অধ্যাপক ডা. মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ

সিটি অব ব্যাংক এন্ড ট্যাংক। ব্যাংক আছে কিন্তু ট্যাংক কমে গেছে। যেভাবে পুকুর ভরাট হচ্ছে মনে হয় ধর্মসাগর, উজির দিঘী, নানুয়ার দিঘী আর রাণীর দিঘী ছাড়া কোন দিঘী, পুকুর বা জলাধার কুমিল্লা শহরে থাকবে না।
নাই মন্দির, নাই কোয়াটার নাম তার মুন্সেফ কোয়াটার, যেই এলাকায় নাই বাজার তার নাম কাপ্তানবাজার, নাই বাটপার নাই মন্ত্রী পাড়া নাম তার ভাটপাড়া, মিল্লা থাকে ছোট বড় মুরুব্বিরা নাম তার ছোটরা, ক্ষেতওয়ালী আর শীলবাড়ি নাম তার কালিয়াজুড়ী, যেই জমিদারের নাই পাইলাটুলী নাম তার মোগলটুলী, রাজা আছে যেই গঞ্জে তার নাম রাজগঞ্জ, পট্টি ধরে কাপড়ের দোকান নাম তার কাপড়িয়াপট্টি, সকল ব্যবসার আড়তের চক বসে গেছে যে বাজারে তার নাম চকবাজার, শহরের সবচেয়ে বড় কোনা নাম তার তেলিকোনা, পীর মাশায়েখ আর ফেরিওয়ালায় ভরপুর নাম তার মুরাদপুর, শিক্ষিত, নবাব-অর্ধশিক্ষিত আর জেন্টেল থা নাম হল চর্থা, শহরের মাঝে যেখানে আছে বিল তার নাম কাটাবিল, শহরে ঠাকুরদের থাকার পাড়া হচ্ছে ঠাকুরপাড়া, হাসপাতাল আর চিকিৎসক ভরপুর নাম হচ্ছে মৌন্নরপুর, শহরের ভিতরে গাও নাম হচ্ছে বাঁগিচাগাও-আরও অনেক বচনে সমৃদ্ধ ছিল কুমিল্লা শহর।
প্রায় বাড়িরই সঙ্গে ছিল একটি ছোট ডোবা বা জলাশয়। যাকে স্থানীয় ভাষায় বলত কোয়া। এ কুয়ার পাড়ে বিভিন্ন ফলফলাদি ও সবজির গাছ সুসজ্জিত ছিল প্রত্যেকটি বাড়ি। পাড়ার রাস্তার পাশে ছিল কাঁচা ড্রেন যা হাতের মাপে কমপক্ষে ৩ হাত। বাড়িতে সার্ভিস লেট্রিন ছিল যা রাত্রে লগরলক্ষী এসে ক্লিয়ার করে নিত। বাড়ির যে আঙিনাটি রাস্তামুখি থাকত তাতে ছিল ফুলবাগান বা ছোট ফলের গাছ কমপক্ষে পেঁপে গাছ, সবজির মধ্যে লাউ, চালকুমড়া বা মিষ্টি কুমড়া চাড়াত থাকতই। প্রায় বাড়িতেই একটি কাচারি ঘর থাকত যেখানে বাড়ির ও পাশের বাড়ির সবাইকে নিয়ে আড্ডা ও চায়ের আসর জমত। বাড়ির আঙিনা পরিষ্কার থাকত বা রাখার চেষ্টা করত সবাই, একটু আধটু কোয়ার মধ্যে ফেলে দিত।
চিমচাম পরিচ্ছন্ন ছিল প্রতিটি পাড়া মহল্লা। প্রতি পাড়াতেই কিছু খালি জায়গা থাকত যেখানে ধান বা অন্যান্য ফসলের চাষ হত। শীতের মৌসুমে ঐ সকল নারা ক্ষেতে ফুটবল বা ক্রিকেট খেলায় শিশু, কিশোর, যুবকরা প্রাণ মাতিয়ে রাখত। ফুটবল যোগাড় করতে অসুবিধা হলে যার বাড়িতে জাম্বুরা গাছ আছে তার বাড়ি থেকে জাম্বুরা এনে ফুটবল খেলার সাধ মেটাত।
