সৌরভের সুবচন
মো.আবু ছালেক সেলিম রেজা সৌরভ

জীবন এক অদ্ভুত, সুন্দর ও বৈচিত্র্যময় নদীর মতো। এর কোনো কূলে পাওয়ার বিপুল আনন্দ, আবার কোনো কূলে হারানোর নীরব বেদনা। আঁকাবাঁকা এই স্রোতস্বিনী নদীটি শেষ পর্যন্ত দুটি শক্তিশালী পালের ওপর ভর করেই মহাসাগরের পানে এগিয়ে চলে। সে দুটি পাল হলো 'আশা' এবং 'ভালোবাসা'। মানুষ জন্মায় এক অজানা ভবিষ্যতের আশা বুকে নিয়ে, আর শৈশব থেকে বড় হয়ে ওঠে চারপাশের পরম ভালোবাসার ওম পেয়ে। এই দুই চিরন্তন শক্তির অপূর্ব মেলবন্ধন ও দোলাচলেই তৈরি হয় প্রতিটি মানুষের নিজস্ব জীবনের অনন্য ইতিহাস।
জীবনের পথ কখনোই সরল বা সমতল নয়। পথচলায় নানা ঘাত-প্রতিঘাত, অপ্রত্যাশিত বাধা এবং কঠিন ব্যর্থতা আসাই জীবনের স্বাভাবিক নিয়ম। একটি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য বা লক্ষ্য অর্জনের জন্য মানুষ দিনরাত কঠোর পরিশ্রম করে, রক্তপানি করা ঘাম ঝরায়। কিন্তু যখন সমস্ত চেষ্টা ও সাধনার পরেও সেই কাক্সিক্ষত সফলতা ধরা দেয় না, তখন মানুষের মনের গহীনে অন্ধকার বিষাদের মেঘ জমতে শুরু করে।
আজকের প্রতিযোগিতামূলক পৃথিবীতে প্রত্যাশার বোঝা এত ভারী হয়ে ওঠে যে, অল্পতেই মানুষ নিজের যোগ্যতা নিয়ে সংশয়ে পড়ে যায়। ব্যর্থতার তীব্র ধাক্কা সামলাতে না পেরে অনেকেই মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে এবং চরম হতাশার গভীর গর্তে নিপতিত হয়। তখন জীবনকে এক দুঃসহ বোঝা বলে মনে হতে থাকে। ব্যর্থতার যন্ত্রণায় কাতর হয়ে অনেকে সমাজ ও পরিবার থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিয়ে একাকীত্বে দিন কাটায়। আর অত্যন্ত বেদনার বিষয় হলো, কেউ কেউ এই তীব্র মানসিক যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে জীবন থেকে পালিয়ে বেড়ানোর চরম পথ বেছে নেয় এবং আত্মহননের মতো আত্মঘাতী পদক্ষেপে লিপ্ত হয়।
তবে পৃথিবীর সবচেয়ে গাঢ় অন্ধকারের ভেতরেও যে আলোকবর্তিকাটি কখনো পুরোপুরি নিভে যায় না, তা-ই হলো আশা। আশা মানুষকে শেখায় যে, একটি বন্ধ দরজার পেছনে আরও শত শত খোলা দরজা অপেক্ষা করে থাকে। একবারের পতনই জীবনের চূড়ান্ত সমাপ্তি নয়; বরং পড়ে গিয়ে আবার উঠে দাঁড়ানোর অদম্য ক্ষমতাই মানুষের প্রকৃত পরিচয়। আশা এক জাদুকরী শক্তি, যা মানুষের ভেতরে অনুভূতির পুনর্জাগরণ ঘটায়। হতাশার কালো মেঘ সরিয়ে একজন মানুষ যখন আবার নতুন স্বপ্নের পেছনে ছুটতে শুরু করে, তখন সে উপলব্ধি করতে পারে যে, অতীত ব্যর্থতাগুলো আসলে শেষ পরিণতি ছিল না; তা ছিল নতুন সফলতার ভিত্তিপ্রস্তর ও জীবনের অমূল্য শিক্ষা।
রূপান্তর ও বেঁচে থাকার প্রেরণা হিসেবে ভালোবাসা
মানুষ একা বেঁচে থাকার জন্য এই পৃথিবীতে আসেনি। সমাজবদ্ধ জীব হিসেবে মানুষের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য ও শক্তি হলো তার অনুভূতির গভীরতা, যার একদম শীর্ষে রয়েছে ভালোবাসা। জীবনের কঠিন সময়গুলোতে কিংবা চরম ব্যর্থতার মুহূর্তে যখন পুরো পৃথিবী মুখ ফিরিয়ে নেয়, তখন যদি অন্তত একজন মানুষ এসে পাশে দাঁড়ায়, সহানুভূতি প্রকাশ করে এবং ভালোবাসার হাত বাড়িয়ে দেয়, তবে ভেঙে পড়া মানুষের বেঁচে থাকার ইচ্ছাটা মুহূর্তে দ্বিগুণ হয়ে যায়।
