অধ্যাপক ডা. মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ

নদীকৃত্য শব্দের অর্থ নদী রক্ষায় করণীয়। ১৯১৭ সালের মার্চে ব্রাজিলের কুরিতিবা শহরে পরিবেশবাদীদের একটি আন্তর্জাতিক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে বিভিন্ন দেশে পরিবেশ কর্মীরা নিজ নিজ দেশের নদ-নদীর করুণ অবস্থা তুলে ধরে সেগুলো রক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। ওই সমাবেশ থেকেই প্রতিবছর ১৪ মার্চ আন্তর্জাতিক নদীকৃত্য দিবস পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
মূলত নদীর প্রতি মানুষের করণীয় কি এবং নদী রক্ষায় মানুষের দায়-দায়িত্ব কতটুকু —এসব বিষয় স্মরণ করিয়ে দিতে দিবসটি পালন করা হয়। বাংলাদেশে সাধারণ মানুষের মধ্যে নদ-নদী সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে এবং নদী ভাবনা জাগিয়ে তুলতে ১৯৯৮ সাল থেকে আন্তর্জাতিক নদীকৃত্য দিবস পালন করে আসছে। দিবসটি উপলক্ষে বিভিন্ন সংগঠনের উদ্যোগে নানান কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। বুড়িগঙ্গার প্রাণ ফিরিয়ে দেয়ার দাবিতে বছিলা ঘাট থেকে হাইক্কার খাল পর্যন্ত গণপদ যাত্রার কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।
শনিবার (১৪ মার্চ) বিকেল ৩টায় পুরাতন গোমতীর দখল ও দূষণ মুক্তির দাবিতে গোমতী পাড়ে মানববন্ধন পালন করেন বাপা, কুমিল্লা আঞ্চলিক কমিটি। কর্মসূচি আয়োজন করেছে ধরিত্রি রক্ষায় আমরা (ধরা), বারসিক, ব্রাইটার্স, নদী পরিব্রাজক দল, বুড়িগঙ্গা রিভারকিপার, ক্লাইমেট ফ্রন্টিয়ার, রিভার বাংলা, গর্জন সমাজ কল্যাণ সংস্থা, গ্লোবাল ল থিংকার্স সোসাইটি, রিভারাইন পিপল, সচেতন ফাউন্ডেশন, ইয়ং ক্লাইমেট নেটওয়ার্ক, সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্য, মিশন গ্রিন বাংলাদেশ, সুন্দরবন ও উপকূল সুরক্ষা আন্দোলন এবং ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশ।
নদীকৃত্য দিবস সামনে রেখে নদ-নদীতে ধাতুর দূষণের বিষয়টি আবারও সামনে এসেছে। সম্প্রতি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ বিভাগের এক গবেষণায় উদ্বেগজনক ফলাফল পাওয়া গেছে। গবেষণাটি মাতামুহুরী নদী, বাঁকখালী নদী, মহেশখালী চ্যানেল, নাফ নদী, সেন্টমার্টিন দ্বীপসহ গুরুত্বপূর্ণ উপকূলীয় এলাকায় পরিচালিত হয়েছে। আধুনিক ল্যাব টেকনোলজি ব্যবহার করে নদী ও মোহনার পলিতে জমে থাকা ক্যাডমিয়াম, কপার, ক্রোমিয়াম, নিকেল, সিসাসহ বিভিন্ন ভারী ধাতুর মাত্রা নির্ণয় করা হয়।
শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের একোয়াকালচার বিভাগের এক গবেষণায় দেখা যায়, দূষণ উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্রের ওপরও দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। ম্যানগ্রোভ বন, নদী- মোহনার তলদেশের জীববৈচিত্র্য এবং সামুদ্রিক খাদ্যচক্র মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কার্যকর ব্যবস্থা নিতে দেরি হলে কিছু অঞ্চলে ইকোসিস্টেমে অস্থিতিশীলতার এবং স্থানীয় পর্যায়ে মৎস্য সম্পদের পতন ঘটতে পারে। যা উপকূলীয় অর্থনীতি ও খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। দেশে দেশে এখন নদীকে ‘জীবন্ত সত্ত্বা’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। আমাদের চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষায় নতুন বাংলাদেশ গড়তে হলে জীবন জীবিকা ও মৎস্যসম্পদ রক্ষায় নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে।
