ভাস্কর মজুমদার

দুর্গাপূজা শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়। এটি বাঙালির হৃদয়ে বেঁচে থাকা এক টুকরো শৈশব, ফেলে আসা দিনের অসংখ্য স্মৃতি, আপনজনের সান্নিধ্য আর শিকড়ের সঙ্গে মিশে থাকা এক গভীর ভালোবাসার নাম।
বছর ঘুরে আবার মা আসেন। শরতের আকাশে সাদা মেঘ ভাসে, কাশফুল দোলে, ভোরের বাতাসে শিউলির গন্ধ ছড়ায়। দূর থেকে ভেসে আসা ঢাকের শব্দে বুকের ভেতর কেমন যেন একটা শিহরণ জাগে। মনে হয়, জীবনের সব ব্যস্ততা, ক্লান্তি আর না পাওয়ার হিসাব ভুলে কয়েকটা দিনের জন্য আবার ফিরে যাই সেই ফেলে আসা শৈশবে।
আমাদের কুমিল্লার পূজার স্মৃতিগুলোও এমনই। ছোটবেলায় পূজা মানেই ছিল নতুন জামার গন্ধ, বন্ধুদের সঙ্গে মণ্ডপে মণ্ডপে ঘুরে বেড়ানো, অঞ্জলির ফুল, প্রসাদের অপেক্ষা, সন্ধ্যার আরতি আর বিজয়া দশমীর বিকেলে বুকের ভেতর জমে থাকা এক অদ্ভুত শূন্যতা। তখন বুঝতাম না, প্রতিমা বিসর্জনের সময় বড়দের চোখেও কেন জল আসে। আজ বুঝি, সেই জল শুধু দেবীকে বিদায় দেওয়ার নয়। সেই জলে মিশে থাকে হারিয়ে যাওয়া শৈশব, প্রিয়জনের স্মৃতি, ফেলে আসা দিন আর সময়ের কাছে অসহায় হয়ে পড়া আমাদের ভালোবাসা।
কুমিল্লার শহর থেকে প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত দুর্গাপূজার রয়েছে সমৃদ্ধ ঐতিহ্য। প্রাচীন পারিবারিক পূজা, বহু বছরের সর্বজনীন আয়োজন আর সময়ের সঙ্গে গড়ে ওঠা নতুন নতুন পূজামণ্ডপ মিলিয়ে এই উৎসব আজ আরও বিস্তৃত। কোথাও পূর্বপুরুষের হাতে শুরু হওয়া পূজা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসছে, কোথাও দেশভাগের পর বদলে গেছে পূজার স্থান ও আয়োজনের ধরন। অনেক পুরোনো বাড়ির মানুষ আজ পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে আছেন। তবু পূজার সময় তাঁদের মন পড়ে থাকে সেই চেনা উঠানে, সেই মন্দিরে, সেই গ্রামের মেঠোপথে। কারণ মানুষ যত দূরেই যাক, শিকড়ের টান সহজে মুছে যায় না।
কিন্তু এই আনন্দের মধ্যেও কিছু বাস্তবতা আমাদের মনকে ভারী করে তোলে।
বাংলাদেশে দুর্গাপূজা এলেই আমরা সম্প্রীতির কথা বলি। মণ্ডপে মণ্ডপে শুভেচ্ছা বিনিময় হয়, নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ আসেন, উৎসবের সৌন্দর্য নিয়ে কথা হয়। এসব আমাদের সামাজিক ঐতিহ্যের সুন্দর দিক। কিন্তু উৎসবের এই হাসিমুখের আড়ালে কিছু না বলা কষ্ট, কিছু উদ্বেগ আর কিছু দীর্ঘশ্বাসও থেকে যায়।
আজও কখনো পূজামণ্ডপের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়, কখনো প্রতিমা ভাঙচুর কিংবা ধর্মীয় বিদ্বেষের খবর আমাদের ব্যথিত করে। কখনো একজন মানুষকে নিজের ধর্মীয় পরিচয় প্রকাশ করতে গিয়ে দ্বিধায় পড়তে হয়। এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের পূজার আনন্দের ছবি প্রকাশ করেও কাউকে কটূক্তি বা বিদ্রূপের মুখে পড়তে হয়। একটি স্বাধীন দেশে নিজের ধর্মীয় উৎসব উদ্যাপনের আনন্দের সঙ্গে এমন উদ্বেগ জড়িয়ে থাকা সত্যিই বেদনাদায়ক।
