অপ্রতিমকে মাথা থেকে সরাতেই পারছি না

সুপ্রীতি ধর
আপডেট : ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২: ৩৫
Thumbnail image

লেখাটা একটু বড়। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি। এই কথাগুলো আগে কখনও এভাবে বলা হয়নি। যদি কারও কাজে লাগে, যদি কেউ একটুও সচেতন হয়, তাহলেই ভালো লাগবে।

মনটা আর সবার মতোই ভীষণ বিক্ষিপ্ত হয়ে আছে। সুন্দর কচিমুখের অপ্রতিমকে মাথা থেকে সরাতেই পারছি না। আর অপ্রতিমের বাবা-মায়ের কান্না! সে তো হাজারও সন্তানের মা-বাবার কান্নারই মতো।

অপ্রতিমকে ফেরত পাওয়া গেল না। শেষ হয়ে গেল ওর জীবন। ফুলটা ফোটার আগেই ঝরে গেল। অথচ বেঁচে থাকলে ও কত কিছুই না হতে পারত! কিছু না হলেও মা-বাবার বুকে তো থাকত!

অপ্রতিম মানে অনুপম, কী সুন্দর নাম! আমরা মা-বাবারা কত ভেবেচিন্তে সন্তানের নাম রাখি। ভাবি, নামের মতোই হবে সন্তান। কিন্তু আমাদের পরিপার্শ্ব, আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা আমাদের সেই স্বপ্ন একের পর এক ধুলিসাৎ করে দিচ্ছে।

সবাই ক্ষমতা চায়। একের পর এক রাজা আসে, কিন্তু আমাদের সাধারণ মানুষের জীবনের কোনো পরিবর্তন আসে না। যেন সন্তান লালন-পালন এককভাবে মা-বাবারই দায়িত্ব, আর কারও নয়।

আগেকার দিনে সমাজ এত আধুনিক ছিল না। ঘর থেকে বের হলেই কমপক্ষে শখানেক চোখ আমাদের ওপর নজর রাখত। সেটা যে খুব আরামদায়ক ছিল, তা নয়। কিন্তু অনেক সময় সেই সামাজিক নজরদারিই আমাদের বিপদ থেকে বাঁচিয়ে দিত।

আর এখন?

মা-বাবা ব্যস্ত। পরিবার ভাঙছে। প্রতিবেশীর সঙ্গে প্রতিবেশীর যোগাযোগ কমছে। সন্তানের জগৎ অনেকটাই চলে গেছে পরিবারের চোখের আড়ালে। সব মিলিয়ে একটি সন্তানের বড় হয়ে ওঠার পথ আরও জটিল হয়ে উঠেছে।

আমি আমার নিজের অভিজ্ঞতা বলি।

আমি সিঙ্গেল মা, সবাই জানে। দুই বাচ্চাকে ছোটবেলা থেকে একা হাতে বড় করতে সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে যে অদম্য পরিশ্রম আমাকে করতে হয়েছে, জীবনের এই ধাপে এসে যখন সেসব ভাবি, আমার নিজেরই মনে হয়, কী করে সম্ভব হলো?

তারপরও দিনশেষে নিজেকে একজন ‘ব্যর্থ মা’ বলেই মনে হয়।

আমার মেয়ে বড়। ওকে নিয়ে আমার কখনও তেমন টেনশন করতে হয়নি। ছোটবেলা থেকেই বইয়ের মধ্যে মুখ বুঁজে থাকত। যত রকম অলিম্পিয়াড, ইন্টারন্যাশনাল এক্সাম, সব করেছে। সময়মতো নিজের খাবারটাও খেয়ে নিয়েছে। কিন্তু যেটা দেখতে পেতাম না তাহলো ওর মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি হচ্ছে কিনা!

আর কতোটুকুই বা সম্ভব একজন একা মায়ের পক্ষে! আমার পেশা ছিল সাংবাদিকতা। আমার কাজের সময়টা মোটেও পারিবারিক জীবনের জন্য উপযুক্ত ছিল না। আমিও আমার পেশায় শতভাগ দেওয়ার চেষ্টা করেছি। এক চাকরির বেতনে সংসার চলত না বলে একই সঙ্গে দুইটা-তিনটা কাজ করেছি। ফলে আমার কোনো ডে-অফ বলতে ছিল না।

এখানে আরেকটা কথা স্বীকার করি। আমি নিজেও একাকী জীবনে বিপর্যস্ত ছিলাম বলে কাজের মধ্যে ডুবে থাকতে ভালোবাসতাম। এটাই আমার ভুল ছিল। সন্তানের পাশে আরও বেশি থাকা উচিত ছিল। একা মা হয়েছি তো কী হয়েছে, সন্তান জন্ম দিয়েছি, দায় তো আমারও।

আমার ছেলেটা একটা সময় পর্যন্ত ভীষণ মেধাবী ছিল। অনেক কিছু করতে পারত। ভালো আঁকত, গান গাইত, ছোটবেলা থেকেই হাতের নানা জিনিস বানাত। খুবই ক্রিয়েটিভ ছিল সে।

কিন্তু টিনএজে গিয়েই সব পাল্টে যেতে শুরু করল। স্কুলের কিছু বড় বয়সী ছেলের সঙ্গে মিশে গেল। আমার ব্যস্ততার কারণে আমিও ঠিক সময়ে ওর পরিবর্তনগুলো ধরতে পারিনি।

ফুটবল তাকে খুব টানত। ভালো খেলত বলে বিভিন্ন স্কুলের হয়েও খেলেছে। কিন্তু ভালো কোনো ক্লাবে ওকে দিতে পারিনিÑআমার অপারগতা এখানেও। কখনও আবাহনী বা ধানমন্ডি মাঠে, কখনও কারও বাড়ির ছাদে, কখনও স্ট্রিট ফুটবল খেলত। আমি শুধু ওকে দামি দামি বুট কিনে দিতাম। এটুকু দিয়েই আমি ভাবতাম, বেশ ভাল দায়িত্ব পালন করা হয়ে গেছে!

ধানমন্ডি মাঠ থেকে ওদের উচ্ছেদ করা হলো 'টোকাই' বলে। খেলা বন্ধপ্রায়। এর মধ্যে নিজেকে আটকে ফেলল অন্তর্জালে। দিনরাত গেম খেলত। আমার তো দেখার সময়ই ছিল না কম্পিউটারে কী করছে!

তার হাতে ফোন দিতে বাধ্য হয়েছিলাম মূলত তাকে ট্র্যাক করার জন্য। প্রথম দিকে সেগুলো ছিল বাটন ফোন। কিন্তু ২০১০ সালে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমি প্রথম ওর জন্য একটা দামি ফোন নিয়ে আসি।

সেটাই একসময় কাল হয়ে উঠল।

এক সন্ধ্যায় কে বা কারা তার রিকশা থামিয়ে ফোনটা নিয়ে যায়। বাসায় এসে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল। জিজ্ঞেস করায় বলল কী হয়েছে। আমি সঙ্গে সঙ্গেই তাকে মোহাম্মদপুর থানায় নিয়ে গেলাম। জিডি করলাম।

এমন সময় আমার ফোনে তার এক বন্ধুর কল এলো।

‘আন্টি, ফোনটা পাওয়া গেছে।’ তার মানে ওর 'বন্ধুরাই' নিয়েছিল যা ও গোপন করেছিল।

সঙ্গে সঙ্গেই আমার ছেলে গিয়ে ফোনটা নিয়ে এলো। কে নিয়েছিল, কেন নিয়েছিল, সেই উত্তর আমি কখনও পাইনি।

এরপর আরেকদিন সন্ধ্যায় অন্য একটি জায়গায় আবার তার ফোন নিয়ে গেল কেউ। এবার জিডি করেও লাভ হলো না। ফোন আর উদ্ধার হয়নি।

একদিন প্রচÐ বুকে ব্যথা নিয়ে বাসায় ফিরল সে। খেয়াল করবেন, ওর বয়স তখনও মাত্র ১৪। এর মধ্যেই এত কিছু ঘটছে।

কী হয়েছে জিজ্ঞেস করায় বলল, 'কেউ একজন' তার রিকশায় জোর করে উঠে তাকে কিলঘুষি মেরেছে। কেন মেরেছে, এর পিছনে কী কারণ, কিছুই বললো না। এরপর নূরজাহান রোড ধরে যেতেই ভয় পেত সে।

২০১৪ সালের কথা। এক রাতে বিবিসি থেকে কাজ সেরে বাসায় ফিরে দেখি আমার দুইটা ল্যাপটপের একটাও নেই। সঙ্গে ওর ফোনটাও নেই।

ভাবতে পারেন আমার অবস্থাটা?

