লাকসামের শহীদ বুদ্ধিজীবী চিকিৎসক এ কে এম গোলাম মোস্তফা
গাজীউল হক সোহাগ

ঘরে এক ফোঁটা পানিও নেই। তার ওপর পাশের বাড়ির এক রেলওয়ে কর্মকর্তা অসুস্থ। তাঁকেও দেখার ডাক পড়ে শহীদ চিকিৎসক এ কে এম গোলাম মোস্তফার। পানির পাত্র নিয়ে বাড়ি থেকে বের হন তিনি। সঙ্গে তাঁর ভায়রা নাট্যজন কাজী আলী ইমাম। খানিকটা এগোতেই তাঁরা পড়লেন পাকিস্তানি হানাদার সেনাদের সামনে। নির্বিচার তাঁদের ওপর গুলি চালিয়ে দেয় নরঘাতকের দল। সড়কের ওপরে লুটিয়ে পড়ে তাঁদের মরদেহ।
চট্টগ্রামের লালখান বাজার এলাকার হাইলেভেল সড়কে থাকতেন শহীদ চিকিৎসক গোলাম মোস্তফা। পাশের বাসাতেই থাকতেন তাঁর ভায়রা নাট্যকর্মী কাজী আলী ইমাম। একাত্তরের ২৯ মার্চ পাকিস্তানি সেনারা চট্টগ্রাম পুলিশ লাইনস দখল করে নেয়। আশপাশের বাসিন্দারা পুলিশ সদস্যদের সহযোগিতা করায় হানাদাররা লালখানে পানির সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। এ কারণে ৩০ মার্চ সকালে চিকিৎসক গোলাম মোস্তফা ও তাঁর ভায়রা স্টেট ব্যাংকের কর্মকর্তা কাজী আলী ইমাম, ভাতিজা খোকন এবং তাঁদের বাসার গৃহকর্মী রাজুকে নিয়ে পানি আনার জন্য বাড়ি থেকে বের হন।
শহীদ গোলাম মোস্তফার একমাত্র মেয়ে রোখসানা দিল আফরোজও চিকিৎসক। তিনি ঢাকা মেডিকেল মেডিকেল কলেজের ফার্মাকোলজির অধ্যাপক ( বর্তমানে ওএসডি। গত বছরের ৫ আগস্টের পর তাঁকে ওএসডি করা হয়। তাঁর চাকরিও আর বেশিদিন নেই)। রোখসানা দিল আফরোজ বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর বয়স ছিল সাড়ে তিন বছর। সে কারণে বাবার স্মৃতি তেমন মনে নেই। মা রোশেনা বেগম ছিলেন পূবালী ব্যাংকের কর্মকর্তা। ২০০৯ সালে তিনি ইন্তেকাল করেন। বাবা ও খালুর শহীদ হওয়ার ঘটনা মা এবং অন্য আত্মীয়দের কাছ থেকে শুনেছেন।
সেই সময়ের ৩০ মার্চ সকালে হাইলেভেল রোডের মোড়ে ওয়াসা পানি দিচ্ছে জানতে পেরে তাঁর বাবা গোলাম মোস্তফা ও খালু কাজী আলী ইমাম, তাঁর ভাতিজা খোকন ও বাড়ির গৃহকর্মী রাজুকে নিয়ে পানি আনতে বের হন। এরই মধ্যে আবার খবর আসে, প্রতিবেশী পূর্বাঞ্চল রেলওয়ে কর্মকর্তা আর এন বাগচী অসুস্থ। গোলাম মোস্তফা ভেবেছিলেন, পানি আনার সময় রোগীকেও দেখতে যাবেন। সড়ক ধরে এগোতেই ধোপা পুকুরপাড় দিয়ে নেমে আসে একদল পাকিস্তানি সেনা। খোকন আর রাজু দৌড়ে পালিয়ে আসে। কিন্তু গোলাম মোস্তফা ও আলী ইমাম তাদের সামনে পড়েন। ঘাতকেরা প্রথমে আলী ইমামকে এবং পরে গোলাম মোস্তফাকে গুলি করে। দুই ভায়রা পাশাপাশি বাড়িতে থাকতেন। শহীদও হন একসঙ্গে। পাকিস্তানি সেনাদের ভয়ে কেউ সড়ক থেকে তাঁদের মরদেহ আনতে সাহস পাচ্ছিলেন না। অবশেষে আলী ইমামের বৃদ্ধ মা সালমা খাতুন বাড়ির অন্য বয়স্ক নারীদের নিয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে লাশ নিয়ে আসেন। রাতের আঁধারে বাড়ির বাগানে তাঁদের দাফন করা হয়।
