ড. চৌধুরী সাকেরা ফেরদৌস

আমার আব্বু, ত্রয়োদশ সংসদের কুমিল্লা-৬ আসনে বিএনপি থেকে নির্বাচিত, বীর মুক্তিযোদ্ধা মনিরুল হক চৌধুরীর বক্তব্য দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে এবং বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছে পৌঁছে গেছে। প্রায় সব পত্রিকা, টেলিভিশন ও অনলাইন মাধ্যমে তাঁর বক্তব্য প্রচারিত হয়েছে। কেউ অংশবিশেষ নিয়ে রিলস বানাচ্ছেন, কেউ ফটোকার্ড তৈরি করছেন, কেউ সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করছেন। এই ভিডিওগুলো দেখতে দেখতে, খবরগুলো পড়তে পড়তে অতীতের অনেক স্মৃতি চোখের সামনে ভেসে উঠল।
১৯৯১-৯২ সালের কথা। আমি তখন দশম শ্রেণির ছাত্রী। আব্বু তখন কুমিল্লা-৯ আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য। সংসদে উপস্থাপনের জন্য তিনি প্রায়ই আমাকে তাঁর বক্তৃতা ডিক্টেশন দিতেন, আর আমি লিখে দিতাম। দল ও সংসদ থেকে তাঁর কাছে চিঠি আসত, অমুক দিন অমুক বিল উপস্থাপিত হবে, কিংবা নির্দিষ্ট সময় বরাদ্দ করা হয়েছে বক্তব্যের জন্য। অনেক সময় ডিক্টেশন লিখতে লিখতে ২৫- ৩০ পৃষ্ঠার সমান স্পিচ হয়ে যেত।
আব্বু বারবার বলতেন, মা একটু জায়গা কম রেখে লেখো। কারণ তাঁর বলার ছিল অনেক, কিন্তু সময় ছিল সীমিত। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি তুখোড় বক্তা। আমি শুধু সন্তানের আবেগ থেকে বলছি না, তাঁর জ্ঞানের পরিধি এত বিস্তৃত যে যিনি তাঁর সঙ্গে কাজ করেননি, তিনি তা পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারবেন না।
এখনো আমার চোখে ভাসে, আব্বু চোখ বন্ধ করে একটানা বলে যাচ্ছেন আর আমি লিখে যাচ্ছি। কিছুক্ষণ পরপর হঠাৎ জিজ্ঞেস করতেন, কী লিখেছ, একটু পড়ে শোনাও। কখনো বলতেন ঠিক আছে, আবার কখনো নিজেই পরিমার্জন করে দিতেন।
আমি প্রায়ই জিজ্ঞেস করতাম, আব্বু কাল সংসদে বক্তৃতা দেবে, মুখস্থ করবে কখন। আব্বু হেসে বলতেন, তোমাকে বলতে বলতে হয়ে গেছে। তাঁর অসাধারণ স্মৃতিশক্তি আমাকে সবসময় বিস্মিত করত।
১৫-১৬ বছরের আমি তখন ভাবতাম, এই ডিক্টেশন লেখার কাজটাই যেন খুব বড় কিছু। মনে মনে কল্পনা করতাম, আমার লেখা কাগজগুলো এক এক করে টাইপ হয়ে সংসদের দলিলে পরিণত হচ্ছে। যদিও বাস্তবে আমি শুধু তাঁর বক্তৃতার খসড়া লেখার কাজ করতাম, তবুও আমার শিশুমনে তা বিশাল রঙিন এক জগৎ তৈরি করত।
একদিন সাহস করে বললাম, তুমি যখন সংসদে এটা বলবে, আমি কি দেখতে যেতে পারি। আব্বু তখন জাতীয় সংসদের হুইপ। তিনি বললেন, অবশ্যই, কালকের অধিবেশনের টিকিট তোমাকে দেব।
আম্মুসহ আমরা চার বোন গিয়েছিলাম। আম্মুকে দেখে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী জনাব শেখ শহীদ কিছু একটা মজার কথা বলেছিলেন, যা আজ আর মনে নেই। আমার অসম্ভব সুন্দরী আম্মু আর তাঁর হাতের রান্না তখনকার অনেক রাজনীতিবিদের কাছে খুবই পরিচিত ছিল। বড় বোন ইভা এবং কিছুটা আমি, আমরা এমন কোনো তৎকালীন রাজনৈতিক নেতা নেই যাঁদের কোলে বসে ছোটবেলায় ছবি তুলিনি। এখন মনে পড়ছে মিজানুর রহমান চৌধুরী, আ স ম আব্দুর রব, মাখন কাকা, শিল্পপতি আব্দুল মোনেম প্রমুখ।
আমি কখনো আব্বুকে সরাসরি বলিনি, কারণ আমি আবেগ খুব বেশি প্রকাশ করতে পারি না। কিন্তু আজ বলতে ইচ্ছে করছে, আব্বু তুমি অসাধারণ মেধাবী, তুমি আমার চোখে দেখা সবচেয়ে বড় রাজনীতিবিদ। পদ বা পদবি আমি ততটা বুঝি না, কিন্তু জানি তোমার মতো ট্যালেন্ট বাংলাদেশে হাতে গোনা। তোমার প্রকৃত মূল্যায়ন করার ক্ষমতা শুধু আমাদের সৃষ্টিকর্তারই আছে।
তুমি আর আম্মু আমাদের যেভাবে আগলে বড় করেছ, আমাদের শিখিয়েছ সততার সঙ্গে রাজনীতি কীভাবে করতে হয়। মূল্যায়নের অপেক্ষা না করে নিজের কাজ করে যাওয়ার যে শিক্ষা, সেটাই আমাদের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। Honesty is the best policy, তুমি শুধু বলোনি, জীবনে চলার পথে তা প্রমাণ করেছ।
আজ এই লেখার মাধ্যমে বলতে চাই, তুমি আমার দেখা শ্রেষ্ঠ বাবা, শ্রেষ্ঠ শিক্ষক, শ্রেষ্ঠ মানুষ। তোমার ট্যালেন্টের পূর্ণ মূল্যায়ন হয়তো এখনো হয়নি, কিন্তু হবে, এই বিশ্বাস রাখি।
ইউটিউব ও সোশ্যাল মিডিয়ায় তোমার বক্তৃতা অসংখ্যবার দেখেছি। আল্লাহর কাছে শুকরিয়া, তিনি আমাকে তোমার সন্তান হিসেবে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন।
আল্লাহ তোমাকে হায়াতে তাইয়্যেবা দান করুন। ছাত্র রাজনীতির দিনগুলোর সেই তারুণ্য আল্লাহ তোমার মাঝে আরও দীর্ঘদিন বজায় রাখুন। তোমার এলাকার মানুষ তোমার জন্য অগাধ ভালোবাসা ও প্রত্যাশা নিয়ে অপেক্ষা করছে। কুমিল্লা ইনশাআল্লাহ একদিন বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ নগরী হিসেবে গড়ে উঠবে।
ফি আমানিল্লাহ,
আমার পৃথিবীর দেখা শ্রেষ্ঠ আব্বু।
পুনশ্চঃ @tareqrahman @theofficeofprimeminister এর কাছে অনুরোধ, অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদদের তত্ত্বাবধানে তরুণ সংসদ সদস্য ও উদীয়মান রাজনৈতিক নেতাদের জন্য একটি কাঠামোবদ্ধ প্রশিক্ষণ বা কর্মশালার ব্যবস্থা করা হোক, যাতে তারা ভবিষ্যতের নেতৃত্বের জন্য প্রস্তুত হতে পারে। কারণ এমন সময় আসবে, যখন দায়িত্ব তাদের হাতেই তুলে দিতে হবে, তারাই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ।
*** ড. চৌধুরী সাকেরা ফেরদৌস (মনিরুল হক চৌধুরীর মেঝো সন্তান)
ইন্টার্ণাল মেডিসিন ও জেনারেল ফিজিশিয়ান, ওবেসিটি মেডিসিন স্পেশালিষ্ট (ঙগঋঈ)
হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুল, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়, বোস্টন, আমেরিকা।

আমার আব্বু, ত্রয়োদশ সংসদের কুমিল্লা-৬ আসনে বিএনপি থেকে নির্বাচিত, বীর মুক্তিযোদ্ধা মনিরুল হক চৌধুরীর বক্তব্য দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে এবং বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছে পৌঁছে গেছে। প্রায় সব পত্রিকা, টেলিভিশন ও অনলাইন মাধ্যমে তাঁর বক্তব্য প্রচারিত হয়েছে। কেউ অংশবিশেষ নিয়ে রিলস বানাচ্ছেন, কেউ ফটোকার্ড তৈরি করছেন, কেউ সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করছেন। এই ভিডিওগুলো দেখতে দেখতে, খবরগুলো পড়তে পড়তে অতীতের অনেক স্মৃতি চোখের সামনে ভেসে উঠল।
১৯৯১-৯২ সালের কথা। আমি তখন দশম শ্রেণির ছাত্রী। আব্বু তখন কুমিল্লা-৯ আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য। সংসদে উপস্থাপনের জন্য তিনি প্রায়ই আমাকে তাঁর বক্তৃতা ডিক্টেশন দিতেন, আর আমি লিখে দিতাম। দল ও সংসদ থেকে তাঁর কাছে চিঠি আসত, অমুক দিন অমুক বিল উপস্থাপিত হবে, কিংবা নির্দিষ্ট সময় বরাদ্দ করা হয়েছে বক্তব্যের জন্য। অনেক সময় ডিক্টেশন লিখতে লিখতে ২৫- ৩০ পৃষ্ঠার সমান স্পিচ হয়ে যেত।
আব্বু বারবার বলতেন, মা একটু জায়গা কম রেখে লেখো। কারণ তাঁর বলার ছিল অনেক, কিন্তু সময় ছিল সীমিত। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি তুখোড় বক্তা। আমি শুধু সন্তানের আবেগ থেকে বলছি না, তাঁর জ্ঞানের পরিধি এত বিস্তৃত যে যিনি তাঁর সঙ্গে কাজ করেননি, তিনি তা পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারবেন না।
এখনো আমার চোখে ভাসে, আব্বু চোখ বন্ধ করে একটানা বলে যাচ্ছেন আর আমি লিখে যাচ্ছি। কিছুক্ষণ পরপর হঠাৎ জিজ্ঞেস করতেন, কী লিখেছ, একটু পড়ে শোনাও। কখনো বলতেন ঠিক আছে, আবার কখনো নিজেই পরিমার্জন করে দিতেন।
আমি প্রায়ই জিজ্ঞেস করতাম, আব্বু কাল সংসদে বক্তৃতা দেবে, মুখস্থ করবে কখন। আব্বু হেসে বলতেন, তোমাকে বলতে বলতে হয়ে গেছে। তাঁর অসাধারণ স্মৃতিশক্তি আমাকে সবসময় বিস্মিত করত।
১৫-১৬ বছরের আমি তখন ভাবতাম, এই ডিক্টেশন লেখার কাজটাই যেন খুব বড় কিছু। মনে মনে কল্পনা করতাম, আমার লেখা কাগজগুলো এক এক করে টাইপ হয়ে সংসদের দলিলে পরিণত হচ্ছে। যদিও বাস্তবে আমি শুধু তাঁর বক্তৃতার খসড়া লেখার কাজ করতাম, তবুও আমার শিশুমনে তা বিশাল রঙিন এক জগৎ তৈরি করত।
একদিন সাহস করে বললাম, তুমি যখন সংসদে এটা বলবে, আমি কি দেখতে যেতে পারি। আব্বু তখন জাতীয় সংসদের হুইপ। তিনি বললেন, অবশ্যই, কালকের অধিবেশনের টিকিট তোমাকে দেব।
আম্মুসহ আমরা চার বোন গিয়েছিলাম। আম্মুকে দেখে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী জনাব শেখ শহীদ কিছু একটা মজার কথা বলেছিলেন, যা আজ আর মনে নেই। আমার অসম্ভব সুন্দরী আম্মু আর তাঁর হাতের রান্না তখনকার অনেক রাজনীতিবিদের কাছে খুবই পরিচিত ছিল। বড় বোন ইভা এবং কিছুটা আমি, আমরা এমন কোনো তৎকালীন রাজনৈতিক নেতা নেই যাঁদের কোলে বসে ছোটবেলায় ছবি তুলিনি। এখন মনে পড়ছে মিজানুর রহমান চৌধুরী, আ স ম আব্দুর রব, মাখন কাকা, শিল্পপতি আব্দুল মোনেম প্রমুখ।
আমি কখনো আব্বুকে সরাসরি বলিনি, কারণ আমি আবেগ খুব বেশি প্রকাশ করতে পারি না। কিন্তু আজ বলতে ইচ্ছে করছে, আব্বু তুমি অসাধারণ মেধাবী, তুমি আমার চোখে দেখা সবচেয়ে বড় রাজনীতিবিদ। পদ বা পদবি আমি ততটা বুঝি না, কিন্তু জানি তোমার মতো ট্যালেন্ট বাংলাদেশে হাতে গোনা। তোমার প্রকৃত মূল্যায়ন করার ক্ষমতা শুধু আমাদের সৃষ্টিকর্তারই আছে।
তুমি আর আম্মু আমাদের যেভাবে আগলে বড় করেছ, আমাদের শিখিয়েছ সততার সঙ্গে রাজনীতি কীভাবে করতে হয়। মূল্যায়নের অপেক্ষা না করে নিজের কাজ করে যাওয়ার যে শিক্ষা, সেটাই আমাদের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। Honesty is the best policy, তুমি শুধু বলোনি, জীবনে চলার পথে তা প্রমাণ করেছ।
আজ এই লেখার মাধ্যমে বলতে চাই, তুমি আমার দেখা শ্রেষ্ঠ বাবা, শ্রেষ্ঠ শিক্ষক, শ্রেষ্ঠ মানুষ। তোমার ট্যালেন্টের পূর্ণ মূল্যায়ন হয়তো এখনো হয়নি, কিন্তু হবে, এই বিশ্বাস রাখি।
ইউটিউব ও সোশ্যাল মিডিয়ায় তোমার বক্তৃতা অসংখ্যবার দেখেছি। আল্লাহর কাছে শুকরিয়া, তিনি আমাকে তোমার সন্তান হিসেবে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন।
আল্লাহ তোমাকে হায়াতে তাইয়্যেবা দান করুন। ছাত্র রাজনীতির দিনগুলোর সেই তারুণ্য আল্লাহ তোমার মাঝে আরও দীর্ঘদিন বজায় রাখুন। তোমার এলাকার মানুষ তোমার জন্য অগাধ ভালোবাসা ও প্রত্যাশা নিয়ে অপেক্ষা করছে। কুমিল্লা ইনশাআল্লাহ একদিন বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ নগরী হিসেবে গড়ে উঠবে।
ফি আমানিল্লাহ,
আমার পৃথিবীর দেখা শ্রেষ্ঠ আব্বু।
পুনশ্চঃ @tareqrahman @theofficeofprimeminister এর কাছে অনুরোধ, অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদদের তত্ত্বাবধানে তরুণ সংসদ সদস্য ও উদীয়মান রাজনৈতিক নেতাদের জন্য একটি কাঠামোবদ্ধ প্রশিক্ষণ বা কর্মশালার ব্যবস্থা করা হোক, যাতে তারা ভবিষ্যতের নেতৃত্বের জন্য প্রস্তুত হতে পারে। কারণ এমন সময় আসবে, যখন দায়িত্ব তাদের হাতেই তুলে দিতে হবে, তারাই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ।
*** ড. চৌধুরী সাকেরা ফেরদৌস (মনিরুল হক চৌধুরীর মেঝো সন্তান)
ইন্টার্ণাল মেডিসিন ও জেনারেল ফিজিশিয়ান, ওবেসিটি মেডিসিন স্পেশালিষ্ট (ঙগঋঈ)
হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুল, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়, বোস্টন, আমেরিকা।