অধ্যাপক ডাঃ মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ

তীব্র বেগে বনের ভেতরে জোয়ারের পানি খাঁড়ি ও খাল দিয়ে যখন ঠুকতে থাকে, তখন বনের শান্ত পরিবেশ নিমিষেই অশান্ত হয়ে উঠে। বনাঞ্চলের ভাষায় ‘প্রথম পালি’র ধাক্কায় সবচেয়ে বিপদে পড়ে চিত্রা হরিণের ছানা ও বন্যশূকরের দল। বড় প্রাণীদের মত সাঁতরে নিজেদের ধরে রাখার মত সামর্থ্য তাদের নাই। তীব্র স্রোতে তাদের ভাসিয়ে নেয় মূল নদীতে, যেখানে উৎপেতে থাকে ক্ষুধার্ত নোনা পানির কুমির। অমাবস্যা-পূর্ণিমার রাতে দিনের চেয়ে জোয়ারের রূপ আরও মারাত্মক।
বনের বানর আর বুনো পাখি যখন অন্ধকারে গাছের ডালে ঘুমিয়ে থাকে তখন হুড়মুড় করে পানি চলে আসে। রাতের আঁধারে জলের গভীরতা ও স্রোতের তীব্রতা আন্দাজ করতে না পেরে অনেক সময় বন্য প্রাণী ও পাখির বাসা পানির নিচে চলে যায়। রাতে উঁচু স্থানে আশ্রয় নেয়ার ব্যাপারটি তাই দিনের চেয়ে অনেক বেশি বিপজ্জনক জোয়ারের পানি যখন বনের মাটি ছাড়িয়ে গাছের কান্ড ছুয়ে ফেলে, সুন্দরবনে তখন এক অদ্ভুত দৃশ্য।
বাঁচার তাগিদে গাছের মগডালে উঠে আসে বিষধর কিং কোবরা, একই ডালে হয়ত আশ্রয় নিয়েছে কোন বানর বা পাখি। শিকার আর শিকারি পাশাপাশি বসে অপেক্ষা করে কখন পানি নামবে। পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনের বন্যপ্রানীদের এ লড়াই চলে দিনে দুবার, প্রতিটি জোয়ারে। কিন্তু সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও একের পর এক ঘূর্ণিঝড়ে সেই লড়াই এখন অস্তিত্বের সংকটে আবর্তিত। গবেষকদের ধারণা, এ ধারা চলতে থাকলে ২০৭০ সালের মধ্যে সুন্দরবনে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের বসবাসের উপযোগী কোন স্থানই অবশিষ্ট থাকবে না। জোয়ারের সময় সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগার দক্ষ সাতারু হয়ে উঠে। জোয়ারের স্রোতের বিপরীতে মাইলের পরে মাইল সাতরিয়ে এক দ্বীপ থেকে অন্য দ্বীপে যাতায়াত, সুন্দরবনের বাঘের নিত্যদিনের ঘটনা।
গবেষকরা বনের গাছে গাছে ক্যামেরা ট্যাপসহ বিভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহার করে দেখেছেন, জোয়ারের সময় বাঘ কীভাবে সাঁতরে স্রোতের বিপরীতে যায় এবং হরিণ কিভাবে দলবদ্ধভাবে উঁচু স্থানে ঘন্টার পর ঘন্টা স্থির দাঁড়িয়ে থাকে। পানি বাড়তে শুরু করলেই চিত্রা হরিণ ও বন্য শুকরের দল বনের তুলনামূলক উঁচু স্থানে বা কৃত্রিম মাটির ঢিবির দিকে ছুটতে থাকে। এসব ঢিবি ‘কেল্লা’ নামে পরিচিত। পানি বাড়লে শত শত হরিণ ও বন্যপ্রাণী কেল্লায় গাদাগাদি করে আশ্রয় নেয়। তবে ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি প্রাণী চলে আসায় এবং খাবারের অভাবে সেখানেও শুরু হয় বেঁচে থাকার নীরব লড়াই। প্রতিটি বাঘ গাছের ছাল আঁচড়ে নিজের একটি নির্দিষ্ট টেরিটরি বা এলাকা চিহ্নিত করে রাখে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাঘের এই এলাকা সংকুচিত হয়ে পড়েছে বলে অনেকে মনে করে। ফলে এক বাঘের এলাকায় আরেক বাঘ ঠুকে পড়ায় প্রায়ই রক্তক্ষয়ী লড়াই হয়। এই ভ্রাতৃঘাতী লড়াইয়ে অনেক সময় প্রবীন বা দূর্বল বাঘ মারা যায় অথবা এলাকা ছাড়া হয়ে লোকালয়ের কাছে চলে আসে।
এদিকে জোয়ারের পানি যখন বনের মাটি ছাড়িয়ে গাছের কান্ড ছুয়ে ফেলে, তখন মাটির গর্তে থাকা বিষধর সাপ গাছের মগডালে আশ্রয় নেয়। একই গাছে হয়ত আশ্রয় নিয়েছে কোন বানর বা পাখি। জীবনের এমন চরম সংকটে একই ডালে পাশাপাশি বসে থাকতে দেখা যায় পানি নামার পূর্ব পর্যন্ত। জোয়ারের পানি নেমে যাওয়ার পর বন্যপ্রাণীর সবচেয়ে বড় লড়াই শুরু হয় মিঠা পানির খুঁজে। সুন্দরবনের নদী- খালের পানি তখন নোনা। প্রাণীদের তৃষ্ণা মেটানোর একমাত্র উপায় বনের ভেতরের প্রাকৃতিক বা মানুষের খনন করা কিছু মিঠা পানির পুকুর। কিন্তু বড় জোয়ার বা জলোচ্ছাসের সময় নোনা পানি ঢুকে পুকুরগুলো নোনা হয়ে যায়। ফলে তৃষ্ণায় ছটফট করলেও প্রাণীরা পানি পান করতে পারে না। বৃষ্টি না হওয়া পর্যন্ত তীব্র তৃষ্ণা নিয়েই তাদের ধুঁকে ধুঁকে বাঁচতে হয়। জলবায়ু সংকটের পাশাপাশি স্থানীয় কাঠুরে, গোলপাতা সংগ্রহকারী, যারা বাওয়ালী নামে পরিচিত এবং জেলেরা যখন অতিরিক্ত মাত্রায় বনের ভেতরের খালের গভীরে বিচরণ করেন, তখন প্রাণীদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রার বিঘ্ন ঘটে। ভয় পেয়ে হরিণ বা বাঘ এমন এলাকায় চলে যায় যেখানে জোয়ারের পানির গভীরতা বেশি। এতে তাদের মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ে। সুন্দরবনের ভয়ংকর জীবনযুদ্ধ কোন কাল্পনিক গল্প নয়। দেশি-বিদেশী বিজ্ঞানীদের গবেষণা ও মাঠ পর্যায়ের জরীপে এর বাস্তবচিত্র বারবার উঠে এসেছে।
বিপন্ন জীবনবৈচিত্র রক্ষার কিছু বৈজ্ঞানিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি
১) বনের গভীর অংশে কেল্লা নির্মাণ করতে হবে, ২) কেল্লার চারপাশে লবণসহিষ্ণু এবং হরিণের খাদ্য উপযোগী ঘাস বা গাছের চারা লাগাতে হবে, ৩) কেল্লার উচ্চতা বাড়াতে হবে যাতে গভীর জোয়ারে বন্যপ্রাণী ও আশ্রয় নিতে পারে ।
অধ্যাপক ডা. মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ: সাবেক অধ্যক্ষ, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কুমিল্লা অঞ্চলের সাবেক সভাপতি, বর্তমান উপদেষ্টা ও কেন্দ্রীয় সদস্য।

তীব্র বেগে বনের ভেতরে জোয়ারের পানি খাঁড়ি ও খাল দিয়ে যখন ঠুকতে থাকে, তখন বনের শান্ত পরিবেশ নিমিষেই অশান্ত হয়ে উঠে। বনাঞ্চলের ভাষায় ‘প্রথম পালি’র ধাক্কায় সবচেয়ে বিপদে পড়ে চিত্রা হরিণের ছানা ও বন্যশূকরের দল। বড় প্রাণীদের মত সাঁতরে নিজেদের ধরে রাখার মত সামর্থ্য তাদের নাই। তীব্র স্রোতে তাদের ভাসিয়ে নেয় মূল নদীতে, যেখানে উৎপেতে থাকে ক্ষুধার্ত নোনা পানির কুমির। অমাবস্যা-পূর্ণিমার রাতে দিনের চেয়ে জোয়ারের রূপ আরও মারাত্মক।
বনের বানর আর বুনো পাখি যখন অন্ধকারে গাছের ডালে ঘুমিয়ে থাকে তখন হুড়মুড় করে পানি চলে আসে। রাতের আঁধারে জলের গভীরতা ও স্রোতের তীব্রতা আন্দাজ করতে না পেরে অনেক সময় বন্য প্রাণী ও পাখির বাসা পানির নিচে চলে যায়। রাতে উঁচু স্থানে আশ্রয় নেয়ার ব্যাপারটি তাই দিনের চেয়ে অনেক বেশি বিপজ্জনক জোয়ারের পানি যখন বনের মাটি ছাড়িয়ে গাছের কান্ড ছুয়ে ফেলে, সুন্দরবনে তখন এক অদ্ভুত দৃশ্য।
বাঁচার তাগিদে গাছের মগডালে উঠে আসে বিষধর কিং কোবরা, একই ডালে হয়ত আশ্রয় নিয়েছে কোন বানর বা পাখি। শিকার আর শিকারি পাশাপাশি বসে অপেক্ষা করে কখন পানি নামবে। পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনের বন্যপ্রানীদের এ লড়াই চলে দিনে দুবার, প্রতিটি জোয়ারে। কিন্তু সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও একের পর এক ঘূর্ণিঝড়ে সেই লড়াই এখন অস্তিত্বের সংকটে আবর্তিত। গবেষকদের ধারণা, এ ধারা চলতে থাকলে ২০৭০ সালের মধ্যে সুন্দরবনে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের বসবাসের উপযোগী কোন স্থানই অবশিষ্ট থাকবে না। জোয়ারের সময় সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগার দক্ষ সাতারু হয়ে উঠে। জোয়ারের স্রোতের বিপরীতে মাইলের পরে মাইল সাতরিয়ে এক দ্বীপ থেকে অন্য দ্বীপে যাতায়াত, সুন্দরবনের বাঘের নিত্যদিনের ঘটনা।
গবেষকরা বনের গাছে গাছে ক্যামেরা ট্যাপসহ বিভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহার করে দেখেছেন, জোয়ারের সময় বাঘ কীভাবে সাঁতরে স্রোতের বিপরীতে যায় এবং হরিণ কিভাবে দলবদ্ধভাবে উঁচু স্থানে ঘন্টার পর ঘন্টা স্থির দাঁড়িয়ে থাকে। পানি বাড়তে শুরু করলেই চিত্রা হরিণ ও বন্য শুকরের দল বনের তুলনামূলক উঁচু স্থানে বা কৃত্রিম মাটির ঢিবির দিকে ছুটতে থাকে। এসব ঢিবি ‘কেল্লা’ নামে পরিচিত। পানি বাড়লে শত শত হরিণ ও বন্যপ্রাণী কেল্লায় গাদাগাদি করে আশ্রয় নেয়। তবে ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি প্রাণী চলে আসায় এবং খাবারের অভাবে সেখানেও শুরু হয় বেঁচে থাকার নীরব লড়াই। প্রতিটি বাঘ গাছের ছাল আঁচড়ে নিজের একটি নির্দিষ্ট টেরিটরি বা এলাকা চিহ্নিত করে রাখে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাঘের এই এলাকা সংকুচিত হয়ে পড়েছে বলে অনেকে মনে করে। ফলে এক বাঘের এলাকায় আরেক বাঘ ঠুকে পড়ায় প্রায়ই রক্তক্ষয়ী লড়াই হয়। এই ভ্রাতৃঘাতী লড়াইয়ে অনেক সময় প্রবীন বা দূর্বল বাঘ মারা যায় অথবা এলাকা ছাড়া হয়ে লোকালয়ের কাছে চলে আসে।
এদিকে জোয়ারের পানি যখন বনের মাটি ছাড়িয়ে গাছের কান্ড ছুয়ে ফেলে, তখন মাটির গর্তে থাকা বিষধর সাপ গাছের মগডালে আশ্রয় নেয়। একই গাছে হয়ত আশ্রয় নিয়েছে কোন বানর বা পাখি। জীবনের এমন চরম সংকটে একই ডালে পাশাপাশি বসে থাকতে দেখা যায় পানি নামার পূর্ব পর্যন্ত। জোয়ারের পানি নেমে যাওয়ার পর বন্যপ্রাণীর সবচেয়ে বড় লড়াই শুরু হয় মিঠা পানির খুঁজে। সুন্দরবনের নদী- খালের পানি তখন নোনা। প্রাণীদের তৃষ্ণা মেটানোর একমাত্র উপায় বনের ভেতরের প্রাকৃতিক বা মানুষের খনন করা কিছু মিঠা পানির পুকুর। কিন্তু বড় জোয়ার বা জলোচ্ছাসের সময় নোনা পানি ঢুকে পুকুরগুলো নোনা হয়ে যায়। ফলে তৃষ্ণায় ছটফট করলেও প্রাণীরা পানি পান করতে পারে না। বৃষ্টি না হওয়া পর্যন্ত তীব্র তৃষ্ণা নিয়েই তাদের ধুঁকে ধুঁকে বাঁচতে হয়। জলবায়ু সংকটের পাশাপাশি স্থানীয় কাঠুরে, গোলপাতা সংগ্রহকারী, যারা বাওয়ালী নামে পরিচিত এবং জেলেরা যখন অতিরিক্ত মাত্রায় বনের ভেতরের খালের গভীরে বিচরণ করেন, তখন প্রাণীদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রার বিঘ্ন ঘটে। ভয় পেয়ে হরিণ বা বাঘ এমন এলাকায় চলে যায় যেখানে জোয়ারের পানির গভীরতা বেশি। এতে তাদের মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ে। সুন্দরবনের ভয়ংকর জীবনযুদ্ধ কোন কাল্পনিক গল্প নয়। দেশি-বিদেশী বিজ্ঞানীদের গবেষণা ও মাঠ পর্যায়ের জরীপে এর বাস্তবচিত্র বারবার উঠে এসেছে।
বিপন্ন জীবনবৈচিত্র রক্ষার কিছু বৈজ্ঞানিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি
১) বনের গভীর অংশে কেল্লা নির্মাণ করতে হবে, ২) কেল্লার চারপাশে লবণসহিষ্ণু এবং হরিণের খাদ্য উপযোগী ঘাস বা গাছের চারা লাগাতে হবে, ৩) কেল্লার উচ্চতা বাড়াতে হবে যাতে গভীর জোয়ারে বন্যপ্রাণী ও আশ্রয় নিতে পারে ।
অধ্যাপক ডা. মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ: সাবেক অধ্যক্ষ, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কুমিল্লা অঞ্চলের সাবেক সভাপতি, বর্তমান উপদেষ্টা ও কেন্দ্রীয় সদস্য।