রাস্তাঘাটের বেহাল দশা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ প্রশাসনিক অবকাঠামোগত সমস্যা, স্বাস্থ্য সেবার বেহাল দশা, নেই ফায়ার সার্ভিস স্টেশন, নেই পৌরসভার ময়লার ভাগাড়, পৌরপার্ক এবং নেই পৌর কবরস্থান
নাঙ্গলকোট প্রতিনিধি

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কুমিল্লা-১০ (নাঙ্গলকোট ও লালমাই) সংসদীয় আসনে বিএনপি সমর্থিত সংসদ সদস্য প্রার্থী মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়া বিপুল ভোটে জায়লাভ করেন। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সংসদ সদস্য হিসেবে তিনি শপথও করেছেন। সংসদ সদস্য হিসেবে তার শপথ গ্রহণের মধ্যে দিয়ে বিশেষ করে বিগত বছরগুলোতে উন্নয়ন বঞ্চিত বিধ্বস্ত নাঙ্গলকোটের উন্নয়নে তাকে বেশি নজর দিতে হবে। পাশাপাশি লালমাই এলাকারও বিভিন্ন সমস্যা চিহিৃত করে লালমাইয়ের উন্নয়নেও তাকে ভূমিকা রাখতে হবে। সংসদ সদস্য মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়াকে দুই উপজেলার উন্নয়নে ব্যাপক চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে হবে।
ইতোমধ্যে মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়া শপথ গ্রহণের একদিন পূর্বে নাঙ্গলকোট পৌরসভার বটতলায় একটি অভিযোগ বাক্স স্থাপন করেন। তিনি ‘বিএনপির কোনো নেতা-কর্মী চাঁদাবাজি অথবা অনৈতিক কার্যকলাপে জড়িত থাকলে দয়া করে নির্দ্বিধায় লিখিত অভিযোগ জমা দিন’ লেখা সম্বলিত অভিযোগ বাক্স স্থাপন করে রীতিমতো প্রশংসায় ভাসছেন। বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছেন। সবাই ফেসবুকে এমন পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়ে ইতিবাচক মন্তব্য করেন। কেউ-কেউ লিখেছেন, এটি বাস্তবায়ন হলে এ আসনে সবক্ষেত্রে দুর্নীতি, অনিয়ম, হয়রানি এবং সিন্ডিকেট বাণিজ্য বন্ধ হবে । গত ২৫ ফেব্রুয়ারি তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে প্রথম নাঙ্গলকোটে আসেন। ওইদিন উপজেলার গোহারুয়ার পরিত্যক্ত ২০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম চালু করেন এবং হাসপাতালটি পরিদর্শন করেন। তিনি ওই সময় হাসপাতালটি পরিদর্শনে স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে নিয়ে আসার ঘোষণা প্রদান করেন। এছাড়া হাসপাতালটির বাউন্ডারি ওয়াল নির্মাণসহ হাসপাতালটির সংস্কারে বড় ধরনের বরাদ্দ এনে হাসপাতালটিতে পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যসেবা চালুর বিষয়েও এলাকাবাসীকে আশ্বাস প্রদান করেন।
এলাকার বিভিন্ন পর্যায়ের লোকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, নাঙ্গলকোটে সর্বত্র সমস্যার পাহাড় জমে আছে। রাস্তাঘাট, স্বাস্থ্যসেবা, ফায়ার সার্ভিক স্টেশন না থাকা, প্রশাসনিক অবকাঠামোগত সমস্যাসহ পৌরসভার বিভিন্ন সমস্যায় এলাকাবাসীকে নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত রয়েছে। বিগত ৫-৬বছর ধরে সংস্কারের অভাবে নাঙ্গলকোটের সড়ক ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। উপজেলার প্রায় দেড়শ কিলোমিটার পাকা সড়কে ছোট-বড় অসংখ্য খানা-খন্দকের সৃষ্টি হয়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়েছে। উপজেলা সদরের সাথে যুক্ত প্রধান-প্রধান সড়কসহ গ্রামীণ অধিকাংশ বিধ্বস্ত সড়কগুলো দিয়ে যাত্রীবাহী ও মালবাহী ছোট-বড় যানবাহনকে নিয়মিত যাতায়াত করতে গিয়ে নাকাল হতে হচ্ছে। বিশেষ করে বর্ষাকালে সড়কগুলো দিয়ে যাতায়াতে সবচাইতে ভোগান্তি পোহাতে হয়। যদিও অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে কিছু উল্লেখযোগ্য সড়কের সংস্কার কাজ করে জনভোগান্তি কিছুটা লাঘব করার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু সড়কগুলো নির্মাণে নিম্নমানের কাজের কারণে অধিকাংশ সড়ক সংস্কারের এক বছরের মধ্যে সড়কগুলোতে ছোট-বড় খানা-খন্দকের সৃষ্টি হয়ে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