মানুষের জীবনে ভালোবাসার বিস্তার কেবল কোনো নির্দিষ্ট সম্পর্কের সীমানায় আবদ্ধ নয়; তা অত্যন্ত ব্যাপক ও গভীর:
পরিবার ও স্বজনের সম্পর্কের বন্ধন: পিতা-মাতা, ভাই-বোন, বন্ধু-বান্ধব, জীবনসঙ্গী ও সন্তানদের ভালোবাসার উষ্ণতায় গড়ে ওঠে মানুষের আত্মিক নিরাপত্তার মূল ভিত্তি। এই ভালোবাসা কঠিন সময়ে টিকে থাকার মানসিক ঢাল হিসেবে কাজ করে।
অন্য মানুষের প্রতি গভীর মমতা: সম্পর্কের বাঁধন ছাড়াও অপরিচিত কোনো বিপদগ্রস্ত মানুষের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া, অন্যের দুঃখে ব্যথিত হওয়া এবং পাশে দাঁড়ানোই প্রমাণ করে যে সমাজে মানবিকতা ও ভালোবাসার মূল ভিত্তি এখনো অটুট আছে।
প্রকৃতি ও সমস্ত সৃষ্টির প্রতি প্রেম: মানুষের ভালোবাসা কেবল মানুষে মানুষে সীমাবদ্ধ থাকে না। একটি ছোট্ট চারা গাছের যত্ন নেওয়া, বনের পশুপাখি কিংবা রাস্তার অবহেলিত প্রাণীকে খাবার দেওয়া এবং প্রকৃতির সৌন্দর্যে বিমোহিত হওয়ার মধ্যেও ভালোবাসার এক চমৎকার ও পবিত্র বহিঃপ্রকাশ ঘটে।
স্রষ্টার সৃষ্টির প্রতি অনুরাাগ: স্রষ্টার তৈরি অপার সৃষ্টিকে ভালোবাসা এবং তাদের কল্যাণ সাধনের মধ্যেই মূলত স্রষ্টার প্রতি মানুষের গভীর ভক্তি ও ভালোবাসা প্রতিফলিত হয়।
ভালোবাসা মানুষের হৃদয়ের সুপ্ত অহংকার, হিংসা, বিদ্বেষ ও দূরপনেয় হতাশা দূর করে সেখানে এক অনাবিল প্রশান্তি এনে দেয়। কোনো বিষণ্ণ ও হতাশ মানুষের প্রতি একটুখানি সহানুভ‚তিশীল দৃষ্টি, একটি সুন্দর আশ্বাস বা নিখাদ ভালোবাসার স্পর্শ তাকে আত্মহত্যার মতো চিরতরে মুছে যাওয়ার পথ থেকেও ফিরিয়ে আনতে পারে।
ইতিহাস, সাহিত্য ও সমাজজীবনে আশা ও ভালোবাসার কাহিনী
মানবসভ্যতার ইতিহাস, মহাকাব্যিক সাহিত্য এবং লোকগাথা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, পৃথিবীর প্রায় সব কালজয়ী ঘটনার নেপথ্যে রয়েছে আশা এবং ভালোবাসার অমর লড়াই। সমাজে ও দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে এমন অসংখ্য রূপকথা সমতুল্য সত্য ঘটনা, যা যুগ যুগ ধরে মানুষকে প্রতিক‚লতার বিরুদ্ধে লড়াই করার পথ দেখায়।
১. যুদ্ধে ও মহামারীতে টিকে থাকার লড়াই: বিশ্বজুড়ে যখন কোনো যুদ্ধ, মহামারী বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ নেমে আসে এবং লাখ লাখ মানুষের জীবন থমকে যায়, তখন মানুষ কেবল একে অপরের প্রতি ভালোবাসা আর নতুন ভোরের আশাকে সম্বল করে টিকে থাকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ বা সাম্প্রতিক নানা সংকটকালে ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে মানুষ যে আবার নতুন করে সংসার ও সমাজ গড়ার স্বপ্ন দেখেছে, তা আশারই এক পরাক্রমশালী রূপ।
২. মানবিকতার অবিস্মরণীয় গল্প: আমাদের চারপাশেই প্রতিদিন অসংখ্য গল্প জন্ম নেয়-যেখানে সবকিছু হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে যাওয়া কোনো মানুষ কোনো মহৎ হৃদয়ের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে আবার শূন্য থেকে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। কোনো সমাজসেবকের অক্লান্ত ভালোবাসা ও আশার শক্তিতে পথশিশুরা শিক্ষার আলো পাচ্ছে, অনাথেরা খুঁজে পাচ্ছে নতুন ঠিকানা।
৩. প্রকৃতি ও মনের পুনর্জাগরণ: বসন্তের আগমনে যেমন রিক্ত গাছে আবার নতুন কচি পাতা গজায়, তেমনি মানুষের ভালোবাসার স্পর্শে দীর্ঘদিনের শুষ্ক ও ভাঙা হৃদয় আবার নতুন করে স্পন্দিত হতে শুরু করে।
এসব বাস্তব উদাহরণ আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেয় যে, জীবনের চরমতম বিপর্যয়, কঠিনতম ব্যাধি কিংবা সবচেয়ে বড় ক্ষতিও আশা এবং ভালোবাসার সম্মিলিত মহাশক্তির কাছে পরাজয় স্বীকার করতে বাধ্য।
আশা ও ভালোবাসার চিরন্তন দোলাচলে মানবজীবন
মানুষের সমগ্র জীবনটি মূলত আশা এবং ভালোবাসার এক নিত্যদিনের সুন্দর দোলাচল। প্রতিদিন ভোরে যখন নতুন সূর্য ওঠে, মানুষ এক বুক আশা নিয়ে দিনের কাজ শুরু করে-এই ভেবে যে আজকের দিনটি গতকালের চেয়ে অনেক বেশি অর্থবহ ও সফল হবে। আর দিনশেষে ক্লান্তি ভুলে ঘরে ফেরে পরম ভালোবাসার মানুষগুলোর হাসিমুখ দেখার এবং তাদের সান্নিধ্য পাওয়ার গভীর আকুলতায়।
এই দুটি অদৃশ্য কিন্তু প্রচণ্ড শক্তিশালী শক্তি ছাড়া মানুষের জীবন শুধুই এক প্রাণহীন, যান্ত্রিক পরিকাঠামো মাত্র। আশা মানুষের মনকে সুদূরের দিকে ধাবিত করে, নতুন দিগন্তের স্বপ্ন দেখায় এবং প্রতিকূল পথে হাঁটার অদৃশ্য শক্তি জোগায়। অন্যদিকে, ভালোবাসা জীবনের সেই দীর্ঘ ও কঠিন যাত্রাপথকে চমৎকার, সুশোভিত ও আনন্দময় করে তোলে। শত সহস্র প্রতিকূলতা, শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তি, প্রিয়জন হারানোর শোক কিংবা ব্যর্থতার পাহাড় ডিঙিয়েও যে মানুষ আবার হাসতে পারে এবং প্রতিদিন নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখে, তা কেবল এই দুই নিয়ামক- আশা ও ভালোবাসার জোরেই সম্ভব হয়।
পৃথিবী যতদিন ঘূর্ণায়মান থাকবে, মানুষের বেঁচে থাকার সংগ্রামও ততদিন থাকবে। কিন্তু সেই সংগ্রামের শেষ পরিণতি কখনোই হতাশায় শেষ হতে পারে না। যতদিন পুব আকাশে সোনালী সূর্য উদিত হবে, যতদিন মানুষের বুকে দয়া, সহানুভূতি ও ভালোবাসার প্রদীপ প্রজ্জ্বলিত থাকবে, ততদিন মানুষ স্বপ্ন দেখবে, ভেঙে পড়েও আবার দ্বিগুণ শক্তিতে ঘুরে দাঁড়াবে। কারণ জীবনের সকল সমীকরণের শেষে একটি মহাশাশ্বত সত্য ফুটে ওঠে-যতক্ষণ আশা আছে এবং ভালোবাসা আছে, ততক্ষণ জীবন সুন্দর ও বেঁচে থাকা অর্থপূর্ণ।
মো. আবু ছালেক সেলিম রেজা সৌরভ: অধ্যক্ষ, সোনার বাংলা কলেজ, কুমিল্লা। সাবেক সিনেট সদস্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।

জীবন এক অদ্ভুত, সুন্দর ও বৈচিত্র্যময় নদীর মতো। এর কোনো কূলে পাওয়ার বিপুল আনন্দ, আবার কোনো কূলে হারানোর নীরব বেদনা। আঁকাবাঁকা এই স্রোতস্বিনী নদীটি শেষ পর্যন্ত দুটি শক্তিশালী পালের ওপর ভর করেই মহাসাগরের পানে এগিয়ে চলে। সে দুটি পাল হলো 'আশা' এবং 'ভালোবাসা'। মানুষ জন্মায় এক অজানা ভবিষ্যতের আশা বুকে নিয়ে, আর শৈশব থেকে বড় হয়ে ওঠে চারপাশের পরম ভালোবাসার ওম পেয়ে। এই দুই চিরন্তন শক্তির অপূর্ব মেলবন্ধন ও দোলাচলেই তৈরি হয় প্রতিটি মানুষের নিজস্ব জীবনের অনন্য ইতিহাস।
জীবনের পথ কখনোই সরল বা সমতল নয়। পথচলায় নানা ঘাত-প্রতিঘাত, অপ্রত্যাশিত বাধা এবং কঠিন ব্যর্থতা আসাই জীবনের স্বাভাবিক নিয়ম। একটি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য বা লক্ষ্য অর্জনের জন্য মানুষ দিনরাত কঠোর পরিশ্রম করে, রক্তপানি করা ঘাম ঝরায়। কিন্তু যখন সমস্ত চেষ্টা ও সাধনার পরেও সেই কাক্সিক্ষত সফলতা ধরা দেয় না, তখন মানুষের মনের গহীনে অন্ধকার বিষাদের মেঘ জমতে শুরু করে।
আজকের প্রতিযোগিতামূলক পৃথিবীতে প্রত্যাশার বোঝা এত ভারী হয়ে ওঠে যে, অল্পতেই মানুষ নিজের যোগ্যতা নিয়ে সংশয়ে পড়ে যায়। ব্যর্থতার তীব্র ধাক্কা সামলাতে না পেরে অনেকেই মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে এবং চরম হতাশার গভীর গর্তে নিপতিত হয়। তখন জীবনকে এক দুঃসহ বোঝা বলে মনে হতে থাকে। ব্যর্থতার যন্ত্রণায় কাতর হয়ে অনেকে সমাজ ও পরিবার থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিয়ে একাকীত্বে দিন কাটায়। আর অত্যন্ত বেদনার বিষয় হলো, কেউ কেউ এই তীব্র মানসিক যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে জীবন থেকে পালিয়ে বেড়ানোর চরম পথ বেছে নেয় এবং আত্মহননের মতো আত্মঘাতী পদক্ষেপে লিপ্ত হয়।
তবে পৃথিবীর সবচেয়ে গাঢ় অন্ধকারের ভেতরেও যে আলোকবর্তিকাটি কখনো পুরোপুরি নিভে যায় না, তা-ই হলো আশা। আশা মানুষকে শেখায় যে, একটি বন্ধ দরজার পেছনে আরও শত শত খোলা দরজা অপেক্ষা করে থাকে। একবারের পতনই জীবনের চূড়ান্ত সমাপ্তি নয়; বরং পড়ে গিয়ে আবার উঠে দাঁড়ানোর অদম্য ক্ষমতাই মানুষের প্রকৃত পরিচয়। আশা এক জাদুকরী শক্তি, যা মানুষের ভেতরে অনুভূতির পুনর্জাগরণ ঘটায়। হতাশার কালো মেঘ সরিয়ে একজন মানুষ যখন আবার নতুন স্বপ্নের পেছনে ছুটতে শুরু করে, তখন সে উপলব্ধি করতে পারে যে, অতীত ব্যর্থতাগুলো আসলে শেষ পরিণতি ছিল না; তা ছিল নতুন সফলতার ভিত্তিপ্রস্তর ও জীবনের অমূল্য শিক্ষা।
রূপান্তর ও বেঁচে থাকার প্রেরণা হিসেবে ভালোবাসা
মানুষ একা বেঁচে থাকার জন্য এই পৃথিবীতে আসেনি। সমাজবদ্ধ জীব হিসেবে মানুষের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য ও শক্তি হলো তার অনুভূতির গভীরতা, যার একদম শীর্ষে রয়েছে ভালোবাসা। জীবনের কঠিন সময়গুলোতে কিংবা চরম ব্যর্থতার মুহূর্তে যখন পুরো পৃথিবী মুখ ফিরিয়ে নেয়, তখন যদি অন্তত একজন মানুষ এসে পাশে দাঁড়ায়, সহানুভূতি প্রকাশ করে এবং ভালোবাসার হাত বাড়িয়ে দেয়, তবে ভেঙে পড়া মানুষের বেঁচে থাকার ইচ্ছাটা মুহূর্তে দ্বিগুণ হয়ে যায়।
মানুষের জীবনে ভালোবাসার বিস্তার কেবল কোনো নির্দিষ্ট সম্পর্কের সীমানায় আবদ্ধ নয়; তা অত্যন্ত ব্যাপক ও গভীর:
পরিবার ও স্বজনের সম্পর্কের বন্ধন: পিতা-মাতা, ভাই-বোন, বন্ধু-বান্ধব, জীবনসঙ্গী ও সন্তানদের ভালোবাসার উষ্ণতায় গড়ে ওঠে মানুষের আত্মিক নিরাপত্তার মূল ভিত্তি। এই ভালোবাসা কঠিন সময়ে টিকে থাকার মানসিক ঢাল হিসেবে কাজ করে।
অন্য মানুষের প্রতি গভীর মমতা: সম্পর্কের বাঁধন ছাড়াও অপরিচিত কোনো বিপদগ্রস্ত মানুষের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া, অন্যের দুঃখে ব্যথিত হওয়া এবং পাশে দাঁড়ানোই প্রমাণ করে যে সমাজে মানবিকতা ও ভালোবাসার মূল ভিত্তি এখনো অটুট আছে।
প্রকৃতি ও সমস্ত সৃষ্টির প্রতি প্রেম: মানুষের ভালোবাসা কেবল মানুষে মানুষে সীমাবদ্ধ থাকে না। একটি ছোট্ট চারা গাছের যত্ন নেওয়া, বনের পশুপাখি কিংবা রাস্তার অবহেলিত প্রাণীকে খাবার দেওয়া এবং প্রকৃতির সৌন্দর্যে বিমোহিত হওয়ার মধ্যেও ভালোবাসার এক চমৎকার ও পবিত্র বহিঃপ্রকাশ ঘটে।
স্রষ্টার সৃষ্টির প্রতি অনুরাাগ: স্রষ্টার তৈরি অপার সৃষ্টিকে ভালোবাসা এবং তাদের কল্যাণ সাধনের মধ্যেই মূলত স্রষ্টার প্রতি মানুষের গভীর ভক্তি ও ভালোবাসা প্রতিফলিত হয়।
ভালোবাসা মানুষের হৃদয়ের সুপ্ত অহংকার, হিংসা, বিদ্বেষ ও দূরপনেয় হতাশা দূর করে সেখানে এক অনাবিল প্রশান্তি এনে দেয়। কোনো বিষণ্ণ ও হতাশ মানুষের প্রতি একটুখানি সহানুভ‚তিশীল দৃষ্টি, একটি সুন্দর আশ্বাস বা নিখাদ ভালোবাসার স্পর্শ তাকে আত্মহত্যার মতো চিরতরে মুছে যাওয়ার পথ থেকেও ফিরিয়ে আনতে পারে।
ইতিহাস, সাহিত্য ও সমাজজীবনে আশা ও ভালোবাসার কাহিনী
মানবসভ্যতার ইতিহাস, মহাকাব্যিক সাহিত্য এবং লোকগাথা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, পৃথিবীর প্রায় সব কালজয়ী ঘটনার নেপথ্যে রয়েছে আশা এবং ভালোবাসার অমর লড়াই। সমাজে ও দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে এমন অসংখ্য রূপকথা সমতুল্য সত্য ঘটনা, যা যুগ যুগ ধরে মানুষকে প্রতিক‚লতার বিরুদ্ধে লড়াই করার পথ দেখায়।
১. যুদ্ধে ও মহামারীতে টিকে থাকার লড়াই: বিশ্বজুড়ে যখন কোনো যুদ্ধ, মহামারী বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ নেমে আসে এবং লাখ লাখ মানুষের জীবন থমকে যায়, তখন মানুষ কেবল একে অপরের প্রতি ভালোবাসা আর নতুন ভোরের আশাকে সম্বল করে টিকে থাকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ বা সাম্প্রতিক নানা সংকটকালে ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে মানুষ যে আবার নতুন করে সংসার ও সমাজ গড়ার স্বপ্ন দেখেছে, তা আশারই এক পরাক্রমশালী রূপ।
২. মানবিকতার অবিস্মরণীয় গল্প: আমাদের চারপাশেই প্রতিদিন অসংখ্য গল্প জন্ম নেয়-যেখানে সবকিছু হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে যাওয়া কোনো মানুষ কোনো মহৎ হৃদয়ের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে আবার শূন্য থেকে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। কোনো সমাজসেবকের অক্লান্ত ভালোবাসা ও আশার শক্তিতে পথশিশুরা শিক্ষার আলো পাচ্ছে, অনাথেরা খুঁজে পাচ্ছে নতুন ঠিকানা।
৩. প্রকৃতি ও মনের পুনর্জাগরণ: বসন্তের আগমনে যেমন রিক্ত গাছে আবার নতুন কচি পাতা গজায়, তেমনি মানুষের ভালোবাসার স্পর্শে দীর্ঘদিনের শুষ্ক ও ভাঙা হৃদয় আবার নতুন করে স্পন্দিত হতে শুরু করে।
এসব বাস্তব উদাহরণ আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেয় যে, জীবনের চরমতম বিপর্যয়, কঠিনতম ব্যাধি কিংবা সবচেয়ে বড় ক্ষতিও আশা এবং ভালোবাসার সম্মিলিত মহাশক্তির কাছে পরাজয় স্বীকার করতে বাধ্য।
আশা ও ভালোবাসার চিরন্তন দোলাচলে মানবজীবন
মানুষের সমগ্র জীবনটি মূলত আশা এবং ভালোবাসার এক নিত্যদিনের সুন্দর দোলাচল। প্রতিদিন ভোরে যখন নতুন সূর্য ওঠে, মানুষ এক বুক আশা নিয়ে দিনের কাজ শুরু করে-এই ভেবে যে আজকের দিনটি গতকালের চেয়ে অনেক বেশি অর্থবহ ও সফল হবে। আর দিনশেষে ক্লান্তি ভুলে ঘরে ফেরে পরম ভালোবাসার মানুষগুলোর হাসিমুখ দেখার এবং তাদের সান্নিধ্য পাওয়ার গভীর আকুলতায়।
এই দুটি অদৃশ্য কিন্তু প্রচণ্ড শক্তিশালী শক্তি ছাড়া মানুষের জীবন শুধুই এক প্রাণহীন, যান্ত্রিক পরিকাঠামো মাত্র। আশা মানুষের মনকে সুদূরের দিকে ধাবিত করে, নতুন দিগন্তের স্বপ্ন দেখায় এবং প্রতিকূল পথে হাঁটার অদৃশ্য শক্তি জোগায়। অন্যদিকে, ভালোবাসা জীবনের সেই দীর্ঘ ও কঠিন যাত্রাপথকে চমৎকার, সুশোভিত ও আনন্দময় করে তোলে। শত সহস্র প্রতিকূলতা, শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তি, প্রিয়জন হারানোর শোক কিংবা ব্যর্থতার পাহাড় ডিঙিয়েও যে মানুষ আবার হাসতে পারে এবং প্রতিদিন নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখে, তা কেবল এই দুই নিয়ামক- আশা ও ভালোবাসার জোরেই সম্ভব হয়।
পৃথিবী যতদিন ঘূর্ণায়মান থাকবে, মানুষের বেঁচে থাকার সংগ্রামও ততদিন থাকবে। কিন্তু সেই সংগ্রামের শেষ পরিণতি কখনোই হতাশায় শেষ হতে পারে না। যতদিন পুব আকাশে সোনালী সূর্য উদিত হবে, যতদিন মানুষের বুকে দয়া, সহানুভূতি ও ভালোবাসার প্রদীপ প্রজ্জ্বলিত থাকবে, ততদিন মানুষ স্বপ্ন দেখবে, ভেঙে পড়েও আবার দ্বিগুণ শক্তিতে ঘুরে দাঁড়াবে। কারণ জীবনের সকল সমীকরণের শেষে একটি মহাশাশ্বত সত্য ফুটে ওঠে-যতক্ষণ আশা আছে এবং ভালোবাসা আছে, ততক্ষণ জীবন সুন্দর ও বেঁচে থাকা অর্থপূর্ণ।
মো. আবু ছালেক সেলিম রেজা সৌরভ: অধ্যক্ষ, সোনার বাংলা কলেজ, কুমিল্লা। সাবেক সিনেট সদস্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।