এক দশক আগে যেমন দেখেছি ‘যাদের রক্তে মুক্ত স্বদেশ’ কমপ্লেক্স

গাজীউল হক সোহাগ
Thumbnail image

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের লাগোয়া কুমিল্লার ময়নামতি সেনানিবাসের সম্মুখভাগের প্রবেশ পথেই রয়েছে 'যাঁদের রক্তে মুক্ত স্বদেশ' নামের একটি কমপ্লেক্স। এর একই আঙিনায় রয়েছে শহীদ মিনার, সমর জাদুঘর, স্বাধীনতার কথা গ্যালারি ও মুক্তিযুদ্ধ লাইব্রেরী। এ যেন একের ভেতর চার। সবুজ গাছগাছালি, নানা ধরনের ফুলের সমারোহ ওই কমপ্লেক্সকে ঘিরে। প্রতিদিন কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে সেখানকার সবুজ ঘাসে পা মাড়িয়ে যান দর্শনার্থীরা। বিদ্যালয়ের খুদে শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে বয়োজ্যেষ্ঠরাও এখানে আসেন। প্রতি বছর নভেম্বর মাসের দ্বিতীয় শুক্রবার কমনওয়েলথভুক্ত দেশের রাষ্ট্রদূত ও প্রতিনিধিরা এখানে আসেন। ২০১৫ সালের ২ ডিসেম্বর যাদের রক্তে মুক্ত স্বদেশ ঘুরে এই দৃশ্য দেখা গেছে। কুমিল্লা সেনানিবাসের স্টেশন সদর দপ্তরের তৎকালীন একজন স্টাফ অফিসার মেজর শিহাব উদ্দিন শোয়াইব আমাকে ওই কমপ্লেক্স দেখার ব্যবস্থা করে দেন।

তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, ১৯৭২ সালের ১৬ মে 'যাঁদের রক্তে মুক্ত স্বদেশ' স্মৃতিসৌধের ভিত্তিপ্রস্তুর স্থাপন করেন কর্ণেল জিয়াউর রহমান। ১৯৭৪ সালের ১১ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর উদ্বোধন করেন। ঢাকার বাস্তশিল্পের স্থপতি মোহাম্মদ আবদুর রশিদ কোন ধরনের সম্মানী না নিয়ে ওই স্মৃতিসৌধের নকশা ও মডেল সরবরাহ করেন। এ সময় কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের এক্সিকিউটিভ অফিসার কারার মাহমুদুল হাসান এর নির্মাণ কাজ শেষ করেন।

১৯৮২ সালের ১৩ আগস্ট লে. জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ কুমিল্লা সমর জাদুঘরের উদ্বোধন করেন। সমর জাদুঘরে ঢুকেই দেখা গিয়েছিল বিভিন্ন দেয়ালে কাঁচের মধ্যে সাজানো রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের সময়কার নানা ধরনের অস্ত্র, পোশাক ও গোলাবারুদ।

সমর জাদুঘরে ঢুকেই উত্তর পাশের দেয়ালে চোখে পড়ে একটি বাক্স। কাঁচে ঘেরা ওই বাক্সে রয়েছে একটি মানচিত্র। এই মানচিত্র ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা সংগ্রাম পরিচালনায় ব্যবহার করেছেন মেজর জিয়াউর রহমান। এর পাশেই রয়েছে যুদ্ধের সময় একজন ব্রিগেডিয়ারের ব্যবহার করা বাইনোকুলার। পূর্ব পাশে দেয়ালে রয়েছে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানিদের কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া স্কাইলাকের পাখায় যে গর্ব ছিনিয়ে নিয়েছি কঠোর হস্তে রক্তের বিনিময়ে। একই বক্সের তিনটি স্তরে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের বুলেট, জিয়াউর রহমানের ছড়ি, জুতা এবং রকেট লাঞ্চার। এ ছাড়া পাশের বক্সে রয়েছে জিয়াউর রহমানকে দেওয়া দুইটি পুতুল, এর পাশে শহীদ মেজর মো. হাসিবের জামাকাপড় (১৯৯৭ সালের ২৩ মার্চ সংগ্রহ) ও স্কাইলাকার। দক্ষিণ পাশে বক্সে রয়েছে পাঁচটি করে রাম দা, জিয়াউর রহমানের ওলের কার্পেট, রাইফেল, স্কাইলাকের স্বাধীনতা সংগ্রামের অব্যাহতির পর দুইটি ৩০৩ রাইফেলের ভগ্নাবেশ উদ্ধার করা হয়েছিল। কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট থেকে যা কারার মাহমুদুল হাসান সংগ্রহ করেছেন। পশ্চিমে রয়েছে স্কাইলাকের, একাত্তর সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর শত্রুদের বিভিন্ন পদক কেড়ে নেওয়া।

সমর জাদুঘরের চারপাশের মাঝখানের খালি জায়গায় রয়েছে চারটি টেবিল। এর একটিতে রয়েছে শহীদ স্মৃতিসৌধের প্রতিকৃতি। দ্বিতীয় টেবিলে লাইট মেশিনগান, যার ওজন ১৯ পাউন্ড ৮ আউন্স। তৃতীয় টেবিলে স্কাইলাকের এবং চতুর্থ টেবিলে চীনে তৈরি হেভি মেশিনগান, যার ওজন ৮৯ পাউন্ড।যাদের রক্তে মুক্ত স্বদেশ মূল ফটক দিয়ে পূব দিকে গেলেই চোখে পড়বে সমর জাদুঘর। এর ডানে উত্তর পাশে রয়েছে শহীদ মিনার। দেবদারু গাছের নিচেই শহীদ মিনার। বঙ্গবন্ধু ওই শহীদ মিনারের উদ্বোধন করেন। বামে দক্ষিণ পাশে রয়েছে সবুজ ঘাস। এর মধ্যে রয়েছে গোলাপ, মোরগ ফুল, গাঁদা ও ঝাউ গাছ। এখানেই রয়েছে। তিনটি ক্রিসমাস বৃক্ষ। এর পাশেই রয়েছে মুক্তিযুদ্ধ লাইব্রেরি। ওই লাইব্রেরিতে মুক্তিযুদ্ধের বই রয়েছে। পূর্ব পাশে 'স্বাধীনতার কথা' নামের দুইটি গ্যালারি । একটি উঁচুতে। অন্যটি একটু নিচুতে। এতে ভাষা আন্দোলন থেকে একাত্তরের মুক্তি সংগ্রামের নানা সময়কার ছবি সম্বলিত চিহ্ন রয়েছে। ২০০০ সালের ২১ নভেম্বর সশস্ত্র বাহিনী দিবস উপলক্ষে তৎকালীন জিওসির মেজর জেনারেল আলাউদ্দিন এম এ ওয়াদুদ বীর প্রতীক এর উদ্বোধন করেন। ওই গ্যালরির নিচের সারিতে রয়েছে ১৯৭০ সালের ১৭ জানুয়ারি ছয় দফা নিয়ে জামায়াতের নেতা মওদুদীর সমর্থনপুষ্ট লোকদের সঙ্গে পল্টন ময়দানে গর্ভণর হাউস বঙ্গভবন এলাকায় সংঘর্ষের চিহ্ন। এ ছাড়া করাচি বিমানবন্দরে কারাবন্দী বঙ্গবন্ধুকে ঘিরে দাঁড়িয়ে থাকা দুই সৈনিকের ছবি। সেখানেও বঙ্গবন্ধু তাঁর স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে বসে আছেন বীরের বেশে।

সমর জাদুঘরের দায়িত্বপ্রাপ্ত তৎকালীন কর্মকর্তা গাজী আনোয়ার হোসেন বলেন, যে কেউ চাইলেই এখানে প্রবেশ করতে পারেন না। কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিয়ে প্রবেশ করতে হয়। প্রথমে স্টেশন সদর দপ্তরের কমান্ডারের কাছে লিখিত আবেদন করতে হয়। এরপর ওই আবেদন ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডে যাবে। সেখান থেকে জিওসির কাছে যাবে। এরপর অনুমোদন হয়ে সেটি জাদুঘরে আসবে। ইতিহাস অনুসন্ধিৎসুরা এখানে সমর জাদুঘর দেখতে আসেন। এটি দেখতে কোন ধরনের টাকা লাগে না।

সাবধানতা: শহীদ স্মৃতিসৌধের ভেতরে যানবাহন ও ছবি তোলা নিষেধ। স্মৃতিসৌধের পাঠাগার ও সমর জাদুঘর খোলার সময় সূচি সাপ্তাহিক ও অন্যান্য সরকারি ছুটির দিন ছাড়া সকাল সাতটা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত।

কিন্তু ‘যাদের রক্তে মুক্ত স্বদেশ’ কমপ্লেক্স এখন আর আগের মতো নেই। বাইরে থেকে যতটুকু দেখা গেছে, এটি অনেকটা অযত্ন, অবহেলায় আছে। কুমিল্লাবাসীর দাবি এটিকে আরও সুন্দর করে দশনার্থীদের জন্য প্রস্তুত করে দিলে সবাই ঘুরে দেখতে পারবে।

গাজীউল হক সোহাগ: সম্পাদক, আমার শহর।

বিষয়:

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

সম্পর্কিত