• কুমিল্লা সিটি করপোরেশন
  • কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়
  • আদর্শ সদর
  • বরুড়া
  • লাকসাম
  • দাউদকান্দি
  • আরও
    • চৌদ্দগ্রাম
    • সদর দক্ষিণ
    • নাঙ্গলকোট
    • বুড়িচং
    • ব্রাহ্মণপাড়া
    • মনোহরগঞ্জ
    • লালমাই
    • চান্দিনা
    • মুরাদনগর
    • দেবীদ্বার
    • হোমনা
    • মেঘনা
    • তিতাস
  • সর্বশেষ
  • রাজনীতি
  • বাংলাদেশ
  • অপরাধ
  • বিশ্ব
  • বাণিজ্য
  • মতামত
  • খেলা
  • বিনোদন
  • চাকরি
  • জীবনযাপন
  • ইপেপার
  • ইপেপার
facebooktwittertiktokpinterestyoutubelinkedininstagramgoogle
স্বত্ব: ©️ আমার শহর

সম্পাদক ও প্রকাশক : মো. গাজীউল হক ভূঁইয়া ( সোহাগ)।

নাহার প্লাজা, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা-৩৫০০

ই-মেইল: [email protected]

ফোন: 01716197760

> মতামত

সবার জন্য সুস্থ হার্ট : হৃদ্স্বাস্থ্য সুরক্ষায় চাই সমন্বিত উদ্যোগ

অধ্যাপক ডা. তৃপ্তীশ চন্দ্র ঘোষ
প্রকাশ : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২: ৫১
logo

সবার জন্য সুস্থ হার্ট : হৃদ্স্বাস্থ্য সুরক্ষায় চাই সমন্বিত উদ্যোগ

অধ্যাপক ডা. তৃপ্তীশ চন্দ্র ঘোষ

প্রকাশ : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২: ৫১
Photo

কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজ বা হৃদরোগ ও রক্তনালির রোগ আজ বিশ্বের অন্যতম বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি। বিশ্বজুড়ে ৫২ কোটি ৩০ লক্ষেরও বেশি মানুষ কোনো না কোনো ধরনের কার্ডিওভাসকুলার রোগে আক্রান্ত। উদ্বেগের বিষয় হলো, হৃদরোগজনিত মৃত্যুর একটি বড় অংশ ঘটে অকালেই—অনেক মানুষ ৭০ বছর বয়সে পৌঁছানোর আগেই হৃদরোগ বা স্ট্রোকের কারণে প্রাণ হারান। অথচ সঠিক উদ্যোগ, সময়মতো চিকিৎসা এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের মাধ্যমে হৃদরোগের একটি বড় অংশ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। প্রশ্ন হলো — যে রোগের এত বড় একটি অংশ প্রতিরোধযোগ্য, সেই রোগে এত মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে কেন? এর অন্যতম কারণ হলো স্বাস্থ্যসেবায় বৈষম্য, প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণে ঘাটতি, বৈজ্ঞানিক জ্ঞান বাস্তবায়নে বিলম্ব, প্রযুক্তির অসম সুযোগ এবং স্বাস্থ্য ও পরিবেশবিষয়ক নীতির মধ্যে সমন্বয়ের অভাব। তাই এখন সময় এসেছে হৃদ্স্বাস্থ্যকে শুধু চিকিৎসকের দায়িত্ব বা ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবে না দেখে - এটিকে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, সরকার ও বেসরকারি খাতের সম্মিলিত দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনা করার।