একজন মানুষ যখন নিজের বিশ্বাস নিয়ে নিশ্চিন্তে বাঁচতে পারেন না, তখন তাঁর কষ্টটা শুধু ব্যক্তিগত থাকে না। সেই কষ্ট ধীরে ধীরে একটি সমাজের বিবেককেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।
আমরা এমন বাংলাদেশ চাই, যেখানে একজন মা তাঁর সন্তানকে নিয়ে পূজামণ্ডপে যাওয়ার সময় শুধু আনন্দের কথাই ভাববেন। যেখানে কোনো শিশুকে তার ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে নিজেকে আলাদা মনে করতে হবে না। যেখানে নিজের বিশ্বাস, সংস্কৃতি কিংবা উৎসবের আনন্দ প্রকাশ করতে কারও সংকোচ থাকবে না।
ধর্মীয় সম্প্রীতি শুধু মণ্ডপে গিয়ে শুভেচ্ছা জানানোর নাম নয়। সম্প্রীতি হলো প্রতিবেশীর আনন্দে আনন্দিত হওয়া, তাঁর দুঃখে ব্যথিত হওয়া, বিপদের দিনে কোনো পরিচয়ের হিসাব না কষে পাশে দাঁড়ানো।
এই বাংলাদেশের মাটিতে হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান প্রজন্মের পর প্রজন্ম পাশাপাশি বসবাস করে আসছেন। একই পাড়ায় আমাদের বেড়ে ওঠা, একই মাঠে খেলাধুলা, একই বিদ্যালয়ে পড়াশোনা, একই বিপদে একে অপরের পাশে দাঁড়ানো। আমাদের কুমিল্লার সামাজিক জীবনেও এমন অসংখ্য স্মৃতি ছড়িয়ে আছে। ছোটবেলার সেই বন্ধুটির ধর্ম কী ছিল, তার চেয়ে বড় পরিচয় ছিল সে আমার বন্ধু। প্রতিবেশীর বাড়িতে উৎসব মানেই ছিল আমাদেরও আনন্দ। সম্পর্কের এই সহজ সৌন্দর্যটুকুই ছিল আমাদের বড় সম্পদ।
অথচ বড় হতে হতে কখনো কখনো আমরা মানুষকে তাঁর নাম, ধর্ম কিংবা পরিচয় দিয়ে বিচার করতে শিখে যাই। যে শিশুরা একদিন একই মাঠে হাত ধরাধরি করে খেলেছে, বড় হয়ে তাদের মাঝেই তৈরি হয় অদৃশ্য দূরত্ব। এই দূরত্ব আমাদের সমাজের জন্য বড় বেদনার।
দেবী দুর্গা শক্তির প্রতীক। তিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রাম আর অশুভের বিনাশের প্রতীক। কিন্তু অশুভ কি শুধু পুরাণের মহিষাসুরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ? মানুষের প্রতি ঘৃণা, ধর্মের নামে বিদ্বেষ, নারীর প্রতি অসম্মান, দুর্বলের ওপর অত্যাচার, ক্ষমতার অহংকার আর অন্যায় দেখেও নীরব থাকার প্রবণতা, এসবও তো আমাদের চারপাশের অশুভ শক্তি।
আমরা মণ্ডপে দাঁড়িয়ে মহিষাসুরমর্দিনীর বন্দনা করি, অথচ বাস্তব জীবনে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে অনেক সময় দ্বিধা করি। দেবীর শক্তির আরাধনা তখনই অর্থবহ হয়ে ওঠে, যখন সেই শক্তির শিক্ষা আমাদের আচরণে প্রতিফলিত হয়।
নিজেদের দিকেও একটু তাকানো দরকার।
আমাদের পূজার আয়োজন দিন দিন সমৃদ্ধ হচ্ছে। সুন্দর প্রতিমা, আলোকসজ্জা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আর নানা আয়োজনে উৎসবের পরিসর বাড়ছে। এটি নিঃসন্দেহে আনন্দের। কিন্তু এই আনন্দের ভিড়ে যেন হারিয়ে না যায় সেই মানুষগুলো, যাঁদের জীবনে উৎসব এলেও আনন্দ পৌঁছায় না। যে পরিবারটি অর্থকষ্টে সন্তানের জন্য নতুন জামা কিনতে পারে না, যে বৃদ্ধ মানুষটি একা ঘরে বসে থাকেন, যে অসুস্থ মানুষটি হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থাকেন, তাঁদের মুখেও একটু হাসি ফোটাতে পারলে উৎসবের আনন্দ আরও গভীর হয়।
আমাদের সন্তানদের কথাও ভাবতে হবে। আমরা তাঁদের ভালো বিদ্যালয়ে পড়াচ্ছি, গান, নাচ, খেলাধুলা শেখাচ্ছি, সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখাচ্ছি। কিন্তু নিজেদের ধর্মীয় ঐতিহ্য, ইতিহাস আর মূল্যবোধের সঙ্গে কতটা পরিচয় করিয়ে দিচ্ছি? পূজা শুধু নতুন পোশাক পরা কিংবা মণ্ডপে ঘুরে বেড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোর শিক্ষা, সত্যকে ধারণ করার সাহস আর মানুষের প্রতি মমত্ববোধ। এই শিক্ষাটুকু পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়াও আমাদের দায়িত্ব।
আমি বিশ্বাস করি, বাংলাদেশের অধিকাংশ সাধারণ মানুষ শান্তিতে থাকতে চান। তাঁরা প্রতিবেশীর সঙ্গে বিরোধ নয়, ভালো সম্পর্ক চান। কিন্তু কিছু মানুষের বিদ্বেষ, উসকানি কিংবা অন্যায় আচরণ অনেক সময় সেই সম্পর্কের ওপর আঘাত হানে। তখন শুধু দুঃখ প্রকাশ করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হয়, আক্রান্ত মানুষের পাশে থাকতে হয়। কারণ অন্যের অধিকার রক্ষা করার মধ্যেই নিজের অধিকারের নিরাপত্তাও নিহিত।
একটি দেশের সৌন্দর্য শুধু তার নদী, মাঠ, সবুজ প্রকৃতি কিংবা উন্নয়নের চিত্রে নয়। সেই দেশের প্রকৃত সৌন্দর্য ফুটে ওঠে তার মানুষের আচরণে। সংখ্যায় ছোট কোনো জনগোষ্ঠীর মানুষ যখন নিজেকে নিরাপদ মনে করেন, যখন একজন নারী নির্ভয়ে চলতে পারেন, যখন ভিন্ন বিশ্বাসের মানুষ সমান সম্মান পান, তখনই একটি সমাজ সত্যিকার অর্থে সুন্দর হয়ে ওঠে।
আমাদের কুমিল্লা, আমাদের বাংলাদেশ এমনই এক জনপদ হয়ে উঠুক, যেখানে মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনি আর মসজিদের আজান নিজ নিজ মর্যাদায় উচ্চারিত হবে। যেখানে ভিন্ন বিশ্বাসের মানুষ একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকবেন। যেখানে ধর্মীয় পরিচয় মানুষের মধ্যে দূরত্ব তৈরি করবে না, বরং পরস্পরকে জানার ও সম্মান করার সুযোগ তৈরি করবে।
জীবনের একটা সময়ে এসে উৎসবের অর্থও বদলে যায়। ছোটবেলায় যে পূজার জন্য সারা বছর অপেক্ষা করতাম, আজ সেই পূজার দিনগুলোতে বারবার মনে পড়ে যায় হারিয়ে যাওয়া মানুষগুলোর কথা। মনে পড়ে সেই সব মুখ, যাঁরা একদিন হাত ধরে মণ্ডপে নিয়ে যেতেন, নতুন জামা কিনে দিতেন, ভিড়ের মধ্যে আগলে রাখতেন। তাঁদের কেউ আজ আর পৃথিবীতে নেই, কেউ বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছেন, কেউ দূরদেশে। অথচ স্মৃতির ভেতর তাঁরা আজও আগের মতোই আছেন।
