ভাস্কর মজুমদার

রেজাল্টটা দেখার পর রাফি কিছুক্ষণ মোবাইলের দিকে তাকিয়ে রইল। রোল নম্বরটা আবার মিলিয়ে দেখল। রেজিস্ট্রেশন নম্বরও ঠিক আছে। নামটাও তার। শুধু ফলাফলটা নিজের বলে বিশ্বাস করতে পারছিল না। পাশের রুম থেকে মা ডাকলেন, “কী রে, রেজাল্ট পেয়েছিস?” রাফি উত্তর দিল না। মা আবার বললেন, “ওয়েবসাইটে ঢুকতে পারছিস না?” তার খুব ইচ্ছা হলো বলে, “না মা, ঢোকা যাচ্ছে না।” তাহলে আরও কিছুক্ষণ সময় পাওয়া যেত। আরও কিছুক্ষণ মা ভাবতেন, তাঁর ছেলে ভালো একটা খবর দেবে। কিন্তু মিথ্যা কথাটাও বলতে পারল না। মোবাইলটা মায়ের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে শুধু বলল, “মা, আমি ফেল করেছি।”
মা প্রথমে স্ক্রিনের দিকে তাকালেন, তারপর ছেলের মুখের দিকে। সকালে রান্না করতে করতে কতবার বলেছেন, “আজ তোর পছন্দের খাবার রান্না করছি। রেজাল্ট দিয়ে আয়, একসঙ্গে খাব।” সেই মানুষটা হঠাৎ চুপ হয়ে গেলেন। রাফির মনে হলো, মা যদি একটু বকতেন, তবু ভালো লাগত। এই চুপ করে থাকাটা সহ্য হচ্ছিল না। কিছুক্ষণ পর মা বাবাকে ফোন দিলেন। ফোনের ওপাশে বাবা কী বলেছেন, রাফি শুনতে পায়নি। শুধু মাকে বলতে শুনল, “আচ্ছা, বাসায় এসে কথা বোলো।” ওই একটা কথাই তার মাথায় ঘুরতে থাকল। বাবা বাসায় এসে কী বলবেন? এত টাকা খরচের হিসাব চাইবেন? বলবেন, “তোর জন্য মানুষের সামনে মুখ দেখাতে পারব না”? নাকি তার সঙ্গে কথা বলাই বন্ধ করে দেবেন?
দুপুরের মধ্যেই ফোন আসা শুরু হলো। “কত পেয়েছে?” “অমুকের ছেলে তো এ প্লাস পেয়েছে, তোমাদের কী খবর?” “আরে, ও তো ভালো ছাত্র ছিল! এমন হলো কীভাবে?” মা কয়েকটা ফোন ধরলেন, তারপর ফোনটা সাইলেন্ট করে রাখলেন। কিন্তু ততক্ষণে খবর ছড়িয়ে গেছে। এক আত্মীয় সরাসরি রাফিকে ফোন করে বললেন, “সারা বছর করেছিস কী? তোর বাবা তোর পেছনে কম টাকা খরচ করেছে? আমরা তো এত সুযোগ পাইনি। তোরা এত সুযোগ পেয়েও কিছু করতে পারিস না।” রাফি শুধু বলল, “জি।” তার বলার মতো অনেক কথা ছিল। কিন্তু মানুষটা উত্তর শোনার জন্য প্রশ্ন করছিলেন না।
রাফি চাইলে বলতে পারত, একটা বিষয় সে অনেক দিন ধরেই বুঝতে পারছিল না। প্রথমে ভেবেছিল, পরে বুঝে নেবে। ক্লাস এগিয়েছে, পড়া জমেছে, তার ভয়ও বেড়েছে। কোচিংয়ে স্যার যখন জিজ্ঞেস করেছেন, “সবাই বুঝেছ?”, অন্যদের সঙ্গে সেও মাথা নেড়েছে। সবার সামনে বলতে পারেনি, “স্যার, আমি বুঝি নাই।” কিছুদিন পড়াশোনায় অবহেলাও করেছে। মোবাইল নিয়ে সময় নষ্ট করেছে, আজকের পড়া কালকের জন্য রেখে দিয়েছে। আবার পরীক্ষার আগে রাত জেগেও পড়েছে। কিন্তু তত দিনে অনেক দেরি হয়ে গেছে। তার ভুল ছিল, দুর্বলতা ছিল, চেষ্টা করার ধরনেও সমস্যা ছিল। অথচ আজ কেউ সেসব জানতে চাইছে না। সবাই শুধু বলে দিচ্ছে, সে কেমন ছেলে।
