বরুড়ায় এক যুগ ধরে শিশুদের নিয়ে চলছে গাছতলায় বিনামূল্যে পাঠদান

বরুড়া প্রতিনিধি
Thumbnail image

কুমিল্লার বরুড়ায় এক যুগ ধরে পথশিশুদের নিয়ে চলছে গাছতলায় বিনামূল্যে পাঠদান।

ওপরে নীলাকাশ, তাদের ছাদ। আর নিচে প্লাস্টিকের বস্তা ওদের বেঞ্চ। সেখানে অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থী নিয়মিত পড়ে।

বরুড়া উপজেলার ৪নং দক্ষিণ খোসবাস ইউনিয়নের হোসেনপুর গ্রামে শিশুদের নিয়ে চলছে পাঠশালাটি। এই পাঠশালার কারণে গ্রামে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর হার কমেছে। সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় হোসেনপুর গ্রামের অধিকাংশ মানুষের পেশা কৃষি ও দিনমজুর। তাদের সন্তানদের নিয়ে চলছে গাছতলার পাঠশালা। শিক্ষকরা পড়া দেখিয়ে দিচ্ছেন। কেউ লিখছেন, কেউ মাথা দুলিয়ে পড়ছেন। এই পাঠশালার উদ্যোক্তা ওই গ্রামের ছেলে ফটো সাংবাদিক মো. ইলিয়াস হোসাইন।

ইলিয়াস হোসাইন বলেন, রাকিয়া, ফাহিমা, জান্নাত। দ্বিতীয় শ্রেণি থেকে এখানে পড়ছে। তারা এখন ১০ম শ্রেণির ছাত্রী। পড়ালেখার প্রবল ইচ্ছে। মা-বাবা মাঝে মাঝে চায় বিয়ে দিতে। আইনের কথা বলি। উৎসাহ দিয়ে এখন পর্যন্ত চালিয়ে যাচ্ছি। ওদের কারও কারও ইচ্ছে শিক্ষক হবে। ভালো চাকরি করবে। পরিবারের দারিদ্র্যতা দূর করবে।

তিনি বলেন, কুমিল্লা নগরের ধর্ম সাগরপাড় পার্কের ভেতর অবকাশ ছাউনিতে ১৩ জন পথশিশুদের পড়ানো দিয়ে শুরু। তারপর খেয়াল করলাম নিজের গ্রামের অনেক মানুষ আছে।

পাঠশালা পরিচালনার আর্থিক জোগান সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বন্ধু মহলের সহযোগিতায়। যখন শুরু করি গ্রামের কিছু মানুষ নেতিবাচক আচরণ করেছিল।

জানা গেছে, সন্তানকে টাকার অভাবে পড়াতে পারছে না কেউ। পঞ্চম শ্রেণিতে উঠেই শিশুদের পড়ালেখা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। তাই অবকাশের দ্বিতীয় শাখা বাড়িতে প্রতিষ্ঠিত করা। গ্রামে শুরু করি ২০১৩ সালের ২০ সেপ্টেম্বর। ২০ জন শিশু এবং ১০ জন শিক্ষক দিয়ে যাত্রা শুরু। প্রথমে মসজিদের মাঠে ও স্কুলের বারান্দায়। পরে বাড়ির উঠানে বরই গাছের তলায় শিশুদের পড়ার স্থান নির্ধারণ করি। এখন পর্যন্ত বাড়ির উঠানেই পড়াচ্ছি। বর্তমানে শিশুর সংখ্যা ৬২ জন। ওরা বিভিন্ন স্কুলে পড়ে। এখানে শিশু শ্রেণি থেকে ১০ম শ্রেণি পর্যন্ত শিশু আছে। বিকাল হলেই সবাই ব্যাগ কাঁধে পড়তে আসে। ওদের প্রতিদিন বিকেল ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত পড়ানো হয়। শিশুদের এখান থেকেই খাতা-কলম, ব্যাগসহ সব সুরক্ষা সামগ্রী দেওয়া হয়। শিশুরা ঈদের আনন্দ থেকে যাতে বঞ্চিত না হয় সেজন্য প্রতি ঈদে নতুন জামা-কাপড় দেওয়া হয়। শীতের মৌসুমে সমস্যা হয় না। বর্ষাতে উঠান ভেজা থাকার কারণে বসতে পারে না, আমাদের ঘরের বারান্দায় বসে। যদি তাদের জন্য একটা ঘর এবং জায়গা পেতাম তাহলে সুবিধা হতো। পাঠশালা পরিচালনার আর্থিক জোগানটা করে থাকি নিজের অর্থ এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন বন্ধু মহলের সহযোগিতায়। তিনি আরও বলেন, প্রথম যখন শুরু করি তখন গ্রামের কিছু মানুষ নেতিবাচক আচরণ শুরু করেছিল। আনন্দের বিষয় হলো যারা বাধা দিয়েছিল এখন তাদের সন্তানও এখানে পড়তে আসে।

গ্রামের সাবেক ইউনিয়ন সদস্য মোস্তফা কামাল বলেন, ইলিয়াসের শিক্ষা কার্যক্রমের কারণে এলাকার শিশুরা উপকৃত হচ্ছে। আমরাও তার পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করি। বর্তমান ইউনিয়ন সদস্য আক্তার হোসেন বলেন, উদ্যোক্তা ইলিয়াস আমার প্রতিবেশী। তার উদ্যোগের কারণে শিশুরা ঝরে পড়া থেকে রক্ষা পাচ্ছে।

বিষয়:

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

সম্পর্কিত