শহরের মাঝখান দিয়ে বয়ে গেল গোমতী। শহরকে প্লাবনে আক্রান্ত করে জনদুর্ভোগ বাড়াত বলে '৬৫ সালের দিকে শহরের উত্তর দিক দিয়ে নতুন করে গোমতীকে প্রবাহিত করার ব্যবস্থা করা হল। তাই আসল গোমতীর জালিয়াপাড়া থেকে কাপ্তানবাজার পর্যন্ত হয়ে গেল একটি হ্রদ যা পুরাতন গোমতী নামে বর্তমানে পরিচিত। পুরাতন গোমতীর দুটি পাড় ছিল।
পাড়ে অনেক জমি ছিল যে জমিতে জালিয়াপাড়া অংশে হত আঁধসহ অন্যান্য ফসলের চাষ আর কাঞ্চন বাজার অংশে ছিল পেয়ারাবাগান। এ পেয়ারা বাগানের পেয়ারা খেত বাদুরতলার বাদুরেরা আর দিনে অবসরজনিত বাদুরতলার মেটারনিটি রোডের সামনে বিশাল বটবৃদ্ধে। আজকে পুরাতন গোমতীর দু'পাড় দখল করে ফেলেছে ভূমিদস্যুরা এবং ময়লা আবর্জনাও বর্জ্য ফেলে নদীটুকুও দখল করে খালে পরিণত করেছে।
যে নদীতে মানুষ সাঁতার কেটে, মাছ শিকার করে নগর জীবনের ব্যস্ততা থেকে অবসরানন্দ যোগাড় করে নিতেন সে নদীর পানিতে এখন পা ফেললে নির্ঘাত একটি চর্মরোগে আক্রান্ত হওয়া ছাড়া আর কোন গতি নাই। তখনকার আখক্ষেতে যে রক্ষী থাকতেন তিনি বলতেন আঁখ খেয়ে যাও কিন্তু নিয়ে যেও না। পেয়ারা বাগানের রক্ষীকে নামমাত্র মূল্যে পেয়ারা বিক্রি করতে দেখেছি। লুঙ্গিতে করে ১০/১২ পেয়ারা নিয়ে ৪/৫ টির কথা বলে নাম মাত্র দাম দিয়ে সবাই চলে যেত। এখন প্রত্যেকে পাড়া মহল্লার জলাধার ও কোয়া পুড়িয়ে এখানে হয়ে আছে ৯ তলা ১০ তলা ভবন যেখানে আগের পুরো পাড়া মহল্লায় যে অধিবাসীরা বাস করতেন এখন শুধু একটি ভবনেই সেই সংখ্যার লোক বসবাস করেন। পানীয় পানির ব্যবস্থা ডিপ টিউবওয়েল বসিয়ে করেছেন।
কিন্তু উচ্ছিষ্ট পানি বা সেনিটারি পাইপ লাইন খুলে দিয়েছেন পাশের ড্রেনের মধ্যে। এ ড্রেনের অবস্থা হচ্ছে রাস্তার চেয়ে উঁচা। এ ড্রেনের পানি রাস্তায় আসে যা পাড়িয়ে শহরবাসী ঘরে প্রবেশ করেন। শহরবাসীর পবিত্রতা এতে রক্ষণ হচ্ছে কিনা সকলের প্রশ্ন। আবার পায়ে করে অনেক রোগ জীবাণুও যে যাচ্ছে ঘরে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আবার যে ড্রেন ছিল তিনহাত তা পাকা করে হয়েছে একহাত। তাই সামান্য একটু বৃষ্টি হলেই জলজট লেগে থাকে। সারা শহরে ম্যানহাইট ড্রেন পিভিসি পাইপ বা কংক্রিটের পাইপ তৈরি করে ড্রেনেজ সিস্টেম তৈরি না করলে গোটা শহর জলজটে ভুগছে এবং ভুগবে, সঙ্গে রোগজীবাণু পায়ের সঙ্গে ঘরে ঢুকবে।
