ভাস্কর মজুমদার

ডিসেম্বরের সকালগুলো তখন অন্যরকম ছিল। বার্ষিক পরীক্ষা শেষ। স্কুলের ব্যাগটা ঘরের এক কোণে রেখে আমরা বেরিয়ে পড়তাম। কারও হাতে বল, কারও বগলে ব্যাট, কেউ আবার খালি হাতে। আমাদের ঠিকানা কখনো তুলাতলি স্কুল মাঠ, কখনো আদালতের মাঠ, কখনো টি অ্যান্ড টি অফিসের মাঠ। কালীবাড়ির মাঠ, হাই স্কুলের মাঠ, সি অ্যান্ড বি কলোনির মাঠ, কোথাও না কোথাও জায়গা ছিলই। মাঠ না পেলেও জীবন থেমে থাকত না। বাড়ির উঠানে সাতচারা, কোথাও ডাংগুলি, একটু বড় জায়গা পেলে ফুটবল, আর ছয়টা ইট দাঁড় করিয়ে দিলেই ক্রিকেটের স্টাম্প। আমাদেরও দল ছিল, ঝগড়া ছিল, মারামারি ছিল, অভিমান ছিল। কে ওপেন করবে, কে গোলকিপার হবে, তা নিয়ে কত তর্ক! কেউ রাগ করে বাড়ি চলে যেত, আবার আধঘণ্টা পর ফিরে আসত। কারণ খেলা তখন বন্ধুত্বের চেয়েও বড় ছিল, আবার বন্ধুত্ব খেলাটার চেয়েও বড়। আমাদেরও গ্যাং ছিল, তবে সেই গ্যাংয়ের হাতে চাপাতি ছিল না, ছিল ক্রিকেট ব্যাট। পকেটে নেশার কিছু ছিল না, ছিল টেনিস বল কেনার চাঁদার খুচরা টাকা। প্রতিপক্ষ পাড়া দেখলে মারামারি নয়, ম্যাচের তারিখ ঠিক হতো। শীতের রাতে ব্যাডমিন্টনের নেট উঠত, বাতির নিচে শাটল উড়ত, ঠান্ডার মধ্যেও শরীর ঘামে ভিজে যেত। তখন কিশোর গ্যাং হওয়ার সময় কোথায় ছিল?
তারপর আমরা বড় হলাম, শহরও বড় হলো। কুমিল্লায় একের পর এক ভবন উঠল, দোকান বাড়ল, গাড়ি বাড়ল, জমির দাম বাড়ল, শুধু ছোট হতে লাগল মাঠগুলো। একদিন দেখলাম যে মাঠে আমরা খেলেছি, সেখানে আর খেলা যায় না। কোথাও ভবন উঠেছে, কোথাও গেট বসেছে, কোথাও লেখা “খেলাধুলা নিষেধ”। কোনো মাঠ আবার খেলাধুলার চেয়ে সভা, সমাবেশ কিংবা অন্য কাজে বেশি ব্যস্ত। একটি শহর তার শিশুদের কাছ থেকে মাঠ সরিয়ে নিল, কিন্তু তাদের শরীরের শক্তি, কৌত‚হল, সাহস আর দল বাঁধার স্বভাব তো সরাতে পারল না।
আজ পাড়ার কোনো এক কিশোর হাতে বল নিয়ে বের হয়, কিন্তু সে জানে না কোথায় যাবে। মাঠ নেই, উঠান নেই, নিরাপদ খোলা জায়গা নেই। শেষে সে রাস্তার মোড়ে দাঁড়ায়। আরও তিনজন আসে, তারপর পাঁচজন, তারপর দশজন। আর ঠিক তখনই সমাজের আরেকটি দরজা তাদের সামনে খুলে যায়। কেউ তাদের বলে, “চলো মিছিলে।” কারণ মিছিলে মাথা দরকার। কেউ বলে, “ভাইয়ের সঙ্গে থাকো।” কারণ শক্তি দেখানোর জন্য লোক দরকার। পোস্টার লাগাতে লোক দরকার, স্লোগান দিতে লোক দরকার, মোটরসাইকেলের বহর বড় দেখাতে লোক দরকার, প্রতিপক্ষকে ভয় দেখাতে লোক দরকার। যে ছেলেটির হাতে বিকেলে ক্রিকেট ব্যাট থাকার কথা ছিল, একসময় তার হাতে তুলে দেওয়া হয় রাজনৈতিক পরিচয়ের এক অদৃশ্য ক্ষমতা। সে বুঝতে শেখে, ভালো খেলোয়াড় হওয়ার চেয়ে কোনো ‘বড় ভাইয়ের লোক’ হওয়া হয়তো দ্রæত পরিচিতি দেয়। কখনো সেই পরিচয়ের সঙ্গে আসে টাকা, কখনো দাপট, কখনো নেশা, কখনো অস্ত্রের সাহস। সব কিশোর এই পথে যায় না, সব রাজনীতিও এমন নয়; কিন্তু এই অপসংস্কৃতির সুযোগ যে কিশোরদের একটা অংশকে ব্যবহার করে, সেটি অস্বীকার করেও লাভ নেই।
আর সবচেয়ে নির্মম ব্যাপার হলো, এই ছেলেগুলো একদিনে কিশোর গ্যাং হয়ে ওঠে না। তাদের তৈরি হওয়ার একটা দীর্ঘ গল্প আছে। যে মাঠে তার ফুটবল খেলার কথা ছিল, সেই মাঠ হয়তো দখল হয়ে গেছে। যে ক্লাবে খেলাধুলা শেখার কথা ছিল, সেখানে হয়তো এখন বড়দের রাজনৈতিক হিসাব। যে বড় ভাই তাকে ব্যাট ধরতে শেখাতে পারতেন, তিনিই হয়তো একদিন তাকে মিছিলের সামনের সারিতে দাঁড়াতে বলেন। যে সমাজ তার হাতে বই, বল কিংবা ব্যাডমিন্টন র্যাকেট তুলে দিতে পারেনি, সেই সমাজেরই কেউ কেউ খুব সহজে তার হাতে ক্ষমতার মিথ্যা স্বাদ তুলে দেয়। প্রথমে মিছিল, তারপর পরিচয়, তারপর দাপট, তারপর “আমাদের লোক” হওয়ার নিরাপত্তাবোধ। একসময় ছেলেটা ভুলেই যায়, সে আসলে একটা কিশোর, যার এখনো মাঠে দৌড়ানোর বয়স।
আমরা দূর থেকে তাদের দেখি এবং বলি, “এই ছেলেগুলো সারাদিন মোড়ে বসে থাকে কেন?” কিছুদিন পর বলি, “কিশোর গ্যাং বেড়ে গেছে।” সভা হয়, সেমিনার হয়, বক্তৃতা হয়, কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা আসে। অথচ সেই সভার মঞ্চে খুব কমই প্রশ্ন ওঠে, যে কিশোর আজ গ্যাংয়ের সদস্য, গতকাল তার খেলার মাঠটা কে নিয়েছিল? তার জন্য বিকেলের বিকল্পটা কে তৈরি করেছিল? রাজনীতির নামে কিশোরদের মাথা গুনে মিছিল বড় করার সংস্কৃতি কে তৈরি করেছে? কেন একজন কিশোরের কাছে খেলোয়াড়, শিল্পী, পাঠক কিংবা ভালো ছাত্র হওয়ার চেয়ে কোনো ক্ষমতাবান ব্যক্তির অনুসারী হওয়া বেশি আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে?
