সৌরভের সুবচন
মো.আবু ছালেক সেলিম রেজা সৌরভ

বাংলাদেশ আজ এক ঐতিহাসিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তরুণ প্রজন্ম এক নতুন দেশের স্বপ্ন দেখছে, যেখানে বৈষম্য থাকবে না, থাকবে মেধার মূল্যায়ন আর মানবিক মর্যাদা। কিন্তু একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্র গড়ে তোলার মূল চালিকাশক্তি হলো তার ছাত্রসমাজ। শিক্ষার্থীদের মেধা, সততা আর নৈতিকতার ওপরই নির্ভর করে আগামীর বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ।
দুর্ভাগ্যবশত, বর্তমান সময়ে আমাদের তরুণদের এক বড় অংশ এমন কিছু নেতিবাচক অভ্যাসের দিকে ঝুঁকে পড়ছে, যা তাদের অজান্তেই তাদের ভেতরকার সম্ভাবনাকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। জীবন গঠনে সততা, নিষ্ঠা ও কঠোর পরিশ্রমের কোনো বিকল্প নেই। একজন শিক্ষার্থীর প্রকৃত মানুষ হয়ে ওঠার পেছনে চারপাশের পরিবেশ যতটা দায়ী, তার চেয়েও বেশি দায়ী তার নিজস্ব কিছু সিদ্ধান্ত। আমাদের সমাজে এখন চারপাশের নানা অবক্ষয়ের ভিড়ে শিক্ষার্থীদের স্পষ্ট করে কিছু জিনিসকে ‘না’ বলতে শিখতে হবে। বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে আজ আমাদের তরুণ সমাজকে দৃঢ় কণ্ঠে বলতে হবে- ‘মিথ্যা, মাদক, বেয়াদবি ও না বুঝে মুখস্থ করাকে না বলি।’
মিথ্যাকে না বলি: সততার আলোয় জীবন গড়ি
আমাদের সমাজে একটি প্রবাদ প্রচলিত আছে- ‘একবার মিথ্যা বললে তা ঢাকতে আরও দশবার মিথ্যা বলতে হয়।’ মিথ্যা হলো সমস্ত পাপ এবং নৈতিক অবক্ষয়ের মূল চাবিকাঠি। একজন শিক্ষার্থীর জীবনে যখন মিথ্যার প্রবেশ ঘটে, তখন তার পুরো চরিত্রটিই কলুষিত হতে শুরু করে।
আজকের বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আমরা প্রায়ই দেখি, পরীক্ষার খাতায় নকল করা, অ্যাসাইনমেন্টে অন্যের লেখা চুরি করা (প্লেজিয়ারিজম), কিংবা ক্লাসে উপস্থিত না থেকে মিথ্যা অজুহাত দেওয়া- এসব ছোটখাটো মিথ্যা দিয়ে অনেক শিক্ষার্থীর প্রাতিষ্ঠানিক জীবন শুরু হয়। অনেক সময় বাবা-মা কিংবা শিক্ষকদের বকুনি থেকে বাঁচতে শিক্ষার্থীরা মিথ্যার আশ্রয় নেয়। কিন্তু এই সাময়িক পার পাওয়ার চেষ্টা ভবিষ্যতে কত বড় বিপদ ডেকে আনে, তা তারা টের পায় না।
শিক্ষাজীবনে যে ছেলে বা মেয়েটি অনায়াসে মিথ্যা বলতে পারে, কর্মজীবনে গিয়ে সে-ই দুর্নীতি, জালিয়াতি এবং প্রতারণার মতো বড় অপরাধের সাথে জড়িয়ে পড়ে। একটি দুর্নীতিমুক্ত, স্বচ্ছ বাংলাদেশ গড়তে হলে প্রথম প্রতিরোধটা আসতে হবে শিক্ষাঙ্গন থেকে। শিক্ষার্থীদের বুঝতে হবে, সত্য বলা সাময়িকভাবে কঠিন বা লজ্জাজনক মনে হতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে সত্যই মানুষকে সম্মানিত করে। পরীক্ষার খাতায় কম নম্বর পাওয়া লজ্জার কিছু নয়, কিন্তু অসদুপায় অবলম্বন করে বা মিথ্যা বলে জিপিএ-৫ পাওয়ার মধ্যে কোনো গৌরব নেই। তাই আজ থেকেই জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে মিথ্যাকে দৃঢ়ভাবে ‘না’ বলতে হবে এবং সততার চর্চা করতে হবে।
