ননী গোপাল সূত্রধর

শীতকাল এলেই ভ্রমণপিয়াসীরা সাগরের টানে ছুটে যায় সেন্ট মার্টিন। সেন্টমার্টিন স্রষ্টার এক অপরুপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও নির্জনতার লীলাভূমি। প্রবাল ঘেরা এ দ্বীপের চারিধারে জল আর জল। জলে ভাসছে অসংখ্য সাম্পান, ছোট বড় মাছ ধরা নৌকা, পর্যটক বহনকারী কিছু জাহাজ ডেউয়ে ডেউয়ে পাড়ি দিচ্ছে শত নটিক্যাল মাইল পথ। সেই সাথে সাগরের বুকে জাহাজের পিছু নেয়া গাঙচিল, আর ডেউয়ের সাথে মিতালি করে লাফাচ্ছে কিছু উড্ডুক মাছ। দারুণ উপভোগ্য। এছাড়াও দূষণমুক্ত অঞ্চল হওয়ায় রাতের আকাশে জ্বলজ্বল করে চাঁদ-তারার মেলা। প্রভাতের টুকটুকে লাল সূর্যটাকে লাগে আরো স্বর্গীয়। জোয়ার ভাটার এ বালুময় সমুদ্র সৈকতে পর্যটকদের জলকেলির এক মহোৎসব - সকলেরই বিষাদ- অবসাদগ্রস্থ মনকে সাগরের জলে ভিজিয়ে প্রাণবন্ত করার পরম চেষ্টা। সাগরের নীল জলে চোখ মেলে নীলিমা দেখা এ আরেক প্রশান্তি। শীতল হাওয়ার পরশে জুড়িয়ে যায় ক্লান্ত দেহ ও মন।
চিত্ত সুখের ভ্রমণ। আকাশ নদী পাহাড় সাগর যে কত বিশাল কত অসীম সাগরের কাছে না গেলে ঠিক বোঝা যায় না। প্রকৃতির রূপ রস গন্ধের অপার মহিমায় উদ্বেলিত হয় আমাদের জীবন। রহস্যময় প্রকৃতির পরতে পরতে স্রষ্টার উপস্থিতি জানান দেয়। সেন্ট মার্টিন দ্বীপকে জানার অনেক কিছুই আছে। এখানকার পরিবেশ, বাস্তুসংস্থান, জীববৈচিত্র্য নিয়ে কাজকরতে প্রতিদিনই এখানে দলে দলে গবেষক, বিজ্ঞানী অনুসন্ধানকারী আসে। কিন্তু এখানে ভ্রমণ যেমন জ্ঞানবর্ধক, আনন্দদায়ক তেমনি বেদনাদায়কও।
কঠিন যন্ত্রণার নামও হতে পারে সেন্ট মার্টিন ভ্রমণ। অনেক লম্বা সময়ের যাত্রাপথ। জাহাজযোগে কক্সবাজার থেকে সেন্ট মার্টিন পৌঁছতে ৬ ঘন্টারও বেশি সময় লাগে। আর জাহাজের উঠার আগেই কক্সবাজার নুনিয়ারচর জেটিতে আরো ঘন্টা দু'য়েক দাঁড়িয়ে থাকা লাগে যা ভ্রমণ বিড়ম্বনার বড় অংশ। জাহাজে উঠা ও নামা দুইটাই যন্ত্রণাদায়ক। ১০ ফিট রাস্তায় লোকে লোকারন্য। ব্যাগ বস্তায় ঠাসাঠাসি। একই সময়ে যাত্রীরা উঠা নামা করে। বিশাল লাইন। মাথার উপর রৌদ্রের খরতাপ ত আছেই।
খরচ একটা বড় বিষয়। সব কিছুরই চড়া দাম। যেকোন কিছুই তিন থেকে চার গুণ বেশি দাম, কিছু কিছু ক্ষেত্রে সাত আট গুণ। হোক সেটা রিসোর্ট বা হোটেল এর ভাড়া, যানবাহনের ভাড়া, কেনাকাটা বা খাওয়া দাওয়া। জাহাজ থেকে নেমে রিসোর্ট যেতে প্রথমে কিছুক্ষন ভীড় ঠেলে হেঁটে জেটি পার হতে হয় তারপরে শুরু হয় অটো রিকশা ভ্যান চালকের দৌরাত্ম্য। কাছে কিংবা দূরে যেখানেই যেতে চান দিতে হবে বহু গুণ টাকা। সবকিছুতেই দরকষাকষি। কথার মারপ্যাঁচ।

সেন্টমার্টিন বাজারের বর্জ্য অপব্যবস্থাপনার কারণে দুর্গন্ধ, পন্যের অতিরিক্ত দাম, মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য বিক্রি, ভালো মাছ দেখিয়ে পঁচা মাছ ফ্রাই করে দেয়া, অসাধুতা, দুর্ব্যবহার ইত্যাদি তো আছেই।
সেন্ট মার্টিনে কুকুরের দাপট বেড়েই চলেছে। অসংখ্য কুকুর সৈকতে ঘুরে বেড়ায় যা বিরক্তিকর, ভীতিকর ও স্বাস্থ্য ঝুঁকিপূর্ণ। শিশু ও বৃদ্ধরা আতংকে থাকে। খাবারের জন্য পর্যটকদের গায়ে উঠে পড়ে যা অত্যন্ত বিপদজনক। পর্যটকরা যখন খোলা জায়গায় খাওয়ার আয়োজন করেন, কুকুরগুলো খাবারের জন্য আগ্রাসী হয়ে উঠে।
সেই পরিচ্ছন্ন প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন এখন দিনকে দিন ময়লা-আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হচ্ছে। কেয়াবন ও প্রবাল থেকে শুরু করে যত্রতত্র বর্জ্যরে কারণে দূষিত হচ্ছে দ্বীপের নীল জলরাশি। নিয়তই হুমকির মুখে পড়ছে জীববৈচিত্র্য। সুতরাং যুগোপযোগী পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো নির্মানসহ জীববৈচিত্র্য, প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন পদ্ধতি অবলম্বনকরে সেন্ট মার্টিনকে বাচিঁয়ে রাখা আমাদের পর্যটকদেরই দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের রয়েছে মহান দায়িত্ব।
পরিশেষে, দিগন্তজোড়া নীল জলরাশি, অবিরাম ঢেউয়ের মৃদু কলতান এবং রক্তিম সূর্যোদয়- সূর্যাস্তের আবির্ভাব মানব মনে এক অন্তর্লীন প্রশান্তির সঞ্চার করে। এই প্রকৃতির মহিমার সামনে দাঁড়িয়ে শরীরের ক্লান্তি ও মানসিক ভার লঘু হয়ে আসে। তাছাড়া, সেন্ট মার্টিন দ্বীপ প্রকৃতির এক নির্মল কবিতা—স্বচ্ছ নীল জল, প্রবালছাওয়া তটরেখা, নীরব-নিস্তব্ধ রাত ও আকাশভরা নক্ষত্ররাজি যেন মানব চেতনাকে গভীর আত্মোপলব্ধির পথে আহ্বান জানায়। আমাদের প্রিয় সেন্টমার্টিন আমাদের নেতিবাচক ও ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের প্রভাবমুক্ত থাকুক হয়ে উঠুক জীববৈচিত্রের অনন্য আঁধার।
ননী গোপাল সূত্রধর : সহকারী অধ্যাপক, ইংরেজি, শশীদল আলহাজ্ব মুহাম্মদ আবু তাহের কলেজ, কুমিল্লা।

শীতকাল এলেই ভ্রমণপিয়াসীরা সাগরের টানে ছুটে যায় সেন্ট মার্টিন। সেন্টমার্টিন স্রষ্টার এক অপরুপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও নির্জনতার লীলাভূমি। প্রবাল ঘেরা এ দ্বীপের চারিধারে জল আর জল। জলে ভাসছে অসংখ্য সাম্পান, ছোট বড় মাছ ধরা নৌকা, পর্যটক বহনকারী কিছু জাহাজ ডেউয়ে ডেউয়ে পাড়ি দিচ্ছে শত নটিক্যাল মাইল পথ। সেই সাথে সাগরের বুকে জাহাজের পিছু নেয়া গাঙচিল, আর ডেউয়ের সাথে মিতালি করে লাফাচ্ছে কিছু উড্ডুক মাছ। দারুণ উপভোগ্য। এছাড়াও দূষণমুক্ত অঞ্চল হওয়ায় রাতের আকাশে জ্বলজ্বল করে চাঁদ-তারার মেলা। প্রভাতের টুকটুকে লাল সূর্যটাকে লাগে আরো স্বর্গীয়। জোয়ার ভাটার এ বালুময় সমুদ্র সৈকতে পর্যটকদের জলকেলির এক মহোৎসব - সকলেরই বিষাদ- অবসাদগ্রস্থ মনকে সাগরের জলে ভিজিয়ে প্রাণবন্ত করার পরম চেষ্টা। সাগরের নীল জলে চোখ মেলে নীলিমা দেখা এ আরেক প্রশান্তি। শীতল হাওয়ার পরশে জুড়িয়ে যায় ক্লান্ত দেহ ও মন।
চিত্ত সুখের ভ্রমণ। আকাশ নদী পাহাড় সাগর যে কত বিশাল কত অসীম সাগরের কাছে না গেলে ঠিক বোঝা যায় না। প্রকৃতির রূপ রস গন্ধের অপার মহিমায় উদ্বেলিত হয় আমাদের জীবন। রহস্যময় প্রকৃতির পরতে পরতে স্রষ্টার উপস্থিতি জানান দেয়। সেন্ট মার্টিন দ্বীপকে জানার অনেক কিছুই আছে। এখানকার পরিবেশ, বাস্তুসংস্থান, জীববৈচিত্র্য নিয়ে কাজকরতে প্রতিদিনই এখানে দলে দলে গবেষক, বিজ্ঞানী অনুসন্ধানকারী আসে। কিন্তু এখানে ভ্রমণ যেমন জ্ঞানবর্ধক, আনন্দদায়ক তেমনি বেদনাদায়কও।
