শ্রদ্ধাঞ্জলি

নির্ভরতার প্রতীক অধ্যাপক শেখর রঞ্জন সাহা একজন নিভৃতচারী নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক

অধ্যাপক ডা. দীপঙ্কর লোধ
Thumbnail image

এসএসসি পাস করার পর কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজে ভর্তি হই। আত্মীয়তার সূত্রধরে স্যারের সাথে পরিচয়। দক্ষ ও অভিজ্ঞ শিক্ষকের অভাবে যখন অনেক প্রতিষ্ঠান হোঁচট খাচ্ছিল সেই সময়েই অধ্যাপক শেখর রঞ্জন সাহা কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজের ছাত্রীদের কাছে নির্ভরতার প্রতীক হয়ে ওঠেন। মেধায়, ব্যক্তিত্বে ও আভিজাত্যে তিনি অনেকের কাছে অনুকরণীয় ও অনুসরণীয় হয়ে ওঠেন। আমিও মাঝে মাঝে তাঁর নিকট উদ্ভিদবিদ্যা বুঝার জন্য যেতাম। কি সহজ সরল ও সাবলীলভাবে পড়াতেন। পড়ানোর পাশাপাশি বিভিন্ন রকম দিকনির্দেশনা দিতেন।

শিক্ষকতা জীবনে তিনি দীর্ঘদিন কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজ ও কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজে অধ্যাপনা করেন এবং কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবেও কর্মরত ছিলেন।

তিনি শিক্ষকতার পাশাপাশি বিভিন্ন বিষয়ে প্রচুর পড়াশোনা ও লেখালেখি করতেন। তিনি ছিলেন একটি চলন্ত বিশ্বকোষ। অধ্যাপক সাহা দীর্ঘদিন ধরে উদ্ভিদবিদ্যা শিক্ষার সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। তিনি শিক্ষার্থীদের জন্য সহজ ভাষায় বহু গুরুত্বপূর্ণ পাঠ্য ও ব্যবহারিক বই রচনা করেছেন যা দেশের অসংখ্য শিক্ষার্থীদের জানার পথকে সুগম করেছে।

উদ্ভিদবিজ্ঞান বিষয়কে সহজ ও সাবলীলভাবে উপস্থাপনের জন্য তাঁর অবদান অবিস্মরণীয়। সেইজন্য অধ্যাপক শেখর রঞ্জন সাহা বাংলাদেশের একজন প্রথিতযশা উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিষয়ক পাঠ্য বই রচয়িতা এবং বিজ্ঞানভিত্তিক জনপ্রিয় লেখক হিসেবে পরিচিত। বিশেষ করে অনার্স পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য ব্যবহারিক ও তাত্তি¡ক বই লেখার মাধ্যমে বিশেষ পরিচিতি লাভ করেছেন। তাঁর রচিত উল্লেখযোগ্য বই গুলির মধ্যে রয়েছে উচ্চতর ব্যবহারিক উদ্ভিদবিজ্ঞান, জীবনের গল্প, বিবর্তনের গল্প। তাঁর রচিত প্লান্ট ফিজিওলজি এন্ড বায়োকেমিস্ট্রি বইটি এ বিষয়ের ছাত্র ও শিক্ষকদের নিকট মহামূল্যবান। এছাড়া তিনি আত্মজীবনী, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গল্প, শিশুতোষ বিভিন্ন গল্প এবং সায়েন্স ফিকশন ও সাহিত্যের অনেক বই রচনা করেছেন। এর মাধ্যমে তাহার বহুমুখী প্রতিভার স্বাক্ষর পাওয়া যায়।

বিজ্ঞান বিষয়ক পাঠচক্রের তিনি অন্যতম আলোচক ও আকর্ষণ ছিলেন। তথ্যবহুল, যুক্তি নির্ভর ও হৃদয়গ্রাহী আলোচনা করতেন।

তিনি বিজ্ঞানকে সহজ ভাষায় শিক্ষার্থীদের কাছে উপস্থাপন করার চেষ্টা করতেন। বিশেষত জীববিজ্ঞান ও বিবর্তনের বিষয়ে তাহার লেখা অত্যন্ত জনপ্রিয়। বিবর্তনের গল্প বইয়ের ভ‚মিকায় তিনি জটিল জীববিজ্ঞানের ধারণা গুলো সহজ ভাবে তরুণ পাঠকদের কাছে তুলে ধরেন।

বিজ্ঞান চর্চার পাশাপাশি তাঁর সাহিত্য, খেলাধুলা, ধর্মীয় ও সমসাময়িক বিষয়ে অগাধ জ্ঞান ছিল। এর ফলে যে কোন বয়সের যে কোন পেশার লোকদের সাথে জ্ঞানগর্ভ আলোচনা করতে পারতেন।

ছোটবেলা কেটেছে যশোরে। ফলে শুদ্ধ চলিত ভাষায় কথা বলতেন। রুচিশীল পোশাক, মার্জিত আচরণ ও সুন্দর শব্দ চয়ন তাঁকে সবার কাছে আকর্ষণীয় করে তুলত। কাউকে উদ্বুদ্ধ করার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অতুলনীয়।

তিনি শুধু একজন শিক্ষকই ছিলেন না, ছিলেন একজন মানবিক ও প্রেরণাদায়ী ব্যক্তিত্ব। তাঁর প্রজ্ঞা ও আন্তরিকতার জন্য ছাত্র-ছাত্রী ও সহকর্মীদের হৃদয়ে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। বিজ্ঞান চর্চা ও শিক্ষার প্রসারে তাহার নিরলস প্রচেষ্টা আগামী প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে।

সুযোগ পেলেই আমি তাহার সাহচর্য লাভের জন্য ছুটে যেতাম। বিভিন্ন বিষয়ে জানতে চাইতেন, উৎসাহ দিতেন। নতুন কিছু করার, এগিয়ে যাওয়ার আগ্রহ তৈরি করে দিতে তাহার জুড়ি মেলা ভার।

তাঁর মৃত্যুতে দেশের শিক্ষা ও বুদ্ধি ভিত্তিক অঙ্গনে এক অপরিণীয় শূন্যতা সৃষ্টি হল। সকল যোগ্যতা থাকা সত্তে¡ও নিভ্তচারী এই গুণী শিক্ষক ও বিজ্ঞান বিষয়ক লেখক কোন রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি না পেলেও আমার মত হাজার হাজার ছাত্র ছাত্রীর মাঝে তিনি চির অ¤øান হয়ে থাকবেন। আমি তাঁর বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করছি এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি।

অধ্যাপক ডা. দীপঙ্কর লোধ: বিভাগীয় প্রধান (রাইনোলজি), জাতীয় নাক কান গলা ইনস্টিটিউট , তেজগাঁও, ঢাকা।

বিষয়:

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

সম্পর্কিত