পাগলপ্রায় আমি। চিৎকার করছি। আর সে নিরুত্তর। অবলীলায় সে সন্দেহটা চাপিয়ে দিল বাসার সহকারীর ওপর, যিনি ছুটা কাজ করতেন।

আমি আদাবর থানায় গেলাম। ঘটনা শুনে পুলিশই বলল, ‘কাজের মানুষ ল্যাপটপ নিয়ে কী করবে? ছেলেকে ভালোভাবে জিজ্ঞাসা করেন। উত্তর সেখানেই আছে।’

বাসায় পুলিশ এলো। ছেলেকে একটু ভয় পেয়েছে বলে মনে হলো। তখন সে বলল, তার দুই বন্ধু বাসায় এসেছিল। কিন্তু তারা নিয়েছে কি না, সে জানে না। পুলিশ তাদের ডাকতে বললে সে রাজি হলো না। আমি রেগে বললাম, তাহলে তোমাকেই পুলিশ নিয়ে যাবে। তাতেও বন্ধুদের নাম বলতে নারাজ।

আজ এতগুলো বছর পার হয়ে গেছে। সেই রহস্য আমি আর ভেদ করতে পারিনি। জানাই হলো না, কী কারণে সে বন্ধুদের হাতে মায়ের কাজের জিনিসগুলো তুলে দিয়েছিল, যে কাজের বিনিময়ে সংসার চলে, সেই মূল্যবান জিনিস কী করে হারাতে দিল? ড্রাগের দাম পরিশোধ করতে? নাকি নতুন করে ড্রাগ কিনতে? আমি জানি না।

আরেকবার সে কম্পিউটার বন্ধ না করেই বাইরে চলে গিয়েছিল। চোখে পড়ল অনলাইনে বন্ধুদের সঙ্গে তার আলাপচারিতার একটা অংশ। ওরা মিলে ধানমন্ডির কোনো একটি গোপন বারে যাওয়ার পরিকল্পনা করছে। কিন্তু সবার কাছে প্রয়োজনীয় টাকা নেই।

আমার ছেলে লিখেছে, তার কাছে পাঁচ হাজার টাকা আছে। সেই টাকা সে নিয়ে যাবে। এবং গেছেও সে।

আমি বজ্রাহত হলাম।

কারণ এই টাকাটা ছিল তার কোচিংয়ের শিক্ষককে দেওয়ার জন্য। পরদিন শিক্ষকের সঙ্গে দেখা করলাম। তিনি জানালেন, গত চার মাস ধরে তিনি কোনো টাকা পাননি। অথচ আমি প্রতি মাসেই ছেলের হাতে টাকা দিয়েছি।

হয়তো বলবেন, আমি নিজে কেন শিক্ষকের হাতে টাকা দিইনি? সেটাও আমার ভুল ছিল। আমার অফিসের সময়ের সঙ্গে কোচিংয়ের সময় মিলত না বলেই এই ঝুঁকিটা নিতে হয়েছিল।

আজকাল কিশোর গ্যাং নিয়ে অনেক কথা হচ্ছে। কিশোরদের দলবদ্ধ অপরাধ নতুন কোনো ঘটনা নয়। আমাদের সময়েও পাড়ায় পাড়ায় বখে যাওয়া কিশোর-তরুণদের দল ছিল। কিন্তু এখন যে বিষয়টি আরও ভয়ংকর হয়ে উঠেছে, তা হলো, এই গ্যাংগুলোর সঙ্গে স্থানীয় প্রভাবশালী ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকদের যোগসূত্র। রাজনৈতিক পরিচয় বা ক্ষমতাবান ‘বড় ভাইয়ের’ আশ্রয় যখন অপরাধের সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন একটি কিশোর শুধু বখে যাওয়া কিশোর থাকে না। তার মধ্যে তৈরি হতে পারে একধরনের দায়মুক্তির বোধ যে আমাকে কেউ কিছু করতে পারবে না।

কিন্তু আমরা কি শুধু সেই কিশোরদেরই দোষ দেব?

তাদের পেছনে যারা দাঁড়িয়ে থাকে, নিজেদের ক্ষমতা আর স্বার্থের জন্য অল্পবয়সী ছেলেদের যারা ব্যবহার করে, তাদের দায় কোথায়? পরিবার, স্কুল, সমাজ আর রাষ্ট্র, সবাই যদি একে অন্যের দিকে আঙুল তোলে, তাহলে একজন মা বা বাবা একা কতদূর তার সন্তানকে আগলে রাখতে পারে?

আমি আমার ছেলেকে আগলে রাখতে পারিনি, এই অপরাধবোধ আমার আছে, থাকবে। আমার অনেক ভুল ছিল। ব্যস্ততা ছিল। অসহায়ত্ব ছিল। অনেক সংকেত আমি সময়ে বুঝতে পারিনি।

কিন্তু আজ এত বছর পরে আরেকটা কথাও বুঝি, একজন সন্তানের বিপথে যাওয়া কেবল একজন মা কিংবা একটি পরিবারের ব্যর্থতার গল্প নয়। এটা পুরো সিস্টেমের ব্যর্থতা। কাউকে এককভাবে দোষারোপ করে লাভ নেই।

একটি সন্তান তো কেবল একজন মায়ের সন্তান নয়। সে একটি পরিবারের সন্তান, একটি সমাজের সন্তান, একটি রাষ্ট্রেরও নাগরিক। পরিবার যখন মুখ ফিরিয়ে নেয়, মা তো আর সন্তানকে ফেলে দিতে পারে না! অনেক মানুষ পাশে না থাকলেও কেউ না কেউ সজ্জন মানুষ থাকেন, যাঁরা হাত বাড়িয়ে দেন। একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্রে সরকারি ও সামাজিক ব্যবস্থাও থাকার কথা, যাতে সন্তানকে নিয়ে মা-বাবাকে একেবারে অক‚ল পাথারে পড়তে না হয়।

কিন্তু আমাদের দেশে যেভাবে মানুষ বাঁচে, তাতে ধর্মাশ্রয়ী মানুষের মতোই কখনও কখনও বলতে ইচ্ছে করে, ‘আল্লায় বাঁচাইয়া রাখছে।’

আর আমরা যারা অবিশ্বাসী, তাদের কে বাঁচিয়ে রাখে, আর কে মারেÑতা কে বলবে?

আমার ছেলেটা প্রাণে বেঁচে গেছে ঠিকই। কিন্তু একে কতটুকু বাঁচা বলে, আমার জানা নেই। ও যদি এখনও বুঝতো ভুলগুলো কোথায় ছিল, তাহলে হয়তো আরেকটু ভালভাবে বাঁচতে পারতো!

অপ্রতিম আর ফিরবে না। তার মা-বাবার জন্য কোনো কথাই যথেষ্ট নয়। কিন্তু অপ্রতিমের মতো আরও যে ছেলেমেয়েরা এখনো আমাদের চারপাশে বড় হচ্ছে, তাদের জন্য অন্তত আমরা কি কিছু শিখব?

একটা শিশুকে নিরাপদে বড় করার সমস্ত দায় কি শুধু তার মা-বাবার? স্কুলের কোনো দায় নেই? পরিবারের অন্য সদস্যদের নেই? প্রতিবেশীর নেই? সমাজের নেই? রাষ্ট্রের নেই?

আর যারা কিশোরদের অপরাধের পথে ব্যবহার করে, তাদের হাতে ক্ষমতা, মাদক, অস্ত্র কিংবা রাজনৈতিক আশ্রয় তুলে দেয়, তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর দায়িত্ব কার?

অপ্রতিমের মতো বাচ্চাদের জন্য একটা নিরাপদ দেশ গড়ে তোলার কি সত্যিই কেউ নেই?

কারও মনেই কি এমন কোনো স্বপ্ন নেই?

সুপ্রীতি ধর: সিনিয়র সাংবাদিক, বর্তমানে প্রবাসী

বিষয়:

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

সম্পর্কিত