• কুমিল্লা সিটি করপোরেশন
  • কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়
  • আদর্শ সদর
  • বরুড়া
  • লাকসাম
  • দাউদকান্দি
  • আরও
    • চৌদ্দগ্রাম
    • সদর দক্ষিণ
    • নাঙ্গলকোট
    • বুড়িচং
    • ব্রাহ্মণপাড়া
    • মনোহরগঞ্জ
    • লালমাই
    • চান্দিনা
    • মুরাদনগর
    • দেবীদ্বার
    • হোমনা
    • মেঘনা
    • তিতাস
  • সর্বশেষ
  • রাজনীতি
  • বাংলাদেশ
  • অপরাধ
  • বিশ্ব
  • বাণিজ্য
  • মতামত
  • খেলা
  • বিনোদন
  • চাকরি
  • জীবনযাপন
  • ইপেপার
  • ইপেপার
facebooktwittertiktokpinterestyoutubelinkedininstagramgoogle
স্বত্ব: ©️ আমার শহর

সম্পাদক ও প্রকাশক : মো. গাজীউল হক ভূঁইয়া ( সোহাগ)।

নাহার প্লাজা, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা-৩৫০০

ই-মেইল: [email protected]

ফোন: 01716197760

> মতামত

কুমিল্লার মাটি থেকে বিশ্বে: আখতার হামিদ খানের গ্রাম উন্নয়নের দর্শন

আবদুল্লাহ আল মামুন
প্রকাশ : ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ১২: ১৫
logo

কুমিল্লার মাটি থেকে বিশ্বে: আখতার হামিদ খানের গ্রাম উন্নয়নের দর্শন

আবদুল্লাহ আল মামুন

প্রকাশ : ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ১২: ১৫
Photo

কিছু মানুষ চলে যান, কিন্তু তাঁদের চিন্তা থেকে যায়। কিছু প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে, কিন্তু তার চেয়েও বড় হয়ে ওঠে সেই প্রতিষ্ঠানের চিন্তার উত্তরাধিকার। ড. আখতার হামিদ খান ছিলেন তেমনই একজন মানুষ। তাঁর জীবন ও কর্মের সঙ্গে কুমিল্লার মাটি, বাংলাদেশের পল্লী উন্নয়ন এবং বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমি (বার্ড)-একটি অবিচ্ছেদ্য অধ্যায়ে যুক্ত হয়ে আছে।

আজ ৯ অক্টোবর ড. আখতার হামিদ খানের মৃত্যুবার্ষিকী। এই দিনে তাঁকে স্মরণ করতে গিয়ে শুধু তাঁর জীবনের ঘটনাগুলো মনে করার প্রয়োজন নেই; বরং আমাদের ফিরে তাকাতে হয় সেই প্রশ্নটির দিকে, যে প্রশ্নটি তাঁর উন্নয়নচিন্তার কেন্দ্রে ছিল—গ্রামের মানুষকে কীভাবে নিজেদের উন্নয়নের শক্তিতে পরিণত করা যায়?

১৯৫৯ সালে কুমিল্লায় প্রতিষ্ঠিত তৎকালীন পাকিস্তান পল্লী উন্নয়ন একাডেমি, পরবর্তীকালে বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমি, ছিল সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। ড. আখতার হামিদ খান ছিলেন প্রতিষ্ঠানটির প্রথম পরিচালক। তাঁর নেতৃত্বে বার্ড শুধু প্রশিক্ষণ দেওয়ার প্রতিষ্ঠান হয়ে থাকেনি; এটি হয়ে উঠেছিল গবেষণা, প্রশিক্ষণ ও মাঠপর্যায়ে উন্নয়ন-পরীক্ষার একটি জীবন্ত পরীক্ষাগার।

এখানেই তাঁর কাজের স্বাতন্ত্র্য।

তিনি মনে করতেন, গ্রামের উন্নয়ন গ্রামের বাইরে বসে পরিকল্পনা করে সম্পন্ন করা যায় না। গ্রামের মানুষকে বুঝতে হবে, তাঁদের সঙ্গে কথা বলতে হবে, তাঁদের অভিজ্ঞতা থেকে শিখতে হবে এবং তাঁদের অংশগ্রহণের ভিত্তিতে সমাধান তৈরি করতে হবে।

এই দর্শন থেকেই কুমিল্লায় শুরু হয় নানা ধরনের পরীক্ষামূলক কর্মসূচি। কৃষক সংগঠন, সমবায়, কৃষি উন্নয়ন, সেচ, প্রশিক্ষণ, স্থানীয় নেতৃত্ব-বিভিন্ন উপাদানকে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত করে একটি সমন্বিত গ্রামীণ উন্নয়ন পদ্ধতি গড়ে উঠতে থাকে। পরবর্তীকালে এই অভিজ্ঞতাই ‘কুমিল্লা মডেল’ নামে পরিচিত হয় এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অঙ্গনে আলোচিত হয়।

কিন্তু ‘কুমিল্লা মডেল’-এর প্রকৃত শক্তি শুধু এর বিভিন্ন কর্মসূচিতে ছিল না। এর শক্তি ছিল একটি দৃষ্টিভঙ্গিতে-মানুষকে উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখা।

একজন দরিদ্র কৃষককে যদি শুধু ঋণের গ্রহীতা হিসেবে দেখা হয়, তাহলে তার ভূমিকা সীমিত থাকে। কিন্তু তাকে যদি সংগঠনের সদস্য, সিদ্ধান্তগ্রহণকারী এবং উন্নয়নের অংশীদার হিসেবে দেখা হয়, তাহলে তার সক্ষমতা বহুগুণ বেড়ে যায়। ড. আখতার হামিদ খান এই দ্বিতীয় পথটি বেছে নিয়েছিলেন।

এই কারণেই তাঁর উন্নয়নচিন্তায় প্রতিষ্ঠান গঠন এত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তিনি বুঝেছিলেন, একটি প্রকল্প শেষ হয়ে গেলে তার সুফলও শেষ হয়ে যেতে পারে; কিন্তু মানুষের নিজস্ব সংগঠন ও সক্ষমতা তৈরি হলে উন্নয়নের ধারাটি টিকে থাকতে পারে।

তাঁর কাজের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল-গবেষণা ও বাস্তব কাজের মধ্যে দূরত্ব কমিয়ে আনা।

আজ আমরা প্রমাণভিত্তিক উন্নয়ন, অংশগ্রহণমূলক উন্নয়ন, প্রায়োগিক গবেষণা ও পরীক্ষামূলক কর্মসূচির কথা বলি। কিন্তু কুমিল্লার গ্রামগুলোতে বহু দশক আগে ড. আখতার হামিদ খান যে কাজের সংস্কৃতি তৈরি করেছিলেন, তার মধ্যে এসব ধারণার বাস্তব প্রয়োগের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ছিল।

একটি ধারণা মাঠে প্রয়োগ করা, ফলাফল দেখা, মানুষের প্রতিক্রিয়া বোঝা, প্রয়োজন হলে পদ্ধতি পরিবর্তন করা এবং সফল অভিজ্ঞতাকে অন্য জায়গায় ছড়িয়ে দেওয়া-এটাই ছিল তাঁর কাজের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য।

এখানেই বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমির ঐতিহাসিক গুরুত্ব।

বার্ড শুধু একটি ভবন বা একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান নয়। এর সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো মাঠ থেকে শেখার ঐতিহ্য। কুমিল্লার গ্রামগুলো বার্ডের জন্য শুধু গবেষণার বিষয় ছিল না; বরং ছিল শেখার জায়গা। আর এই সম্পর্কটিই ড. আখতার হামিদ খানের উত্তরাধিকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

আজকের বাংলাদেশ অবশ্য অনেক বদলে গেছে। যে গ্রামে একসময় কৃষি উৎপাদন, সেচ, সমবায় ও যোগাযোগ ছিল প্রধান চ্যালেঞ্জ, সেখানে আজ নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। গ্রামের তরুণরা শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের জন্য শহরে যাচ্ছে। প্রযুক্তি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম গ্রামীণ সমাজকে দ্রুত বদলে দিচ্ছে। একই সঙ্গে বেকারত্ব, মাদকাসক্তি, জলবায়ু পরিবর্তন, অভিবাসন, সামাজিক বৈষম্য, তথ্যের অসমতা এবং সরকারি সেবা সম্পর্কে অজ্ঞতার মতো নতুন সমস্যাও সামনে এসেছে।

তাই আজ আখতার হামিদ খানকে স্মরণ করার সবচেয়ে অর্থবহ উপায় হয়তো পুরোনো কোনো মডেলকে হুবহু অনুসরণ করা নয়।

বরং প্রশ্ন করা-

আজকের গ্রামের জন্য নতুন ‘কুমিল্লা মডেল’ কী হতে পারে?

