ভাস্কর মজুমদার

তাজমিনের চলে যাওয়ার পর থেকে মাথার ভেতর কিছু প্রশ্ন বারবার ঘুরপাক খাচ্ছে। পনেরো বছরের একটি মেয়ের এমন নির্মম মৃত্যু শুধু হৃদয়কে ভারাক্রান্ত করে না, আমাদের চারপাশে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের মনোজগৎ নিয়েও গভীর উদ্বেগ তৈরি করে। একটি নিষ্পাপ জীবন এভাবে শেষ হয়ে গেল! অথচ তার মৃত্যুর আগে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোও আমাদের সামনে এমন কিছু প্রশ্ন রেখে গেছে, যেগুলোর উত্তর খোঁজা আজ অত্যন্ত জরুরি।
বেশিদিন হয়নি 'জেন জি' শব্দটার সঙ্গে ভালোভাবে পরিচিত হয়েছি। তারপর থেকে এই প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের চিন্তাভাবনা, কথাবার্তা, নিজেদের মধ্যে আলোচনা, সম্পর্কের ধরন, প্রতিবাদের ভাষা, আবেগের প্রকাশ এবং সামাজিক আচরণ একটু গভীরভাবে বোঝার চেষ্টা করছি। যত দেখছি, ততই বিস্মিত হচ্ছি। কখনো তাদের সাহস, আত্মবিশ্বাস, স্বাধীন চিন্তা আর প্রযুক্তির সঙ্গে সহজ সম্পর্ক দেখে মুগ্ধ হচ্ছি। আবার কখনো তাদের অস্থিরতা, আবেগের তীব্রতা, সম্পর্কের দ্রুত পরিবর্তন এবং কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা দেখে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ছি।
আমাদের বয়সীদের অনেকের ঘরেই এখন জেন জি প্রজন্মের ছেলেমেয়ে। আবার অনেক পরিবারে বড় হচ্ছে জেন আলফা। অর্থাৎ এমন এক প্রজন্ম, যাদের জন্মের আগেই পৃথিবী ডিজিটাল হয়ে গেছে। যারা হাঁটতে শেখার পাশাপাশি মোবাইলের পর্দায় আঙুল চালাতে শিখেছে। যাদের কাছে বাস্তব পৃথিবী আর ভার্চুয়াল পৃথিবীর সীমারেখা ক্রমেই অস্পষ্ট হয়ে উঠছে।
তাজমিনের ঘটনাটাই ধরা যাক।
সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয়ের মাত্র ১৭ দিনের মাথায় একজন যুবকের সঙ্গে কক্সবাজারে গিয়েছিল পনেরো বছরের এই কিশোরী। সেখানে একটি আবাসিক হোটেলেও অবস্থান করেছিল বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে। এরপর বাড়ি ফেরার পথে ঘটে তার জীবনের সেই ভয়ংকর পরিণতি।
এই ঘটনা জানার পর প্রথমেই মনে প্রশ্ন জাগে, মাত্র ১৭ দিনের পরিচয়ে একজন মানুষকে এতটা বিশ্বাস করা সম্ভব হলো কীভাবে? পনেরো বছরের একটি মেয়ে কীভাবে এমন একটি সিদ্ধান্ত নিতে পারল? কী এমন আবেগ, কী এমন আকর্ষণ, কী এমন মানসিক তাড়না তাকে পরিচিত নিরাপদ পরিবেশ ছেড়ে অচেনা একটি জায়গায় নিয়ে গেল?
ভালোবাসা কি এখন এতটাই তাড়াহুড়োর বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে? প্রেম হলেই কি একান্তে সময় কাটাতে হবে? সম্পর্কের গভীরতা কি এখন শারীরিক ঘনিষ্ঠতা কিংবা একসঙ্গে কোথাও রাত কাটানোর মাধ্যমে প্রমাণ করতে হয়? নাকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তৈরি হওয়া একধরনের কৃত্রিম রোমান্টিক পৃথিবী কিশোর-কিশোরীদের কাছে ভালোবাসার অর্থটাই বদলে দিচ্ছে?
প্রশ্নগুলো অস্বস্তিকর, কিন্তু এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
আশি কিংবা নব্বইয়ের দশকেও প্রেম ছিল, ভালোবাসা ছিল, আবেগ ছিল, অভিমান ছিল। ছিল নিষিদ্ধের প্রতি কৌতূহল, বয়সের স্বাভাবিক দুরন্তপনা, কখনো ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতাও। কিন্তু সেই সময় ভালোবাসার প্রকাশে একধরনের অপেক্ষা ছিল, দ্বিধা ছিল, সামাজিক সংকোচ ছিল। একটি চিঠির উত্তর পেতে দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হতো। প্রিয় মানুষটির সঙ্গে কয়েক মিনিট কথা বলাও ছিল অনেক বড় প্রাপ্তি। সম্পর্ক গড়ে উঠত ধীরে ধীরে, পরিচয় থেকে বিশ্বাসে পৌঁছাতে সময় লাগত। অবশ্য তখনও ভুল হতো, প্রতারণা ছিল, সম্পর্কের নামে বিপদও ছিল। কিন্তু আজকের মতো মুহূর্তের মধ্যে অচেনা একজন মানুষের সঙ্গে গভীর ব্যক্তিগত যোগাযোগ গড়ে তোলার এত সহজ সুযোগ ছিল না।
আজ প্রযুক্তি সেই অপেক্ষার দেয়াল ভেঙে দিয়েছে। কয়েক ঘণ্টার পরিচয়েও তৈরি হচ্ছে গভীর আবেগের দাবি, কয়েক দিনের কথোপকথনেই জন্ম নিচ্ছে আজীবন বিশ্বাসের অনুভূতি। প্রশ্ন হচ্ছে, মানুষের ভালোবাসার ক্ষমতা কি বদলে গেছে, নাকি বদলে গেছে ভালোবাসাকে বোঝার ধৈর্য, সম্পর্কের গভীরতা উপলব্ধি করার সময়টুকু?
