️সৌরভের সুবচন
মো.আবু ছালেক সেলিম রেজা সৌরভ

একটি দেশের আসল শক্তি তার মাটির নিচে থাকা সম্পদ নয়, বরং মানুষের মগজে থাকা মেধা ও সৃজনশীলতা। বাংলাদেশ নামক স্বাধীন রাষ্ট্রটির জন্ম থেকেই আমরা শুনে আসছি মেধাবীদের মূল্যায়নের কথা। রাজনীতির মঞ্চ, প্রশাসনের সভা কিংবা সভা-সমাবেশের ভাষণ—সবখানেই রাজনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারকরা এক বাক্যে স্বীকার করেন যে মেধাবীদের এগিয়ে আনতে হবে। কিন্তু বাস্তবের চিত্রটা একেবারেই আলাদা। কথার ফুলঝুরি যত বড়ই হোক, কাজের ক্ষেত্রে মেধাবীরা বরাবরই আড়ালে থেকে যান। আর এই সুযোগে যোগ্যতা ও মেধার ঘাটতি থাকা মানুষগুলো দখলের মতো করে পৌঁছে যান সমাজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোতে।
সবকিছুরই একটা না একটা বিকল্প খুঁজে পাওয়া যায়, কিন্তু মেধা, বুদ্ধি আর সৃজনশীলতার কোনো বিকল্প নেই। একজন মেধাবী মানুষ কেবল বইয়ের পাতা পড়ে কিংবা সার্টিফিকেট জমিয়ে বসে থাকেন না। তিনি বোঝেন বাস্তবতা, চোখের সামনে থাকা সমস্যাগুলোকে চিনতে পারেন এবং সবচেয়ে কম সময়ে ও সুনির্দিষ্ট উপায়ে তার সমাধান খুঁজে বের করতে পারেন। সিদ্ধান্ত নেওয়ার এই ক্ষমতা যখন যোগ্য মানুষের হাতে থাকে না, তখন পুরো সমাজ ও রাষ্ট্রকে তার খেসারত দিতে হয়।
মেধাবীদের সঠিক মূল্যায়ন না হওয়ার মাশুল বাংলাদেশ এখন প্রতিটি ক্ষেত্রে দিচ্ছে। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা আজ মুখস্থ নির্ভরতা আর সার্টিফিকেট বিতরণের কারখানায় পরিণত হয়েছে। যেখানে গবেষণার সুযোগ নেই, নতুন চিন্তার স্থান নেই, সেখানে মেধার বিকাশ ঘটে না। আবার যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও সঠিক সুযোগ ও মূল্যায়নের অভাবে অসংখ্য তরুণ দেশ ছাড়ছেন। তারা বিদেশের মাটিতে নিজেদের বুদ্ধিমত্তা দিয়ে একের পর এক সাফল্য এনে দিচ্ছেন, আর নিজ দেশে পড়ে থাকছে এক ধরণের শূন্যতা। আমাদের এই মেধা পাচার বন্ধ করতে না পারলে সামনের দিনে উন্নত ও স্বনির্ভর বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখা নিছকই কল্পনা।
রাজনীতি, প্রশাসন এবং নীতি-নির্ধারণী পর্যায়—এই তিন জায়গায় মেধাবীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। যখন কোনো রাজনৈতিক দলে বা জাতীয় নেতৃত্বে মেধার বদলে অন্ধ আনুগত্য প্রাধান্য পায়, তখন সাধারণ মানুষের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয় না। একইভাবে প্রশাসনে যদি যোগ্যতা ও দক্ষতার বদলে অন্য কোনো হিসাব দিয়ে দায়িত্ব বণ্টন করা হয়, তবে প্রশাসনিক স্থবিরতা ও দুর্নীতি দেখা দেওয়া স্বাভাবিক। যোগ্য ও মেধাবী মানুষ যদি নীতি তৈরির প্রক্রিয়ায় না থাকেন, তবে তৈরি হওয়া নীতিগুলো কেবল কাগজে-কলমে থেকে যায়, সাধারণ মানুষের কোনো কাজে আসে না।
এখন প্রশ্ন হতে পারে, বদলটা কীভাবে আসবে?
প্রথমত, আমাদের পুরো শিক্ষাব্যবস্থা ও নিয়োগ প্রক্রিয়ায় আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। শুধু প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি নয়, একজন মানুষের সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা, সৃজনশীলতা ও চিন্তার গভীরতাকে মূল্যায়নের ভিত্তি করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, কর্মক্ষেত্রে স্বজনপ্রীতি ও যোগ্যতাহীনদের অন্যায্য সুযোগ বন্ধ করে মেধাভিত্তিক প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। প্রতিটি সেক্টরে মেধাবীদের স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে, যেন তারা কোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক বাধার মুখে না পড়েন।
তৃতীয়ত, মেধার যথাযথ সম্মান ও প্রতিদান নিশ্চিত করতে হবে। তরুণ প্রজন্মকে এই আশ্বাস দিতে হবে যে, এই দেশে সৎ উপায়ে এবং নিজের মেধা ব্যবহার করেই সম্মানজনকভাবে বেঁচে থাকা সম্ভব।
বিশেষায়িত ও কারিগরি ক্ষেত্রগুলোতে মেধাবীদের উপযুক্ত দায়িত্ব প্রদান করার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। একজন প্রকৌশলী, একজন চিকিৎসক কিংবা একজন প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞের সামান্য ভুলের ওপর হাজার মানুষের জীবন ও রাষ্ট্রের শত শত কোটি টাকার সম্পদ নির্ভর করে। বড় বড় অবকাঠামোগত পরিকল্পনা থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের চিকিৎসা সেবা—সবখানেই যদি শীর্ষ মেধাগুলো সঠিক স্থানে বসতে না পারে, তবে পুরো ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা হারিয়ে যায়। যখন একজন যোগ্য প্রকৌশলী কিংবা দক্ষ চিকিৎসক তার প্রাপ্য মর্যাদা ও স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ পান না, তখন তৈরি হয় মেধা পাচারের মতো মারাত্মক সংকট। আমাদের তরুণ মেধাবীরা বিদেশের মাটিতে নিজেদের কাজের প্রমাণ দিচ্ছেন, অথচ নিজ দেশে তাদের মূল্যায়নের অভাবে রাষ্ট্র বঞ্চিত হচ্ছে তাদের সেবা থেকে।
সবচেয়ে বড় পরিবর্তন প্রয়োজন আমাদের রাজনৈতিক ও নেতৃত্ব নির্বাচনে। রাষ্ট্রের শাসনদণ্ড এবং বিভিন্ন স্তরের জনপ্রতিনিধি নির্বাচন যদি মেধা, বিবেক ও মেধার নিরিখে না হয়, তবে অন্য কোনো সংস্কারই দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া কোনো রাষ্ট্র এগোতে পারে না। নীতি-নির্ধারণের টেবিলে যদি দূরদর্শী, সৎ ও মেধাভিত্তিক নেতৃত্বের অভাব থাকে, তবে সমাজের অন্যান্য স্তরে যত বড় মেধাবীই থাকুক না কেন, তাদের সঠিক ব্যবহার হয় না। যে প্রতিনিধিরা আইন তৈরি করবেন, জাতীয় বাজেট তৈরি করবেন এবং দেশের জন্য ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা প্রণয়ন করবেন—তাদের নিজস্ব মেধা ও সৃজনশীলতা থাকা আবশ্যক। অন্ধ আনুগত্য কিংবা পেশিশক্তির বদলে যদি রাজনৈতিক দলগুলো মেধা ও যোগ্যতা সম্পন্ন মানুষদের নেতৃত্ব প্রদানের সুযোগ করে দেয়, তবে রাজনীতি সম্পর্কে জনগণের যে নেতিবাচক ধারণা রয়েছে তাও বদলে যাবে।
বদলের এই সূচনা করতে হলে প্রথমত নিয়োগ প্রক্রিয়ায় আমূল সংস্কার আনতে হবে। দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি বা অসচ্ছতা বাদ দিয়ে সরকারি-বেসরকারি সকল নিয়োগে শতভাগ মেধাভিত্তিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, কারিগরি ও পেশাগত ক্ষেত্রগুলোতে বিশেষজ্ঞ মানুষদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা দিতে হবে, যাতে প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ তাদের কাজে বাধা হতে না পারে। তৃতীয়ত, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে কেবল সনদমুখী না করে চিন্তা করার ক্ষমতা এবং সৃজনশীলতা বিকাশের উপযোগী করে গড়ে তুলতে হবে।
সমৃদ্ধ বাংলাদেশের স্বপ্ন কেবল ফাঁকা বুলি বা স্লোগানে আটকে থাকলে চলবে না। রাজনীতির মাঠ থেকে শুরু করে দেশের প্রশাসনিক ভবন, হাসপাতাল, প্রকৌশল দপ্তর এবং শ্রেণিকক্ষ—সব স্তরে যখন মেধাবীদের হাতে দায়িত্ব অর্পিত হবে, তখনই বদলে যাবে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি। বিশ্ব দরবারে নিজেদের মাথা উঁচু করে দাঁড় করাতে হলে এবং কোটি মানুষের স্বপ্নের সমৃদ্ধশালী, সুখী ও প্রগতিশীল বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হলে মেধাবীদের মূল্যায়নের কোনো বিকল্প নেই।
একটি দেশের সমৃদ্ধি নির্ভর করে সেই দেশের সেরা মস্তিষ্কগুলো কোন কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে তার ওপর। আমরা যদি সত্যিই লাখো মানুষের রক্তের বিনিময়ে পাওয়া এই বাংলাদেশকে বিশ্ব দরবারে একটি সমৃদ্ধ, সুখী ও প্রগতিশীল রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে চাই, তবে মেধার ওপর অবিচার করা এখনই বন্ধ করতে হবে। রাজনীতির টেবিল থেকে শুরু করে শিক্ষার আঙিনা—সব জায়গায় যোগ্যদের হাতে নেতৃত্ব তুলে দেওয়ার সময় এসেছে। মেধাবীদের অগ্রাধিকার দিয়ে তাদের কাজের উপযোগী পরিবেশ তৈরি করে দিতে পারলে আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ বদলাবেই। আর তখনই তৈরি হবে লাখো কোটি মানুষের স্বপ্নের সেই কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ।
মো. আবু ছালেক সেলিম রেজা সৌরভ: অধ্যক্ষ, সোনার বাংলা কলেজ, কুমিল্লা। সাবেক সিনেট সদস্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।

একটি দেশের আসল শক্তি তার মাটির নিচে থাকা সম্পদ নয়, বরং মানুষের মগজে থাকা মেধা ও সৃজনশীলতা। বাংলাদেশ নামক স্বাধীন রাষ্ট্রটির জন্ম থেকেই আমরা শুনে আসছি মেধাবীদের মূল্যায়নের কথা। রাজনীতির মঞ্চ, প্রশাসনের সভা কিংবা সভা-সমাবেশের ভাষণ—সবখানেই রাজনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারকরা এক বাক্যে স্বীকার করেন যে মেধাবীদের এগিয়ে আনতে হবে। কিন্তু বাস্তবের চিত্রটা একেবারেই আলাদা। কথার ফুলঝুরি যত বড়ই হোক, কাজের ক্ষেত্রে মেধাবীরা বরাবরই আড়ালে থেকে যান। আর এই সুযোগে যোগ্যতা ও মেধার ঘাটতি থাকা মানুষগুলো দখলের মতো করে পৌঁছে যান সমাজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোতে।
সবকিছুরই একটা না একটা বিকল্প খুঁজে পাওয়া যায়, কিন্তু মেধা, বুদ্ধি আর সৃজনশীলতার কোনো বিকল্প নেই। একজন মেধাবী মানুষ কেবল বইয়ের পাতা পড়ে কিংবা সার্টিফিকেট জমিয়ে বসে থাকেন না। তিনি বোঝেন বাস্তবতা, চোখের সামনে থাকা সমস্যাগুলোকে চিনতে পারেন এবং সবচেয়ে কম সময়ে ও সুনির্দিষ্ট উপায়ে তার সমাধান খুঁজে বের করতে পারেন। সিদ্ধান্ত নেওয়ার এই ক্ষমতা যখন যোগ্য মানুষের হাতে থাকে না, তখন পুরো সমাজ ও রাষ্ট্রকে তার খেসারত দিতে হয়।
মেধাবীদের সঠিক মূল্যায়ন না হওয়ার মাশুল বাংলাদেশ এখন প্রতিটি ক্ষেত্রে দিচ্ছে। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা আজ মুখস্থ নির্ভরতা আর সার্টিফিকেট বিতরণের কারখানায় পরিণত হয়েছে। যেখানে গবেষণার সুযোগ নেই, নতুন চিন্তার স্থান নেই, সেখানে মেধার বিকাশ ঘটে না। আবার যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও সঠিক সুযোগ ও মূল্যায়নের অভাবে অসংখ্য তরুণ দেশ ছাড়ছেন। তারা বিদেশের মাটিতে নিজেদের বুদ্ধিমত্তা দিয়ে একের পর এক সাফল্য এনে দিচ্ছেন, আর নিজ দেশে পড়ে থাকছে এক ধরণের শূন্যতা। আমাদের এই মেধা পাচার বন্ধ করতে না পারলে সামনের দিনে উন্নত ও স্বনির্ভর বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখা নিছকই কল্পনা।
রাজনীতি, প্রশাসন এবং নীতি-নির্ধারণী পর্যায়—এই তিন জায়গায় মেধাবীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। যখন কোনো রাজনৈতিক দলে বা জাতীয় নেতৃত্বে মেধার বদলে অন্ধ আনুগত্য প্রাধান্য পায়, তখন সাধারণ মানুষের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয় না। একইভাবে প্রশাসনে যদি যোগ্যতা ও দক্ষতার বদলে অন্য কোনো হিসাব দিয়ে দায়িত্ব বণ্টন করা হয়, তবে প্রশাসনিক স্থবিরতা ও দুর্নীতি দেখা দেওয়া স্বাভাবিক। যোগ্য ও মেধাবী মানুষ যদি নীতি তৈরির প্রক্রিয়ায় না থাকেন, তবে তৈরি হওয়া নীতিগুলো কেবল কাগজে-কলমে থেকে যায়, সাধারণ মানুষের কোনো কাজে আসে না।
এখন প্রশ্ন হতে পারে, বদলটা কীভাবে আসবে?
প্রথমত, আমাদের পুরো শিক্ষাব্যবস্থা ও নিয়োগ প্রক্রিয়ায় আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। শুধু প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি নয়, একজন মানুষের সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা, সৃজনশীলতা ও চিন্তার গভীরতাকে মূল্যায়নের ভিত্তি করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, কর্মক্ষেত্রে স্বজনপ্রীতি ও যোগ্যতাহীনদের অন্যায্য সুযোগ বন্ধ করে মেধাভিত্তিক প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। প্রতিটি সেক্টরে মেধাবীদের স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে, যেন তারা কোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক বাধার মুখে না পড়েন।
তৃতীয়ত, মেধার যথাযথ সম্মান ও প্রতিদান নিশ্চিত করতে হবে। তরুণ প্রজন্মকে এই আশ্বাস দিতে হবে যে, এই দেশে সৎ উপায়ে এবং নিজের মেধা ব্যবহার করেই সম্মানজনকভাবে বেঁচে থাকা সম্ভব।
বিশেষায়িত ও কারিগরি ক্ষেত্রগুলোতে মেধাবীদের উপযুক্ত দায়িত্ব প্রদান করার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। একজন প্রকৌশলী, একজন চিকিৎসক কিংবা একজন প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞের সামান্য ভুলের ওপর হাজার মানুষের জীবন ও রাষ্ট্রের শত শত কোটি টাকার সম্পদ নির্ভর করে। বড় বড় অবকাঠামোগত পরিকল্পনা থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের চিকিৎসা সেবা—সবখানেই যদি শীর্ষ মেধাগুলো সঠিক স্থানে বসতে না পারে, তবে পুরো ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা হারিয়ে যায়। যখন একজন যোগ্য প্রকৌশলী কিংবা দক্ষ চিকিৎসক তার প্রাপ্য মর্যাদা ও স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ পান না, তখন তৈরি হয় মেধা পাচারের মতো মারাত্মক সংকট। আমাদের তরুণ মেধাবীরা বিদেশের মাটিতে নিজেদের কাজের প্রমাণ দিচ্ছেন, অথচ নিজ দেশে তাদের মূল্যায়নের অভাবে রাষ্ট্র বঞ্চিত হচ্ছে তাদের সেবা থেকে।
সবচেয়ে বড় পরিবর্তন প্রয়োজন আমাদের রাজনৈতিক ও নেতৃত্ব নির্বাচনে। রাষ্ট্রের শাসনদণ্ড এবং বিভিন্ন স্তরের জনপ্রতিনিধি নির্বাচন যদি মেধা, বিবেক ও মেধার নিরিখে না হয়, তবে অন্য কোনো সংস্কারই দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া কোনো রাষ্ট্র এগোতে পারে না। নীতি-নির্ধারণের টেবিলে যদি দূরদর্শী, সৎ ও মেধাভিত্তিক নেতৃত্বের অভাব থাকে, তবে সমাজের অন্যান্য স্তরে যত বড় মেধাবীই থাকুক না কেন, তাদের সঠিক ব্যবহার হয় না। যে প্রতিনিধিরা আইন তৈরি করবেন, জাতীয় বাজেট তৈরি করবেন এবং দেশের জন্য ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা প্রণয়ন করবেন—তাদের নিজস্ব মেধা ও সৃজনশীলতা থাকা আবশ্যক। অন্ধ আনুগত্য কিংবা পেশিশক্তির বদলে যদি রাজনৈতিক দলগুলো মেধা ও যোগ্যতা সম্পন্ন মানুষদের নেতৃত্ব প্রদানের সুযোগ করে দেয়, তবে রাজনীতি সম্পর্কে জনগণের যে নেতিবাচক ধারণা রয়েছে তাও বদলে যাবে।
বদলের এই সূচনা করতে হলে প্রথমত নিয়োগ প্রক্রিয়ায় আমূল সংস্কার আনতে হবে। দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি বা অসচ্ছতা বাদ দিয়ে সরকারি-বেসরকারি সকল নিয়োগে শতভাগ মেধাভিত্তিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, কারিগরি ও পেশাগত ক্ষেত্রগুলোতে বিশেষজ্ঞ মানুষদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা দিতে হবে, যাতে প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ তাদের কাজে বাধা হতে না পারে। তৃতীয়ত, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে কেবল সনদমুখী না করে চিন্তা করার ক্ষমতা এবং সৃজনশীলতা বিকাশের উপযোগী করে গড়ে তুলতে হবে।
সমৃদ্ধ বাংলাদেশের স্বপ্ন কেবল ফাঁকা বুলি বা স্লোগানে আটকে থাকলে চলবে না। রাজনীতির মাঠ থেকে শুরু করে দেশের প্রশাসনিক ভবন, হাসপাতাল, প্রকৌশল দপ্তর এবং শ্রেণিকক্ষ—সব স্তরে যখন মেধাবীদের হাতে দায়িত্ব অর্পিত হবে, তখনই বদলে যাবে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি। বিশ্ব দরবারে নিজেদের মাথা উঁচু করে দাঁড় করাতে হলে এবং কোটি মানুষের স্বপ্নের সমৃদ্ধশালী, সুখী ও প্রগতিশীল বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হলে মেধাবীদের মূল্যায়নের কোনো বিকল্প নেই।
একটি দেশের সমৃদ্ধি নির্ভর করে সেই দেশের সেরা মস্তিষ্কগুলো কোন কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে তার ওপর। আমরা যদি সত্যিই লাখো মানুষের রক্তের বিনিময়ে পাওয়া এই বাংলাদেশকে বিশ্ব দরবারে একটি সমৃদ্ধ, সুখী ও প্রগতিশীল রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে চাই, তবে মেধার ওপর অবিচার করা এখনই বন্ধ করতে হবে। রাজনীতির টেবিল থেকে শুরু করে শিক্ষার আঙিনা—সব জায়গায় যোগ্যদের হাতে নেতৃত্ব তুলে দেওয়ার সময় এসেছে। মেধাবীদের অগ্রাধিকার দিয়ে তাদের কাজের উপযোগী পরিবেশ তৈরি করে দিতে পারলে আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ বদলাবেই। আর তখনই তৈরি হবে লাখো কোটি মানুষের স্বপ্নের সেই কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ।
মো. আবু ছালেক সেলিম রেজা সৌরভ: অধ্যক্ষ, সোনার বাংলা কলেজ, কুমিল্লা। সাবেক সিনেট সদস্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।