আবু সাঈদ, চান্দিনা

একসময় গ্রামবাংলার প্রায় প্রতিটি পরিবারেই মাটির তৈরি বিভিন্ন তৈজসপত্রের ব্যাপক ব্যবহার ছিল। রান্না, খাবার পরিবেশন, পানি সংরক্ষণ কিংবা ঘর সাজানো সব ক্ষেত্রেই মাটির পাত্র ছিল অপরিহার্য। তবে আধুনিকতার বিস্তার ও প্রযুক্তিনির্ভর জীবনযাত্রার কারণে ঐতিহ্যবাহী মাটির তৈজসপত্রের ব্যবহার দিন দিন কমে যাচ্ছে। এর ফলে এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত কারিগররাও চরম সংকটে পড়েছেন।
পূর্ব মাইজখার গ্রামের প্রবীণ সিরাজুল হক বলেন, একসময় মাটির হাঁড়ি, পাতিল, কলস, সরা, পেয়ালা, থালা, বাটি, ব্যাংক, পুতুল, মাটির চুলাসহ নানা ধরনের সামগ্রী ছিল দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য অংশ। বিশেষ করে বিয়ে ও বিভিন্ন সামাজিক-ধর্মীয় অনুষ্ঠানে মাটির তৈজসপত্রের ব্যবহার ছিল অত্যন্ত লক্ষণীয়। কিন্তু এখন আগের মতো এসব আর দেখা যায় না। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রায় এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। অ্যালুমিনিয়াম, স্টিল, প্লাস্টিক, মেলামাইন ও সিরামিকের তৈরি সামগ্রী সহজলভ্য হওয়ায় মাটির তৈজসপত্রের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।
চান্দিনা পৌর এলাকার বাসিন্দা খোকন আহমেদ বলেন, এক সময় কাঁধে করে কুমাররা মাটির তৈরি বিভিন্ন জিনিস পত্র বিক্রি করতো। নগদ টাকার পাশাপাশি ধান, গম ও মৌসুমি ফসলের বিনিময়েও এসব জিনিস কিনতো মহিলারা। এখন আর এসব সহসা চোখে পড়ে না।

চান্দিনার কামারখোলা, আওধাতা, করতলা ও দেবীদ্বারের সাইতলা, আতাপুর, নুরিতলাসহ বিভিন্ন এলাকায় একসময় নিয়মিতভাবে মাটির তৈজসপত্র তৈরি করতেন কুমার সম্প্রদায়ের কারিগররা। বর্তমানে হাতেগোনা কয়েকটি পরিবারই এ ঐতিহ্যবাহী পেশা ধরে রেখেছেন। তারা জানান, তাদের তৈরি পণ্য স্থানীয় বাজারে বিক্রি হলেও আগের মতো ক্রেতা পাওয়া যাচ্ছে না। নতুন করে কেউ এ পেশায় না আসায় এই শিল্পটি এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে।
চান্দিনার কামারখোলা গ্রামের মৃৎশিল্পী নিমাই পাল বলেন, উপযুক্ত মাটি সংগ্রহ করে মাটির জিনিস তৈরি করা, এরপর তা শুকিয়ে নকশা করে বাজারজাত করা এখন অনেক ব্যয়বহুল। মানুষ এখন এসব ক্রয় করতে আগের মতো আগ্রহী নয়। যার কারণে অনেকেই এই পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে গেছে।
আরেক মৃৎশিল্পী সুনীল পাল, এসব জিনিসের চাহিদা কমে যাওয়ায় নতুন করে কেউ এই পেশায় আসতে চায় না। আগের মতো বাড়ি বাড়ি গিয়ে বিক্রি করাও এখন কষ্টকর। যার কারণে বর্তমানে মাটির জিনিস তৈরি করার কারিগর খুঁজে পাওয়া যায়না।
দেবীদ্বারের সাইতলা গ্রামের মৃৎশিল্পী কানন রাণী শর্মা বলেন, আগে মাটির পণ্যের ব্যাপক চাহিদা ছিল। সারাদিন কাজ করেও মানুষের চাহিদার শেষ করা যেত না। বর্তমানে মানুষ প্লাস্টিক ও স্টিলের পণ্য বেশি ব্যবহার করছেন। ফলে মাটির তৈজসপত্র তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