বিকেলে বাবা বাসায় ফিরলেন। হাতে একটা মিষ্টির প্যাকেট। খবরটা জানার আগেই কিনেছিলেন। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে প্যাকেটটা দেখে রাফির বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে উঠল। বাবা কিছু না বলে সেটা টেবিলে রেখে দিলেন। রাফি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। বাবার কষ্টের টাকায় কেনা ওই মিষ্টির দিকে তাকানোর সাহসও হচ্ছিল না। জামা বদলে বাবা তাকে ডাকলেন। “কোন বিষয়ে ফেল করেছিস?” রাফি বলল। “পরীক্ষা খারাপ হয়েছে, আগে বলিসনি কেন?” ছেলেটা চুপ করে রইল। বাবা আবার জিজ্ঞেস করলেন, “আমাকে বলা যেত না?” অনেক কষ্টে রাফি বলল, “ভয় লাগছিল, বাবা।”
“কিসের ভয়?” রাফি উত্তর খুঁজে পাচ্ছিল না। কীভাবে বলবে, বাবাকে সে ভালোবাসে, আবার তাঁর হতাশ মুখটাকেও ভয় পায়? কীভাবে বলবে, বাসায় সবাই এত ভালো ফল আশা করছিল যে খারাপ পরীক্ষার কথাটা মুখেই আনতে পারেনি? বাবা তখন বললেন, “তোর জন্য আমরা এত কিছু করি, আর তুই...” কথাটা শেষ হওয়ার আগেই ফোন বেজে উঠল। এক আত্মীয় ফোন করেছেন। ওপাশ থেকে বললেন, “শুনলাম খবর। তোমাকে আগেই বলেছিলাম, ছেলেকে আরও শাসনে রাখো। এখনকার ছেলেপেলে তো...” বাবা কিছুক্ষণ শুনলেন। তারপর ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন, “ও এখন আমার সামনে বসে আছে। এসব কথা পরে বলি।” ওপাশের মানুষটা তবু থামলেন না। এবার বাবা বললেন, “আমাদের সবারই মন খারাপ। এখন ওকে একটু সময় দিই।” ফোনটা রেখে দেখলেন, রাফি তাঁর দিকে তাকিয়ে আছে। সারা দিনে এই প্রথম ছেলেটা কারও চোখের দিকে তাকাল।
রাতে মা খেতে ডাকলে রাফি বলল, “খাব না।” কিছুক্ষণ পর মা নিজেই খাবার নিয়ে রুমে এলেন। প্লেটটা টেবিলে রেখে পাশে বসলেন। তারপর বললেন, “বিকেলে তোকে একটা কথা বলেছি, বলা ঠিক হয়নি।” রাফি বুঝল, মা কোন কথাটা বলছেন। আত্মীয়দের ফোন আসার সময় মা বলেছিলেন, “এখন মানুষকে কী বলব?” সেই কথাটাই বারবার তার মনে পড়ছিল। মা ধীরে বললেন, “মানুষকে কী বলব ভাবতে গিয়ে তোর কেমন লাগছে, সেটাই জিজ্ঞেস করি নাই।”
রাফি আর কান্না আটকাতে পারল না। “মা, আমি তোমাদের অনেক কষ্ট দিয়ে ফেললাম।” মা ছেলের পিঠে হাত রাখলেন। “কষ্ট পেয়েছি। কিন্তু তুই এমন চুপ হয়ে থাকলে আরও কষ্ট লাগে। কী হয়েছে, আমাকে বল।” সেই রাতে রাফি অনেক কথা বলল। কোথায় পড়া বুঝতে পারেনি, কোথায় ফাঁকি দিয়েছে, কোন কথাটা স্যারকে বলতে লজ্জা পেয়েছে, কীভাবে পরীক্ষার হলে বসে জানা উত্তরও গুলিয়ে ফেলেছে। মা সব সমস্যার সমাধান জানতেন না। কিন্তু তিনি শুনলেন। বারবার থামিয়ে বললেন না, “অজুহাত দিস না।” দরজার কাছে বাবা দাঁড়িয়ে ছিলেন। কিছুক্ষণ পর তিনিও এসে বসলেন।