আন্তর্জাতিক জার্নাল সায়েন্স অব দ্য টোটাল এনভায়রনমেন্টে (এলসেভিয়ার) প্রকাশিত ওই গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা যায়, বাঁকখালী নদী ও মহেশখালী চ্যানেল উপকূলীয় দূষণের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা। এ স্থানে পিএলআই মান —২ এর বেশি, যা উচ্চ মাত্রা দূষণের ইঙ্গিত দেয়। বিশেষত সবচেয়ে উদ্বেগজনক ধাতু হিসাবে শনাক্ত হয়েছে ক্যাডমিয়াম। এর উচ্চ বিষক্রিয়ার কারণে বাঁকখালী ও মহেশখালী অত্যন্ত উচ্চ পরিবেশগত ঝুঁকি শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। ওই দূষণের মূল কারণ হিসেবে গবেষণায় বলা হয়েছে —শিল্প-কারখানার অপরিশোধিত বর্জ্য, নগর পয়ঃনিষ্কাশন থেকে নিঃসৃত পানি, জাহাজ ভাঙা কার্যক্রম, বন্দরভিত্তিক নৌ চলাচল এবং কৃষি ও নগর এলাকা থেকে বয়ে আসা দূষিত নদী নিষ্কাশন।
চট্টগ্রাম ও মহেশখালী অঞ্চলে এসব কার্যক্রমের ঘনত্ব বেশি হওয়ায় সেখানে দূষণের চাপও বেশি। এ ধাতুদূষণের সরাসরি প্রভাব পড়েছে মৎস্য সম্পদের ওপর। পলিতে জমে থাকা ধাতু ক্ষুদ্র জলজ প্রাণী ও প্লাংকটনের শরীরে প্রবেশ করে খাদ্যশৃঙ্খলার মাধ্যমে মাছ ও চিংড়িতে চলে আসে। ফলে মাছের প্রজনন ও বৃদ্ধি ব্যাহত হয়, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায় এবং বিভিন্ন প্রজাতির মাছের সংখ্যা কমতে থাকে। এতে জেলেদের একদিকে আয় কমছে, অন্যদিকে দূষিত মাছ মানুষের খাদ্য হিসাবে ব্যবহারের কারণে জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি বাড়ছে।
দেশের নদ-নদীর পানিতে বিষাক্ত ভারী ধাতুর দূষণ উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। এক সময় রাজধানী ঢাকার আশেপাশের নদীগুলোতেই এ দূষণ সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু এখন উপকূলীয় নদী ও মোহনায়ও তা ছড়িয়ে পড়েছে। এতে মৎস্য সম্পদ, জীববৈচিত্র্য এবং মানুষের স্বাস্থ্য ও খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এ প্রেক্ষাপটেই ১৪ই মার্চ’২৬ পালিত হয়েছে আন্তর্জাতিক নদীকৃত্য দিবস।
অধ্যাপক ডা. মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ: সাবেক অধ্যক্ষ, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ

নদীকৃত্য শব্দের অর্থ নদী রক্ষায় করণীয়। ১৯১৭ সালের মার্চে ব্রাজিলের কুরিতিবা শহরে পরিবেশবাদীদের একটি আন্তর্জাতিক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে বিভিন্ন দেশে পরিবেশ কর্মীরা নিজ নিজ দেশের নদ-নদীর করুণ অবস্থা তুলে ধরে সেগুলো রক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। ওই সমাবেশ থেকেই প্রতিবছর ১৪ মার্চ আন্তর্জাতিক নদীকৃত্য দিবস পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
মূলত নদীর প্রতি মানুষের করণীয় কি এবং নদী রক্ষায় মানুষের দায়-দায়িত্ব কতটুকু —এসব বিষয় স্মরণ করিয়ে দিতে দিবসটি পালন করা হয়। বাংলাদেশে সাধারণ মানুষের মধ্যে নদ-নদী সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে এবং নদী ভাবনা জাগিয়ে তুলতে ১৯৯৮ সাল থেকে আন্তর্জাতিক নদীকৃত্য দিবস পালন করে আসছে। দিবসটি উপলক্ষে বিভিন্ন সংগঠনের উদ্যোগে নানান কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। বুড়িগঙ্গার প্রাণ ফিরিয়ে দেয়ার দাবিতে বছিলা ঘাট থেকে হাইক্কার খাল পর্যন্ত গণপদ যাত্রার কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।
শনিবার (১৪ মার্চ) বিকেল ৩টায় পুরাতন গোমতীর দখল ও দূষণ মুক্তির দাবিতে গোমতী পাড়ে মানববন্ধন পালন করেন বাপা, কুমিল্লা আঞ্চলিক কমিটি। কর্মসূচি আয়োজন করেছে ধরিত্রি রক্ষায় আমরা (ধরা), বারসিক, ব্রাইটার্স, নদী পরিব্রাজক দল, বুড়িগঙ্গা রিভারকিপার, ক্লাইমেট ফ্রন্টিয়ার, রিভার বাংলা, গর্জন সমাজ কল্যাণ সংস্থা, গ্লোবাল ল থিংকার্স সোসাইটি, রিভারাইন পিপল, সচেতন ফাউন্ডেশন, ইয়ং ক্লাইমেট নেটওয়ার্ক, সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্য, মিশন গ্রিন বাংলাদেশ, সুন্দরবন ও উপকূল সুরক্ষা আন্দোলন এবং ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশ।