২০০০ সালের পর পৃথিবীটা যেন এক অদ্ভুত গতিতে পাল্টে গেল। মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টিকটক, স্ন্যাপচ্যাট একের পর এক এসে মানুষের যোগাযোগের ধারণাই বদলে দিল। যে বিষয়গুলো একসময় বয়স, অভিজ্ঞতা আর সামাজিক পরিপক্বতার সঙ্গে ধীরে ধীরে মানুষের জীবনে প্রবেশ করত, আজ সেগুলো একটি শিশু কয়েক মিনিটেই দেখে ফেলছে।
একটি বারো কিংবা তেরো বছরের শিশু এখন এমন সব দৃশ্য, সম্পর্ক, কথোপকথন আর জীবনযাপনের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছে, যেগুলো বোঝার মতো মানসিক পরিপক্বতা তার এখনো তৈরি হয়নি। বয়সের আগেই তার সামনে খুলে যাচ্ছে বড়দের পৃথিবী। অথচ সেই পৃথিবীর জটিলতা, প্রতারণা, যৌন শোষণ, আবেগের ফাঁদ কিংবা ব্যক্তিগত নিরাপত্তার ঝুঁকি সম্পর্কে তার উপলব্ধি কতটুকু?
একসময় কিশোর বয়সের স্বপ্ন তৈরি হতো বই পড়ে, সিনেমা দেখে, বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করে, চারপাশের মানুষদের জীবন পর্যবেক্ষণ করে। এখন সেই স্বপ্নের বড় অংশ তৈরি হচ্ছে মোবাইলের পর্দায়। যেখানে ভালোবাসা অনেক সময় দেখানো হয় বাস্তবতার চেয়ে অনেক বেশি রোমাঞ্চকর, সম্পর্ককে দেখানো হয় সীমাহীন স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে, আর আবেগের বশে নেওয়া হঠকারী সিদ্ধান্তকেও কখনো কখনো সাহসিকতার মোড়কে উপস্থাপন করা হয়।
এই অবিরাম দৃশ্য আর গল্পের প্রভাব একটি কিশোর মনের ওপর কতটা পড়ছে, তা কি আমরা কখনো গভীরভাবে ভেবেছি?
আরও একটি বিষয় আমাকে ভাবায়। আমরা যে প্রজন্মকে এত অস্থির বলছি, সেই অস্থিরতার পেছনে আমাদের নিজেদের ভূমিকা কতটুকু?
একটি শিশু এখন সারাদিন অনলাইনে শত শত মানুষের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে। কিন্তু নিজের মনের কথা বলার জন্য পরিবারের একজন মানুষকে খুঁজে পায় কি? তার হাজারজন অনুসারী থাকতে পারে, অথচ গভীর রাতে মন খারাপ হলে পাশে বসে কথা বলার মতো একজন মানুষও হয়তো থাকে না।
আমরা সন্তানদের জন্য দামি মোবাইল কিনছি, ভালো বিদ্যালয়ে পড়াচ্ছি, কোচিংয়ের ব্যবস্থা করছি, ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতায় এগিয়ে রাখার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। কিন্তু তাদের মনের ভেতরে কী চলছে, সেই খবরটুকু রাখছি তো?
পরীক্ষায় কত নম্বর পেল, কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বে, ভবিষ্যতে কী হবে, এসব নিয়ে আমাদের যত উদ্বেগ, তার বন্ধুত্ব, একাকিত্ব, প্রথম প্রেম, প্রত্যাখ্যানের ভয় কিংবা মানসিক পরিবর্তন নিয়ে কি আমরা ততটা ভাবি?
অনেক পরিবারে সন্তান একটু বড় হলেই তার সঙ্গে বাবা-মায়ের কথোপকথন কমে যায়। প্রয়োজনীয় কথা হয়, পড়াশোনার কথা হয়, খাওয়াদাওয়ার কথা হয়, কিন্তু মনের কথা হয় না। সন্তানও ধীরে ধীরে নিজের আলাদা একটি পৃথিবী তৈরি করে। সেই পৃথিবীতে বন্ধু থাকে, অনলাইন পরিচিত মানুষ থাকে, গোপন সম্পর্ক থাকে, কিন্তু অনেক সময় বাবা-মায়ের প্রবেশাধিকার থাকে না।
এখানেই তৈরি হয় এক ভয়ংকর দূরত্ব।
আবার আমাদের সমাজে ভালোবাসা, শরীর, যৌনতা কিংবা ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে সন্তানদের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করার সংস্কৃতিও খুব একটা গড়ে ওঠেনি। আমরা মনে করি এসব বিষয়ে কথা বললে সন্তান হয়তো আরও বেশি কৌতূহলী হয়ে উঠবে। অথচ বাস্তবতা হচ্ছে, পরিবার কথা না বললেও ইন্টারনেট ঠিকই কথা বলছে। বন্ধুদের কাছ থেকে, অপরিচিত মানুষের কাছ থেকে, নানা ভিডিও আর অনলাইন কনটেন্ট থেকে তারা এসব বিষয়ে ধারণা তৈরি করছে।
সেই ধারণা কতটা সত্য, কতটা নিরাপদ, কতটা বিভ্রান্তিকর, সেটি যাচাই করার মতো অভিজ্ঞতা তাদের নেই।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি নতুন সংকট। তাৎক্ষণিক প্রাপ্তির অভ্যাস।
একটি ভিডিও ভালো না লাগলে মুহূর্তেই বদলে ফেলা যায়। একটি ছবি পছন্দ না হলে সরিয়ে দেওয়া যায়। একটি বার্তার উত্তর না পেলে অস্থিরতা তৈরি হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিনিয়ত নতুন কিছু দেখার, নতুন কারও সঙ্গে পরিচিত হওয়ার, অন্যের মনোযোগ পাওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
কিন্তু বাস্তব জীবন তো এত দ্রুত চলে না। বাস্তব সম্পর্কে অপেক্ষা আছে, ভুল বোঝাবুঝি আছে, দায়িত্ব আছে, সীমাবদ্ধতা আছে। সেখানে সব ইচ্ছা সঙ্গে সঙ্গে পূরণ হয় না। এই দুই পৃথিবীর ব্যবধান কিশোর মনকে কতটা প্রভাবিত করছে, সেটিও বোঝা দরকার।
তবে জেন জি কিংবা জেন আলফাকে এককভাবে দায়ী করা অন্যায় হবে। এই প্রজন্মের মধ্যেই অসাধারণ মেধা, মানবিকতা, সৃজনশীলতা, সাহস আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর শক্তি রয়েছে। অনেক বিষয়ে তারা আমাদের চেয়েও সচেতন। অন্যায় দেখলে প্রতিবাদ করতে জানে, নিজের মত প্রকাশ করতে জানে, পুরোনো অনেক অযৌক্তিক সামাজিক ধারণাকে প্রশ্ন করতে জানে।
সমস্যা তাদের স্বাধীন চিন্তায় নয়। সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন স্বাধীনতার সুযোগ বাড়ে, কিন্তু সেই স্বাধীনতা ব্যবহার করার মতো মানসিক প্রস্তুতি, দায়িত্ববোধ এবং নিরাপত্তার শিক্ষা সমানভাবে গড়ে ওঠে না।
আর এই জায়গায় পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সমাজ এবং রাষ্ট্রের দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় গণিত আছে, বিজ্ঞান আছে, ভাষা আছে, ইতিহাস আছে। কিন্তু আবেগকে বোঝা, সম্পর্কের সীমারেখা নির্ধারণ করা, অপরিচিত মানুষের আচরণ যাচাই করা, অনলাইন প্রতারণা থেকে নিজেকে রক্ষা করা কিংবা বিপদের মুহূর্তে সাহায্য চাওয়ার মতো জীবনঘনিষ্ঠ শিক্ষা কতটুকু আছে?
আমরা শিশুদের পরীক্ষায় ভালো করার কৌশল শেখাই, কিন্তু ভুল মানুষের কাছ থেকে নিজেকে সরিয়ে আনার সাহস শেখাই কি?
আমরা তাদের সফল মানুষ হওয়ার স্বপ্ন দেখাই, কিন্তু নিরাপদ ও দায়িত্বশীল মানুষ হয়ে ওঠার শিক্ষাটা কতটা দিই?
তাজমিনের ঘটনাটি এখানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য সামনে নিয়ে আসে।

পনেরো বছরের একটি মেয়ে দেখতে যতই বড় হোক, মানসিকভাবে সে এখনো পরিপূর্ণ প্রাপ্তবয়স্ক নয়। এই বয়সে আবেগ প্রবল হয়, নতুন অভিজ্ঞতার প্রতি আকর্ষণ তৈরি হয়, নিজের সিদ্ধান্তকে সঠিক মনে করার প্রবণতাও থাকতে পারে। ফলে ভুল মানুষকে বিশ্বাস করা কিংবা বিপজ্জনক সিদ্ধান্ত নেওয়ার আশঙ্কা থাকে।
কিন্তু কোনো কিশোরীর ভুল সিদ্ধান্ত কখনো তার ওপর সংঘটিত ধর্ষণ, নির্যাতন কিংবা হত্যার দায় তৈরি করে না। সেই দায় সম্পূর্ণ অপরাধীর। এ বিষয়ে কোনো দ্বিধা থাকার সুযোগ নেই।
বরং আমাদের আরও প্রশ্ন করা উচিত, একটি শিশু এমন পরিস্থিতিতে পড়লে তাকে নিরাপদে ফেরানোর ব্যবস্থা কোথায়? অপরিচিত মানুষের সঙ্গে দূরে চলে গেলে তাকে সুরক্ষা দেওয়ার সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা কতটা কার্যকর? হোটেল কর্তৃপক্ষের বয়স যাচাই, পরিবহন ব্যবস্থার নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা এবং শিশু সুরক্ষার কাঠামো কতটা দায়িত্বশীল?
শুধু সন্তানকে শাসন করে কিংবা মোবাইল কেড়ে নিয়ে এই সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন বিশ্বাসের সম্পর্ক, বয়স অনুযায়ী সচেতনতা, নিয়মিত কথোপকথন এবং এমন একটি পারিবারিক পরিবেশ, যেখানে সন্তান ভুল করলেও সত্যিটা বলতে ভয় পাবে না।
কারণ ভয় দিয়ে সন্তানকে সাময়িকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, কিন্তু বিশ্বাস ছাড়া তার মনের দরজা খোলা যায় না।
আর এই দরজা একবার বন্ধ হয়ে গেলে, একই বাড়িতে থেকেও বাবা-মা হয়তো বুঝতে পারেন না সন্তানের জীবনে কখন, কীভাবে, কোন অপরিচিত মানুষটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
প্রযুক্তি আমাদের পৃথিবীর দূরত্ব কমিয়েছে, কিন্তু মানুষের সঙ্গে মানুষের মানসিক দূরত্বও কি কোথাও বাড়িয়ে দিয়েছে?আমরা কি সন্তানদের সঙ্গে একই ঘরে বসে থেকেও আলাদা আলাদা পৃথিবীতে বাস করছি?
আমাদের প্রজন্ম হয়তো প্রযুক্তির এমন বিস্ফোরণ দেখেনি, কিন্তু জীবনের একটি বড় শিক্ষা পেয়েছিল। মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করতে সময় লাগে, বিশ্বাস অর্জন করতে সময় লাগে, আর ভালোবাসার সঙ্গে দায়িত্ববোধের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। এই মূল্যবোধগুলো নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব আমাদেরই। তবে পুরোনো দিনের সবকিছু ভালো ছিল, আর আজকের সবকিছু খারাপ, এমন সরল সিদ্ধান্তেও পৌঁছানো যাবে না।
কারণ পৃথিবীকে পেছনে ফেরানো সম্ভব নয়। মোবাইল, ইন্টারনেট কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে জীবন থেকে পুরোপুরি সরিয়ে দেওয়াও বাস্তবসম্মত নয়। প্রয়োজন প্রযুক্তির সঙ্গে মানবিক শিক্ষা, স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্ববোধ, আর আধুনিকতার সঙ্গে জীবনের মূল্যবোধের সমন্বয়।
তাজমিনের মৃত্যু তাই শুধু একটি পরিবারের ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়। এটি আমাদের সময়ের সামনে দাঁড় করানো এক নির্মম প্রশ্ন।
আমরা কি আমাদের সন্তানদের সত্যিই চিনতে পারছি?
তাদের হাসির আড়ালের একাকিত্ব, আত্মবিশ্বাসের আড়ালের অপরিপক্বতা, প্রতিবাদের আড়ালের অভিমান কিংবা স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার আড়ালে লুকিয়ে থাকা নিরাপত্তাহীনতা বুঝতে পারছি?
নাকি তাদের জন্য সবকিছুর ব্যবস্থা করতে গিয়ে সবচেয়ে প্রয়োজনীয় জিনিসটি, অর্থাৎ সময়, মনোযোগ আর নির্ভরতার জায়গাটুকুই দিতে ভুলে যাচ্ছি?
তাজমিন আর ফিরে আসবে না। তার পরিবারের শূন্যতা কোনো কথায় পূরণ হবে না। কিন্তু তার চলে যাওয়ার পরও যদি আমরা শুধু কয়েক দিন আবেগ প্রকাশ করি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ জানাই, নতুন প্রজন্মকে দোষারোপ করি, তারপর আবার সব ভুলে যাই, তাহলে এই মৃত্যু আমাদের কিছুই শেখাতে পারবে না।
আজ প্রয়োজন নতুন প্রজন্মকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো নয়, বরং তাদের মনোজগৎকে বোঝার আন্তরিক চেষ্টা। প্রয়োজন নিজেদেরও প্রশ্ন করা, আমরা কেমন পরিবার তৈরি করছি, কেমন সমাজ রেখে যাচ্ছি, কেমন পৃথিবীতে আমাদের সন্তানদের বড় হতে দিচ্ছি।
তাই নতুন প্রজন্মের আচরণ দেখে শুধু বিস্মিত কিংবা ক্ষুব্ধ হওয়ার আগে আমাদের নিজেদের দিকেও একবার তাকানো প্রয়োজন।
আমরা সন্তানদের হাতে গোটা পৃথিবী তুলে দিয়েছি। কিন্তু সেই পৃথিবীতে কীভাবে নিরাপদে বাঁচতে হয়, কাকে বিশ্বাস করতে হয়, কখন থামতে হয়, আর বিপদে পড়লে কোথায় ফিরে আসতে হয়, সেই শিক্ষাটুকু কি দিতে পেরেছি?
তাজমিনের চলে যাওয়া আমাদের সামনে হয়তো সবচেয়ে কঠিন এই প্রশ্নটিই রেখে গেল।
ভাস্কর মজুমদার: জেনারেল ম্যানেজার, মার্চেন্ডাইজিং, ব্র্যাক আড়ং ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী।

তাজমিনের চলে যাওয়ার পর থেকে মাথার ভেতর কিছু প্রশ্ন বারবার ঘুরপাক খাচ্ছে। পনেরো বছরের একটি মেয়ের এমন নির্মম মৃত্যু শুধু হৃদয়কে ভারাক্রান্ত করে না, আমাদের চারপাশে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের মনোজগৎ নিয়েও গভীর উদ্বেগ তৈরি করে। একটি নিষ্পাপ জীবন এভাবে শেষ হয়ে গেল! অথচ তার মৃত্যুর আগে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোও আমাদের সামনে এমন কিছু প্রশ্ন রেখে গেছে, যেগুলোর উত্তর খোঁজা আজ অত্যন্ত জরুরি।
বেশিদিন হয়নি 'জেন জি' শব্দটার সঙ্গে ভালোভাবে পরিচিত হয়েছি। তারপর থেকে এই প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের চিন্তাভাবনা, কথাবার্তা, নিজেদের মধ্যে আলোচনা, সম্পর্কের ধরন, প্রতিবাদের ভাষা, আবেগের প্রকাশ এবং সামাজিক আচরণ একটু গভীরভাবে বোঝার চেষ্টা করছি। যত দেখছি, ততই বিস্মিত হচ্ছি। কখনো তাদের সাহস, আত্মবিশ্বাস, স্বাধীন চিন্তা আর প্রযুক্তির সঙ্গে সহজ সম্পর্ক দেখে মুগ্ধ হচ্ছি। আবার কখনো তাদের অস্থিরতা, আবেগের তীব্রতা, সম্পর্কের দ্রুত পরিবর্তন এবং কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা দেখে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ছি।
আমাদের বয়সীদের অনেকের ঘরেই এখন জেন জি প্রজন্মের ছেলেমেয়ে। আবার অনেক পরিবারে বড় হচ্ছে জেন আলফা। অর্থাৎ এমন এক প্রজন্ম, যাদের জন্মের আগেই পৃথিবী ডিজিটাল হয়ে গেছে। যারা হাঁটতে শেখার পাশাপাশি মোবাইলের পর্দায় আঙুল চালাতে শিখেছে। যাদের কাছে বাস্তব পৃথিবী আর ভার্চুয়াল পৃথিবীর সীমারেখা ক্রমেই অস্পষ্ট হয়ে উঠছে।
তাজমিনের ঘটনাটাই ধরা যাক।
সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয়ের মাত্র ১৭ দিনের মাথায় একজন যুবকের সঙ্গে কক্সবাজারে গিয়েছিল পনেরো বছরের এই কিশোরী। সেখানে একটি আবাসিক হোটেলেও অবস্থান করেছিল বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে। এরপর বাড়ি ফেরার পথে ঘটে তার জীবনের সেই ভয়ংকর পরিণতি।
এই ঘটনা জানার পর প্রথমেই মনে প্রশ্ন জাগে, মাত্র ১৭ দিনের পরিচয়ে একজন মানুষকে এতটা বিশ্বাস করা সম্ভব হলো কীভাবে? পনেরো বছরের একটি মেয়ে কীভাবে এমন একটি সিদ্ধান্ত নিতে পারল? কী এমন আবেগ, কী এমন আকর্ষণ, কী এমন মানসিক তাড়না তাকে পরিচিত নিরাপদ পরিবেশ ছেড়ে অচেনা একটি জায়গায় নিয়ে গেল?
ভালোবাসা কি এখন এতটাই তাড়াহুড়োর বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে? প্রেম হলেই কি একান্তে সময় কাটাতে হবে? সম্পর্কের গভীরতা কি এখন শারীরিক ঘনিষ্ঠতা কিংবা একসঙ্গে কোথাও রাত কাটানোর মাধ্যমে প্রমাণ করতে হয়? নাকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তৈরি হওয়া একধরনের কৃত্রিম রোমান্টিক পৃথিবী কিশোর-কিশোরীদের কাছে ভালোবাসার অর্থটাই বদলে দিচ্ছে?
প্রশ্নগুলো অস্বস্তিকর, কিন্তু এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
আশি কিংবা নব্বইয়ের দশকেও প্রেম ছিল, ভালোবাসা ছিল, আবেগ ছিল, অভিমান ছিল। ছিল নিষিদ্ধের প্রতি কৌতূহল, বয়সের স্বাভাবিক দুরন্তপনা, কখনো ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতাও। কিন্তু সেই সময় ভালোবাসার প্রকাশে একধরনের অপেক্ষা ছিল, দ্বিধা ছিল, সামাজিক সংকোচ ছিল। একটি চিঠির উত্তর পেতে দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হতো। প্রিয় মানুষটির সঙ্গে কয়েক মিনিট কথা বলাও ছিল অনেক বড় প্রাপ্তি। সম্পর্ক গড়ে উঠত ধীরে ধীরে, পরিচয় থেকে বিশ্বাসে পৌঁছাতে সময় লাগত। অবশ্য তখনও ভুল হতো, প্রতারণা ছিল, সম্পর্কের নামে বিপদও ছিল। কিন্তু আজকের মতো মুহূর্তের মধ্যে অচেনা একজন মানুষের সঙ্গে গভীর ব্যক্তিগত যোগাযোগ গড়ে তোলার এত সহজ সুযোগ ছিল না।
আজ প্রযুক্তি সেই অপেক্ষার দেয়াল ভেঙে দিয়েছে। কয়েক ঘণ্টার পরিচয়েও তৈরি হচ্ছে গভীর আবেগের দাবি, কয়েক দিনের কথোপকথনেই জন্ম নিচ্ছে আজীবন বিশ্বাসের অনুভূতি। প্রশ্ন হচ্ছে, মানুষের ভালোবাসার ক্ষমতা কি বদলে গেছে, নাকি বদলে গেছে ভালোবাসাকে বোঝার ধৈর্য, সম্পর্কের গভীরতা উপলব্ধি করার সময়টুকু?
২০০০ সালের পর পৃথিবীটা যেন এক অদ্ভুত গতিতে পাল্টে গেল। মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টিকটক, স্ন্যাপচ্যাট একের পর এক এসে মানুষের যোগাযোগের ধারণাই বদলে দিল। যে বিষয়গুলো একসময় বয়স, অভিজ্ঞতা আর সামাজিক পরিপক্বতার সঙ্গে ধীরে ধীরে মানুষের জীবনে প্রবেশ করত, আজ সেগুলো একটি শিশু কয়েক মিনিটেই দেখে ফেলছে।
একটি বারো কিংবা তেরো বছরের শিশু এখন এমন সব দৃশ্য, সম্পর্ক, কথোপকথন আর জীবনযাপনের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছে, যেগুলো বোঝার মতো মানসিক পরিপক্বতা তার এখনো তৈরি হয়নি। বয়সের আগেই তার সামনে খুলে যাচ্ছে বড়দের পৃথিবী। অথচ সেই পৃথিবীর জটিলতা, প্রতারণা, যৌন শোষণ, আবেগের ফাঁদ কিংবা ব্যক্তিগত নিরাপত্তার ঝুঁকি সম্পর্কে তার উপলব্ধি কতটুকু?
একসময় কিশোর বয়সের স্বপ্ন তৈরি হতো বই পড়ে, সিনেমা দেখে, বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করে, চারপাশের মানুষদের জীবন পর্যবেক্ষণ করে। এখন সেই স্বপ্নের বড় অংশ তৈরি হচ্ছে মোবাইলের পর্দায়। যেখানে ভালোবাসা অনেক সময় দেখানো হয় বাস্তবতার চেয়ে অনেক বেশি রোমাঞ্চকর, সম্পর্ককে দেখানো হয় সীমাহীন স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে, আর আবেগের বশে নেওয়া হঠকারী সিদ্ধান্তকেও কখনো কখনো সাহসিকতার মোড়কে উপস্থাপন করা হয়।
এই অবিরাম দৃশ্য আর গল্পের প্রভাব একটি কিশোর মনের ওপর কতটা পড়ছে, তা কি আমরা কখনো গভীরভাবে ভেবেছি?
আরও একটি বিষয় আমাকে ভাবায়। আমরা যে প্রজন্মকে এত অস্থির বলছি, সেই অস্থিরতার পেছনে আমাদের নিজেদের ভূমিকা কতটুকু?
একটি শিশু এখন সারাদিন অনলাইনে শত শত মানুষের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে। কিন্তু নিজের মনের কথা বলার জন্য পরিবারের একজন মানুষকে খুঁজে পায় কি? তার হাজারজন অনুসারী থাকতে পারে, অথচ গভীর রাতে মন খারাপ হলে পাশে বসে কথা বলার মতো একজন মানুষও হয়তো থাকে না।
আমরা সন্তানদের জন্য দামি মোবাইল কিনছি, ভালো বিদ্যালয়ে পড়াচ্ছি, কোচিংয়ের ব্যবস্থা করছি, ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতায় এগিয়ে রাখার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। কিন্তু তাদের মনের ভেতরে কী চলছে, সেই খবরটুকু রাখছি তো?
পরীক্ষায় কত নম্বর পেল, কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বে, ভবিষ্যতে কী হবে, এসব নিয়ে আমাদের যত উদ্বেগ, তার বন্ধুত্ব, একাকিত্ব, প্রথম প্রেম, প্রত্যাখ্যানের ভয় কিংবা মানসিক পরিবর্তন নিয়ে কি আমরা ততটা ভাবি?
অনেক পরিবারে সন্তান একটু বড় হলেই তার সঙ্গে বাবা-মায়ের কথোপকথন কমে যায়। প্রয়োজনীয় কথা হয়, পড়াশোনার কথা হয়, খাওয়াদাওয়ার কথা হয়, কিন্তু মনের কথা হয় না। সন্তানও ধীরে ধীরে নিজের আলাদা একটি পৃথিবী তৈরি করে। সেই পৃথিবীতে বন্ধু থাকে, অনলাইন পরিচিত মানুষ থাকে, গোপন সম্পর্ক থাকে, কিন্তু অনেক সময় বাবা-মায়ের প্রবেশাধিকার থাকে না।
এখানেই তৈরি হয় এক ভয়ংকর দূরত্ব।
আবার আমাদের সমাজে ভালোবাসা, শরীর, যৌনতা কিংবা ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে সন্তানদের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করার সংস্কৃতিও খুব একটা গড়ে ওঠেনি। আমরা মনে করি এসব বিষয়ে কথা বললে সন্তান হয়তো আরও বেশি কৌতূহলী হয়ে উঠবে। অথচ বাস্তবতা হচ্ছে, পরিবার কথা না বললেও ইন্টারনেট ঠিকই কথা বলছে। বন্ধুদের কাছ থেকে, অপরিচিত মানুষের কাছ থেকে, নানা ভিডিও আর অনলাইন কনটেন্ট থেকে তারা এসব বিষয়ে ধারণা তৈরি করছে।
সেই ধারণা কতটা সত্য, কতটা নিরাপদ, কতটা বিভ্রান্তিকর, সেটি যাচাই করার মতো অভিজ্ঞতা তাদের নেই।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি নতুন সংকট। তাৎক্ষণিক প্রাপ্তির অভ্যাস।
একটি ভিডিও ভালো না লাগলে মুহূর্তেই বদলে ফেলা যায়। একটি ছবি পছন্দ না হলে সরিয়ে দেওয়া যায়। একটি বার্তার উত্তর না পেলে অস্থিরতা তৈরি হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিনিয়ত নতুন কিছু দেখার, নতুন কারও সঙ্গে পরিচিত হওয়ার, অন্যের মনোযোগ পাওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
কিন্তু বাস্তব জীবন তো এত দ্রুত চলে না। বাস্তব সম্পর্কে অপেক্ষা আছে, ভুল বোঝাবুঝি আছে, দায়িত্ব আছে, সীমাবদ্ধতা আছে। সেখানে সব ইচ্ছা সঙ্গে সঙ্গে পূরণ হয় না। এই দুই পৃথিবীর ব্যবধান কিশোর মনকে কতটা প্রভাবিত করছে, সেটিও বোঝা দরকার।
তবে জেন জি কিংবা জেন আলফাকে এককভাবে দায়ী করা অন্যায় হবে। এই প্রজন্মের মধ্যেই অসাধারণ মেধা, মানবিকতা, সৃজনশীলতা, সাহস আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর শক্তি রয়েছে। অনেক বিষয়ে তারা আমাদের চেয়েও সচেতন। অন্যায় দেখলে প্রতিবাদ করতে জানে, নিজের মত প্রকাশ করতে জানে, পুরোনো অনেক অযৌক্তিক সামাজিক ধারণাকে প্রশ্ন করতে জানে।
সমস্যা তাদের স্বাধীন চিন্তায় নয়। সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন স্বাধীনতার সুযোগ বাড়ে, কিন্তু সেই স্বাধীনতা ব্যবহার করার মতো মানসিক প্রস্তুতি, দায়িত্ববোধ এবং নিরাপত্তার শিক্ষা সমানভাবে গড়ে ওঠে না।
আর এই জায়গায় পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সমাজ এবং রাষ্ট্রের দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় গণিত আছে, বিজ্ঞান আছে, ভাষা আছে, ইতিহাস আছে। কিন্তু আবেগকে বোঝা, সম্পর্কের সীমারেখা নির্ধারণ করা, অপরিচিত মানুষের আচরণ যাচাই করা, অনলাইন প্রতারণা থেকে নিজেকে রক্ষা করা কিংবা বিপদের মুহূর্তে সাহায্য চাওয়ার মতো জীবনঘনিষ্ঠ শিক্ষা কতটুকু আছে?
আমরা শিশুদের পরীক্ষায় ভালো করার কৌশল শেখাই, কিন্তু ভুল মানুষের কাছ থেকে নিজেকে সরিয়ে আনার সাহস শেখাই কি?
আমরা তাদের সফল মানুষ হওয়ার স্বপ্ন দেখাই, কিন্তু নিরাপদ ও দায়িত্বশীল মানুষ হয়ে ওঠার শিক্ষাটা কতটা দিই?
তাজমিনের ঘটনাটি এখানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য সামনে নিয়ে আসে।

পনেরো বছরের একটি মেয়ে দেখতে যতই বড় হোক, মানসিকভাবে সে এখনো পরিপূর্ণ প্রাপ্তবয়স্ক নয়। এই বয়সে আবেগ প্রবল হয়, নতুন অভিজ্ঞতার প্রতি আকর্ষণ তৈরি হয়, নিজের সিদ্ধান্তকে সঠিক মনে করার প্রবণতাও থাকতে পারে। ফলে ভুল মানুষকে বিশ্বাস করা কিংবা বিপজ্জনক সিদ্ধান্ত নেওয়ার আশঙ্কা থাকে।
কিন্তু কোনো কিশোরীর ভুল সিদ্ধান্ত কখনো তার ওপর সংঘটিত ধর্ষণ, নির্যাতন কিংবা হত্যার দায় তৈরি করে না। সেই দায় সম্পূর্ণ অপরাধীর। এ বিষয়ে কোনো দ্বিধা থাকার সুযোগ নেই।
বরং আমাদের আরও প্রশ্ন করা উচিত, একটি শিশু এমন পরিস্থিতিতে পড়লে তাকে নিরাপদে ফেরানোর ব্যবস্থা কোথায়? অপরিচিত মানুষের সঙ্গে দূরে চলে গেলে তাকে সুরক্ষা দেওয়ার সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা কতটা কার্যকর? হোটেল কর্তৃপক্ষের বয়স যাচাই, পরিবহন ব্যবস্থার নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা এবং শিশু সুরক্ষার কাঠামো কতটা দায়িত্বশীল?
শুধু সন্তানকে শাসন করে কিংবা মোবাইল কেড়ে নিয়ে এই সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন বিশ্বাসের সম্পর্ক, বয়স অনুযায়ী সচেতনতা, নিয়মিত কথোপকথন এবং এমন একটি পারিবারিক পরিবেশ, যেখানে সন্তান ভুল করলেও সত্যিটা বলতে ভয় পাবে না।
কারণ ভয় দিয়ে সন্তানকে সাময়িকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, কিন্তু বিশ্বাস ছাড়া তার মনের দরজা খোলা যায় না।
আর এই দরজা একবার বন্ধ হয়ে গেলে, একই বাড়িতে থেকেও বাবা-মা হয়তো বুঝতে পারেন না সন্তানের জীবনে কখন, কীভাবে, কোন অপরিচিত মানুষটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
প্রযুক্তি আমাদের পৃথিবীর দূরত্ব কমিয়েছে, কিন্তু মানুষের সঙ্গে মানুষের মানসিক দূরত্বও কি কোথাও বাড়িয়ে দিয়েছে?আমরা কি সন্তানদের সঙ্গে একই ঘরে বসে থেকেও আলাদা আলাদা পৃথিবীতে বাস করছি?
আমাদের প্রজন্ম হয়তো প্রযুক্তির এমন বিস্ফোরণ দেখেনি, কিন্তু জীবনের একটি বড় শিক্ষা পেয়েছিল। মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করতে সময় লাগে, বিশ্বাস অর্জন করতে সময় লাগে, আর ভালোবাসার সঙ্গে দায়িত্ববোধের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। এই মূল্যবোধগুলো নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব আমাদেরই। তবে পুরোনো দিনের সবকিছু ভালো ছিল, আর আজকের সবকিছু খারাপ, এমন সরল সিদ্ধান্তেও পৌঁছানো যাবে না।
কারণ পৃথিবীকে পেছনে ফেরানো সম্ভব নয়। মোবাইল, ইন্টারনেট কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে জীবন থেকে পুরোপুরি সরিয়ে দেওয়াও বাস্তবসম্মত নয়। প্রয়োজন প্রযুক্তির সঙ্গে মানবিক শিক্ষা, স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্ববোধ, আর আধুনিকতার সঙ্গে জীবনের মূল্যবোধের সমন্বয়।
তাজমিনের মৃত্যু তাই শুধু একটি পরিবারের ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়। এটি আমাদের সময়ের সামনে দাঁড় করানো এক নির্মম প্রশ্ন।
আমরা কি আমাদের সন্তানদের সত্যিই চিনতে পারছি?
তাদের হাসির আড়ালের একাকিত্ব, আত্মবিশ্বাসের আড়ালের অপরিপক্বতা, প্রতিবাদের আড়ালের অভিমান কিংবা স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার আড়ালে লুকিয়ে থাকা নিরাপত্তাহীনতা বুঝতে পারছি?
নাকি তাদের জন্য সবকিছুর ব্যবস্থা করতে গিয়ে সবচেয়ে প্রয়োজনীয় জিনিসটি, অর্থাৎ সময়, মনোযোগ আর নির্ভরতার জায়গাটুকুই দিতে ভুলে যাচ্ছি?
তাজমিন আর ফিরে আসবে না। তার পরিবারের শূন্যতা কোনো কথায় পূরণ হবে না। কিন্তু তার চলে যাওয়ার পরও যদি আমরা শুধু কয়েক দিন আবেগ প্রকাশ করি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ জানাই, নতুন প্রজন্মকে দোষারোপ করি, তারপর আবার সব ভুলে যাই, তাহলে এই মৃত্যু আমাদের কিছুই শেখাতে পারবে না।
আজ প্রয়োজন নতুন প্রজন্মকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো নয়, বরং তাদের মনোজগৎকে বোঝার আন্তরিক চেষ্টা। প্রয়োজন নিজেদেরও প্রশ্ন করা, আমরা কেমন পরিবার তৈরি করছি, কেমন সমাজ রেখে যাচ্ছি, কেমন পৃথিবীতে আমাদের সন্তানদের বড় হতে দিচ্ছি।
তাই নতুন প্রজন্মের আচরণ দেখে শুধু বিস্মিত কিংবা ক্ষুব্ধ হওয়ার আগে আমাদের নিজেদের দিকেও একবার তাকানো প্রয়োজন।
আমরা সন্তানদের হাতে গোটা পৃথিবী তুলে দিয়েছি। কিন্তু সেই পৃথিবীতে কীভাবে নিরাপদে বাঁচতে হয়, কাকে বিশ্বাস করতে হয়, কখন থামতে হয়, আর বিপদে পড়লে কোথায় ফিরে আসতে হয়, সেই শিক্ষাটুকু কি দিতে পেরেছি?
তাজমিনের চলে যাওয়া আমাদের সামনে হয়তো সবচেয়ে কঠিন এই প্রশ্নটিই রেখে গেল।
ভাস্কর মজুমদার: জেনারেল ম্যানেজার, মার্চেন্ডাইজিং, ব্র্যাক আড়ং ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী।