• কুমিল্লা সিটি করপোরেশন
  • কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়
  • আদর্শ সদর
  • বরুড়া
  • লাকসাম
  • দাউদকান্দি
  • আরও
    • চৌদ্দগ্রাম
    • সদর দক্ষিণ
    • নাঙ্গলকোট
    • বুড়িচং
    • ব্রাহ্মণপাড়া
    • মনোহরগঞ্জ
    • লালমাই
    • চান্দিনা
    • মুরাদনগর
    • দেবীদ্বার
    • হোমনা
    • মেঘনা
    • তিতাস
  • সর্বশেষ
  • রাজনীতি
  • বাংলাদেশ
  • অপরাধ
  • বিশ্ব
  • বাণিজ্য
  • মতামত
  • খেলা
  • বিনোদন
  • চাকরি
  • জীবনযাপন
  • ইপেপার
  • ইপেপার
facebooktwittertiktokpinterestyoutubelinkedininstagramgoogle
স্বত্ব: ©️ আমার শহর

সম্পাদক ও প্রকাশক : মো. গাজীউল হক ভূঁইয়া ( সোহাগ)।

নাহার প্লাজা, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা-৩৫০০

ই-মেইল: [email protected]

ফোন: 01716197760

> মতামত

কুমিল্লার সড়ক: নিরাপদে ঘরে ফেরার অধিকার কোথায়?

ভাস্কর মজুমদার
প্রকাশ : ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ২১: ৩৮
আপডেট : ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ২১: ৪৪
logo

কুমিল্লার সড়ক: নিরাপদে ঘরে ফেরার অধিকার কোথায়?

ভাস্কর মজুমদার

প্রকাশ : ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ২১: ৩৮
Photo

সন্ধ্যা নেমেছে কুমিল্লা শহরে। কান্দিরপাড়ের চিরচেনা ব্যস্ততা। দোকানপাটে আলো জ্বলছে, মানুষ ছুটছে যে যার গন্তব্যে। কেউ ফিরছেন অফিস থেকে, কেউ বাজার সেরে বাড়ি, কেউ হয়তো পরিচিতজনের সঙ্গে একটু আড্ডা দিয়ে দিনের ক্লান্তি ভুলে ঘরে ফিরছেন। ঘরে অপেক্ষা করছেন প্রিয়জনেরা। প্রতিদিনের মতোই একটি সাধারণ সন্ধ্যা। অথচ সেই সন্ধ্যাতেই কারও জীবনের গল্প শেষ হয়ে যেতে পারে, কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই।

গত ১৫ অক্টোবর এমনই এক সন্ধ্যায় কুমিল্লার কান্দিরপাড়ে ব্যাটারিচালিত ইজিবাইকের ধাক্কায় প্রাণ হারালেন বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের অবসরপ্রাপ্ত সহকারী মহাব্যবস্থাপক দীপক সাহা। বয়স হয়েছিল ৬৮ বছর। দীর্ঘ কর্মজীবন পেরিয়ে অবসরের দিনগুলো কাটাচ্ছিলেন। সেদিনও হয়তো ভেবেছিলেন, একটু পরেই বাড়ি ফিরবেন। অথচ বাড়ি ফেরার সেই পথটুকুই আর শেষ করা হলো না।

একটি মৃত্যু সংবাদ আমরা পড়ি, কিছুক্ষণ মন খারাপ করি, তারপর নিজেদের জীবনে ফিরে যাই। কিন্তু যে বাড়িতে মানুষটি আর ফেরেন না, সেই বাড়িতে সময় কি আর আগের মতো চলে? খাবার টেবিলে একটি চেয়ার খালি পড়ে থাকে, পরিচিত কণ্ঠস্বরটি আর শোনা যায় না, দরজার দিকে তাকিয়ে থাকার অভ্যাসটা হয়তো থেকে যায় বহুদিন। একটি দুর্ঘটনা শুধু একটি প্রাণ কেড়ে নেয় না, একটি পরিবারের চেনা পৃথিবীটাকেও চিরদিনের জন্য বদলে দেয়।

