দেবীদ্বারে রোপা আমনের পর সরিষায় সোনালি সম্ভাবনা

দেবীদ্বার প্রতিনিধি
Thumbnail image

কুমিল্লার দেবীদ্বারে রোপা আমন ধান কাটার পর পতিত পড়ে থাকা জমিতে সরিষা চাষ করে একই জমিতে আবার বোরো আবাদ’ এমন সফল শস্যবিন্যাসে নতুন দিগন্ত খুলেছে কৃষকের। প্রথম বছরেই মিলেছে আশাব্যঞ্জক সাফল্য। এতে যেমন শস্যের নিবিড়তা বেড়েছে, তেমনি অতিরিক্ত আয় পেয়ে কৃষকের মুখে ফুটেছে হাসি। চলতি মৌসুমে দেবীদ্বার উপজেলায় নতুন করে প্রায় ১০০ হেক্টর জমিতে সরিষা চাষ হয়েছে।

মাঠজুড়ে হলুদ চাদর, কৃষকের মুখে স্বস্তি। পৌরসভার বড় আলমপুর মাঠ ঘুরে দেখা যায়, বিস্তীর্ণ এলাকায় প্রায় ২০ বিঘা জমিতে সরিষার আবাদ। ফুলে ফুলে মাঠ যেন হলুদ চাদরে মোড়া। রাস্তা থেকেই পাওয়া যাচ্ছে সরিষার মিষ্টি সুঘ্রাণ। মাঠের কাছে গেলেই চোখে পড়ে মধু সংগ্রহে ব্যস্ত মৌমাছির দল’-এক কথায় সাজ সাজ রব।

স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, উপজেলা কৃষি অফিসের পরামর্শ ও সহায়তায় এবারই প্রথম সরিষা চাষে আগ্রহী হয়েছেন তাঁরা। শুরুতে আশঙ্কা থাকলেও এখন ফলনের সম্ভাবনা দেখে স্বস্তিতে আছেন কৃষকেরা।

বড় আলমপুর এলাকার কৃষক আমিনুল ইসলাম জানান, খরিফ-২ মৌসুমে রোপা আমন কাটার পর সরিষা চাষ নিয়ে উপজেলা কৃষি অফিসের উদ্যোগে আলোচনা সভা হয়। সেখান থেকেই আগ্রহ তৈরি হয়। প্রথমবার ২০ বিঘা জমিতে সরিষা আবাদ করা হয়েছে। এখন মাঠজুড়ে ফুল দেখে আশঙ্কা কেটে গেছে। বিকেল হলেই দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ছবি তুলতে আসে। আগামী বছর পুরো মাঠজুড়ে সরিষা আবাদে আগ্রহী কৃষকেরা-এ নিয়ে এখনই আলোচনা চলছে।

ফতেহাবাদ ইউনিয়নের সুলতানপুর গ্রামে তরুণ কৃষক মারুফ পতিত জমিতে সরিষা আবাদ করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। এতে পতিত জমিগুলোর প্রাণ ফিরে পেয়েছে।

তিনি জানান, যে জমিতে একসময় চাষের ট্রাক্টর ঢুকত না, সেখানে এ বছর প্রথমবার ১২ বিঘা জমিতে সরিষা চাষ হয়েছে। ট্রাক্টর ঢোকায় আশপাশের আরও ১০ বিঘা জমিতে শসা, গমসহ নানা ফসল আবাদ সম্ভব হয়েছে।

উপসহকারী কৃষি অফিসার মোছা. নাজমা আক্তারের পরামর্শে প্রথমে ৬ বিঘা জমিতে সরিষা চাষের উদ্যোগ নেন কয়েকজন কৃষক। দেখাদেখি আরও ৬ বিঘা জমিতে আবাদ হয়। একই ইউনিয়নের ফতেহাবাদ গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, ১০০ বিঘারও বেশি জমিতে সরিষা আবাদ হয়েছে। স্থানীয় কৃষকেরা ইতোমধ্যে সরিষা তুলে বোরো আবাদে প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, কুমিল্লা অঞ্চলে টেকসই কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণ প্রকল্পের আওতায় কৃষক গ্রুপ গঠন করে শস্যবিন্যাসে সরিষার অন্তর্ভুক্তি এবং বিনা চাষে সরিষা আবাদে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। নতুন জাত সম্প্রসারণ ও ফলন ব্যবধান কমাতে স্থাপন করা হয়েছে প্রদর্শনী প্লট। পাশাপাশি সরকারি উদ্যোগে উপজেলা পরিষদের অর্থায়নে ৫০০ জন কৃষকের জন্য প্রণোদনা কর্মসূচি নেওয়া হয়; এর আওতায় ৪০০ জন কৃষককে সরিষা বীজ ও সার বিতরণ করা হয়েছে।

চলতি মৌসুমে দেবীদ্বার উপজেলায় মোট ৩৯৭ হেক্টর জমিতে সরিষা আবাদ হয়েছে। এতে আনুমানিক ৫ হাজার টন সরিষা উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে, যার বাজার মূল্য কমপক্ষে দেড় কোটি টাকা।

উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ বানিন রায় বলেন, দেবীদ্বারে শস্যের নিবিড়তা বেশি এবং কৃষকেরা ধানভিত্তিক শস্যবিন্যাসে অভ্যস্ত হওয়ায় সরিষা সম্প্রসারণ চ্যালেঞ্জিং। তবে বোরো-পতিত-রোপা আমন ও বোরো-পতিত শস্যবিন্যাসের জমিতে সরিষা অন্তর্ভুক্ত করে আবাদ বৃদ্ধির কার্যক্রম নেওয়া হয়েছে। নতুন জাত হিসেবে এবার প্রথমবার বিনাসরিষা-১১ ও বারি সরিষা-২০ আবাদ ও বীজ উৎপাদনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। কৃষক গ্রুপে উঠান বৈঠক চলমান রয়েছে। আগামী দিনে সরিষার আবাদ আরও বাড়বে বলে আমরা আশাবাদী।

রোপা আমনের পর সরিষা-আর তারপর বোরো। এই তিন ফসলের সমন্বয় দেবীদ্বারের কৃষিতে এনে দিয়েছে নতুন সম্ভাবনা। পতিত জমির সদ্ব্যবহার, বাড়তি আয় ও কৃষকের আগ্রহ-সব মিলিয়ে সরিষা এখন দেবীদ্বারের কৃষিতে এক উজ্জ্বল সম্ভাবনার নাম।

বিষয়:

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

সম্পর্কিত