মোহাম্মদ আইনুল হক

অপ্রতিমের ছবি আর তার মায়ের কথা বারবার মনে পড়ছে। কিছু ঘটনা শুধু সংবাদ হয়ে থাকে না-মনের ভেতর গভীর ক্ষত তৈরি করে। অপ্রতিমের ঘটনাটি আমার কাছে ঠিক তেমনই একটি ঘটনা।
নাহিদা আপা আমাদের সহকর্মী। অপ্রতিমকে তাঁর সঙ্গে অনেকবার দেখেছি। তখন সে ছিল খুবই ছোট্ট। আজ সেই ছোট্ট ছেলেটি আর নেই-এই কথাটা ভাবতেই বুকটা ভার হয়ে আসে। একজন সহকর্মীর সন্তান, যাকে একসময় নিজের চোখের সামনে দেখেছি, সে আজ আর পৃথিবীতে নেই-এ বাস্তবতাকে মেনে নেওয়া খুব কঠিন।
আমি এখন কানাডায় পরিবার নিয়ে শিক্ষাছুটিতে আছি। আমার নিজের সন্তানও অপ্রতিমের মতো প্রায় ১৩ বছরের। তাই এই ঘটনাটি আমার কাছে শুধু একজন সহকর্মীর পরিবারের শোকের ঘটনা নয়, নিজের সন্তানের মুখের সঙ্গে অপ্রতিমের মুখটাও বারবার মিশে গেছে। দূরদেশে বসেও মনে হয়েছে-ও তো আমার সন্তানের বয়সী! ওরও হয়তো স্বপ্ন ছিল, বন্ধু ছিল, পছন্দ-অপছন্দ ছিল, সামনে ছিল একটি দীর্ঘ জীবন।
সারাদিন অনেকবার লিখতে বসেছি। কিন্তু নাহিদা আপা ও তাঁর পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানানোর মতো যথেষ্ট শব্দ খুঁজে পাইনি। সন্তান হারানোর শোকের সামনে সত্যিই ভাষা খুব অসহায়।
আমরা যারা দেশের বাইরে আছি, তাদের নিয়ে অনেক সময় বলা হয়Ñ“তোমরা তো বেঁচে গেছ”, “বিদেশে চলে গেলে নিরাপদ”, “দেশের সমস্যা থেকে দূরে চলে গেছ।” আবার দেশে থাকা মানুষদের মধ্যেও কখনো এমন ধারণা তৈরি হয় যে বিদেশে থাকলেই বুঝি জীবনের সব সমস্যার সমাধান হয়ে যায়।
কিন্তু বাস্তবতা এত সরল নয়।
বিদেশে থাকলেও আমাদের মন পড়ে থাকে সেই দেশেই। আমাদের পরিবার, শিকড়, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব, স্মৃতি-সবকিছুই তো সেই দেশের সঙ্গে জড়িয়ে। আর সবচেয়ে বড় কথা, দেশটা শুধু দেশে বসবাসকারী মানুষের নয়; দেশটা আমাদের সবার।
কানাডায় বসে নিজের সন্তানকে স্কুলে পাঠানোর সময়ও আমি ভাবি, আমার দেশের একটি ১৩ বছরের শিশু কেন নিরাপদে বড় হওয়ার নিশ্চয়তা পাবে না? অপ্রতিমের মতো একটি শিশুর নিরাপত্তা কেন শুধু তার পরিবারের ব্যক্তিগত দায়িত্ব হবে?