কুমিল্লার রাস্তায় এমন মৃত্যুর আশঙ্কা আজ আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা বলে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই।

আমার শৈশবের কুমিল্লা এমন ছিল না। এই শহরের অলিগলি, রাজগঞ্জের ব্যস্ততা, কান্দিরপাড়ের আড্ডা, চকবাজারের কোলাহল, টমছমব্রিজের পথ, সবকিছুর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমাদের বেড়ে ওঠার অসংখ্য গল্প। তখনও রাস্তায় ভিড় ছিল, যানবাহন ছিল, মানুষের ব্যস্ততা ছিল। কিন্তু আজকের মতো প্রতিটি মোড়ে এমন অস্থিরতা, এমন বেপরোয়া প্রতিযোগিতা, এমন অনিশ্চয়তা যেন ছিল না।

এখন রাস্তায় বের হলে মনে হয়, সবাই ছুটছে, কিন্তু কেউ কাউকে দেখছে না। কে কোন দিক দিয়ে আসছে, কে কোথায় থামবে, কে হঠাৎ উল্টো পথে ঢুকে পড়বে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। পথচারী যেন নিজের শহরেই অনাহূত অতিথি। ফুটপাত দখল হয়ে গেলে তাকে নামতে হয় রাস্তায়, আর রাস্তায় নামলেই শুরু হয় বেঁচে থাকার এক অদ্ভুত লড়াই।

এই বিশৃঙ্খলার বড় একটি অংশজুড়ে রয়েছে নিয়ন্ত্রণহীন ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইক।

সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, কুমিল্লায় এ ধরনের যানবাহনের পরীক্ষামূলক চলাচল শুরু হয়েছিল প্রায় দুই দশক আগে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এগুলোর সংখ্যা বেড়েছে অস্বাভাবিকভাবে। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার প্রতিবেদনে নগরে প্রায় ৪৮ হাজার ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলাচলের কথা উঠে আসে। একই বছরের অক্টোবরে প্রথম আলোর প্রতিবেদনে ট্রাফিক পুলিশের হিসাবে মিশুক ও ইজিবাইকের সংখ্যা ৬০ থেকে ৭০ হাজার বলে উল্লেখ করা হয়।

একবার ভাবুন, আমাদের ছোট্ট শহরের সীমিত সড়কে এত বিপুলসংখ্যক যানবাহনের চাপ! অথচ সেই অনুপাতে নেই প্রশিক্ষিত চালক, সুশৃঙ্খল চলাচল কিংবা কার্যকর নিয়ন্ত্রণ।

তবে এই সংখ্যাগুলোর চেয়েও বড় একটি হিসাব রয়েছে, যে হিসাব আমরা কেউ রাখি না।

কতজন মানুষ রাস্তায় পড়ে গিয়ে হাত ভেঙেছেন? কতজনের পা ভেঙেছে? কতজনকে অস্ত্রোপচারের টেবিলে শুতে হয়েছে? কতজন আজও খুঁড়িয়ে হাঁটেন? কতজন আর কোনোদিন নিজের পায়ে স্বাভাবিকভাবে দাঁড়াতে পারবেন না?

২০২৩ সালের মে মাসে কুমিল্লা সার্কিট হাউসের সামনে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ধাক্কায় সাংবাদিক আনোয়ার হোসাইনের বাঁ পা ভেঙে যায়। তিন বছর পরও তিনি স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারছিলেন না বলে সংবাদমাধ্যমে জানিয়েছেন। ২০২২ সালে নেউরা এলাকায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার যন্ত্রাংশে ওড়না পেঁচিয়ে তরুণী পোশাকশ্রমিক নাহার আক্তারের হাতের কবজি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। হাসপাতালে তাঁর বিচ্ছিন্ন হাত জোড়া লাগানোর চিকিৎসা করা হয়।

এই মানুষগুলোর কথা ভাবলে বুকের ভেতর কেমন একটা অস্বস্তি হয়। একটি দুর্ঘটনার আগে তাঁদেরও তো স্বাভাবিক জীবন ছিল। হাঁটতেন, কাজ করতেন, স্বপ্ন দেখতেন, ভবিষ্যৎ নিয়ে পরিকল্পনা করতেন। তারপর হঠাৎ একটি মুহূর্ত এসে সবকিছু বদলে দিল।

কুমিল্লার সড়কে কত মানুষ মারা গেছেন, তার চেয়েও ভয়ংকর হতে পারে সেই হিসাব, কত মানুষ বেঁচে থেকেও হারিয়েছেন স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকার ক্ষমতা।

আমি জানি না গত পাঁচ বছরে এই শহরের রাস্তায় ব্যাটারিচালিত যানবাহন সংশ্লিষ্ট দুর্ঘটনায় কতজন আহত হয়েছেন, কতজনের হাড় ভেঙেছে, কতজনের অস্ত্রোপচার হয়েছে। কিন্তু আমার আশঙ্কা, হাসপাতালের নথিগুলো এক জায়গায় করলে এমন এক বাস্তবতা সামনে আসবে, যা আমাদের অনেকের কল্পনাকেও হার মানাবে।

কুমিল্লা জেলা প্রশাসন, সিটি করপোরেশন, ট্রাফিক বিভাগ এবং সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোর প্রতি আমার একটি খোলা অনুরোধ রইল। গত পাঁচ বছরের দুর্ঘটনায় আহত, নিহত এবং স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের একটি সমন্বিত পরিসংখ্যান প্রকাশ করুন। শহরের মানুষ জানুক, এই অব্যবস্থাপনার প্রকৃত মূল্য কতটা ভয়াবহ।

কারণ একটি ভাঙা পা শুধু একটি হাড় ভাঙার ঘটনা নয়। হয়তো সেই পায়ের ওপর ভর করেই চলত একটি সংসার। একটি আহত হাত হয়তো ছিল কোনো পরিবারের একমাত্র উপার্জনের সম্বল। আর একটি মৃত্যুর অর্থ শুধু একজন মানুষের চলে যাওয়া নয়, অনেকগুলো মানুষের জীবনে একসঙ্গে অন্ধকার নেমে আসা।

অথচ এই শহরের রাস্তায় আমরা প্রতিদিন এসব আশঙ্কা নিয়েই চলাফেরা করছি। কখনো প্রতিবাদ করছি, কখনো বিরক্ত হচ্ছি, কখনো অসহায়ের মতো মেনে নিচ্ছি। ধীরে ধীরে যেন বিপদকেই স্বাভাবিক জীবনের অংশ বানিয়ে ফেলেছি।

আমি ব্যাটারিচালিত রিকশার চালকদের বিপক্ষে নই। তাঁদেরও সংসার আছে, সন্তান আছে, স্বপ্ন আছে। তাঁদের ঘরেও কেউ অপেক্ষা করেন। কিন্তু একজন মানুষের জীবিকার প্রয়োজনে আরেকজন মানুষের জীবন বিপন্ন হতে পারে না। যে মানুষটি রিকশা চালিয়ে সংসার চালান, তাঁর যেমন সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকার অধিকার আছে, তেমনি সেই রিকশার পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া মানুষটিরও নিরাপদে ঘরে ফেরার অধিকার আছে।

তাই সমাধান নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা কিংবা কয়েক দিনের অভিযান নয়। প্রয়োজন সঠিক নিবন্ধন, চালকদের প্রশিক্ষণ, নির্দিষ্ট চলাচলের পথ, গতিসীমা, যানবাহনের নিরাপত্তা পরীক্ষা এবং নিয়মিত তদারকি। প্রয়োজন সিটি কর্পোরেশন, ট্রাফিক বিভাগ ও জেলা প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ। প্রয়োজন এমন একটি পরিকল্পনা, যার সুফল মানুষ রাস্তায় নেমেই অনুভব করতে পারবেন।

সবচেয়ে বড় কথা, প্রয়োজন দায়িত্ববোধ। কারণ একটি শহর শুধু প্রশাসনের নয়, সেখানে বসবাসকারী প্রতিটি মানুষেরও।

মাঝে মধ্যে ভাবি, আমরা কেমন শহর রেখে যাচ্ছি আমাদের সন্তানদের জন্য? যে শহরে আমরা একসময় নির্ভয়ে হেঁটেছি, সেই শহরে আমাদের সন্তানেরা কি হাত ধরে না চললে রাস্তা পার হতে পারবে না? যে কান্দিরপাড় আমাদের কাছে ছিল আড্ডা আর আনন্দের জায়গা, সেটিই কি আগামী প্রজন্মের কাছে আতঙ্কের নাম হয়ে থাকবে?

কুমিল্লাকে আমি ভালোবাসি। এই ভালোবাসা শুধু জন্মস্থান কিংবা শৈশবের স্মৃতির কারণে নয়। এই শহরের মানুষের সঙ্গে আমার আত্মার সম্পর্ক। তাই এর অসংগতি দেখলে কষ্ট হয়, এর অব্যবস্থাপনা দেখলে ক্ষোভ হয়, আর এর রাস্তায় কারও অকালমৃত্যুর সংবাদ শুনলে মনে হয়, আমরা সবাই কোথাও না কোথাও ব্যর্থ হচ্ছি।

দীপক সাহা আর ফিরবেন না। তাঁর পরিবারের মানুষগুলো হয়তো এখনও সেই সন্ধ্যার কথা মনে করে ভাবেন, মানুষটি যদি আরেকটু আগে কিংবা পরে ফিরতেন! কিন্তু একটি সভ্য শহরে মানুষের জীবন কি এমন 'যদি' আর 'হয়তো'র ওপর নির্ভর করে থাকতে পারে?

আমরা আর কোনো পরিবারের দরজায় এমন অপেক্ষা দেখতে চাই না। চাই না কোনো মা তাঁর সন্তানকে বাইরে পাঠিয়ে সারাক্ষণ উৎকণ্ঠায় থাকুন। চাই না কোনো বৃদ্ধ নিজের শহরের রাস্তা পার হতে ভয় পান। চাই না কোনো সুস্থ মানুষ একটি দুর্ঘটনার পর বাকি জীবনটা হাসপাতাল, ওষুধ আর অন্যের সহায়তার ওপর নির্ভর করে কাটান।

উন্নয়ন মানে শুধু নতুন রাস্তা নয়, সেই রাস্তায় নিরাপদে হাঁটার স্বাধীনতা। উন্নয়ন মানে শুধু শহরের সৌন্দর্যবর্ধন নয়, শহরের মানুষের জীবনের মূল্য বোঝা।

একটি শহরের সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য তার আলোকিত সড়ক নয়, সেই সড়ক দিয়ে নিশ্চিন্তে ঘরে ফিরে যাওয়া মানুষগুলো।

আমাদের প্রিয় কুমিল্লা আবার সেই নিশ্চিন্তে ঘরে ফেরার শহর হয়ে উঠুক।

কারণ দিনের শেষে প্রতিটি মানুষের গল্পই তো এক জায়গায় এসে মেলে। কেউ অফিস থেকে, কেউ বাজার থেকে, কেউ স্কুল থেকে, কেউবা প্রিয়জনের সঙ্গে আড্ডা শেষে শুধু নিজের ঘরে ফিরতে চান।

সেই সামান্য ঘরে ফেরাটুকু যেন আর কারও জীবনের শেষ যাত্রা হয়ে না ওঠে।

ভাস্কর মজুমদার: জেনারেল ম্যানেজার, মার্চেন্ডাইজিং, ব্র্যাক আড়ং ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী।

Thumbnail image

সন্ধ্যা নেমেছে কুমিল্লা শহরে। কান্দিরপাড়ের চিরচেনা ব্যস্ততা। দোকানপাটে আলো জ্বলছে, মানুষ ছুটছে যে যার গন্তব্যে। কেউ ফিরছেন অফিস থেকে, কেউ বাজার সেরে বাড়ি, কেউ হয়তো পরিচিতজনের সঙ্গে একটু আড্ডা দিয়ে দিনের ক্লান্তি ভুলে ঘরে ফিরছেন। ঘরে অপেক্ষা করছেন প্রিয়জনেরা। প্রতিদিনের মতোই একটি সাধারণ সন্ধ্যা। অথচ সেই সন্ধ্যাতেই কারও জীবনের গল্প শেষ হয়ে যেতে পারে, কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই।

গত ১৫ অক্টোবর এমনই এক সন্ধ্যায় কুমিল্লার কান্দিরপাড়ে ব্যাটারিচালিত ইজিবাইকের ধাক্কায় প্রাণ হারালেন বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের অবসরপ্রাপ্ত সহকারী মহাব্যবস্থাপক দীপক সাহা। বয়স হয়েছিল ৬৮ বছর। দীর্ঘ কর্মজীবন পেরিয়ে অবসরের দিনগুলো কাটাচ্ছিলেন। সেদিনও হয়তো ভেবেছিলেন, একটু পরেই বাড়ি ফিরবেন। অথচ বাড়ি ফেরার সেই পথটুকুই আর শেষ করা হলো না।

একটি মৃত্যু সংবাদ আমরা পড়ি, কিছুক্ষণ মন খারাপ করি, তারপর নিজেদের জীবনে ফিরে যাই। কিন্তু যে বাড়িতে মানুষটি আর ফেরেন না, সেই বাড়িতে সময় কি আর আগের মতো চলে? খাবার টেবিলে একটি চেয়ার খালি পড়ে থাকে, পরিচিত কণ্ঠস্বরটি আর শোনা যায় না, দরজার দিকে তাকিয়ে থাকার অভ্যাসটা হয়তো থেকে যায় বহুদিন। একটি দুর্ঘটনা শুধু একটি প্রাণ কেড়ে নেয় না, একটি পরিবারের চেনা পৃথিবীটাকেও চিরদিনের জন্য বদলে দেয়।

কুমিল্লার রাস্তায় এমন মৃত্যুর আশঙ্কা আজ আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা বলে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই।

আমার শৈশবের কুমিল্লা এমন ছিল না। এই শহরের অলিগলি, রাজগঞ্জের ব্যস্ততা, কান্দিরপাড়ের আড্ডা, চকবাজারের কোলাহল, টমছমব্রিজের পথ, সবকিছুর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমাদের বেড়ে ওঠার অসংখ্য গল্প। তখনও রাস্তায় ভিড় ছিল, যানবাহন ছিল, মানুষের ব্যস্ততা ছিল। কিন্তু আজকের মতো প্রতিটি মোড়ে এমন অস্থিরতা, এমন বেপরোয়া প্রতিযোগিতা, এমন অনিশ্চয়তা যেন ছিল না।

এখন রাস্তায় বের হলে মনে হয়, সবাই ছুটছে, কিন্তু কেউ কাউকে দেখছে না। কে কোন দিক দিয়ে আসছে, কে কোথায় থামবে, কে হঠাৎ উল্টো পথে ঢুকে পড়বে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। পথচারী যেন নিজের শহরেই অনাহূত অতিথি। ফুটপাত দখল হয়ে গেলে তাকে নামতে হয় রাস্তায়, আর রাস্তায় নামলেই শুরু হয় বেঁচে থাকার এক অদ্ভুত লড়াই।

এই বিশৃঙ্খলার বড় একটি অংশজুড়ে রয়েছে নিয়ন্ত্রণহীন ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইক।

সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, কুমিল্লায় এ ধরনের যানবাহনের পরীক্ষামূলক চলাচল শুরু হয়েছিল প্রায় দুই দশক আগে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এগুলোর সংখ্যা বেড়েছে অস্বাভাবিকভাবে। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার প্রতিবেদনে নগরে প্রায় ৪৮ হাজার ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলাচলের কথা উঠে আসে। একই বছরের অক্টোবরে প্রথম আলোর প্রতিবেদনে ট্রাফিক পুলিশের হিসাবে মিশুক ও ইজিবাইকের সংখ্যা ৬০ থেকে ৭০ হাজার বলে উল্লেখ করা হয়।

একবার ভাবুন, আমাদের ছোট্ট শহরের সীমিত সড়কে এত বিপুলসংখ্যক যানবাহনের চাপ! অথচ সেই অনুপাতে নেই প্রশিক্ষিত চালক, সুশৃঙ্খল চলাচল কিংবা কার্যকর নিয়ন্ত্রণ।

তবে এই সংখ্যাগুলোর চেয়েও বড় একটি হিসাব রয়েছে, যে হিসাব আমরা কেউ রাখি না।

কতজন মানুষ রাস্তায় পড়ে গিয়ে হাত ভেঙেছেন? কতজনের পা ভেঙেছে? কতজনকে অস্ত্রোপচারের টেবিলে শুতে হয়েছে? কতজন আজও খুঁড়িয়ে হাঁটেন? কতজন আর কোনোদিন নিজের পায়ে স্বাভাবিকভাবে দাঁড়াতে পারবেন না?

২০২৩ সালের মে মাসে কুমিল্লা সার্কিট হাউসের সামনে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ধাক্কায় সাংবাদিক আনোয়ার হোসাইনের বাঁ পা ভেঙে যায়। তিন বছর পরও তিনি স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারছিলেন না বলে সংবাদমাধ্যমে জানিয়েছেন। ২০২২ সালে নেউরা এলাকায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার যন্ত্রাংশে ওড়না পেঁচিয়ে তরুণী পোশাকশ্রমিক নাহার আক্তারের হাতের কবজি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। হাসপাতালে তাঁর বিচ্ছিন্ন হাত জোড়া লাগানোর চিকিৎসা করা হয়।

এই মানুষগুলোর কথা ভাবলে বুকের ভেতর কেমন একটা অস্বস্তি হয়। একটি দুর্ঘটনার আগে তাঁদেরও তো স্বাভাবিক জীবন ছিল। হাঁটতেন, কাজ করতেন, স্বপ্ন দেখতেন, ভবিষ্যৎ নিয়ে পরিকল্পনা করতেন। তারপর হঠাৎ একটি মুহূর্ত এসে সবকিছু বদলে দিল।

কুমিল্লার সড়কে কত মানুষ মারা গেছেন, তার চেয়েও ভয়ংকর হতে পারে সেই হিসাব, কত মানুষ বেঁচে থেকেও হারিয়েছেন স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকার ক্ষমতা।

আমি জানি না গত পাঁচ বছরে এই শহরের রাস্তায় ব্যাটারিচালিত যানবাহন সংশ্লিষ্ট দুর্ঘটনায় কতজন আহত হয়েছেন, কতজনের হাড় ভেঙেছে, কতজনের অস্ত্রোপচার হয়েছে। কিন্তু আমার আশঙ্কা, হাসপাতালের নথিগুলো এক জায়গায় করলে এমন এক বাস্তবতা সামনে আসবে, যা আমাদের অনেকের কল্পনাকেও হার মানাবে।

কুমিল্লা জেলা প্রশাসন, সিটি করপোরেশন, ট্রাফিক বিভাগ এবং সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোর প্রতি আমার একটি খোলা অনুরোধ রইল। গত পাঁচ বছরের দুর্ঘটনায় আহত, নিহত এবং স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের একটি সমন্বিত পরিসংখ্যান প্রকাশ করুন। শহরের মানুষ জানুক, এই অব্যবস্থাপনার প্রকৃত মূল্য কতটা ভয়াবহ।

কারণ একটি ভাঙা পা শুধু একটি হাড় ভাঙার ঘটনা নয়। হয়তো সেই পায়ের ওপর ভর করেই চলত একটি সংসার। একটি আহত হাত হয়তো ছিল কোনো পরিবারের একমাত্র উপার্জনের সম্বল। আর একটি মৃত্যুর অর্থ শুধু একজন মানুষের চলে যাওয়া নয়, অনেকগুলো মানুষের জীবনে একসঙ্গে অন্ধকার নেমে আসা।

অথচ এই শহরের রাস্তায় আমরা প্রতিদিন এসব আশঙ্কা নিয়েই চলাফেরা করছি। কখনো প্রতিবাদ করছি, কখনো বিরক্ত হচ্ছি, কখনো অসহায়ের মতো মেনে নিচ্ছি। ধীরে ধীরে যেন বিপদকেই স্বাভাবিক জীবনের অংশ বানিয়ে ফেলেছি।

আমি ব্যাটারিচালিত রিকশার চালকদের বিপক্ষে নই। তাঁদেরও সংসার আছে, সন্তান আছে, স্বপ্ন আছে। তাঁদের ঘরেও কেউ অপেক্ষা করেন। কিন্তু একজন মানুষের জীবিকার প্রয়োজনে আরেকজন মানুষের জীবন বিপন্ন হতে পারে না। যে মানুষটি রিকশা চালিয়ে সংসার চালান, তাঁর যেমন সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকার অধিকার আছে, তেমনি সেই রিকশার পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া মানুষটিরও নিরাপদে ঘরে ফেরার অধিকার আছে।

তাই সমাধান নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা কিংবা কয়েক দিনের অভিযান নয়। প্রয়োজন সঠিক নিবন্ধন, চালকদের প্রশিক্ষণ, নির্দিষ্ট চলাচলের পথ, গতিসীমা, যানবাহনের নিরাপত্তা পরীক্ষা এবং নিয়মিত তদারকি। প্রয়োজন সিটি কর্পোরেশন, ট্রাফিক বিভাগ ও জেলা প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ। প্রয়োজন এমন একটি পরিকল্পনা, যার সুফল মানুষ রাস্তায় নেমেই অনুভব করতে পারবেন।

সবচেয়ে বড় কথা, প্রয়োজন দায়িত্ববোধ। কারণ একটি শহর শুধু প্রশাসনের নয়, সেখানে বসবাসকারী প্রতিটি মানুষেরও।

মাঝে মধ্যে ভাবি, আমরা কেমন শহর রেখে যাচ্ছি আমাদের সন্তানদের জন্য? যে শহরে আমরা একসময় নির্ভয়ে হেঁটেছি, সেই শহরে আমাদের সন্তানেরা কি হাত ধরে না চললে রাস্তা পার হতে পারবে না? যে কান্দিরপাড় আমাদের কাছে ছিল আড্ডা আর আনন্দের জায়গা, সেটিই কি আগামী প্রজন্মের কাছে আতঙ্কের নাম হয়ে থাকবে?

কুমিল্লাকে আমি ভালোবাসি। এই ভালোবাসা শুধু জন্মস্থান কিংবা শৈশবের স্মৃতির কারণে নয়। এই শহরের মানুষের সঙ্গে আমার আত্মার সম্পর্ক। তাই এর অসংগতি দেখলে কষ্ট হয়, এর অব্যবস্থাপনা দেখলে ক্ষোভ হয়, আর এর রাস্তায় কারও অকালমৃত্যুর সংবাদ শুনলে মনে হয়, আমরা সবাই কোথাও না কোথাও ব্যর্থ হচ্ছি।

দীপক সাহা আর ফিরবেন না। তাঁর পরিবারের মানুষগুলো হয়তো এখনও সেই সন্ধ্যার কথা মনে করে ভাবেন, মানুষটি যদি আরেকটু আগে কিংবা পরে ফিরতেন! কিন্তু একটি সভ্য শহরে মানুষের জীবন কি এমন 'যদি' আর 'হয়তো'র ওপর নির্ভর করে থাকতে পারে?

আমরা আর কোনো পরিবারের দরজায় এমন অপেক্ষা দেখতে চাই না। চাই না কোনো মা তাঁর সন্তানকে বাইরে পাঠিয়ে সারাক্ষণ উৎকণ্ঠায় থাকুন। চাই না কোনো বৃদ্ধ নিজের শহরের রাস্তা পার হতে ভয় পান। চাই না কোনো সুস্থ মানুষ একটি দুর্ঘটনার পর বাকি জীবনটা হাসপাতাল, ওষুধ আর অন্যের সহায়তার ওপর নির্ভর করে কাটান।

উন্নয়ন মানে শুধু নতুন রাস্তা নয়, সেই রাস্তায় নিরাপদে হাঁটার স্বাধীনতা। উন্নয়ন মানে শুধু শহরের সৌন্দর্যবর্ধন নয়, শহরের মানুষের জীবনের মূল্য বোঝা।

একটি শহরের সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য তার আলোকিত সড়ক নয়, সেই সড়ক দিয়ে নিশ্চিন্তে ঘরে ফিরে যাওয়া মানুষগুলো।

আমাদের প্রিয় কুমিল্লা আবার সেই নিশ্চিন্তে ঘরে ফেরার শহর হয়ে উঠুক।

কারণ দিনের শেষে প্রতিটি মানুষের গল্পই তো এক জায়গায় এসে মেলে। কেউ অফিস থেকে, কেউ বাজার থেকে, কেউ স্কুল থেকে, কেউবা প্রিয়জনের সঙ্গে আড্ডা শেষে শুধু নিজের ঘরে ফিরতে চান।

সেই সামান্য ঘরে ফেরাটুকু যেন আর কারও জীবনের শেষ যাত্রা হয়ে না ওঠে।

ভাস্কর মজুমদার: জেনারেল ম্যানেজার, মার্চেন্ডাইজিং, ব্র্যাক আড়ং ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী।

বিষয়:

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

১

রাষ্ট্রীয় ও নাগরিক দায়িত্ব: আবেগ বনাম আইনি সীমানা

২

কুমিল্লার সড়ক: নিরাপদে ঘরে ফেরার অধিকার কোথায়?

৩

মা দুর্গার আগমনে, মানুষের জাগরণের প্রত্যাশা

৪

সুন্দরবনে জীবনযুদ্ধ অসুন্দর

৫

প্রসঙ্গ: ক্লাসরুমে টিকটক

সম্পর্কিত

রাষ্ট্রীয় ও নাগরিক দায়িত্ব: আবেগ বনাম আইনি সীমানা

রাষ্ট্রীয় ও নাগরিক দায়িত্ব: আবেগ বনাম আইনি সীমানা

১৭ ঘণ্টা আগে
মা দুর্গার আগমনে, মানুষের জাগরণের প্রত্যাশা

মা দুর্গার আগমনে, মানুষের জাগরণের প্রত্যাশা

৪ দিন আগে
সুন্দরবনে জীবনযুদ্ধ অসুন্দর

সুন্দরবনে জীবনযুদ্ধ অসুন্দর

৭ দিন আগে
প্রসঙ্গ: ক্লাসরুমে টিকটক

প্রসঙ্গ: ক্লাসরুমে টিকটক

৯ দিন আগে