কঠিন যন্ত্রণার নামও হতে পারে সেন্ট মার্টিন ভ্রমণ। অনেক লম্বা সময়ের যাত্রাপথ। জাহাজযোগে কক্সবাজার থেকে সেন্ট মার্টিন পৌঁছতে ৬ ঘন্টারও বেশি সময় লাগে। আর জাহাজের উঠার আগেই কক্সবাজার নুনিয়ারচর জেটিতে আরো ঘন্টা দু'য়েক দাঁড়িয়ে থাকা লাগে যা ভ্রমণ বিড়ম্বনার বড় অংশ। জাহাজে উঠা ও নামা দুইটাই যন্ত্রণাদায়ক। ১০ ফিট রাস্তায় লোকে লোকারন্য। ব্যাগ বস্তায় ঠাসাঠাসি। একই সময়ে যাত্রীরা উঠা নামা করে। বিশাল লাইন। মাথার উপর রৌদ্রের খরতাপ ত আছেই।
খরচ একটা বড় বিষয়। সব কিছুরই চড়া দাম। যেকোন কিছুই তিন থেকে চার গুণ বেশি দাম, কিছু কিছু ক্ষেত্রে সাত আট গুণ। হোক সেটা রিসোর্ট বা হোটেল এর ভাড়া, যানবাহনের ভাড়া, কেনাকাটা বা খাওয়া দাওয়া। জাহাজ থেকে নেমে রিসোর্ট যেতে প্রথমে কিছুক্ষন ভীড় ঠেলে হেঁটে জেটি পার হতে হয় তারপরে শুরু হয় অটো রিকশা ভ্যান চালকের দৌরাত্ম্য। কাছে কিংবা দূরে যেখানেই যেতে চান দিতে হবে বহু গুণ টাকা। সবকিছুতেই দরকষাকষি। কথার মারপ্যাঁচ।

সেন্টমার্টিন বাজারের বর্জ্য অপব্যবস্থাপনার কারণে দুর্গন্ধ, পন্যের অতিরিক্ত দাম, মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য বিক্রি, ভালো মাছ দেখিয়ে পঁচা মাছ ফ্রাই করে দেয়া, অসাধুতা, দুর্ব্যবহার ইত্যাদি তো আছেই।
সেন্ট মার্টিনে কুকুরের দাপট বেড়েই চলেছে। অসংখ্য কুকুর সৈকতে ঘুরে বেড়ায় যা বিরক্তিকর, ভীতিকর ও স্বাস্থ্য ঝুঁকিপূর্ণ। শিশু ও বৃদ্ধরা আতংকে থাকে। খাবারের জন্য পর্যটকদের গায়ে উঠে পড়ে যা অত্যন্ত বিপদজনক। পর্যটকরা যখন খোলা জায়গায় খাওয়ার আয়োজন করেন, কুকুরগুলো খাবারের জন্য আগ্রাসী হয়ে উঠে।
সেই পরিচ্ছন্ন প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন এখন দিনকে দিন ময়লা-আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হচ্ছে। কেয়াবন ও প্রবাল থেকে শুরু করে যত্রতত্র বর্জ্যরে কারণে দূষিত হচ্ছে দ্বীপের নীল জলরাশি। নিয়তই হুমকির মুখে পড়ছে জীববৈচিত্র্য। সুতরাং যুগোপযোগী পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো নির্মানসহ জীববৈচিত্র্য, প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন পদ্ধতি অবলম্বনকরে সেন্ট মার্টিনকে বাচিঁয়ে রাখা আমাদের পর্যটকদেরই দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের রয়েছে মহান দায়িত্ব।
পরিশেষে, দিগন্তজোড়া নীল জলরাশি, অবিরাম ঢেউয়ের মৃদু কলতান এবং রক্তিম সূর্যোদয়- সূর্যাস্তের আবির্ভাব মানব মনে এক অন্তর্লীন প্রশান্তির সঞ্চার করে। এই প্রকৃতির মহিমার সামনে দাঁড়িয়ে শরীরের ক্লান্তি ও মানসিক ভার লঘু হয়ে আসে। তাছাড়া, সেন্ট মার্টিন দ্বীপ প্রকৃতির এক নির্মল কবিতা—স্বচ্ছ নীল জল, প্রবালছাওয়া তটরেখা, নীরব-নিস্তব্ধ রাত ও আকাশভরা নক্ষত্ররাজি যেন মানব চেতনাকে গভীর আত্মোপলব্ধির পথে আহ্বান জানায়। আমাদের প্রিয় সেন্টমার্টিন আমাদের নেতিবাচক ও ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের প্রভাবমুক্ত থাকুক হয়ে উঠুক জীববৈচিত্রের অনন্য আঁধার।
ননী গোপাল সূত্রধর : সহকারী অধ্যাপক, ইংরেজি, শশীদল আলহাজ্ব মুহাম্মদ আবু তাহের কলেজ, কুমিল্লা।