সব শুনে বাবা বললেন, “এখন এক দিনেই সব ঠিক করতে হবে না। আগে একটু শান্ত হ। তারপর স্যারদের সঙ্গে কথা বলব। কোথায় সমস্যা হয়েছে দেখি। আবার প্রস্তুতি নিতে হবে।” রাফি আস্তে করে জিজ্ঞেস করল, “তুমি আমার ওপর খুব রাগ করেছ?” বাবা বললেন, “রাগ করেছি। মনও খারাপ হয়েছে। কিন্তু তাই বলে তুই আমার কাছে আসতে ভয় পাবি, এটা তো চাইনি।” একটু থেমে আবার বললেন, “কষ্ট হলে আমার কাছেই বলবি। সব ঠিক থাকলেই শুধু আমার সঙ্গে কথা বলবি, এমন তো কোনো কথা নেই।”
পরদিন সকালে রাফি দেখল, বন্ধুদের কেউ মিষ্টি খাওয়ানোর ছবি দিয়েছে, কেউ ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়ে কথা বলছে। তাদের জন্য ভালো লাগার পাশাপাশি নিজের জন্যও খারাপ লাগছিল। মনে হচ্ছিল, সবাই সামনে চলে যাচ্ছে, সে একা দাঁড়িয়ে আছে। আবার একই বই নিয়ে বসতে হবে। কেউ প্রশ্ন করবে, কেউ তুলনা করবে। নিজের ওপর বিশ্বাস ফিরিয়ে আনতেও সময় লাগবে। বাবার কয়েকটা ভালো কথায় এসব কষ্ট এক রাতে শেষ হয়ে যায়নি। কিন্তু নাশতার টেবিলে বসে দেখল, মা আগের মতোই তার প্লেটে খাবার তুলে দিচ্ছেন। ছোট বোনটা স্কুলের গল্প করছে। বাবা বললেন, “বিকেলে একটু বাইরে যাবি আমার সঙ্গে?” রাফি মাথা নাড়ল। বাড়িটা আগের মতোই আছে। এই স্বাভাবিক আচরণটুকু তার খুব দরকার ছিল।
আমাদের দেশে রেজাল্টের দিনে একটা শিক্ষার্থীকে অনেক মানুষের মুখোমুখি হতে হয়। নিজের কষ্ট সামলানোর আগেই তাকে আত্মীয়দের প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়, প্রতিবেশীর সন্তানের সঙ্গে তুলনা শুনতে হয়, বাবা-মায়ের হতাশার ভারও নিতে হয়। যে ছেলেটা নিজেই বুঝে উঠতে পারছে না এখন কী করবে, তাকেই আমরা বলে দিই, তার ভবিষ্যৎ শেষ। মেয়েটা হয়তো সারারাত কেঁদেছে। সকালে তাকে আবার শুনতে হয়, “তোমাকে নিয়ে আমাদের কত আশা ছিল!” কথাটা শুনে তার মনে হতে পারে, পরিবারের সব ভালোবাসা বুঝি ওই আশাটা পূরণ করার শর্তেই ছিল।
বাবা-মায়ের কষ্টটাও সত্যি। সন্তানের পড়াশোনার জন্য অনেকেই নিজের শখ বাদ দেন, বাড়তি কাজ করেন, মাসের শেষটা টানাটানি করে চালান। খারাপ ফলে তাঁদের মন খারাপ হবে, রাগও হবে। সন্তান কোথায় অবহেলা করেছে, সেই কথাও বলতে হবে। কিন্তু “তোর দ্বারা কিছু হবে না” বলে দিলে সে কোথা থেকে শুরু করবে? ভুলটা স্বীকার করার সাহস পেতে হলে তাকে এটুকু বিশ্বাস করতে হবে যে সত্যি কথাটা বললেও বাসায় তার কথা শোনা হবে।
