• কুমিল্লা সিটি করপোরেশন
  • কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়
  • আদর্শ সদর
  • বরুড়া
  • লাকসাম
  • দাউদকান্দি
  • আরও
    • চৌদ্দগ্রাম
    • সদর দক্ষিণ
    • নাঙ্গলকোট
    • বুড়িচং
    • ব্রাহ্মণপাড়া
    • মনোহরগঞ্জ
    • লালমাই
    • চান্দিনা
    • মুরাদনগর
    • দেবীদ্বার
    • হোমনা
    • মেঘনা
    • তিতাস
  • সর্বশেষ
  • রাজনীতি
  • বাংলাদেশ
  • অপরাধ
  • বিশ্ব
  • বাণিজ্য
  • মতামত
  • খেলা
  • বিনোদন
  • চাকরি
  • জীবনযাপন
  • ইপেপার
  • ইপেপার
facebooktwittertiktokpinterestyoutubelinkedininstagramgoogle
স্বত্ব: ©️ আমার শহর

সম্পাদক ও প্রকাশক : মো. গাজীউল হক ভূঁইয়া ( সোহাগ)।

নাহার প্লাজা, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা-৩৫০০

ই-মেইল: [email protected]

ফোন: 01716197760

> মতামত

শ্রদ্ধাঞ্জলি

সুরশিল্পী শচীন দেববর্মন

শাহজাহান চৌধুরী
প্রকাশ : ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ১১: ৪৫
logo

সুরশিল্পী শচীন দেববর্মন

শাহজাহান চৌধুরী

প্রকাশ : ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ১১: ৪৫
Photo

এক সময়ের সাংস্কৃতিক রাজধানী বৃহত্তর কুমিল্লায় সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশের বহু সংগীত ব্যক্তিত্ব জন্মগ্রহণ করেন। সুর সম্রাট আলাউদ্দিন খাঁ, আয়াত আলী খাঁ, ওস্তাদ মোহাম্মদ খসরু, মনমোহন দত্ত, লব চন্দ্র শীল, আফতাব উদ্দিন আহমেদ, হিমাংশু দত্ত, দিলীপ সিংহ রায়, সুখেন্দু চক্রবর্ত্তী, কুলেন্দু দাস, শ্যামাচরণ দত্ত, ওস্তাদ জানু মিয়া, অজয় ভট্টাচার্য, সুরেন দাস, সুবল দাস, শ্যাফাল রায় এবং আরও অসংখ্য সুর স্রষ্টার জন্মস্থান এই কুমিল্লায়। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সংগীত ও সাহিত্য প্রতিভাও গড়ে উঠেছিল এই কুমিল্লায়।

উপমহাদেশের জনপ্রিয় সঙ্গীতজ্ঞ শচীন দেববর্মনের জন্ম ১৯০৬ সালের ১ অক্টোবর কুমিল্লা পৌর এলাকার নবাববাড়ি সংলগ্ন দক্ষিণ চর্থায়। শচীন দেববর্মনের পিতা নবদ্বীপ কুমার বর্মণ ছিলেন তৎকালীন ত্রিপুরার মহারাজ বীরচন্দ্র মানিক্য বাহাদুরের সৎ ভাই। বীরচন্দ্র মানিক্য বাহাদুরের সৎ মা পটরাণীর পুত্র নবদ্বীপ বর্মন ছিলেন শিক্ষাদীক্ষা-সংস্কৃতিতে চৌকস। তাই বীরচন্দ্র মানিক্য বাহাদুর তার পথের কাঁটা দূর করার জন্য নবদ্বীপ কুমার বর্মনকে হত্যা করা চেষ্টা করে। তখন শচীন দেববর্মনের পিতা রাজবাড়ির কর্মকর্তা শ্রী কৈলাস সিংহের পরামর্শে ১৮৭০ সালের মাঝামাঝি সময়ে সপরিবারে কুমিল্লায় চলে এসে বসতি স্থাপন করেন এবং সিংহাসনের দাবি ছেড়ে দেন। এই কৈলাস সিংহই ত্রিপুরা রাজ্যের ইতিহাস গ্রন্থ রাজমালার রচয়িতা। এ বাড়িতেই শচীন দেববর্মনের শিশুকাল, কিশোরকাল ও যৌবনের কিয়দংশ অতিবাহিত হয়। কুমিল্লা শহরের ইউসুফ স্কুলে তার শিক্ষা জীবন শুরু এবং পর তিনি জিলা স্কুল থেকে এন্ট্রান্স পাস করে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে ১৯২৪ সালে বিএ পাস করেন। ততদিনে তিনি হয়ে গেছেন সঙ্গীতানুরাগী। গানের নেশায় রাজ পরিবারের আদরের দুলাল শচীন চষে বেড়িয়েছেন গ্রাম থেকে গ্রামান্তর। ত্রিপুরার বাঁশি ছিল তার নিত্যদিনের সহযাত্রী। 'বাঁশি শুনে আর কাজ নেই, সে যে ডাকাতিয়া বাঁশি' গানের মূর্ছনা এখনও সঙ্গীতানুরাগীদের হৃদয়ে দোলার সৃষ্টি করে। সুরের তাগিদে তিনি নৌকার মাঝি-মাল্লাদের সঙ্গে কত বিনিদ্র রাত কাটিয়েছেন তার হিসাব করা দুষ্কর।

"কে যাসরে ভাটি গাঙ বাইয়া

আমার ভাই ধনরে কইও নাইওর নিত আইয়া"

তার বিখ্যাত গানগুলোর একটি, যা রচিত হয়েছিল তখন। কুমিল্লায় বসবাসকালে এখানকার লোকালয়ের সঙ্গে শচীন কর্তার সম্যক পরিচয় ঘটেছিল। বিশালচন্দ্র দেবের অভিমত, শচীন দেববর্মনের সুরের মূল সম্পদ আহরিত হয়েছিল পূর্ব বঙ্গের বাউল, ভাটিয়ালি, কীর্তন গান থেকে। কলকাতা শচীন দেববর্মনকে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে। মুম্বাই দিয়েছে সুরের জগতে পৃথিবীব্যাপী খ্যাতি। শচীন কর্তার তার নিজ মুখেই বলেছেন, পূর্ব বঙ্গের এমন কোন অঞ্চল, পথ নেই, এমন কোন নদী নেই যেখানে আমি না ঘুরেছি। ছুটি ও পড়াশোনার ফাঁকে আমি গান সংগ্রহ করতাম। যে সম্পদের জোরে আমি সুরের সেবা করে চলেছি, তার আদি হল আমার ওইসব দিনের সংগ্রহ।'

'নিশিতে যাইও ফুল বনে রে ভ্রমরা নিশিতে যাইও ফুল বনে' অথবা 'তুমি এসেছিলে পরশু কাল কেন আসনি, তবে কি তুমি আমায় বন্ধু কাল ভালবাসনি'। নিজের সুরা করা লোকজ সংগীত ছিল তার প্রধান গান। তিনি লোকজ সংগীত ও ভারতীয় মার্গ সংগীতের সংমিশ্রণে নিজস্ব ঘরানার সৃষ্টি করেন। ভারত সরকার তাঁকে পদ্মশ্রী খেতাবে ভূষিত করে। এ পদক প্রদান করেন ভারতে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ড. জাকির হোসেন। ১৯২৪ সালে তিনি উচ্চ শিক্ষার্থে কলকাতা চলে যান এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যে এমএ শ্রেণীতে ভর্তি হন। সঙ্গীতের টানে এক বছরের মাথায় তিনি লেখাপড়া ছেড়ে দেন এবং সম্পূর্ণ নিজেকে সংগীতে সমর্পণ করেন। কলকাতার জীবনে আবার কুমিল্লার তিন বন্ধুর মিলন হয় গীতিকার অজয়, সুরকার হিমাংশু আর কন্ঠ শচীন। পরে অবশ্য শচীন নিজের গান নিজেই সুর করেন। কলকাতায় শাস্ত্রীয় সংগীতে উৎসাহী হয়ে সর্বপ্রথম অন্ধ সঙ্গীতজ্ঞ কৃষ্ণ চন্দ্র দে'র শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন, পরে ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায় ও ওস্তাদ বদর খাঁর কাছে তালিম নেন। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে কুমিল্লায় শচীন দেববর্মনের বিশেষ সখ্য গড়ে ওঠে, যা কলকাতায় আরও ঘনিষ্ঠ হয়। কবি নজরুল শচীন কর্তার সঙ্গে প্রায়শ মিলিত হতেন সৃজনশীল আড্ডায়।

কলকাতায় তার বাংলা গানের রেকর্ড বেরিয়েছিল ১৩১টি। তার মধ্যে নিজের সুরে ১১৪টি। গীতিকারদের মধ্যে সর্বোচ্চ ৪১টি গান করেছেন বাল্যবন্ধু অজয় ভট্টাচার্য। মাত্র ৩৮ বছরে অজয় ভট্টাচার্য মৃত্যুবরণ করেন। না হয় এ সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পেত। অজয় ভট্টাচার্য মোট দেড় হাজার গান লিখেছেন। শচীন দেবের প্রথম রেকর্ড বের হয় ১৯৩২ সালে হিন্দুস্থান মিউজিক প্রোডাক্টস থেকে। এইচএমভিতে রেকর্ড শুরু হয় ১৯৪৭ সাল থেকে। চলচ্চিত্রে তিনি প্রথম সংগীত পরিচালনা করেন 'রাজনী' ছবিতে। মোট ১৩টি বাংলা ছবিতে সঙ্গীত পরিচালনা করেন। হিন্দি ছবি 'শিকারি' তে প্রথম সংগীত পরিচালনা করেন। তিনি নজরুলের কথা ও সুরে ৪টি গান রেকর্ড করেন।

১৯৩৪ সালে এলাহাবাদে অল ইন্ডিয়া মিউজিক কনফারেন্সে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে তার অবস্থান আরও সম্মানজনক পর্যায়ে পৌঁছে। ১৯৩০ সালে পিতার মৃত্যুর পর তিনি মানসিক আঘাত পান এবং অর্থনৈতিক দুরাবস্থার মধ্যে পড়েন। তিনি কলকাতার নিবাস 'ত্রিপুরা প্যালেস' ছেড়ে দিয়ে কম ভাড়ার ছোট্ট বাসা নিয়ে থাকতে শুরু করেন। ১৯৩৮ সালে হাইকোর্টের জজ কমল নাথ দাশ গুপ্তের দৌহিত্রী এবং তারই গানের ছাত্রী মীরা ধর গুপ্তকে বিয়ে করেন। মীরাও ছিলেন সংগীত শিল্পী ও গীতিকার। ১৯৩৯ সালে তাদের সন্তান রাহুল দেববর্মনের জন্ম হয় (যিনি আরডি বর্মন হিসেবে খ্যাত)। তার পুত্রবধূ আশা ভোঁসলে। ভারতীয় উপমহাদেশের সঙ্গীতের আরেক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তার স্ত্রী মীরা দেবীও একজন সুগায়িকা ছিলেন। ১৯৩৯-৪০ সালে দুই বছর তিনি বাম ধারার সংগঠন গণনাট্য সংঘের, সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি এ সংগঠনের লোক সংগীত বিভাগের সভাপতি ছিলেন। এ সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলরাজ সাহানী, পণ্ডিত রবিশঙ্কর, সলিল চৌধুরী, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, সুচিত্রা মিত্র, বীনা রায়, দেবব্রত বিশ্বাস সহ বহু গুণী শিল্পী। ১৯৪২ সালে মুম্বাইয়ের রঞ্জিত স্টুডিও'র মালিক চণ্ডুলাল শা শচীন দেব বর্মণকে সঙ্গীত পরিচালক পদে যোগ দিতে আহ্বান জানান। কিন্তু তিনি যাননি। বাংলা গানের প্রতি ও বাঙালি জীবন তাকে কলকাতায় টেনে রেখেছিল। ১৯৪৪ সালে আবার মুম্বাই থেকে ডাক এলে তিনি কলকাতা ছেড়ে মুম্বাই চলে যান। সেখানে তিনি ছবিতে সংগীত পরিচালকের দায়িত্ব পেতে শুরু করেন। 'ট্যাক্সি ড্রাইভার' ছবির জন্য ফিল্ম ফেয়ার পুরস্কার লাভ করেন। পিয়াসা ছবিতে সুরারোপের জন্য এশিয়ান ফিল্ম সোসাইটি পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৬২ সালে তিনি হেলসিঙ্কি, ফিনল্যান্ড আন্তর্জাতিক সঙ্গীত প্রতিযোগিতায় অন্যতম বিচারক ছিলেন। তিনি লাভ করেন 'সন্তহরিদাস' পুরস্কারসহ আরও অনেক পুরস্কার। ১৯৭৫ সালে ৩১ অক্টোবর তিনি মুম্বাইতে মৃত্যুবরণ করেন। তার শেষকৃত্য অনুষ্ঠান সেখানেই সম্পন্ন হয়।

শচীন দেববর্মনের ৫১তম মৃত্যু বার্ষিকীতে জানাই শ্রদ্ধাঞ্জলি।

শাহজাহান চৌধুরী: সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব

Thumbnail image

এক সময়ের সাংস্কৃতিক রাজধানী বৃহত্তর কুমিল্লায় সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশের বহু সংগীত ব্যক্তিত্ব জন্মগ্রহণ করেন। সুর সম্রাট আলাউদ্দিন খাঁ, আয়াত আলী খাঁ, ওস্তাদ মোহাম্মদ খসরু, মনমোহন দত্ত, লব চন্দ্র শীল, আফতাব উদ্দিন আহমেদ, হিমাংশু দত্ত, দিলীপ সিংহ রায়, সুখেন্দু চক্রবর্ত্তী, কুলেন্দু দাস, শ্যামাচরণ দত্ত, ওস্তাদ জানু মিয়া, অজয় ভট্টাচার্য, সুরেন দাস, সুবল দাস, শ্যাফাল রায় এবং আরও অসংখ্য সুর স্রষ্টার জন্মস্থান এই কুমিল্লায়। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সংগীত ও সাহিত্য প্রতিভাও গড়ে উঠেছিল এই কুমিল্লায়।

উপমহাদেশের জনপ্রিয় সঙ্গীতজ্ঞ শচীন দেববর্মনের জন্ম ১৯০৬ সালের ১ অক্টোবর কুমিল্লা পৌর এলাকার নবাববাড়ি সংলগ্ন দক্ষিণ চর্থায়। শচীন দেববর্মনের পিতা নবদ্বীপ কুমার বর্মণ ছিলেন তৎকালীন ত্রিপুরার মহারাজ বীরচন্দ্র মানিক্য বাহাদুরের সৎ ভাই। বীরচন্দ্র মানিক্য বাহাদুরের সৎ মা পটরাণীর পুত্র নবদ্বীপ বর্মন ছিলেন শিক্ষাদীক্ষা-সংস্কৃতিতে চৌকস। তাই বীরচন্দ্র মানিক্য বাহাদুর তার পথের কাঁটা দূর করার জন্য নবদ্বীপ কুমার বর্মনকে হত্যা করা চেষ্টা করে। তখন শচীন দেববর্মনের পিতা রাজবাড়ির কর্মকর্তা শ্রী কৈলাস সিংহের পরামর্শে ১৮৭০ সালের মাঝামাঝি সময়ে সপরিবারে কুমিল্লায় চলে এসে বসতি স্থাপন করেন এবং সিংহাসনের দাবি ছেড়ে দেন। এই কৈলাস সিংহই ত্রিপুরা রাজ্যের ইতিহাস গ্রন্থ রাজমালার রচয়িতা। এ বাড়িতেই শচীন দেববর্মনের শিশুকাল, কিশোরকাল ও যৌবনের কিয়দংশ অতিবাহিত হয়। কুমিল্লা শহরের ইউসুফ স্কুলে তার শিক্ষা জীবন শুরু এবং পর তিনি জিলা স্কুল থেকে এন্ট্রান্স পাস করে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে ১৯২৪ সালে বিএ পাস করেন। ততদিনে তিনি হয়ে গেছেন সঙ্গীতানুরাগী। গানের নেশায় রাজ পরিবারের আদরের দুলাল শচীন চষে বেড়িয়েছেন গ্রাম থেকে গ্রামান্তর। ত্রিপুরার বাঁশি ছিল তার নিত্যদিনের সহযাত্রী। 'বাঁশি শুনে আর কাজ নেই, সে যে ডাকাতিয়া বাঁশি' গানের মূর্ছনা এখনও সঙ্গীতানুরাগীদের হৃদয়ে দোলার সৃষ্টি করে। সুরের তাগিদে তিনি নৌকার মাঝি-মাল্লাদের সঙ্গে কত বিনিদ্র রাত কাটিয়েছেন তার হিসাব করা দুষ্কর।

"কে যাসরে ভাটি গাঙ বাইয়া

আমার ভাই ধনরে কইও নাইওর নিত আইয়া"

তার বিখ্যাত গানগুলোর একটি, যা রচিত হয়েছিল তখন। কুমিল্লায় বসবাসকালে এখানকার লোকালয়ের সঙ্গে শচীন কর্তার সম্যক পরিচয় ঘটেছিল। বিশালচন্দ্র দেবের অভিমত, শচীন দেববর্মনের সুরের মূল সম্পদ আহরিত হয়েছিল পূর্ব বঙ্গের বাউল, ভাটিয়ালি, কীর্তন গান থেকে। কলকাতা শচীন দেববর্মনকে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে। মুম্বাই দিয়েছে সুরের জগতে পৃথিবীব্যাপী খ্যাতি। শচীন কর্তার তার নিজ মুখেই বলেছেন, পূর্ব বঙ্গের এমন কোন অঞ্চল, পথ নেই, এমন কোন নদী নেই যেখানে আমি না ঘুরেছি। ছুটি ও পড়াশোনার ফাঁকে আমি গান সংগ্রহ করতাম। যে সম্পদের জোরে আমি সুরের সেবা করে চলেছি, তার আদি হল আমার ওইসব দিনের সংগ্রহ।'

'নিশিতে যাইও ফুল বনে রে ভ্রমরা নিশিতে যাইও ফুল বনে' অথবা 'তুমি এসেছিলে পরশু কাল কেন আসনি, তবে কি তুমি আমায় বন্ধু কাল ভালবাসনি'। নিজের সুরা করা লোকজ সংগীত ছিল তার প্রধান গান। তিনি লোকজ সংগীত ও ভারতীয় মার্গ সংগীতের সংমিশ্রণে নিজস্ব ঘরানার সৃষ্টি করেন। ভারত সরকার তাঁকে পদ্মশ্রী খেতাবে ভূষিত করে। এ পদক প্রদান করেন ভারতে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ড. জাকির হোসেন। ১৯২৪ সালে তিনি উচ্চ শিক্ষার্থে কলকাতা চলে যান এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যে এমএ শ্রেণীতে ভর্তি হন। সঙ্গীতের টানে এক বছরের মাথায় তিনি লেখাপড়া ছেড়ে দেন এবং সম্পূর্ণ নিজেকে সংগীতে সমর্পণ করেন। কলকাতার জীবনে আবার কুমিল্লার তিন বন্ধুর মিলন হয় গীতিকার অজয়, সুরকার হিমাংশু আর কন্ঠ শচীন। পরে অবশ্য শচীন নিজের গান নিজেই সুর করেন। কলকাতায় শাস্ত্রীয় সংগীতে উৎসাহী হয়ে সর্বপ্রথম অন্ধ সঙ্গীতজ্ঞ কৃষ্ণ চন্দ্র দে'র শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন, পরে ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায় ও ওস্তাদ বদর খাঁর কাছে তালিম নেন। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে কুমিল্লায় শচীন দেববর্মনের বিশেষ সখ্য গড়ে ওঠে, যা কলকাতায় আরও ঘনিষ্ঠ হয়। কবি নজরুল শচীন কর্তার সঙ্গে প্রায়শ মিলিত হতেন সৃজনশীল আড্ডায়।

কলকাতায় তার বাংলা গানের রেকর্ড বেরিয়েছিল ১৩১টি। তার মধ্যে নিজের সুরে ১১৪টি। গীতিকারদের মধ্যে সর্বোচ্চ ৪১টি গান করেছেন বাল্যবন্ধু অজয় ভট্টাচার্য। মাত্র ৩৮ বছরে অজয় ভট্টাচার্য মৃত্যুবরণ করেন। না হয় এ সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পেত। অজয় ভট্টাচার্য মোট দেড় হাজার গান লিখেছেন। শচীন দেবের প্রথম রেকর্ড বের হয় ১৯৩২ সালে হিন্দুস্থান মিউজিক প্রোডাক্টস থেকে। এইচএমভিতে রেকর্ড শুরু হয় ১৯৪৭ সাল থেকে। চলচ্চিত্রে তিনি প্রথম সংগীত পরিচালনা করেন 'রাজনী' ছবিতে। মোট ১৩টি বাংলা ছবিতে সঙ্গীত পরিচালনা করেন। হিন্দি ছবি 'শিকারি' তে প্রথম সংগীত পরিচালনা করেন। তিনি নজরুলের কথা ও সুরে ৪টি গান রেকর্ড করেন।

১৯৩৪ সালে এলাহাবাদে অল ইন্ডিয়া মিউজিক কনফারেন্সে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে তার অবস্থান আরও সম্মানজনক পর্যায়ে পৌঁছে। ১৯৩০ সালে পিতার মৃত্যুর পর তিনি মানসিক আঘাত পান এবং অর্থনৈতিক দুরাবস্থার মধ্যে পড়েন। তিনি কলকাতার নিবাস 'ত্রিপুরা প্যালেস' ছেড়ে দিয়ে কম ভাড়ার ছোট্ট বাসা নিয়ে থাকতে শুরু করেন। ১৯৩৮ সালে হাইকোর্টের জজ কমল নাথ দাশ গুপ্তের দৌহিত্রী এবং তারই গানের ছাত্রী মীরা ধর গুপ্তকে বিয়ে করেন। মীরাও ছিলেন সংগীত শিল্পী ও গীতিকার। ১৯৩৯ সালে তাদের সন্তান রাহুল দেববর্মনের জন্ম হয় (যিনি আরডি বর্মন হিসেবে খ্যাত)। তার পুত্রবধূ আশা ভোঁসলে। ভারতীয় উপমহাদেশের সঙ্গীতের আরেক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তার স্ত্রী মীরা দেবীও একজন সুগায়িকা ছিলেন। ১৯৩৯-৪০ সালে দুই বছর তিনি বাম ধারার সংগঠন গণনাট্য সংঘের, সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি এ সংগঠনের লোক সংগীত বিভাগের সভাপতি ছিলেন। এ সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলরাজ সাহানী, পণ্ডিত রবিশঙ্কর, সলিল চৌধুরী, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, সুচিত্রা মিত্র, বীনা রায়, দেবব্রত বিশ্বাস সহ বহু গুণী শিল্পী। ১৯৪২ সালে মুম্বাইয়ের রঞ্জিত স্টুডিও'র মালিক চণ্ডুলাল শা শচীন দেব বর্মণকে সঙ্গীত পরিচালক পদে যোগ দিতে আহ্বান জানান। কিন্তু তিনি যাননি। বাংলা গানের প্রতি ও বাঙালি জীবন তাকে কলকাতায় টেনে রেখেছিল। ১৯৪৪ সালে আবার মুম্বাই থেকে ডাক এলে তিনি কলকাতা ছেড়ে মুম্বাই চলে যান। সেখানে তিনি ছবিতে সংগীত পরিচালকের দায়িত্ব পেতে শুরু করেন। 'ট্যাক্সি ড্রাইভার' ছবির জন্য ফিল্ম ফেয়ার পুরস্কার লাভ করেন। পিয়াসা ছবিতে সুরারোপের জন্য এশিয়ান ফিল্ম সোসাইটি পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৬২ সালে তিনি হেলসিঙ্কি, ফিনল্যান্ড আন্তর্জাতিক সঙ্গীত প্রতিযোগিতায় অন্যতম বিচারক ছিলেন। তিনি লাভ করেন 'সন্তহরিদাস' পুরস্কারসহ আরও অনেক পুরস্কার। ১৯৭৫ সালে ৩১ অক্টোবর তিনি মুম্বাইতে মৃত্যুবরণ করেন। তার শেষকৃত্য অনুষ্ঠান সেখানেই সম্পন্ন হয়।

শচীন দেববর্মনের ৫১তম মৃত্যু বার্ষিকীতে জানাই শ্রদ্ধাঞ্জলি।

শাহজাহান চৌধুরী: সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব

বিষয়:

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

১

সুরশিল্পী শচীন দেববর্মন

২

উদীচী-সংগ্রামের দীপশিখা

৩

জলবায়ু অর্থায়নে কপ-৩১ই ভরসা

৪

রাষ্ট্রীয় ও নাগরিক দায়িত্ব: আবেগ বনাম আইনি সীমানা

৫

কুমিল্লার সড়ক: নিরাপদে ঘরে ফেরার অধিকার কোথায়?

সম্পর্কিত

উদীচী-সংগ্রামের দীপশিখা

উদীচী-সংগ্রামের দীপশিখা

১ দিন আগে
জলবায়ু অর্থায়নে কপ-৩১ই ভরসা

জলবায়ু অর্থায়নে কপ-৩১ই ভরসা

৪ দিন আগে
রাষ্ট্রীয় ও নাগরিক দায়িত্ব: আবেগ বনাম আইনি সীমানা

রাষ্ট্রীয় ও নাগরিক দায়িত্ব: আবেগ বনাম আইনি সীমানা

৬ দিন আগে
কুমিল্লার সড়ক: নিরাপদে ঘরে ফেরার অধিকার কোথায়?

কুমিল্লার সড়ক: নিরাপদে ঘরে ফেরার অধিকার কোথায়?

৬ দিন আগে