সবার জন্য সমান হৃদ্স্বাস্থ্যসেবা

হৃদ্স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্ছগুলোর একটি হলো স্বাস্থ্যসেবায় বৈষম্য। একটি দেশের শহর ও গ্রামের মধ্যে, ধনী ও দরিদ্র মানুষের মধ্যে, এমনকি বিভিন্ন সামাজিক ও অর্থনৈতিক গোষ্ঠীর মধ্যেও হৃদরোগ সম্পর্কে সচেতনতা এবং চিকিৎসাসেবা পাওয়ার সুযোগে বড় পার্থক্য রয়েছে। কার্ডিওভাসকুলার রোগজনিত মৃত্যুর ৭৫ শতাংশেরও বেশি ঘটে বিশ্বের নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে । দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠী অনেক সময় প্রয়োজনীয় পরীক্ষা, ওষুধ, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা কিংবা জরুরি চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হয়। অন্যদিকে, পর্যাপ্ত ও পুষ্টিকর খাবারের অভাবও হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি। বিশ্বের আনুমানিক ৩০০ কোটি মানুষ নিরাপদ, পুষ্টিকর ও পর্যাপ্ত খাবারের নিশ্চয়তা থেকে বঞ্চিত। অথচ স্বাস্থ্যকর খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, নির্মল বায়ু এবং নিয়মিত শারীরিক কর্মকাণ্ড হৃদরোগ প্রতিরোধের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। তাই প্রত্যেক মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় হৃদ্স্বাস্থ্য শিক্ষা, রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস পরীক্ষা, প্রয়োজনীয় ওষুধ এবং মানসম্মত চিকিৎসা সহজলভ্য করা জরুরি। হৃদ্স্বাস্থ্য হতে হবে অধিকার - সুযোগের বিষয় নয়।

জ্ঞানকে বাস্তব কর্মে রূপ দিতে হবে

হৃদরোগ প্রতিরোধ ও চিকিৎসা সম্পর্কে গত কয়েক দশকে বিপুল বৈজ্ঞানিক জ্ঞান অর্জিত হয়েছে। কিšদ শুধু গবেষণা বা বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার যথেষ্ট নয়। সেই জ্ঞানকে মানুষের জীবনে বাস্তব পরিবর্তন আনতে হবে। উচ্চ রক্তচাপ এর একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ। বিশ্বে প্রায় ১৩০ কোটি মানুষ উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত, অথচ আক্রান্তদের একপঞ্চমাংশেরও কম মানুষের রক্তচাপ কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। নিয়মিত রক্তচাপ পরিমাপ, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, খাবার হিসাবে লবণ গ্রহণের পরিমান কমানো, শারীরিক পরিশ্রম, ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং প্রয়োজন হলে নিয়মিত ওষুধ গ্রহণের মাধ্যমে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। একইভাবে ডায়াবেটিস ও হৃদরোগের সম্পর্কও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের হৃদরোগ হওয়ার ঝুঁকি সাধারণ মানুষের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। তাই হৃদরোগ প্রতিরোধের কর্মসূচিতে ডায়াবেটিস, স্থূলতা, উচ্চ রক্তচাপ ও কোলেস্টেরল - সবগুলো বিষয়কে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করতে হবে। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোকে এ ক্ষেত্রে আরও শক্তিশালী করতে হবে। প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মী, সহজ চিকিৎসা-প্রোটোকল, নিয়মিত স্ক্রিনিং এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার হৃদরোগ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৩ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের ১২৩টি দেশে প্রাথমিক ও দ্বিতীয় পর্যায়ের হৃদরোগ প্রতিরোধ কার্যক্রমের আওতা মাত্র ২০ শতাংশ বাড়ানো গেলেও প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ জীবন রক্ষা করা সম্ভব হতে পারে। অর্থাৎ, আমাদের হাতে জ্ঞান আছে - এখন প্রয়োজন জ্ঞানকে দ্রুত কর্মে পরিণত করা। প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনকে মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে ডিজিটাল প্রযুক্তি স্বাস্থ্যসেবার ভবিষ্যৎকে দ্রুত পরিবর্তন করছে। টেলিমেডিসিন, স্মার্টফোন, ওয়্যারেবল ডিভাইস, রিমোট মনিটরিং এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা হৃদরোগ শনাক্তকরণ ও প্রতিরোধে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। একজন রোগী নিজের বাড়িতে রক্তচাপ, হৃদস্পন্দন বা অন্যান্য স্বাস্থ্য-তথ্য পর্যবেক্ষণ করতে পারেন। দূরবর্তী এলাকার একজন মানুষ টেলিমেডিসিনের মাধ্যমে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ পেতে পারেন। ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিপুল পরিমাণ স্বাস্থ্য-তথ্য বিশ্লেষণ করে রোগের ঝুঁকি ও চিকিৎসার সম্ভাব্য ধারা শনাক্ত করতেও সাহায্য করতে পারে। তবে প্রযুক্তি যেন নতুন বৈষম্য সৃষ্টি না করে, সেদিকেও নজর দিতে হবে। প্রযুক্তি ও ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা হতে হবে সহজলভ্য, সাশ্রয়ী, নিরাপদ এবং সবার জন্য ব্যবহারযোগ্য। একই সঙ্গে রোগীর ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যতথ্যের গোপনীয়তা নিশ্চিত করতে হবে।