একটা পরীক্ষায় ফেল করলে সময় নষ্ট হতে পারে, পরিকল্পনা বদলাতে পারে, কোনো সুযোগ হাতছাড়াও হতে পারে। এই ক্ষতিকে ছোট করে দেখার কিছু নেই। কিন্তু এখান থেকেই একটি মানুষের বাকি জীবনের হিসাব করে ফেলা যায় না। কেউ একটু বেশি সময় নিয়ে শেখে, কেউ ভুল পথে গিয়ে ফিরে আসে, কেউ অন্য কাজে নিজের যোগ্যতা খুঁজে পায়। আর প্রত্যেককে একদিন বিরাট কিছু হয়ে সবাইকে চমকে দিতেই হবে কেন? নিজের দায়িত্ব নিতে শেখা, সৎভাবে কাজ করা, পরিবারের পাশে দাঁড়ানো, ভালো মানুষ হয়ে বেঁচে থাকাও তো কম কিছু নয়।
সেদিন রাতে বাবা মিষ্টির প্যাকেটটা খুললেন। একটা মিষ্টি রাফির হাতে দিয়ে বললেন, “নে, খা।” রাফি অবাক হয়ে তাকাল। বাবা বললেন, “তোর জন্যই তো এনেছিলাম।” মিষ্টিটা হাতে নিয়ে রাফির আবার কান্না পেল। তার রেজাল্ট বদলায়নি। সামনে আবার পড়তে হবে, ভুলগুলোও ঠিক করতে হবে। কিন্তু বাবার পাশে বসে সেদিন সে মিষ্টিটা খেতে পারল। অনেকক্ষণ পর বলল, “বাবা, কাল আমার সঙ্গে স্যারের কাছে যাবা?” বাবা বললেন, “যাব।”
ভাস্কর মজুমদার: জেনারেল ম্যানেজার, মার্চেন্ডাইজিং, ব্র্যাক আড়ং ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী।

রেজাল্টটা দেখার পর রাফি কিছুক্ষণ মোবাইলের দিকে তাকিয়ে রইল। রোল নম্বরটা আবার মিলিয়ে দেখল। রেজিস্ট্রেশন নম্বরও ঠিক আছে। নামটাও তার। শুধু ফলাফলটা নিজের বলে বিশ্বাস করতে পারছিল না। পাশের রুম থেকে মা ডাকলেন, “কী রে, রেজাল্ট পেয়েছিস?” রাফি উত্তর দিল না। মা আবার বললেন, “ওয়েবসাইটে ঢুকতে পারছিস না?” তার খুব ইচ্ছা হলো বলে, “না মা, ঢোকা যাচ্ছে না।” তাহলে আরও কিছুক্ষণ সময় পাওয়া যেত। আরও কিছুক্ষণ মা ভাবতেন, তাঁর ছেলে ভালো একটা খবর দেবে। কিন্তু মিথ্যা কথাটাও বলতে পারল না। মোবাইলটা মায়ের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে শুধু বলল, “মা, আমি ফেল করেছি।”
মা প্রথমে স্ক্রিনের দিকে তাকালেন, তারপর ছেলের মুখের দিকে। সকালে রান্না করতে করতে কতবার বলেছেন, “আজ তোর পছন্দের খাবার রান্না করছি। রেজাল্ট দিয়ে আয়, একসঙ্গে খাব।” সেই মানুষটা হঠাৎ চুপ হয়ে গেলেন। রাফির মনে হলো, মা যদি একটু বকতেন, তবু ভালো লাগত। এই চুপ করে থাকাটা সহ্য হচ্ছিল না। কিছুক্ষণ পর মা বাবাকে ফোন দিলেন। ফোনের ওপাশে বাবা কী বলেছেন, রাফি শুনতে পায়নি। শুধু মাকে বলতে শুনল, “আচ্ছা, বাসায় এসে কথা বোলো।” ওই একটা কথাই তার মাথায় ঘুরতে থাকল। বাবা বাসায় এসে কী বলবেন? এত টাকা খরচের হিসাব চাইবেন? বলবেন, “তোর জন্য মানুষের সামনে মুখ দেখাতে পারব না”? নাকি তার সঙ্গে কথা বলাই বন্ধ করে দেবেন?
দুপুরের মধ্যেই ফোন আসা শুরু হলো। “কত পেয়েছে?” “অমুকের ছেলে তো এ প্লাস পেয়েছে, তোমাদের কী খবর?” “আরে, ও তো ভালো ছাত্র ছিল! এমন হলো কীভাবে?” মা কয়েকটা ফোন ধরলেন, তারপর ফোনটা সাইলেন্ট করে রাখলেন। কিন্তু ততক্ষণে খবর ছড়িয়ে গেছে। এক আত্মীয় সরাসরি রাফিকে ফোন করে বললেন, “সারা বছর করেছিস কী? তোর বাবা তোর পেছনে কম টাকা খরচ করেছে? আমরা তো এত সুযোগ পাইনি। তোরা এত সুযোগ পেয়েও কিছু করতে পারিস না।” রাফি শুধু বলল, “জি।” তার বলার মতো অনেক কথা ছিল। কিন্তু মানুষটা উত্তর শোনার জন্য প্রশ্ন করছিলেন না।
রাফি চাইলে বলতে পারত, একটা বিষয় সে অনেক দিন ধরেই বুঝতে পারছিল না। প্রথমে ভেবেছিল, পরে বুঝে নেবে। ক্লাস এগিয়েছে, পড়া জমেছে, তার ভয়ও বেড়েছে। কোচিংয়ে স্যার যখন জিজ্ঞেস করেছেন, “সবাই বুঝেছ?”, অন্যদের সঙ্গে সেও মাথা নেড়েছে। সবার সামনে বলতে পারেনি, “স্যার, আমি বুঝি নাই।” কিছুদিন পড়াশোনায় অবহেলাও করেছে। মোবাইল নিয়ে সময় নষ্ট করেছে, আজকের পড়া কালকের জন্য রেখে দিয়েছে। আবার পরীক্ষার আগে রাত জেগেও পড়েছে। কিন্তু তত দিনে অনেক দেরি হয়ে গেছে। তার ভুল ছিল, দুর্বলতা ছিল, চেষ্টা করার ধরনেও সমস্যা ছিল। অথচ আজ কেউ সেসব জানতে চাইছে না। সবাই শুধু বলে দিচ্ছে, সে কেমন ছেলে।
বিকেলে বাবা বাসায় ফিরলেন। হাতে একটা মিষ্টির প্যাকেট। খবরটা জানার আগেই কিনেছিলেন। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে প্যাকেটটা দেখে রাফির বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে উঠল। বাবা কিছু না বলে সেটা টেবিলে রেখে দিলেন। রাফি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। বাবার কষ্টের টাকায় কেনা ওই মিষ্টির দিকে তাকানোর সাহসও হচ্ছিল না। জামা বদলে বাবা তাকে ডাকলেন। “কোন বিষয়ে ফেল করেছিস?” রাফি বলল। “পরীক্ষা খারাপ হয়েছে, আগে বলিসনি কেন?” ছেলেটা চুপ করে রইল। বাবা আবার জিজ্ঞেস করলেন, “আমাকে বলা যেত না?” অনেক কষ্টে রাফি বলল, “ভয় লাগছিল, বাবা।”
“কিসের ভয়?” রাফি উত্তর খুঁজে পাচ্ছিল না। কীভাবে বলবে, বাবাকে সে ভালোবাসে, আবার তাঁর হতাশ মুখটাকেও ভয় পায়? কীভাবে বলবে, বাসায় সবাই এত ভালো ফল আশা করছিল যে খারাপ পরীক্ষার কথাটা মুখেই আনতে পারেনি? বাবা তখন বললেন, “তোর জন্য আমরা এত কিছু করি, আর তুই...” কথাটা শেষ হওয়ার আগেই ফোন বেজে উঠল। এক আত্মীয় ফোন করেছেন। ওপাশ থেকে বললেন, “শুনলাম খবর। তোমাকে আগেই বলেছিলাম, ছেলেকে আরও শাসনে রাখো। এখনকার ছেলেপেলে তো...” বাবা কিছুক্ষণ শুনলেন। তারপর ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন, “ও এখন আমার সামনে বসে আছে। এসব কথা পরে বলি।” ওপাশের মানুষটা তবু থামলেন না। এবার বাবা বললেন, “আমাদের সবারই মন খারাপ। এখন ওকে একটু সময় দিই।” ফোনটা রেখে দেখলেন, রাফি তাঁর দিকে তাকিয়ে আছে। সারা দিনে এই প্রথম ছেলেটা কারও চোখের দিকে তাকাল।
রাতে মা খেতে ডাকলে রাফি বলল, “খাব না।” কিছুক্ষণ পর মা নিজেই খাবার নিয়ে রুমে এলেন। প্লেটটা টেবিলে রেখে পাশে বসলেন। তারপর বললেন, “বিকেলে তোকে একটা কথা বলেছি, বলা ঠিক হয়নি।” রাফি বুঝল, মা কোন কথাটা বলছেন। আত্মীয়দের ফোন আসার সময় মা বলেছিলেন, “এখন মানুষকে কী বলব?” সেই কথাটাই বারবার তার মনে পড়ছিল। মা ধীরে বললেন, “মানুষকে কী বলব ভাবতে গিয়ে তোর কেমন লাগছে, সেটাই জিজ্ঞেস করি নাই।”
রাফি আর কান্না আটকাতে পারল না। “মা, আমি তোমাদের অনেক কষ্ট দিয়ে ফেললাম।” মা ছেলের পিঠে হাত রাখলেন। “কষ্ট পেয়েছি। কিন্তু তুই এমন চুপ হয়ে থাকলে আরও কষ্ট লাগে। কী হয়েছে, আমাকে বল।” সেই রাতে রাফি অনেক কথা বলল। কোথায় পড়া বুঝতে পারেনি, কোথায় ফাঁকি দিয়েছে, কোন কথাটা স্যারকে বলতে লজ্জা পেয়েছে, কীভাবে পরীক্ষার হলে বসে জানা উত্তরও গুলিয়ে ফেলেছে। মা সব সমস্যার সমাধান জানতেন না। কিন্তু তিনি শুনলেন। বারবার থামিয়ে বললেন না, “অজুহাত দিস না।” দরজার কাছে বাবা দাঁড়িয়ে ছিলেন। কিছুক্ষণ পর তিনিও এসে বসলেন।
সব শুনে বাবা বললেন, “এখন এক দিনেই সব ঠিক করতে হবে না। আগে একটু শান্ত হ। তারপর স্যারদের সঙ্গে কথা বলব। কোথায় সমস্যা হয়েছে দেখি। আবার প্রস্তুতি নিতে হবে।” রাফি আস্তে করে জিজ্ঞেস করল, “তুমি আমার ওপর খুব রাগ করেছ?” বাবা বললেন, “রাগ করেছি। মনও খারাপ হয়েছে। কিন্তু তাই বলে তুই আমার কাছে আসতে ভয় পাবি, এটা তো চাইনি।” একটু থেমে আবার বললেন, “কষ্ট হলে আমার কাছেই বলবি। সব ঠিক থাকলেই শুধু আমার সঙ্গে কথা বলবি, এমন তো কোনো কথা নেই।”
পরদিন সকালে রাফি দেখল, বন্ধুদের কেউ মিষ্টি খাওয়ানোর ছবি দিয়েছে, কেউ ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়ে কথা বলছে। তাদের জন্য ভালো লাগার পাশাপাশি নিজের জন্যও খারাপ লাগছিল। মনে হচ্ছিল, সবাই সামনে চলে যাচ্ছে, সে একা দাঁড়িয়ে আছে। আবার একই বই নিয়ে বসতে হবে। কেউ প্রশ্ন করবে, কেউ তুলনা করবে। নিজের ওপর বিশ্বাস ফিরিয়ে আনতেও সময় লাগবে। বাবার কয়েকটা ভালো কথায় এসব কষ্ট এক রাতে শেষ হয়ে যায়নি। কিন্তু নাশতার টেবিলে বসে দেখল, মা আগের মতোই তার প্লেটে খাবার তুলে দিচ্ছেন। ছোট বোনটা স্কুলের গল্প করছে। বাবা বললেন, “বিকেলে একটু বাইরে যাবি আমার সঙ্গে?” রাফি মাথা নাড়ল। বাড়িটা আগের মতোই আছে। এই স্বাভাবিক আচরণটুকু তার খুব দরকার ছিল।
আমাদের দেশে রেজাল্টের দিনে একটা শিক্ষার্থীকে অনেক মানুষের মুখোমুখি হতে হয়। নিজের কষ্ট সামলানোর আগেই তাকে আত্মীয়দের প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়, প্রতিবেশীর সন্তানের সঙ্গে তুলনা শুনতে হয়, বাবা-মায়ের হতাশার ভারও নিতে হয়। যে ছেলেটা নিজেই বুঝে উঠতে পারছে না এখন কী করবে, তাকেই আমরা বলে দিই, তার ভবিষ্যৎ শেষ। মেয়েটা হয়তো সারারাত কেঁদেছে। সকালে তাকে আবার শুনতে হয়, “তোমাকে নিয়ে আমাদের কত আশা ছিল!” কথাটা শুনে তার মনে হতে পারে, পরিবারের সব ভালোবাসা বুঝি ওই আশাটা পূরণ করার শর্তেই ছিল।
বাবা-মায়ের কষ্টটাও সত্যি। সন্তানের পড়াশোনার জন্য অনেকেই নিজের শখ বাদ দেন, বাড়তি কাজ করেন, মাসের শেষটা টানাটানি করে চালান। খারাপ ফলে তাঁদের মন খারাপ হবে, রাগও হবে। সন্তান কোথায় অবহেলা করেছে, সেই কথাও বলতে হবে। কিন্তু “তোর দ্বারা কিছু হবে না” বলে দিলে সে কোথা থেকে শুরু করবে? ভুলটা স্বীকার করার সাহস পেতে হলে তাকে এটুকু বিশ্বাস করতে হবে যে সত্যি কথাটা বললেও বাসায় তার কথা শোনা হবে।
একটা পরীক্ষায় ফেল করলে সময় নষ্ট হতে পারে, পরিকল্পনা বদলাতে পারে, কোনো সুযোগ হাতছাড়াও হতে পারে। এই ক্ষতিকে ছোট করে দেখার কিছু নেই। কিন্তু এখান থেকেই একটি মানুষের বাকি জীবনের হিসাব করে ফেলা যায় না। কেউ একটু বেশি সময় নিয়ে শেখে, কেউ ভুল পথে গিয়ে ফিরে আসে, কেউ অন্য কাজে নিজের যোগ্যতা খুঁজে পায়। আর প্রত্যেককে একদিন বিরাট কিছু হয়ে সবাইকে চমকে দিতেই হবে কেন? নিজের দায়িত্ব নিতে শেখা, সৎভাবে কাজ করা, পরিবারের পাশে দাঁড়ানো, ভালো মানুষ হয়ে বেঁচে থাকাও তো কম কিছু নয়।
সেদিন রাতে বাবা মিষ্টির প্যাকেটটা খুললেন। একটা মিষ্টি রাফির হাতে দিয়ে বললেন, “নে, খা।” রাফি অবাক হয়ে তাকাল। বাবা বললেন, “তোর জন্যই তো এনেছিলাম।” মিষ্টিটা হাতে নিয়ে রাফির আবার কান্না পেল। তার রেজাল্ট বদলায়নি। সামনে আবার পড়তে হবে, ভুলগুলোও ঠিক করতে হবে। কিন্তু বাবার পাশে বসে সেদিন সে মিষ্টিটা খেতে পারল। অনেকক্ষণ পর বলল, “বাবা, কাল আমার সঙ্গে স্যারের কাছে যাবা?” বাবা বললেন, “যাব।”
ভাস্কর মজুমদার: জেনারেল ম্যানেজার, মার্চেন্ডাইজিং, ব্র্যাক আড়ং ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী।