সুশিক্ষকের মাধ্যমে সুশিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড

সৈয়দ আবদুল কাইয়ুম
Thumbnail image

শিক্ষক শিক্ষকতা করেন। শিক্ষকতা পেশা। সক্রেটিস, প্লেটো ও অ্যারিস্টটলের যুগে এই পেশা ছিল না। তাঁদের মতো জ্ঞানী ব্যক্তির শিক্ষার্থী ছিল অনুসারীবৃন্দ। প্রাচীন চীনে নৈতিক বিপ্লবের দিশারী কনফুসিয়াস, লাওৎসি বা মেনসিয়াস পেশাদার শিক্ষক ছিলেন না। মধ্যযুগে ইউরোপে আধুনিক শিক্ষার গোড়াপত্তনের সময় যখন বিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠেছিল, ঠিক তখন থেকেই শিক্ষকতা নামের পেশার সূচনা। কিন্তু শিক্ষকতা অন্যসব পেশার মতো নয়, এই পেশায় অন্যসব পেশার মতো পেশাদারের জীবিকা নির্বাহের রসদ সংগ্রহের তাগিদ থাকলেও একটি অবৈষয়িক দিকও আছে, এবং যা মুখ্য, গৌণ নয়। এই পেশায় ঐকান্তিকতায় ব্যাপারটি অন্যদের পেশার মতো বিদ্যমান থাকলেও তা আসলে নিবেদিতপ্রাণ ঐকান্তিকতা। অর্থাৎ সাধারণ পেশা ধরে ঐকান্তিকতার চেয়েও গভীরতর কিছু একটা ব্যাপার শিক্ষকতায় আছে। সুতরাং শিক্ষকতা শুধু চাকরি নয়। শুধু চাকরি করে গ্রাসাচ্ছাদনের ব্যবস্থা করা যাদের লক্ষ্য, তাঁদের জন্য শিক্ষকতা পেশা নয়। এ পেশায় তাঁদের আগমন ও উপস্থিতি শিক্ষা ও শিক্ষার্থী উভয়ের জন্যই ক্ষতিকর। শিক্ষক ও শিক্ষকতা পেশার মৌল পাটাতন সাধনাসদৃশ্য জ্ঞানচর্চা ও তার বিবরণ ও সম্প্রদান।

শিক্ষকতা মানে মুদ্রিত বইয়ের কালো অক্ষরের উপস্থাপন নয়। বইয়ের জ্ঞানের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া ঘটবে শিক্ষকের মননের, এবং যার সম্মিলিত ফসলই যাবে শিক্ষার্থীর ঘরে। কারণ অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের বিবেচনায় “Your imagination is more importent then knowledge ” কাজেই শিক্ষকতা পেশার দায়ভার অনেক। অবশ্য এটা বাস্তব সত্য যে, নষ্ট এ সময়ে ভ্রষ্ট এ সমাজের শিক্ষাজগতে শিক্ষক সন্ধান করতে হলে হয়তোবা অতি শক্তিশালী অনুবীক্ষণ যন্ত্রের প্রয়োজন। এ জন্য রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন ‘শিক্ষক পেতে হলে বিজ্ঞপ্তি দিতে হয়, গুরু পেতে আগে থেকে ফরমাইশ দিতে হয়।’

সুশিক্ষার পূর্ব শর্ত সুশিক্ষক তা এক স্বার্থহীন স্বীকার্য সত্য। কিন্তু প্রশ্ন হলো- সুশিক্ষক কে? কি তার গুনাবলী? কবি জীবনানন্দ দাশ কবিতা লিখলেই যে কাউকে কবি হিসেবে মানতে রাজি ছিলেন না- ‘কেউ কেউ কবি, সবাই কবি নয়।’ তেমনি শিক্ষকতা পেশায় কেউ নিয়োজিত থাকলেই শিক্ষক বা সুশিক্ষক পদবাচ্য হবেন, এমন একটি সিদ্ধান্ত অতি সরলীকরণের সমার্থক হবে। শিক্ষকের জনারণ্য থেকে সুশিক্ষক চিহ্নিত করার অন্তত ছয়টি নির্দেশিকার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা যায়।

সুশিক্ষক মানেই সুশিক্ষার্থী। তিনি আজীবনই শিক্ষার্থী, জ্ঞান সীমাহীন ও নিয়ত প্রসারমাণ এবং পরিবর্তনশীল। যিনি জ্ঞান বিতরণের পেশায় নিয়োজিত, তাকেও প্রসারমাণ-পরিবর্তনশীল জ্ঞানের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজেকে নিয়ত হালনাগাদ (update) করতে হবে। একজন শিক্ষার্থী যখন পরীক্ষার্থী, তখন তার কাছে কাম্য সাম্প্রতিকতম তথ্যসমৃদ্ধ উত্তর, যার নির্দেশক তার শিক্ষক। শিক্ষকের জ্ঞান যদি অপর্যাপ্ত বা সেকেলে হয়, তাহলে এমন শিক্ষক শিক্ষা ও শিক্ষার্থীকে কোনো কাজে লাগবে না। অথবা সাধারণভাবেই যদি বলা হয় তাহলে, বা তা প্রদানে তার শিক্ষণকলা-সংক্রান্ত ঘাটতি ও ত্রুটি অপরিমেয় হলে সুশিক্ষক তো দূরের কথা, তিনি শিক্ষক পদবাচ্য হওয়ার যোগ্যতা হারান। সম্ভবত একটি ভাবনা মাথায় রেখেই কার্ল মার্ক্স মন্তব্য করেছিলেন ‘Educator must be Educated’ শিক্ষককে শিক্ষিত হতে হবে।

সুশিক্ষক নিজে প্রাণিত এবং তিনি শিক্ষার্থীকে প্রাণিত করার যোগ্যতা ধারণ করেন। কিসে তিনি প্রাণিত? কিসের প্রনোদনার উৎস তিনি? শিক্ষক জ্ঞানচর্চা মহান উদ্দেশ্যে প্রাণিত। তার প্রতীতী জ্ঞানই শক্তি। জ্ঞানালোকে উল্লাসিত যে শিক্ষক দ্যুতিময় ব্যক্তিত্ব তিনিই হতে পারেন শিক্ষার্থীর অসীম প্রেরণা- প্রণোদনাময় উৎস। এমন সুশিক্ষক শিক্ষার্থীর জন্য বাতিঘরসদৃশ। বাতিঘর অন্ধকার - সাগরে আলোর নিশানা দিয়ে সাগরে জাহাজকে পথ দেখায়, ক‚লে যাওয়ার আশ্বাস দেয়। এমন সুশিক্ষক সুশিক্ষার্থীদের জন্য চাই।

একজন সুশিক্ষক মেধা, মনন, আচরণ, বচন ও বসনে হবেন অনুসরনীয় ও অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব। কারণ শিক্ষক শুধু বইভিত্তিক জ্ঞানের শিক্ষক নন, তিনি মানুষের শিক্ষক। তিনি মানবজীবনের বিস্তৃত সব বিষয়েরও সমান্তরাল পাঠদান করেন। আর সে কারণে তিনি মানুষ গড়ার হিসেবে বিবেচিত। এর এটাতো জানা কথাই যে, মানুষের মানবীয় সব শিক্ষা শ্রেণিকক্ষের নির্ধারিত বইয়ের পাতায় সবটুকু থাকেনা। কাজেই তিনিই সুশিক্ষক, যিনি শিক্ষার্থীর জন্য বিশাল এক বই হওয়ার যোগ্যতার অধিকারী।

সুশিক্ষক নামের এ বইটির ঐকান্তিক পাঠ শিক্ষার্থীকে জ্ঞান আহরণের সমান্তরালে মানুষ হওয়ার প্রেরণা জোগায়। প্রসঙ্গক্রমে কনফুসিয়াসের কথা বলা যায়। খ্রিষ্টপূর্ব ছয় শতকে অনৈতিকতায় প্লাবিত চীনের সমাজে কনফুসিয়াস তার নৈতিক শিক্ষা দিয়ে সমাজের বাঁকবদল ঘটিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন শিক্ষক নীতি-দর্শনের শিক্ষক। কিন্তু তার দর্শন আজও চীনে ধর্মের মহিমায় পুঁজিত। অথচ কনফুসিয়াস ধর্ম নিয়ে কোনো কথা বলেননি। তিনি বলেছিলেন নৈতিক ইহলোকের কথা। পরালোক নিয়ে তার কোনো কথা ছিল না। কারণ তার বিশ্বাস ছিল, ইহলোকে ভলো মানুষ পরলোকে পুরস্কৃত হবেই।

সুশিক্ষক সমাজচেতন হওয়ার সুবাদে রাজনীতিসচেতনও হবেন, তবে সক্রিয় রাজনীতি তিনি পরিহার করবেন। রাজনৈতিক দলের সক্রিয় সদস্য হয়ে রাজনীতির মাঠকর্মী হলে তার ভাবনা ও কর্মে বস্তুনিষ্ঠতা-ও সমাজের সামগ্রিকতা হারিয়ে যাবে। সুশিক্ষকের লক্ষ্য হবে সমাজপ্রগতি ও কল্যাণধর্মী- সামাজিক বাঁকবদল। তিনি ক্ষমতার হাতবদলের সঙ্গে তার ভাবনা-কামনা আস্বিত করবেন না।

সুশিক্ষক-শিক্ষার্থী মনস্তত্বের সঠিক পাঠক শিক্ষক- শিক্ষার্থী দাতক - গ্রহীতা সম্পর্ক বিধায় দাতাকে অবশ্যই গ্রহীতার মনের খবরটি রাখতে হয়। এ জন্য নিজকে সুশিক্ষক হিসেবে গড়ে তুলতে হলে একজন শিক্ষককে শিক্ষাদর্শনে ও সাধারণ মনস্তত্ব সম্পর্কে গভীর জ্ঞান অবশ্যই অর্জন করতে হবে। একজন সুশিক্ষক একজন ভালো মনস্তবিদত্ত। খ্যাতনামা শিক্ষাবিদ গিলবার্ট হায়েটের মতে, শিক্ষার্থীকে মনের খবরটি জানার পাশাপাশি একজন সুশিক্ষককে নিজের মনের খবরটিও জানতে হবে।

বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের সভাপতি আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বলেছেন শিক্ষকের খাতায় নাম লেখলেই শিক্ষক হওয়া যায় না। যে মানুষ ছাত্রদের বিকাশের ভেতর নিজের নিয়তিকে রক্তমাখা ভবিষ্যৎ হিসাবে প্রত্যক্ষ করতে পারেন, ছাত্রদের জীবনের ভেতর শবেবরাতের রাতের কোটি কোটি প্রদীপের মতো জ্বলে উঠতে পারেন। তিনিই তো সুশিক্ষক। সুশিক্ষা অর্জন করতে হলে সুশিক্ষকের কোনো বিকল্প নেই।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের প্রফেসর ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন বলেন ‘যে মানুষের মধ্যে সততা ও ন্যায়নিষ্ঠা নেই তিনি বিশ্ববরণ্য পন্ডিত হলেও মানুষ গড়ার কারিগর হতে পারে না।’ ড. হুমায়ুন আহমেদ বলেছেন ‘একজন সুশিক্ষক একশত হাতি থেকে শক্তিশালী।’

শিক্ষকের মর্যাদা ও ভালো থাকার উপর নির্ভর করে দেশের মর্যাদা ও ভালো থাকা।

সৈয়দ আবদুল কাইয়ুম: অধ্যক্ষ, মাধবপুর আলহাজ্ব মুহাম্মদ আবু জাহের ফাউন্ডেশন কলেজ, ব্রাহ্মণপাড়া, কুমিল্লা

বিষয়:

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

সম্পর্কিত