি তার বাহ্যিক রূপে নয়, মানুষের ভেতরের সংযোগে। নববর্ষ বদলেছে, কিন্তু তার আত্মা এখনো বেঁচে আছে- আমাদের ভেতরে, আমাদের সম্পর্কের উষ্ণতায়।

সফিকুল বোরহান: কথাসাহিত্যিক, অন্বেষা, রানির দিঘির পূর্ব পাড়, কুমিল্লা

Thumbnail image

দেশের ঐতিহ্য, উৎসব, আনন্দ, সংস্কৃতি শেষ হয়ে গেল বলে আমরা আক্ষেপ করি। আসলেই কি সব শেষ হয়ে গেছে? আমি মনে করি শেষ হয়নি, বরং বিবর্তন হয়েছে। আধুনিকতা ও বিজ্ঞানের প্রভাবে ধরন, সময় ও মানসিকতায় পরিবর্তন এসেছে। তারপরও একটা তৃষ্ণা থেকে যায়, নববর্ষ- তার অতীতগুলো নিয়ে।

ঐতিহ্য স্থির নয়- এটি জীবন্ত। সমাজ, সময়, প্রযুক্তি- সবকিছু সময়ের সাথে এটি বদলায়। আগে গ্রামবাংলার নববর্ষ মানেই ছিল হালখাতা, মেলা, পান্তা-ইলিশ, লোকগান, আর সামাজিক মেলামেশা। এখন শহুরে জীবনে আমরা দেখি- র‌্যালি, কনসার্ট, সামাজিক মাধ্যমে শুভেচ্ছা, ফ্যাশন, রেস্টুরেন্ট কালচার। এগুলো আলাদা- কিন্তু একেবারে বিচ্ছিন্ন নয়। পুরোনোর ছায়া নতুনের মধ্যে থেকেই যায়।

পরিবর্তনের কারণ: আধুনিকতা ও প্রযুক্তি- ডিজিটাল যুগ আমাদের জীবনযাপন, সময়ের ব্যবহার, এমনকি উৎসব উদযাপনের ধরনও বদলে দিয়েছে। এখন নববর্ষের শুভেচ্ছা অনেক সময় সরাসরি নয়, অনলাইনে পৌঁছে যায়। শহুরে জীবন ও ব্যস্ততা- আগে মানুষের হাতে সময় ছিল বেশি, সামাজিক বন্ধনও ছিল ঘনিষ্ঠ। এখন ব্যস্ততা বেড়েছে, ফলে উৎসবের রূপ কিছুটা সংক্ষিপ্ত ও পরিকল্পিত হয়েছে। বিশ্বায়ন- বিশ্বের বিভিন্ন সংস্কৃতির প্রভাব আমাদের ওপর পড়ছে। ফলে আমাদের উৎসবেও নতুন নতুন উপাদান যুক্ত হচ্ছে।

তবুও কেন ‘তৃষ্ণা’ থেকে যায়? এটাই সবচেয়ে মানবিক অংশ। আমরা শুধু উৎসব উদযাপন করি না- আমরা স্মৃতি উদযাপন করি। শৈশবের নববর্ষ, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো, মেলার গন্ধ- এসব আমাদের আবেগের অংশ। এই তৃষ্ণা আসলে সরলতার জন্য, আন্তরিক সম্পর্কের জন্য, ধীরগতির জীবনের জন্য। অর্থাৎ, আমরা উৎসবের রূপ নয়, তার অনুভ‚তিটাই খুঁজি।

অতীত বনাম বর্তমান : দ্ব›দ্ব না সমন্বয়? এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- আমরা প্রায়ই অতীতকে ‘রোমান্টিসাইজ’ করি। অতীতে যেমন সৌন্দর্য ছিল, তেমনি সীমাবদ্ধতাও ছিল। আর বর্তমানেও যেমন যান্ত্রিকতা আছে, তেমনি নতুন সম্ভাবনাও আছে। তাই এটাকে দ্ব›দ্ব হিসেবে না দেখে সমন্বয় হিসেবে দেখাই ভালো, পুরোনো ঐতিহ্যের মূল মূল্যবোধ (সম্প্রীতি, আনন্দ, মিলন) এবং নতুন যুগের সুবিধা (প্রযুক্তি, সৃজনশীলতা, বৈচিত্র্য) ইত্যাদি।

করণীয় হচ্ছে, সচেতনভাবে ঐতিহ্যকে ধারণ করা, যেমন- পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো, লোকসংস্কৃতিকে গুরুত্ব দেওয়া। নতুন প্রজন্মকে যুক্ত করা, তাদের ভাষায়, তাদের মাধ্যমে ঐতিহ্যকে উপস্থাপন করা। ব্যক্তিগত উদ্যোগ- ছোট ছোট উদ্যোগ- বন্ধুদের নিয়ে আড্ডা, ঘরোয়া আয়োজন- এসবই বড় পরিবর্তন আনতে পারে।

ঐতিহ্য হারিয়ে যায় না, যদি আমরা তাকে বাঁচিয়ে রাখতে চাই। নববর্ষের সেই ‘তৃষ্ণা’ আসলে আমাদের ভেতরের মানবিকতা, সংযোগ আর শিকড়ের প্রতি টান। তাই বলা যায়- নববর্ষ বদলেছে, কিন্তু তার আত্মা এখনো বেঁচে আছে- আমাদের ভেতরেই।

নববর্ষ নিয়ে যে অনুভ‚তি- তা আসলে এক প্রজন্মের সম্মিলিত স্মৃতি। একটু ফিরে যাওয়া যায় সেই সময়ের নববর্ষে- ভোরের শুরু: শুদ্ধতা আর নতুনের আহŸান, আগে নববর্ষ মানেই ভোরে ঘুম থেকে ওঠা। পুকুরে বা নদীতে গোসল- এক ধরনের মানসিক শুদ্ধতা, নতুন কাপড় পরা, বাড়ির বড়দের সালাম/প্রণাম করা। এটা শুধু রীতি ছিল না- একটা মানসিক প্রস্তুতি, ‘নতুন বছরটা ভালোভাবে শুরু করবো’ এই অনুভ‚তি। পাড়াময় ডাকাডাকি, সম্পর্কের উচ্ছ¡াস, ছোটরা দলবেঁধে শোর তুলতো, ‘এই বাড়ির বালা, সেই বাড়িতে যা’, এগুলো নিছক মজা নয়- এগুলো ছিল সামাজিক সংযোগের এক অনন্য প্রকাশ। পাড়ার সবাই একে অপরকে চিনতো- মজা, খুনসুটি, ডাকাডাকি- সব মিলিয়ে এক জীবন্ত সমাজ। এখনকার শহুরে জীবনে এই স্বতঃস্ফ‚র্ততা অনেকটাই কমে গেছে।

নববর্ষ মানেই ছিল গ্রামবাংলার মেলা- তালপাতার সেপাই, হাতে বানানো খেলনা, খুব সাধারণ- কিন্তু কল্পনার জগৎ তৈরি করত। বাঁশি, মাটির খেলনা, ডুগডুগি, রঙিন ঘুড়ি, মিষ্টি, বাতাসা, জিলাপি, কাঁচামিঠে আম, বেথুন, গাব- এগুলো ছিল স্পর্শযোগ্য আনন্দ- ডিজিটাল নয়, বাস্তব। নাগরদোলা- ছোট্ট স্বপ্নের উড়ান, নাগরদোলায় চড়া ছিল এক বিরাট উত্তেজনা। একটু ভয়, একটু আনন্দ, ওপর থেকে পুরো মেলা দেখা। আজকের দিনে বড় বড় অ্যামিউজমেন্ট পার্ক আছে, কিন্তু সেই সরল রোমাঞ্চটা অন্যরকম ছিল।

হালখাতা: অর্থনীতি আর সম্পর্কের মেলবন্ধন, দোকানিরা নতুন খাতা খুলত- পুরোনো হিসাব মিটানো, মিষ্টি খাওয়ানো, গ্রাহকদের সঙ্গে সম্পর্ক নবায়ন, এটা শুধু ব্যবসা নয়- একটা সামাজিক বন্ধনও ছিল। সাংস্কৃতিক পরিবেশ : লোকগান, পালাগান, গ্রামীণ নাটক, কখনো কবিগান- এগুলো ছিল লোকজ সংস্কৃতির প্রাণ। স্বতঃস্ফ‚র্ততা, আগে সবকিছুই ছিল স্বাভাবিক, আয়োজনবিহীন। এখন অনেক কিছুই ‘ইভেন্ট’ হয়ে গেছে। ঘনিষ্ঠ সামাজিক সম্পর্ক, পাড়ার সবাই ছিল এক পরিবারের মতো। এখন সেই বন্ধন শিথিল। সরল আনন্দের ক্ষমতা- তালপাতার সেপাই, বেলনু-বাঁশি বা নাগরদোলায় যে আনন্দ পাওয়া যেত, এখন অনেক বড় কিছু পেয়েও সেই অনুভ‚তি হয় না। প্রকৃতির সঙ্গে সংযোগ- পুকুর, মাঠ, খোলা আকাশ- এসবের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক কমে গেছে।

তবুও পুরোপুরি সব হারায়নি- আজও নববর্ষে মানুষ লাল-সাদা পরে, আনন্দ/মঙ্গল/বৈশাখি শোভাযাত্রা করে, গান গায়, ছবি তোলে, শুভেচ্ছা জানায়। কিন্তু পার্থক্যটা হলো- নববর্ষ আসলে বাইরে নয়, আমাদের ভেতরেই থাকে।

গ্রাম ও শহরে আগে বিস্তর ফারাক ছিল। আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে এখন গ্রাম ও শহরের ফারাকটা কিছু কমেছে। কিন্তু যোগাযোগ লভ্যতা, আর্থিক সাযুজ্য ও আধুনিক মানসিকতা, কুসংস্কার, ধর্ম ইত্যাদিতে শহর-গ্রাম এখনও নদীর দুই কূলের মতোন। গ্রাম এখনো অনেক ক্ষেত্রে উন্নয়নের দিক থেকে পিছিয়ে আছে। তাই নববর্ষ গ্রামে পালিত হয় সীমিত আকারে। শহরে জাঁকজমক করে।

শহুরে নববর্ষ আসলে এক আকর্ষণীয় অনুভ‚তি- এখানে ঐতিহ্য, আধুনিকতা, বাণিজ্য, প্রযুক্তি- সব একসাথে মিশে গেছে। ফলে এর আবেদন যেমন বেড়েছে, তেমনি তার প্রকৃতি বদলেছে। শহুরে নববর্ষের আবেদন: উৎসব থেকে ‘অভিজ্ঞতা’, গ্রামের নববর্ষ ছিল জীবনঘনিষ্ঠ; শহরের নববর্ষ হয়ে উঠেছে ‘ইভেন্ট-নির্ভর’। বড় বড় আয়োজন (যেমন মঙ্গল শোভাযাত্রা, কনসার্ট) ইত্যাদি। সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, কর্পোরেট অংশগ্রহণ, সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক প্রচার। এখন নববর্ষ শুধু পালন নয়- এটা ‘দেখা’, ‘শেয়ার করা’, ‘অংশগ্রহণ করা’- এক ধরনের নাগরিক অভিজ্ঞতা। ফলে শহরে এর দৃশ্যমানতা ও ব্যাপ্তি অনেক বেশি।

আনন্দের উপকরণে কী কী যোগ হলো? ফ্যাশন ও পরিচয়ের প্রকাশ- লাল-সাদা পোশাক এখন এক ধরনের সাংস্কৃতিক স্টেটমেন্ট ডিজাইনার পোশাক, থিমভিত্তিক সাজ। খাবারের বৈচিত্র্য- ঐতিহ্যবাহী পান্তা-ইলিশের পাশাপাশি রেস্টুরেন্টে বিশেষ নববর্ষ মেনু, ফিউশন খাবার। ডিজিটাল উদযাপন- ফেসবুক/ইনস্টাগ্রামে শুভেচ্ছা, লাইভ ইভেন্ট, অনলাইন কনসার্ট, ছবি তোলা ও শেয়ার করা- উৎসবের বড় অংশ। বিনোদনের আধুনিক রূপ- ব্যান্ড কনসার্ট, টিভি শো, বিশেষ অনুষ্ঠান, আর্ট এক্সিবিশন, ফটোওয়াক অর্থাৎ আনন্দ এখন বহুমাত্রিক- শুধু অংশগ্রহণ নয়, উপভোগের ধরনও বদলেছে।

আত্মিক সম্পর্ক বেড়েছে না কমেছে? উত্তরটা সরল না- দুই দিকই আছে। যেগুলো বেড়েছে: বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে আউটিং, গ্রæপ সেলিব্রেশন, সামাজিক মাধ্যমে সংযোগ (দূরের মানুষও যুক্ত হচ্ছে)। যেগুলো কমেছে: পাড়া-প্রতিবেশীর সঙ্গে স্বতঃস্ফ‚র্ত সম্পর্ক, পরিবারের সাথে দীর্ঘ সময় কাটানো, আন্তরিক, অনানুষ্ঠানিক মেলামেশা। শহরে সম্পর্ক সংখ্যায় বাড়লেও, গভীরতায় অনেক সময় কমে গেছে।

শিশু-কিশোরদের কাছে ঐতিহ্যের সাড়া, এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ দিক। ইতিবাচক দিক: স্কুল, মিডিয়া, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তারা নববর্ষ সম্পর্কে জানছে। বৈশাখি, আনন্দ কিংবা মঙ্গল শোভাযাত্রা, গান, পোশাক- এসব তাদের কাছে আকর্ষণীয়, তারা গর্ব অনুভব করে- ‘এটা আমাদের সংস্কৃতি’। সীমাবদ্ধতা: ঐতিহ্যের ‘অভিজ্ঞতা’ কম, ‘দেখা’ বেশি, অনেক কিছুই তাদের কাছে ফটো তোলার বিষয়, গ্রামীণ ঐতিহ্যের সরাসরি সংস্পর্শ নেই। ফলে তারা ঐতিহ্যকে ‘অনুভব’ কম করে, ‘প্রেজেন্ট’ বেশি করে।

শহুরে নববর্ষকে এক কথায় বলা যায়- ‘উৎসবের বিস্তার ঘটেছে, কিন্তু গভীরতা কিছুটা হালকা হয়েছে। তবুও এটাকে নেতিবাচকভাবে দেখার সুযোগ নেই, কারণ: নতুন প্রজন্ম যুক্ত হচ্ছে, সংস্কৃতি দৃশ্যমান হচ্ছে, বৈচিত্র্য বাড়ছে।’ শহরের নববর্ষ আমরা কি শুধু উদযাপন করছি, নাকি সত্যিই অনুভব করছি? ঐতিহ্য টিকে থাকে তখনই, যখন তা শুধু পোশাকে নয়, সম্পর্কে, আচরণে, স্মৃতিতে জায়গা করে নেয়। আর সারল্যপূর্ণ গ্রাম্য পরিবেশে এখনো গাছালীঘেরা মাঠে বৈশাখি মেলা হয়, বাড়িতে পিঠা-পুলি হয়, আম আঁটির ভেঁপুতে শিশু-কিশোররা মাতোয়ারা হয়, কৃষক তার কাস্তে আর নাঙ্গল ফলায় নতুন শান দেয়। পুরনো খড়ের ছাউনিতে নতুন খড় বাঁধা হয়।

নববর্ষের আসল শক্তি তার বাহ্যিক রূপে নয়, মানুষের ভেতরের সংযোগে। নববর্ষ বদলেছে, কিন্তু তার আত্মা এখনো বেঁচে আছে- আমাদের ভেতরে, আমাদের সম্পর্কের উষ্ণতায়।

সফিকুল বোরহান: কথাসাহিত্যিক, অন্বেষা, রানির দিঘির পূর্ব পাড়, কুমিল্লা

বিষয়:

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

১

বৈরাগী ও দীনবন্ধু বাঁশির গ্রাম শ্রীমদ্দী

২

লালমাই পাহাড়ের কোলে বিজয়পুরের মৃৎশিল্প

৩

নববর্ষের ঐতিহ্য : শহর ও গ্রাম

৪

মাত্রাতিরিক্ত বিষাক্ত ধাতু নদীর পানিতে

৫

হাকিম সাহেব বলতেন -এখন টাকার যুগ, টাকা ছিটানোর যুগ, এ যুগে আমি অচল

সম্পর্কিত

বৈরাগী ও দীনবন্ধু বাঁশির গ্রাম শ্রীমদ্দী

বৈরাগী ও দীনবন্ধু বাঁশির গ্রাম শ্রীমদ্দী

৬ দিন আগে
লালমাই পাহাড়ের কোলে বিজয়পুরের মৃৎশিল্প

লালমাই পাহাড়ের কোলে বিজয়পুরের মৃৎশিল্প

৬ দিন আগে
মাত্রাতিরিক্ত বিষাক্ত ধাতু নদীর পানিতে

মাত্রাতিরিক্ত বিষাক্ত ধাতু নদীর পানিতে

২২ দিন আগে
হাকিম সাহেব বলতেন -এখন টাকার যুগ, টাকা ছিটানোর যুগ, এ যুগে আমি অচল

হাকিম সাহেব বলতেন -এখন টাকার যুগ, টাকা ছিটানোর যুগ, এ যুগে আমি অচল

২৩ মার্চ ২০২৬