এ কে এম গোলাম মোস্তফার পুরো নাম আবুল খায়ের মোহাম্মদ গোলাম মোস্তফা। ১৯৩৬ সালের ৫ এপ্রিল কুমিল্লার লাকসামে তাঁর জন্ম। বাবা মৌলভি আজিজুর রহমান ও মা সুফিয়া খাতুন। পাঁচ ভাই ও চার বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন বড়। ১৯৫৪ সালে লালমাই উপজেলার হরিশ্চর ইউনিয়ন উচ্চবিদ্যালয় থেকে তিনি মাধ্যমিক পাস করেন। এরপর ১৯৫৮ সালে চট্টগ্রাম মেডিকেল স্কুল থেকে এলএমএফ করেন। তিনি সাবুঅ্যাসিস্ট্যান্ট সার্জন হিসেবে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও পরে স্বাস্থ্য বিভাগের সাবডিভিশনাল মেডিকেল কর্মকর্তা হিসেবে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও চট্টগ্রামে কাজ করেন। ১৯৬৫ সালে রোশেনা বেগমের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। পরে তিনি স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজে এমবিবিএস কোর্সে ভর্তি হন। ১৯৭১ সালে ইন্টার্ন করছিলেন। পাকিস্তানি হানাদাররা গণহত্যা শুরু করলে তিনি চট্টগ্রামে তাঁর বাসায় চলে আসেন। বাংলা একাডেমির শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মারকগ্রন্থে শহীদ চিকিৎসকদের তালিকায় তাঁর নাম রয়েছে। এ ছাড়া সাড়ে চার বছর আগে করা মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের শহীদ বুদ্ধিজীবীদের প্রজ্ঞাপনেও তাঁর নাম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
রোখসানা দিল আফরোজ বলেন, ‘বাবা দেশের জন্য প্রাণ দিয়েছেন। আমি বাবার আদর্শকে ধারণ করে এগিয়ে যাচ্ছি। এ পর্যন্ত কয়েকজন বীরাঙ্গনাকে সম্মাননা দিয়েছি। মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য কাজ করছি। ছবিতে বাবা মায়ের কোলে আমি। সাদা কালো ছবিতে। বাবাকে নিয়ে আমার কোন স্মৃতি মনে পড়ছে না। আমি তখন এত্তো ছোট।’
রোখসানা দিল আফরোজ জানান, শহীদ বুদ্ধিজীবী হিসেবে গোলাম মোস্তফার নাম চিকিৎসকদের সংগঠন বিএমএ কেন্দ্রীয় কার্যালয়, ঢাকা, সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে স্মৃতিফলকে আছে।
চিকিৎসক রোখসানা দিল আফরোজ গতকাল শনিবার দুপুরে মুঠোফোনে বলেন, আমার বাবা যুদ্ধে শহীদ হওয়ার পর নগদ দুই হাজার টাকা ও একটি সেলাই মেশিন নিয়ে আমাদের বাসায় আসেন সরকারি কর্মকর্তারা। আমার মা ওই টাকা ফিরিয়ে দেন। আমার খালা মনি ইমামও সেটি ফিরিয়ে দেন। খালা ছিলেন বাংলাদেশ মহিলা সমিতি উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক।
তিনি আরও বলেন, একাত্তরের শহীদ আর চব্বিশের শহীদ এক না। দুইটির প্রেক্ষাপট ভিন্ন। গত বছরের ৫ আগস্টের পর আমাকে ওএসডি করা হয়। আমি এখন ওএসডিতেই আছি।
রোখসানা দিল আফরোজ ডক্টরস ফর হেলথ এন্ড এনভায়রনমেন্ট সংগঠনের সাংগঠনিক সম্পাদক। এটি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিকাশ ও সাম্প্রদায়িক প্রতিরোধ সাব কমিটি। এই সংগঠন গত ১২ ডিসেম্বর ধানমন্ডির ২৭ নম্বর সড়কের উইমেন্স ভলান্টারি এসোসিয়েশন মিলনায়তনে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মরণ ও চিকিৎসক মুত্তিযোদ্ধাদের স্মরণ করে।

ঘরে এক ফোঁটা পানিও নেই। তার ওপর পাশের বাড়ির এক রেলওয়ে কর্মকর্তা অসুস্থ। তাঁকেও দেখার ডাক পড়ে শহীদ চিকিৎসক এ কে এম গোলাম মোস্তফার। পানির পাত্র নিয়ে বাড়ি থেকে বের হন তিনি। সঙ্গে তাঁর ভায়রা নাট্যজন কাজী আলী ইমাম। খানিকটা এগোতেই তাঁরা পড়লেন পাকিস্তানি হানাদার সেনাদের সামনে। নির্বিচার তাঁদের ওপর গুলি চালিয়ে দেয় নরঘাতকের দল। সড়কের ওপরে লুটিয়ে পড়ে তাঁদের মরদেহ।
চট্টগ্রামের লালখান বাজার এলাকার হাইলেভেল সড়কে থাকতেন শহীদ চিকিৎসক গোলাম মোস্তফা। পাশের বাসাতেই থাকতেন তাঁর ভায়রা নাট্যকর্মী কাজী আলী ইমাম। একাত্তরের ২৯ মার্চ পাকিস্তানি সেনারা চট্টগ্রাম পুলিশ লাইনস দখল করে নেয়। আশপাশের বাসিন্দারা পুলিশ সদস্যদের সহযোগিতা করায় হানাদাররা লালখানে পানির সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। এ কারণে ৩০ মার্চ সকালে চিকিৎসক গোলাম মোস্তফা ও তাঁর ভায়রা স্টেট ব্যাংকের কর্মকর্তা কাজী আলী ইমাম, ভাতিজা খোকন এবং তাঁদের বাসার গৃহকর্মী রাজুকে নিয়ে পানি আনার জন্য বাড়ি থেকে বের হন।
শহীদ গোলাম মোস্তফার একমাত্র মেয়ে রোখসানা দিল আফরোজও চিকিৎসক। তিনি ঢাকা মেডিকেল মেডিকেল কলেজের ফার্মাকোলজির অধ্যাপক ( বর্তমানে ওএসডি। গত বছরের ৫ আগস্টের পর তাঁকে ওএসডি করা হয়। তাঁর চাকরিও আর বেশিদিন নেই)। রোখসানা দিল আফরোজ বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর বয়স ছিল সাড়ে তিন বছর। সে কারণে বাবার স্মৃতি তেমন মনে নেই। মা রোশেনা বেগম ছিলেন পূবালী ব্যাংকের কর্মকর্তা। ২০০৯ সালে তিনি ইন্তেকাল করেন। বাবা ও খালুর শহীদ হওয়ার ঘটনা মা এবং অন্য আত্মীয়দের কাছ থেকে শুনেছেন।
সেই সময়ের ৩০ মার্চ সকালে হাইলেভেল রোডের মোড়ে ওয়াসা পানি দিচ্ছে জানতে পেরে তাঁর বাবা গোলাম মোস্তফা ও খালু কাজী আলী ইমাম, তাঁর ভাতিজা খোকন ও বাড়ির গৃহকর্মী রাজুকে নিয়ে পানি আনতে বের হন। এরই মধ্যে আবার খবর আসে, প্রতিবেশী পূর্বাঞ্চল রেলওয়ে কর্মকর্তা আর এন বাগচী অসুস্থ। গোলাম মোস্তফা ভেবেছিলেন, পানি আনার সময় রোগীকেও দেখতে যাবেন। সড়ক ধরে এগোতেই ধোপা পুকুরপাড় দিয়ে নেমে আসে একদল পাকিস্তানি সেনা। খোকন আর রাজু দৌড়ে পালিয়ে আসে। কিন্তু গোলাম মোস্তফা ও আলী ইমাম তাদের সামনে পড়েন। ঘাতকেরা প্রথমে আলী ইমামকে এবং পরে গোলাম মোস্তফাকে গুলি করে। দুই ভায়রা পাশাপাশি বাড়িতে থাকতেন। শহীদও হন একসঙ্গে। পাকিস্তানি সেনাদের ভয়ে কেউ সড়ক থেকে তাঁদের মরদেহ আনতে সাহস পাচ্ছিলেন না। অবশেষে আলী ইমামের বৃদ্ধ মা সালমা খাতুন বাড়ির অন্য বয়স্ক নারীদের নিয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে লাশ নিয়ে আসেন। রাতের আঁধারে বাড়ির বাগানে তাঁদের দাফন করা হয়।
এ কে এম গোলাম মোস্তফার পুরো নাম আবুল খায়ের মোহাম্মদ গোলাম মোস্তফা। ১৯৩৬ সালের ৫ এপ্রিল কুমিল্লার লাকসামে তাঁর জন্ম। বাবা মৌলভি আজিজুর রহমান ও মা সুফিয়া খাতুন। পাঁচ ভাই ও চার বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন বড়। ১৯৫৪ সালে লালমাই উপজেলার হরিশ্চর ইউনিয়ন উচ্চবিদ্যালয় থেকে তিনি মাধ্যমিক পাস করেন। এরপর ১৯৫৮ সালে চট্টগ্রাম মেডিকেল স্কুল থেকে এলএমএফ করেন। তিনি সাবুঅ্যাসিস্ট্যান্ট সার্জন হিসেবে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও পরে স্বাস্থ্য বিভাগের সাবডিভিশনাল মেডিকেল কর্মকর্তা হিসেবে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও চট্টগ্রামে কাজ করেন। ১৯৬৫ সালে রোশেনা বেগমের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। পরে তিনি স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজে এমবিবিএস কোর্সে ভর্তি হন। ১৯৭১ সালে ইন্টার্ন করছিলেন। পাকিস্তানি হানাদাররা গণহত্যা শুরু করলে তিনি চট্টগ্রামে তাঁর বাসায় চলে আসেন। বাংলা একাডেমির শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মারকগ্রন্থে শহীদ চিকিৎসকদের তালিকায় তাঁর নাম রয়েছে। এ ছাড়া সাড়ে চার বছর আগে করা মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের শহীদ বুদ্ধিজীবীদের প্রজ্ঞাপনেও তাঁর নাম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
রোখসানা দিল আফরোজ বলেন, ‘বাবা দেশের জন্য প্রাণ দিয়েছেন। আমি বাবার আদর্শকে ধারণ করে এগিয়ে যাচ্ছি। এ পর্যন্ত কয়েকজন বীরাঙ্গনাকে সম্মাননা দিয়েছি। মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য কাজ করছি। ছবিতে বাবা মায়ের কোলে আমি। সাদা কালো ছবিতে। বাবাকে নিয়ে আমার কোন স্মৃতি মনে পড়ছে না। আমি তখন এত্তো ছোট।’
রোখসানা দিল আফরোজ জানান, শহীদ বুদ্ধিজীবী হিসেবে গোলাম মোস্তফার নাম চিকিৎসকদের সংগঠন বিএমএ কেন্দ্রীয় কার্যালয়, ঢাকা, সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে স্মৃতিফলকে আছে।
চিকিৎসক রোখসানা দিল আফরোজ গতকাল শনিবার দুপুরে মুঠোফোনে বলেন, আমার বাবা যুদ্ধে শহীদ হওয়ার পর নগদ দুই হাজার টাকা ও একটি সেলাই মেশিন নিয়ে আমাদের বাসায় আসেন সরকারি কর্মকর্তারা। আমার মা ওই টাকা ফিরিয়ে দেন। আমার খালা মনি ইমামও সেটি ফিরিয়ে দেন। খালা ছিলেন বাংলাদেশ মহিলা সমিতি উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক।
তিনি আরও বলেন, একাত্তরের শহীদ আর চব্বিশের শহীদ এক না। দুইটির প্রেক্ষাপট ভিন্ন। গত বছরের ৫ আগস্টের পর আমাকে ওএসডি করা হয়। আমি এখন ওএসডিতেই আছি।
রোখসানা দিল আফরোজ ডক্টরস ফর হেলথ এন্ড এনভায়রনমেন্ট সংগঠনের সাংগঠনিক সম্পাদক। এটি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিকাশ ও সাম্প্রদায়িক প্রতিরোধ সাব কমিটি। এই সংগঠন গত ১২ ডিসেম্বর ধানমন্ডির ২৭ নম্বর সড়কের উইমেন্স ভলান্টারি এসোসিয়েশন মিলনায়তনে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মরণ ও চিকিৎসক মুত্তিযোদ্ধাদের স্মরণ করে।