এই প্রশ্নটি বার্ডের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ আখতার হামিদ খানের প্রকৃত উত্তরাধিকার কোনো নির্দিষ্ট প্রকল্প নয়; তাঁর উত্তরাধিকার হলো নতুন সমস্যা নিয়ে প্রশ্ন করার সাহস, মাঠে গিয়ে উত্তর খোঁজার মানসিকতা এবং মানুষের সঙ্গে কাজ করে সমাধান উদ্ভাবনের সংস্কৃতি।

একজন উন্নয়ন গবেষক হিসেবে তাঁর কাছ থেকে আমরা শিখতে পারি—গবেষণা যদি মানুষের জীবনে পরিবর্তন না আনে, তবে তার মূল্য সীমিত। একজন উন্নয়নকর্মী হিসেবে আমরা শিখতে পারি—মানুষের ওপর কাজ করা আর মানুষের সঙ্গে কাজ করা এক জিনিস নয়। আর একটি উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান হিসেবে বার্ডের জন্য তাঁর শিক্ষা হলো—প্রতিষ্ঠানের শক্তি শুধু তার অবকাঠামো বা জনবল নয়; তার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো নতুন জ্ঞান সৃষ্টি এবং তা মাঠে প্রয়োগ করার সক্ষমতা।

নতুন সময়ের জন্য নতুন চিন্তা

বর্তমান গ্রামীণ বাংলাদেশের বাস্তবতায় ড. আখতার হামিদ খানের দর্শন নতুনভাবে প্রাসঙ্গিক। কারণ গ্রাম উন্নয়ন এখন শুধু কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর প্রশ্ন নয়। এটি একই সঙ্গে মানবসম্পদ উন্নয়ন, যুব নেতৃত্ব, শিক্ষা, প্রযুক্তি, সামাজিক সুরক্ষা, স্থানীয় শাসন, উদ্যোক্তা সৃষ্টি, পরিবেশ এবং সামাজিক সংহতির প্রশ্ন।

এই নতুন বাস্তবতায় বার্ডের সামনে একটি বড় সুযোগ রয়েছে-কুমিল্লার ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার ওপর দাঁড়িয়ে ভবিষ্যতের গ্রাম উন্নয়নের নতুন মডেল উদ্ভাবন করা।

যে প্রতিষ্ঠান একসময় কুমিল্লার গ্রাম থেকে একটি উন্নয়ন মডেলের জন্ম দিয়েছিল, সেই প্রতিষ্ঠান আজও নতুন প্রজন্মের গবেষক ও উন্নয়নকর্মীদের জন্য একটি অনন্য ক্ষেত্র হতে পারে। প্রয়োজন শুধু অতীতের সাফল্যকে স্মরণ করা নয়; বরং সেই উদ্ভাবনী চেতনাকে বর্তমানের সমস্যার সঙ্গে যুক্ত করা।

আখতার হামিদ খানের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা হবে তখনই, যখন আমরা তাঁর প্রতিষ্ঠিত উন্নয়নচিন্তার মূল দর্শন-মানুষকে বিশ্বাস করা, মাঠ থেকে শেখা, গবেষণাকে বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত করা এবং স্থানীয় নেতৃত্বকে শক্তিশালী করা-নতুন সময়ের প্রয়োজন অনুযায়ী এগিয়ে নিতে পারব।

ড. আখতার হামিদ খান ১৯৯৯ সালের ৯ অক্টোবর আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। কিন্তু তাঁর চিন্তার মৃত্যু হয়নি। কুমিল্লার গ্রাম, বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমির প্রাতিষ্ঠানিক স্মৃতি এবং বাংলাদেশের পল্লী উন্নয়নের ইতিহাসে তাঁর কাজ আজও জীবন্ত।

তাঁকে স্মরণ করার সবচেয়ে সুন্দর উপায় হয়তো শুধু একটি ফুল দেওয়া নয়—বরং একটি নতুন প্রশ্ন করা, একটি নতুন ধারণা পরীক্ষা করা এবং গ্রামের মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে নতুন কিছু শেখা।

ড. আখতার হামিদ খানের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।

তাঁর দেখানো পথে শুধু হাঁটা নয়-তাঁর মতো করে নতুন পথ খোঁজার মধ্যেই হোক তাঁর প্রতি আমাদের প্রকৃত শ্রদ্ধা।

আবদুল্লাহ আল মামুন: সহকারী পরিচালক, বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমি (বার্ড), কোটবাড়ি, কুমিল্লা

Thumbnail image

কিছু মানুষ চলে যান, কিন্তু তাঁদের চিন্তা থেকে যায়। কিছু প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে, কিন্তু তার চেয়েও বড় হয়ে ওঠে সেই প্রতিষ্ঠানের চিন্তার উত্তরাধিকার। ড. আখতার হামিদ খান ছিলেন তেমনই একজন মানুষ। তাঁর জীবন ও কর্মের সঙ্গে কুমিল্লার মাটি, বাংলাদেশের পল্লী উন্নয়ন এবং বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমি (বার্ড)-একটি অবিচ্ছেদ্য অধ্যায়ে যুক্ত হয়ে আছে।

আজ ৯ অক্টোবর ড. আখতার হামিদ খানের মৃত্যুবার্ষিকী। এই দিনে তাঁকে স্মরণ করতে গিয়ে শুধু তাঁর জীবনের ঘটনাগুলো মনে করার প্রয়োজন নেই; বরং আমাদের ফিরে তাকাতে হয় সেই প্রশ্নটির দিকে, যে প্রশ্নটি তাঁর উন্নয়নচিন্তার কেন্দ্রে ছিল—গ্রামের মানুষকে কীভাবে নিজেদের উন্নয়নের শক্তিতে পরিণত করা যায়?

১৯৫৯ সালে কুমিল্লায় প্রতিষ্ঠিত তৎকালীন পাকিস্তান পল্লী উন্নয়ন একাডেমি, পরবর্তীকালে বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমি, ছিল সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। ড. আখতার হামিদ খান ছিলেন প্রতিষ্ঠানটির প্রথম পরিচালক। তাঁর নেতৃত্বে বার্ড শুধু প্রশিক্ষণ দেওয়ার প্রতিষ্ঠান হয়ে থাকেনি; এটি হয়ে উঠেছিল গবেষণা, প্রশিক্ষণ ও মাঠপর্যায়ে উন্নয়ন-পরীক্ষার একটি জীবন্ত পরীক্ষাগার।

এখানেই তাঁর কাজের স্বাতন্ত্র্য।

তিনি মনে করতেন, গ্রামের উন্নয়ন গ্রামের বাইরে বসে পরিকল্পনা করে সম্পন্ন করা যায় না। গ্রামের মানুষকে বুঝতে হবে, তাঁদের সঙ্গে কথা বলতে হবে, তাঁদের অভিজ্ঞতা থেকে শিখতে হবে এবং তাঁদের অংশগ্রহণের ভিত্তিতে সমাধান তৈরি করতে হবে।

এই দর্শন থেকেই কুমিল্লায় শুরু হয় নানা ধরনের পরীক্ষামূলক কর্মসূচি। কৃষক সংগঠন, সমবায়, কৃষি উন্নয়ন, সেচ, প্রশিক্ষণ, স্থানীয় নেতৃত্ব-বিভিন্ন উপাদানকে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত করে একটি সমন্বিত গ্রামীণ উন্নয়ন পদ্ধতি গড়ে উঠতে থাকে। পরবর্তীকালে এই অভিজ্ঞতাই ‘কুমিল্লা মডেল’ নামে পরিচিত হয় এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অঙ্গনে আলোচিত হয়।

কিন্তু ‘কুমিল্লা মডেল’-এর প্রকৃত শক্তি শুধু এর বিভিন্ন কর্মসূচিতে ছিল না। এর শক্তি ছিল একটি দৃষ্টিভঙ্গিতে-মানুষকে উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখা।

একজন দরিদ্র কৃষককে যদি শুধু ঋণের গ্রহীতা হিসেবে দেখা হয়, তাহলে তার ভূমিকা সীমিত থাকে। কিন্তু তাকে যদি সংগঠনের সদস্য, সিদ্ধান্তগ্রহণকারী এবং উন্নয়নের অংশীদার হিসেবে দেখা হয়, তাহলে তার সক্ষমতা বহুগুণ বেড়ে যায়। ড. আখতার হামিদ খান এই দ্বিতীয় পথটি বেছে নিয়েছিলেন।

এই কারণেই তাঁর উন্নয়নচিন্তায় প্রতিষ্ঠান গঠন এত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তিনি বুঝেছিলেন, একটি প্রকল্প শেষ হয়ে গেলে তার সুফলও শেষ হয়ে যেতে পারে; কিন্তু মানুষের নিজস্ব সংগঠন ও সক্ষমতা তৈরি হলে উন্নয়নের ধারাটি টিকে থাকতে পারে।

তাঁর কাজের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল-গবেষণা ও বাস্তব কাজের মধ্যে দূরত্ব কমিয়ে আনা।

আজ আমরা প্রমাণভিত্তিক উন্নয়ন, অংশগ্রহণমূলক উন্নয়ন, প্রায়োগিক গবেষণা ও পরীক্ষামূলক কর্মসূচির কথা বলি। কিন্তু কুমিল্লার গ্রামগুলোতে বহু দশক আগে ড. আখতার হামিদ খান যে কাজের সংস্কৃতি তৈরি করেছিলেন, তার মধ্যে এসব ধারণার বাস্তব প্রয়োগের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ছিল।

একটি ধারণা মাঠে প্রয়োগ করা, ফলাফল দেখা, মানুষের প্রতিক্রিয়া বোঝা, প্রয়োজন হলে পদ্ধতি পরিবর্তন করা এবং সফল অভিজ্ঞতাকে অন্য জায়গায় ছড়িয়ে দেওয়া-এটাই ছিল তাঁর কাজের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য।

এখানেই বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমির ঐতিহাসিক গুরুত্ব।

বার্ড শুধু একটি ভবন বা একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান নয়। এর সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো মাঠ থেকে শেখার ঐতিহ্য। কুমিল্লার গ্রামগুলো বার্ডের জন্য শুধু গবেষণার বিষয় ছিল না; বরং ছিল শেখার জায়গা। আর এই সম্পর্কটিই ড. আখতার হামিদ খানের উত্তরাধিকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

আজকের বাংলাদেশ অবশ্য অনেক বদলে গেছে। যে গ্রামে একসময় কৃষি উৎপাদন, সেচ, সমবায় ও যোগাযোগ ছিল প্রধান চ্যালেঞ্জ, সেখানে আজ নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। গ্রামের তরুণরা শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের জন্য শহরে যাচ্ছে। প্রযুক্তি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম গ্রামীণ সমাজকে দ্রুত বদলে দিচ্ছে। একই সঙ্গে বেকারত্ব, মাদকাসক্তি, জলবায়ু পরিবর্তন, অভিবাসন, সামাজিক বৈষম্য, তথ্যের অসমতা এবং সরকারি সেবা সম্পর্কে অজ্ঞতার মতো নতুন সমস্যাও সামনে এসেছে।

তাই আজ আখতার হামিদ খানকে স্মরণ করার সবচেয়ে অর্থবহ উপায় হয়তো পুরোনো কোনো মডেলকে হুবহু অনুসরণ করা নয়।

বরং প্রশ্ন করা-

আজকের গ্রামের জন্য নতুন ‘কুমিল্লা মডেল’ কী হতে পারে?

এই প্রশ্নটি বার্ডের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ আখতার হামিদ খানের প্রকৃত উত্তরাধিকার কোনো নির্দিষ্ট প্রকল্প নয়; তাঁর উত্তরাধিকার হলো নতুন সমস্যা নিয়ে প্রশ্ন করার সাহস, মাঠে গিয়ে উত্তর খোঁজার মানসিকতা এবং মানুষের সঙ্গে কাজ করে সমাধান উদ্ভাবনের সংস্কৃতি।

একজন উন্নয়ন গবেষক হিসেবে তাঁর কাছ থেকে আমরা শিখতে পারি—গবেষণা যদি মানুষের জীবনে পরিবর্তন না আনে, তবে তার মূল্য সীমিত। একজন উন্নয়নকর্মী হিসেবে আমরা শিখতে পারি—মানুষের ওপর কাজ করা আর মানুষের সঙ্গে কাজ করা এক জিনিস নয়। আর একটি উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান হিসেবে বার্ডের জন্য তাঁর শিক্ষা হলো—প্রতিষ্ঠানের শক্তি শুধু তার অবকাঠামো বা জনবল নয়; তার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো নতুন জ্ঞান সৃষ্টি এবং তা মাঠে প্রয়োগ করার সক্ষমতা।