শহরের একটি সুবিধা হচ্ছে সকল ড্রেনেজ ওয়াটার গুংগাইজুরী খাল দিয়ে ডাকাতিয়ায় প্রবাহিত হয়। তাই অংগাইজুরী মুখে একটি ঊঞচ বসিয়ে দিলে সকল ড্রেনেজ ওয়াটার বিশুদ্ধ হয়ে ডাকাতিয়ায় প্রবাহিত হবে। এখনও ম্যানহাইট ড্রেনেজ একপাশে করার সুবর্ণসুযোগ রয়েছে। বর্তমান পাক্কা ড্রেনেজ শুধু একপাশ দিয়ে তৈরি হয়েছে যা এখন যেভাবে আছে একপাশে সেভাবে রেখে অন্য পাশে ম্যানহাইট ড্রেনেজ করা যেতে পারে।
সমগ্র শহরেই সেনিটেশন ব্যবস্থা নাই। একসময় আসবে যখন বড় বড় এপার্টমেন্টগুলোর সেনিটারি ট্যাংকি ময়লায় পূর্ণ হয়ে যাবে তখন গোটা শহর সেনিটারি ট্যাংকির ময়লায় সয়লাব হয়ে যাবে। এজন্যই বিশুদ্ধ পানি ও সেনিটারি কার্যাদি সম্পত্রের জন্য ডঅঝঅ স্থাপন করে তার সমাধান করতে হবে। মান্দাতার আমলের বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ঘোটা শহর বার্জোর ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে এবং বর্জ্যের স্তুপ বিবিরবাজার রোডের পাশে অবৈজ্ঞানিকভাবে রক্ষিত আছে। একটি আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা চালু করে বর্জ্যের জঞ্জাল দূরীভূত করতে নগরের সকল নাগরিকরা একমত।
নগরীতে যানজটের চাপে সবাই বিরক্ত। কিন্তু সমাধানের চিন্তা কেউ করে না আর সরকারিভাবেও কোনকিছুই কর্ণপাত কেউ করেন না। ফুটপাত ও ফুটপাত সংলগ্ন রাস্তায় বিভিন্ন প্রকারের হকাররা তাদের ব্যবসায় ব্যস্ত। পৌরসভার অনেক স্থান রয়েছে সেগুলোতে নীচতলা খালি রেখে মাল্টিস্টোরিড মার্কেট করে ফুটপাতের ব্যবসায়ীদের সংস্থান করে রাস্তাকে যানজটমুক্ত করা যায়। রাস্তার পাশে ও ফুটপাতে দোকানদারি হকারি করার বিরুদ্ধে কড়া আইন করে জরিমানা চালু হোক। যেখানে সম্ভব সেখানে রাস্তায় ডিভাইডার চালু হলেও যানজট কিছুটা নিয়ন্ত্রণ হবে।
সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে শহরের অলিতে গলিতে যে বিল্ডিং নির্মাণ করে তাতে বেইসমেন্ট তৈরি করে গাড়ির পার্কিং তৈরি করতে হবে। রাজগঞ্জ বাজার, রাণীর বাজারসহ সকল বাজারগুলো নীচতলা পার্কিং এর জন্য খালি রেখে মাল্টিস্টোরিড বিল্ডিং এ বাজার চালু করলে জটলা সৃষ্টির সকল যানবাহন নীচতলায় রেষ্ট নিয়ে যানভাট কমাতে পারে। ট্রাফিক সিষ্টেম ইলেক্ট্রনিক পদ্ধতিতে চালু করতে হবে এবং অমান্যকারীদের সাজা নির্ধারণ করতে হবে।
কান্দিরপাড়ের দুটি চৌমুহনীতে, রাজগঞ্জ চৌমুহনীতে, ওভারহের ব্রীজ চালু করে রাঙাপারের ব্যবস্থা করলে ঐ সকল স্থানের যানজট নিয়ন্ত্রণ অনেকটা সহজ হয়ে যাবে। পুরাতন গোমতীর দুপার দখলমুক্ত করে দুপারে ওয়াকওয়ে সৃষ্টি করে ওয়াকওয়ের দুধারে সবুজায়ন ও বাগান করে দিলে শহরের মানুষ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে প্রাতঃকালীন ও বৈকালিক ভ্রমণ সম্পন্ন করতে পারত। পুরাতন গোমতীর বুকচিরে অনেকগুলি রাস্তা হয়েছে। এ রাজাসমূহ ভেঙ্গে নদীর শুভপুর থেকে কাপ্তানবাজার পর্যন্ত ইঞ্জিনবোট চালু করলে মানুষ সেখানে ভ্রমণপিপাসাও মিটাতে পারত।
পুরাতন গোমতীর দুপারে শাপলার চাষ করে এবং আবর্জনা পরিষ্কার করে একটি নৈসর্গিক সৌন্দর্য আনয়ন করা যেতে পারে। দুপার কংক্রিট দিয়ে বাঁধাই করে পুরাতন গোমতীতে মাছের চাষ করলে অর্থনীতিতে কিছুটা অবদান রাখতে পারত। দুপারের ভূমি থেকোদের নদী দখলের পায়তারায় নদীটি এখন খালে পরিণত হয়েছে এবং সবার সেনিটারি পাইপটি নদীবক্ষে ফেলে দেয়ার কারণে নদীর পানি এখন বিষাক্ত রূপ ধারণ করেছে।
পুরাতন গোমতীকে উন্নয়নের জন্য একটি বিরাট অংকের অর্থ এলজিইডি মন্ত্রণালয় থেকে বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল কিন্তু তা কোন কারণে বন্ধ হল তা কুমিল্লাবাসী জানে না। নির্বাচন এসেছে যিনি নির্বাচিত হবেন তিনি আর কিছু না করুক পুরাতন গোমতী উন্নয়নে সকল প্রকার সহযোগিতা ও পরিকল্পনা মাফিক সকল কর্ম বাস্তবায়নে নগরবাসীকে ধন্য করবেন বলে সকলের আশাবাদ।
খেলাধূলায় এ শহরের খেলোয়াররা জাতীয় প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে আমাদের মুখ্যেজ্জল করত। তাই সকল এলাকায় অর্থাৎ প্রতিটি ওয়ার্ডে খেলাধূলার আয়োজন, পুরোনো ক্লাবগুলোকে পূর্ণজাগরণসহ ভুল স্পোর্টস চালু করা এখন যুগের দাবী। গাছ কেটে বিল্ডিং নির্মান করে কেউ গাছ লাগানোর কথা চিন্তা করে না। বিল্ডিং কোড কেউ মানছে না এমনকি সিটি কর্পোরেশন কর্তৃপক্ষও এ ব্যাপারে উদাসীন।
রাস্তার দুধায় সবুজায়ন করা হোক, বিল্ডিং এর ফাঁকে ফাঁকে বৃক্ষায়িত হোক, ছাদ কৃষি করে বাজার থেকে সবজি ও ফল কেনা কিছুটা হলেও কমানো হোক। শুধু বিল্ডিং করাই উন্নয়ন নয় সাথে প্রচুর অক্সিজেন সরবরাহ নিশ্চিত করে পরিচ্ছন্ন পরিবেশ রক্ষার নিশ্চয়তা বিধান করতে হবে। যেখানেই খালি জায়গা পাবেন সেখানেই একটি গাছ লাগিয়ে দেন না হয় রাসায়নিক কারখানা থেকে অক্সিজেন কিনে পরিবেশে বিলিয়ে দিয়ে জীবন ও জীববৈচিত্র রক্ষা করতে হবে। আমরা চাই ক্লিন এন্ড গ্রীণ কুমিল্লা শহর আমরা চাই ক্লিন এন্ড গ্রীণ কুমিল্লা শহর যে শহর হবে যানজট, জলজট, ময়লা-আবর্জনা ও বর্জ্যমুক্ত।
অধ্যাপক ডা. মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ
সাবেক অধ্যক্ষ, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ

সিটি অব ব্যাংক এন্ড ট্যাংক। ব্যাংক আছে কিন্তু ট্যাংক কমে গেছে। যেভাবে পুকুর ভরাট হচ্ছে মনে হয় ধর্মসাগর, উজির দিঘী, নানুয়ার দিঘী আর রাণীর দিঘী ছাড়া কোন দিঘী, পুকুর বা জলাধার কুমিল্লা শহরে থাকবে না।
নাই মন্দির, নাই কোয়াটার নাম তার মুন্সেফ কোয়াটার, যেই এলাকায় নাই বাজার তার নাম কাপ্তানবাজার, নাই বাটপার নাই মন্ত্রী পাড়া নাম তার ভাটপাড়া, মিল্লা থাকে ছোট বড় মুরুব্বিরা নাম তার ছোটরা, ক্ষেতওয়ালী আর শীলবাড়ি নাম তার কালিয়াজুড়ী, যেই জমিদারের নাই পাইলাটুলী নাম তার মোগলটুলী, রাজা আছে যেই গঞ্জে তার নাম রাজগঞ্জ, পট্টি ধরে কাপড়ের দোকান নাম তার কাপড়িয়াপট্টি, সকল ব্যবসার আড়তের চক বসে গেছে যে বাজারে তার নাম চকবাজার, শহরের সবচেয়ে বড় কোনা নাম তার তেলিকোনা, পীর মাশায়েখ আর ফেরিওয়ালায় ভরপুর নাম তার মুরাদপুর, শিক্ষিত, নবাব-অর্ধশিক্ষিত আর জেন্টেল থা নাম হল চর্থা, শহরের মাঝে যেখানে আছে বিল তার নাম কাটাবিল, শহরে ঠাকুরদের থাকার পাড়া হচ্ছে ঠাকুরপাড়া, হাসপাতাল আর চিকিৎসক ভরপুর নাম হচ্ছে মৌন্নরপুর, শহরের ভিতরে গাও নাম হচ্ছে বাঁগিচাগাও-আরও অনেক বচনে সমৃদ্ধ ছিল কুমিল্লা শহর।
প্রায় বাড়িরই সঙ্গে ছিল একটি ছোট ডোবা বা জলাশয়। যাকে স্থানীয় ভাষায় বলত কোয়া। এ কুয়ার পাড়ে বিভিন্ন ফলফলাদি ও সবজির গাছ সুসজ্জিত ছিল প্রত্যেকটি বাড়ি। পাড়ার রাস্তার পাশে ছিল কাঁচা ড্রেন যা হাতের মাপে কমপক্ষে ৩ হাত। বাড়িতে সার্ভিস লেট্রিন ছিল যা রাত্রে লগরলক্ষী এসে ক্লিয়ার করে নিত। বাড়ির যে আঙিনাটি রাস্তামুখি থাকত তাতে ছিল ফুলবাগান বা ছোট ফলের গাছ কমপক্ষে পেঁপে গাছ, সবজির মধ্যে লাউ, চালকুমড়া বা মিষ্টি কুমড়া চাড়াত থাকতই। প্রায় বাড়িতেই একটি কাচারি ঘর থাকত যেখানে বাড়ির ও পাশের বাড়ির সবাইকে নিয়ে আড্ডা ও চায়ের আসর জমত। বাড়ির আঙিনা পরিষ্কার থাকত বা রাখার চেষ্টা করত সবাই, একটু আধটু কোয়ার মধ্যে ফেলে দিত।
চিমচাম পরিচ্ছন্ন ছিল প্রতিটি পাড়া মহল্লা। প্রতি পাড়াতেই কিছু খালি জায়গা থাকত যেখানে ধান বা অন্যান্য ফসলের চাষ হত। শীতের মৌসুমে ঐ সকল নারা ক্ষেতে ফুটবল বা ক্রিকেট খেলায় শিশু, কিশোর, যুবকরা প্রাণ মাতিয়ে রাখত। ফুটবল যোগাড় করতে অসুবিধা হলে যার বাড়িতে জাম্বুরা গাছ আছে তার বাড়ি থেকে জাম্বুরা এনে ফুটবল খেলার সাধ মেটাত।
শহরের মাঝখান দিয়ে বয়ে গেল গোমতী। শহরকে প্লাবনে আক্রান্ত করে জনদুর্ভোগ বাড়াত বলে '৬৫ সালের দিকে শহরের উত্তর দিক দিয়ে নতুন করে গোমতীকে প্রবাহিত করার ব্যবস্থা করা হল। তাই আসল গোমতীর জালিয়াপাড়া থেকে কাপ্তানবাজার পর্যন্ত হয়ে গেল একটি হ্রদ যা পুরাতন গোমতী নামে বর্তমানে পরিচিত। পুরাতন গোমতীর দুটি পাড় ছিল।
পাড়ে অনেক জমি ছিল যে জমিতে জালিয়াপাড়া অংশে হত আঁধসহ অন্যান্য ফসলের চাষ আর কাঞ্চন বাজার অংশে ছিল পেয়ারাবাগান। এ পেয়ারা বাগানের পেয়ারা খেত বাদুরতলার বাদুরেরা আর দিনে অবসরজনিত বাদুরতলার মেটারনিটি রোডের সামনে বিশাল বটবৃদ্ধে। আজকে পুরাতন গোমতীর দু'পাড় দখল করে ফেলেছে ভূমিদস্যুরা এবং ময়লা আবর্জনাও বর্জ্য ফেলে নদীটুকুও দখল করে খালে পরিণত করেছে।
যে নদীতে মানুষ সাঁতার কেটে, মাছ শিকার করে নগর জীবনের ব্যস্ততা থেকে অবসরানন্দ যোগাড় করে নিতেন সে নদীর পানিতে এখন পা ফেললে নির্ঘাত একটি চর্মরোগে আক্রান্ত হওয়া ছাড়া আর কোন গতি নাই। তখনকার আখক্ষেতে যে রক্ষী থাকতেন তিনি বলতেন আঁখ খেয়ে যাও কিন্তু নিয়ে যেও না। পেয়ারা বাগানের রক্ষীকে নামমাত্র মূল্যে পেয়ারা বিক্রি করতে দেখেছি। লুঙ্গিতে করে ১০/১২ পেয়ারা নিয়ে ৪/৫ টির কথা বলে নাম মাত্র দাম দিয়ে সবাই চলে যেত। এখন প্রত্যেকে পাড়া মহল্লার জলাধার ও কোয়া পুড়িয়ে এখানে হয়ে আছে ৯ তলা ১০ তলা ভবন যেখানে আগের পুরো পাড়া মহল্লায় যে অধিবাসীরা বাস করতেন এখন শুধু একটি ভবনেই সেই সংখ্যার লোক বসবাস করেন। পানীয় পানির ব্যবস্থা ডিপ টিউবওয়েল বসিয়ে করেছেন।
কিন্তু উচ্ছিষ্ট পানি বা সেনিটারি পাইপ লাইন খুলে দিয়েছেন পাশের ড্রেনের মধ্যে। এ ড্রেনের অবস্থা হচ্ছে রাস্তার চেয়ে উঁচা। এ ড্রেনের পানি রাস্তায় আসে যা পাড়িয়ে শহরবাসী ঘরে প্রবেশ করেন। শহরবাসীর পবিত্রতা এতে রক্ষণ হচ্ছে কিনা সকলের প্রশ্ন। আবার পায়ে করে অনেক রোগ জীবাণুও যে যাচ্ছে ঘরে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আবার যে ড্রেন ছিল তিনহাত তা পাকা করে হয়েছে একহাত। তাই সামান্য একটু বৃষ্টি হলেই জলজট লেগে থাকে। সারা শহরে ম্যানহাইট ড্রেন পিভিসি পাইপ বা কংক্রিটের পাইপ তৈরি করে ড্রেনেজ সিস্টেম তৈরি না করলে গোটা শহর জলজটে ভুগছে এবং ভুগবে, সঙ্গে রোগজীবাণু পায়ের সঙ্গে ঘরে ঢুকবে।
শহরের একটি সুবিধা হচ্ছে সকল ড্রেনেজ ওয়াটার গুংগাইজুরী খাল দিয়ে ডাকাতিয়ায় প্রবাহিত হয়। তাই অংগাইজুরী মুখে একটি ঊঞচ বসিয়ে দিলে সকল ড্রেনেজ ওয়াটার বিশুদ্ধ হয়ে ডাকাতিয়ায় প্রবাহিত হবে। এখনও ম্যানহাইট ড্রেনেজ একপাশে করার সুবর্ণসুযোগ রয়েছে। বর্তমান পাক্কা ড্রেনেজ শুধু একপাশ দিয়ে তৈরি হয়েছে যা এখন যেভাবে আছে একপাশে সেভাবে রেখে অন্য পাশে ম্যানহাইট ড্রেনেজ করা যেতে পারে।
সমগ্র শহরেই সেনিটেশন ব্যবস্থা নাই। একসময় আসবে যখন বড় বড় এপার্টমেন্টগুলোর সেনিটারি ট্যাংকি ময়লায় পূর্ণ হয়ে যাবে তখন গোটা শহর সেনিটারি ট্যাংকির ময়লায় সয়লাব হয়ে যাবে। এজন্যই বিশুদ্ধ পানি ও সেনিটারি কার্যাদি সম্পত্রের জন্য ডঅঝঅ স্থাপন করে তার সমাধান করতে হবে। মান্দাতার আমলের বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ঘোটা শহর বার্জোর ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে এবং বর্জ্যের স্তুপ বিবিরবাজার রোডের পাশে অবৈজ্ঞানিকভাবে রক্ষিত আছে। একটি আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা চালু করে বর্জ্যের জঞ্জাল দূরীভূত করতে নগরের সকল নাগরিকরা একমত।
নগরীতে যানজটের চাপে সবাই বিরক্ত। কিন্তু সমাধানের চিন্তা কেউ করে না আর সরকারিভাবেও কোনকিছুই কর্ণপাত কেউ করেন না। ফুটপাত ও ফুটপাত সংলগ্ন রাস্তায় বিভিন্ন প্রকারের হকাররা তাদের ব্যবসায় ব্যস্ত। পৌরসভার অনেক স্থান রয়েছে সেগুলোতে নীচতলা খালি রেখে মাল্টিস্টোরিড মার্কেট করে ফুটপাতের ব্যবসায়ীদের সংস্থান করে রাস্তাকে যানজটমুক্ত করা যায়। রাস্তার পাশে ও ফুটপাতে দোকানদারি হকারি করার বিরুদ্ধে কড়া আইন করে জরিমানা চালু হোক। যেখানে সম্ভব সেখানে রাস্তায় ডিভাইডার চালু হলেও যানজট কিছুটা নিয়ন্ত্রণ হবে।
সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে শহরের অলিতে গলিতে যে বিল্ডিং নির্মাণ করে তাতে বেইসমেন্ট তৈরি করে গাড়ির পার্কিং তৈরি করতে হবে। রাজগঞ্জ বাজার, রাণীর বাজারসহ সকল বাজারগুলো নীচতলা পার্কিং এর জন্য খালি রেখে মাল্টিস্টোরিড বিল্ডিং এ বাজার চালু করলে জটলা সৃষ্টির সকল যানবাহন নীচতলায় রেষ্ট নিয়ে যানভাট কমাতে পারে। ট্রাফিক সিষ্টেম ইলেক্ট্রনিক পদ্ধতিতে চালু করতে হবে এবং অমান্যকারীদের সাজা নির্ধারণ করতে হবে।
কান্দিরপাড়ের দুটি চৌমুহনীতে, রাজগঞ্জ চৌমুহনীতে, ওভারহের ব্রীজ চালু করে রাঙাপারের ব্যবস্থা করলে ঐ সকল স্থানের যানজট নিয়ন্ত্রণ অনেকটা সহজ হয়ে যাবে। পুরাতন গোমতীর দুপার দখলমুক্ত করে দুপারে ওয়াকওয়ে সৃষ্টি করে ওয়াকওয়ের দুধারে সবুজায়ন ও বাগান করে দিলে শহরের মানুষ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে প্রাতঃকালীন ও বৈকালিক ভ্রমণ সম্পন্ন করতে পারত। পুরাতন গোমতীর বুকচিরে অনেকগুলি রাস্তা হয়েছে। এ রাজাসমূহ ভেঙ্গে নদীর শুভপুর থেকে কাপ্তানবাজার পর্যন্ত ইঞ্জিনবোট চালু করলে মানুষ সেখানে ভ্রমণপিপাসাও মিটাতে পারত।
পুরাতন গোমতীর দুপারে শাপলার চাষ করে এবং আবর্জনা পরিষ্কার করে একটি নৈসর্গিক সৌন্দর্য আনয়ন করা যেতে পারে। দুপার কংক্রিট দিয়ে বাঁধাই করে পুরাতন গোমতীতে মাছের চাষ করলে অর্থনীতিতে কিছুটা অবদান রাখতে পারত। দুপারের ভূমি থেকোদের নদী দখলের পায়তারায় নদীটি এখন খালে পরিণত হয়েছে এবং সবার সেনিটারি পাইপটি নদীবক্ষে ফেলে দেয়ার কারণে নদীর পানি এখন বিষাক্ত রূপ ধারণ করেছে।
পুরাতন গোমতীকে উন্নয়নের জন্য একটি বিরাট অংকের অর্থ এলজিইডি মন্ত্রণালয় থেকে বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল কিন্তু তা কোন কারণে বন্ধ হল তা কুমিল্লাবাসী জানে না। নির্বাচন এসেছে যিনি নির্বাচিত হবেন তিনি আর কিছু না করুক পুরাতন গোমতী উন্নয়নে সকল প্রকার সহযোগিতা ও পরিকল্পনা মাফিক সকল কর্ম বাস্তবায়নে নগরবাসীকে ধন্য করবেন বলে সকলের আশাবাদ।
খেলাধূলায় এ শহরের খেলোয়াররা জাতীয় প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে আমাদের মুখ্যেজ্জল করত। তাই সকল এলাকায় অর্থাৎ প্রতিটি ওয়ার্ডে খেলাধূলার আয়োজন, পুরোনো ক্লাবগুলোকে পূর্ণজাগরণসহ ভুল স্পোর্টস চালু করা এখন যুগের দাবী। গাছ কেটে বিল্ডিং নির্মান করে কেউ গাছ লাগানোর কথা চিন্তা করে না। বিল্ডিং কোড কেউ মানছে না এমনকি সিটি কর্পোরেশন কর্তৃপক্ষও এ ব্যাপারে উদাসীন।
রাস্তার দুধায় সবুজায়ন করা হোক, বিল্ডিং এর ফাঁকে ফাঁকে বৃক্ষায়িত হোক, ছাদ কৃষি করে বাজার থেকে সবজি ও ফল কেনা কিছুটা হলেও কমানো হোক। শুধু বিল্ডিং করাই উন্নয়ন নয় সাথে প্রচুর অক্সিজেন সরবরাহ নিশ্চিত করে পরিচ্ছন্ন পরিবেশ রক্ষার নিশ্চয়তা বিধান করতে হবে। যেখানেই খালি জায়গা পাবেন সেখানেই একটি গাছ লাগিয়ে দেন না হয় রাসায়নিক কারখানা থেকে অক্সিজেন কিনে পরিবেশে বিলিয়ে দিয়ে জীবন ও জীববৈচিত্র রক্ষা করতে হবে। আমরা চাই ক্লিন এন্ড গ্রীণ কুমিল্লা শহর আমরা চাই ক্লিন এন্ড গ্রীণ কুমিল্লা শহর যে শহর হবে যানজট, জলজট, ময়লা-আবর্জনা ও বর্জ্যমুক্ত।
অধ্যাপক ডা. মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ
সাবেক অধ্যক্ষ, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