আমরা ধীরে ধীরে হয়তো এমন একটি সমাজের দিকে যাচ্ছি, যেখানে প্রত্যেকে নিজের নিরাপত্তা, নিজের পরিবার, নিজের সুবিধা আর নিজের ভবিষ্যৎ নিয়েই ব্যস্ত। অন্যের সন্তান, অন্যের পরিবার, অন্যের বিপদ এসব যেন ধীরে ধীরে “অন্যের বিষয়” হয়ে যাচ্ছে।
কিন্তু একটি শিশুর নিরাপত্তা কখনোই শুধু তার বাবা-মায়ের দায়িত্ব হতে পারে না। একটি শিশুকে নিরাপদে বড় করে তোলার দায়িত্ব পরিবার যেমন বহন করে, তেমনি সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্র, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠান এবং আমাদের প্রত্যেক নাগরিকেরও কিছু না কিছু দায়িত্ব রয়েছে।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব, আইন প্রয়োগ করার, নিরাপত্তা নিশ্চিত করার, অপরাধ প্রতিরোধ করার এবং কোনো ঘটনা ঘটলে দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করার। সরকারের দায়িত্ব আছে এমন একটি সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশ তৈরি করার, যেখানে শিশু ও সাধারণ মানুষ নিরাপদ বোধ করবে। পরিবারের দায়িত্ব আছে সন্তানের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করার, তার চলাফেরা ও যোগাযোগ সম্পর্কে সচেতন থাকার এবং তার পরিবর্তনগুলো বোঝার।
আর আমাদের নাগরিক হিসেবেও দায়িত্ব আছে অন্যায়ের সামনে নীরব না থাকা, সন্দেহজনক বা ক্ষতিকর কোনো পরিস্থিতি দেখলে যথাযথ জায়গায় জানানো, অন্যের সন্তানকেও নিজের সন্তানের মতো গুরুত্ব দেওয়া এবং সমাজের প্রতি নিজের দায়বদ্ধতাকে স্বীকার করা।
কিন্তু দুঃখজনকভাবে আমরা প্রায় সবাই কোনো না কোনোভাবে দায়িত্বটা অন্যের ওপর ঠেলে দিতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি। নাগরিক বলছি সরকারের কথা, সরকার বলছে পরিবারের কথা, পরিবার বলছে সমাজের কথা-আর এই দায় এড়ানোর মাঝখানে সবচেয়ে অসহায় হয়ে পড়ছে আমাদের সন্তানরা।

অপ্রতিমের ঘটনা আমাদের আরও বড় একটি ভয়াবহ তথ্য আমাদের সামনে এনেছে। বাংলাদেশ পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত বাংলাদেশে ১৫,৭১৭টি শিশুর নিখোঁজ হওয়ার জিডি হয়েছে; এর মধ্যে ২,০৩৮ শিশু এখনো নিখোঁজ বা অদৃশ্য।
বিদেশে চলে আসা কোনো সমাজের সব সমস্যার সমাধান নয়। আবার দেশে থাকা মানেই অনিরাপদ, আর বিদেশে থাকলেই নিরাপদ-এমন সরল সমীকরণও বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না। নিরাপত্তা শুধু একটি দেশের ভৌগোলিক অবস্থানের বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান, সামাজিক মূল্যবোধ, পারিবারিক সম্পর্ক, নাগরিক সচেতনতা এবং আমাদের সম্মিলিত দায়িত্ববোধের বিষয়।
আজ অপ্রতিম নেই। তার মা-বাবার কাছে সে আর কোনোদিন ফিরে আসবে না। কোনো বিচারই সেই শূন্যতা পূরণ করতে পারবে না।
রাষ্ট্র তার দায়িত্ব পালন করুক। সরকার তার দায়িত্ব পালন করুক। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের দায়িত্ব পালন করুক। পরিবারগুলো আরও সচেতন হোক। আর আমরা নাগরিকরাও নিজেদের দায়িত্ব এড়িয়ে না গিয়ে স্বীকার করি।
কারণ অপ্রতিম শুধু নাহিদা আপার সন্তান নয়।
সে আমাদের সমাজের একটি শিশু। আর একজন ১৩ বছরের শিশুর নিরাপদে বেঁচে থাকার অধিকার কোনো পরিবার, কোনো শহর কিংবা কোনো দেশের সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
আজ অপ্রতিম নেই।
কিন্তু আমাদের সন্তানরা আছে।
নাহিদা আপা ও তাঁর পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা! অপ্রতিমের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা। আল্লাহ তার আত্মাকে শান্তিতে রাখুক!!!
মোহাম্মদ আইনুল হক: সহযোগী অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ও বর্তমানে কানাডায় শিক্ষাছুটিতে

অপ্রতিমের ছবি আর তার মায়ের কথা বারবার মনে পড়ছে। কিছু ঘটনা শুধু সংবাদ হয়ে থাকে না-মনের ভেতর গভীর ক্ষত তৈরি করে। অপ্রতিমের ঘটনাটি আমার কাছে ঠিক তেমনই একটি ঘটনা।
নাহিদা আপা আমাদের সহকর্মী। অপ্রতিমকে তাঁর সঙ্গে অনেকবার দেখেছি। তখন সে ছিল খুবই ছোট্ট। আজ সেই ছোট্ট ছেলেটি আর নেই-এই কথাটা ভাবতেই বুকটা ভার হয়ে আসে। একজন সহকর্মীর সন্তান, যাকে একসময় নিজের চোখের সামনে দেখেছি, সে আজ আর পৃথিবীতে নেই-এ বাস্তবতাকে মেনে নেওয়া খুব কঠিন।
আমি এখন কানাডায় পরিবার নিয়ে শিক্ষাছুটিতে আছি। আমার নিজের সন্তানও অপ্রতিমের মতো প্রায় ১৩ বছরের। তাই এই ঘটনাটি আমার কাছে শুধু একজন সহকর্মীর পরিবারের শোকের ঘটনা নয়, নিজের সন্তানের মুখের সঙ্গে অপ্রতিমের মুখটাও বারবার মিশে গেছে। দূরদেশে বসেও মনে হয়েছে-ও তো আমার সন্তানের বয়সী! ওরও হয়তো স্বপ্ন ছিল, বন্ধু ছিল, পছন্দ-অপছন্দ ছিল, সামনে ছিল একটি দীর্ঘ জীবন।
সারাদিন অনেকবার লিখতে বসেছি। কিন্তু নাহিদা আপা ও তাঁর পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানানোর মতো যথেষ্ট শব্দ খুঁজে পাইনি। সন্তান হারানোর শোকের সামনে সত্যিই ভাষা খুব অসহায়।
আমরা যারা দেশের বাইরে আছি, তাদের নিয়ে অনেক সময় বলা হয়Ñ“তোমরা তো বেঁচে গেছ”, “বিদেশে চলে গেলে নিরাপদ”, “দেশের সমস্যা থেকে দূরে চলে গেছ।” আবার দেশে থাকা মানুষদের মধ্যেও কখনো এমন ধারণা তৈরি হয় যে বিদেশে থাকলেই বুঝি জীবনের সব সমস্যার সমাধান হয়ে যায়।
কিন্তু বাস্তবতা এত সরল নয়।
বিদেশে থাকলেও আমাদের মন পড়ে থাকে সেই দেশেই। আমাদের পরিবার, শিকড়, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব, স্মৃতি-সবকিছুই তো সেই দেশের সঙ্গে জড়িয়ে। আর সবচেয়ে বড় কথা, দেশটা শুধু দেশে বসবাসকারী মানুষের নয়; দেশটা আমাদের সবার।
কানাডায় বসে নিজের সন্তানকে স্কুলে পাঠানোর সময়ও আমি ভাবি, আমার দেশের একটি ১৩ বছরের শিশু কেন নিরাপদে বড় হওয়ার নিশ্চয়তা পাবে না? অপ্রতিমের মতো একটি শিশুর নিরাপত্তা কেন শুধু তার পরিবারের ব্যক্তিগত দায়িত্ব হবে?
আমরা ধীরে ধীরে হয়তো এমন একটি সমাজের দিকে যাচ্ছি, যেখানে প্রত্যেকে নিজের নিরাপত্তা, নিজের পরিবার, নিজের সুবিধা আর নিজের ভবিষ্যৎ নিয়েই ব্যস্ত। অন্যের সন্তান, অন্যের পরিবার, অন্যের বিপদ এসব যেন ধীরে ধীরে “অন্যের বিষয়” হয়ে যাচ্ছে।
কিন্তু একটি শিশুর নিরাপত্তা কখনোই শুধু তার বাবা-মায়ের দায়িত্ব হতে পারে না। একটি শিশুকে নিরাপদে বড় করে তোলার দায়িত্ব পরিবার যেমন বহন করে, তেমনি সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্র, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠান এবং আমাদের প্রত্যেক নাগরিকেরও কিছু না কিছু দায়িত্ব রয়েছে।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব, আইন প্রয়োগ করার, নিরাপত্তা নিশ্চিত করার, অপরাধ প্রতিরোধ করার এবং কোনো ঘটনা ঘটলে দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করার। সরকারের দায়িত্ব আছে এমন একটি সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশ তৈরি করার, যেখানে শিশু ও সাধারণ মানুষ নিরাপদ বোধ করবে। পরিবারের দায়িত্ব আছে সন্তানের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করার, তার চলাফেরা ও যোগাযোগ সম্পর্কে সচেতন থাকার এবং তার পরিবর্তনগুলো বোঝার।
আর আমাদের নাগরিক হিসেবেও দায়িত্ব আছে অন্যায়ের সামনে নীরব না থাকা, সন্দেহজনক বা ক্ষতিকর কোনো পরিস্থিতি দেখলে যথাযথ জায়গায় জানানো, অন্যের সন্তানকেও নিজের সন্তানের মতো গুরুত্ব দেওয়া এবং সমাজের প্রতি নিজের দায়বদ্ধতাকে স্বীকার করা।
কিন্তু দুঃখজনকভাবে আমরা প্রায় সবাই কোনো না কোনোভাবে দায়িত্বটা অন্যের ওপর ঠেলে দিতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি। নাগরিক বলছি সরকারের কথা, সরকার বলছে পরিবারের কথা, পরিবার বলছে সমাজের কথা-আর এই দায় এড়ানোর মাঝখানে সবচেয়ে অসহায় হয়ে পড়ছে আমাদের সন্তানরা।

অপ্রতিমের ঘটনা আমাদের আরও বড় একটি ভয়াবহ তথ্য আমাদের সামনে এনেছে। বাংলাদেশ পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত বাংলাদেশে ১৫,৭১৭টি শিশুর নিখোঁজ হওয়ার জিডি হয়েছে; এর মধ্যে ২,০৩৮ শিশু এখনো নিখোঁজ বা অদৃশ্য।
বিদেশে চলে আসা কোনো সমাজের সব সমস্যার সমাধান নয়। আবার দেশে থাকা মানেই অনিরাপদ, আর বিদেশে থাকলেই নিরাপদ-এমন সরল সমীকরণও বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না। নিরাপত্তা শুধু একটি দেশের ভৌগোলিক অবস্থানের বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান, সামাজিক মূল্যবোধ, পারিবারিক সম্পর্ক, নাগরিক সচেতনতা এবং আমাদের সম্মিলিত দায়িত্ববোধের বিষয়।
আজ অপ্রতিম নেই। তার মা-বাবার কাছে সে আর কোনোদিন ফিরে আসবে না। কোনো বিচারই সেই শূন্যতা পূরণ করতে পারবে না।
রাষ্ট্র তার দায়িত্ব পালন করুক। সরকার তার দায়িত্ব পালন করুক। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের দায়িত্ব পালন করুক। পরিবারগুলো আরও সচেতন হোক। আর আমরা নাগরিকরাও নিজেদের দায়িত্ব এড়িয়ে না গিয়ে স্বীকার করি।
কারণ অপ্রতিম শুধু নাহিদা আপার সন্তান নয়।
সে আমাদের সমাজের একটি শিশু। আর একজন ১৩ বছরের শিশুর নিরাপদে বেঁচে থাকার অধিকার কোনো পরিবার, কোনো শহর কিংবা কোনো দেশের সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
আজ অপ্রতিম নেই।
কিন্তু আমাদের সন্তানরা আছে।
নাহিদা আপা ও তাঁর পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা! অপ্রতিমের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা। আল্লাহ তার আত্মাকে শান্তিতে রাখুক!!!
মোহাম্মদ আইনুল হক: সহযোগী অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ও বর্তমানে কানাডায় শিক্ষাছুটিতে