• কুমিল্লা সিটি করপোরেশন
  • কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়
  • আদর্শ সদর
  • বরুড়া
  • লাকসাম
  • দাউদকান্দি
  • আরও
    • চৌদ্দগ্রাম
    • সদর দক্ষিণ
    • নাঙ্গলকোট
    • বুড়িচং
    • ব্রাহ্মণপাড়া
    • মনোহরগঞ্জ
    • লালমাই
    • চান্দিনা
    • মুরাদনগর
    • দেবীদ্বার
    • হোমনা
    • মেঘনা
    • তিতাস
  • সর্বশেষ
  • রাজনীতি
  • বাংলাদেশ
  • অপরাধ
  • বিশ্ব
  • বাণিজ্য
  • মতামত
  • খেলা
  • বিনোদন
  • চাকরি
  • জীবনযাপন
  • ইপেপার
  • ইপেপার
facebooktwittertiktokpinterestyoutubelinkedininstagramgoogle
স্বত্ব: ©️ আমার শহর

সম্পাদক ও প্রকাশক : মো. গাজীউল হক ভূঁইয়া ( সোহাগ)।

নাহার প্লাজা, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা-৩৫০০

ই-মেইল: [email protected]

ফোন: 01716197760

> জীবনযাপন

ওমরাহ সম্পর্কে জানার চেষ্টা করি

আমার শহর ডেস্ক
প্রকাশ : ২৩ জানুয়ারি ২০২৬, ১১: ৫০
logo

ওমরাহ সম্পর্কে জানার চেষ্টা করি

আমার শহর ডেস্ক

প্রকাশ : ২৩ জানুয়ারি ২০২৬, ১১: ৫০
Photo

আল্লাহর ইচ্ছায় আপনি ওমরাহর নিয়ত করেছেন। ওমরাহ পালন করতে সৌদি আরবে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করুন, 'হে আল্লাহ, আমার ওমরাহকে সহজ করুন, কবুল করুন।' দেখবেন, আল্লাহর রহমতে সবকিছু সহজ হয়ে যাবে।

ওমরাহ পালনের নিয়ম সম্পর্কে আপনার রয়েছে কৌতূহল, আছে জানার ইচ্ছা। আসুন, আমরা ওমরাহ সম্পর্কে জানার চেষ্টা করি এবং এটি পালনের নিয়মগুলো সম্পর্কে জেনে নিই।

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, এক ওমরাহ অন্য ওমরাহ পর্যন্ত সময়ের গুনাহগুলোর কাফফারা স্বরূপ। আর মাবরুর (কবুল) হজের একমাত্র প্রতিদান হলো জান্নাত। (বুখারি, হাদিস: ১৭৩৩; মুসলিম, হাদিস: ১৩৪৯)।

আরেক বর্ণনায় রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, 'তোমরা বারবার হজ ও ওমরাহ আদায় করো। কেননা, এ দুটি দারিদ্র্য ও গুনাহকে এমনভাবে দূর করে দেয়, যেভাবে কামারের হাপর লোহা ও স্বর্ণ-রুপার ময়লাকে দূর করে।' (সুনান আত তিরমিজি,হাদিস: ৮১০)

আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, নিশ্চয় রমজান মাসের ওমরাহ একটি হজ বা আমার সঙ্গে আদায় করা হজের সমান। (বুখারি, হাদিস: ১৮৬৩)

ওমরাহ পালন করার কিছু পূর্বশর্ত

ওমরাহ পালন করার কিছু পূর্বশর্ত আছে। আসুন, এগুলো আমরা জেনে নিই।

শর্ত: ওমরাহর পূর্বশর্তগুলো হলো, যিনি ওমরাহ করবেন তাঁকে অবশ্যই- মুসলমান হতে হবে। প্রাপ্তবয়স্ক হতে হবে। মানসিক ভারসাম্যপূর্ণ হতে হবে। ওমরাহতে যাওয়ার আর্থিক সামর্থ্য থাকতে হবে। শারীরিকভাবে সক্ষম হতে হবে।

নারীদের সঙ্গে মাহরাম থাকতে হবে। যদিও সৌদি সরকার মাহরামের নিয়মটি সহজ করে দিয়েছে। সহিহ হাদিস ও পবিত্র কোরআনে মাহরামের বিষয়টি স্পষ্ট। মাহরাম আসলে কে, এ ব্যাপারে পবিত্র কোরআনে সুরা নিসার ২২ ও ২৩তম আয়াতে বলা আছে। সারসংক্ষেপ হলো, একজন নারীর স্বামী ব্যতীত তাঁর মাহরাম হবে এমন ব্যক্তি, যাঁর সঙ্গে তাঁর রক্তের সম্পর্কের কারণে বিবাহ সম্পাদন সম্ভব নয়; যেমন নারীর ভাই, বাবা, ছেলে ইত্যাদি।

সুন্দর আচরণ: ওমরাহ করতে যাওয়ার আগে কিছু জিনিস আপনাকে নিশ্চিত করতে হবে। মনে রাখবেন, আপনি ওমরাহ'র উদ্দেশ্যে যাচ্ছেন আল্লাহকে খুশি করার জন্য।তাই আপনার ব্যবহার যাতে আশপাশের লোকদের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ হয়। কাউকে কষ্ট দেবেন না; বরং কাউকে কীভাবে উপকার করা যায়, সেটাই চেষ্টা করুন। আপনার মুখে যেন সব সময় ভালো কথা থাকে।

জিকির: ভ্রমণের শুরু থেকেই নিজেকে আল্লাহর জিকিরেমগ্ন রাখুন। তসবিহ পড়ুন, পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত করুন, আল্লাহর কাছে নিজের গুনাহর জন্য ক্ষমা চান, আল্লাহ খুশি হন, এমন কাজ করুন। ভালো বা মন্দ যা-ই হোক বলুন 'আলহামদু লিল্লাহ'; কোনো কিছুর শুরুতে বলুন 'বিসমিল্লাহ'; কিছু চাইলে 'ইনশা আল্লাহ'; প্রশংসার ক্ষেত্রে 'সুবহানাল্লাহ' বা 'মা শা আল্লাহ'; কাউকে ধন্যবাদ দিতে 'জাজাকাল্লাহু খাইরান'; হাঁচি দিলে 'আলহামদু লিল্লাহ'; আর তার জবাবে 'ইয়ারহামুক আল্লাহ'; কোনো পাপ থেকে দূরে থাকতে 'আসতাগফিরুল্লাহ' ইত্যাদি।

ধৈর্য: ওমরাহ বা হজের একটা বড় পরীক্ষা হলো ধৈর্য ধারণ করা, রেগে গেলে চলবে না। মনে রাখবেন, ওমরাহর সময় আগে ও পরে এমন অনেক বিষয় আপনাকে দেখতে হবে, যা আপনার ধৈর্য পরীক্ষা করবে। যে এজেন্সি আপনাকে নিয়ে যাচ্ছে, তাদের কথার সঙ্গে হয়তো কাজের মিল খুঁজে না-ও পেতে পারেন। তারা আপনাকে যা বলেছিল, তা হয়তো আপনি পাচ্ছেন না বা পাবেন না, অথবা বিমানভ্রমণে বা ইমিগ্রেশনে অথবা জেদ্দা এয়ারপোর্টের বাইরে আপনাকেবাসের জন্য অপেক্ষা করতে হতে পারে। কারও সঙ্গে এই সময় ঝগড়ায় লিপ্ত হবেন না, চেঁচামেচি করবেন না। মনে করবেন, আল্লাহ আপনার পরীক্ষা নিচ্ছেন এবং এটা তাঁরই ইচ্ছা; বরং এ সময় বেশি বেশি জিকির করুন।

কোন কোন দোয়া মুখস্থ করবেন

কাবা শরিফের চারদিকে ঘোরাকে বলা হয় তাওয়াফ আর এই তাওয়াফ সম্পন্ন করতে হয় কাবাঘরের সাতটি চক্করের মাধ্যমে। সাফা ও মারওয়া পাহাড়ে ছোটাছুটি করাকে বলা হয় সাঈ।

আপনাকে যেটা মুখস্থ করতে হবে, তার একটি হলো তালবিয়া। তবে এটি শুধু মুখস্থ করলে চলবে না, এগুলোর অর্থও আপনাকে জানতে হবে। তাহলেই আপনার ভেতরে এর অনুভূতিটা আসবে। তালবিয়া কী, তালবিয়ার কথা একটু পরে ওমরাহর ধারাবাহিকতায় আমরা বলব।

ওমরাহ কাকে বলে: হিল (হারামের সীমানার বাইরে মিকাতের ভেতরের স্থান) থেকে অথবা মিকাত থেকে ইহরামের নিয়ত করে বায়তুল্লাহ শরিফ তাওয়াফ করা, সাফা-মারওয়া সাঈ করা এবং মাথার চুল ফেলে দেওয়া বা ছোট করাকে 'ওমরাহ' বলে।

৯ থেকে ১৩ জিলহজ পর্যন্ত সময় ছাড়া বছরের যেকোনো সময় ওমরাহ পালন করা যায়। হজের পাঁচ দিন ওমরাহ করা মাকরুহ।

