• কুমিল্লা সিটি করপোরেশন
  • কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়
  • আদর্শ সদর
  • বরুড়া
  • লাকসাম
  • দাউদকান্দি
  • আরও
    • চৌদ্দগ্রাম
    • সদর দক্ষিণ
    • নাঙ্গলকোট
    • বুড়িচং
    • ব্রাহ্মণপাড়া
    • মনোহরগঞ্জ
    • লালমাই
    • চান্দিনা
    • মুরাদনগর
    • দেবীদ্বার
    • হোমনা
    • মেঘনা
    • তিতাস
  • সর্বশেষ
  • রাজনীতি
  • বাংলাদেশ
  • অপরাধ
  • বিশ্ব
  • বাণিজ্য
  • মতামত
  • খেলা
  • বিনোদন
  • চাকরি
  • জীবনযাপন
  • ইপেপার
  • ইপেপার
facebooktwittertiktokpinterestyoutubelinkedininstagramgoogle
স্বত্ব: ©️ আমার শহর

সম্পাদক ও প্রকাশক : মো. গাজীউল হক ভূঁইয়া ( সোহাগ)।

নাহার প্লাজা, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা-৩৫০০

ই-মেইল: [email protected]

ফোন: 01716197760

> মতামত

স্মৃতিচারণ

আজন্ম বিপ্লবী শিব নারায়ণ দাশ

আবুল হাসানাত বাবুল
প্রকাশ : ২৯ এপ্রিল ২০২৬, ১২: ৪৩
logo

আজন্ম বিপ্লবী শিব নারায়ণ দাশ

আবুল হাসানাত বাবুল

প্রকাশ : ২৯ এপ্রিল ২০২৬, ১২: ৪৩
Photo

শিব নারায়ণ দাশ। প্রথমত তিনি বিপ্লবী। শেষ পর্যন্ত তিনি বিপ্লবী। তিনি জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের বিদ্রোহী কবিতার ন্যায় একজন চিরকালের বিদ্রোহী। তিনি টর্পেডো, ভীম, ভাসমান মাইন। তিনি মানেননি কোন শাসন।

সম্ভবত তিনিই একজন যিনি বিদ্রোহী কবিতার সেই লাইন ধরে বলেছেন তিনি জাহান্নামের আগুনে বসিয়া হাসেন পুষ্পের হাসি। কমতো নয় শিবুদাকে ষাট বছর দেখেছি। তিনিই ভ‚পেন হাজারিকার গাওয়া গান গাইতে পারতেন তিনি এক যাযাবর। যদিও বাস্তবে তিনি প্রেমিকা সহধর্মিণী গীতশ্রী চৌধুরীর সান্নিধ্যে ছিলেন পঞ্চান্ন বছর। তাদের একমাত্র পুত্রসন্তান অর্ণব আদিত্য দাশ। এই তিনে তাদের সংসার। শিব নারায়ণ দাশ কতটা সংসারী ছিলেন তা বলতে পারবেন গীতশ্রী চৌধুরী। প্রথাগত বিধি মেনে শিব নারায়ণ দাশ সংসার করবেন এমন মানুষ শিব নারায়ণ দাশ নন।

তবুও যে তিনি স্বামী ছিলেন, তবুও যে তিনি পিতা হতে পেরেছিলেন তার কৃতিত্ব গীতশ্রী চৌধুরীর। গীতশ্রী চৌধুরী বাংলাদেশ বেতার চট্টগ্রাম কেন্দ্রে চাকুরী করতেন। আমার বিবেচনায় গীতশ্রী চৌধুরী অমর কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের অমর সৃষ্টি শ্রীকান্ত উপন্যাসের রাজলক্ষী। যে কিনা বোহেমিয়ান শ্রীকান্তকে পাগলের মত ভালবাসতো। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত শ্রীকান্তকে ভালবেসে গেছেন। অথবা গীতশ্রী চৌধুরীর তুলনা হতে পারে নিমাই ভট্টাচার্যের মেম সাহেবের সঙ্গে। কুমিল্লার কান্দিরপাড়ের অধিবাসী অসিত চৌধুরী। যিনি সর্বাঙ্গে শিল্পী।

তাকে আমি ১৯৭৯ সালের রমজান মাসের কোন এক রজনীতে টাউনহল মঞ্চে দেখেছি উপমহাদেশের অন্যতম সেরা সেতারবাদক বাহাদুর হোসেন খানের পাশে। জেলা প্রশাসক তখন এস.এ. বারী। তারাবির নামাজের পর আসর বসে। সেহেরি খাওয়ার পূর্বে আসর শেষ হয়। তবলচি শেফাল রায়। হারমোনিয়াম অসিত চৌধুরীর কাছে। অসিত চৌধুরী আলাউদ্দিন শিল্পীসংঘ করতেন। যার সভাপতি ছিলেন ওস্তাদ আয়েত আলী খান। সাধারণ সম্পাদক হাবিবুল ইসলাম রতন।

কান্দিরপাড়েই আয়েত আলী খানের বাড়ি। তার সন্তান মোবারক হোসেন খান, শেখ সাদি খান। তারা জিলা স্কুল, ভিক্টোরিয়া কলেজের ছাত্র। অসিত চৌধুরীর সন্তান গীতশ্রী চৌধুরী। দুই ভাই আশিষ চৌধুরী ও অরুণ চৌধুরী। আশিষ চৌধুরী চট্টগ্রাম বেতারে চাকুরী করতেন। অরুণ চৌধুরী গল্পকার। বিশেষ করে টেলিভিশন নাটকের দিকপাল। তাদের দুজনের সাথে একসময় সুইটহোমে আড্ডা দিতাম। শিব নারায়ণ দাশ না ফেরার দেশে চলে গেছেন। তাকে নিয়ে তার জীবদ্দশায় বহুকথা হয়েছে। তার মৃত্যুর পর তাকে তার আত্মার আত্মীয়রা স্মরণের খাতায় জীবনের অংশবিশেষ লিপিবদ্ধ করে যাচ্ছেন।

মৃত্যুর পর ২০ এপ্রিল বিকেল চারটায় টাউন হল ময়দানে তাকে অন্যরকমভাবে বিদায় জানায় তার প্রিয় কুমিল্লাবাসী। শিব নারায়ণ দাশের নিষ্প্রাণ শরীর ফুলে ফুলে ভরে গিয়েছিল। সকল পেশার সকল নাগরিক তাদের আন্তরিক শ্রদ্ধা জানাতে টাউন হল মাঠে সমবেত হয়েছিলেন। সম্ভবত আমিই শেষ ব্যক্তি হিসেবে রজনীগন্ধা ও গোলাপ দিয়ে শ্রদ্ধা জানাবার মধ্য দিয়ে পর্বটি শেষ হয়। বাংলাদেশের ইতিহাসে জাতীয় পতাকার রূপকার কিংবা নকশাকার যাই বলি শিব নারায়ণ দাশের প্রসঙ্গ থাকবে। শিবুদাকে বহুবার এ প্রসঙ্গে মুখ খুলতে অনুরোধ করেছিলাম। তিনি বলেছেন জাতীয় জীবনে যখন যে দায়িত্ব পেয়েছি তা নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করতে চেষ্টা করেছি। যদি কৃতিত্বপূর্ণ কিছু করে থাকি সেসময়ের জন্য করেছি। সময় এবং কাজ শেষ হলেই শেষ।

পরের বিষয় নিয়ে প্রস্তুত হয়ে গেছি। এ যেন নেতাজি সুভাষ বোসের পলাতক জীবনের জীবন কথা। দেশটাই বড়। দেশ ছাড়া শিবুদা অন্য কোনকিছু বুঝতেন না। তিনি কারাগারে থেকেই বাংলায় এম.এ. করেছেন। জিলা স্কুলে পড়াকালীন আইয়ুববিরোধী আন্দোলনের জন্য বহিষ্কৃত হয়েছিলেন। শিবুদাকে আমি কুমিল্লা নগর উদ্যানের জামতলায় বহুবার অতিথি হিসেবে এনেছি। ফেব্রুয়ারি মাসের একুশের একুশদিনের তিননদী পরিষদের অনুষ্ঠানে তিনি দারুণ বক্তৃতা করতেন। তিননদী পরিষদের একুশের অনুষ্ঠান হয়েছে ৪৩ বছর। ১৯৮৩ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত অন্তত বিশ বছর তিনি জামতলায় আসতেন। বক্তৃতা করতেন। তিনি চিরকালের বিদ্রোহী। সরকারে যারাই থাকুক জ্বালাময়ী ভাষণে তিনি সরকারের শোষণ, নিপীড়নের কথা তার মত করে বলতেন।

এধরণের বিদ্রোহী একজনই, তিনি শিব নারায়ণ দাশ। ১৯৭৩-৭৪ সালে শিব নারায়ণ দাশ ‘যেভাবে অশ্রু হলো বারুদ’ অ্যালবাম হিসেবে প্রকাশ ও সম্পাদনা করেন তা এক বিস্ময়। সংখ্যাটি বহুবছর সংরক্ষণ করেছিলাম। মুশকিল হলো কেউ একবার দেখতে নিলে আর ফেরত দেন না। শিবুদা বাগিচাগাঁওয়ের ছেলে। বাবা সতীশচন্দ্র দাশ। তিনি বিক্রমপুর থেকে এসে কুমিল্লায় স্থায়ী হন। চার কন্যা, তিন পুত্রসন্তানের তিনি জনক। আয়ুর্বেদীয় চিকিৎসার পেশায় ছিলেন।

পরিবারে আর্থিক স্বচ্ছলতা ছিল না। কিন্তু চার বোন, তিন ভাই উচ্চশিক্ষিত হয়েছেন। এজন্য শিবুদার মায়ের অবদান বেশি। কেননা ১৯৭১ সালের ২৯ মার্চ পাকিস্তানি সেনারা আরো অনেকের মত সতীশচন্দ্র দাশকেও বাগিচাগাঁওয়ের বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে ময়নামতি সেনানিবাসে হত্যা করে। তারপরের করুণ ইতিহাস শিবুদার মায়ের। শ্যামল দাশ সিলেটে। আর কমল দাশ আমেরিকায় স্থায়ী হয়েছে। বোনরা যার যার স্বামীর সংসারে। শিবুদাকে প্রথম দেখেছি ছাত্রশক্তির নেতা হিসেবে। ১৯৬৭ সালে ছাত্রশক্তির সমাবেশে শিবুদার বক্তৃতা শুনি। টাউনহলের পূর্বদিকের মাঠে।

শিবুদার তখনকার ছাত্রনেতা মনিরুল হক ভূঞা। মনিরুল হক ভ‚ঞা অনেক ছাত্রকে ছাত্র রাজনীতিতে এনেছিলেন। তাদের আড্ডা কান্দিরপাড়ের টিচিং এইডে। যেখানে শিক্ষা সামগ্রী বিক্রি হতো। তখন তাদের নেতা অধ্যাপক মফিজুল ইসলাম এডভোকেট। ১৯৬৮-৬৯ পর্যন্ত শিবুদা ছাত্রশক্তি নিয়ে সোচ্চার। ১৯৭০ সালে ছাত্রলীগের রাজনীতি নিয়ে শিবুদার বিশাল পদচারণা। ১৯৭১ সালের দুর্বার মার্চে শিব নারায়ণ দাশ লড়াকু সৈনিক।

শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণের পর শিব নারায়ণ দাশ ঠিকই উপলব্ধি করেছিলেন এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। তার আগে ইয়াহিয়া খানের সংসদ স্থগিত করার ঘোষণার পর পরই ১, ২, ৩ মার্চে তারা কুমিল্লা ও ঢাকার রাজপথে করেন কুইক মার্চ-লেফট রাইট লেফট। সে এক বিরাট উন্মাদনা। তখনই জাতীয় পতাকার সূচনা। তখনই নকশাকার, রূপকার ইত্যাদি। এনিয়ে নতুন করে কথা বাড়াতে চাই না। ১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ শিব নারায়ণ দাশ টাউন হলের সামনের রাস্তায় পাকিস্তানের পতাকায় আগুন দেন। মানচিত্রখচিত বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়ে দেন। ১৯৭২-৭৩ সালে তিনি জাসদ ছাত্রলীগ। জাসদ রাজনীতি নিয়ে দুর্বার। তিনি সবসময় বলতেন জাসদের রাজনীতি ভুল ছিল না।

মেজর জলিল, আ স ম আব্দুর রব, কর্ণেল তাহের, হাসানুল হক ইনু নেতৃত্ব দিতে পারেননি। তারা ভুল রাজনীতি করেছেন। তার এই উক্তি আমি বহুবার শুনেছি। শিবুদা গীতিকারও ছিলেন। ১৯৭৪ সালে ওস্তাদ কুলেন্দু দাসের সুরে, তার রচনায় কন্ঠশিল্পী ছিলেন নাসির আহমেদ। গানের কথা রচিত হয়েছিল রিলিফ চোরদের নিয়ে। বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব মো. ওমর ফারুকের ভাষায় শিব নারায়ণ দাশ কোনকিছুতেই স্থির ছিল না। সকল অবস্থায় স্বাধীন। তবে সবার স্বীকার করতে হবে সৎ রাজনীতিকের শ্রেষ্ঠ উদাহরণ শিব নারায়ণ দাশ। যাকে বাড়ি-গাড়ি-অর্থ বশ করতে পারেনি। বছর দশক আগে কুমিল্লায় তিনি দৈনিক জনশক্তি নিয়ে আবার যাত্রা শুরু করেন।

রোটারিয়ান দিলনাশি মোহসেনকে তিনি পাশে পেয়েছিলেন। দিলনাশি মোহসেন থেকে শুনেছি কেবল শিবুদার দিকে তাকিয়ে অকাতরে অর্থ খরচ করেছেন। কিন্তু কিছুদিন পর কোথায় জনশক্তি আর কোথায় শিবুদা। চরম অর্থ সংকটে শিবুদা একবার হোটেল ব্যবসাও শুরু করেছিলেন। পরে আবার ছেড়ে দেন। শিবুদার পাশে অনেকেই ছিলেন। পরে সবাই সরে গেছেন। কেবল সরে যাননি গীতশ্রী চৌধুরী। সম্ভবত এজন্যই তিনি ৭৮ বছর আয়ু পেয়েছিলেন। এবছর ২২ এপ্রিল ছিল শিব নারায়ণ দাশের দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী। শিবুদার মতো রাজনীতিকরা জন্মই নেন অমর থাকবার জন্য। শিবুদা অমর হয়েই থাকবেন।

আবুল হাসানাত বাবুল: সম্পাদক, সাপ্তাহিক অভিবাদন; সাবেক সভাপতি, কুমিল্লা প্রেসক্লাব।

Thumbnail image

শিব নারায়ণ দাশ। প্রথমত তিনি বিপ্লবী। শেষ পর্যন্ত তিনি বিপ্লবী। তিনি জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের বিদ্রোহী কবিতার ন্যায় একজন চিরকালের বিদ্রোহী। তিনি টর্পেডো, ভীম, ভাসমান মাইন। তিনি মানেননি কোন শাসন।

সম্ভবত তিনিই একজন যিনি বিদ্রোহী কবিতার সেই লাইন ধরে বলেছেন তিনি জাহান্নামের আগুনে বসিয়া হাসেন পুষ্পের হাসি। কমতো নয় শিবুদাকে ষাট বছর দেখেছি। তিনিই ভ‚পেন হাজারিকার গাওয়া গান গাইতে পারতেন তিনি এক যাযাবর। যদিও বাস্তবে তিনি প্রেমিকা সহধর্মিণী গীতশ্রী চৌধুরীর সান্নিধ্যে ছিলেন পঞ্চান্ন বছর। তাদের একমাত্র পুত্রসন্তান অর্ণব আদিত্য দাশ। এই তিনে তাদের সংসার। শিব নারায়ণ দাশ কতটা সংসারী ছিলেন তা বলতে পারবেন গীতশ্রী চৌধুরী। প্রথাগত বিধি মেনে শিব নারায়ণ দাশ সংসার করবেন এমন মানুষ শিব নারায়ণ দাশ নন।

তবুও যে তিনি স্বামী ছিলেন, তবুও যে তিনি পিতা হতে পেরেছিলেন তার কৃতিত্ব গীতশ্রী চৌধুরীর। গীতশ্রী চৌধুরী বাংলাদেশ বেতার চট্টগ্রাম কেন্দ্রে চাকুরী করতেন। আমার বিবেচনায় গীতশ্রী চৌধুরী অমর কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের অমর সৃষ্টি শ্রীকান্ত উপন্যাসের রাজলক্ষী। যে কিনা বোহেমিয়ান শ্রীকান্তকে পাগলের মত ভালবাসতো। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত শ্রীকান্তকে ভালবেসে গেছেন। অথবা গীতশ্রী চৌধুরীর তুলনা হতে পারে নিমাই ভট্টাচার্যের মেম সাহেবের সঙ্গে। কুমিল্লার কান্দিরপাড়ের অধিবাসী অসিত চৌধুরী। যিনি সর্বাঙ্গে শিল্পী।

তাকে আমি ১৯৭৯ সালের রমজান মাসের কোন এক রজনীতে টাউনহল মঞ্চে দেখেছি উপমহাদেশের অন্যতম সেরা সেতারবাদক বাহাদুর হোসেন খানের পাশে। জেলা প্রশাসক তখন এস.এ. বারী। তারাবির নামাজের পর আসর বসে। সেহেরি খাওয়ার পূর্বে আসর শেষ হয়। তবলচি শেফাল রায়। হারমোনিয়াম অসিত চৌধুরীর কাছে। অসিত চৌধুরী আলাউদ্দিন শিল্পীসংঘ করতেন। যার সভাপতি ছিলেন ওস্তাদ আয়েত আলী খান। সাধারণ সম্পাদক হাবিবুল ইসলাম রতন।

কান্দিরপাড়েই আয়েত আলী খানের বাড়ি। তার সন্তান মোবারক হোসেন খান, শেখ সাদি খান। তারা জিলা স্কুল, ভিক্টোরিয়া কলেজের ছাত্র। অসিত চৌধুরীর সন্তান গীতশ্রী চৌধুরী। দুই ভাই আশিষ চৌধুরী ও অরুণ চৌধুরী। আশিষ চৌধুরী চট্টগ্রাম বেতারে চাকুরী করতেন। অরুণ চৌধুরী গল্পকার। বিশেষ করে টেলিভিশন নাটকের দিকপাল। তাদের দুজনের সাথে একসময় সুইটহোমে আড্ডা দিতাম। শিব নারায়ণ দাশ না ফেরার দেশে চলে গেছেন। তাকে নিয়ে তার জীবদ্দশায় বহুকথা হয়েছে। তার মৃত্যুর পর তাকে তার আত্মার আত্মীয়রা স্মরণের খাতায় জীবনের অংশবিশেষ লিপিবদ্ধ করে যাচ্ছেন।

মৃত্যুর পর ২০ এপ্রিল বিকেল চারটায় টাউন হল ময়দানে তাকে অন্যরকমভাবে বিদায় জানায় তার প্রিয় কুমিল্লাবাসী। শিব নারায়ণ দাশের নিষ্প্রাণ শরীর ফুলে ফুলে ভরে গিয়েছিল। সকল পেশার সকল নাগরিক তাদের আন্তরিক শ্রদ্ধা জানাতে টাউন হল মাঠে সমবেত হয়েছিলেন। সম্ভবত আমিই শেষ ব্যক্তি হিসেবে রজনীগন্ধা ও গোলাপ দিয়ে শ্রদ্ধা জানাবার মধ্য দিয়ে পর্বটি শেষ হয়। বাংলাদেশের ইতিহাসে জাতীয় পতাকার রূপকার কিংবা নকশাকার যাই বলি শিব নারায়ণ দাশের প্রসঙ্গ থাকবে। শিবুদাকে বহুবার এ প্রসঙ্গে মুখ খুলতে অনুরোধ করেছিলাম। তিনি বলেছেন জাতীয় জীবনে যখন যে দায়িত্ব পেয়েছি তা নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করতে চেষ্টা করেছি। যদি কৃতিত্বপূর্ণ কিছু করে থাকি সেসময়ের জন্য করেছি। সময় এবং কাজ শেষ হলেই শেষ।

পরের বিষয় নিয়ে প্রস্তুত হয়ে গেছি। এ যেন নেতাজি সুভাষ বোসের পলাতক জীবনের জীবন কথা। দেশটাই বড়। দেশ ছাড়া শিবুদা অন্য কোনকিছু বুঝতেন না। তিনি কারাগারে থেকেই বাংলায় এম.এ. করেছেন। জিলা স্কুলে পড়াকালীন আইয়ুববিরোধী আন্দোলনের জন্য বহিষ্কৃত হয়েছিলেন। শিবুদাকে আমি কুমিল্লা নগর উদ্যানের জামতলায় বহুবার অতিথি হিসেবে এনেছি। ফেব্রুয়ারি মাসের একুশের একুশদিনের তিননদী পরিষদের অনুষ্ঠানে তিনি দারুণ বক্তৃতা করতেন। তিননদী পরিষদের একুশের অনুষ্ঠান হয়েছে ৪৩ বছর। ১৯৮৩ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত অন্তত বিশ বছর তিনি জামতলায় আসতেন। বক্তৃতা করতেন। তিনি চিরকালের বিদ্রোহী। সরকারে যারাই থাকুক জ্বালাময়ী ভাষণে তিনি সরকারের শোষণ, নিপীড়নের কথা তার মত করে বলতেন।

এধরণের বিদ্রোহী একজনই, তিনি শিব নারায়ণ দাশ। ১৯৭৩-৭৪ সালে শিব নারায়ণ দাশ ‘যেভাবে অশ্রু হলো বারুদ’ অ্যালবাম হিসেবে প্রকাশ ও সম্পাদনা করেন তা এক বিস্ময়। সংখ্যাটি বহুবছর সংরক্ষণ করেছিলাম। মুশকিল হলো কেউ একবার দেখতে নিলে আর ফেরত দেন না। শিবুদা বাগিচাগাঁওয়ের ছেলে। বাবা সতীশচন্দ্র দাশ। তিনি বিক্রমপুর থেকে এসে কুমিল্লায় স্থায়ী হন। চার কন্যা, তিন পুত্রসন্তানের তিনি জনক। আয়ুর্বেদীয় চিকিৎসার পেশায় ছিলেন।

পরিবারে আর্থিক স্বচ্ছলতা ছিল না। কিন্তু চার বোন, তিন ভাই উচ্চশিক্ষিত হয়েছেন। এজন্য শিবুদার মায়ের অবদান বেশি। কেননা ১৯৭১ সালের ২৯ মার্চ পাকিস্তানি সেনারা আরো অনেকের মত সতীশচন্দ্র দাশকেও বাগিচাগাঁওয়ের বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে ময়নামতি সেনানিবাসে হত্যা করে। তারপরের করুণ ইতিহাস শিবুদার মায়ের। শ্যামল দাশ সিলেটে। আর কমল দাশ আমেরিকায় স্থায়ী হয়েছে। বোনরা যার যার স্বামীর সংসারে। শিবুদাকে প্রথম দেখেছি ছাত্রশক্তির নেতা হিসেবে। ১৯৬৭ সালে ছাত্রশক্তির সমাবেশে শিবুদার বক্তৃতা শুনি। টাউনহলের পূর্বদিকের মাঠে।

শিবুদার তখনকার ছাত্রনেতা মনিরুল হক ভূঞা। মনিরুল হক ভ‚ঞা অনেক ছাত্রকে ছাত্র রাজনীতিতে এনেছিলেন। তাদের আড্ডা কান্দিরপাড়ের টিচিং এইডে। যেখানে শিক্ষা সামগ্রী বিক্রি হতো। তখন তাদের নেতা অধ্যাপক মফিজুল ইসলাম এডভোকেট। ১৯৬৮-৬৯ পর্যন্ত শিবুদা ছাত্রশক্তি নিয়ে সোচ্চার। ১৯৭০ সালে ছাত্রলীগের রাজনীতি নিয়ে শিবুদার বিশাল পদচারণা। ১৯৭১ সালের দুর্বার মার্চে শিব নারায়ণ দাশ লড়াকু সৈনিক।

শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণের পর শিব নারায়ণ দাশ ঠিকই উপলব্ধি করেছিলেন এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। তার আগে ইয়াহিয়া খানের সংসদ স্থগিত করার ঘোষণার পর পরই ১, ২, ৩ মার্চে তারা কুমিল্লা ও ঢাকার রাজপথে করেন কুইক মার্চ-লেফট রাইট লেফট। সে এক বিরাট উন্মাদনা। তখনই জাতীয় পতাকার সূচনা। তখনই নকশাকার, রূপকার ইত্যাদি। এনিয়ে নতুন করে কথা বাড়াতে চাই না। ১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ শিব নারায়ণ দাশ টাউন হলের সামনের রাস্তায় পাকিস্তানের পতাকায় আগুন দেন। মানচিত্রখচিত বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়ে দেন। ১৯৭২-৭৩ সালে তিনি জাসদ ছাত্রলীগ। জাসদ রাজনীতি নিয়ে দুর্বার। তিনি সবসময় বলতেন জাসদের রাজনীতি ভুল ছিল না।

মেজর জলিল, আ স ম আব্দুর রব, কর্ণেল তাহের, হাসানুল হক ইনু নেতৃত্ব দিতে পারেননি। তারা ভুল রাজনীতি করেছেন। তার এই উক্তি আমি বহুবার শুনেছি। শিবুদা গীতিকারও ছিলেন। ১৯৭৪ সালে ওস্তাদ কুলেন্দু দাসের সুরে, তার রচনায় কন্ঠশিল্পী ছিলেন নাসির আহমেদ। গানের কথা রচিত হয়েছিল রিলিফ চোরদের নিয়ে। বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব মো. ওমর ফারুকের ভাষায় শিব নারায়ণ দাশ কোনকিছুতেই স্থির ছিল না। সকল অবস্থায় স্বাধীন। তবে সবার স্বীকার করতে হবে সৎ রাজনীতিকের শ্রেষ্ঠ উদাহরণ শিব নারায়ণ দাশ। যাকে বাড়ি-গাড়ি-অর্থ বশ করতে পারেনি। বছর দশক আগে কুমিল্লায় তিনি দৈনিক জনশক্তি নিয়ে আবার যাত্রা শুরু করেন।

রোটারিয়ান দিলনাশি মোহসেনকে তিনি পাশে পেয়েছিলেন। দিলনাশি মোহসেন থেকে শুনেছি কেবল শিবুদার দিকে তাকিয়ে অকাতরে অর্থ খরচ করেছেন। কিন্তু কিছুদিন পর কোথায় জনশক্তি আর কোথায় শিবুদা। চরম অর্থ সংকটে শিবুদা একবার হোটেল ব্যবসাও শুরু করেছিলেন। পরে আবার ছেড়ে দেন। শিবুদার পাশে অনেকেই ছিলেন। পরে সবাই সরে গেছেন। কেবল সরে যাননি গীতশ্রী চৌধুরী। সম্ভবত এজন্যই তিনি ৭৮ বছর আয়ু পেয়েছিলেন। এবছর ২২ এপ্রিল ছিল শিব নারায়ণ দাশের দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী। শিবুদার মতো রাজনীতিকরা জন্মই নেন অমর থাকবার জন্য। শিবুদা অমর হয়েই থাকবেন।

আবুল হাসানাত বাবুল: সম্পাদক, সাপ্তাহিক অভিবাদন; সাবেক সভাপতি, কুমিল্লা প্রেসক্লাব।

বিষয়:

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

১

আজন্ম বিপ্লবী শিব নারায়ণ দাশ

২

হিট ওয়েভ সামলাবেন কীভাবে

৩

পরীক্ষার হলে পড়ে আসতেই হবে, নির্ভুল উত্তর দিতে হবে

৪

বৈরাগী ও দীনবন্ধু বাঁশির গ্রাম শ্রীমদ্দী

৫

লালমাই পাহাড়ের কোলে বিজয়পুরের মৃৎশিল্প

সম্পর্কিত

হিট ওয়েভ সামলাবেন কীভাবে

হিট ওয়েভ সামলাবেন কীভাবে

৬ দিন আগে
পরীক্ষার হলে পড়ে আসতেই হবে, নির্ভুল উত্তর দিতে হবে

পরীক্ষার হলে পড়ে আসতেই হবে, নির্ভুল উত্তর দিতে হবে

৯ দিন আগে
বৈরাগী ও দীনবন্ধু বাঁশির গ্রাম শ্রীমদ্দী

বৈরাগী ও দীনবন্ধু বাঁশির গ্রাম শ্রীমদ্দী

১৫ দিন আগে
লালমাই পাহাড়ের কোলে বিজয়পুরের মৃৎশিল্প

লালমাই পাহাড়ের কোলে বিজয়পুরের মৃৎশিল্প

১৫ দিন আগে