ড. কামরুন নাহার শীলা

অপ্রতিমের সাথে মেসেঞ্জারে কথা বলার এই আমার প্রথম আর শেষ চেষ্টা-- গত পরশু ভোরে। বাংলা সহকর্মী গ্রুপে সুমনা ম্যাডাম জানিয়েছিলেন, অপ্রতিমের মেসেঞ্জার অ্যাক্টিভ দেখাচ্ছে। তখনও জানতাম না সে নিজের ফোনটি বাসায় রেখে গেছে, জানতাম না এই জীবনে আর অপ্রতিম আর আমাকে কল করবে না।
ওর সাথে শেষ দেখা হয়েছিল কোটবাড়ি, গন্ধমতির মোড়ে। আমি রিকশা থেকে নেমে ভ্যান থেকে কাঁচাবাজার সদাই করছিলাম। পেছন থেকে সে হঠাৎ ডেকে ওঠে, 'আন্টি!'
তাকিয়ে দেখি এক ঝালমুড়িওয়ালার সামনে দাঁড়িয়ে, ঠোঙ্গা থেকে ঝালমুড়ি মুখে পুড়ছে। বললাম, 'তুমি ঝালমুড়ি খাচ্ছ, নাহিদা ম্যাডাম তোমাকে ঠ্যাঙাবে।'
মুচকি হেসে বলেছিল, 'আম্মুর জন্যও নিয়ে যাচ্ছি।'
ছোট্ট অপ্রতিম আমাদের চোখের সামনেই বড় হয়েছে, ম্যাডাম যখন জয়েন ওর বয়স সম্ভবত বছর দুই। শিক্ষার্থীদের কোলে-কোলে ঘুরে বেড়াত অপ্রতিম। ম্যাডামের ক্লাসের ফাঁকে মেয়েদের কেউকেউ হলে নিয়ে খাইয়ে-দাইয়ে দিব্যি তাকে ঘুমও পাড়িয়ে দিত। ধীরে ধীরে অপ্রতিম বড় হতে লাগল। বিশেষ দিন ছাড়া আর আসে না বিভাগে। পরে পরে বিশেষ দিনেও আসা প্রায় বন্ধ-- যেমনটা করেছে আমার ছেলে মেঘ-- বাচ্চারা একটা সময় মায়ের আঁচল ছেড়ে বাইরে বেরুনের পথ চিনে যায়, তাদের নিজেদের জগৎ তৈরি হয়ে যায়।
ছবি তুলতে গিয়ে আমাদের অপ্রতিম মায়ের আঁচল, নিজের জগৎ ছাড়িয়ে আরও বহুদূর চলে গেছে; হারিয়ে গেছে চিরতরে। তাকে খুঁজেছে শিক্ষক-শিক্ষার্থী আর নাহিদা ম্যাডামের প্রতিবেশীরা। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আর শিক্ষক-শিক্ষার্থীর উদ্যোগে সিসিটিভির ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে, সেটা বিশ্লেষণ করে তার কাছে যেতে যেতে পরদিন বেলা ১১ টা। ততক্ষণে অপ্রতিম আর নেই, ২১ ঘন্টা ধরে পড়েছিল তার রক্তাক্ত দেহ। খবর পেয়ে পুলিশ এসেছে বিকেল ৩ টায় (এক শিক্ষার্থী এই বিলম্বের জবাবদিহিতা চাইছে এমন একটা ভিডিও দেখলাম)। তার মরদেহ খুঁজে পাওয়ার পর আরও চারঘন্টা সেখানে সে পড়েছিল সম্ভবত পুলিশ সুপারের অপেক্ষায়, এরপর সুরতহাল শেষে পোস্ট মর্টেমের জন্য যেতে যেতে বিকেল পাঁচটা কি তারও বেশি।
ধন্যি দেশের ধন্যি প্রশাসন!
পুলিশের পোশাক বদলেছে, এবার পোশাকের নিচের অধিকাংশ মানুষকেও বদলে ফেলার সময় এসেছে বোধ করি। কিন্তু কে নেবে এই উদ্যোগ, যারা নতুনভাবে আসবে তাদের ক্রিয়াকর্ম দেখে হয়তো বলতে হবে, 'আগেই তো ভালো ছিলাম।'
গন্ধমতির মোড়টার আবার হয়তো দাঁড়াব, আবার হয়তো সেই ঝালমুড়িওয়াকে বিকিকিনি করতে দেখব। আমার মনে হবে তেরো বছরের এক কিশোর ঝালমুড়ির ঠোঙা হাতে পিলে চমকে দেবার মতো ডাকছে, 'আন্টি!'
পেছন ফিরে দেখব -- কেউ নেই...
অপ্রতিমের নাম আর তার মায়ের কপালের টিপ দেখে যারা তার হত্যাকাÐকে জায়েজ করার চেষ্টা করছেন-- মাদ্রাসার ধর্ষণ-বলাৎকার আর খুনের বেলায় কোনো যুক্তি খাটান আপনারা? আপনার মূল্যবোধের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা আছে, আমাদের মূল্যবোধকে শ্রদ্ধা করতে না পারেন, গায়ে পড়ে লাগতে আসবেন না।
আর যারা প্যারেন্টিং নিয়ে লম্বা বক্তৃতা মারছেন, নিজের সন্তানের জগৎটার খোঁজ নিন একবার। মোবাইলের লক খুলে একটু চেক করুন। দোয়া করি, এই খোঁজে আপনার মাথায় যেন বাজ না পড়ে।
(ড. কামরুন নাহার আজ সোমবার বিকেল পাঁচটা ৫০ মিনিটে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাঁর শীলা বৃষ্টি আইডি থেকে এ লেখাটি দেন)
ড. কামরুন নাহার শীলা: সহযোগী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়

অপ্রতিমের সাথে মেসেঞ্জারে কথা বলার এই আমার প্রথম আর শেষ চেষ্টা-- গত পরশু ভোরে। বাংলা সহকর্মী গ্রুপে সুমনা ম্যাডাম জানিয়েছিলেন, অপ্রতিমের মেসেঞ্জার অ্যাক্টিভ দেখাচ্ছে। তখনও জানতাম না সে নিজের ফোনটি বাসায় রেখে গেছে, জানতাম না এই জীবনে আর অপ্রতিম আর আমাকে কল করবে না।
ওর সাথে শেষ দেখা হয়েছিল কোটবাড়ি, গন্ধমতির মোড়ে। আমি রিকশা থেকে নেমে ভ্যান থেকে কাঁচাবাজার সদাই করছিলাম। পেছন থেকে সে হঠাৎ ডেকে ওঠে, 'আন্টি!'
তাকিয়ে দেখি এক ঝালমুড়িওয়ালার সামনে দাঁড়িয়ে, ঠোঙ্গা থেকে ঝালমুড়ি মুখে পুড়ছে। বললাম, 'তুমি ঝালমুড়ি খাচ্ছ, নাহিদা ম্যাডাম তোমাকে ঠ্যাঙাবে।'
মুচকি হেসে বলেছিল, 'আম্মুর জন্যও নিয়ে যাচ্ছি।'
ছোট্ট অপ্রতিম আমাদের চোখের সামনেই বড় হয়েছে, ম্যাডাম যখন জয়েন ওর বয়স সম্ভবত বছর দুই। শিক্ষার্থীদের কোলে-কোলে ঘুরে বেড়াত অপ্রতিম। ম্যাডামের ক্লাসের ফাঁকে মেয়েদের কেউকেউ হলে নিয়ে খাইয়ে-দাইয়ে দিব্যি তাকে ঘুমও পাড়িয়ে দিত। ধীরে ধীরে অপ্রতিম বড় হতে লাগল। বিশেষ দিন ছাড়া আর আসে না বিভাগে। পরে পরে বিশেষ দিনেও আসা প্রায় বন্ধ-- যেমনটা করেছে আমার ছেলে মেঘ-- বাচ্চারা একটা সময় মায়ের আঁচল ছেড়ে বাইরে বেরুনের পথ চিনে যায়, তাদের নিজেদের জগৎ তৈরি হয়ে যায়।
ছবি তুলতে গিয়ে আমাদের অপ্রতিম মায়ের আঁচল, নিজের জগৎ ছাড়িয়ে আরও বহুদূর চলে গেছে; হারিয়ে গেছে চিরতরে। তাকে খুঁজেছে শিক্ষক-শিক্ষার্থী আর নাহিদা ম্যাডামের প্রতিবেশীরা। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আর শিক্ষক-শিক্ষার্থীর উদ্যোগে সিসিটিভির ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে, সেটা বিশ্লেষণ করে তার কাছে যেতে যেতে পরদিন বেলা ১১ টা। ততক্ষণে অপ্রতিম আর নেই, ২১ ঘন্টা ধরে পড়েছিল তার রক্তাক্ত দেহ। খবর পেয়ে পুলিশ এসেছে বিকেল ৩ টায় (এক শিক্ষার্থী এই বিলম্বের জবাবদিহিতা চাইছে এমন একটা ভিডিও দেখলাম)। তার মরদেহ খুঁজে পাওয়ার পর আরও চারঘন্টা সেখানে সে পড়েছিল সম্ভবত পুলিশ সুপারের অপেক্ষায়, এরপর সুরতহাল শেষে পোস্ট মর্টেমের জন্য যেতে যেতে বিকেল পাঁচটা কি তারও বেশি।
ধন্যি দেশের ধন্যি প্রশাসন!
পুলিশের পোশাক বদলেছে, এবার পোশাকের নিচের অধিকাংশ মানুষকেও বদলে ফেলার সময় এসেছে বোধ করি। কিন্তু কে নেবে এই উদ্যোগ, যারা নতুনভাবে আসবে তাদের ক্রিয়াকর্ম দেখে হয়তো বলতে হবে, 'আগেই তো ভালো ছিলাম।'
গন্ধমতির মোড়টার আবার হয়তো দাঁড়াব, আবার হয়তো সেই ঝালমুড়িওয়াকে বিকিকিনি করতে দেখব। আমার মনে হবে তেরো বছরের এক কিশোর ঝালমুড়ির ঠোঙা হাতে পিলে চমকে দেবার মতো ডাকছে, 'আন্টি!'
পেছন ফিরে দেখব -- কেউ নেই...
অপ্রতিমের নাম আর তার মায়ের কপালের টিপ দেখে যারা তার হত্যাকাÐকে জায়েজ করার চেষ্টা করছেন-- মাদ্রাসার ধর্ষণ-বলাৎকার আর খুনের বেলায় কোনো যুক্তি খাটান আপনারা? আপনার মূল্যবোধের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা আছে, আমাদের মূল্যবোধকে শ্রদ্ধা করতে না পারেন, গায়ে পড়ে লাগতে আসবেন না।
আর যারা প্যারেন্টিং নিয়ে লম্বা বক্তৃতা মারছেন, নিজের সন্তানের জগৎটার খোঁজ নিন একবার। মোবাইলের লক খুলে একটু চেক করুন। দোয়া করি, এই খোঁজে আপনার মাথায় যেন বাজ না পড়ে।
(ড. কামরুন নাহার আজ সোমবার বিকেল পাঁচটা ৫০ মিনিটে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাঁর শীলা বৃষ্টি আইডি থেকে এ লেখাটি দেন)
ড. কামরুন নাহার শীলা: সহযোগী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়