হৃদ্স্বাস্থ্য ও পরিবেশ—একই সুতোয় বাঁধা

হৃদ্স্বাস্থ্য শুধু হাসপাতাল বা চিকিৎসাকেন্দ্রের বিষয় নয়। আমরা যে পরিবেশে বসবাস করি, সেটিও আমাদের হৃদ্স্বাস্থ্যের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। তামাক ব্যবহার ও পরোক্ষ ধূমপানের কারণে প্রতি বছর প্রায় ৩০ লাখ মানুষ হৃদরোগে মারা যায়। একইভাবে বায়ুদূষণও হৃদরোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি। বিশ্বের অধিকাংশ মানুষ এমন এলাকায় বসবাস করেন যেখানে বায়ুর মান সুপারিশকৃত নিরাপদ মাত্রার চেয়ে খারাপ। তাই হৃদরোগ প্রতিরোধ করতে হলে তামাক নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি বায়ুদূষণ কমানো, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ব্যবহার, গণপরিবহন উন্নত করা, নিরাপদ হাঁটার পথ ও খেলার মাঠ তৈরি এবং স্বাস্থ্যকর নগর পরিকল্পনা নিশ্চিত করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশ এবং হৃদ্স্বাস্থ্যের বিষয়গুলোকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। একটি সুস্থ হৃদয়ের জন্য প্রয়োজন একটি সুস্থ পরিবেশ।

শারীরিক পরিশ্রম হোক প্রতিদিনের অভ্যাস

আধুনিক জীবনযাত্রায় শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা হৃদরোগের অন্যতম বড় ঝুঁকি। নিয়মিত শারীরিক কর্মকাণ্ড হৃদ্রোগ, ডায়াবেটিস, স্থূলতা ও অন্যান্য অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য সপ্তাহে প্রায় ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার শারীরিক কর্মকাণ্ড হৃদরোগের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারে। হাঁটা, সাইকেল চালানো, সাঁতার, খেলাধুলা কিংবা নিয়মিত ব্যায়াম—যেকোনো উপযুক্ত শারীরিক কর্মকাণ্ডই উপকারী। এজন্য এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে যেখানে মানুষ নিরাপদে হাঁটতে, ব্যায়াম করতে ও খেলাধুলা করতে পারে।

হৃদ্স্বাস্থ্য সবার দায়িত্ব

হৃদ্স্বাস্থ্য রক্ষার দায়িত্ব শুধু চিকিৎসকের নয়।

সরকারের দায়িত্ব -

প্রতিরোধ, স্ক্রিনিং, জরুরি চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও প্রয়োজনীয় ওষুধের সুযোগ বাড়ানো এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের উপযোগী নীতি গ্রহণ করা।

স্বাস্থ্য পেশাজীবীদের দায়িত্ব -

রোগ শনাক্ত ও চিকিৎসার পাশাপাশি প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা এবং রোগী ও জনগণের স্বাস্থ্যশিক্ষায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করা।

সুশীল সমাজের দায়িত্ব -

স্বাস্থ্যকর খাদ্য, তামাক নিয়ন্ত্রণ, পরিষ্কার বায়ু, শারীরিক কর্মকাণ্ড এবং সবার জন্য মানসম্মত চিকিৎসার দাবিতে জনসচেতনতা তৈরি করা।

বেসরকারি খাতের দায়িত্ব -

মানুষের স্বাস্থ্যকে ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা এবং স্বাস্থ্যকর পণ্য ও পরিবেশ তৈরিতে ভূমিকা রাখা। আর প্রতিটি মানুষের দায়িত্ব হলো নিজের হৃদ্স্বাস্থ্যের প্রতি সচেতন হওয়া - ধূমপান পরিহার করা, স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ করা, নিয়মিত ব্যায়াম করা, রক্তচাপ ও রক্তে শর্করা পরীক্ষা করা এবং প্রয়োজন হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া।

উপসংহার

হৃদরোগের বিরুদ্ধে লড়াই শুধু হাসপাতালের লড়াই নয়; এটি একটি সামাজিক আন্দোলন। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি পৃথিবী, যেখানে একজন মানুষের আয়, বাসস্থান, বয়স, লিঙ্গ বা সামাজিক অবস্থান তার হৃদ্স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সুযোগ নির্ধারণ করবে না। হৃদ্স্বাস্থ্য সবার জন্য - এবং হৃদ্স্বাস্থ্য সুরক্ষার দায়িত্বও সবার। আমাদের এখনই প্রতিরোধে বিনিয়োগ করতে হবে, বৈজ্ঞানিক জ্ঞানকে দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে, প্রযুক্তির সুফল সবার কাছে পৌঁছে দিতে হবে এবং স্বাস্থ্য ও পরিবেশবান্ধব নীতি গ্রহণ করতে হবে। কারণ হৃদরোগ প্রতিরোধের প্রতিটি পদক্ষেপ একটি জীবন বাঁচাতে পারে। সুস্থ হৃদয় মানেই সুস্থ পরিবার, সুস্থ সমাজ এবং সুস্থ ভবিষ্যৎ। হৃদ্স্বাস্থ্য সবার অধিকার, হৃদ্স্বাস্থ্য রক্ষায় সবাই অংশীদার।

অধ্যাপক ডা. তৃপ্তীশ চন্দ্র ঘোষ : প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি, হার্ট কেয়ার ফাউন্ডেশন, কুমিল্লা

Thumbnail image

কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজ বা হৃদরোগ ও রক্তনালির রোগ আজ বিশ্বের অন্যতম বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি। বিশ্বজুড়ে ৫২ কোটি ৩০ লক্ষেরও বেশি মানুষ কোনো না কোনো ধরনের কার্ডিওভাসকুলার রোগে আক্রান্ত। উদ্বেগের বিষয় হলো, হৃদরোগজনিত মৃত্যুর একটি বড় অংশ ঘটে অকালেই—অনেক মানুষ ৭০ বছর বয়সে পৌঁছানোর আগেই হৃদরোগ বা স্ট্রোকের কারণে প্রাণ হারান। অথচ সঠিক উদ্যোগ, সময়মতো চিকিৎসা এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের মাধ্যমে হৃদরোগের একটি বড় অংশ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। প্রশ্ন হলো — যে রোগের এত বড় একটি অংশ প্রতিরোধযোগ্য, সেই রোগে এত মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে কেন? এর অন্যতম কারণ হলো স্বাস্থ্যসেবায় বৈষম্য, প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণে ঘাটতি, বৈজ্ঞানিক জ্ঞান বাস্তবায়নে বিলম্ব, প্রযুক্তির অসম সুযোগ এবং স্বাস্থ্য ও পরিবেশবিষয়ক নীতির মধ্যে সমন্বয়ের অভাব। তাই এখন সময় এসেছে হৃদ্স্বাস্থ্যকে শুধু চিকিৎসকের দায়িত্ব বা ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবে না দেখে - এটিকে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, সরকার ও বেসরকারি খাতের সম্মিলিত দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনা করার।

