সৌরভের সুবচন
মো.আবু ছালেক সেলিম রেজা সৌরভ

সবুজ-শ্যামল রূপ আর অফুরন্ত সম্ভাবনার দেশ আমাদের এই বাংলাদেশ। আজ আমরা যে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, দৃশ্যমান উন্নয়ন আর আধুনিকতার গল্প বলি, তার পেছনের গল্পটা কিন্তু রূপকথার মতো সহজ ছিল না। এই গল্পটা আসলে এদেশের কোটি কোটি কৃষক, শ্রমিক আর প্রবাসী মেহনতি মানুষের রক্ত, শ্রম আর ঘামের। অথচ রূঢ় বাস্তবতা হলো, যাদের অক্লান্ত পরিশ্রমে টেকসই অর্থনীতির ভিত তৈরি হয়েছে, তাদের এক বড় অংশ আজও মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। কবি কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায় তাই আজ উচ্চকণ্ঠে বলার সময় এসেছে- ‘দিনে দিনে বহু বাড়িয়াছে দেনা শুধিতে হইবে ঋণ।’ সমাজের সুবিধাপ্রাপ্ত ও শিক্ষিত শ্রেণির এখন সময় হয়েছে এই অবহেলিত জনগোষ্ঠীর প্রতি তাদের দায়বদ্ধতা স্বীকার করার এবং সেই ঋণ শোধে এগিয়ে আসার।
বাংলাদেশের অর্থনীতির সিংহভাগ অর্জনই মূলত মেহনতি মানুষের শ্রমের ফসল। এদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি তিনটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে আছে: কৃষি, তৈরি পোশাক ও ম্যানুফ্যাকচারিং শিল্প, এবং প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স। একটু গভীরভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, এই তিনটি খাতের প্রতিটির পেছনেই জড়িয়ে আছে এদেশের সাধারণ মেহনতি মানুষের হাড়ভাঙা খাটুনি।
রোদ-বৃষ্টি-ঝড় মাথায় নিয়ে যে কৃষক মাঠে ফসল ফলায়, তারাই ১৬ কোটির বেশি মানুষের খাদ্যের জোগান দেয়। দেশের জিডিপিতে কৃষির অবদান যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি খাদ্য নিরাপত্তার প্রশ্নে তারা অনন্য।
দেশের তৈরি পোশাক শিল্প আজ বিশ্বমঞ্চে সমাদৃত। এই শিল্পের চাকা সচল রাখছেন লাখ লাখ নারী ও পুরুষ শ্রমিক। তাদের স্বল্প মজুরির বিনিময়ে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা দেশের অর্থনীতির ভিতকে মজবুত করেছে।
নিজের চেনা পরিবেশ, পরিবার-পরিজন ছেড়ে মরুভ‚মির তপ্ত বালু বা বিদেশের কঠিন পরিস্থিতিতে যারা দিনরাত পরিশ্রম করছেন, সেই প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের মূল উৎস।
আমাদের জনসংখ্যার প্রায় আশি ভাগ মানুষ এখনও গ্রামে বসবাস করে। দৃশ্যত দেশের উন্নয়ন হলেও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ আজও শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং উন্নত জীবনের সুফল থেকে সমভাবে উপকৃত হতে পারছে না।
প্রকৃতপক্ষে, দেশের অর্ধেকের বেশি মানুষ কোনো না কোনোভাবে প্রতিদিন দারিদ্র্য ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে সংগ্রাম করে টিকে আছে। গ্রামীণ অঞ্চলের অবহেলিত মানুষগুলো এখনো ভালো মানের চিকিৎসা সেবা থেকে দূরে। সরকারি হাসপাতালগুলোর সীমাবদ্ধতা এবং বেসরকারি চিকিৎসার চড়া ব্যয়ের কারণে অনেকেই ন্যূনতম স্বাস্থ্যসেবা পান না। শিক্ষার আলো সব জায়গায় পৌঁছালেও মানসম্মত শিক্ষা এবং কারিগরি দক্ষতার অভাব গ্রামীণ তরুণদের কর্মক্ষেত্রে পিছিয়ে রাখছে। মেহনতি মানুষের এই বঞ্চনা প্রমাণ করে যে, সামষ্টিক অর্থনীতি বড় হলেও তার সুফল সবার কাছে সমানভাবে পৌঁছায়নি।
সমাজে যারা শিক্ষার আলোয় আলোকিত হয়েছেন, যারা ভালো কর্মসংস্থান, ব্যবসা বা মেধার জোরে উন্নত জীবনের অধিকারী হয়েছেন, তারা মূলত এই সুবিধাপ্রাপ্ত ক্ষুদ্র অংশের অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু এই সত্যটি ভুলে গেলে চলবে না যে, তাদের এই অবস্থানের পেছনে পরোক্ষভাবে হলেও কৃষক, শ্রমিক আর সাধারণ করদাতার অবদান রয়েছে।
রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো ব্যবহার করে যখন কেউ উচ্চশিক্ষিত বা সফল ব্যবসায়ী হন, তখন সেই অবকাঠামো তৈরিতে মেহনতি মানুষের ট্যাক্সের টাকা এবং শ্রম মিশে থাকে। তাই সমাজের অনগ্রসর ও পিছিয়ে পড়া মানুষের প্রতি এই সৌভাগ্যবান শ্রেণির একটি গভীর সামাজিক ও নৈতিক দায়বদ্ধতা তৈরি হয়। একে কেবল দয়া বা দানশীলতা হিসেবে দেখলে চলবে না, এটি মূলত এক ধরণের সামাজিক ঋণ শোধ করার প্রক্রিয়া।
পিছিয়ে পড়া এই বিশাল জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে শিক্ষিত এবং সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত শ্রেণি বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন:
১. শিক্ষার বিস্তার ও জ্ঞানভিত্তিক সহায়তা
শুধুমাত্র প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি নয়, গ্রামীণ ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য মানসম্মত শিক্ষার ব্যবস্থা করা জরুরি। শিক্ষিত তরুণরা প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্বেচ্ছাসেবী স্কুল পরিচালনা করতে পারেন। এছাড়া, বর্তমান যুগের চাহিদার সঙ্গে সংগতি রেখে সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি ও আইটি শিক্ষার সুযোগ প্রান্তিক পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া দরকার, যেন দরিদ্র পরিবারের সন্তানরা দ্রæত কর্মক্ষম হয়ে উঠতে পারে।
২. চিকিৎসাসেবার প্রসার
মেডিকেল পেশার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা প্রান্তিক মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বড় অবদান রাখতে পারেন। গ্রামাঞ্চলে নিয়মিত ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প পরিচালনা, টেলিমেডিসিন সেবার সম্প্রসারণ এবং স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যগত অধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব।
৩. কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও উদ্যোক্তা উন্নয়ন
যাদের আর্থিক সক্ষমতা রয়েছে, তারা কেবল শহরে ব্যবসা বা শিল্পকারখানা সীমাবদ্ধ না রেখে গ্রামীণ অর্থনীতিতে বিনিয়োগ করতে পারেন। কৃষিভিত্তিক শিল্প, কুটির শিল্প এবং স্থানীয় পর্যায়ে ছোট ছোট প্রজেক্ট চালুর মাধ্যমে গ্রামের মানুষের জন্য স্থায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা সম্ভব। এতে করে কাজের সন্ধানে গ্রামের মানুষের শহরমুখী হওয়ার প্রবণতাও কমবে।
৪. প্রবাসীদের অধিকার ও কল্যাণে কাজ করা
আমাদের রেমিট্যান্স যোদ্ধারা প্রবাসে অনেক সময় আইনি, সামাজিক বা মানসিক সংকটে পড়েন। আইনজীবী, সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মীরা তাদের অধিকার রক্ষায় দেশ-বিদেশে সোচ্চার ভ‚মিকা পালন করতে পারেন। প্রবাসীদের কষ্টার্জিত অর্থের সঠিক বিনিয়োগের জন্য সঠিক পরামর্শ ও দিকনির্দেশনা দেওয়াও শিক্ষিত শ্রেণির একটি বড় দায়িত্ব।
একটি দেশকে প্রকৃত অর্থে উন্নত করতে হলে সমাজের বৈষম্য দূর করা সবার আগে প্রয়োজন। মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের উন্নয়ন কখনো সামগ্রিক দেশের উন্নয়ন হতে পারে না। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের প্রধান শর্তই হলো- ‘কাউকে পেছনে ফেলে রাখা যাবে না।’ মেহনতি মানুষের অধিকার রক্ষা এবং তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করার মাধ্যমেই কেবল একটি সাম্যবাদী ও মানবিক সমাজ গঠন সম্ভব। সুবিধাপ্রাপ্ত সমাজ যদি তাদের দায়িত্ব এড়িয়ে যায়, তবে সামাজিক ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের অগ্রযাত্রাকেই বাধাগ্রস্ত করবে।
আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। আমরা উন্নয়নশীল দেশের কাতারে শামিল হচ্ছি, চারদিকে আধুনিকতার ছোঁয়া লাগছে। কিন্তু এই রূপান্তরের মূল কারিগর যে সাধারণ মানুষ, তাদের অবহেলা করে কোনো উন্নয়নই টেকসই হতে পারে না। কবি নজরুলের সেই অমোঘ বাণীকে ধারণ করে আমাদের আজ আত্মোপলব্ধি করতে হবে। সমাজের প্রতিটি সচেতন, শিক্ষিত ও সামর্থ্যবান মানুষের উচিত মেহনতি মানুষের প্রতি অবহেলার দেয়াল ভেঙে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া। তাদের ন্যায্য অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া এবং জীবনমান উন্নত করার মধ্য দিয়েই কেবল আমরা এই ঐতিহাসিক সামাজিক ঋণ শোধ করতে পারি। তবেই সার্থক হবে আমাদের স্বাধীনতা, তবেই গড়ে উঠবে বৈষম্যহীন সাম্য ও সমতার এক স্বপ্নের বাংলাদেশ।
মো. আবু ছালেক সেলিম রেজা সৌরভ: অধ্যক্ষ, সোনার বাংলা কলেজ, কুমিল্লা। সাবেক সিনেট সদস্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।

সবুজ-শ্যামল রূপ আর অফুরন্ত সম্ভাবনার দেশ আমাদের এই বাংলাদেশ। আজ আমরা যে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, দৃশ্যমান উন্নয়ন আর আধুনিকতার গল্প বলি, তার পেছনের গল্পটা কিন্তু রূপকথার মতো সহজ ছিল না। এই গল্পটা আসলে এদেশের কোটি কোটি কৃষক, শ্রমিক আর প্রবাসী মেহনতি মানুষের রক্ত, শ্রম আর ঘামের। অথচ রূঢ় বাস্তবতা হলো, যাদের অক্লান্ত পরিশ্রমে টেকসই অর্থনীতির ভিত তৈরি হয়েছে, তাদের এক বড় অংশ আজও মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। কবি কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায় তাই আজ উচ্চকণ্ঠে বলার সময় এসেছে- ‘দিনে দিনে বহু বাড়িয়াছে দেনা শুধিতে হইবে ঋণ।’ সমাজের সুবিধাপ্রাপ্ত ও শিক্ষিত শ্রেণির এখন সময় হয়েছে এই অবহেলিত জনগোষ্ঠীর প্রতি তাদের দায়বদ্ধতা স্বীকার করার এবং সেই ঋণ শোধে এগিয়ে আসার।
বাংলাদেশের অর্থনীতির সিংহভাগ অর্জনই মূলত মেহনতি মানুষের শ্রমের ফসল। এদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি তিনটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে আছে: কৃষি, তৈরি পোশাক ও ম্যানুফ্যাকচারিং শিল্প, এবং প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স। একটু গভীরভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, এই তিনটি খাতের প্রতিটির পেছনেই জড়িয়ে আছে এদেশের সাধারণ মেহনতি মানুষের হাড়ভাঙা খাটুনি।
রোদ-বৃষ্টি-ঝড় মাথায় নিয়ে যে কৃষক মাঠে ফসল ফলায়, তারাই ১৬ কোটির বেশি মানুষের খাদ্যের জোগান দেয়। দেশের জিডিপিতে কৃষির অবদান যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি খাদ্য নিরাপত্তার প্রশ্নে তারা অনন্য।
দেশের তৈরি পোশাক শিল্প আজ বিশ্বমঞ্চে সমাদৃত। এই শিল্পের চাকা সচল রাখছেন লাখ লাখ নারী ও পুরুষ শ্রমিক। তাদের স্বল্প মজুরির বিনিময়ে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা দেশের অর্থনীতির ভিতকে মজবুত করেছে।
নিজের চেনা পরিবেশ, পরিবার-পরিজন ছেড়ে মরুভ‚মির তপ্ত বালু বা বিদেশের কঠিন পরিস্থিতিতে যারা দিনরাত পরিশ্রম করছেন, সেই প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের মূল উৎস।
আমাদের জনসংখ্যার প্রায় আশি ভাগ মানুষ এখনও গ্রামে বসবাস করে। দৃশ্যত দেশের উন্নয়ন হলেও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ আজও শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং উন্নত জীবনের সুফল থেকে সমভাবে উপকৃত হতে পারছে না।
প্রকৃতপক্ষে, দেশের অর্ধেকের বেশি মানুষ কোনো না কোনোভাবে প্রতিদিন দারিদ্র্য ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে সংগ্রাম করে টিকে আছে। গ্রামীণ অঞ্চলের অবহেলিত মানুষগুলো এখনো ভালো মানের চিকিৎসা সেবা থেকে দূরে। সরকারি হাসপাতালগুলোর সীমাবদ্ধতা এবং বেসরকারি চিকিৎসার চড়া ব্যয়ের কারণে অনেকেই ন্যূনতম স্বাস্থ্যসেবা পান না। শিক্ষার আলো সব জায়গায় পৌঁছালেও মানসম্মত শিক্ষা এবং কারিগরি দক্ষতার অভাব গ্রামীণ তরুণদের কর্মক্ষেত্রে পিছিয়ে রাখছে। মেহনতি মানুষের এই বঞ্চনা প্রমাণ করে যে, সামষ্টিক অর্থনীতি বড় হলেও তার সুফল সবার কাছে সমানভাবে পৌঁছায়নি।
সমাজে যারা শিক্ষার আলোয় আলোকিত হয়েছেন, যারা ভালো কর্মসংস্থান, ব্যবসা বা মেধার জোরে উন্নত জীবনের অধিকারী হয়েছেন, তারা মূলত এই সুবিধাপ্রাপ্ত ক্ষুদ্র অংশের অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু এই সত্যটি ভুলে গেলে চলবে না যে, তাদের এই অবস্থানের পেছনে পরোক্ষভাবে হলেও কৃষক, শ্রমিক আর সাধারণ করদাতার অবদান রয়েছে।
রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো ব্যবহার করে যখন কেউ উচ্চশিক্ষিত বা সফল ব্যবসায়ী হন, তখন সেই অবকাঠামো তৈরিতে মেহনতি মানুষের ট্যাক্সের টাকা এবং শ্রম মিশে থাকে। তাই সমাজের অনগ্রসর ও পিছিয়ে পড়া মানুষের প্রতি এই সৌভাগ্যবান শ্রেণির একটি গভীর সামাজিক ও নৈতিক দায়বদ্ধতা তৈরি হয়। একে কেবল দয়া বা দানশীলতা হিসেবে দেখলে চলবে না, এটি মূলত এক ধরণের সামাজিক ঋণ শোধ করার প্রক্রিয়া।
পিছিয়ে পড়া এই বিশাল জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে শিক্ষিত এবং সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত শ্রেণি বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন:
১. শিক্ষার বিস্তার ও জ্ঞানভিত্তিক সহায়তা
শুধুমাত্র প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি নয়, গ্রামীণ ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য মানসম্মত শিক্ষার ব্যবস্থা করা জরুরি। শিক্ষিত তরুণরা প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্বেচ্ছাসেবী স্কুল পরিচালনা করতে পারেন। এছাড়া, বর্তমান যুগের চাহিদার সঙ্গে সংগতি রেখে সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি ও আইটি শিক্ষার সুযোগ প্রান্তিক পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া দরকার, যেন দরিদ্র পরিবারের সন্তানরা দ্রæত কর্মক্ষম হয়ে উঠতে পারে।
২. চিকিৎসাসেবার প্রসার
মেডিকেল পেশার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা প্রান্তিক মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বড় অবদান রাখতে পারেন। গ্রামাঞ্চলে নিয়মিত ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প পরিচালনা, টেলিমেডিসিন সেবার সম্প্রসারণ এবং স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যগত অধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব।
৩. কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও উদ্যোক্তা উন্নয়ন
যাদের আর্থিক সক্ষমতা রয়েছে, তারা কেবল শহরে ব্যবসা বা শিল্পকারখানা সীমাবদ্ধ না রেখে গ্রামীণ অর্থনীতিতে বিনিয়োগ করতে পারেন। কৃষিভিত্তিক শিল্প, কুটির শিল্প এবং স্থানীয় পর্যায়ে ছোট ছোট প্রজেক্ট চালুর মাধ্যমে গ্রামের মানুষের জন্য স্থায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা সম্ভব। এতে করে কাজের সন্ধানে গ্রামের মানুষের শহরমুখী হওয়ার প্রবণতাও কমবে।
৪. প্রবাসীদের অধিকার ও কল্যাণে কাজ করা
আমাদের রেমিট্যান্স যোদ্ধারা প্রবাসে অনেক সময় আইনি, সামাজিক বা মানসিক সংকটে পড়েন। আইনজীবী, সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মীরা তাদের অধিকার রক্ষায় দেশ-বিদেশে সোচ্চার ভ‚মিকা পালন করতে পারেন। প্রবাসীদের কষ্টার্জিত অর্থের সঠিক বিনিয়োগের জন্য সঠিক পরামর্শ ও দিকনির্দেশনা দেওয়াও শিক্ষিত শ্রেণির একটি বড় দায়িত্ব।
একটি দেশকে প্রকৃত অর্থে উন্নত করতে হলে সমাজের বৈষম্য দূর করা সবার আগে প্রয়োজন। মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের উন্নয়ন কখনো সামগ্রিক দেশের উন্নয়ন হতে পারে না। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের প্রধান শর্তই হলো- ‘কাউকে পেছনে ফেলে রাখা যাবে না।’ মেহনতি মানুষের অধিকার রক্ষা এবং তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করার মাধ্যমেই কেবল একটি সাম্যবাদী ও মানবিক সমাজ গঠন সম্ভব। সুবিধাপ্রাপ্ত সমাজ যদি তাদের দায়িত্ব এড়িয়ে যায়, তবে সামাজিক ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের অগ্রযাত্রাকেই বাধাগ্রস্ত করবে।
আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। আমরা উন্নয়নশীল দেশের কাতারে শামিল হচ্ছি, চারদিকে আধুনিকতার ছোঁয়া লাগছে। কিন্তু এই রূপান্তরের মূল কারিগর যে সাধারণ মানুষ, তাদের অবহেলা করে কোনো উন্নয়নই টেকসই হতে পারে না। কবি নজরুলের সেই অমোঘ বাণীকে ধারণ করে আমাদের আজ আত্মোপলব্ধি করতে হবে। সমাজের প্রতিটি সচেতন, শিক্ষিত ও সামর্থ্যবান মানুষের উচিত মেহনতি মানুষের প্রতি অবহেলার দেয়াল ভেঙে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া। তাদের ন্যায্য অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া এবং জীবনমান উন্নত করার মধ্য দিয়েই কেবল আমরা এই ঐতিহাসিক সামাজিক ঋণ শোধ করতে পারি। তবেই সার্থক হবে আমাদের স্বাধীনতা, তবেই গড়ে উঠবে বৈষম্যহীন সাম্য ও সমতার এক স্বপ্নের বাংলাদেশ।
মো. আবু ছালেক সেলিম রেজা সৌরভ: অধ্যক্ষ, সোনার বাংলা কলেজ, কুমিল্লা। সাবেক সিনেট সদস্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।