মাদককে না বলি: সুস্থ দেহে সুন্দর মন
বর্তমান বাংলাদেশের তরুণ সমাজের জন্য সবচেয়ে বড় এবং ভয়াবহ আতঙ্কের নাম হলো ‘মাদক’। এটি এমন এক নীরব ঘাতক, যা কেবল একজন শিক্ষার্থীর জীবনই ধ্বংস করে না, বরং একটি পুরো পরিবার এবং সমাজকে পঙ্গু করে দেয়। কৌতুহল, বন্ধুদের চাপ, পারিবারিক অশান্তি কিংবা সস্তা থ্রিল খোঁজার তাড়নায় অনেক শিক্ষার্থী মাদকের মরণফাঁদে পা বাড়ায়। ধূমপান থেকে শুরু করে গাঁজা, ফেন্সিডিল, ইয়াবা, আইস কিংবা নানা ধরনের মরণনেশায় জড়িয়ে পড়ছে আজকের স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।
মাদক একজন শিক্ষার্থীর চিন্তাভাবনা করার ক্ষমতা কেড়ে নেয়, তার মেধা ধ্বংস করে এবং তাকে চরম হতাশার দিকে ঠেলে দেয়। মাদকাসক্ত একজন শিক্ষার্থী কখনো পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে পারে না। নেশার টাকা জোগাড় করতে গিয়ে তারা জড়িয়ে পড়ে চুরি, ছিনতাই, কিশোর গ্যাং এবং নানা ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কিশোর গ্যাং কালচার এবং মাদকের বিস্তার এখন জাতীয় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক সম্ভাবনাময় মেধা অকালেই ঝরে যাচ্ছে শুধু এই মাদকের করাল গ্রাসে। শিক্ষার্থীদের বুঝতে হবে, মাদক কোনো স্মার্টনেস বা আধুনিকতার প্রতীক নয়; এটি হলো আত্মহত্যার নামান্তর। জীবন একটাই, আর একে সুন্দরভাবে বাঁচিয়ে রাখার জন্য সুস্থ শরীর ও সুস্থ মন জরুরি। তাই কোনো বন্ধু বা পরিবেশ যদি মাদকের দিকে প্ররোচিত করে, তবে তাকে সরাসরি এবং শক্তভাবে ‘না’ বলতে হবে। খেলার মাঠ, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে এবং সৃজনশীল চর্চায় যুক্ত হয়ে মাদককে সমাজ থেকে উপড়ে ফেলতে হবে।
বেয়াদবিকে না বলি: নৈতিকতা ও মূল্যবোধের শিক্ষা
শিক্ষার আসল উদ্দেশ্য কেবল সার্টিফিকেট অর্জন নয়, বরং একজন বিনয়ী ও মানবিক মানুষ হওয়া। আর বিনয়ের প্রথম প্রকাশ ঘটে আমাদের আচরণে। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের সমাজ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে গুরুজন, শিক্ষক এবং মা-বাবার প্রতি শিক্ষার্থীদের একাংশের আচরণের মধ্যে এক ধরনের অবাধ্যতা ও বেয়াদবি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার, সস্তা জনপ্রিয়তার লোভ এবং পশ্চিমা সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ তরুণদের একটা অংশকে ঔদ্ধত্যপূর্ণ করে তুলছে।
শিক্ষকেরা হলেন মানুষ গড়ার কারিগর। আমাদের সমাজ ও সংস্কৃতিতে শিক্ষকের স্থান সবসময় সবার ওপরে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য, ইদানীং শিক্ষকদের লাঞ্ছিত করা, তাদের সাথে উগ্র আচরণ করা কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের নিয়ে ট্রল করার মতো ঘটনাও আমাদের দেখতে হচ্ছে। মা-বাবার সাথে সামান্য বিষয়ে তর্ক করা বা তাদের আদেশ অমান্য করাকে অনেকে এখন ‘ব্যক্তিগত স্বাধীনতা’ বলে চালিয়ে দিতে চায়।
বিনয় ও শ্রদ্ধা ছাড়া কোনোদিন প্রকৃত জ্ঞান অর্জন করা যায় না। যে শিক্ষার্থী তার শিক্ষক বা মা-বাবাকে সম্মান করতে পারে না, সে কখনো সমাজের ভালো নাগরিক হতে পারে না। বড়দের সম্মান করা এবং ছোটদের স্নেহ করা আমাদের হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতির মূল ভিত্তি। বাকস্বাধীনতা বা অধিকার আদায়ের আন্দোলনের নামে প্রবীণ বা গুরুজনদের অপমান করার সংস্কৃতি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। শিক্ষার্থীদের মনে রাখতে হবে, অহংকার ও বেয়াদবি মানুষের পতনের মূল কারণ। তাই সমাজ থেকে উগ্রতা ও অহংকার দূর করে, বড়দের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ জাগিয়ে তুলতে হবে এবং সব ধরনের বেয়াদবিকে ‘না’ বলতে হবে।
না বুঝে মুখস্থ করাকে না বলি: সৃজনশীলতা ও প্রকৃত জ্ঞানার্জন
আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থার একটি বড় সংকট হলো ‘না বুঝে মুখস্থ করার প্রবণতা’। ছোটবেলা থেকেই আমাদের শিক্ষার্থীদের শেখানো হয় কীভাবে পরীক্ষায় বেশি নম্বর পাওয়া যায়, কিন্তু কীভাবে জ্ঞানকে বাস্তব জীবনে কাজে লাগানো যায়, তা অনেক সময়ই আড়ালে আবছা রয়ে যায়। জিপিএ-৫ পাওয়ার এক অন্ধ ইঁদুর দৌড়ে শামিল হয়ে শিক্ষার্থীরা গাইড বই, নোট খাতা কিংবা শিক্ষকের তৈরি করে দেওয়া নোট হুবহু মুখস্থ করে পরীক্ষার খাতায় উগরে দেয়।
না বুঝে মুখস্থ করা হলো একজন শিক্ষার্থীর প্রকৃত জ্ঞানার্জন এবং সৃজনশীলতার পথে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা। এর ফলে শিক্ষার্থীরা সাময়িকভাবে পরীক্ষায় ভালো ফল করতে পারে ঠিকই, কিন্তু তাদের চিন্তাশক্তি, বিশ্লেষণ ক্ষমতা এবং নতুন কিছু উদ্ভাবন করার যোগ্যতা পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায়। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে বা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যখন আমাদের শিক্ষার্থীরা পদার্পণ করে, তখন এই মুখস্থ বিদ্যার ফাঁকফোকরগুলো স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। তারা বাস্তব সমস্যার সমাধান করতে পারে না, কারণ তারা কখনো বিষয়টি অনুধাবন করতে শেখেনি।
বর্তমান পৃথিবী এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই যুগে কেবল মুখস্থ বিদ্যা দিয়ে টিকে থাকা অসম্ভব। এখন প্রয়োজন সমস্যা সমাধানের দক্ষতা (প্রবলেম সলভিং স্কিল) এবং সমালোচনাপ্রবণ চিন্তাভাবনা (ক্রিটিক্যাল থিংকিং)। একটি বিষয় যতক্ষণ না একজন শিক্ষার্থী নিজের ভাষায় ব্যাখ্যা করতে পারছে, ততক্ষণ বুঝতে হবে তার শিক্ষাটা অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে। তাই তথাকথিত জিপিএ-৫ এর পেছনে না ছুটে জানার আনন্দের জন্য পড়তে হবে। মুখস্থ করার এই প্রাচীন ও ক্ষতিকর অভ্যাসকে আজই ‘না’ বলতে হবে। যেকোনো বিষয় পড়ার সময় ‘কেন’, ‘কীভাবে’ এবং ‘কোথায়’-এই প্রশ্নগুলো করার অভ্যাস গড়তে হবে।
সংকট উত্তরণে করণীয়: সমাজ ও রাষ্ট্রের ভূমিকা
শিক্ষার্থীদের এই চারটি আত্মবিধ্বংসী বিষয় থেকে দূরে রাখতে কেবল তাদের উপদেশ দিলেই চলবে না, সমাজ ও রাষ্ট্রকেও কিছু দায়িত্ব নিতে হবে।
পারিবারিক সচেতনতা: মা-বাবাকে সন্তানের প্রথম শিক্ষক হতে হবে। সন্তান কার সাথে মিশছে, ইন্টারনেটে কী দেখছে, তার আচরণে কোনো পরিবর্তন আসছে কি না-এসব বিষয়ে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। পারিবারিক আড্ডায় সততা ও নৈতিকতার গল্প বলতে হবে।
শিক্ষাঙ্গনের পরিবেশ: শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে কেবল পরীক্ষা নেওয়ার কেন্দ্রে পরিণত না করে আনন্দময় শিখন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। নতুন শিক্ষাক্রমের সঠিক বাস্তবায়নের মাধ্যমে মুখস্থ নির্ভরতা কমিয়ে ব্যবহারিক ও অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিক্ষাকে উৎসাহিত করতে হবে। প্রতিটি ক্যাম্পাসকে 'লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস' এর আওতায় এনে আনন্দময় ক্যাম্পাস হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স: রাষ্ট্রকে মাদকের চোরাচালান বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। মাদক ব্যবসায়ী ও সরবরাহকারীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশেপাশে যেন কোনোভাবেই মাদকের বিস্তার না ঘটে, তা নিশ্চিত করতে হবে।
সুস্থ সংস্কৃতির বিকাশ: তরুণদের মাঠমুখী করতে হবে। প্রতিটি এলাকায় খেলার মাঠ, লাইব্রেরি এবং সাংস্কৃতিক কেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে, যেন তারা অবসর সময়ে সৃজনশীল কাজে ব্যস্ত থাকতে পারে।
একটি জাতির মেরুদণ্ড হলো তার তরুণ সমাজ। সেই মেরুদণ্ড যদি মিথ্যা, মাদক, বেয়াদবি আর না বুঝে মুখস্থ করার মতো ঘুণপোকায় আক্রান্ত হয়, তবে সেই জাতি কখনো পৃথিবীর বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে না। বাংলাদেশের তরুণদের মনে রাখতে হবে, পরিবর্তন অন্য কেউ এসে করে দিয়ে যাবে না, পরিবর্তন শুরু করতে হবে নিজের ভেতর থেকে।
আজকের শিক্ষার্থীরাই আগামী দিনের ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, শিক্ষক, রাজনীতিবিদ ও দেশের নীতিনির্ধারক। তাই নিজেদের এক একজন যোগ্য ও সংবেদনশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা তাদের নৈতিক দায়িত্ব। আসুন, বুক ফুলিয়ে, দৃঢ় চিত্তে, আত্মবিশ্বাসের সাথে মিথ্যা, মাদক, বেয়াদবি ও না বুঝে মুখস্থ করাকে ‘না’ বলি। আমাদের সন্তানেরা ভালো ছাত্রের পাশাপাশি ভালো মানুষ হয়ে গড়ে উঠুক। সততা, নৈতিকতা, আদব আর সৃজনশীলতার আলোয় আলোকিত হোক প্রিয় বাংলাদেশ।
মো. আবু ছালেক সেলিম রেজা সৌরভ: অধ্যক্ষ, সোনার বাংলা কলেজ, কুমিল্লা। সাবেক সিনেট সদস্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।

বাংলাদেশ আজ এক ঐতিহাসিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তরুণ প্রজন্ম এক নতুন দেশের স্বপ্ন দেখছে, যেখানে বৈষম্য থাকবে না, থাকবে মেধার মূল্যায়ন আর মানবিক মর্যাদা। কিন্তু একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্র গড়ে তোলার মূল চালিকাশক্তি হলো তার ছাত্রসমাজ। শিক্ষার্থীদের মেধা, সততা আর নৈতিকতার ওপরই নির্ভর করে আগামীর বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ।
দুর্ভাগ্যবশত, বর্তমান সময়ে আমাদের তরুণদের এক বড় অংশ এমন কিছু নেতিবাচক অভ্যাসের দিকে ঝুঁকে পড়ছে, যা তাদের অজান্তেই তাদের ভেতরকার সম্ভাবনাকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। জীবন গঠনে সততা, নিষ্ঠা ও কঠোর পরিশ্রমের কোনো বিকল্প নেই। একজন শিক্ষার্থীর প্রকৃত মানুষ হয়ে ওঠার পেছনে চারপাশের পরিবেশ যতটা দায়ী, তার চেয়েও বেশি দায়ী তার নিজস্ব কিছু সিদ্ধান্ত। আমাদের সমাজে এখন চারপাশের নানা অবক্ষয়ের ভিড়ে শিক্ষার্থীদের স্পষ্ট করে কিছু জিনিসকে ‘না’ বলতে শিখতে হবে। বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে আজ আমাদের তরুণ সমাজকে দৃঢ় কণ্ঠে বলতে হবে- ‘মিথ্যা, মাদক, বেয়াদবি ও না বুঝে মুখস্থ করাকে না বলি।’
মিথ্যাকে না বলি: সততার আলোয় জীবন গড়ি
আমাদের সমাজে একটি প্রবাদ প্রচলিত আছে- ‘একবার মিথ্যা বললে তা ঢাকতে আরও দশবার মিথ্যা বলতে হয়।’ মিথ্যা হলো সমস্ত পাপ এবং নৈতিক অবক্ষয়ের মূল চাবিকাঠি। একজন শিক্ষার্থীর জীবনে যখন মিথ্যার প্রবেশ ঘটে, তখন তার পুরো চরিত্রটিই কলুষিত হতে শুরু করে।
আজকের বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আমরা প্রায়ই দেখি, পরীক্ষার খাতায় নকল করা, অ্যাসাইনমেন্টে অন্যের লেখা চুরি করা (প্লেজিয়ারিজম), কিংবা ক্লাসে উপস্থিত না থেকে মিথ্যা অজুহাত দেওয়া- এসব ছোটখাটো মিথ্যা দিয়ে অনেক শিক্ষার্থীর প্রাতিষ্ঠানিক জীবন শুরু হয়। অনেক সময় বাবা-মা কিংবা শিক্ষকদের বকুনি থেকে বাঁচতে শিক্ষার্থীরা মিথ্যার আশ্রয় নেয়। কিন্তু এই সাময়িক পার পাওয়ার চেষ্টা ভবিষ্যতে কত বড় বিপদ ডেকে আনে, তা তারা টের পায় না।
শিক্ষাজীবনে যে ছেলে বা মেয়েটি অনায়াসে মিথ্যা বলতে পারে, কর্মজীবনে গিয়ে সে-ই দুর্নীতি, জালিয়াতি এবং প্রতারণার মতো বড় অপরাধের সাথে জড়িয়ে পড়ে। একটি দুর্নীতিমুক্ত, স্বচ্ছ বাংলাদেশ গড়তে হলে প্রথম প্রতিরোধটা আসতে হবে শিক্ষাঙ্গন থেকে। শিক্ষার্থীদের বুঝতে হবে, সত্য বলা সাময়িকভাবে কঠিন বা লজ্জাজনক মনে হতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে সত্যই মানুষকে সম্মানিত করে। পরীক্ষার খাতায় কম নম্বর পাওয়া লজ্জার কিছু নয়, কিন্তু অসদুপায় অবলম্বন করে বা মিথ্যা বলে জিপিএ-৫ পাওয়ার মধ্যে কোনো গৌরব নেই। তাই আজ থেকেই জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে মিথ্যাকে দৃঢ়ভাবে ‘না’ বলতে হবে এবং সততার চর্চা করতে হবে।
মাদককে না বলি: সুস্থ দেহে সুন্দর মন
বর্তমান বাংলাদেশের তরুণ সমাজের জন্য সবচেয়ে বড় এবং ভয়াবহ আতঙ্কের নাম হলো ‘মাদক’। এটি এমন এক নীরব ঘাতক, যা কেবল একজন শিক্ষার্থীর জীবনই ধ্বংস করে না, বরং একটি পুরো পরিবার এবং সমাজকে পঙ্গু করে দেয়। কৌতুহল, বন্ধুদের চাপ, পারিবারিক অশান্তি কিংবা সস্তা থ্রিল খোঁজার তাড়নায় অনেক শিক্ষার্থী মাদকের মরণফাঁদে পা বাড়ায়। ধূমপান থেকে শুরু করে গাঁজা, ফেন্সিডিল, ইয়াবা, আইস কিংবা নানা ধরনের মরণনেশায় জড়িয়ে পড়ছে আজকের স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।
মাদক একজন শিক্ষার্থীর চিন্তাভাবনা করার ক্ষমতা কেড়ে নেয়, তার মেধা ধ্বংস করে এবং তাকে চরম হতাশার দিকে ঠেলে দেয়। মাদকাসক্ত একজন শিক্ষার্থী কখনো পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে পারে না। নেশার টাকা জোগাড় করতে গিয়ে তারা জড়িয়ে পড়ে চুরি, ছিনতাই, কিশোর গ্যাং এবং নানা ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কিশোর গ্যাং কালচার এবং মাদকের বিস্তার এখন জাতীয় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক সম্ভাবনাময় মেধা অকালেই ঝরে যাচ্ছে শুধু এই মাদকের করাল গ্রাসে। শিক্ষার্থীদের বুঝতে হবে, মাদক কোনো স্মার্টনেস বা আধুনিকতার প্রতীক নয়; এটি হলো আত্মহত্যার নামান্তর। জীবন একটাই, আর একে সুন্দরভাবে বাঁচিয়ে রাখার জন্য সুস্থ শরীর ও সুস্থ মন জরুরি। তাই কোনো বন্ধু বা পরিবেশ যদি মাদকের দিকে প্ররোচিত করে, তবে তাকে সরাসরি এবং শক্তভাবে ‘না’ বলতে হবে। খেলার মাঠ, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে এবং সৃজনশীল চর্চায় যুক্ত হয়ে মাদককে সমাজ থেকে উপড়ে ফেলতে হবে।
বেয়াদবিকে না বলি: নৈতিকতা ও মূল্যবোধের শিক্ষা
শিক্ষার আসল উদ্দেশ্য কেবল সার্টিফিকেট অর্জন নয়, বরং একজন বিনয়ী ও মানবিক মানুষ হওয়া। আর বিনয়ের প্রথম প্রকাশ ঘটে আমাদের আচরণে। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের সমাজ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে গুরুজন, শিক্ষক এবং মা-বাবার প্রতি শিক্ষার্থীদের একাংশের আচরণের মধ্যে এক ধরনের অবাধ্যতা ও বেয়াদবি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার, সস্তা জনপ্রিয়তার লোভ এবং পশ্চিমা সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ তরুণদের একটা অংশকে ঔদ্ধত্যপূর্ণ করে তুলছে।
শিক্ষকেরা হলেন মানুষ গড়ার কারিগর। আমাদের সমাজ ও সংস্কৃতিতে শিক্ষকের স্থান সবসময় সবার ওপরে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য, ইদানীং শিক্ষকদের লাঞ্ছিত করা, তাদের সাথে উগ্র আচরণ করা কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের নিয়ে ট্রল করার মতো ঘটনাও আমাদের দেখতে হচ্ছে। মা-বাবার সাথে সামান্য বিষয়ে তর্ক করা বা তাদের আদেশ অমান্য করাকে অনেকে এখন ‘ব্যক্তিগত স্বাধীনতা’ বলে চালিয়ে দিতে চায়।
বিনয় ও শ্রদ্ধা ছাড়া কোনোদিন প্রকৃত জ্ঞান অর্জন করা যায় না। যে শিক্ষার্থী তার শিক্ষক বা মা-বাবাকে সম্মান করতে পারে না, সে কখনো সমাজের ভালো নাগরিক হতে পারে না। বড়দের সম্মান করা এবং ছোটদের স্নেহ করা আমাদের হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতির মূল ভিত্তি। বাকস্বাধীনতা বা অধিকার আদায়ের আন্দোলনের নামে প্রবীণ বা গুরুজনদের অপমান করার সংস্কৃতি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। শিক্ষার্থীদের মনে রাখতে হবে, অহংকার ও বেয়াদবি মানুষের পতনের মূল কারণ। তাই সমাজ থেকে উগ্রতা ও অহংকার দূর করে, বড়দের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ জাগিয়ে তুলতে হবে এবং সব ধরনের বেয়াদবিকে ‘না’ বলতে হবে।
না বুঝে মুখস্থ করাকে না বলি: সৃজনশীলতা ও প্রকৃত জ্ঞানার্জন
আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থার একটি বড় সংকট হলো ‘না বুঝে মুখস্থ করার প্রবণতা’। ছোটবেলা থেকেই আমাদের শিক্ষার্থীদের শেখানো হয় কীভাবে পরীক্ষায় বেশি নম্বর পাওয়া যায়, কিন্তু কীভাবে জ্ঞানকে বাস্তব জীবনে কাজে লাগানো যায়, তা অনেক সময়ই আড়ালে আবছা রয়ে যায়। জিপিএ-৫ পাওয়ার এক অন্ধ ইঁদুর দৌড়ে শামিল হয়ে শিক্ষার্থীরা গাইড বই, নোট খাতা কিংবা শিক্ষকের তৈরি করে দেওয়া নোট হুবহু মুখস্থ করে পরীক্ষার খাতায় উগরে দেয়।
না বুঝে মুখস্থ করা হলো একজন শিক্ষার্থীর প্রকৃত জ্ঞানার্জন এবং সৃজনশীলতার পথে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা। এর ফলে শিক্ষার্থীরা সাময়িকভাবে পরীক্ষায় ভালো ফল করতে পারে ঠিকই, কিন্তু তাদের চিন্তাশক্তি, বিশ্লেষণ ক্ষমতা এবং নতুন কিছু উদ্ভাবন করার যোগ্যতা পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায়। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে বা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যখন আমাদের শিক্ষার্থীরা পদার্পণ করে, তখন এই মুখস্থ বিদ্যার ফাঁকফোকরগুলো স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। তারা বাস্তব সমস্যার সমাধান করতে পারে না, কারণ তারা কখনো বিষয়টি অনুধাবন করতে শেখেনি।
বর্তমান পৃথিবী এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই যুগে কেবল মুখস্থ বিদ্যা দিয়ে টিকে থাকা অসম্ভব। এখন প্রয়োজন সমস্যা সমাধানের দক্ষতা (প্রবলেম সলভিং স্কিল) এবং সমালোচনাপ্রবণ চিন্তাভাবনা (ক্রিটিক্যাল থিংকিং)। একটি বিষয় যতক্ষণ না একজন শিক্ষার্থী নিজের ভাষায় ব্যাখ্যা করতে পারছে, ততক্ষণ বুঝতে হবে তার শিক্ষাটা অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে। তাই তথাকথিত জিপিএ-৫ এর পেছনে না ছুটে জানার আনন্দের জন্য পড়তে হবে। মুখস্থ করার এই প্রাচীন ও ক্ষতিকর অভ্যাসকে আজই ‘না’ বলতে হবে। যেকোনো বিষয় পড়ার সময় ‘কেন’, ‘কীভাবে’ এবং ‘কোথায়’-এই প্রশ্নগুলো করার অভ্যাস গড়তে হবে।
সংকট উত্তরণে করণীয়: সমাজ ও রাষ্ট্রের ভূমিকা
শিক্ষার্থীদের এই চারটি আত্মবিধ্বংসী বিষয় থেকে দূরে রাখতে কেবল তাদের উপদেশ দিলেই চলবে না, সমাজ ও রাষ্ট্রকেও কিছু দায়িত্ব নিতে হবে।
পারিবারিক সচেতনতা: মা-বাবাকে সন্তানের প্রথম শিক্ষক হতে হবে। সন্তান কার সাথে মিশছে, ইন্টারনেটে কী দেখছে, তার আচরণে কোনো পরিবর্তন আসছে কি না-এসব বিষয়ে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। পারিবারিক আড্ডায় সততা ও নৈতিকতার গল্প বলতে হবে।
শিক্ষাঙ্গনের পরিবেশ: শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে কেবল পরীক্ষা নেওয়ার কেন্দ্রে পরিণত না করে আনন্দময় শিখন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। নতুন শিক্ষাক্রমের সঠিক বাস্তবায়নের মাধ্যমে মুখস্থ নির্ভরতা কমিয়ে ব্যবহারিক ও অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিক্ষাকে উৎসাহিত করতে হবে। প্রতিটি ক্যাম্পাসকে 'লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস' এর আওতায় এনে আনন্দময় ক্যাম্পাস হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স: রাষ্ট্রকে মাদকের চোরাচালান বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। মাদক ব্যবসায়ী ও সরবরাহকারীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশেপাশে যেন কোনোভাবেই মাদকের বিস্তার না ঘটে, তা নিশ্চিত করতে হবে।
সুস্থ সংস্কৃতির বিকাশ: তরুণদের মাঠমুখী করতে হবে। প্রতিটি এলাকায় খেলার মাঠ, লাইব্রেরি এবং সাংস্কৃতিক কেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে, যেন তারা অবসর সময়ে সৃজনশীল কাজে ব্যস্ত থাকতে পারে।
একটি জাতির মেরুদণ্ড হলো তার তরুণ সমাজ। সেই মেরুদণ্ড যদি মিথ্যা, মাদক, বেয়াদবি আর না বুঝে মুখস্থ করার মতো ঘুণপোকায় আক্রান্ত হয়, তবে সেই জাতি কখনো পৃথিবীর বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে না। বাংলাদেশের তরুণদের মনে রাখতে হবে, পরিবর্তন অন্য কেউ এসে করে দিয়ে যাবে না, পরিবর্তন শুরু করতে হবে নিজের ভেতর থেকে।
আজকের শিক্ষার্থীরাই আগামী দিনের ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, শিক্ষক, রাজনীতিবিদ ও দেশের নীতিনির্ধারক। তাই নিজেদের এক একজন যোগ্য ও সংবেদনশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা তাদের নৈতিক দায়িত্ব। আসুন, বুক ফুলিয়ে, দৃঢ় চিত্তে, আত্মবিশ্বাসের সাথে মিথ্যা, মাদক, বেয়াদবি ও না বুঝে মুখস্থ করাকে ‘না’ বলি। আমাদের সন্তানেরা ভালো ছাত্রের পাশাপাশি ভালো মানুষ হয়ে গড়ে উঠুক। সততা, নৈতিকতা, আদব আর সৃজনশীলতার আলোয় আলোকিত হোক প্রিয় বাংলাদেশ।
মো. আবু ছালেক সেলিম রেজা সৌরভ: অধ্যক্ষ, সোনার বাংলা কলেজ, কুমিল্লা। সাবেক সিনেট সদস্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।