(আল-বাহরুল আমিক, ৪/২০২১)

রাসুলুল্লাহ (সা.) চারবার ওমরাহ করেছেন। প্রথমটি জিলকদ মাসে। এটি হুদাইবিয়ার ওমরাহ নামে পরিচিত। ষষ্ঠ হিজরিতে কাফেরদের প্রতিরোধের কারণে বায়তুল্লাহ শরিফে সে বছর যাওয়া হয়নি। হুদায়বিয়াতেই ইহরাম ত্যাগ করেছিলেন রাসুলুল্লাহ (সা.)। দ্বিতীয় ওমরাহ পালন করেছেন পরবর্তী বছরে, অর্থাৎ সপ্তম হিজরিতে। এটি কাজা ওমরাহ নামে পরিচিত। তৃতীয়টি ওমরাতুল জিরানা নামে পরিচিত। হুনাইন থেকে ফেরার পথে জিরানা থেকে ইহরাম বেঁধেছিলেন রাসুলুল্লাহ (সা.)। চতুর্থটি আদায় করেছেন বিদায় হজেরসঙ্গে। (বুখারি, হাদিস ১৭৭৮-৯)

ওমরাহর ফরজ ওয়াজিব: ওমরাহর ফরজ ২টি ১. ইহরাম।২. তাওয়াফ।

ওমরাহর ওয়াজিব ২টি: ১. সাঈ। ২. হলক করা।

ইহরামের ফরজ ২টি: ১ নিয়ত করা।২. তালবিয়া পড়া।

ইহরামের ওয়াজিব ২টি: ১. মিকাত থেকে ইহরাম বাঁধা। ২. নিষিদ্ধ কাজ থেকে বেঁচে থাকা।

তাওয়াফের ফরজ ৩টি: ১. নিয়ত করা। ২. বায়তুল্লাহ তাওয়াফ করা। ৩. নিজেতাওয়াফ করা।

তাওয়াফের ওয়াজিব ৬টি: ১. শরীর পাক। ২. হেঁটে তাওয়াফকরা। ৩. হাতিমের বাইরে দিয়ে তাওয়াফ করা। ৪. তাওয়াফের সাত চক্কর পুরো করা। ৫. তাওয়াফ হাজরে আসওয়াদ থেকে শুরু করা। ৬. তাওয়াফ শেষে মাকামে ইব্রাহিমের পেছনে দুই রাকাত নামাজ পড়া।

তাওয়াফের সুন্নত: ১. হাজরে আসওয়াদের দিকে মুখ করেতাওয়াফ শুরু করা। ২. প্রথম তিন তাওয়াফে রমল করা (বীরের মতো হেলেদুলে চলা)। ৩. প্রতি চক্করে সম্ভব হলে হাজরে আসওয়াদকে চুম্বন করা। ৪. তাওয়াফ ও নামাজ শেষে জমজমের পানি পান করা।

সাঈ মানে সাতটি দৌড়। সাঈ করার সময় সবুজ বাতির নিচে পুরুষেরা দৌড়াবেন। নারীরা স্বাভাবিকভাবে চলবেন।

(বাদায়েউস সানায়ে, ২/৪৮০)

সাঈর ওয়াজিব: ১. ওজর না থাকলে হেঁটে সাঈ করা। ২. সাত চক্কর পুরো করার পর মাথা মুণ্ডন করতে হবে।

ওমরাহর কাজ ধারাবাহিকভাবে করতে হবে, যেমন তাওয়াফ করা, নামাজ আদায় করা, জমজমের পানি পান করা, সাঈকরা (সাফা-মারওয়া পাহাড়ে দৌড়ানো), মাথা ন্যাড়া অথবা চুল ছোট করা।

মিকাত: মিকাত হলো সীমা। হজ ও ওমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে মক্কা গমনকারীদের কাবাঘর থেকে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ দূরত্ব থেকে ইহরাম করতে হয়। এ জায়গাগুলোকে মিকাত বলা হয়। হজের সময় হলো তিনটি মাস-শাওয়াল, জিলকদ ও জিলহজ মাস। ওমরাহর সময় হলো বছরের যেকোনো সময়।

(সুরা বাকারা, আয়াত: ১৯৭)

মিকাতের জন্য পাঁচটি নির্ধারিত স্থান রয়েছে। (বুখারি:১৫২৪; মুসলিম: ২৬৯৩)

মিকাতের নাম- ১. জুল হুলায়ফা: অন্য নাম আবিয়ারে আলী, মক্কা থেকে এর দূরত্ব ৪২০ কিলোমিটার। মদিনাবাসী ও যাঁরা এই পথ দিয়ে যাবেন। ২. আল-জুহফাহ: অন্য নাম রাবিগ, মক্কা থেকে এর দূরত্ব ১৮৬ কিলোমিটার। সিরিয়া, লেবানন, জর্ডান, ফিলিস্তিন, মিসর, সুদান, মরক্কো ও আফ্রিকার জন্য। ৩. ইয়ালামলাম: অন্য নাম আস সাদিয়া, মক্কা থেকেএর দূরত্ব ১২০ কিলোমিটার। নৌপথে ইয়েমেন, ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, চীন, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ এশিয়া, ইন্দোনেশিয়া থেকে যাঁরা আসবেন তাঁদের জন্য। ৪. কারনুল মানাজিল: অন্য নাম সাইলুল কাবির, মক্কা থেকেএর দূরত্ব ৭৮ কিলোমিটার। কাতার, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, ওমান, ইরাক ও ইরান এই পথে। ৫. জাতু ইরক: মক্কা থেকে এর দূরত্ব ১০০ কিলোমিটার।

যাঁরা মিকাতের সীমানার ভেতরে বসবাস করেন, তাঁদের অবস্থানই হলো তাঁদের মিকাত। অর্থাৎ যে যেখানে আছেন, সেখান থেকেই ওমরাহ বা হজের ইহরাম করবেন। তবে মক্কার হারাম এলাকার ভেতরে বসবাসকারী ব্যক্তি যদি ওমরাহ করতে চান, তবে তাঁকে হারাম এলাকার বাইরে গিয়ে, যেমন তানিম বা আয়েশা মসজিদে অথবা অনুরূপ কোথাও গিয়েইহরাম করবেন। (বুখারি: ১৫২৪)

ইহরাম করতে হবে: ইহরাম হলো একটি সার্বিক অবস্থা। মনে করুন, আপনি আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যাচ্ছেন; ঠিক যেমন মৃত্যুর পর কিয়ামতের দিন বান্দারা আল্লাহর সামনে দাঁড়াবেন। আপনি যেন আল্লাহর সামনে দুই টুকরা কাপড় পরে দাঁড়িয়েছেন এবং হাজিরা দিচ্ছেন।

ইহরামে আসার জন্য আপনাকে ইহরাম বাঁধার আগেই কিছু কাজ করে নিতে হবে। অনেকেই ইহরাম বলতে সাদা দুটি কাপড়ের টুকরাকে মনে করে থাকেন। আসলে (পুরুষদের জন্য) পরিধানের এই দুটি কাপড় ইহরাম নয়; বরং এটিইহরামের একটি অংশ, এদের বলে 'ইজার' ও 'রিদা'। 'ইজার' হলো লুঙ্গির মতো একটি সেলাইবিহীন কাপড় আর 'রিদা' হলো সেলাইবিহীন চাদর।

ওমরাহ ও হজ করার আগেই ইহরাম বাঁধতে হয়। যেদিন আপনার ফ্লাইট, সেদিন বিমানবন্দরে রওনা দেওয়ার আগে শুধু নিয়ত বাদে বাকি সব কাজ সেরে ফেলতে হবে। বিশেষ এই কাজগুলো হলো-

হাত ও পায়ের নখ ছোট করে কেটে ফেলুন।

অপ্রয়োজনীয় লোম বা চুল পরিষ্কার করে নিন। গোঁফ ছোট করে ছেঁটে নিন।

অজু ও গোসল করুন।

রিদা (ওপরের অংশ) ও ইজার (নিচের অংশ) পরিধান করুন।

নারীদের ইহরাম: পুরুষ ও নারীর ইহরামের কাপড়ে একটু ভিন্নতা আছে। নারীদের ইজার ও রিদা পরতে হয় না; বরং নারীরা যেকোনো রঙের বা প্রকারের কাপড় পরতে পারেন। তবে অবশ্যই লক্ষ রাখতে হবে যে কোনোভাবেই যেন এমন ধরনের কাপড় না পরা হয়, যাতে পর্দা নষ্ট হয় বা শরীরের আকৃতি বেরিয়ে আসে। রাসুল (সা.) নারীদের মুখ ঢাকতে নিষেধ করেছেন। পিরিয়ডকালে নারীদেরও ইহরাম ধারণ করতে বলা হয়েছে। তবে এ অবস্থায় তাঁরা যেন কোনো মসজিদে প্রবেশ না করেন।ঢাকা থেকে মক্কার উদ্দেশে যাঁরা উড়োজাহাজে উঠেছেন, তাঁরা পাইলটের ঘোষণার অপেক্ষা করুন অথবা, মিকাত আসার আগেই ওমরাহর নিয়ত করে নিন। আর যাঁরা মদিনা থেকে মক্কায় আসছেন, তাঁরা 'জুল হুলায়ফা' মসজিদে (মিকাত) এসে ইহরাম ধারণ করে ওমরাহর নিয়ত করুন।

নিয়ত: নিয়ত পড়ার বিষয় না, এটি হলো মনের সংকল্প। ঠিক যেমন আমরা নামাজের জন্য নিয়ত করে থাকি। আপনি ওমরাহর নিয়ত করে নিন-'লাব্বাইকা আল্লাহুম্মা ওমরাতান।'

অর্থ : 'হে আল্লাহ, এই যে আমি ওমরাহ করতে হাজির হয়েছি।' বাংলায়ও বলতে পারেন, 'হে আল্লাহ, আমি একটি ওমরাহর নিয়ত করলাম, সহজ করুন, কবুল করুন।'

এই নিয়ত যেকোনো ওয়াক্তের নামাজের পর করা ভালো। রাসুল (সা.) জোহরের নামাজের পর নিয়ত করেছিলেন। আপনার ফ্লাইটের সময়ের ওপর ভিত্তি করে নিয়ত করবেন। ইহরাম পরিপূর্ণ করার পর আপনি যেকোনো ওয়াক্তের নামাজ পড়ে নিন বা দুই রাকাত নফল নামাজ আদায় করে নিন। আপনি যদি উড়োজাহাজে থাকেন, তাহলে নিজের সিটে বসেই দুই রাকাত নফল নামাজ আদায় করে নিন।

এরপর তালবিয়া পাঠ করতে হবে। যত খুশি ততবার। পুরুষেরা জোর গলায় পড়বেন। আর নারীরা পড়বেন আস্তে আস্তে, যেন নিজে তাঁর পড়ার শব্দ শুনতে পান।

তালবিয়া: 'লাব্বাইক, আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা শারিকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হাম্দা ওয়ান নি'মাতা লাকা ওয়াল মুল্ক, লা শারিকা লাক।'

অর্থ: 'আমি হাজির, হে আল্লাহ আমি হাজির, এই যে আমি। আর তোমার কোনো শরিক নেই, আমি হাজির। সব প্রশংসা ও কর্তৃত্ব শুধু তোমারই আর তোমার কোনো শরিক নেই।'

(বুখারি, হাদিস: ১৫৪৯)

ইহরাম থাকা অবস্থায় যা যা করা যাবে না: ইহরাম থাকা অবস্থায় বেশ কিছু কাজ থেকে বিরত থাকতে হবে। যদি ইচ্ছাকৃতভাবে এই কাজগুলো সম্পাদন করা হয়, সে ক্ষেত্রে আপনাকে 'দম' বা পশু কোরবানি দিতে হবে। ইহরামরত অবস্থায় যে কাজগুলো করা যাবে না, সেগুলো হলো- চুল বা নখ কাটা। সুগন্ধি বা পারফিউম ব্যবহার করা। পুরুষেরা সেলাই করা কাপড় পরতে পারবেন না। নারীরা মুখ ঢাকতে পারবেন না বা হাতে গ্লাভস পরতে পারবেন না। পশু শিকার করা যাবে না। মশা, মাছিও মারা যাবে না। গাছ বা পাতা ছেঁড়া যাবে না। কারও পড়ে যাওয়া জিনিস ওঠানো যাবে না, যদি না ফেরত দেওয়ার জন্য ওঠানো হয়। স্বামী-স্ত্রী সহবাস করা যাবে না। কোনো ধরনের খারাপ কাজ করা যাবে না। ঝগড়া-বিবাদে লিপ্ত হওয়া যাবে না।

তবে ইহরাম থাকা অবস্থায় কিছু কাজ করা যেতে পারে। যেমন বেল্ট পরা, হিয়ারিং এইড, পাওয়ার চশমা পরা ইত্যাদি। গোসল করা। তবে সাবান হতে হবে গন্ধহীন। ইহরামের কাপড় ধোয়া বা নতুন ইহরামের কাপড় পরা ইত্যাদি।

মসজিদুল হারাম: মক্কা শহরের প্রাণকেন্দ্র হলো মসজিদুল হারাম। এটি পৃথিবীর বৃহত্তম মসজিদ। পবিত্র কোরআনে আছে, নিশ্চয় মানবজাতির জন্য প্রথম যে ঘর প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তা তো বাক্কায় (মক্কার অপর নাম), তা আশীর্বাদ ও বিশ্বজগতের দিশারি। (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ৯৬)

বায়তুল্লাহ বা আল্লাহর ঘর বা কাবাকে বায়তুল আতিক(প্রাচীন ঘর) বলা হয়। আল্লাহ এই ঘরকে অবিশ্বাসীদের থেকে স্বাধীন করেছেন। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এ ঘরের স্থানটি পৃথিবীর ভৌগোলিক মানচিত্রের কেন্দ্রে অবস্থিত।

পবিত্র কোরআনে বলা হয়, 'আর স্মরণ করো সেই সময়কে যখন আমি (কাবা) ঘরকে মানুষের মিলনক্ষেত্র ও আশ্রয়স্থল করেছিলাম। (আর আমি বলেছিলাম,) “তোমরা ইব্রাহিমের দাঁড়ানোর জায়গাকেই নামাজের জায়গারূপে গ্রহণ করো।” আর যখন আমি ইব্রাহিম ও ইসমাইলকে আদেশ করি যে 'তোমরা আমার ঘরকে পবিত্র রাখবে তাদের জন্য যারা এটা প্রদক্ষিণ করবে, এখানে বসে ইতিকাফ করবে এবং এখানে রুকু ও সিজদা করবে।' (সুরা বাকারা: আয়াত: ১২৫)

কাবা ও হজের ইতিহাসে রয়েছে ইব্রাহিম (আ.)-এর মহৎ ইসলামি আখ্যান। আল্লাহ তাআলা ইব্রাহিম (আ.)-কে তাঁর স্ত্রী হাজেরা (আ.) ও পুত্র ইসমাইল (আ.)-কে নিয়ে মরুময়, পাথুরে ও জনশূন্য মক্কার উপত্যকায় রেখে আসার নির্দেশ দেন, এটা ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি পরীক্ষা। প্রচণ্ড পিপাসার্ত ইসমাইল (আ.), তখন তাঁর মা হাজেরা (আ.) পানির সন্ধানে সাফা ও মারওয়া পাহাড়ে সাতবার ছোটাছুটি করেন। এরপর জিবরাইল (আ.) এসে শিশু ইসমাইল (আ.)-এর জন্য সৃষ্টি করলেন সুপেয় পানির কূপ-জমজম। আল্লাহর নির্দেশে ইব্রাহিম (আ.) ও ইসমাইল (আ.) দুজনে জমজম কূপের পাশে ইবাদতের লক্ষ্যে কাবার পুনর্নিমাণের কাজ শুরু করলেন।

মুহাম্মদ (সা.)-এর যুগে কাবা সংস্কারের সময় জান্নাতথেকে নিয়ে আসা পাথর 'হাজরে আসওয়াদ', যা কাবার কোণে স্থাপন করেন হজরত মুহাম্মদ (সা.)। কাবার এক পাশে একটি স্থান রয়েছে, যার নাম 'মাকামে ইব্রাহিম'; এখানে দাঁড়িয়ে ইব্রাহিম (আ.) কাবার নির্মাণকাজ পর্যবেক্ষণ করতেন, এখানে একটি পাথরে তাঁর পায়ের ছাপ রয়েছে। কাবাঘরের উত্তর দিকে কাবাসংলগ্ন অর্ধবৃত্তাকার একটি উঁচু দেয়াল আছে, যা কাবাঘরেরই অংশ, যার নাম 'হাতিম' বা 'হিজর'। হাজরে আসওয়াদ ও কাবাঘরের দরজার মাঝখানের স্থানকে 'মুলতাজম' বলা হয়। কাবাঘরকে বৃষ্টি ও ধুলাবালু থেকে রক্ষার জন্য একটি চাদর দিয়ে আবৃত করে রাখা হয়, যাকে 'গিলাফ' বলে।

কাবাঘরের মর্যাদার কারণে এর চারপাশে হারামের সীমানা আল্লাহ নির্ধারণ করে দিয়েছেন, যার পাহারায় নিয়োজিত আছেন ফেরেশতারা। হারামের সীমানার মধ্যে বরকত, রহমত ও নিরাপত্তা প্রদান করা হয়েছে। মুসলমানরা কাবাঘরের ইবাদত করেন না; বরং কাবার রবের ইবাদত করেন। কাবা হচ্ছে 'কিবলা', যা মুসলিমদের ইবাদতের দিকনির্ণায়ক।

কাবার উচ্চতা ১৪ মিটার। মুলতাজমের দিকে দৈর্ঘ্য ১২ দশমিক ৮৪ মিটার, হাতিমের দিকে দৈর্ঘ্য ১১ দশমিক ২৮ মিটার, রুকনে ইয়ামেনি ও হাতিমের মাঝখানের দৈর্ঘ্য ১২ দশমিক ১১ মিটার, হাজরে আসওয়াদ ও রুকনে ইয়ামেনির মাঝখানের দৈর্ঘ্য ১১ দশমিক ৫২ মিটার।

মসজিদুল হারামে এক রাকাত নামাজ আদায় অন্য মসজিদে এক লাখ রাকাত নামাজ আদায়ের সমান সওয়াব।

আর মদিনার মসজিদে নববিতে এক রাকাত নামাজ আদায় অন্য মসজিদে এক হাজার রাকাত নামাজ আদায়ের সমান সওয়াব। (ইবনে মাজাহ: ১৪০৬)

সম্পূর্ণ মসজিদে এসির ব্যবস্থা আছে। কিং ফাহাদসহ কয়েকটি গেটের দুই পাশের সিঁড়ি দিয়ে মসজিদের নিচে বেজমেন্ট ফ্লোরে যাওয়া যায়, যেখানে নামাজের ব্যবস্থা আছে।

মসজিদুল হারামের গেট দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করার সময় খেয়াল রাখবেন, গেটের ওপরে 'সবুজ আলো অর্থাৎ প্রবেশ' অথবা 'লাল আলো অর্থাৎ প্রবেশ নয়' লেখা আছে।

মসজিদুল হারামের ভেতরে ও বাইরে

মসজিদের ভেতরে ও বাইরের চত্বরে সব জায়গায় মেঝেতে কাতারের দাগ দেওয়া আছে। নামাজের সময় ওই কাতারের দাগে দাঁড়ালে কিবলামুখী হওয়া হয়ে যায়। মসজিদুল হারামের ভেতরে প্রবেশের জন্য ১০০টির বেশি গেট রয়েছে। মসজিদের ওপরতলায় ওঠার জন্য সিঁড়ি ও এস্কেলেটরের ব্যবস্থা আছে। মসজিদের ভেতরে ও বাইরে পান করার জন্য জমজমের পানি সম্পূর্ণ উন্মুক্ত এবং মক্কা লাইব্রেরির পাশ থেকে বড় বোতলে কূপের পানি নিয়ে আসা যায়।

মসজিদের ভেতরে অসংখ্য বুকশেলফ রয়েছে, সেখান থেকে পবিত্র কোরআন নিয়ে তিলাওয়াত করতে পারবেন।

মারওয়া পাহাড়ের পাশে বেজমেন্ট ওয়াশরুমের ছাদের ওপর হারানো ও পাওয়া জিনিসের খোঁজ নেওয়ার অফিস আছে। মসজিদের বাইরে বেশ কিছু লাগেজ লকার পাবেন,যেখানে দামি ও মূল্যবান সামগ্রী রাখতে পারেন। অসুস্থ বা দুর্বলদের জন্য টাকার বিনিময়ে তাওয়াফ ও সাঈ করার জন্য মসজিদে হুইলচেয়ার, ব্যাটারিচালিত গাড়ি পাওয়া যায়। মসজিদের প্রতিটি গেটে নিরাপত্তাকর্মী থাকেন ও সন্দেহজনক ব্যাগ চেক করেন। তাঁরা সাধারণত বড় ব্যাগ নিয়ে মসজিদে প্রবেশ করতে দেন না।

মসজিদুল হারামের কয়েকজন ইমামের নাম

১. আবদুর রহমান আল-সুদাইস, ১৯৮৪ সালে ইমাম এবং খতিব হিসেবে নিযুক্ত হন।

২. সালেহ বিন আবদুল্লাহ আল-হুমাইদ, ১৯৮৪ সালে ইমাম এবং খতিব হিসেবে নিযুক্ত হন।

৩. ওসামা আবদুল আজিজ আল-খায়য়াত, ১৯৯৮ সালে ইমাম এবং খতিব হিসেবে নিযুক্ত হন।

৪. মাহের আল-মুআইকলি, ২০০৭ সালে ইমাম এবং ২০১৬ সালে, খতিব হিসেবে নিযুক্ত হন।

৫. ফয়সাল জামিল গাজ্জাবি, ২০০৮ সালে ইমাম এবং খতিব হিসেবে নিযুক্ত হন।

৬. আবদুল্লাহ আওয়াদ আল জুহানি, ২০০৭ সালে, ইমাম এবং ২০১৯ সালে, খতিব হিসেবে নিযুক্ত হন।

৭. বান্দার বালিলাহ, ২০১৩ সালে ইমাম এবং ২০১৯ সালে খতিব হিসেবে নিযুক্ত হন।

৮. ইয়াসির আদ-দৌসারি, ২০১৫ সালে তারাবিহর ইমাম এবং ২০২২ সালে খতিব নিযুক্ত হন।

৯. বদর আল তুর্কি, ২০২৪ সালে ইমাম নিযুক্ত হন।

১০. ওয়ালিদ আশ-শামসান, ২০২৪ সালে ইমাম নিযুক্ত হন।

মক্কায় প্রবেশের পর প্রথম আমল ওমরাহ পালন

মক্কায় প্রবেশের পর প্রথম আমল হলো ওমরাহ করা। কিন্তু অনেকেই মক্কায় ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে ওমরাহর জন্য এমন ব্যস্ত হয়ে ওঠেন যে হোটেল-বিশ্রাম সবকিছু ভুলে যান। সেটি করার প্রয়োজন নেই। তাতে নতুন একটি স্থানে গিয়ে আগে হোটেলে উঠুন, কিছুটা সময় বিশ্রাম নিন, কিছু খাবার খেয়ে নিন। এরপর আপনার এজেন্সির লোকদের সঙ্গে পরিকল্পনা অনুযায়ী একটি নির্দিষ্ট সময়ে ও জায়গায় মিলিত হয়ে ওমরাহর জন্য রওনা হোন। বেশি বেশি তালবিয়া পাঠ করতে থাকুন।

মক্কার হারাম শরিফ অনেক বড়। তাই এখানে হারিয়ে যাওয়া আশ্চর্যের কিছু নয়। হোটেলের আশপাশের কিছু বিশেষ ল্যান্ডমার্ক (যেমন ক্লক টাওয়ার) বা বিল্ডিং চিনে নিন এবং এগুলো মনে রাখুন, ফিরতে সুবিধা হবে। সবচেয়ে ভালো হয়, যদি আপনারা বিমানবন্দর থেকে অথবা হোটেলের আশপাশ থেকে একটি সৌদি সিমকার্ড কিনে নিতে পারেন। সঙ্গে মুঠোফোন থাকলে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা কম থাকে। হোটেল থেকে ঠিকানাযুক্ত কার্ড নিন; আপনার আইডি কার্ডটিও নিন। এবার এগুলো বেল্টের পকেটে সাবধানতার সঙ্গে সংরক্ষণ করুন। মনে রাখবেন, আইডি কার্ডটি এখন আপনার পাসপোর্ট। কারণ, মক্কায় আপনার পাসপোর্ট কিন্তু জমা নিয়ে নেবে এবং এটি আপনার বাংলাদেশে ফেরার সময় বা এর আগের দিনফেরত পাবেন। তাই আপনার আইডি কার্ডটি যাতে কোনোভাবে হারিয়ে না যায়। হারিয়ে গেলে অনেক বড় ঝামেলা পোহাতে হতে পারে। যাহোক, রওনা হওয়ার আগে নিশ্চিত হয়ে নিন কোন জায়গায় আবার মিলিত হবেন (যদি কেউ হারিয়ে যায়)। ক্লক টাওয়ার বা গেট নম্বর ১ বা কিং আবদুল আজিজ গেট সবার পরিচিত। মসজিদুল হারামে রয়েছে চারটি ফ্লোর-বেজমেন্ট, গ্রাউন্ড, মিডল ও ছাদ। আবার একটি অংশে ওপরে ওঠার জন্য রয়েছে এস্কেলেটর ও এসি (শীতাতপনিয়ন্ত্রিত) এলাকা। মসজিদে ঢোকার সময় সব ব্যাগ চেক হয়। বড় কোনো হাতব্যাগ বা কোনো ধরনের খাবার নিয়ে নিয়ে প্রবেশ করা যায় না। অবশ্য ছোট্ট পানির বোতল নেওয়া যায়, যাতে পরে জমজমের পানি ভরে নিয়ে আসতে পারেন।

তাওয়াফ শুরু হয় হাজরে আসওয়াদ বরাবর থেকে

হাজরে আসওয়াদ বরাবর কোণ থেকে শুরু হয়ে কাবাঘরের পরবর্তী কোণ রুকনে ইরাকি। এরপর যথাক্রমে রুকনে শামি (এই দুই কোণের মাঝামাঝি স্থান মিজাবে রহমত ও হাতিম) ও রুকনে ইয়ামেনি। এটা ঘুরে আবার হাজরে আসওয়াদ বরাবর এলে তাওয়াফের এক চক্কর পূর্ণ হয়। এভাবে একে একে সাত চক্কর দিতে হয়।

মসজিদুল হারামে ঢোকার আগে প্রথম তাওয়াফে পুরুষদের ইহরামের কাপড় একটু অন্যভাবে পরতে হয়। শুধু ইহরামের ওপরের অংশটি (রিদা) ডান কাঁধের ওপর থেকে সরিয়ে হাতের নিচ থেকে নিয়ে নিতে হবে, এ অবস্থাকে বলাহয় 'ইজতিবা'।

Thumbnail image

আল্লাহর ইচ্ছায় আপনি ওমরাহর নিয়ত করেছেন। ওমরাহ পালন করতে সৌদি আরবে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করুন, 'হে আল্লাহ, আমার ওমরাহকে সহজ করুন, কবুল করুন।' দেখবেন, আল্লাহর রহমতে সবকিছু সহজ হয়ে যাবে।

ওমরাহ পালনের নিয়ম সম্পর্কে আপনার রয়েছে কৌতূহল, আছে জানার ইচ্ছা। আসুন, আমরা ওমরাহ সম্পর্কে জানার চেষ্টা করি এবং এটি পালনের নিয়মগুলো সম্পর্কে জেনে নিই।

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, এক ওমরাহ অন্য ওমরাহ পর্যন্ত সময়ের গুনাহগুলোর কাফফারা স্বরূপ। আর মাবরুর (কবুল) হজের একমাত্র প্রতিদান হলো জান্নাত। (বুখারি, হাদিস: ১৭৩৩; মুসলিম, হাদিস: ১৩৪৯)।

আরেক বর্ণনায় রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, 'তোমরা বারবার হজ ও ওমরাহ আদায় করো। কেননা, এ দুটি দারিদ্র্য ও গুনাহকে এমনভাবে দূর করে দেয়, যেভাবে কামারের হাপর লোহা ও স্বর্ণ-রুপার ময়লাকে দূর করে।' (সুনান আত তিরমিজি,হাদিস: ৮১০)

আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, নিশ্চয় রমজান মাসের ওমরাহ একটি হজ বা আমার সঙ্গে আদায় করা হজের সমান। (বুখারি, হাদিস: ১৮৬৩)

ওমরাহ পালন করার কিছু পূর্বশর্ত

ওমরাহ পালন করার কিছু পূর্বশর্ত আছে। আসুন, এগুলো আমরা জেনে নিই।

শর্ত: ওমরাহর পূর্বশর্তগুলো হলো, যিনি ওমরাহ করবেন তাঁকে অবশ্যই- মুসলমান হতে হবে। প্রাপ্তবয়স্ক হতে হবে। মানসিক ভারসাম্যপূর্ণ হতে হবে। ওমরাহতে যাওয়ার আর্থিক সামর্থ্য থাকতে হবে। শারীরিকভাবে সক্ষম হতে হবে।

নারীদের সঙ্গে মাহরাম থাকতে হবে। যদিও সৌদি সরকার মাহরামের নিয়মটি সহজ করে দিয়েছে। সহিহ হাদিস ও পবিত্র কোরআনে মাহরামের বিষয়টি স্পষ্ট। মাহরাম আসলে কে, এ ব্যাপারে পবিত্র কোরআনে সুরা নিসার ২২ ও ২৩তম আয়াতে বলা আছে। সারসংক্ষেপ হলো, একজন নারীর স্বামী ব্যতীত তাঁর মাহরাম হবে এমন ব্যক্তি, যাঁর সঙ্গে তাঁর রক্তের সম্পর্কের কারণে বিবাহ সম্পাদন সম্ভব নয়; যেমন নারীর ভাই, বাবা, ছেলে ইত্যাদি।

সুন্দর আচরণ: ওমরাহ করতে যাওয়ার আগে কিছু জিনিস আপনাকে নিশ্চিত করতে হবে। মনে রাখবেন, আপনি ওমরাহ'র উদ্দেশ্যে যাচ্ছেন আল্লাহকে খুশি করার জন্য।তাই আপনার ব্যবহার যাতে আশপাশের লোকদের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ হয়। কাউকে কষ্ট দেবেন না; বরং কাউকে কীভাবে উপকার করা যায়, সেটাই চেষ্টা করুন। আপনার মুখে যেন সব সময় ভালো কথা থাকে।

জিকির: ভ্রমণের শুরু থেকেই নিজেকে আল্লাহর জিকিরেমগ্ন রাখুন। তসবিহ পড়ুন, পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত করুন, আল্লাহর কাছে নিজের গুনাহর জন্য ক্ষমা চান, আল্লাহ খুশি হন, এমন কাজ করুন। ভালো বা মন্দ যা-ই হোক বলুন 'আলহামদু লিল্লাহ'; কোনো কিছুর শুরুতে বলুন 'বিসমিল্লাহ'; কিছু চাইলে 'ইনশা আল্লাহ'; প্রশংসার ক্ষেত্রে 'সুবহানাল্লাহ' বা 'মা শা আল্লাহ'; কাউকে ধন্যবাদ দিতে 'জাজাকাল্লাহু খাইরান'; হাঁচি দিলে 'আলহামদু লিল্লাহ'; আর তার জবাবে 'ইয়ারহামুক আল্লাহ'; কোনো পাপ থেকে দূরে থাকতে 'আসতাগফিরুল্লাহ' ইত্যাদি।

ধৈর্য: ওমরাহ বা হজের একটা বড় পরীক্ষা হলো ধৈর্য ধারণ করা, রেগে গেলে চলবে না। মনে রাখবেন, ওমরাহর সময় আগে ও পরে এমন অনেক বিষয় আপনাকে দেখতে হবে, যা আপনার ধৈর্য পরীক্ষা করবে। যে এজেন্সি আপনাকে নিয়ে যাচ্ছে, তাদের কথার সঙ্গে হয়তো কাজের মিল খুঁজে না-ও পেতে পারেন। তারা আপনাকে যা বলেছিল, তা হয়তো আপনি পাচ্ছেন না বা পাবেন না, অথবা বিমানভ্রমণে বা ইমিগ্রেশনে অথবা জেদ্দা এয়ারপোর্টের বাইরে আপনাকেবাসের জন্য অপেক্ষা করতে হতে পারে। কারও সঙ্গে এই সময় ঝগড়ায় লিপ্ত হবেন না, চেঁচামেচি করবেন না। মনে করবেন, আল্লাহ আপনার পরীক্ষা নিচ্ছেন এবং এটা তাঁরই ইচ্ছা; বরং এ সময় বেশি বেশি জিকির করুন।

কোন কোন দোয়া মুখস্থ করবেন

কাবা শরিফের চারদিকে ঘোরাকে বলা হয় তাওয়াফ আর এই তাওয়াফ সম্পন্ন করতে হয় কাবাঘরের সাতটি চক্করের মাধ্যমে। সাফা ও মারওয়া পাহাড়ে ছোটাছুটি করাকে বলা হয় সাঈ।

আপনাকে যেটা মুখস্থ করতে হবে, তার একটি হলো তালবিয়া। তবে এটি শুধু মুখস্থ করলে চলবে না, এগুলোর অর্থও আপনাকে জানতে হবে। তাহলেই আপনার ভেতরে এর অনুভূতিটা আসবে। তালবিয়া কী, তালবিয়ার কথা একটু পরে ওমরাহর ধারাবাহিকতায় আমরা বলব।

ওমরাহ কাকে বলে: হিল (হারামের সীমানার বাইরে মিকাতের ভেতরের স্থান) থেকে অথবা মিকাত থেকে ইহরামের নিয়ত করে বায়তুল্লাহ শরিফ তাওয়াফ করা, সাফা-মারওয়া সাঈ করা এবং মাথার চুল ফেলে দেওয়া বা ছোট করাকে 'ওমরাহ' বলে।

৯ থেকে ১৩ জিলহজ পর্যন্ত সময় ছাড়া বছরের যেকোনো সময় ওমরাহ পালন করা যায়। হজের পাঁচ দিন ওমরাহ করা মাকরুহ।

(আল-বাহরুল আমিক, ৪/২০২১)

রাসুলুল্লাহ (সা.) চারবার ওমরাহ করেছেন। প্রথমটি জিলকদ মাসে। এটি হুদাইবিয়ার ওমরাহ নামে পরিচিত। ষষ্ঠ হিজরিতে কাফেরদের প্রতিরোধের কারণে বায়তুল্লাহ শরিফে সে বছর যাওয়া হয়নি। হুদায়বিয়াতেই ইহরাম ত্যাগ করেছিলেন রাসুলুল্লাহ (সা.)। দ্বিতীয় ওমরাহ পালন করেছেন পরবর্তী বছরে, অর্থাৎ সপ্তম হিজরিতে। এটি কাজা ওমরাহ নামে পরিচিত। তৃতীয়টি ওমরাতুল জিরানা নামে পরিচিত। হুনাইন থেকে ফেরার পথে জিরানা থেকে ইহরাম বেঁধেছিলেন রাসুলুল্লাহ (সা.)। চতুর্থটি আদায় করেছেন বিদায় হজেরসঙ্গে। (বুখারি, হাদিস ১৭৭৮-৯)

ওমরাহর ফরজ ওয়াজিব: ওমরাহর ফরজ ২টি ১. ইহরাম।২. তাওয়াফ।

ওমরাহর ওয়াজিব ২টি: ১. সাঈ। ২. হলক করা।

ইহরামের ফরজ ২টি: ১ নিয়ত করা।২. তালবিয়া পড়া।

ইহরামের ওয়াজিব ২টি: ১. মিকাত থেকে ইহরাম বাঁধা। ২. নিষিদ্ধ কাজ থেকে বেঁচে থাকা।

তাওয়াফের ফরজ ৩টি: ১. নিয়ত করা। ২. বায়তুল্লাহ তাওয়াফ করা। ৩. নিজেতাওয়াফ করা।

তাওয়াফের ওয়াজিব ৬টি: ১. শরীর পাক। ২. হেঁটে তাওয়াফকরা। ৩. হাতিমের বাইরে দিয়ে তাওয়াফ করা। ৪. তাওয়াফের সাত চক্কর পুরো করা। ৫. তাওয়াফ হাজরে আসওয়াদ থেকে শুরু করা। ৬. তাওয়াফ শেষে মাকামে ইব্রাহিমের পেছনে দুই রাকাত নামাজ পড়া।

তাওয়াফের সুন্নত: ১. হাজরে আসওয়াদের দিকে মুখ করেতাওয়াফ শুরু করা। ২. প্রথম তিন তাওয়াফে রমল করা (বীরের মতো হেলেদুলে চলা)। ৩. প্রতি চক্করে সম্ভব হলে হাজরে আসওয়াদকে চুম্বন করা। ৪. তাওয়াফ ও নামাজ শেষে জমজমের পানি পান করা।

সাঈ মানে সাতটি দৌড়। সাঈ করার সময় সবুজ বাতির নিচে পুরুষেরা দৌড়াবেন। নারীরা স্বাভাবিকভাবে চলবেন।

(বাদায়েউস সানায়ে, ২/৪৮০)

সাঈর ওয়াজিব: ১. ওজর না থাকলে হেঁটে সাঈ করা। ২. সাত চক্কর পুরো করার পর মাথা মুণ্ডন করতে হবে।

ওমরাহর কাজ ধারাবাহিকভাবে করতে হবে, যেমন তাওয়াফ করা, নামাজ আদায় করা, জমজমের পানি পান করা, সাঈকরা (সাফা-মারওয়া পাহাড়ে দৌড়ানো), মাথা ন্যাড়া অথবা চুল ছোট করা।

মিকাত: মিকাত হলো সীমা। হজ ও ওমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে মক্কা গমনকারীদের কাবাঘর থেকে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ দূরত্ব থেকে ইহরাম করতে হয়। এ জায়গাগুলোকে মিকাত বলা হয়। হজের সময় হলো তিনটি মাস-শাওয়াল, জিলকদ ও জিলহজ মাস। ওমরাহর সময় হলো বছরের যেকোনো সময়।

(সুরা বাকারা, আয়াত: ১৯৭)

মিকাতের জন্য পাঁচটি নির্ধারিত স্থান রয়েছে। (বুখারি:১৫২৪; মুসলিম: ২৬৯৩)

মিকাতের নাম- ১. জুল হুলায়ফা: অন্য নাম আবিয়ারে আলী, মক্কা থেকে এর দূরত্ব ৪২০ কিলোমিটার। মদিনাবাসী ও যাঁরা এই পথ দিয়ে যাবেন। ২. আল-জুহফাহ: অন্য নাম রাবিগ, মক্কা থেকে এর দূরত্ব ১৮৬ কিলোমিটার। সিরিয়া, লেবানন, জর্ডান, ফিলিস্তিন, মিসর, সুদান, মরক্কো ও আফ্রিকার জন্য। ৩. ইয়ালামলাম: অন্য নাম আস সাদিয়া, মক্কা থেকেএর দূরত্ব ১২০ কিলোমিটার। নৌপথে ইয়েমেন, ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, চীন, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ এশিয়া, ইন্দোনেশিয়া থেকে যাঁরা আসবেন তাঁদের জন্য। ৪. কারনুল মানাজিল: অন্য নাম সাইলুল কাবির, মক্কা থেকেএর দূরত্ব ৭৮ কিলোমিটার। কাতার, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, ওমান, ইরাক ও ইরান এই পথে। ৫. জাতু ইরক: মক্কা থেকে এর দূরত্ব ১০০ কিলোমিটার।

যাঁরা মিকাতের সীমানার ভেতরে বসবাস করেন, তাঁদের অবস্থানই হলো তাঁদের মিকাত। অর্থাৎ যে যেখানে আছেন, সেখান থেকেই ওমরাহ বা হজের ইহরাম করবেন। তবে মক্কার হারাম এলাকার ভেতরে বসবাসকারী ব্যক্তি যদি ওমরাহ করতে চান, তবে তাঁকে হারাম এলাকার বাইরে গিয়ে, যেমন তানিম বা আয়েশা মসজিদে অথবা অনুরূপ কোথাও গিয়েইহরাম করবেন। (বুখারি: ১৫২৪)

ইহরাম করতে হবে: ইহরাম হলো একটি সার্বিক অবস্থা। মনে করুন, আপনি আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যাচ্ছেন; ঠিক যেমন মৃত্যুর পর কিয়ামতের দিন বান্দারা আল্লাহর সামনে দাঁড়াবেন। আপনি যেন আল্লাহর সামনে দুই টুকরা কাপড় পরে দাঁড়িয়েছেন এবং হাজিরা দিচ্ছেন।

ইহরামে আসার জন্য আপনাকে ইহরাম বাঁধার আগেই কিছু কাজ করে নিতে হবে। অনেকেই ইহরাম বলতে সাদা দুটি কাপড়ের টুকরাকে মনে করে থাকেন। আসলে (পুরুষদের জন্য) পরিধানের এই দুটি কাপড় ইহরাম নয়; বরং এটিইহরামের একটি অংশ, এদের বলে 'ইজার' ও 'রিদা'। 'ইজার' হলো লুঙ্গির মতো একটি সেলাইবিহীন কাপড় আর 'রিদা' হলো সেলাইবিহীন চাদর।

ওমরাহ ও হজ করার আগেই ইহরাম বাঁধতে হয়। যেদিন আপনার ফ্লাইট, সেদিন বিমানবন্দরে রওনা দেওয়ার আগে শুধু নিয়ত বাদে বাকি সব কাজ সেরে ফেলতে হবে। বিশেষ এই কাজগুলো হলো-

হাত ও পায়ের নখ ছোট করে কেটে ফেলুন।

অপ্রয়োজনীয় লোম বা চুল পরিষ্কার করে নিন। গোঁফ ছোট করে ছেঁটে নিন।

অজু ও গোসল করুন।

রিদা (ওপরের অংশ) ও ইজার (নিচের অংশ) পরিধান করুন।

নারীদের ইহরাম: পুরুষ ও নারীর ইহরামের কাপড়ে একটু ভিন্নতা আছে। নারীদের ইজার ও রিদা পরতে হয় না; বরং নারীরা যেকোনো রঙের বা প্রকারের কাপড় পরতে পারেন। তবে অবশ্যই লক্ষ রাখতে হবে যে কোনোভাবেই যেন এমন ধরনের কাপড় না পরা হয়, যাতে পর্দা নষ্ট হয় বা শরীরের আকৃতি বেরিয়ে আসে। রাসুল (সা.) নারীদের মুখ ঢাকতে নিষেধ করেছেন। পিরিয়ডকালে নারীদেরও ইহরাম ধারণ করতে বলা হয়েছে। তবে এ অবস্থায় তাঁরা যেন কোনো মসজিদে প্রবেশ না করেন।ঢাকা থেকে মক্কার উদ্দেশে যাঁরা উড়োজাহাজে উঠেছেন, তাঁরা পাইলটের ঘোষণার অপেক্ষা করুন অথবা, মিকাত আসার আগেই ওমরাহর নিয়ত করে নিন। আর যাঁরা মদিনা থেকে মক্কায় আসছেন, তাঁরা 'জুল হুলায়ফা' মসজিদে (মিকাত) এসে ইহরাম ধারণ করে ওমরাহর নিয়ত করুন।

নিয়ত: নিয়ত পড়ার বিষয় না, এটি হলো মনের সংকল্প। ঠিক যেমন আমরা নামাজের জন্য নিয়ত করে থাকি। আপনি ওমরাহর নিয়ত করে নিন-'লাব্বাইকা আল্লাহুম্মা ওমরাতান।'

অর্থ : 'হে আল্লাহ, এই যে আমি ওমরাহ করতে হাজির হয়েছি।' বাংলায়ও বলতে পারেন, 'হে আল্লাহ, আমি একটি ওমরাহর নিয়ত করলাম, সহজ করুন, কবুল করুন।'

এই নিয়ত যেকোনো ওয়াক্তের নামাজের পর করা ভালো। রাসুল (সা.) জোহরের নামাজের পর নিয়ত করেছিলেন। আপনার ফ্লাইটের সময়ের ওপর ভিত্তি করে নিয়ত করবেন। ইহরাম পরিপূর্ণ করার পর আপনি যেকোনো ওয়াক্তের নামাজ পড়ে নিন বা দুই রাকাত নফল নামাজ আদায় করে নিন। আপনি যদি উড়োজাহাজে থাকেন, তাহলে নিজের সিটে বসেই দুই রাকাত নফল নামাজ আদায় করে নিন।

এরপর তালবিয়া পাঠ করতে হবে। যত খুশি ততবার। পুরুষেরা জোর গলায় পড়বেন। আর নারীরা পড়বেন আস্তে আস্তে, যেন নিজে তাঁর পড়ার শব্দ শুনতে পান।

তালবিয়া: 'লাব্বাইক, আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা শারিকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হাম্দা ওয়ান নি'মাতা লাকা ওয়াল মুল্ক, লা শারিকা লাক।'

অর্থ: 'আমি হাজির, হে আল্লাহ আমি হাজির, এই যে আমি। আর তোমার কোনো শরিক নেই, আমি হাজির। সব প্রশংসা ও কর্তৃত্ব শুধু তোমারই আর তোমার কোনো শরিক নেই।'

(বুখারি, হাদিস: ১৫৪৯)

ইহরাম থাকা অবস্থায় যা যা করা যাবে না: ইহরাম থাকা অবস্থায় বেশ কিছু কাজ থেকে বিরত থাকতে হবে। যদি ইচ্ছাকৃতভাবে এই কাজগুলো সম্পাদন করা হয়, সে ক্ষেত্রে আপনাকে 'দম' বা পশু কোরবানি দিতে হবে। ইহরামরত অবস্থায় যে কাজগুলো করা যাবে না, সেগুলো হলো- চুল বা নখ কাটা। সুগন্ধি বা পারফিউম ব্যবহার করা। পুরুষেরা সেলাই করা কাপড় পরতে পারবেন না। নারীরা মুখ ঢাকতে পারবেন না বা হাতে গ্লাভস পরতে পারবেন না। পশু শিকার করা যাবে না। মশা, মাছিও মারা যাবে না। গাছ বা পাতা ছেঁড়া যাবে না। কারও পড়ে যাওয়া জিনিস ওঠানো যাবে না, যদি না ফেরত দেওয়ার জন্য ওঠানো হয়। স্বামী-স্ত্রী সহবাস করা যাবে না। কোনো ধরনের খারাপ কাজ করা যাবে না। ঝগড়া-বিবাদে লিপ্ত হওয়া যাবে না।

তবে ইহরাম থাকা অবস্থায় কিছু কাজ করা যেতে পারে। যেমন বেল্ট পরা, হিয়ারিং এইড, পাওয়ার চশমা পরা ইত্যাদি। গোসল করা। তবে সাবান হতে হবে গন্ধহীন। ইহরামের কাপড় ধোয়া বা নতুন ইহরামের কাপড় পরা ইত্যাদি।

মসজিদুল হারাম: মক্কা শহরের প্রাণকেন্দ্র হলো মসজিদুল হারাম। এটি পৃথিবীর বৃহত্তম মসজিদ। পবিত্র কোরআনে আছে, নিশ্চয় মানবজাতির জন্য প্রথম যে ঘর প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তা তো বাক্কায় (মক্কার অপর নাম), তা আশীর্বাদ ও বিশ্বজগতের দিশারি। (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ৯৬)

বায়তুল্লাহ বা আল্লাহর ঘর বা কাবাকে বায়তুল আতিক(প্রাচীন ঘর) বলা হয়। আল্লাহ এই ঘরকে অবিশ্বাসীদের থেকে স্বাধীন করেছেন। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এ ঘরের স্থানটি পৃথিবীর ভৌগোলিক মানচিত্রের কেন্দ্রে অবস্থিত।

পবিত্র কোরআনে বলা হয়, 'আর স্মরণ করো সেই সময়কে যখন আমি (কাবা) ঘরকে মানুষের মিলনক্ষেত্র ও আশ্রয়স্থল করেছিলাম। (আর আমি বলেছিলাম,) “তোমরা ইব্রাহিমের দাঁড়ানোর জায়গাকেই নামাজের জায়গারূপে গ্রহণ করো।” আর যখন আমি ইব্রাহিম ও ইসমাইলকে আদেশ করি যে 'তোমরা আমার ঘরকে পবিত্র রাখবে তাদের জন্য যারা এটা প্রদক্ষিণ করবে, এখানে বসে ইতিকাফ করবে এবং এখানে রুকু ও সিজদা করবে।' (সুরা বাকারা: আয়াত: ১২৫)

কাবা ও হজের ইতিহাসে রয়েছে ইব্রাহিম (আ.)-এর মহৎ ইসলামি আখ্যান। আল্লাহ তাআলা ইব্রাহিম (আ.)-কে তাঁর স্ত্রী হাজেরা (আ.) ও পুত্র ইসমাইল (আ.)-কে নিয়ে মরুময়, পাথুরে ও জনশূন্য মক্কার উপত্যকায় রেখে আসার নির্দেশ দেন, এটা ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি পরীক্ষা। প্রচণ্ড পিপাসার্ত ইসমাইল (আ.), তখন তাঁর মা হাজেরা (আ.) পানির সন্ধানে সাফা ও মারওয়া পাহাড়ে সাতবার ছোটাছুটি করেন। এরপর জিবরাইল (আ.) এসে শিশু ইসমাইল (আ.)-এর জন্য সৃষ্টি করলেন সুপেয় পানির কূপ-জমজম। আল্লাহর নির্দেশে ইব্রাহিম (আ.) ও ইসমাইল (আ.) দুজনে জমজম কূপের পাশে ইবাদতের লক্ষ্যে কাবার পুনর্নিমাণের কাজ শুরু করলেন।

মুহাম্মদ (সা.)-এর যুগে কাবা সংস্কারের সময় জান্নাতথেকে নিয়ে আসা পাথর 'হাজরে আসওয়াদ', যা কাবার কোণে স্থাপন করেন হজরত মুহাম্মদ (সা.)। কাবার এক পাশে একটি স্থান রয়েছে, যার নাম 'মাকামে ইব্রাহিম'; এখানে দাঁড়িয়ে ইব্রাহিম (আ.) কাবার নির্মাণকাজ পর্যবেক্ষণ করতেন, এখানে একটি পাথরে তাঁর পায়ের ছাপ রয়েছে। কাবাঘরের উত্তর দিকে কাবাসংলগ্ন অর্ধবৃত্তাকার একটি উঁচু দেয়াল আছে, যা কাবাঘরেরই অংশ, যার নাম 'হাতিম' বা 'হিজর'। হাজরে আসওয়াদ ও কাবাঘরের দরজার মাঝখানের স্থানকে 'মুলতাজম' বলা হয়। কাবাঘরকে বৃষ্টি ও ধুলাবালু থেকে রক্ষার জন্য একটি চাদর দিয়ে আবৃত করে রাখা হয়, যাকে 'গিলাফ' বলে।

কাবাঘরের মর্যাদার কারণে এর চারপাশে হারামের সীমানা আল্লাহ নির্ধারণ করে দিয়েছেন, যার পাহারায় নিয়োজিত আছেন ফেরেশতারা। হারামের সীমানার মধ্যে বরকত, রহমত ও নিরাপত্তা প্রদান করা হয়েছে। মুসলমানরা কাবাঘরের ইবাদত করেন না; বরং কাবার রবের ইবাদত করেন। কাবা হচ্ছে 'কিবলা', যা মুসলিমদের ইবাদতের দিকনির্ণায়ক।

কাবার উচ্চতা ১৪ মিটার। মুলতাজমের দিকে দৈর্ঘ্য ১২ দশমিক ৮৪ মিটার, হাতিমের দিকে দৈর্ঘ্য ১১ দশমিক ২৮ মিটার, রুকনে ইয়ামেনি ও হাতিমের মাঝখানের দৈর্ঘ্য ১২ দশমিক ১১ মিটার, হাজরে আসওয়াদ ও রুকনে ইয়ামেনির মাঝখানের দৈর্ঘ্য ১১ দশমিক ৫২ মিটার।

মসজিদুল হারামে এক রাকাত নামাজ আদায় অন্য মসজিদে এক লাখ রাকাত নামাজ আদায়ের সমান সওয়াব।

আর মদিনার মসজিদে নববিতে এক রাকাত নামাজ আদায় অন্য মসজিদে এক হাজার রাকাত নামাজ আদায়ের সমান সওয়াব। (ইবনে মাজাহ: ১৪০৬)

সম্পূর্ণ মসজিদে এসির ব্যবস্থা আছে। কিং ফাহাদসহ কয়েকটি গেটের দুই পাশের সিঁড়ি দিয়ে মসজিদের নিচে বেজমেন্ট ফ্লোরে যাওয়া যায়, যেখানে নামাজের ব্যবস্থা আছে।

মসজিদুল হারামের গেট দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করার সময় খেয়াল রাখবেন, গেটের ওপরে 'সবুজ আলো অর্থাৎ প্রবেশ' অথবা 'লাল আলো অর্থাৎ প্রবেশ নয়' লেখা আছে।

মসজিদুল হারামের ভেতরে ও বাইরে

মসজিদের ভেতরে ও বাইরের চত্বরে সব জায়গায় মেঝেতে কাতারের দাগ দেওয়া আছে। নামাজের সময় ওই কাতারের দাগে দাঁড়ালে কিবলামুখী হওয়া হয়ে যায়। মসজিদুল হারামের ভেতরে প্রবেশের জন্য ১০০টির বেশি গেট রয়েছে। মসজিদের ওপরতলায় ওঠার জন্য সিঁড়ি ও এস্কেলেটরের ব্যবস্থা আছে। মসজিদের ভেতরে ও বাইরে পান করার জন্য জমজমের পানি সম্পূর্ণ উন্মুক্ত এবং মক্কা লাইব্রেরির পাশ থেকে বড় বোতলে কূপের পানি নিয়ে আসা যায়।

মসজিদের ভেতরে অসংখ্য বুকশেলফ রয়েছে, সেখান থেকে পবিত্র কোরআন নিয়ে তিলাওয়াত করতে পারবেন।

মারওয়া পাহাড়ের পাশে বেজমেন্ট ওয়াশরুমের ছাদের ওপর হারানো ও পাওয়া জিনিসের খোঁজ নেওয়ার অফিস আছে। মসজিদের বাইরে বেশ কিছু লাগেজ লকার পাবেন,যেখানে দামি ও মূল্যবান সামগ্রী রাখতে পারেন। অসুস্থ বা দুর্বলদের জন্য টাকার বিনিময়ে তাওয়াফ ও সাঈ করার জন্য মসজিদে হুইলচেয়ার, ব্যাটারিচালিত গাড়ি পাওয়া যায়। মসজিদের প্রতিটি গেটে নিরাপত্তাকর্মী থাকেন ও সন্দেহজনক ব্যাগ চেক করেন। তাঁরা সাধারণত বড় ব্যাগ নিয়ে মসজিদে প্রবেশ করতে দেন না।

মসজিদুল হারামের কয়েকজন ইমামের নাম

১. আবদুর রহমান আল-সুদাইস, ১৯৮৪ সালে ইমাম এবং খতিব হিসেবে নিযুক্ত হন।

২. সালেহ বিন আবদুল্লাহ আল-হুমাইদ, ১৯৮৪ সালে ইমাম এবং খতিব হিসেবে নিযুক্ত হন।

৩. ওসামা আবদুল আজিজ আল-খায়য়াত, ১৯৯৮ সালে ইমাম এবং খতিব হিসেবে নিযুক্ত হন।

৪. মাহের আল-মুআইকলি, ২০০৭ সালে ইমাম এবং ২০১৬ সালে, খতিব হিসেবে নিযুক্ত হন।

৫. ফয়সাল জামিল গাজ্জাবি, ২০০৮ সালে ইমাম এবং খতিব হিসেবে নিযুক্ত হন।

৬. আবদুল্লাহ আওয়াদ আল জুহানি, ২০০৭ সালে, ইমাম এবং ২০১৯ সালে, খতিব হিসেবে নিযুক্ত হন।

৭. বান্দার বালিলাহ, ২০১৩ সালে ইমাম এবং ২০১৯ সালে খতিব হিসেবে নিযুক্ত হন।

৮. ইয়াসির আদ-দৌসারি, ২০১৫ সালে তারাবিহর ইমাম এবং ২০২২ সালে খতিব নিযুক্ত হন।

৯. বদর আল তুর্কি, ২০২৪ সালে ইমাম নিযুক্ত হন।

১০. ওয়ালিদ আশ-শামসান, ২০২৪ সালে ইমাম নিযুক্ত হন।

মক্কায় প্রবেশের পর প্রথম আমল ওমরাহ পালন

মক্কায় প্রবেশের পর প্রথম আমল হলো ওমরাহ করা। কিন্তু অনেকেই মক্কায় ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে ওমরাহর জন্য এমন ব্যস্ত হয়ে ওঠেন যে হোটেল-বিশ্রাম সবকিছু ভুলে যান। সেটি করার প্রয়োজন নেই। তাতে নতুন একটি স্থানে গিয়ে আগে হোটেলে উঠুন, কিছুটা সময় বিশ্রাম নিন, কিছু খাবার খেয়ে নিন। এরপর আপনার এজেন্সির লোকদের সঙ্গে পরিকল্পনা অনুযায়ী একটি নির্দিষ্ট সময়ে ও জায়গায় মিলিত হয়ে ওমরাহর জন্য রওনা হোন। বেশি বেশি তালবিয়া পাঠ করতে থাকুন।

মক্কার হারাম শরিফ অনেক বড়। তাই এখানে হারিয়ে যাওয়া আশ্চর্যের কিছু নয়। হোটেলের আশপাশের কিছু বিশেষ ল্যান্ডমার্ক (যেমন ক্লক টাওয়ার) বা বিল্ডিং চিনে নিন এবং এগুলো মনে রাখুন, ফিরতে সুবিধা হবে। সবচেয়ে ভালো হয়, যদি আপনারা বিমানবন্দর থেকে অথবা হোটেলের আশপাশ থেকে একটি সৌদি সিমকার্ড কিনে নিতে পারেন। সঙ্গে মুঠোফোন থাকলে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা কম থাকে। হোটেল থেকে ঠিকানাযুক্ত কার্ড নিন; আপনার আইডি কার্ডটিও নিন। এবার এগুলো বেল্টের পকেটে সাবধানতার সঙ্গে সংরক্ষণ করুন। মনে রাখবেন, আইডি কার্ডটি এখন আপনার পাসপোর্ট। কারণ, মক্কায় আপনার পাসপোর্ট কিন্তু জমা নিয়ে নেবে এবং এটি আপনার বাংলাদেশে ফেরার সময় বা এর আগের দিনফেরত পাবেন। তাই আপনার আইডি কার্ডটি যাতে কোনোভাবে হারিয়ে না যায়। হারিয়ে গেলে অনেক বড় ঝামেলা পোহাতে হতে পারে। যাহোক, রওনা হওয়ার আগে নিশ্চিত হয়ে নিন কোন জায়গায় আবার মিলিত হবেন (যদি কেউ হারিয়ে যায়)। ক্লক টাওয়ার বা গেট নম্বর ১ বা কিং আবদুল আজিজ গেট সবার পরিচিত। মসজিদুল হারামে রয়েছে চারটি ফ্লোর-বেজমেন্ট, গ্রাউন্ড, মিডল ও ছাদ। আবার একটি অংশে ওপরে ওঠার জন্য রয়েছে এস্কেলেটর ও এসি (শীতাতপনিয়ন্ত্রিত) এলাকা। মসজিদে ঢোকার সময় সব ব্যাগ চেক হয়। বড় কোনো হাতব্যাগ বা কোনো ধরনের খাবার নিয়ে নিয়ে প্রবেশ করা যায় না। অবশ্য ছোট্ট পানির বোতল নেওয়া যায়, যাতে পরে জমজমের পানি ভরে নিয়ে আসতে পারেন।

তাওয়াফ শুরু হয় হাজরে আসওয়াদ বরাবর থেকে

হাজরে আসওয়াদ বরাবর কোণ থেকে শুরু হয়ে কাবাঘরের পরবর্তী কোণ রুকনে ইরাকি। এরপর যথাক্রমে রুকনে শামি (এই দুই কোণের মাঝামাঝি স্থান মিজাবে রহমত ও হাতিম) ও রুকনে ইয়ামেনি। এটা ঘুরে আবার হাজরে আসওয়াদ বরাবর এলে তাওয়াফের এক চক্কর পূর্ণ হয়। এভাবে একে একে সাত চক্কর দিতে হয়।

মসজিদুল হারামে ঢোকার আগে প্রথম তাওয়াফে পুরুষদের ইহরামের কাপড় একটু অন্যভাবে পরতে হয়। শুধু ইহরামের ওপরের অংশটি (রিদা) ডান কাঁধের ওপর থেকে সরিয়ে হাতের নিচ থেকে নিয়ে নিতে হবে, এ অবস্থাকে বলাহয় 'ইজতিবা'।

বিষয়:

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

১

ওমরাহ সম্পর্কে জানার চেষ্টা করি

২

এখন কমলা খাওয়ার সময়

৩

রাতে মোজা পরে ঘুমালে শরীরে যা হয়

৪

শীতে অলসতা কাটাতে যা করবেন

৫

শিশুর সৃজনশীলতা বাড়াতে তাকে একা থাকতে দিন

সম্পর্কিত

এখন কমলা খাওয়ার সময়

এখন কমলা খাওয়ার সময়

০৫ ডিসেম্বর ২০২৫
রাতে মোজা পরে ঘুমালে শরীরে যা হয়

রাতে মোজা পরে ঘুমালে শরীরে যা হয়

০১ ডিসেম্বর ২০২৫
শীতে অলসতা কাটাতে যা করবেন

শীতে অলসতা কাটাতে যা করবেন

০১ ডিসেম্বর ২০২৫
শিশুর সৃজনশীলতা বাড়াতে তাকে একা থাকতে দিন

শিশুর সৃজনশীলতা বাড়াতে তাকে একা থাকতে দিন

২৭ নভেম্বর ২০২৫