মাইজখার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক আবদুর রহমান বলেন, মাটির তৈজসপত্র শুধু ব্যবহারিক সামগ্রী নয়, এটি বাংলার গ্রামীণ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই এ শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে কারিগরদের প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে ঋণ, কাঁচামাল সরবরাহ এবং কার্যকর বাজারজাতকরণে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন। ঐতিহ্যের স্মারক হিসেবে এটিকে টিকিয়ে রাখা জরুরি।
তবে বিভিন্ন রেস্তোরাঁ এখন শখের বিষয় হিসেবে মাটির তৈরি খাবারের বাটি, বাসন ইত্যাদি ব্যবহার করার ফলে এ পেশায় জড়িতরা কিছুটা আশান্বিত হচ্ছেন। তারা মনে করছেন আধুনিকতার সাথে যদি ঐতিহ্যকে সঠিকভাবে যুক্ত করা যায় তবে এ পেশাটি নতুন করে আবারও জৌলুশ ফিরে পাবে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, আধুনিকতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মৃৎশিল্পে নতুন নকশা ও বৈচিত্র্য যুক্ত করা গেলে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে এর চাহিদা বৃদ্ধি করা সম্ভব। এতে একদিকে যেমন হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্য সংরক্ষিত হবে, অন্যদিকে মৃৎশিল্পের সঙ্গে জড়িত পরিবারগুলোর কর্মসংস্থানও নিশ্চিত হবে।
ঐতিহ্য ও আধুনিকতার সমন্বয়ের মাধ্যমে মাটির তৈজসপত্রের ব্যবহার পুনরায় বৃদ্ধি পেলে এই প্রায় বিলুপ্তপ্রায় শিল্প আবারও প্রাণ ফিরে পেতে পারে এমনটাই প্রত্যাশা স্থানীয়দের।

একসময় গ্রামবাংলার প্রায় প্রতিটি পরিবারেই মাটির তৈরি বিভিন্ন তৈজসপত্রের ব্যাপক ব্যবহার ছিল। রান্না, খাবার পরিবেশন, পানি সংরক্ষণ কিংবা ঘর সাজানো সব ক্ষেত্রেই মাটির পাত্র ছিল অপরিহার্য। তবে আধুনিকতার বিস্তার ও প্রযুক্তিনির্ভর জীবনযাত্রার কারণে ঐতিহ্যবাহী মাটির তৈজসপত্রের ব্যবহার দিন দিন কমে যাচ্ছে। এর ফলে এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত কারিগররাও চরম সংকটে পড়েছেন।
পূর্ব মাইজখার গ্রামের প্রবীণ সিরাজুল হক বলেন, একসময় মাটির হাঁড়ি, পাতিল, কলস, সরা, পেয়ালা, থালা, বাটি, ব্যাংক, পুতুল, মাটির চুলাসহ নানা ধরনের সামগ্রী ছিল দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য অংশ। বিশেষ করে বিয়ে ও বিভিন্ন সামাজিক-ধর্মীয় অনুষ্ঠানে মাটির তৈজসপত্রের ব্যবহার ছিল অত্যন্ত লক্ষণীয়। কিন্তু এখন আগের মতো এসব আর দেখা যায় না। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রায় এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। অ্যালুমিনিয়াম, স্টিল, প্লাস্টিক, মেলামাইন ও সিরামিকের তৈরি সামগ্রী সহজলভ্য হওয়ায় মাটির তৈজসপত্রের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।
চান্দিনা পৌর এলাকার বাসিন্দা খোকন আহমেদ বলেন, এক সময় কাঁধে করে কুমাররা মাটির তৈরি বিভিন্ন জিনিস পত্র বিক্রি করতো। নগদ টাকার পাশাপাশি ধান, গম ও মৌসুমি ফসলের বিনিময়েও এসব জিনিস কিনতো মহিলারা। এখন আর এসব সহসা চোখে পড়ে না।

চান্দিনার কামারখোলা, আওধাতা, করতলা ও দেবীদ্বারের সাইতলা, আতাপুর, নুরিতলাসহ বিভিন্ন এলাকায় একসময় নিয়মিতভাবে মাটির তৈজসপত্র তৈরি করতেন কুমার সম্প্রদায়ের কারিগররা। বর্তমানে হাতেগোনা কয়েকটি পরিবারই এ ঐতিহ্যবাহী পেশা ধরে রেখেছেন। তারা জানান, তাদের তৈরি পণ্য স্থানীয় বাজারে বিক্রি হলেও আগের মতো ক্রেতা পাওয়া যাচ্ছে না। নতুন করে কেউ এ পেশায় না আসায় এই শিল্পটি এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে।
চান্দিনার কামারখোলা গ্রামের মৃৎশিল্পী নিমাই পাল বলেন, উপযুক্ত মাটি সংগ্রহ করে মাটির জিনিস তৈরি করা, এরপর তা শুকিয়ে নকশা করে বাজারজাত করা এখন অনেক ব্যয়বহুল। মানুষ এখন এসব ক্রয় করতে আগের মতো আগ্রহী নয়। যার কারণে অনেকেই এই পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে গেছে।
আরেক মৃৎশিল্পী সুনীল পাল, এসব জিনিসের চাহিদা কমে যাওয়ায় নতুন করে কেউ এই পেশায় আসতে চায় না। আগের মতো বাড়ি বাড়ি গিয়ে বিক্রি করাও এখন কষ্টকর। যার কারণে বর্তমানে মাটির জিনিস তৈরি করার কারিগর খুঁজে পাওয়া যায়না।
দেবীদ্বারের সাইতলা গ্রামের মৃৎশিল্পী কানন রাণী শর্মা বলেন, আগে মাটির পণ্যের ব্যাপক চাহিদা ছিল। সারাদিন কাজ করেও মানুষের চাহিদার শেষ করা যেত না। বর্তমানে মানুষ প্লাস্টিক ও স্টিলের পণ্য বেশি ব্যবহার করছেন। ফলে মাটির তৈজসপত্র তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
মাইজখার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক আবদুর রহমান বলেন, মাটির তৈজসপত্র শুধু ব্যবহারিক সামগ্রী নয়, এটি বাংলার গ্রামীণ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই এ শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে কারিগরদের প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে ঋণ, কাঁচামাল সরবরাহ এবং কার্যকর বাজারজাতকরণে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন। ঐতিহ্যের স্মারক হিসেবে এটিকে টিকিয়ে রাখা জরুরি।
তবে বিভিন্ন রেস্তোরাঁ এখন শখের বিষয় হিসেবে মাটির তৈরি খাবারের বাটি, বাসন ইত্যাদি ব্যবহার করার ফলে এ পেশায় জড়িতরা কিছুটা আশান্বিত হচ্ছেন। তারা মনে করছেন আধুনিকতার সাথে যদি ঐতিহ্যকে সঠিকভাবে যুক্ত করা যায় তবে এ পেশাটি নতুন করে আবারও জৌলুশ ফিরে পাবে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, আধুনিকতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মৃৎশিল্পে নতুন নকশা ও বৈচিত্র্য যুক্ত করা গেলে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে এর চাহিদা বৃদ্ধি করা সম্ভব। এতে একদিকে যেমন হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্য সংরক্ষিত হবে, অন্যদিকে মৃৎশিল্পের সঙ্গে জড়িত পরিবারগুলোর কর্মসংস্থানও নিশ্চিত হবে।
ঐতিহ্য ও আধুনিকতার সমন্বয়ের মাধ্যমে মাটির তৈজসপত্রের ব্যবহার পুনরায় বৃদ্ধি পেলে এই প্রায় বিলুপ্তপ্রায় শিল্প আবারও প্রাণ ফিরে পেতে পারে এমনটাই প্রত্যাশা স্থানীয়দের।