সবার জন্য সমান হৃদ্স্বাস্থ্যসেবা

হৃদ্স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্ছগুলোর একটি হলো স্বাস্থ্যসেবায় বৈষম্য। একটি দেশের শহর ও গ্রামের মধ্যে, ধনী ও দরিদ্র মানুষের মধ্যে, এমনকি বিভিন্ন সামাজিক ও অর্থনৈতিক গোষ্ঠীর মধ্যেও হৃদরোগ সম্পর্কে সচেতনতা এবং চিকিৎসাসেবা পাওয়ার সুযোগে বড় পার্থক্য রয়েছে। কার্ডিওভাসকুলার রোগজনিত মৃত্যুর ৭৫ শতাংশেরও বেশি ঘটে বিশ্বের নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে । দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠী অনেক সময় প্রয়োজনীয় পরীক্ষা, ওষুধ, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা কিংবা জরুরি চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হয়। অন্যদিকে, পর্যাপ্ত ও পুষ্টিকর খাবারের অভাবও হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি। বিশ্বের আনুমানিক ৩০০ কোটি মানুষ নিরাপদ, পুষ্টিকর ও পর্যাপ্ত খাবারের নিশ্চয়তা থেকে বঞ্চিত। অথচ স্বাস্থ্যকর খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, নির্মল বায়ু এবং নিয়মিত শারীরিক কর্মকাণ্ড হৃদরোগ প্রতিরোধের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। তাই প্রত্যেক মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় হৃদ্স্বাস্থ্য শিক্ষা, রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস পরীক্ষা, প্রয়োজনীয় ওষুধ এবং মানসম্মত চিকিৎসা সহজলভ্য করা জরুরি। হৃদ্স্বাস্থ্য হতে হবে অধিকার - সুযোগের বিষয় নয়।

জ্ঞানকে বাস্তব কর্মে রূপ দিতে হবে

হৃদরোগ প্রতিরোধ ও চিকিৎসা সম্পর্কে গত কয়েক দশকে বিপুল বৈজ্ঞানিক জ্ঞান অর্জিত হয়েছে। কিšদ শুধু গবেষণা বা বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার যথেষ্ট নয়। সেই জ্ঞানকে মানুষের জীবনে বাস্তব পরিবর্তন আনতে হবে। উচ্চ রক্তচাপ এর একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ। বিশ্বে প্রায় ১৩০ কোটি মানুষ উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত, অথচ আক্রান্তদের একপঞ্চমাংশেরও কম মানুষের রক্তচাপ কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। নিয়মিত রক্তচাপ পরিমাপ, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, খাবার হিসাবে লবণ গ্রহণের পরিমান কমানো, শারীরিক পরিশ্রম, ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং প্রয়োজন হলে নিয়মিত ওষুধ গ্রহণের মাধ্যমে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। একইভাবে ডায়াবেটিস ও হৃদরোগের সম্পর্কও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের হৃদরোগ হওয়ার ঝুঁকি সাধারণ মানুষের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। তাই হৃদরোগ প্রতিরোধের কর্মসূচিতে ডায়াবেটিস, স্থূলতা, উচ্চ রক্তচাপ ও কোলেস্টেরল - সবগুলো বিষয়কে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করতে হবে। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোকে এ ক্ষেত্রে আরও শক্তিশালী করতে হবে। প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মী, সহজ চিকিৎসা-প্রোটোকল, নিয়মিত স্ক্রিনিং এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার হৃদরোগ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৩ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের ১২৩টি দেশে প্রাথমিক ও দ্বিতীয় পর্যায়ের হৃদরোগ প্রতিরোধ কার্যক্রমের আওতা মাত্র ২০ শতাংশ বাড়ানো গেলেও প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ জীবন রক্ষা করা সম্ভব হতে পারে। অর্থাৎ, আমাদের হাতে জ্ঞান আছে - এখন প্রয়োজন জ্ঞানকে দ্রুত কর্মে পরিণত করা। প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনকে মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে ডিজিটাল প্রযুক্তি স্বাস্থ্যসেবার ভবিষ্যৎকে দ্রুত পরিবর্তন করছে। টেলিমেডিসিন, স্মার্টফোন, ওয়্যারেবল ডিভাইস, রিমোট মনিটরিং এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা হৃদরোগ শনাক্তকরণ ও প্রতিরোধে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। একজন রোগী নিজের বাড়িতে রক্তচাপ, হৃদস্পন্দন বা অন্যান্য স্বাস্থ্য-তথ্য পর্যবেক্ষণ করতে পারেন। দূরবর্তী এলাকার একজন মানুষ টেলিমেডিসিনের মাধ্যমে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ পেতে পারেন। ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিপুল পরিমাণ স্বাস্থ্য-তথ্য বিশ্লেষণ করে রোগের ঝুঁকি ও চিকিৎসার সম্ভাব্য ধারা শনাক্ত করতেও সাহায্য করতে পারে। তবে প্রযুক্তি যেন নতুন বৈষম্য সৃষ্টি না করে, সেদিকেও নজর দিতে হবে। প্রযুক্তি ও ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা হতে হবে সহজলভ্য, সাশ্রয়ী, নিরাপদ এবং সবার জন্য ব্যবহারযোগ্য। একই সঙ্গে রোগীর ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যতথ্যের গোপনীয়তা নিশ্চিত করতে হবে।

হৃদ্স্বাস্থ্য ও পরিবেশ—একই সুতোয় বাঁধা

হৃদ্স্বাস্থ্য শুধু হাসপাতাল বা চিকিৎসাকেন্দ্রের বিষয় নয়। আমরা যে পরিবেশে বসবাস করি, সেটিও আমাদের হৃদ্স্বাস্থ্যের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। তামাক ব্যবহার ও পরোক্ষ ধূমপানের কারণে প্রতি বছর প্রায় ৩০ লাখ মানুষ হৃদরোগে মারা যায়। একইভাবে বায়ুদূষণও হৃদরোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি। বিশ্বের অধিকাংশ মানুষ এমন এলাকায় বসবাস করেন যেখানে বায়ুর মান সুপারিশকৃত নিরাপদ মাত্রার চেয়ে খারাপ। তাই হৃদরোগ প্রতিরোধ করতে হলে তামাক নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি বায়ুদূষণ কমানো, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ব্যবহার, গণপরিবহন উন্নত করা, নিরাপদ হাঁটার পথ ও খেলার মাঠ তৈরি এবং স্বাস্থ্যকর নগর পরিকল্পনা নিশ্চিত করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশ এবং হৃদ্স্বাস্থ্যের বিষয়গুলোকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। একটি সুস্থ হৃদয়ের জন্য প্রয়োজন একটি সুস্থ পরিবেশ।

শারীরিক পরিশ্রম হোক প্রতিদিনের অভ্যাস

আধুনিক জীবনযাত্রায় শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা হৃদরোগের অন্যতম বড় ঝুঁকি। নিয়মিত শারীরিক কর্মকাণ্ড হৃদ্রোগ, ডায়াবেটিস, স্থূলতা ও অন্যান্য অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য সপ্তাহে প্রায় ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার শারীরিক কর্মকাণ্ড হৃদরোগের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারে। হাঁটা, সাইকেল চালানো, সাঁতার, খেলাধুলা কিংবা নিয়মিত ব্যায়াম—যেকোনো উপযুক্ত শারীরিক কর্মকাণ্ডই উপকারী। এজন্য এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে যেখানে মানুষ নিরাপদে হাঁটতে, ব্যায়াম করতে ও খেলাধুলা করতে পারে।

হৃদ্স্বাস্থ্য সবার দায়িত্ব

হৃদ্স্বাস্থ্য রক্ষার দায়িত্ব শুধু চিকিৎসকের নয়।

সরকারের দায়িত্ব -

প্রতিরোধ, স্ক্রিনিং, জরুরি চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও প্রয়োজনীয় ওষুধের সুযোগ বাড়ানো এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের উপযোগী নীতি গ্রহণ করা।

স্বাস্থ্য পেশাজীবীদের দায়িত্ব -

রোগ শনাক্ত ও চিকিৎসার পাশাপাশি প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা এবং রোগী ও জনগণের স্বাস্থ্যশিক্ষায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করা।

সুশীল সমাজের দায়িত্ব -

স্বাস্থ্যকর খাদ্য, তামাক নিয়ন্ত্রণ, পরিষ্কার বায়ু, শারীরিক কর্মকাণ্ড এবং সবার জন্য মানসম্মত চিকিৎসার দাবিতে জনসচেতনতা তৈরি করা।

বেসরকারি খাতের দায়িত্ব -

মানুষের স্বাস্থ্যকে ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা এবং স্বাস্থ্যকর পণ্য ও পরিবেশ তৈরিতে ভূমিকা রাখা। আর প্রতিটি মানুষের দায়িত্ব হলো নিজের হৃদ্স্বাস্থ্যের প্রতি সচেতন হওয়া - ধূমপান পরিহার করা, স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ করা, নিয়মিত ব্যায়াম করা, রক্তচাপ ও রক্তে শর্করা পরীক্ষা করা এবং প্রয়োজন হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া।

উপসংহার

হৃদরোগের বিরুদ্ধে লড়াই শুধু হাসপাতালের লড়াই নয়; এটি একটি সামাজিক আন্দোলন। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি পৃথিবী, যেখানে একজন মানুষের আয়, বাসস্থান, বয়স, লিঙ্গ বা সামাজিক অবস্থান তার হৃদ্স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সুযোগ নির্ধারণ করবে না। হৃদ্স্বাস্থ্য সবার জন্য - এবং হৃদ্স্বাস্থ্য সুরক্ষার দায়িত্বও সবার। আমাদের এখনই প্রতিরোধে বিনিয়োগ করতে হবে, বৈজ্ঞানিক জ্ঞানকে দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে, প্রযুক্তির সুফল সবার কাছে পৌঁছে দিতে হবে এবং স্বাস্থ্য ও পরিবেশবান্ধব নীতি গ্রহণ করতে হবে। কারণ হৃদরোগ প্রতিরোধের প্রতিটি পদক্ষেপ একটি জীবন বাঁচাতে পারে। সুস্থ হৃদয় মানেই সুস্থ পরিবার, সুস্থ সমাজ এবং সুস্থ ভবিষ্যৎ। হৃদ্স্বাস্থ্য সবার অধিকার, হৃদ্স্বাস্থ্য রক্ষায় সবাই অংশীদার।

অধ্যাপক ডা. তৃপ্তীশ চন্দ্র ঘোষ : প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি, হার্ট কেয়ার ফাউন্ডেশন, কুমিল্লা

বিষয়:

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

১

সবার জন্য সুস্থ হার্ট : হৃদ্স্বাস্থ্য সুরক্ষায় চাই সমন্বিত উদ্যোগ

২

রাজকন্যা সোনামতি কন্যা ও তিনটি অলীক কাহিনি

৩

অপ্রতিম হত্যা: এমন নির্মম সমাজ ও সংবাদমাধ্যম কীভাবে আমাদের হলো?

৪

অপ্রতিম মায়ের আঁচল, নিজের জগৎ ছাড়িয়ে আরও বহুদূর চলে গেছে

৫

নাজুক বয়ঃসন্ধি ও একটি মোবাইল ফোন: ঘরে ঢুকে পড়া অচেনা পৃথিবী

সম্পর্কিত

রাজকন্যা সোনামতি কন্যা ও তিনটি অলীক কাহিনি

রাজকন্যা সোনামতি কন্যা ও তিনটি অলীক কাহিনি

১৫ ঘণ্টা আগে
অপ্রতিম হত্যা: এমন নির্মম সমাজ ও সংবাদমাধ্যম কীভাবে আমাদের হলো?

অপ্রতিম হত্যা: এমন নির্মম সমাজ ও সংবাদমাধ্যম কীভাবে আমাদের হলো?

৪ দিন আগে
অপ্রতিম মায়ের আঁচল, নিজের জগৎ ছাড়িয়ে আরও বহুদূর চলে গেছে

অপ্রতিম মায়ের আঁচল, নিজের জগৎ ছাড়িয়ে আরও বহুদূর চলে গেছে

৪ দিন আগে
নাজুক বয়ঃসন্ধি ও একটি মোবাইল ফোন: ঘরে ঢুকে পড়া অচেনা পৃথিবী

নাজুক বয়ঃসন্ধি ও একটি মোবাইল ফোন: ঘরে ঢুকে পড়া অচেনা পৃথিবী

৫ দিন আগে