নদীকৃত্য দিবস সামনে রেখে নদ-নদীতে ধাতুর দূষণের বিষয়টি আবারও সামনে এসেছে। সম্প্রতি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ বিভাগের এক গবেষণায় উদ্বেগজনক ফলাফল পাওয়া গেছে। গবেষণাটি মাতামুহুরী নদী, বাঁকখালী নদী, মহেশখালী চ্যানেল, নাফ নদী, সেন্টমার্টিন দ্বীপসহ গুরুত্বপূর্ণ উপকূলীয় এলাকায় পরিচালিত হয়েছে। আধুনিক ল্যাব টেকনোলজি ব্যবহার করে নদী ও মোহনার পলিতে জমে থাকা ক্যাডমিয়াম, কপার, ক্রোমিয়াম, নিকেল, সিসাসহ বিভিন্ন ভারী ধাতুর মাত্রা নির্ণয় করা হয়।
শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের একোয়াকালচার বিভাগের এক গবেষণায় দেখা যায়, দূষণ উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্রের ওপরও দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। ম্যানগ্রোভ বন, নদী- মোহনার তলদেশের জীববৈচিত্র্য এবং সামুদ্রিক খাদ্যচক্র মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কার্যকর ব্যবস্থা নিতে দেরি হলে কিছু অঞ্চলে ইকোসিস্টেমে অস্থিতিশীলতার এবং স্থানীয় পর্যায়ে মৎস্য সম্পদের পতন ঘটতে পারে। যা উপকূলীয় অর্থনীতি ও খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। দেশে দেশে এখন নদীকে ‘জীবন্ত সত্ত্বা’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। আমাদের চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষায় নতুন বাংলাদেশ গড়তে হলে জীবন জীবিকা ও মৎস্যসম্পদ রক্ষায় নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে।
আন্তর্জাতিক জার্নাল সায়েন্স অব দ্য টোটাল এনভায়রনমেন্টে (এলসেভিয়ার) প্রকাশিত ওই গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা যায়, বাঁকখালী নদী ও মহেশখালী চ্যানেল উপকূলীয় দূষণের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা। এ স্থানে পিএলআই মান —২ এর বেশি, যা উচ্চ মাত্রা দূষণের ইঙ্গিত দেয়। বিশেষত সবচেয়ে উদ্বেগজনক ধাতু হিসাবে শনাক্ত হয়েছে ক্যাডমিয়াম। এর উচ্চ বিষক্রিয়ার কারণে বাঁকখালী ও মহেশখালী অত্যন্ত উচ্চ পরিবেশগত ঝুঁকি শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। ওই দূষণের মূল কারণ হিসেবে গবেষণায় বলা হয়েছে —শিল্প-কারখানার অপরিশোধিত বর্জ্য, নগর পয়ঃনিষ্কাশন থেকে নিঃসৃত পানি, জাহাজ ভাঙা কার্যক্রম, বন্দরভিত্তিক নৌ চলাচল এবং কৃষি ও নগর এলাকা থেকে বয়ে আসা দূষিত নদী নিষ্কাশন।
চট্টগ্রাম ও মহেশখালী অঞ্চলে এসব কার্যক্রমের ঘনত্ব বেশি হওয়ায় সেখানে দূষণের চাপও বেশি। এ ধাতুদূষণের সরাসরি প্রভাব পড়েছে মৎস্য সম্পদের ওপর। পলিতে জমে থাকা ধাতু ক্ষুদ্র জলজ প্রাণী ও প্লাংকটনের শরীরে প্রবেশ করে খাদ্যশৃঙ্খলার মাধ্যমে মাছ ও চিংড়িতে চলে আসে। ফলে মাছের প্রজনন ও বৃদ্ধি ব্যাহত হয়, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায় এবং বিভিন্ন প্রজাতির মাছের সংখ্যা কমতে থাকে। এতে জেলেদের একদিকে আয় কমছে, অন্যদিকে দূষিত মাছ মানুষের খাদ্য হিসাবে ব্যবহারের কারণে জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি বাড়ছে।
দেশের নদ-নদীর পানিতে বিষাক্ত ভারী ধাতুর দূষণ উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। এক সময় রাজধানী ঢাকার আশেপাশের নদীগুলোতেই এ দূষণ সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু এখন উপকূলীয় নদী ও মোহনায়ও তা ছড়িয়ে পড়েছে। এতে মৎস্য সম্পদ, জীববৈচিত্র্য এবং মানুষের স্বাস্থ্য ও খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এ প্রেক্ষাপটেই ১৪ই মার্চ’২৬ পালিত হয়েছে আন্তর্জাতিক নদীকৃত্য দিবস।
অধ্যাপক ডা. মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ: সাবেক অধ্যক্ষ, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