নতুন সময়ের জন্য নতুন চিন্তা

বর্তমান গ্রামীণ বাংলাদেশের বাস্তবতায় ড. আখতার হামিদ খানের দর্শন নতুনভাবে প্রাসঙ্গিক। কারণ গ্রাম উন্নয়ন এখন শুধু কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর প্রশ্ন নয়। এটি একই সঙ্গে মানবসম্পদ উন্নয়ন, যুব নেতৃত্ব, শিক্ষা, প্রযুক্তি, সামাজিক সুরক্ষা, স্থানীয় শাসন, উদ্যোক্তা সৃষ্টি, পরিবেশ এবং সামাজিক সংহতির প্রশ্ন।

এই নতুন বাস্তবতায় বার্ডের সামনে একটি বড় সুযোগ রয়েছে-কুমিল্লার ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার ওপর দাঁড়িয়ে ভবিষ্যতের গ্রাম উন্নয়নের নতুন মডেল উদ্ভাবন করা।

যে প্রতিষ্ঠান একসময় কুমিল্লার গ্রাম থেকে একটি উন্নয়ন মডেলের জন্ম দিয়েছিল, সেই প্রতিষ্ঠান আজও নতুন প্রজন্মের গবেষক ও উন্নয়নকর্মীদের জন্য একটি অনন্য ক্ষেত্র হতে পারে। প্রয়োজন শুধু অতীতের সাফল্যকে স্মরণ করা নয়; বরং সেই উদ্ভাবনী চেতনাকে বর্তমানের সমস্যার সঙ্গে যুক্ত করা।

আখতার হামিদ খানের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা হবে তখনই, যখন আমরা তাঁর প্রতিষ্ঠিত উন্নয়নচিন্তার মূল দর্শন-মানুষকে বিশ্বাস করা, মাঠ থেকে শেখা, গবেষণাকে বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত করা এবং স্থানীয় নেতৃত্বকে শক্তিশালী করা-নতুন সময়ের প্রয়োজন অনুযায়ী এগিয়ে নিতে পারব।

ড. আখতার হামিদ খান ১৯৯৯ সালের ৯ অক্টোবর আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। কিন্তু তাঁর চিন্তার মৃত্যু হয়নি। কুমিল্লার গ্রাম, বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমির প্রাতিষ্ঠানিক স্মৃতি এবং বাংলাদেশের পল্লী উন্নয়নের ইতিহাসে তাঁর কাজ আজও জীবন্ত।

তাঁকে স্মরণ করার সবচেয়ে সুন্দর উপায় হয়তো শুধু একটি ফুল দেওয়া নয়—বরং একটি নতুন প্রশ্ন করা, একটি নতুন ধারণা পরীক্ষা করা এবং গ্রামের মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে নতুন কিছু শেখা।

ড. আখতার হামিদ খানের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।

তাঁর দেখানো পথে শুধু হাঁটা নয়-তাঁর মতো করে নতুন পথ খোঁজার মধ্যেই হোক তাঁর প্রতি আমাদের প্রকৃত শ্রদ্ধা।

আবদুল্লাহ আল মামুন: সহকারী পরিচালক, বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমি (বার্ড), কোটবাড়ি, কুমিল্লা

বিষয়:

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

১

আশা আছে, ভালোবাসা আছে

২

তাজমিনের চলে যাওয়া, জেন জি এবং আমাদের অচেনা এক পৃথিবী

৩

মাঠ হারানো শহর, পথ হারানো কিশোর

৪

কুমিল্লার মাটি থেকে বিশ্বে: আখতার হামিদ খানের গ্রাম উন্নয়নের দর্শন

৫

শিশু অধিকার বাস্তবায়ন করুন

সম্পর্কিত

আশা আছে, ভালোবাসা আছে

আশা আছে, ভালোবাসা আছে

৩ ঘণ্টা আগে
তাজমিনের চলে যাওয়া, জেন জি এবং আমাদের অচেনা এক পৃথিবী

তাজমিনের চলে যাওয়া, জেন জি এবং আমাদের অচেনা এক পৃথিবী

১২ ঘণ্টা আগে
মাঠ হারানো শহর, পথ হারানো কিশোর

মাঠ হারানো শহর, পথ হারানো কিশোর

২ দিন আগে
শিশু অধিকার বাস্তবায়ন করুন

শিশু অধিকার বাস্তবায়ন করুন

৩ দিন আগে