সাধারণ সম্পাদকের বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য

কুমিল্লা ডায়াবেটিক সমিতিতে অনিয়মের ছড়াছড়ি

গাজীউল হক সোহাগ
Thumbnail image

কুমিল্লা ডায়াবেটিক সমিতিতে অনিয়মের ছড়াছড়ি। গত এক দশকে জমি কেনা, সংস্কার কাজ না করে নগদ ক্যাশ টাকা উত্তোলন, মৌখিক নির্দেশে সাবেক সংসদ সদস্য আ ক ম বাহাউদ্দিনের নাইস পাওয়ার আইটি সলিউশন কোম্পানীকে বিল ভাউচার ছাড়া ক্যাশ টাকা প্রদান, ফার্মেসির হিসেবে গড়মিল, আর্থিক খাতে অব্যবস্থাপনা, সিটি করপোরেশনের কর না দেওয়া, ডায়াবেটিক হাসপাতালের পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র না থাকার অনিয়ম রয়েছে। কুমিল্লা ডায়াবেটিক সমিতির ৩৭তম বার্ষিক সাধারণ সভায় বর্তমান সাধারণ সম্পাদক মো. মোস্তাক মিয়ার বার্ষিক প্রতিবেদনে ওই অনিয়ম তুলে ধরা হয়। গত শুক্রবার বিকেল চারটায় ওই বার্ষিক সভা হয় হাসপাতালের ডা. যোবায়দা হান্নান মিলনায়তনে। ওই সভায় অডিট আপত্তি ও অনিয়মের জন্য তদন্ত কমিটি গঠন করে টাকা আদায় করার ওপর জোর দেন সাধারণ সদস্যরা। একই সঙ্গে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ারও আবেদন জানান।

বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয় বিগতকিমিটি অন্তঃবিভাগের নিচ তলায় সমিতির অর্থে একটি ফার্মেসি আছে। ওষুধ ক্রয়ে ছিল অস্বচ্ছতা। ২০০৪-২০২৫ সালের অডিট প্রতিবেদনে ১০লাখ ৪১ হাজার ৯৩৬টাকার আপত্তি প্রদান করা হয়।

এদিকে কুমিল্লা ডায়াবেটিক সমিতি গত পাঁচ বছর যাবত কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের কর বকেয়া বাবদ রেখে গেছেন ২৯ লাখ ৬৩ হাজার ৬২৫ টাকা।

জানতে চাইলে কুমিল্লা ডায়াবেটিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. মোস্তাক মিয়া বলেন, এমপি বাহার ( সাবেক সংসদ সদস্য আ ক ম বাাউদ্দিন) ও তাঁর অনুসারীরা কুমিল্লা ডায়াবেটিক হাসপাতালকে শেষ করে দিয়েছে। তাঁরা পদে পদে অনিয়ম করেছে। আমরা এ নিয়ে অডিট আপত্তি পেয়েছি।

সমিতির সহসভাপতি আইনজীবী মো. কাইমুল হক রিংকু বলেন, এই হাসপাতালটি অব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে চলছিল। আমরা বিশেষ প্রেক্ষাপটে এই সমিতি ও হাসপাতালের দায়িত্ব নিই। ইতিমধ্যে বিভিন্ন খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনি। যেসব বিষয়ে অভিযোগ পাওয়া গেছে, অডিট আপত্তি এসেছে আমরা সেইগুলোর আইনগত দিক দেখছি।

জমি কিনে সাত বছর পর ৮২ লাখ টাকা কমে বিক্রি!

কুমিল্লা ডায়াবেটিক সমিতি নার্সিং ইনস্টিটিউট করার জন্য নগরের বাগিচাগাঁও এলাকায় আনন্দ কুটির বাড়ি কেনে। ২০১৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর ১১ দশমিক ৪৬ শতক জমিটি কেনা হয়। ২০১৬ সালের ২৬ জুলাই পর্যন্ত ২৫ ধাপে ৬ কোটি ১৫ লাখ ২৩ হাজার ৮৫০ টাকা দিয়ে দলিল করা হয়। কিন্তু ওই জমি ২০২১ সালে ৫ কোটি ৩৩ লাখ ২০ হাজার টাকায় বিক্রি করে দেওয়া হয়। ৮২ লাখ তিন হাজার ৮৫০ টাকা কমে আনন্দ কুটির বিক্রি করে দেয় তৎকালীন পরিচালনা পর্ষদ। এতে করে সমিতির অপূরণীয় ক্ষতি হয়। বর্তমান প্রশাসনের ভাষ্য, কুমিল্লা শহরে জায়গার দাম প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। নগরের প্রাণকেন্দ্রের ঐতিহ্যবাহী আনন্দ কুটির। এটার দাম আরও বেশি হওয়ার কথা।

আয়কর বাবদ বকেয়া ২ কোটি ২২ লাখ

একই সঙ্গে কুমিল্লা ডায়াবেটিক সমিতি আয়কর বাবদ বকেয়া টাকার পরিমাণ প্রায় ২ কোটি ২২ লাখ টাকা। বর্তমানে আয়কর ট্রাইবুনালে এ নিয়ে মামলা করা হয়েছে।

নাইস পাওয়ার আইটি সলিউশন হাতিয়ে নেয় ৩৮ লাখ টাকা

কুমিল্লা ডায়াবেটিক সমিতি ও হাসপাতাল 'ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম অটোমেশন সফটওয়্যার' নামে একটি প্রকল্প গ্রহণ করে বিগত নির্বাহী কমিটি। স্বয়ংক্রিয় ডিজিটাল এই যান্ত্রিক পদ্ধতি ১৫টি মডিউলসের মাধ্যমে ২৫ লাখ টাকার বিনিময়ে নাইস পাওয়ার আইটি সলিউশনকে কার্যাদেশ প্রদান করা হয়। কিন্তু ওই কোম্পানী ৩৮ লাখ ৩৮ হাজার ৫৪২ টাকা সাধারণ সম্পাদক মো. কোরাইশি ও কোষাধ্যক্ষ প্রবাল শেখর মজুমদার মিঠুর মৌখিক নির্দেশে বিল, ভাউচার ছাড়া বিভিন্ন তারিখে হিসাব থেকে ক্যাশের মাধ্যমে প্রদান করে। কিন্তু সফটওয়্যারের কাজ অসম্পূর্ণ থেকে যায়। সফটওয়্যার কোম্পানির স্বত্বাধিকারী কুমিল্লা ডায়াবেটিক সমিতির সাবেক পৃষ্ঠপোষক সাবেক সংসদ সদস্য আ কম বাহাউদ্দিন বাহার। জানতে চাইলে সমিতির বর্তমান সাধারণ সম্পাদক মো. মোস্তাক মিয়া বলেন, আইটি বিশেষজ্ঞ এনে আমরা ৩০ শতাংশ কাজ পেয়েছি। এ ব্যাপারে সাবেক সংসদ সদস্য বাহাউদ্দিনের সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাঁর বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

সংস্কার কাজের নামে ৩৪ কোটি ৬৩ লাখ ৯৫৬ টাকার বিল ভাউচার মেলেনি

কুমিল্লা ডায়াবেটিক সমিতি থেকে ২০২৪ সালের ২৩ জুন সংস্কার কাজের নামে ৩৪ কোটি ৬৩ লাখ ৯৫৬ টাকার খরচ দেখানো হয়। ২০২৩-২০২৪ সালের অডিট প্রতিবেদনে ওই টাকা ব্যয়ের বিল ভাউচার মেলেনি। এ নিয়ে অডিট আপত্তি জানায়।

ইমারত সংস্কারের নামে ভাউচার ছাড়াই প্রায় ৪২ কোটি টাকা ক্যাশ উত্তোলন

২০২৪ সালের ২৮ এপ্রিল থেকে ৮ জুলাই পর্যন্ত আট ধাপে ২১ লাখ ৭০ হাজার ৫০০ টাকা ও ২০২৪ সালের ১৫ জুন থেকে ৬ জুলাই পর্যন্ত সাত ধাপে ( সাতটি তারিখে) ২০ লাখ ২৮ হাজার ৪০০ টাকা হিসাব বিভাগ থেকে ক্যাশের মাধ্যমে উত্তোলন করা হয়। এই খাতে ৪১ লাখ ৯৮ হাজার ৯০০ টাকা ব্যয়ের উপযুক্ত বা যথাযথ বিল ভাউচার পাওয়া যায় নাই। এ নিয়ে অডিট আপত্তি জানায়। সমিতির সাধারণ সদস্যরা জানিয়েছেন সব অনিয়ম নিয়ে তদন্ত হোক।

বিষয়:

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

সম্পর্কিত