অবশ্যই অপরাধ হলে আইন প্রয়োগ করতে হবে। কিশোর বলে অপরাধকে ছাড় দেওয়ার প্রশ্ন নেই। পরিবারকেও দায়িত্ব নিতে হবে। কিন্তু শুধু পুলিশ পাঠিয়ে, ধরে নিয়ে, সভায় কঠোর ভাষণ দিয়ে সমস্যার শেকড় কাটা যাবে না। কারণ সমস্যাটা শুধু কিশোরের ভেতরে নয়, সমস্যাটা আমাদের শহরের ভেতরে, আমাদের রাজনীতির ভেতরে, আমাদের সামাজিক সংস্কৃতির ভেতরে। আমরা তাদের মাঠ নিয়েছি, উঠান নিয়েছি, পাড়ার খেলাধুলার সংস্কৃতি নিয়েছি। তারপর হাতে মোবাইল দিয়েছি। আর সুযোগ পেলে কেউ কেউ তাদের হাতে দিয়েছে মিছিলের ফেষ্টুন, ক্ষমতার পরিচয়, দাপটের নেশা। তারপর একদিন যখন সেই কিশোর নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে, আমরা সবাই বিস্মিত হওয়ার অভিনয় করেছি।
রাজনীতি অবশ্যই মানুষের কল্যাণের জন্য। তরুণদের রাজনীতিতে অংশগ্রহণও প্রয়োজন। কিন্তু রাজনৈতিক শিক্ষা আর কিশোরদের ব্যবহার করা এক জিনিস নয়। একজন তরুণকে দেশ, সমাজ, ইতিহাস, অধিকার ও দায়িত্ব শেখানো রাজনীতি; আর তার মাথা গুনে মিছিল ভারী করা, তাকে পেশিশক্তি হিসেবে ব্যবহার করা কিংবা ক্ষমতার ছায়ায় অপরাধের সাহস দেওয়া রাজনীতি নয়, এটি ভবিষ্যৎ নষ্ট করার সবচেয়ে সহজ রাস্তা। আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকেও তাই প্রশ্ন করতে হবে, আমরা কি তরুণদের নাগরিক বানাচ্ছি, নাকি অনুসারী বানাচ্ছি? আমরা কি তাদের যুক্তি শেখাচ্ছি, নাকি শুধু ¯েøাগান?
আজও পাড়ার কোনো রাস্তা দিয়ে গেলে ডিসেম্বরের সেই সকালগুলোর কথা মনে পড়ে। মনে হয়, একটু পরেই কেউ ডাকবে, “এই, ব্যাটটা নিয়ে আয়।” কেউ বলবে, “আজ ঈদগাহ মাঠে ম্যাচ।” কেউ দৌড়ে গিয়ে ইট এনে স্টাম্প বানাবে। কিন্তু সেই ডাক আর আসে না। শহরটা আছে, মানুষও আছে, রাজনীতি আছে, সভা আছে, মিছিল আছে, পোস্টার আছে, শুধু আমাদের শৈশবের জায়গাগুলো ক্রমেই কমে গেছে।
তাই যখন খুব জোরে “কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণ” করার কথা শুনি, তখন মনে হয়, কথাটা উল্টো দিক থেকেও একবার বলা দরকার। যে সমাজ কিশোরদের মাঠ দিতে পারে না, তাকে অন্তত তাদের বিপথে যাওয়ার রাস্তা তৈরি করা বন্ধ করতে হবে। যে রাজনীতি তরুণদের ভবিষ্যতের কথা বলে, তাকে আগে প্রতিজ্ঞা করতে হবে, কোনো কিশোরকে আর মাথা গোনার মিছিলের সংখ্যা হিসেবে ব্যবহার করা হবে না। যে শহর উন্নয়নের কথা বলে, সেখানে একটি শিশুর দৌড়ানোর জায়গাও উন্নয়নের অংশ হতে হবে।
কারণ একটি মাঠ হারিয়ে গেলে শুধু কয়েক কাঠা খোলা জমি হারায় না। হারিয়ে যায় একসঙ্গে বড় হওয়ার সংস্কৃতি, হার মানতে শেখার শিক্ষা, নিয়ম মানার অভ্যাস, বন্ধুত্বের জায়গা। আর সেই শূন্যস্থান যদি ক্রিকেট ব্যাট, ফুটবল, বই আর সংস্কৃতি দিয়ে পূরণ না করা হয়, কোনো না কোনো দিন সেখানে অন্য কিছু এসে জায়গা নেবে।
তারপর আমরা আবার সভা সেমিনার করব।
বলব, কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণ করতে হবে !!
ভাস্কর মজুমদার: জেনারেল ম্যানেজার, মার্চেন্ডাইজিং, ব্র্যাক আড়ং ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী।

ডিসেম্বরের সকালগুলো তখন অন্যরকম ছিল। বার্ষিক পরীক্ষা শেষ। স্কুলের ব্যাগটা ঘরের এক কোণে রেখে আমরা বেরিয়ে পড়তাম। কারও হাতে বল, কারও বগলে ব্যাট, কেউ আবার খালি হাতে। আমাদের ঠিকানা কখনো তুলাতলি স্কুল মাঠ, কখনো আদালতের মাঠ, কখনো টি অ্যান্ড টি অফিসের মাঠ। কালীবাড়ির মাঠ, হাই স্কুলের মাঠ, সি অ্যান্ড বি কলোনির মাঠ, কোথাও না কোথাও জায়গা ছিলই। মাঠ না পেলেও জীবন থেমে থাকত না। বাড়ির উঠানে সাতচারা, কোথাও ডাংগুলি, একটু বড় জায়গা পেলে ফুটবল, আর ছয়টা ইট দাঁড় করিয়ে দিলেই ক্রিকেটের স্টাম্প। আমাদেরও দল ছিল, ঝগড়া ছিল, মারামারি ছিল, অভিমান ছিল। কে ওপেন করবে, কে গোলকিপার হবে, তা নিয়ে কত তর্ক! কেউ রাগ করে বাড়ি চলে যেত, আবার আধঘণ্টা পর ফিরে আসত। কারণ খেলা তখন বন্ধুত্বের চেয়েও বড় ছিল, আবার বন্ধুত্ব খেলাটার চেয়েও বড়। আমাদেরও গ্যাং ছিল, তবে সেই গ্যাংয়ের হাতে চাপাতি ছিল না, ছিল ক্রিকেট ব্যাট। পকেটে নেশার কিছু ছিল না, ছিল টেনিস বল কেনার চাঁদার খুচরা টাকা। প্রতিপক্ষ পাড়া দেখলে মারামারি নয়, ম্যাচের তারিখ ঠিক হতো। শীতের রাতে ব্যাডমিন্টনের নেট উঠত, বাতির নিচে শাটল উড়ত, ঠান্ডার মধ্যেও শরীর ঘামে ভিজে যেত। তখন কিশোর গ্যাং হওয়ার সময় কোথায় ছিল?
তারপর আমরা বড় হলাম, শহরও বড় হলো। কুমিল্লায় একের পর এক ভবন উঠল, দোকান বাড়ল, গাড়ি বাড়ল, জমির দাম বাড়ল, শুধু ছোট হতে লাগল মাঠগুলো। একদিন দেখলাম যে মাঠে আমরা খেলেছি, সেখানে আর খেলা যায় না। কোথাও ভবন উঠেছে, কোথাও গেট বসেছে, কোথাও লেখা “খেলাধুলা নিষেধ”। কোনো মাঠ আবার খেলাধুলার চেয়ে সভা, সমাবেশ কিংবা অন্য কাজে বেশি ব্যস্ত। একটি শহর তার শিশুদের কাছ থেকে মাঠ সরিয়ে নিল, কিন্তু তাদের শরীরের শক্তি, কৌত‚হল, সাহস আর দল বাঁধার স্বভাব তো সরাতে পারল না।
আজ পাড়ার কোনো এক কিশোর হাতে বল নিয়ে বের হয়, কিন্তু সে জানে না কোথায় যাবে। মাঠ নেই, উঠান নেই, নিরাপদ খোলা জায়গা নেই। শেষে সে রাস্তার মোড়ে দাঁড়ায়। আরও তিনজন আসে, তারপর পাঁচজন, তারপর দশজন। আর ঠিক তখনই সমাজের আরেকটি দরজা তাদের সামনে খুলে যায়। কেউ তাদের বলে, “চলো মিছিলে।” কারণ মিছিলে মাথা দরকার। কেউ বলে, “ভাইয়ের সঙ্গে থাকো।” কারণ শক্তি দেখানোর জন্য লোক দরকার। পোস্টার লাগাতে লোক দরকার, স্লোগান দিতে লোক দরকার, মোটরসাইকেলের বহর বড় দেখাতে লোক দরকার, প্রতিপক্ষকে ভয় দেখাতে লোক দরকার। যে ছেলেটির হাতে বিকেলে ক্রিকেট ব্যাট থাকার কথা ছিল, একসময় তার হাতে তুলে দেওয়া হয় রাজনৈতিক পরিচয়ের এক অদৃশ্য ক্ষমতা। সে বুঝতে শেখে, ভালো খেলোয়াড় হওয়ার চেয়ে কোনো ‘বড় ভাইয়ের লোক’ হওয়া হয়তো দ্রæত পরিচিতি দেয়। কখনো সেই পরিচয়ের সঙ্গে আসে টাকা, কখনো দাপট, কখনো নেশা, কখনো অস্ত্রের সাহস। সব কিশোর এই পথে যায় না, সব রাজনীতিও এমন নয়; কিন্তু এই অপসংস্কৃতির সুযোগ যে কিশোরদের একটা অংশকে ব্যবহার করে, সেটি অস্বীকার করেও লাভ নেই।
আর সবচেয়ে নির্মম ব্যাপার হলো, এই ছেলেগুলো একদিনে কিশোর গ্যাং হয়ে ওঠে না। তাদের তৈরি হওয়ার একটা দীর্ঘ গল্প আছে। যে মাঠে তার ফুটবল খেলার কথা ছিল, সেই মাঠ হয়তো দখল হয়ে গেছে। যে ক্লাবে খেলাধুলা শেখার কথা ছিল, সেখানে হয়তো এখন বড়দের রাজনৈতিক হিসাব। যে বড় ভাই তাকে ব্যাট ধরতে শেখাতে পারতেন, তিনিই হয়তো একদিন তাকে মিছিলের সামনের সারিতে দাঁড়াতে বলেন। যে সমাজ তার হাতে বই, বল কিংবা ব্যাডমিন্টন র্যাকেট তুলে দিতে পারেনি, সেই সমাজেরই কেউ কেউ খুব সহজে তার হাতে ক্ষমতার মিথ্যা স্বাদ তুলে দেয়। প্রথমে মিছিল, তারপর পরিচয়, তারপর দাপট, তারপর “আমাদের লোক” হওয়ার নিরাপত্তাবোধ। একসময় ছেলেটা ভুলেই যায়, সে আসলে একটা কিশোর, যার এখনো মাঠে দৌড়ানোর বয়স।
আমরা দূর থেকে তাদের দেখি এবং বলি, “এই ছেলেগুলো সারাদিন মোড়ে বসে থাকে কেন?” কিছুদিন পর বলি, “কিশোর গ্যাং বেড়ে গেছে।” সভা হয়, সেমিনার হয়, বক্তৃতা হয়, কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা আসে। অথচ সেই সভার মঞ্চে খুব কমই প্রশ্ন ওঠে, যে কিশোর আজ গ্যাংয়ের সদস্য, গতকাল তার খেলার মাঠটা কে নিয়েছিল? তার জন্য বিকেলের বিকল্পটা কে তৈরি করেছিল? রাজনীতির নামে কিশোরদের মাথা গুনে মিছিল বড় করার সংস্কৃতি কে তৈরি করেছে? কেন একজন কিশোরের কাছে খেলোয়াড়, শিল্পী, পাঠক কিংবা ভালো ছাত্র হওয়ার চেয়ে কোনো ক্ষমতাবান ব্যক্তির অনুসারী হওয়া বেশি আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে?
অবশ্যই অপরাধ হলে আইন প্রয়োগ করতে হবে। কিশোর বলে অপরাধকে ছাড় দেওয়ার প্রশ্ন নেই। পরিবারকেও দায়িত্ব নিতে হবে। কিন্তু শুধু পুলিশ পাঠিয়ে, ধরে নিয়ে, সভায় কঠোর ভাষণ দিয়ে সমস্যার শেকড় কাটা যাবে না। কারণ সমস্যাটা শুধু কিশোরের ভেতরে নয়, সমস্যাটা আমাদের শহরের ভেতরে, আমাদের রাজনীতির ভেতরে, আমাদের সামাজিক সংস্কৃতির ভেতরে। আমরা তাদের মাঠ নিয়েছি, উঠান নিয়েছি, পাড়ার খেলাধুলার সংস্কৃতি নিয়েছি। তারপর হাতে মোবাইল দিয়েছি। আর সুযোগ পেলে কেউ কেউ তাদের হাতে দিয়েছে মিছিলের ফেষ্টুন, ক্ষমতার পরিচয়, দাপটের নেশা। তারপর একদিন যখন সেই কিশোর নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে, আমরা সবাই বিস্মিত হওয়ার অভিনয় করেছি।
রাজনীতি অবশ্যই মানুষের কল্যাণের জন্য। তরুণদের রাজনীতিতে অংশগ্রহণও প্রয়োজন। কিন্তু রাজনৈতিক শিক্ষা আর কিশোরদের ব্যবহার করা এক জিনিস নয়। একজন তরুণকে দেশ, সমাজ, ইতিহাস, অধিকার ও দায়িত্ব শেখানো রাজনীতি; আর তার মাথা গুনে মিছিল ভারী করা, তাকে পেশিশক্তি হিসেবে ব্যবহার করা কিংবা ক্ষমতার ছায়ায় অপরাধের সাহস দেওয়া রাজনীতি নয়, এটি ভবিষ্যৎ নষ্ট করার সবচেয়ে সহজ রাস্তা। আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকেও তাই প্রশ্ন করতে হবে, আমরা কি তরুণদের নাগরিক বানাচ্ছি, নাকি অনুসারী বানাচ্ছি? আমরা কি তাদের যুক্তি শেখাচ্ছি, নাকি শুধু ¯েøাগান?
আজও পাড়ার কোনো রাস্তা দিয়ে গেলে ডিসেম্বরের সেই সকালগুলোর কথা মনে পড়ে। মনে হয়, একটু পরেই কেউ ডাকবে, “এই, ব্যাটটা নিয়ে আয়।” কেউ বলবে, “আজ ঈদগাহ মাঠে ম্যাচ।” কেউ দৌড়ে গিয়ে ইট এনে স্টাম্প বানাবে। কিন্তু সেই ডাক আর আসে না। শহরটা আছে, মানুষও আছে, রাজনীতি আছে, সভা আছে, মিছিল আছে, পোস্টার আছে, শুধু আমাদের শৈশবের জায়গাগুলো ক্রমেই কমে গেছে।
তাই যখন খুব জোরে “কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণ” করার কথা শুনি, তখন মনে হয়, কথাটা উল্টো দিক থেকেও একবার বলা দরকার। যে সমাজ কিশোরদের মাঠ দিতে পারে না, তাকে অন্তত তাদের বিপথে যাওয়ার রাস্তা তৈরি করা বন্ধ করতে হবে। যে রাজনীতি তরুণদের ভবিষ্যতের কথা বলে, তাকে আগে প্রতিজ্ঞা করতে হবে, কোনো কিশোরকে আর মাথা গোনার মিছিলের সংখ্যা হিসেবে ব্যবহার করা হবে না। যে শহর উন্নয়নের কথা বলে, সেখানে একটি শিশুর দৌড়ানোর জায়গাও উন্নয়নের অংশ হতে হবে।
কারণ একটি মাঠ হারিয়ে গেলে শুধু কয়েক কাঠা খোলা জমি হারায় না। হারিয়ে যায় একসঙ্গে বড় হওয়ার সংস্কৃতি, হার মানতে শেখার শিক্ষা, নিয়ম মানার অভ্যাস, বন্ধুত্বের জায়গা। আর সেই শূন্যস্থান যদি ক্রিকেট ব্যাট, ফুটবল, বই আর সংস্কৃতি দিয়ে পূরণ না করা হয়, কোনো না কোনো দিন সেখানে অন্য কিছু এসে জায়গা নেবে।
তারপর আমরা আবার সভা সেমিনার করব।
বলব, কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণ করতে হবে !!
ভাস্কর মজুমদার: জেনারেল ম্যানেজার, মার্চেন্ডাইজিং, ব্র্যাক আড়ং ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী।