মোহাম্মদ এমদাদুল হক

একটি শ্রেণিকক্ষ—যেখানে শিক্ষার্থীদের হাতে থাকার কথা বই, খাতা ও কলম; যেখানে প্রতিধ্বনিত হওয়ার কথা পাঠদানের শব্দ, জ্ঞানচর্চার আলোচনা আর স্বপ্ন গড়ার প্রত্যয়। অথচ সেই শ্রেণিকক্ষেই যখন কয়েকজন শিক্ষার্থী পড়াশোনার পরিবর্তে টিকটক ভিডিও তৈরি করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়, তখন বিষয়টি আর নিছক বিনোদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এটি হয়ে ওঠে আমাদের পারিবারিক সচেতনতা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশ, প্রযুক্তি ব্যবহারের সংস্কৃতি এবং শিশু-কিশোরদের নিরাপত্তা নিয়ে গভীরভাবে ভাবার একটি উপলক্ষ।
সম্প্রতি একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে কয়েকজন শিক্ষার্থীর টিকটক ভিডিও ধারণ করে ফেসবুকে প্রকাশের ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ঘটনাটি ভাইরাল হওয়ার পর বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের দায়িত্ব ও তদারকি নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। এতে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়। কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীদের শনাক্ত করে তাদের অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলার উদ্যোগ নিয়েছে। নিঃসন্দেহে এটি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ। তবে প্রশ্ন হলো, অভিভাবকদের ডেকে সতর্ক করা কিংবা শিক্ষার্থীদের তালিকা তৈরি করলেই কি সমস্যার সমাধান হবে? নাকি এর পেছনের কারণগুলো চিহ্নিত করে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন?
আমার বিবেচনায়, এ ঘটনায় কাউকে এককভাবে দায়ী করে দায়িত্ব শেষ করার সুযোগ নেই। বরং প্রয়োজন ঘটনার যথাযথ মূল্যায়ন, শিক্ষার্থীদের মানসিক অবস্থা বোঝা এবং পরিবার, বিদ্যালয় ও সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগ।
কৈশোর এমন একটি সময়, যখন একজন শিক্ষার্থীর চিন্তাভাবনা, আবেগ, ব্যক্তিত্ব ও সামাজিক পরিচয় দ্রুত বিকশিত হতে থাকে। এ বয়সে বন্ধুদের স্বীকৃতি পাওয়া, সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাইক-কমেন্ট অর্জনের প্রতি আকর্ষণ তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। অনেক সময় অনলাইনে প্রশংসাসূচক মন্তব্য কিংবা মিষ্টি কথায় তারা সহজেই প্রভাবিত হয়। কিন্তু অনলাইন আচরণের দীর্ঘমেয়াদি পরিণতি অনুধাবন করার মতো অভিজ্ঞতা ও বিচারবোধ সবার মধ্যে তখনো গড়ে ওঠে না।
ফলে মুহূর্তের আনন্দ, বন্ধুদের উৎসাহ কিংবা ভাইরাল হওয়ার আকাঙ্ক্ষায় তারা এমন কিছু করে বসতে পারে, যার প্রভাব পরবর্তী সময়ে তাদের শিক্ষা, সামাজিক সম্পর্ক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর পড়তে পারে।
তবে শিক্ষার্থীদের এ ধরনের আচরণকে সমর্থন করার সুযোগ নেই। শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের পরিবেশ নষ্ট করা, বিদ্যালয়ের নিয়ম অমান্য করা কিংবা অনুমতি ছাড়া ভিডিও ধারণ ও প্রকাশ করা দায়িত্বশীল আচরণ নয়। একই সঙ্গে এটিও মনে রাখতে হবে, কৈশোরের একটি ভুল যেন কোনো শিক্ষার্থীর স্থায়ী পরিচয় হয়ে না দাঁড়ায়। ভুলের জন্য সংশোধন প্রয়োজন, অপমান নয়; জবাবদিহি প্রয়োজন, কিন্তু তা হতে হবে বয়সোপযোগী ও মানবিক।
বর্তমান সময়ে স্মার্টফোন যোগাযোগ, তথ্য অনুসন্ধান ও শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। কিন্তু এর অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার শিশু-কিশোরদের সামনে এমন এক বিশাল জগৎ খুলে দেয়, যেখানে শিক্ষণীয় বিষয়বস্তুর পাশাপাশি রয়েছে প্রতারণা, সাইবার হয়রানি, অনলাইন প্রলোভন, ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহার এবং নানা ধরনের ঝুঁকি।
দুঃখজনক হলেও সত্য, অনেক পরিবারের কাছে সন্তানের হাতে দামি স্মার্টফোন তুলে দেওয়া আধুনিকতা, সামর্থ্য কিংবা সামাজিক মর্যাদার প্রতীক হয়ে উঠেছে। কিন্তু একটি ফোন কিনে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সন্তানের ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়ে যায় না। বরং তখন থেকেই শুরু হয় অভিভাবকের আরও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
সন্তান কী দেখছে, কী ধরনের ভিডিও তৈরি করছে, কার সঙ্গে যোগাযোগ করছে, অপরিচিত কারও সঙ্গে বন্ধুত্ব করছে কি না এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের ব্যক্তিগত তথ্য কতটা প্রকাশ করছে—এসব বিষয়ে অভিভাবকদের সচেতন থাকা জরুরি। তবে সচেতনতার অর্থ সার্বক্ষণিক সন্দেহ কিংবা গোপনে নজরদারি নয়; বরং বয়সোপযোগী নিয়ম, খোলামেলা আলোচনা, আস্থা এবং দায়িত্বশীল প্রযুক্তি ব্যবহারের অভ্যাস গড়ে তোলা।
পড়াশোনা ও জরুরি যোগাযোগের প্রয়োজনে ফোন ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। তবে বয়স, প্রয়োজন ও পরিস্থিতি বিবেচনা না করে ব্যক্তিগত স্মার্টফোন এবং অবাধ ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া কতটা যুক্তিসংগত, তা অভিভাবকদের ভেবে দেখা উচিত। সন্তানের হাতে ফোন থাকলেই তাকে যেকোনো সময়, যেকোনো উদ্দেশ্যে ইন্টারনেট ব্যবহারের স্বাধীনতা দিতে হবে—এমন কোনো কথা নেই।
সন্তানকে শুধু বকাঝকা করে কিংবা ফোন কেড়ে নিয়ে দায়িত্ব শেষ করা যায় না। বরং তার সঙ্গে এমন বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে, যাতে সে নিজের ভুল, ভয়, দ্বিধা কিংবা মানসিক চাপের কথা নির্দ্বিধায় অভিভাবকদের জানাতে পারে।
পরিবারে যোগাযোগের অভাব, অতিরিক্ত শাসন কিংবা অভিভাবকের সঙ্গে সন্তানের মানসিক দূরত্ব তৈরি হলে সে অনেক সময় নিজের সমস্যার সমাধান খুঁজতে বাইরের মানুষের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। অনলাইনে কেউ মিষ্টি কথা বলে কাছে টানলে কিংবা বন্ধুত্বের আড়ালে প্রভাব বিস্তার করলে তখন ঝুঁকি আরও বেড়ে যেতে পারে।
তাই সন্তান কার সঙ্গে মিশছে, কী নিয়ে ভাবছে, পড়াশোনায় মনোযোগ হারাচ্ছে কি না, কোনো বিষয়ে মানসিক চাপে রয়েছে কি না—এসব জানতে হবে ভালোবাসা, ধৈর্য ও আস্থার মাধ্যমে। সন্তানকে বোঝাতে হবে, অনলাইনে জনপ্রিয়তা অর্জনের চেয়ে বাস্তব জীবনে জ্ঞান, দক্ষতা, নৈতিকতা ও সুন্দর ব্যক্তিত্ব গড়ে তোলা অনেক বেশি মূল্যবান।
বিদ্যালয় কেবল পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান দেওয়ার প্রতিষ্ঠান নয়; এটি শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা, শৃঙ্খলা, দায়িত্ববোধ ও মানবিক মূল্যবোধ গড়ে তোলারও গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। তাই শ্রেণিকক্ষে এমন ঘটনা ঘটলে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নেই। একই সঙ্গে কোনো একটি ঘটনা ঘটলেই সমগ্র বিদ্যালয় কিংবা সব শিক্ষককে দায়ী করাও ন্যায়সংগত নয়।
শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের পাঠদান, শৃঙ্খলা রক্ষা ও নৈতিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। কিন্তু একটি বিদ্যালয়ের প্রতিটি শিক্ষার্থীর প্রতিটি মুহূর্তের আচরণ সব সময় সরাসরি পর্যবেক্ষণ করা বাস্তবসম্মত নয়। ফলে দায়িত্ব নির্ধারণ করতে হবে ঘটনার প্রকৃতি, তদারকির ব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট পরিস্থিতি বিবেচনা করে।
বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের উচিত শ্রেণিকক্ষে ও বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে স্মার্টফোন ব্যবহারের সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী তা কার্যকর করা। পাঠদানের সময় ব্যক্তিগত ফোন ব্যবহার নিরুৎসাহিত করা, অনুমতি ছাড়া ভিডিও ধারণ ও প্রকাশ নিষিদ্ধ করা, ফাঁকা শ্রেণিকক্ষের তদারকি জোরদার করা এবং শিক্ষার্থীদের ডিজিটাল শিষ্টাচার ও অনলাইন নিরাপত্তা বিষয়ে নিয়মিত সচেতনতামূলক আলোচনা আয়োজন করা যেতে পারে।
প্রয়োজনে শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত স্মার্টফোন বিদ্যালয়ে আনার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা যেতে পারে। তবে জরুরি যোগাযোগ, বিশেষ শিক্ষাগত প্রয়োজন এবং বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় একটি স্পষ্ট ও ন্যায়সংগত নীতিমালা থাকা উচিত। শুধু নিষেধাজ্ঞা নয়, নিয়মের উদ্দেশ্য বোঝানো এবং তা ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়ন করাও জরুরি।
ঘটনার সঙ্গে জড়িত শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের সঙ্গে আলোচনা করা অবশ্যই প্রয়োজন। তবে এর পরবর্তী ধাপ হিসেবে তাদের আচরণের পেছনের কারণ বোঝার চেষ্টা করতে হবে। তারা কি নিছক বিনোদনের জন্য ভিডিও তৈরি করেছে, বন্ধুদের প্রভাবে এমন করেছে, নাকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয় হওয়ার আকাঙ্ক্ষা থেকে এ কাজ করেছে—এসব বিষয় বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে কথা বলা, প্রয়োজন অনুযায়ী কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করা এবং তাদের অনলাইন আচরণের সম্ভাব্য পরিণতি বুঝিয়ে বলা যেতে পারে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে যেন তারা এ ধরনের কাজে জড়িত না হয়, সে জন্য পরিবার ও বিদ্যালয়কে সমন্বিতভাবে পাশে দাঁড়াতে হবে।
শিক্ষার্থীদের মনে রাখতে হবে, একটি ভিডিও মুহূর্তের আনন্দ দিতে পারে; কিন্তু তার ডিজিটাল ছাপ দীর্ঘদিন থেকে যেতে পারে। অন্যদিকে অভিভাবক ও শিক্ষকদেরও মনে রাখতে হবে, কিশোর বয়সের ভুল সংশোধনের সুযোগ দিলে তা ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষণীয় অভিজ্ঞতায় পরিণত হতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো ঘটনা ছড়িয়ে পড়লে অনেকেই দ্রুত মন্তব্য করতে, ভিডিও শেয়ার করতে কিংবা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয় প্রকাশ করতে আগ্রহী হন। কিন্তু কোনো শিক্ষার্থীকে নিয়ে সমালোচনা করার আগে তার বয়স, মানসিক অবস্থা এবং ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করা প্রয়োজন।
বিশেষ করে অপ্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার্থীদের নাম, ছবি, পরিচয় কিংবা ব্যক্তিগত তথ্য অপ্রয়োজনে প্রকাশ করা তাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও মানসিক ক্ষতির কারণ হতে পারে। একটি ভুলের কারণে যেন কোনো শিক্ষার্থী অনলাইন অপমান, বিদ্রূপ কিংবা সামাজিক বর্জনের শিকার না হয়, সে বিষয়ে সবার সংবেদনশীল থাকা উচিত।
কোনো ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর সেটি বারবার শেয়ার করা, শিক্ষার্থীদের নিয়ে অপমানজনক মন্তব্য করা কিংবা যাচাই না করে বিভিন্ন তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া সমস্যার সমাধান করে না; বরং ক্ষতি আরও বাড়াতে পারে। তাই দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে আমাদের উচিত ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা করা, যাচাই করা তথ্যের বাইরে কিছু প্রচার না করা এবং সংশোধনের উদ্যোগকে উৎসাহিত করা।
ফেসবুকে কোনো ঘটনা নিয়ে লেখা, মন্তব্য করা কিংবা ক্ষোভ প্রকাশ করা সহজ। কিন্তু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি, শিক্ষকদের সম্মান এবং শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের ওপর সেই লেখার প্রভাব কতটা পড়তে পারে, তা বিবেচনা করা জরুরি।
বিদ্যালয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলে গঠনমূলক সমালোচনা অবশ্যই প্রয়োজন। শিক্ষকদের দায়িত্ব, বিদ্যালয়ের তদারকি কিংবা কর্তৃপক্ষের পদক্ষেপে কোনো ঘাটতি থাকলে তা তথ্যভিত্তিকভাবে তুলে ধরা যেতে পারে। কিন্তু যাচাই-বাছাই ছাড়া দোষারোপ, অপমানজনক মন্তব্য কিংবা অতিরঞ্জিত প্রচার কোনো স্থায়ী সমাধান এনে দেয় না।
একটি বিষয় স্পষ্টভাবে মনে রাখা দরকার—বিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের ভুল পথে পরিচালিত করার প্রতিষ্ঠান নয়। বরং শিক্ষার্থীরা কখনো বিদ্যালয়ের নিয়ম, শিক্ষকদের নির্দেশনা কিংবা পরিবারের প্রত্যাশা উপেক্ষা করে ভুল সিদ্ধান্ত নিতে পারে। আবার এমন পরিস্থিতি প্রতিরোধে বিদ্যালয়েরও দায়িত্ব ও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তাই একপক্ষকে সম্পূর্ণ দায়মুক্ত কিংবা অন্যপক্ষকে এককভাবে দায়ী না করে, ঘটনার নিরপেক্ষ মূল্যায়ন এবং সংশোধনমূলক উদ্যোগই হওয়া উচিত আমাদের লক্ষ্য।
শিশু-কিশোরদের নিরাপদ ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে কয়েকটি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
প্রথমত, অভিভাবকদের সন্তানের বয়স ও প্রয়োজন বিবেচনা করে স্মার্টফোন ব্যবহারের সুযোগ দিতে হবে এবং দায়িত্বশীল ইন্টারনেট ব্যবহারের শিক্ষা দিতে হবে।
দ্বিতীয়ত, বিদ্যালয়ে স্মার্টফোন ব্যবহারের সুস্পষ্ট নীতিমালা, কার্যকর তদারকি এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা বিষয়ে নিয়মিত সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালু করতে হবে।
তৃতীয়ত, অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় জড়িত শিক্ষার্থীদের শুধু শাস্তি না দিয়ে তাদের আচরণের কারণ বুঝতে হবে এবং প্রয়োজনে কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে।
চতুর্থত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের অপ্রাপ্তবয়স্কদের পরিচয় ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষায় সচেতন হতে হবে। কোনো ভিডিও ভাইরাল হলে সেটিকে আরও ছড়িয়ে না দিয়ে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে।
পঞ্চমত, শিক্ষার্থীদের বোঝাতে হবে—লাইক, কমেন্ট কিংবা ভাইরাল হওয়ার সাময়িক আনন্দের চেয়ে শিক্ষাগ্রহণ, নৈতিকতা, দক্ষতা অর্জন এবং সুন্দর ভবিষ্যৎ নির্মাণ অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ক্লাসরুমে টিকটক ভিডিও তৈরি ও প্রকাশের ঘটনাটি আমাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। এটি শুধু কয়েকজন শিক্ষার্থীর আচরণের প্রশ্ন নয়; এটি আমাদের অভিভাবকত্ব, শিক্ষাব্যবস্থা, প্রযুক্তি ব্যবহারের সংস্কৃতি এবং সামাজিক দায়িত্ববোধেরও পরীক্ষা।
সন্তানের হাতে স্মার্টফোন তুলে দেওয়ার আগে আমাদের ভাবতে হবে, তাকে কি আমরা শুধু একটি যন্ত্র দিচ্ছি, নাকি সেই যন্ত্রের দায়িত্বশীল ব্যবহার শেখানোর প্রস্তুতিও নিচ্ছি? বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের শৃঙ্খলা নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাদের মানসিক বিকাশ, নৈতিক শিক্ষা ও ডিজিটাল নিরাপত্তাকে আমরা কতটা গুরুত্ব দিচ্ছি? আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো ভুলের খবর ছড়িয়ে পড়লে আমরা কি সমাধানের পথ খুঁজি, নাকি দোষারোপের প্রতিযোগিতায় মেতে উঠি?
আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি ভাইরাল ভিডিও কোনো শিক্ষার্থীর পুরো জীবনকে সংজ্ঞায়িত করতে পারে না। কৈশোরের ভুলকে সংশোধনের সুযোগে রূপান্তরিত করাই হতে পারে আমাদের সবচেয়ে বড় সাফল্য। শিক্ষকদের দায়িত্বশীলতা, অভিভাবকদের সচেতনতা, বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপ এবং সমাজের মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি—এই চারটির সমন্বয়েই গড়ে উঠতে পারে নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ।
শিশু-কিশোরদের সুরক্ষা কোনো একক ব্যক্তি, পরিবার কিংবা বিদ্যালয়ের দায়িত্ব নয়—এ দায়িত্ব আমাদের সবার। তাই দোষারোপ নয়, চাই দায়িত্বশীলতা; অপমান নয়, চাই সংশোধন; নিষেধাজ্ঞা নয় শুধু, চাই সচেতনতা ও সহমর্মিতা। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি প্রজন্ম গড়ে তোলা, যারা প্রযুক্তি ব্যবহার করবে জ্ঞান অর্জনে, সৃজনশীলতা বিকাশে এবং সুন্দর ভবিষ্যৎ নির্মাণে—নিজের কিংবা অন্যের ক্ষতির কারণ হতে নয়।
মোহাম্মদ এমদাদুল হক : ডেপুটি রেজিস্ট্রার (জনসংযোগ) , কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়।

একটি শ্রেণিকক্ষ—যেখানে শিক্ষার্থীদের হাতে থাকার কথা বই, খাতা ও কলম; যেখানে প্রতিধ্বনিত হওয়ার কথা পাঠদানের শব্দ, জ্ঞানচর্চার আলোচনা আর স্বপ্ন গড়ার প্রত্যয়। অথচ সেই শ্রেণিকক্ষেই যখন কয়েকজন শিক্ষার্থী পড়াশোনার পরিবর্তে টিকটক ভিডিও তৈরি করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়, তখন বিষয়টি আর নিছক বিনোদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এটি হয়ে ওঠে আমাদের পারিবারিক সচেতনতা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশ, প্রযুক্তি ব্যবহারের সংস্কৃতি এবং শিশু-কিশোরদের নিরাপত্তা নিয়ে গভীরভাবে ভাবার একটি উপলক্ষ।
সম্প্রতি একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে কয়েকজন শিক্ষার্থীর টিকটক ভিডিও ধারণ করে ফেসবুকে প্রকাশের ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ঘটনাটি ভাইরাল হওয়ার পর বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের দায়িত্ব ও তদারকি নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। এতে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়। কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীদের শনাক্ত করে তাদের অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলার উদ্যোগ নিয়েছে। নিঃসন্দেহে এটি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ। তবে প্রশ্ন হলো, অভিভাবকদের ডেকে সতর্ক করা কিংবা শিক্ষার্থীদের তালিকা তৈরি করলেই কি সমস্যার সমাধান হবে? নাকি এর পেছনের কারণগুলো চিহ্নিত করে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন?
আমার বিবেচনায়, এ ঘটনায় কাউকে এককভাবে দায়ী করে দায়িত্ব শেষ করার সুযোগ নেই। বরং প্রয়োজন ঘটনার যথাযথ মূল্যায়ন, শিক্ষার্থীদের মানসিক অবস্থা বোঝা এবং পরিবার, বিদ্যালয় ও সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগ।
কৈশোর এমন একটি সময়, যখন একজন শিক্ষার্থীর চিন্তাভাবনা, আবেগ, ব্যক্তিত্ব ও সামাজিক পরিচয় দ্রুত বিকশিত হতে থাকে। এ বয়সে বন্ধুদের স্বীকৃতি পাওয়া, সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাইক-কমেন্ট অর্জনের প্রতি আকর্ষণ তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। অনেক সময় অনলাইনে প্রশংসাসূচক মন্তব্য কিংবা মিষ্টি কথায় তারা সহজেই প্রভাবিত হয়। কিন্তু অনলাইন আচরণের দীর্ঘমেয়াদি পরিণতি অনুধাবন করার মতো অভিজ্ঞতা ও বিচারবোধ সবার মধ্যে তখনো গড়ে ওঠে না।
ফলে মুহূর্তের আনন্দ, বন্ধুদের উৎসাহ কিংবা ভাইরাল হওয়ার আকাঙ্ক্ষায় তারা এমন কিছু করে বসতে পারে, যার প্রভাব পরবর্তী সময়ে তাদের শিক্ষা, সামাজিক সম্পর্ক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর পড়তে পারে।
তবে শিক্ষার্থীদের এ ধরনের আচরণকে সমর্থন করার সুযোগ নেই। শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের পরিবেশ নষ্ট করা, বিদ্যালয়ের নিয়ম অমান্য করা কিংবা অনুমতি ছাড়া ভিডিও ধারণ ও প্রকাশ করা দায়িত্বশীল আচরণ নয়। একই সঙ্গে এটিও মনে রাখতে হবে, কৈশোরের একটি ভুল যেন কোনো শিক্ষার্থীর স্থায়ী পরিচয় হয়ে না দাঁড়ায়। ভুলের জন্য সংশোধন প্রয়োজন, অপমান নয়; জবাবদিহি প্রয়োজন, কিন্তু তা হতে হবে বয়সোপযোগী ও মানবিক।
বর্তমান সময়ে স্মার্টফোন যোগাযোগ, তথ্য অনুসন্ধান ও শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। কিন্তু এর অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার শিশু-কিশোরদের সামনে এমন এক বিশাল জগৎ খুলে দেয়, যেখানে শিক্ষণীয় বিষয়বস্তুর পাশাপাশি রয়েছে প্রতারণা, সাইবার হয়রানি, অনলাইন প্রলোভন, ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহার এবং নানা ধরনের ঝুঁকি।
দুঃখজনক হলেও সত্য, অনেক পরিবারের কাছে সন্তানের হাতে দামি স্মার্টফোন তুলে দেওয়া আধুনিকতা, সামর্থ্য কিংবা সামাজিক মর্যাদার প্রতীক হয়ে উঠেছে। কিন্তু একটি ফোন কিনে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সন্তানের ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়ে যায় না। বরং তখন থেকেই শুরু হয় অভিভাবকের আরও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
সন্তান কী দেখছে, কী ধরনের ভিডিও তৈরি করছে, কার সঙ্গে যোগাযোগ করছে, অপরিচিত কারও সঙ্গে বন্ধুত্ব করছে কি না এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের ব্যক্তিগত তথ্য কতটা প্রকাশ করছে—এসব বিষয়ে অভিভাবকদের সচেতন থাকা জরুরি। তবে সচেতনতার অর্থ সার্বক্ষণিক সন্দেহ কিংবা গোপনে নজরদারি নয়; বরং বয়সোপযোগী নিয়ম, খোলামেলা আলোচনা, আস্থা এবং দায়িত্বশীল প্রযুক্তি ব্যবহারের অভ্যাস গড়ে তোলা।
পড়াশোনা ও জরুরি যোগাযোগের প্রয়োজনে ফোন ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। তবে বয়স, প্রয়োজন ও পরিস্থিতি বিবেচনা না করে ব্যক্তিগত স্মার্টফোন এবং অবাধ ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া কতটা যুক্তিসংগত, তা অভিভাবকদের ভেবে দেখা উচিত। সন্তানের হাতে ফোন থাকলেই তাকে যেকোনো সময়, যেকোনো উদ্দেশ্যে ইন্টারনেট ব্যবহারের স্বাধীনতা দিতে হবে—এমন কোনো কথা নেই।
সন্তানকে শুধু বকাঝকা করে কিংবা ফোন কেড়ে নিয়ে দায়িত্ব শেষ করা যায় না। বরং তার সঙ্গে এমন বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে, যাতে সে নিজের ভুল, ভয়, দ্বিধা কিংবা মানসিক চাপের কথা নির্দ্বিধায় অভিভাবকদের জানাতে পারে।
পরিবারে যোগাযোগের অভাব, অতিরিক্ত শাসন কিংবা অভিভাবকের সঙ্গে সন্তানের মানসিক দূরত্ব তৈরি হলে সে অনেক সময় নিজের সমস্যার সমাধান খুঁজতে বাইরের মানুষের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। অনলাইনে কেউ মিষ্টি কথা বলে কাছে টানলে কিংবা বন্ধুত্বের আড়ালে প্রভাব বিস্তার করলে তখন ঝুঁকি আরও বেড়ে যেতে পারে।
তাই সন্তান কার সঙ্গে মিশছে, কী নিয়ে ভাবছে, পড়াশোনায় মনোযোগ হারাচ্ছে কি না, কোনো বিষয়ে মানসিক চাপে রয়েছে কি না—এসব জানতে হবে ভালোবাসা, ধৈর্য ও আস্থার মাধ্যমে। সন্তানকে বোঝাতে হবে, অনলাইনে জনপ্রিয়তা অর্জনের চেয়ে বাস্তব জীবনে জ্ঞান, দক্ষতা, নৈতিকতা ও সুন্দর ব্যক্তিত্ব গড়ে তোলা অনেক বেশি মূল্যবান।
বিদ্যালয় কেবল পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান দেওয়ার প্রতিষ্ঠান নয়; এটি শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা, শৃঙ্খলা, দায়িত্ববোধ ও মানবিক মূল্যবোধ গড়ে তোলারও গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। তাই শ্রেণিকক্ষে এমন ঘটনা ঘটলে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নেই। একই সঙ্গে কোনো একটি ঘটনা ঘটলেই সমগ্র বিদ্যালয় কিংবা সব শিক্ষককে দায়ী করাও ন্যায়সংগত নয়।
শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের পাঠদান, শৃঙ্খলা রক্ষা ও নৈতিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। কিন্তু একটি বিদ্যালয়ের প্রতিটি শিক্ষার্থীর প্রতিটি মুহূর্তের আচরণ সব সময় সরাসরি পর্যবেক্ষণ করা বাস্তবসম্মত নয়। ফলে দায়িত্ব নির্ধারণ করতে হবে ঘটনার প্রকৃতি, তদারকির ব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট পরিস্থিতি বিবেচনা করে।
বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের উচিত শ্রেণিকক্ষে ও বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে স্মার্টফোন ব্যবহারের সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী তা কার্যকর করা। পাঠদানের সময় ব্যক্তিগত ফোন ব্যবহার নিরুৎসাহিত করা, অনুমতি ছাড়া ভিডিও ধারণ ও প্রকাশ নিষিদ্ধ করা, ফাঁকা শ্রেণিকক্ষের তদারকি জোরদার করা এবং শিক্ষার্থীদের ডিজিটাল শিষ্টাচার ও অনলাইন নিরাপত্তা বিষয়ে নিয়মিত সচেতনতামূলক আলোচনা আয়োজন করা যেতে পারে।
প্রয়োজনে শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত স্মার্টফোন বিদ্যালয়ে আনার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা যেতে পারে। তবে জরুরি যোগাযোগ, বিশেষ শিক্ষাগত প্রয়োজন এবং বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় একটি স্পষ্ট ও ন্যায়সংগত নীতিমালা থাকা উচিত। শুধু নিষেধাজ্ঞা নয়, নিয়মের উদ্দেশ্য বোঝানো এবং তা ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়ন করাও জরুরি।
ঘটনার সঙ্গে জড়িত শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের সঙ্গে আলোচনা করা অবশ্যই প্রয়োজন। তবে এর পরবর্তী ধাপ হিসেবে তাদের আচরণের পেছনের কারণ বোঝার চেষ্টা করতে হবে। তারা কি নিছক বিনোদনের জন্য ভিডিও তৈরি করেছে, বন্ধুদের প্রভাবে এমন করেছে, নাকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয় হওয়ার আকাঙ্ক্ষা থেকে এ কাজ করেছে—এসব বিষয় বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে কথা বলা, প্রয়োজন অনুযায়ী কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করা এবং তাদের অনলাইন আচরণের সম্ভাব্য পরিণতি বুঝিয়ে বলা যেতে পারে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে যেন তারা এ ধরনের কাজে জড়িত না হয়, সে জন্য পরিবার ও বিদ্যালয়কে সমন্বিতভাবে পাশে দাঁড়াতে হবে।
শিক্ষার্থীদের মনে রাখতে হবে, একটি ভিডিও মুহূর্তের আনন্দ দিতে পারে; কিন্তু তার ডিজিটাল ছাপ দীর্ঘদিন থেকে যেতে পারে। অন্যদিকে অভিভাবক ও শিক্ষকদেরও মনে রাখতে হবে, কিশোর বয়সের ভুল সংশোধনের সুযোগ দিলে তা ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষণীয় অভিজ্ঞতায় পরিণত হতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো ঘটনা ছড়িয়ে পড়লে অনেকেই দ্রুত মন্তব্য করতে, ভিডিও শেয়ার করতে কিংবা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয় প্রকাশ করতে আগ্রহী হন। কিন্তু কোনো শিক্ষার্থীকে নিয়ে সমালোচনা করার আগে তার বয়স, মানসিক অবস্থা এবং ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করা প্রয়োজন।
বিশেষ করে অপ্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার্থীদের নাম, ছবি, পরিচয় কিংবা ব্যক্তিগত তথ্য অপ্রয়োজনে প্রকাশ করা তাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও মানসিক ক্ষতির কারণ হতে পারে। একটি ভুলের কারণে যেন কোনো শিক্ষার্থী অনলাইন অপমান, বিদ্রূপ কিংবা সামাজিক বর্জনের শিকার না হয়, সে বিষয়ে সবার সংবেদনশীল থাকা উচিত।
কোনো ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর সেটি বারবার শেয়ার করা, শিক্ষার্থীদের নিয়ে অপমানজনক মন্তব্য করা কিংবা যাচাই না করে বিভিন্ন তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া সমস্যার সমাধান করে না; বরং ক্ষতি আরও বাড়াতে পারে। তাই দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে আমাদের উচিত ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা করা, যাচাই করা তথ্যের বাইরে কিছু প্রচার না করা এবং সংশোধনের উদ্যোগকে উৎসাহিত করা।
ফেসবুকে কোনো ঘটনা নিয়ে লেখা, মন্তব্য করা কিংবা ক্ষোভ প্রকাশ করা সহজ। কিন্তু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি, শিক্ষকদের সম্মান এবং শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের ওপর সেই লেখার প্রভাব কতটা পড়তে পারে, তা বিবেচনা করা জরুরি।
বিদ্যালয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলে গঠনমূলক সমালোচনা অবশ্যই প্রয়োজন। শিক্ষকদের দায়িত্ব, বিদ্যালয়ের তদারকি কিংবা কর্তৃপক্ষের পদক্ষেপে কোনো ঘাটতি থাকলে তা তথ্যভিত্তিকভাবে তুলে ধরা যেতে পারে। কিন্তু যাচাই-বাছাই ছাড়া দোষারোপ, অপমানজনক মন্তব্য কিংবা অতিরঞ্জিত প্রচার কোনো স্থায়ী সমাধান এনে দেয় না।
একটি বিষয় স্পষ্টভাবে মনে রাখা দরকার—বিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের ভুল পথে পরিচালিত করার প্রতিষ্ঠান নয়। বরং শিক্ষার্থীরা কখনো বিদ্যালয়ের নিয়ম, শিক্ষকদের নির্দেশনা কিংবা পরিবারের প্রত্যাশা উপেক্ষা করে ভুল সিদ্ধান্ত নিতে পারে। আবার এমন পরিস্থিতি প্রতিরোধে বিদ্যালয়েরও দায়িত্ব ও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তাই একপক্ষকে সম্পূর্ণ দায়মুক্ত কিংবা অন্যপক্ষকে এককভাবে দায়ী না করে, ঘটনার নিরপেক্ষ মূল্যায়ন এবং সংশোধনমূলক উদ্যোগই হওয়া উচিত আমাদের লক্ষ্য।
শিশু-কিশোরদের নিরাপদ ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে কয়েকটি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
প্রথমত, অভিভাবকদের সন্তানের বয়স ও প্রয়োজন বিবেচনা করে স্মার্টফোন ব্যবহারের সুযোগ দিতে হবে এবং দায়িত্বশীল ইন্টারনেট ব্যবহারের শিক্ষা দিতে হবে।
দ্বিতীয়ত, বিদ্যালয়ে স্মার্টফোন ব্যবহারের সুস্পষ্ট নীতিমালা, কার্যকর তদারকি এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা বিষয়ে নিয়মিত সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালু করতে হবে।
তৃতীয়ত, অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় জড়িত শিক্ষার্থীদের শুধু শাস্তি না দিয়ে তাদের আচরণের কারণ বুঝতে হবে এবং প্রয়োজনে কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে।
চতুর্থত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের অপ্রাপ্তবয়স্কদের পরিচয় ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষায় সচেতন হতে হবে। কোনো ভিডিও ভাইরাল হলে সেটিকে আরও ছড়িয়ে না দিয়ে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে।
পঞ্চমত, শিক্ষার্থীদের বোঝাতে হবে—লাইক, কমেন্ট কিংবা ভাইরাল হওয়ার সাময়িক আনন্দের চেয়ে শিক্ষাগ্রহণ, নৈতিকতা, দক্ষতা অর্জন এবং সুন্দর ভবিষ্যৎ নির্মাণ অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ক্লাসরুমে টিকটক ভিডিও তৈরি ও প্রকাশের ঘটনাটি আমাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। এটি শুধু কয়েকজন শিক্ষার্থীর আচরণের প্রশ্ন নয়; এটি আমাদের অভিভাবকত্ব, শিক্ষাব্যবস্থা, প্রযুক্তি ব্যবহারের সংস্কৃতি এবং সামাজিক দায়িত্ববোধেরও পরীক্ষা।
সন্তানের হাতে স্মার্টফোন তুলে দেওয়ার আগে আমাদের ভাবতে হবে, তাকে কি আমরা শুধু একটি যন্ত্র দিচ্ছি, নাকি সেই যন্ত্রের দায়িত্বশীল ব্যবহার শেখানোর প্রস্তুতিও নিচ্ছি? বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের শৃঙ্খলা নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাদের মানসিক বিকাশ, নৈতিক শিক্ষা ও ডিজিটাল নিরাপত্তাকে আমরা কতটা গুরুত্ব দিচ্ছি? আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো ভুলের খবর ছড়িয়ে পড়লে আমরা কি সমাধানের পথ খুঁজি, নাকি দোষারোপের প্রতিযোগিতায় মেতে উঠি?
আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি ভাইরাল ভিডিও কোনো শিক্ষার্থীর পুরো জীবনকে সংজ্ঞায়িত করতে পারে না। কৈশোরের ভুলকে সংশোধনের সুযোগে রূপান্তরিত করাই হতে পারে আমাদের সবচেয়ে বড় সাফল্য। শিক্ষকদের দায়িত্বশীলতা, অভিভাবকদের সচেতনতা, বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপ এবং সমাজের মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি—এই চারটির সমন্বয়েই গড়ে উঠতে পারে নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ।
শিশু-কিশোরদের সুরক্ষা কোনো একক ব্যক্তি, পরিবার কিংবা বিদ্যালয়ের দায়িত্ব নয়—এ দায়িত্ব আমাদের সবার। তাই দোষারোপ নয়, চাই দায়িত্বশীলতা; অপমান নয়, চাই সংশোধন; নিষেধাজ্ঞা নয় শুধু, চাই সচেতনতা ও সহমর্মিতা। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি প্রজন্ম গড়ে তোলা, যারা প্রযুক্তি ব্যবহার করবে জ্ঞান অর্জনে, সৃজনশীলতা বিকাশে এবং সুন্দর ভবিষ্যৎ নির্মাণে—নিজের কিংবা অন্যের ক্ষতির কারণ হতে নয়।
মোহাম্মদ এমদাদুল হক : ডেপুটি রেজিস্ট্রার (জনসংযোগ) , কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়।