হয়তো এটাই জীবনের সবচেয়ে বড় সত্য। সময় আমাদের অনেক কিছু দেয়, আবার নিঃশব্দে অনেক কিছু কেড়েও নেয়। কিন্তু ভালোবাসার স্মৃতিগুলো থেকে যায়। তাই দুর্গাপূজা যতটা আনন্দের, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ততটাই হয়ে ওঠে ফিরে দেখার, আপনজনকে মনে করার আর নিজের শিকড়কে নতুন করে অনুভব করার উৎসব।
কুমিল্লার প্রাচীন পূজার ঐতিহ্য আর নতুন নতুন আয়োজনের মধ্য দিয়ে এই উত্তরাধিকার এগিয়ে চলুক প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। আমাদের সন্তানেরা শুধু উৎসবের আলো নয়, এর পেছনের ইতিহাসটুকুও জানুক। তারা জানুক, এই মাটিতে তাদের পূর্বপুরুষের স্মৃতি আছে, সংস্কৃতি আছে, ভালোবাসার অধিকার আছে। এই দেশ তাদেরও, এই মাটিতে মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকার অধিকার তাদেরও সমান।
একদিন বিজয়ার সন্ধ্যা নামবে। ঢাকের শব্দ থেমে আসবে, প্রতিমা বিসর্জন হবে, আলোকসজ্জা নিভে যাবে। যে মণ্ডপ কয়েক দিন মানুষের হাসি আর আনন্দে মুখর ছিল, সেখানে নেমে আসবে নীরবতা। সবাই ফিরে যাবেন নিজের ঘরে, নিজের জীবনে।
কিন্তু উৎসবের এই কয়েকটি দিন আমাদের মনে যে ভালোবাসা, সহমর্মিতা আর আপন করে নেওয়ার অনুভূতি জাগিয়ে যায়, সেটুকু যেন হারিয়ে না যায়। মায়ের আরাধনার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের প্রতি আমাদের দায়িত্ববোধও যেন আরও গভীর হয়।
আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম যেন এমন এক বাংলাদেশ পায়, যেখানে পূজার আনন্দের সঙ্গে ভয়ের কোনো সম্পর্ক থাকবে না। যেখানে একটি শিশুর কাছে দুর্গাপূজা মানে হবে শুধু নতুন জামা, ঢাকের বাদ্যি, মায়ের মুখের হাসি আর বন্ধুদের সঙ্গে কাটানো আনন্দের দিন। যেখানে বড় হয়ে তাকে আমাদের মতো নিরাপত্তা, অধিকার কিংবা ধর্মীয় পরিচয়ের মর্যাদা নিয়ে উদ্বিগ্ন হতে হবে না।
মা দুর্গা ফিরে যাবেন কিন্তু মানুষের হৃদয়ে থেকে যাক তাঁর শক্তি, সাহস আর মমতা। প্রতিমার বিসর্জন হোক, কিন্তু মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসার যেন কখনো বিসর্জন না হয়।
শরতের আকাশে আবার সাদা মেঘ ভাসবে, শিউলি ঝরবে, ঢাক বাজবে। প্রজন্ম বদলাবে, সময় বদলাবে, তবু এই বাংলার মাটিতে মানুষের প্রতি মানুষের বিশ্বাস আর ভালোবাসাটুকু অমলিন থাকুক।
মায়ের আগমন শুধু উৎসবের আনন্দ বয়ে না আনুক, আমাদের বিবেকেও জাগিয়ে তুলুক একটু বেশি মানবিকতা, একটু বেশি সাহস, আর একে অপরকে আপন করে নেওয়ার শক্তি।
শুভ শারদীয়া। সকলের জীবন হোক নিরাপদ, সুন্দর ও মানবিক।
ভাস্কর মজুমদার: জেনারেল ম্যানেজার, মার্চেন্ডাইজিং, ব্র্যাক আড়ং ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী।

দুর্গাপূজা শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়। এটি বাঙালির হৃদয়ে বেঁচে থাকা এক টুকরো শৈশব, ফেলে আসা দিনের অসংখ্য স্মৃতি, আপনজনের সান্নিধ্য আর শিকড়ের সঙ্গে মিশে থাকা এক গভীর ভালোবাসার নাম।
বছর ঘুরে আবার মা আসেন। শরতের আকাশে সাদা মেঘ ভাসে, কাশফুল দোলে, ভোরের বাতাসে শিউলির গন্ধ ছড়ায়। দূর থেকে ভেসে আসা ঢাকের শব্দে বুকের ভেতর কেমন যেন একটা শিহরণ জাগে। মনে হয়, জীবনের সব ব্যস্ততা, ক্লান্তি আর না পাওয়ার হিসাব ভুলে কয়েকটা দিনের জন্য আবার ফিরে যাই সেই ফেলে আসা শৈশবে।
আমাদের কুমিল্লার পূজার স্মৃতিগুলোও এমনই। ছোটবেলায় পূজা মানেই ছিল নতুন জামার গন্ধ, বন্ধুদের সঙ্গে মণ্ডপে মণ্ডপে ঘুরে বেড়ানো, অঞ্জলির ফুল, প্রসাদের অপেক্ষা, সন্ধ্যার আরতি আর বিজয়া দশমীর বিকেলে বুকের ভেতর জমে থাকা এক অদ্ভুত শূন্যতা। তখন বুঝতাম না, প্রতিমা বিসর্জনের সময় বড়দের চোখেও কেন জল আসে। আজ বুঝি, সেই জল শুধু দেবীকে বিদায় দেওয়ার নয়। সেই জলে মিশে থাকে হারিয়ে যাওয়া শৈশব, প্রিয়জনের স্মৃতি, ফেলে আসা দিন আর সময়ের কাছে অসহায় হয়ে পড়া আমাদের ভালোবাসা।
কুমিল্লার শহর থেকে প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত দুর্গাপূজার রয়েছে সমৃদ্ধ ঐতিহ্য। প্রাচীন পারিবারিক পূজা, বহু বছরের সর্বজনীন আয়োজন আর সময়ের সঙ্গে গড়ে ওঠা নতুন নতুন পূজামণ্ডপ মিলিয়ে এই উৎসব আজ আরও বিস্তৃত। কোথাও পূর্বপুরুষের হাতে শুরু হওয়া পূজা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসছে, কোথাও দেশভাগের পর বদলে গেছে পূজার স্থান ও আয়োজনের ধরন। অনেক পুরোনো বাড়ির মানুষ আজ পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে আছেন। তবু পূজার সময় তাঁদের মন পড়ে থাকে সেই চেনা উঠানে, সেই মন্দিরে, সেই গ্রামের মেঠোপথে। কারণ মানুষ যত দূরেই যাক, শিকড়ের টান সহজে মুছে যায় না।
কিন্তু এই আনন্দের মধ্যেও কিছু বাস্তবতা আমাদের মনকে ভারী করে তোলে।
বাংলাদেশে দুর্গাপূজা এলেই আমরা সম্প্রীতির কথা বলি। মণ্ডপে মণ্ডপে শুভেচ্ছা বিনিময় হয়, নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ আসেন, উৎসবের সৌন্দর্য নিয়ে কথা হয়। এসব আমাদের সামাজিক ঐতিহ্যের সুন্দর দিক। কিন্তু উৎসবের এই হাসিমুখের আড়ালে কিছু না বলা কষ্ট, কিছু উদ্বেগ আর কিছু দীর্ঘশ্বাসও থেকে যায়।
আজও কখনো পূজামণ্ডপের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়, কখনো প্রতিমা ভাঙচুর কিংবা ধর্মীয় বিদ্বেষের খবর আমাদের ব্যথিত করে। কখনো একজন মানুষকে নিজের ধর্মীয় পরিচয় প্রকাশ করতে গিয়ে দ্বিধায় পড়তে হয়। এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের পূজার আনন্দের ছবি প্রকাশ করেও কাউকে কটূক্তি বা বিদ্রূপের মুখে পড়তে হয়। একটি স্বাধীন দেশে নিজের ধর্মীয় উৎসব উদ্যাপনের আনন্দের সঙ্গে এমন উদ্বেগ জড়িয়ে থাকা সত্যিই বেদনাদায়ক।
একজন মানুষ যখন নিজের বিশ্বাস নিয়ে নিশ্চিন্তে বাঁচতে পারেন না, তখন তাঁর কষ্টটা শুধু ব্যক্তিগত থাকে না। সেই কষ্ট ধীরে ধীরে একটি সমাজের বিবেককেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।
আমরা এমন বাংলাদেশ চাই, যেখানে একজন মা তাঁর সন্তানকে নিয়ে পূজামণ্ডপে যাওয়ার সময় শুধু আনন্দের কথাই ভাববেন। যেখানে কোনো শিশুকে তার ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে নিজেকে আলাদা মনে করতে হবে না। যেখানে নিজের বিশ্বাস, সংস্কৃতি কিংবা উৎসবের আনন্দ প্রকাশ করতে কারও সংকোচ থাকবে না।
ধর্মীয় সম্প্রীতি শুধু মণ্ডপে গিয়ে শুভেচ্ছা জানানোর নাম নয়। সম্প্রীতি হলো প্রতিবেশীর আনন্দে আনন্দিত হওয়া, তাঁর দুঃখে ব্যথিত হওয়া, বিপদের দিনে কোনো পরিচয়ের হিসাব না কষে পাশে দাঁড়ানো।
এই বাংলাদেশের মাটিতে হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান প্রজন্মের পর প্রজন্ম পাশাপাশি বসবাস করে আসছেন। একই পাড়ায় আমাদের বেড়ে ওঠা, একই মাঠে খেলাধুলা, একই বিদ্যালয়ে পড়াশোনা, একই বিপদে একে অপরের পাশে দাঁড়ানো। আমাদের কুমিল্লার সামাজিক জীবনেও এমন অসংখ্য স্মৃতি ছড়িয়ে আছে। ছোটবেলার সেই বন্ধুটির ধর্ম কী ছিল, তার চেয়ে বড় পরিচয় ছিল সে আমার বন্ধু। প্রতিবেশীর বাড়িতে উৎসব মানেই ছিল আমাদেরও আনন্দ। সম্পর্কের এই সহজ সৌন্দর্যটুকুই ছিল আমাদের বড় সম্পদ।
অথচ বড় হতে হতে কখনো কখনো আমরা মানুষকে তাঁর নাম, ধর্ম কিংবা পরিচয় দিয়ে বিচার করতে শিখে যাই। যে শিশুরা একদিন একই মাঠে হাত ধরাধরি করে খেলেছে, বড় হয়ে তাদের মাঝেই তৈরি হয় অদৃশ্য দূরত্ব। এই দূরত্ব আমাদের সমাজের জন্য বড় বেদনার।
দেবী দুর্গা শক্তির প্রতীক। তিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রাম আর অশুভের বিনাশের প্রতীক। কিন্তু অশুভ কি শুধু পুরাণের মহিষাসুরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ? মানুষের প্রতি ঘৃণা, ধর্মের নামে বিদ্বেষ, নারীর প্রতি অসম্মান, দুর্বলের ওপর অত্যাচার, ক্ষমতার অহংকার আর অন্যায় দেখেও নীরব থাকার প্রবণতা, এসবও তো আমাদের চারপাশের অশুভ শক্তি।
আমরা মণ্ডপে দাঁড়িয়ে মহিষাসুরমর্দিনীর বন্দনা করি, অথচ বাস্তব জীবনে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে অনেক সময় দ্বিধা করি। দেবীর শক্তির আরাধনা তখনই অর্থবহ হয়ে ওঠে, যখন সেই শক্তির শিক্ষা আমাদের আচরণে প্রতিফলিত হয়।
নিজেদের দিকেও একটু তাকানো দরকার।
আমাদের পূজার আয়োজন দিন দিন সমৃদ্ধ হচ্ছে। সুন্দর প্রতিমা, আলোকসজ্জা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আর নানা আয়োজনে উৎসবের পরিসর বাড়ছে। এটি নিঃসন্দেহে আনন্দের। কিন্তু এই আনন্দের ভিড়ে যেন হারিয়ে না যায় সেই মানুষগুলো, যাঁদের জীবনে উৎসব এলেও আনন্দ পৌঁছায় না। যে পরিবারটি অর্থকষ্টে সন্তানের জন্য নতুন জামা কিনতে পারে না, যে বৃদ্ধ মানুষটি একা ঘরে বসে থাকেন, যে অসুস্থ মানুষটি হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থাকেন, তাঁদের মুখেও একটু হাসি ফোটাতে পারলে উৎসবের আনন্দ আরও গভীর হয়।
আমাদের সন্তানদের কথাও ভাবতে হবে। আমরা তাঁদের ভালো বিদ্যালয়ে পড়াচ্ছি, গান, নাচ, খেলাধুলা শেখাচ্ছি, সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখাচ্ছি। কিন্তু নিজেদের ধর্মীয় ঐতিহ্য, ইতিহাস আর মূল্যবোধের সঙ্গে কতটা পরিচয় করিয়ে দিচ্ছি? পূজা শুধু নতুন পোশাক পরা কিংবা মণ্ডপে ঘুরে বেড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোর শিক্ষা, সত্যকে ধারণ করার সাহস আর মানুষের প্রতি মমত্ববোধ। এই শিক্ষাটুকু পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়াও আমাদের দায়িত্ব।
আমি বিশ্বাস করি, বাংলাদেশের অধিকাংশ সাধারণ মানুষ শান্তিতে থাকতে চান। তাঁরা প্রতিবেশীর সঙ্গে বিরোধ নয়, ভালো সম্পর্ক চান। কিন্তু কিছু মানুষের বিদ্বেষ, উসকানি কিংবা অন্যায় আচরণ অনেক সময় সেই সম্পর্কের ওপর আঘাত হানে। তখন শুধু দুঃখ প্রকাশ করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হয়, আক্রান্ত মানুষের পাশে থাকতে হয়। কারণ অন্যের অধিকার রক্ষা করার মধ্যেই নিজের অধিকারের নিরাপত্তাও নিহিত।
একটি দেশের সৌন্দর্য শুধু তার নদী, মাঠ, সবুজ প্রকৃতি কিংবা উন্নয়নের চিত্রে নয়। সেই দেশের প্রকৃত সৌন্দর্য ফুটে ওঠে তার মানুষের আচরণে। সংখ্যায় ছোট কোনো জনগোষ্ঠীর মানুষ যখন নিজেকে নিরাপদ মনে করেন, যখন একজন নারী নির্ভয়ে চলতে পারেন, যখন ভিন্ন বিশ্বাসের মানুষ সমান সম্মান পান, তখনই একটি সমাজ সত্যিকার অর্থে সুন্দর হয়ে ওঠে।
আমাদের কুমিল্লা, আমাদের বাংলাদেশ এমনই এক জনপদ হয়ে উঠুক, যেখানে মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনি আর মসজিদের আজান নিজ নিজ মর্যাদায় উচ্চারিত হবে। যেখানে ভিন্ন বিশ্বাসের মানুষ একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকবেন। যেখানে ধর্মীয় পরিচয় মানুষের মধ্যে দূরত্ব তৈরি করবে না, বরং পরস্পরকে জানার ও সম্মান করার সুযোগ তৈরি করবে।
জীবনের একটা সময়ে এসে উৎসবের অর্থও বদলে যায়। ছোটবেলায় যে পূজার জন্য সারা বছর অপেক্ষা করতাম, আজ সেই পূজার দিনগুলোতে বারবার মনে পড়ে যায় হারিয়ে যাওয়া মানুষগুলোর কথা। মনে পড়ে সেই সব মুখ, যাঁরা একদিন হাত ধরে মণ্ডপে নিয়ে যেতেন, নতুন জামা কিনে দিতেন, ভিড়ের মধ্যে আগলে রাখতেন। তাঁদের কেউ আজ আর পৃথিবীতে নেই, কেউ বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছেন, কেউ দূরদেশে। অথচ স্মৃতির ভেতর তাঁরা আজও আগের মতোই আছেন।
হয়তো এটাই জীবনের সবচেয়ে বড় সত্য। সময় আমাদের অনেক কিছু দেয়, আবার নিঃশব্দে অনেক কিছু কেড়েও নেয়। কিন্তু ভালোবাসার স্মৃতিগুলো থেকে যায়। তাই দুর্গাপূজা যতটা আনন্দের, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ততটাই হয়ে ওঠে ফিরে দেখার, আপনজনকে মনে করার আর নিজের শিকড়কে নতুন করে অনুভব করার উৎসব।
কুমিল্লার প্রাচীন পূজার ঐতিহ্য আর নতুন নতুন আয়োজনের মধ্য দিয়ে এই উত্তরাধিকার এগিয়ে চলুক প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। আমাদের সন্তানেরা শুধু উৎসবের আলো নয়, এর পেছনের ইতিহাসটুকুও জানুক। তারা জানুক, এই মাটিতে তাদের পূর্বপুরুষের স্মৃতি আছে, সংস্কৃতি আছে, ভালোবাসার অধিকার আছে। এই দেশ তাদেরও, এই মাটিতে মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকার অধিকার তাদেরও সমান।
একদিন বিজয়ার সন্ধ্যা নামবে। ঢাকের শব্দ থেমে আসবে, প্রতিমা বিসর্জন হবে, আলোকসজ্জা নিভে যাবে। যে মণ্ডপ কয়েক দিন মানুষের হাসি আর আনন্দে মুখর ছিল, সেখানে নেমে আসবে নীরবতা। সবাই ফিরে যাবেন নিজের ঘরে, নিজের জীবনে।
কিন্তু উৎসবের এই কয়েকটি দিন আমাদের মনে যে ভালোবাসা, সহমর্মিতা আর আপন করে নেওয়ার অনুভূতি জাগিয়ে যায়, সেটুকু যেন হারিয়ে না যায়। মায়ের আরাধনার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের প্রতি আমাদের দায়িত্ববোধও যেন আরও গভীর হয়।
আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম যেন এমন এক বাংলাদেশ পায়, যেখানে পূজার আনন্দের সঙ্গে ভয়ের কোনো সম্পর্ক থাকবে না। যেখানে একটি শিশুর কাছে দুর্গাপূজা মানে হবে শুধু নতুন জামা, ঢাকের বাদ্যি, মায়ের মুখের হাসি আর বন্ধুদের সঙ্গে কাটানো আনন্দের দিন। যেখানে বড় হয়ে তাকে আমাদের মতো নিরাপত্তা, অধিকার কিংবা ধর্মীয় পরিচয়ের মর্যাদা নিয়ে উদ্বিগ্ন হতে হবে না।
মা দুর্গা ফিরে যাবেন কিন্তু মানুষের হৃদয়ে থেকে যাক তাঁর শক্তি, সাহস আর মমতা। প্রতিমার বিসর্জন হোক, কিন্তু মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসার যেন কখনো বিসর্জন না হয়।
শরতের আকাশে আবার সাদা মেঘ ভাসবে, শিউলি ঝরবে, ঢাক বাজবে। প্রজন্ম বদলাবে, সময় বদলাবে, তবু এই বাংলার মাটিতে মানুষের প্রতি মানুষের বিশ্বাস আর ভালোবাসাটুকু অমলিন থাকুক।
মায়ের আগমন শুধু উৎসবের আনন্দ বয়ে না আনুক, আমাদের বিবেকেও জাগিয়ে তুলুক একটু বেশি মানবিকতা, একটু বেশি সাহস, আর একে অপরকে আপন করে নেওয়ার শক্তি।
শুভ শারদীয়া। সকলের জীবন হোক নিরাপদ, সুন্দর ও মানবিক।
ভাস্কর মজুমদার: জেনারেল ম্যানেজার, মার্চেন্ডাইজিং, ব্র্যাক আড়ং ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী।