সৌরভের সুবচন

'জেগে উঠো মানুষ ফিরে আসুক মানবিকতা'

সেলিম রেজা সৌরভ
Thumbnail image

সাম্প্রতিককালে আমাদের প্রিয় মাতৃভ‚মি বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, শিশু ও নারী নির্যাতন, চুরি, ডাকাতি এবং রাহাজানির মতো অপরাধের খবর প্রতিদিন আমাদের নমনীয় মনকে বিষিয়ে তুলছে। এর পাশাপাশি সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে জেঁকে বসা ঘুষ, দুর্নীতি ও অনিয়ম সাধারণ মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। প্রতিদিনের সংবাদপত্রের পাতা খুললেই যে নির্মমতার চিত্র ফুটে ওঠে, তা কোনো সুস্থ সমাজের লক্ষণ হতে পারে না। এই পরিস্থিতি শুধু একটি প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, বরং এটি আমাদের সামগ্রিক সামাজিক ও মানসিক অবক্ষয়ের এক ভয়াবহ প্রতিফলন। রাষ্ট্রীয় আইন বা কঠোর পুলিশি নজরদারি দিয়ে সাময়িকভাবে অপরাধ কমানো হয়তো সম্ভব, কিন্তু সমাজকে ভেতর থেকে শুদ্ধ করতে হলে মানুষের মানবিক মূল্যবোধ ও মনুষ্যত্ব বোধ জাগ্রত করার কোনো বিকল্প নেই।

একটি সমাজ বা রাষ্ট্র কতটা উন্নত, তা কেবল তার জিডিপি বা বহুতল ভবনের সংখ্যা দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। আসল পরিমাপ হলো সেই সমাজের মানুষের নৈতিকতা ও সহমর্মিতায়। বর্তমান সমাজে আমরা বস্তুগত উন্নতির পেছনে এতটাই অন্ধ হয়ে ছুটেছি যে, আমাদের ভেতরের 'মানুষ' সত্তাটিকে কোথাও হারিয়ে ফেলেছি। অন্যায় দেখেও চোখ বুজে থাকা, নিজের স্বার্থের জন্য অন্যের ক্ষতি করা এবং দুর্বলকে শোষণ করার প্রবণতা আমাদের গ্রাস করে নিচ্ছে। যখন একটি সমাজে অবোধ শিশু বা একজন নারী নিরাপদ বোধ করে না, তখন বুঝতে হবে সেই সমাজের নৈতিক ভিত্তি ধসে পড়েছে। আইন যেখানে ভয়ের সৃষ্টি করে, নৈতিকতা সেখানে শ্রদ্ধার সৃষ্টি করে। তাই আজ সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন আমাদের সেই ঘুমিয়ে থাকা বিবেককে জাগিয়ে তোলা।

মনুষ্যত্ব ও মানবিক মূল্যবোধ কোনো আকাশ থেকে পড়া গুণ নয়, এটি প্রতিটি মানুষের ভেতরের এক অন্তর্নিহিত শক্তি, যা তাকে ভালো ও মন্দের পার্থক্য করতে শেখায়। এই বোধ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, অন্যের অধিকার খর্ব করার নাম স্বাধীনতা নয়। ঘুষ ও দুর্নীতিকে যখন আমরা সামাজিকভাবে মেনে নিতে শুরু করি, তখন পুরো ব্যবস্থাটাই পচে যায়। একজন সৎ মানুষও যখন পারিপার্শ্বিক চাপে পড়ে দুর্নীতিকে 'নিয়ম' বলে মেনে নেন, তখনই সমাজ থেকে মনুষ্যত্ব বিদায় নেয়। এই চক্র থেকে বের হতে হলে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির আমূল পরিবর্তন দরকার। অন্যায়কে শুধু অন্যায় বলাই যথেষ্ট নয়, তাকে ঘৃণা করতে শেখা এবং সামাজিকভাবে বয়কট করার মানসিকতা তৈরি করতে হবে।

এই রূপান্তরের প্রথম ও প্রধান কেন্দ্রবিন্দু হলো আমাদের পরিবার। পরিবারই একটি শিশুর প্রথম পাঠশালা। শৈশবে বাবা-মায়ের আচরণ, কথাবার্তা এবং নৈতিক শিক্ষা শিশুর মনে গভীর দাগ কাটে। আজকের দিনে অনেক পরিবারেই জিপিএ-৫ পাওয়ার প্রতিযোগিতা বা অর্থ উপার্জনের অন্ধ দৌড়কে এতটাই গুরুত্ব দেওয়া হয় যে, সততা, পরোপকার ও সহমর্মিতার মতো গুণগুলো আড়ালে পড়ে যায়। সন্তানদের শুধু সফল হতে শেখালে চলবে না, তাদের ভালো মানুষ হতে শেখাতে হবে। অন্যের বিপদে পাশে দাঁড়ানো, নারীকে সম্মান করা, এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ করার প্রাথমিক শিক্ষা পরিবার থেকেই আসতে হবে। বাবা-মায়েরা যদি নিজেরা সৎ জীবন যাপন করেন, তবে সন্তানরাও সেই আদর্শে অনুপ্রাণিত হবে।

পরিবারের পরেই আসে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভ‚মিকা। বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা অনেকাংশেই পরীক্ষাকেন্দ্রীক এবং চাকরি পাওয়ার হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। কিন্তু শিক্ষার আসল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত ছিল চরিত্র গঠন। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি নৈতিক শিক্ষা এবং মানবিক মূল্যবোধের চর্চা বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। শিক্ষার্থীদের শুধু মুখস্থ বিদ্যায় আটকে না রেখে তাদের মধ্যে সামাজিক দায়বদ্ধতা তৈরি করতে হবে। শিক্ষকেরা শুধু পাঠ্যবইয়ের শিক্ষক নন, তারা জীবনের মেন্টর। তাদের আদর্শ ও জীবনবোধ শিক্ষার্থীদের অনুপ্রাণিত করতে পারে। একটি সংবেদনশীল ও মানবিক প্রজন্ম গড়ে তুলতে শিক্ষা কারিকুলামে নৈতিকতার গল্প, সহমর্মিতার শিক্ষা এবং মানবিক কাজের বাস্তব অভিজ্ঞতা যুক্ত করা সময়ের দাবি।

পাশাপাশি, আমাদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর ভ‚মিকা পুনরুজ্জীবিত করা অত্যন্ত জরুরি। একসময় পাড়ায় পাড়ায় লাইব্রেরি, সাংস্কৃতিক ক্লাব এবং খেলাধুলার সংগঠন ছিল, যা তরুণ সমাজকে সুস্থ বিনোদন ও মানবিক মূল্যবোধের শিক্ষা দিত। আজ সেই জায়গাগুলো দখল করেছে প্রযুক্তির অপব্যবহার এবং মাদকের নীল ছোবল। তরুণদের এই বিপথগামিতা থেকে বাঁচাতে হলে সুস্থ ধারার সাংস্কৃতিক চর্চা, নাটক, সাহিত্য ও খেলাধুলার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে। সংস্কৃতি মানুষকে সংবেদনশীল করে তোলে, অন্যের দুঃখকে নিজের করে অনুভব করতে শেখায়। যখন সমাজে সংস্কৃতির আলো কমে যায়, তখনই অপরাধের অন্ধকার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে।

ধর্মীয় ও নৈতিক অনুশাসনও মানুষের বিবেককে জাগ্রত করতে বড় ভ‚মিকা রাখতে পারে। প্রতিটি ধর্মই মানবকল্যাণ, সততা, ন্যায়পরায়ণতা এবং অন্যের অধিকার রক্ষার কথা বলে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, অনেক সময় ধর্মের মূল বাণীকে বাদ দিয়ে কেবল বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠানকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। ধর্মীয় উপাসনালয়গুলো থেকে যদি নিয়মিতভাবে দুর্নীতি, নারী ও শিশু নির্যাতন, এবং সামাজিক অপরাধের বিরুদ্ধে সচেতনতামূলক বার্তা দেওয়া হয়, তবে তা সাধারণ মানুষের মনে গভীর প্রভাব ফেলবে। পরকালের জবাবদিহিতা বা নিজের বিবেকের কাছে পরিষ্কার থাকার যে তাগিদ ধর্ম দেয়, তা মানুষকে গোপনে অপরাধ করা থেকেও বিরত রাখতে পারে।

গণমাধ্যমের ভ‚মিকাও এখানে অনস্বীকার্য। শুধু অপরাধের খবর বা চাঞ্চল্যকর তথ্য পরিবেশন করলেই গণমাধ্যমের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। অপরাধের পেছনের কারণগুলো তুলে ধরা এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির খবর প্রচারের পাশাপাশি সমাজের ইতিবাচক ও মানবিক গল্পগুলোও সামনে আনা দরকার। সমাজে এখনো যারা সততার সাথে জীবনযাপন করছেন, যারা নিঃস্বার্থভাবে মানুষের সেবা করছেন, তাদের তুলে ধরলে তরুণ সমাজ ভালো কাজের প্রতি আকৃষ্ট হবে। ইতিবাচক রোল মডেলের বড্ড অভাব আজ আমাদের সমাজে, গণমাধ্যম সেই অভাব পূরণ করতে পারে।

সর্বোপরি, এই পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন আমাদের প্রত্যেকের ব্যক্তিগত আত্মোপলব্ধি। আমরা প্রায়শই ব্যবস্থার সমালোচনা করি, কিন্তু নিজেরা বদলাতে চাই না। "আমি একা সৎ হয়ে কী করব?"Ñএই মানসিকতা পরিহার করতে হবে। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বালুকণা যেমন মহাদেশ গড়ে তোলে, তেমনি প্রতিটি ব্যক্তির ছোট ছোট সৎ পদক্ষেপ একটি সুন্দর সমাজ বিনির্মাণ করতে পারে। ঘুষ না দেওয়া, ট্রাফিক আইন মেনে চলা, প্রতিবেশীর বিপদে এগিয়ে যাওয়াÑএই ছোট ছোট কাজগুলোই মনুষ্যত্বের প্রকাশ।

আমাদের মনে রাখতে হবে, কোনো রাষ্ট্রই কেবল অর্থনৈতিকভাবে উন্নত হয়ে টিকে থাকতে পারে না, যদি না তার নাগরিকদের নৈতিক ভিত্তি মজবুত থাকে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে অবশ্যই তাদের দায়িত্ব সততার সাথে পালন করতে হবে এবং অপরাধীদের বিচার নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু স্থায়ী শান্তির জন্য আমাদের মনের ভেতরের অন্ধকার দূর করতে হবে। আসুন, আমরা প্রত্যেকে নিজের জায়গা থেকে সচেতন হই। অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হই এবং আমাদের ভেতরে ঘুমিয়ে থাকা মনুষ্যত্বকে জাগ্রত করি। একটি নিরাপদ, বৈষম্যহীন এবং মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তোলা আমাদের নিজেদের এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এখন সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।

সেলিম রেজা সৌরভ: অধ্যক্ষ, সোনার বাংলা কলেজ, বুড়িচং, কুমিল্লা।

বিষয়:

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

সম্পর্কিত