এদিকে উপজেলার গ্রামীণ প্রায় ১০০ কিলোমিটার কাঁচা সড়ক রয়েছে। বর্ষাকালে সড়কগুলোর ছোট-বড় খানা-খন্দকসহ কাদা-মাটি মাড়িয়ে যাতায়াত করতে গিয়ে এলাকাবাসীকে নাকাল হতে হয়। দীর্ঘদিনেও নতুন সড়কগুলো পাকাকরণের কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি।
এলাকার স্বাস্থ্য সেবারও বেহাল দশা বিরাজ করছে। ৫০ শয্যা বিশিষ্ট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ভবনটি জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। ভবনটির মূল পিলারসহ বিভিন্নস্থানে একাধিক ফাটল সৃষ্টি হয়েছে। স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর ভবনটিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন। কিন্তু ভবন সংকটের কারণে গত প্রায় ২বছর থেকে ঝুঁকিপূর্ণভাবে ভবনটিতে স্বাস্থ্য সেবা পরিচালিত হচ্ছে। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটিতে ডাক্তার ও কর্মচারী সংকটে এলাকাবাসী পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছে না। তৃণমূলপর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে উপজেলার জোড্ডা পশ্চিম ইউনিয়নের গোহারুয়ায় প্রায় ৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০০৬ সালে ২০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল নির্মাণ করা হয়। কিন্তু বিগত সরকার বিভিন্ন সময়ে হাসপাতালটিতে স্বাস্থ্যসেবা চালুর উদ্যোগ নিলেও পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্য সেবা চালু করা সম্ভব হয়নি। যার ফলে গত ১৭ বছরে হাসপাতালের মূল ভবন এবং আবাসিকভবনসহ অন্যান্য ভবনগুলো পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থেকে দরজা-জানালাসহ অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে। ভবনটিতে বাউন্ডারি ওয়াল না থাকায় মাদকসেবীদের আড্ডাখানায় পরিণত হয়। এছাড়া হাসপাতালটিতে ছিন্নমূল মানুষের বসবাসসহ মাটি কাটা ট্রাক্টর রাখা হয়েছে। হাসপাতালটি চালু করা সম্ভব হলে নাঙ্গলকোট, মনোহরগঞ্জ এবং পার্শ্ববর্তী নোয়াখালী এলাকার প্রায় ২ লাখ লোকের স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। এদিকে গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবায় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র, উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্র এবং কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোর অবকাঠামোগত সমস্যাসহ ডাক্তার সংকটে স্বাস্থ্যসেবার বেহাল দশা বিরাজ করছে।
উপজেলা প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ ৪২ বছরেও একটি ফায়ার সার্ভিস স্টেশন স্থাপন করা সম্ভব হয়নি। যার ফলে প্রতিবছর নাঙ্গলকোট পৌরবাজারসহ ছোট-বড় বাজার এবং গ্রামাঞ্চলের বিভিন্ন গ্রামের বাড়িতে অগ্নিকাণ্ডে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং বাড়িঘর পুড়ে প্রতিবছর কোটি-কোটি টাকার সম্পদ পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে। এতে করে ব্যবসায়ীসহ এলাকাবাসীকে নিঃস্ব হতে হচ্ছে।
উপজেলার বিভিন্ন স্কুল, কলেজ এবং মাদ্রাসাগুলোতে অবকাঠামোগত সমস্যায় শিক্ষার্থীদের লেখাপাড়া ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে জরাজীর্ণ ভবন, কক্ষ সংকটে লেখাপড়া ব্যাহত হচ্ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে কম্পিউটার ল্যাব এবং বিজ্ঞানাগারের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি না থাকায় হাতে-কলমে শিক্ষা ছাড়া শিক্ষার্থীদের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করতে হচ্ছে।
বর্তমানে শিক্ষার্থীরা মোবাইল আসক্তি, মাদকে জড়িত থাকার কারণে তারা বইমুখী হচ্ছে না। এক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের মোবাইল আসক্তি এবং মাদক থেকে মুক্ত করে তাদেরকে বইমুখী করতে হবে। এক্ষেত্রে অভিভাবকদের সবচাইতে বেশি সচেতনত হতে হবে। না হয় ২০২৫ সালের মতোন ২০২৬ সালের এসএসসি এবং এইচএসসি পরীক্ষায় শিক্ষার্থীদের ব্যাপক ফলাফল বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে হবে।
উপজেলাটি সীমান্তবর্তী হওয়ায় পার্শ¦বর্তী দেশগুলো থেকে বিভিন্ন রুট দিয়ে সহজে মাদক প্রবেশ করছে। যার ফলে বিভিন্ন এলাকায় মাদকে ভাসতে দেখা যায়। এতে করে এলাকার যুবসমাজ এবং শিক্ষার্থীরা মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে। মাদকের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থানের মাধ্যমে এলাকার যুবসমাজ এবং শিক্ষার্থীদের মাদকাসক্ত থেকে মুক্ত করার উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। এছাড়া গত কয়েক বছরে কিশোর গ্যাংয়ের ব্যাপক আধিপত্যে এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে। এই কিশোর গ্যাংয়ের লাগাম টেনে ধরার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে হবে।
উপজেলার প্রশাসনিক ভবন সংকটের কারণে পার্শ্ববর্তী একটি ঝূঁকিপূর্ণ ভবনে বিভিন্ন দপ্তরের অফিস পরিচালিত হচ্ছে। উপজেলা প্রশাসনের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ হিসাবরক্ষণ অফিসটি ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের নিচতলায় রয়েছে। হিসাবরক্ষণ অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ঝুঁকিপূর্ণভাবে অফিসিয়াল কাজ-কর্ম করতে হচ্ছে। এছাড়া ভবনটিতে সমাজসেবা, সমবায়, নির্বাচন অফিসও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় পরিচালিত হচ্ছে।
উপজেলা সাব রেজিস্ট্রি অফিসের নিজস্ব ভবন না থাকায় উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স ভবন ভাড়া নিয়ে সাব রেজিস্ট্রি অফিসের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
উপজেলা পাবলিক লাইব্রেরি নামমাত্র থাকলেও পাবলিক লাইবে্িররর নিজস্ব ভবন না থাকায় এর কোনো কার্যক্রম নেই। এতে করে এলাকার শিক্ষার্থী, যুবসমাজসহ বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষজন সুকুমার ভিত্তির চর্চা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
১৯৮৩ সালে নতুন উপজেলা প্রতিষ্ঠার পর উপজেলার কর্মকর্তাদের জন্য আবাসিক ভবন নির্মাণ করা হয়। কিন্তু দীর্ঘদিনে ভবনগুলো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো বিভিন্ন সময়ে সংস্কার করে ব্যবহারের উপযোগী করা হয়। বর্তমানে অধিকাংশ ভবন ব্যবহারের অনুপযোগী অবস্থায় রয়েছে। তারপরও ভবনগুলোতে ঝুঁকিপূর্ণ ও স্যাঁতস্যাঁতে পরিবেশে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মানবেতর জীবন-যাপন করতে হচ্ছে। পাশাপাশি কর্মচারীদের জন্য নির্মিত অন্য একটি ভবনও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ ভবনটিতে কর্মচারীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করেন।
২০০৬ সালে উপজেলা কমিউনিটি সেন্টার নির্মাণ করা হলেও ভবনটি নিয়মিত ব্যবহার না করায় বর্তমানে ভবনটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। মাদকসেবী এবং চোরের দল ভবনের দরজা, জানালা, বাথরুম এবং রেলিং ভেঙে নিয়ে গেছে। বিদ্যুৎ সংযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছে। বৃষ্টি হলে ভবনটিতে পানি পড়ে। ২০২০ সালে করোনাকালীন করোনা রোগীদের স্বাস্থ্যসেবার জন্যও ভবনটিকে ব্যবহারের উপযোগী করা হয়। শেষ দিকে ভবনের নিচতলার বিশাল অডিটরিয়ামে ব্যাটমিন্টন খেলার মাঠ করা হয়।
নাঙ্গলকোট পৌরসভা নামেই প্রথম শ্রেণির পৌরসভা। বিশাল কর্মচারীর বহর নিয়োগ দিয়ে পৌরসভায় মাথাভারী প্রশাসন তৈরি করা হয়েছে। কাজ নেই। অথচ বিভিন্ন পদে অপ্রয়োজনীয় কর্মচারী নিয়োগ দিয়ে তাদের বসিয়ে বসিয়ে মোটা অঙ্কের টাকার বেতন দেওয়া হচ্ছে। অধিকাংশ কর্মচারীর ২ বছরের বেতন বকেয়া রয়েছে। গত ৫-৬বছর ধরে পৌর বাজারের ২২টি খাতে ইজারার নামে সিন্ডিকেট করে ইজারার অধিকমূল্য দেখানো হয়। পরে কেউ ইজারা না নেওয়ার কথা বলে খাস কালেকশন দেখানো হয়। এতে করে বাজার ইজারার ২২টি খাত থেকে কয়েক কোটি টাকা উত্তোলন করা হয়। পরে উত্তোলনকৃত টাকা থেকে নামমাত্র টাকা পৌরসভার ব্যাংক হিসাবে জামা দিয়ে অবশিষ্ট কয়েক কোটি টাকা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে আত্মসাতের সুস্পষ্ট অভিযোগ রয়েছে।
পৌরসভায় টেকসই কোনো উন্নয়ন হয়নি। বিভিন্নস্থানে ঢালাই রাস্তা নির্মাণ করা হলেও টেকসই উন্নয়নের অভাবে রাস্তাগুলো ভেঙে পড়ে আছে। সড়কবাতির নামে লাখ-লাখ টাকা আত্মসাৎ করার অভিযোগ রয়েছে। পৌরসভার অধিকাংশ এলাকায় সড়কবাতি নেই। বিভিন্নস্থানে সড়ক বাতির বেস ঢালাই থাকলেও সড়ক বাতি নেই। যার ফলে পৌরসভার গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে রাতের অন্ধকারে ভূতুড়ে পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
পৌরসভার নিজস্ব জমি না থাকায় দীর্ঘদিনেও পৌরসভার ময়লার ভাগাড়, পৌরপার্ক, পৌরকবরস্থান নির্মাণ করা সম্ভব হয়নি। বর্তমানে বাইপাস সড়ক ও ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথের গোত্রশাল এলাকায় সড়কের পাশে পৌরসভার ময়লা ফেলায় পথচারী, রেলের যাত্রী এবং ছোট-বড় যানবাহনে চলাচালকারী যাত্রীদের দুর্গন্ধময় পরিবেশে সড়কটি পার হতে হয়। এছাড়া পার্শ্ববর্তী একটি বেসরকারি হাসপাতালসহ বাসাবাড়ির লোকজনকে ময়লার দুর্গন্ধে অস্বত্বিকর অবস্থায় থাকতে হচ্ছে।
পৌরসভার বিশুদ্ধ পানি সরবরাহেরও ব্যবস্থা নেই। পৌরবাসীকে সকাল-বিকেল নির্মল পরিবেশে হাঁটাচলা করার পরিবেশ নেই। পৌরবাসীর কর বৃদ্ধি পেলেও তাদের সেবা নেই। রেলপথ ঘেষা সরকারি গোত্রশাল দীঘিটিকে উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় এনে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার মাধ্যমে সৌন্দর্য বর্ধনের উদ্যোগও চোখে পড়ছে না।
পৌর বাজারের সর্বত্র ব্যাটারি চালিত অটোরিকশা, যত্রতত্র হকারদের দোকানপাট বসার কারণে পৌরবাজারে নিত্তদিন যানজট লেগেই থাকে। পৌরসভায় নির্ধারিত বাসস্ট্যান্ড এবং সিএনজিচালিত অটোরিকশা স্ট্যান্ড নেই। যার ফলে সড়কের পাশে বাস এবং সিএনজি অটোরিকশা থামিয়ে যাত্রী উঠানামা করায় পৌরবাজারে সবসময় যানজট লেগেই থাকে। বিশেষ করে পৌরবাজারে প্রবেশ মুখ বটতলা এলাকায় সড়কের উপর কুমিল্লাগামী সুপার সার্ভিস পরিবহনের বাস, লাকসাম, বাঙ্গড্ডা এবং মাহিনীগামী সিএনজিচালিত অটোরিকশার স্ট্যান্ড থাকায় বটতলায় এলাকায় সবসময় যানজট লেগেই থাকে। এছাড়া গরু বাজার এলাকায় উপজেলার ঢালুয়া, দৌলখাঁড়, জোড্ডা, আদ্রা এবং বাইয়ারাগামী সিএনজিচালিত অটোরিকশা স্ট্যান্ড রয়েছে। এখানে যাত্রী উঠানামা করায় স্থানটিতে সবসময় যানজট লেগেই থাকে। পৌর এলাকার বিভিন্নস্থানে ড্রেনেজ ব্যবস্থার বেহাল দশা বিরাজ করছে। পৌরসভার বিভিন্ন এলাকায় ড্রেনেজ ব্যবস্থা নির্মাণ কাজ শুরু হলেও তা শেষ করা হয়নি। যার ফলে ড্রেনেজ ব্যবস্থা একেবারেই অকার্যকর অবস্থায় রয়েছে। এছাড়া ড্রেনেজ ব্যবস্থা নির্মাণ করা হলেও পানি সরানোর মুখের ব্যবস্থা রাখা হয়নি।
নাঙ্গলকোট পৌরসভার হরিপুর গ্রামের মফিজুর রহমান বলেন, নাঙ্গলকোট পৌরসভার রাস্তাঘাট, ময়লার ভাগাড়, পৌর পার্ক, পৌর কবরস্থান নির্মাণ এবং পৌরবাজারের যানজটের উন্নয়নে সম্বন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ মাহিনী-নাঙ্গলকোট সড়কে যাতায়াতকারী রবিউল হক বলেন, সড়কটির মাহিনী থেকে জোড়পুকুরিয়া পর্যন্ত অসংখ্য খানা-খন্দক দিয়ে যাতায়াতে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়।
কুমিল্লা-১০ (নাঙ্গলকোট ও লালমাই) সংসদীয় আসনের সংসদ সদস্য মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়া গোহারুয়ায় পরিত্যক্ত ২০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা উদ্বোধনকালে বলেছিলেন, নাঙ্গলকোটের উন্নয়নে মাস্টারপ্ল্যান করে পর্যায়ক্রমে সকল উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাস্তবায়ন করা হবে।

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কুমিল্লা-১০ (নাঙ্গলকোট ও লালমাই) সংসদীয় আসনে বিএনপি সমর্থিত সংসদ সদস্য প্রার্থী মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়া বিপুল ভোটে জায়লাভ করেন। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সংসদ সদস্য হিসেবে তিনি শপথও করেছেন। সংসদ সদস্য হিসেবে তার শপথ গ্রহণের মধ্যে দিয়ে বিশেষ করে বিগত বছরগুলোতে উন্নয়ন বঞ্চিত বিধ্বস্ত নাঙ্গলকোটের উন্নয়নে তাকে বেশি নজর দিতে হবে। পাশাপাশি লালমাই এলাকারও বিভিন্ন সমস্যা চিহিৃত করে লালমাইয়ের উন্নয়নেও তাকে ভূমিকা রাখতে হবে। সংসদ সদস্য মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়াকে দুই উপজেলার উন্নয়নে ব্যাপক চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে হবে।
ইতোমধ্যে মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়া শপথ গ্রহণের একদিন পূর্বে নাঙ্গলকোট পৌরসভার বটতলায় একটি অভিযোগ বাক্স স্থাপন করেন। তিনি ‘বিএনপির কোনো নেতা-কর্মী চাঁদাবাজি অথবা অনৈতিক কার্যকলাপে জড়িত থাকলে দয়া করে নির্দ্বিধায় লিখিত অভিযোগ জমা দিন’ লেখা সম্বলিত অভিযোগ বাক্স স্থাপন করে রীতিমতো প্রশংসায় ভাসছেন। বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছেন। সবাই ফেসবুকে এমন পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়ে ইতিবাচক মন্তব্য করেন। কেউ-কেউ লিখেছেন, এটি বাস্তবায়ন হলে এ আসনে সবক্ষেত্রে দুর্নীতি, অনিয়ম, হয়রানি এবং সিন্ডিকেট বাণিজ্য বন্ধ হবে । গত ২৫ ফেব্রুয়ারি তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে প্রথম নাঙ্গলকোটে আসেন। ওইদিন উপজেলার গোহারুয়ার পরিত্যক্ত ২০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম চালু করেন এবং হাসপাতালটি পরিদর্শন করেন। তিনি ওই সময় হাসপাতালটি পরিদর্শনে স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে নিয়ে আসার ঘোষণা প্রদান করেন। এছাড়া হাসপাতালটির বাউন্ডারি ওয়াল নির্মাণসহ হাসপাতালটির সংস্কারে বড় ধরনের বরাদ্দ এনে হাসপাতালটিতে পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যসেবা চালুর বিষয়েও এলাকাবাসীকে আশ্বাস প্রদান করেন।
এলাকার বিভিন্ন পর্যায়ের লোকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, নাঙ্গলকোটে সর্বত্র সমস্যার পাহাড় জমে আছে। রাস্তাঘাট, স্বাস্থ্যসেবা, ফায়ার সার্ভিক স্টেশন না থাকা, প্রশাসনিক অবকাঠামোগত সমস্যাসহ পৌরসভার বিভিন্ন সমস্যায় এলাকাবাসীকে নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত রয়েছে। বিগত ৫-৬বছর ধরে সংস্কারের অভাবে নাঙ্গলকোটের সড়ক ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। উপজেলার প্রায় দেড়শ কিলোমিটার পাকা সড়কে ছোট-বড় অসংখ্য খানা-খন্দকের সৃষ্টি হয়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়েছে। উপজেলা সদরের সাথে যুক্ত প্রধান-প্রধান সড়কসহ গ্রামীণ অধিকাংশ বিধ্বস্ত সড়কগুলো দিয়ে যাত্রীবাহী ও মালবাহী ছোট-বড় যানবাহনকে নিয়মিত যাতায়াত করতে গিয়ে নাকাল হতে হচ্ছে। বিশেষ করে বর্ষাকালে সড়কগুলো দিয়ে যাতায়াতে সবচাইতে ভোগান্তি পোহাতে হয়। যদিও অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে কিছু উল্লেখযোগ্য সড়কের সংস্কার কাজ করে জনভোগান্তি কিছুটা লাঘব করার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু সড়কগুলো নির্মাণে নিম্নমানের কাজের কারণে অধিকাংশ সড়ক সংস্কারের এক বছরের মধ্যে সড়কগুলোতে ছোট-বড় খানা-খন্দকের সৃষ্টি হয়ে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
এদিকে উপজেলার গ্রামীণ প্রায় ১০০ কিলোমিটার কাঁচা সড়ক রয়েছে। বর্ষাকালে সড়কগুলোর ছোট-বড় খানা-খন্দকসহ কাদা-মাটি মাড়িয়ে যাতায়াত করতে গিয়ে এলাকাবাসীকে নাকাল হতে হয়। দীর্ঘদিনেও নতুন সড়কগুলো পাকাকরণের কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি।
এলাকার স্বাস্থ্য সেবারও বেহাল দশা বিরাজ করছে। ৫০ শয্যা বিশিষ্ট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ভবনটি জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। ভবনটির মূল পিলারসহ বিভিন্নস্থানে একাধিক ফাটল সৃষ্টি হয়েছে। স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর ভবনটিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন। কিন্তু ভবন সংকটের কারণে গত প্রায় ২বছর থেকে ঝুঁকিপূর্ণভাবে ভবনটিতে স্বাস্থ্য সেবা পরিচালিত হচ্ছে। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটিতে ডাক্তার ও কর্মচারী সংকটে এলাকাবাসী পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছে না। তৃণমূলপর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে উপজেলার জোড্ডা পশ্চিম ইউনিয়নের গোহারুয়ায় প্রায় ৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০০৬ সালে ২০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল নির্মাণ করা হয়। কিন্তু বিগত সরকার বিভিন্ন সময়ে হাসপাতালটিতে স্বাস্থ্যসেবা চালুর উদ্যোগ নিলেও পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্য সেবা চালু করা সম্ভব হয়নি। যার ফলে গত ১৭ বছরে হাসপাতালের মূল ভবন এবং আবাসিকভবনসহ অন্যান্য ভবনগুলো পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থেকে দরজা-জানালাসহ অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে। ভবনটিতে বাউন্ডারি ওয়াল না থাকায় মাদকসেবীদের আড্ডাখানায় পরিণত হয়। এছাড়া হাসপাতালটিতে ছিন্নমূল মানুষের বসবাসসহ মাটি কাটা ট্রাক্টর রাখা হয়েছে। হাসপাতালটি চালু করা সম্ভব হলে নাঙ্গলকোট, মনোহরগঞ্জ এবং পার্শ্ববর্তী নোয়াখালী এলাকার প্রায় ২ লাখ লোকের স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। এদিকে গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবায় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র, উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্র এবং কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোর অবকাঠামোগত সমস্যাসহ ডাক্তার সংকটে স্বাস্থ্যসেবার বেহাল দশা বিরাজ করছে।
উপজেলা প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ ৪২ বছরেও একটি ফায়ার সার্ভিস স্টেশন স্থাপন করা সম্ভব হয়নি। যার ফলে প্রতিবছর নাঙ্গলকোট পৌরবাজারসহ ছোট-বড় বাজার এবং গ্রামাঞ্চলের বিভিন্ন গ্রামের বাড়িতে অগ্নিকাণ্ডে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং বাড়িঘর পুড়ে প্রতিবছর কোটি-কোটি টাকার সম্পদ পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে। এতে করে ব্যবসায়ীসহ এলাকাবাসীকে নিঃস্ব হতে হচ্ছে।
উপজেলার বিভিন্ন স্কুল, কলেজ এবং মাদ্রাসাগুলোতে অবকাঠামোগত সমস্যায় শিক্ষার্থীদের লেখাপাড়া ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে জরাজীর্ণ ভবন, কক্ষ সংকটে লেখাপড়া ব্যাহত হচ্ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে কম্পিউটার ল্যাব এবং বিজ্ঞানাগারের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি না থাকায় হাতে-কলমে শিক্ষা ছাড়া শিক্ষার্থীদের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করতে হচ্ছে।
বর্তমানে শিক্ষার্থীরা মোবাইল আসক্তি, মাদকে জড়িত থাকার কারণে তারা বইমুখী হচ্ছে না। এক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের মোবাইল আসক্তি এবং মাদক থেকে মুক্ত করে তাদেরকে বইমুখী করতে হবে। এক্ষেত্রে অভিভাবকদের সবচাইতে বেশি সচেতনত হতে হবে। না হয় ২০২৫ সালের মতোন ২০২৬ সালের এসএসসি এবং এইচএসসি পরীক্ষায় শিক্ষার্থীদের ব্যাপক ফলাফল বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে হবে।
উপজেলাটি সীমান্তবর্তী হওয়ায় পার্শ¦বর্তী দেশগুলো থেকে বিভিন্ন রুট দিয়ে সহজে মাদক প্রবেশ করছে। যার ফলে বিভিন্ন এলাকায় মাদকে ভাসতে দেখা যায়। এতে করে এলাকার যুবসমাজ এবং শিক্ষার্থীরা মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে। মাদকের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থানের মাধ্যমে এলাকার যুবসমাজ এবং শিক্ষার্থীদের মাদকাসক্ত থেকে মুক্ত করার উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। এছাড়া গত কয়েক বছরে কিশোর গ্যাংয়ের ব্যাপক আধিপত্যে এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে। এই কিশোর গ্যাংয়ের লাগাম টেনে ধরার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে হবে।
উপজেলার প্রশাসনিক ভবন সংকটের কারণে পার্শ্ববর্তী একটি ঝূঁকিপূর্ণ ভবনে বিভিন্ন দপ্তরের অফিস পরিচালিত হচ্ছে। উপজেলা প্রশাসনের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ হিসাবরক্ষণ অফিসটি ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের নিচতলায় রয়েছে। হিসাবরক্ষণ অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ঝুঁকিপূর্ণভাবে অফিসিয়াল কাজ-কর্ম করতে হচ্ছে। এছাড়া ভবনটিতে সমাজসেবা, সমবায়, নির্বাচন অফিসও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় পরিচালিত হচ্ছে।
উপজেলা সাব রেজিস্ট্রি অফিসের নিজস্ব ভবন না থাকায় উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স ভবন ভাড়া নিয়ে সাব রেজিস্ট্রি অফিসের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
উপজেলা পাবলিক লাইব্রেরি নামমাত্র থাকলেও পাবলিক লাইবে্িররর নিজস্ব ভবন না থাকায় এর কোনো কার্যক্রম নেই। এতে করে এলাকার শিক্ষার্থী, যুবসমাজসহ বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষজন সুকুমার ভিত্তির চর্চা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
১৯৮৩ সালে নতুন উপজেলা প্রতিষ্ঠার পর উপজেলার কর্মকর্তাদের জন্য আবাসিক ভবন নির্মাণ করা হয়। কিন্তু দীর্ঘদিনে ভবনগুলো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো বিভিন্ন সময়ে সংস্কার করে ব্যবহারের উপযোগী করা হয়। বর্তমানে অধিকাংশ ভবন ব্যবহারের অনুপযোগী অবস্থায় রয়েছে। তারপরও ভবনগুলোতে ঝুঁকিপূর্ণ ও স্যাঁতস্যাঁতে পরিবেশে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মানবেতর জীবন-যাপন করতে হচ্ছে। পাশাপাশি কর্মচারীদের জন্য নির্মিত অন্য একটি ভবনও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ ভবনটিতে কর্মচারীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করেন।
২০০৬ সালে উপজেলা কমিউনিটি সেন্টার নির্মাণ করা হলেও ভবনটি নিয়মিত ব্যবহার না করায় বর্তমানে ভবনটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। মাদকসেবী এবং চোরের দল ভবনের দরজা, জানালা, বাথরুম এবং রেলিং ভেঙে নিয়ে গেছে। বিদ্যুৎ সংযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছে। বৃষ্টি হলে ভবনটিতে পানি পড়ে। ২০২০ সালে করোনাকালীন করোনা রোগীদের স্বাস্থ্যসেবার জন্যও ভবনটিকে ব্যবহারের উপযোগী করা হয়। শেষ দিকে ভবনের নিচতলার বিশাল অডিটরিয়ামে ব্যাটমিন্টন খেলার মাঠ করা হয়।
নাঙ্গলকোট পৌরসভা নামেই প্রথম শ্রেণির পৌরসভা। বিশাল কর্মচারীর বহর নিয়োগ দিয়ে পৌরসভায় মাথাভারী প্রশাসন তৈরি করা হয়েছে। কাজ নেই। অথচ বিভিন্ন পদে অপ্রয়োজনীয় কর্মচারী নিয়োগ দিয়ে তাদের বসিয়ে বসিয়ে মোটা অঙ্কের টাকার বেতন দেওয়া হচ্ছে। অধিকাংশ কর্মচারীর ২ বছরের বেতন বকেয়া রয়েছে। গত ৫-৬বছর ধরে পৌর বাজারের ২২টি খাতে ইজারার নামে সিন্ডিকেট করে ইজারার অধিকমূল্য দেখানো হয়। পরে কেউ ইজারা না নেওয়ার কথা বলে খাস কালেকশন দেখানো হয়। এতে করে বাজার ইজারার ২২টি খাত থেকে কয়েক কোটি টাকা উত্তোলন করা হয়। পরে উত্তোলনকৃত টাকা থেকে নামমাত্র টাকা পৌরসভার ব্যাংক হিসাবে জামা দিয়ে অবশিষ্ট কয়েক কোটি টাকা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে আত্মসাতের সুস্পষ্ট অভিযোগ রয়েছে।
পৌরসভায় টেকসই কোনো উন্নয়ন হয়নি। বিভিন্নস্থানে ঢালাই রাস্তা নির্মাণ করা হলেও টেকসই উন্নয়নের অভাবে রাস্তাগুলো ভেঙে পড়ে আছে। সড়কবাতির নামে লাখ-লাখ টাকা আত্মসাৎ করার অভিযোগ রয়েছে। পৌরসভার অধিকাংশ এলাকায় সড়কবাতি নেই। বিভিন্নস্থানে সড়ক বাতির বেস ঢালাই থাকলেও সড়ক বাতি নেই। যার ফলে পৌরসভার গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে রাতের অন্ধকারে ভূতুড়ে পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
পৌরসভার নিজস্ব জমি না থাকায় দীর্ঘদিনেও পৌরসভার ময়লার ভাগাড়, পৌরপার্ক, পৌরকবরস্থান নির্মাণ করা সম্ভব হয়নি। বর্তমানে বাইপাস সড়ক ও ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথের গোত্রশাল এলাকায় সড়কের পাশে পৌরসভার ময়লা ফেলায় পথচারী, রেলের যাত্রী এবং ছোট-বড় যানবাহনে চলাচালকারী যাত্রীদের দুর্গন্ধময় পরিবেশে সড়কটি পার হতে হয়। এছাড়া পার্শ্ববর্তী একটি বেসরকারি হাসপাতালসহ বাসাবাড়ির লোকজনকে ময়লার দুর্গন্ধে অস্বত্বিকর অবস্থায় থাকতে হচ্ছে।
পৌরসভার বিশুদ্ধ পানি সরবরাহেরও ব্যবস্থা নেই। পৌরবাসীকে সকাল-বিকেল নির্মল পরিবেশে হাঁটাচলা করার পরিবেশ নেই। পৌরবাসীর কর বৃদ্ধি পেলেও তাদের সেবা নেই। রেলপথ ঘেষা সরকারি গোত্রশাল দীঘিটিকে উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় এনে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার মাধ্যমে সৌন্দর্য বর্ধনের উদ্যোগও চোখে পড়ছে না।
পৌর বাজারের সর্বত্র ব্যাটারি চালিত অটোরিকশা, যত্রতত্র হকারদের দোকানপাট বসার কারণে পৌরবাজারে নিত্তদিন যানজট লেগেই থাকে। পৌরসভায় নির্ধারিত বাসস্ট্যান্ড এবং সিএনজিচালিত অটোরিকশা স্ট্যান্ড নেই। যার ফলে সড়কের পাশে বাস এবং সিএনজি অটোরিকশা থামিয়ে যাত্রী উঠানামা করায় পৌরবাজারে সবসময় যানজট লেগেই থাকে। বিশেষ করে পৌরবাজারে প্রবেশ মুখ বটতলা এলাকায় সড়কের উপর কুমিল্লাগামী সুপার সার্ভিস পরিবহনের বাস, লাকসাম, বাঙ্গড্ডা এবং মাহিনীগামী সিএনজিচালিত অটোরিকশার স্ট্যান্ড থাকায় বটতলায় এলাকায় সবসময় যানজট লেগেই থাকে। এছাড়া গরু বাজার এলাকায় উপজেলার ঢালুয়া, দৌলখাঁড়, জোড্ডা, আদ্রা এবং বাইয়ারাগামী সিএনজিচালিত অটোরিকশা স্ট্যান্ড রয়েছে। এখানে যাত্রী উঠানামা করায় স্থানটিতে সবসময় যানজট লেগেই থাকে। পৌর এলাকার বিভিন্নস্থানে ড্রেনেজ ব্যবস্থার বেহাল দশা বিরাজ করছে। পৌরসভার বিভিন্ন এলাকায় ড্রেনেজ ব্যবস্থা নির্মাণ কাজ শুরু হলেও তা শেষ করা হয়নি। যার ফলে ড্রেনেজ ব্যবস্থা একেবারেই অকার্যকর অবস্থায় রয়েছে। এছাড়া ড্রেনেজ ব্যবস্থা নির্মাণ করা হলেও পানি সরানোর মুখের ব্যবস্থা রাখা হয়নি।
নাঙ্গলকোট পৌরসভার হরিপুর গ্রামের মফিজুর রহমান বলেন, নাঙ্গলকোট পৌরসভার রাস্তাঘাট, ময়লার ভাগাড়, পৌর পার্ক, পৌর কবরস্থান নির্মাণ এবং পৌরবাজারের যানজটের উন্নয়নে সম্বন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ মাহিনী-নাঙ্গলকোট সড়কে যাতায়াতকারী রবিউল হক বলেন, সড়কটির মাহিনী থেকে জোড়পুকুরিয়া পর্যন্ত অসংখ্য খানা-খন্দক দিয়ে যাতায়াতে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়।
কুমিল্লা-১০ (নাঙ্গলকোট ও লালমাই) সংসদীয় আসনের সংসদ সদস্য মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়া গোহারুয়ায় পরিত্যক্ত ২০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা উদ্বোধনকালে বলেছিলেন, নাঙ্গলকোটের উন্নয়নে মাস্টারপ্ল্যান করে পর্যায়ক্রমে সকল উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাস্তবায়ন করা হবে।