গাজীউল হক সোহাগ

সম্প্রতি এক সকালে ঘুম ভাঙালেন বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের এক কর্মকর্তা। তিনি জানালেন, তাঁর বোনের দশম শ্রেণিতে পড়ুয়া মেয়েটি সুইসাইড করেছে। মেয়েটি রাজধানীর একটি নামকরা স্কুলের ছাত্রী। আমি ওনার কথা শুনে বিস্ময়ে হতবাক। ওই ছাত্রীর বাবা আমার পরিচিত। ভীষণ ভালো মানুষ। বাড়ি আমাদের উপজেলায়। কদিন আগে কাকরাইলে একটা অনুষ্ঠানে দেখা হল।
আমি ওই কর্মকর্তার কথা শুনছি, আর নিজেকে সামলে নিচ্ছি।
ওই কর্মকর্তা আমাকে আরও জানালেন, ওরা দুই বোন। বড় বোন একটি প্রাইভেট ভার্সিটিতে পড়ে, ভালো ছাত্রী, রেজাল্ট ভালো। যে মেয়েটি আত্নহনন করেছে, তার রেজাল্টও ভালো।
আত্নহননের আগে মেয়েটি তার কক্ষে ঢুকে শাড়ি পরে। সুন্দর করে সাজে। এরপর দরজা বন্ধ করে আত্নহনন করে। পরে পরিবারের সদস্যরা বিষয়টি টের পেয়ে দরজা ভেঙে তাকে উদ্ধার করে। ঘটনার সময় মেয়েটির বাবা দেশের অন্য একটি শহরে ছিলেন।
ওই কর্মকর্তার ভাষ্য মোতাবেক, বড় মেয়েটিও পৃথিবী নিয়ে হতাশ। জাগতিক বিষয় নিয়ে চরম হতাশ। এ অবস্থায় পুরো পরিবারের সদস্যরা দুই বোনকে চোখে চোখে রাখতেন। চিকিৎসা করাতেন। এরই মধ্যে ছোটটা চলে গেল। তারা এই পৃথিবী ভালো নয় বলে মনে করতো। জপতো।
এর আগে সাইবার বুলিং ও নানাভাবে হেনস্তার শিকার হয়ে একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রী নিজ বাসায় আত্নহত্যা করেন। আত্নহত্যার পর সরকারি হাসপাতালে তাঁর মরদেহ দেখেছি। কয়েক বছর আগে এক বাসার কাজের মেয়ে আত্নহত্যা করেছে। আমি তার ঝুলন্ত লাশ দেখেছি। এ রকম অসংখ্য কেইস স্টাডি আছে।
আজ বিশ্ব আত্নহত্যা প্রতিরোধ দিবস। বাংলাদেশে প্রতিদিন গড়ে ৪০ জনের মতো আত্নহত্যা করে। সকালে একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলের স্কলে দেখেছি এ তথ্য। দেশে আত্নহত্যার এ প্রবণতা রুখতে হলে পারিবারিক সম্পর্ক জোরদার করতে হবে। পরিবারের সদস্যদের মানসিক স্বাস্থ্য দেখতে হবে।
আমি সমাজকর্মের স্টুডেন্ট ছিলাম। সাইকোলজি পড়েছি। আত্নহননের সম্ভাব্য কারণ বিশ্লেষণ করেছি। মানুষ নানা কারণে হতাশায় ভোগেন। এটা এক ধরণের মানসিক রোগ। এই রোগে আক্রান্তদের নানাভাবে বুঝা যায়। এইক্ষেত্রে তাকে পরম যত্নে রাখতে হয়। চোখে চোখে রাখতে হয়। চান্স পেলেই সে নির্জনতা, নিরাপদ জায়গা বেছে নিয়ে নিজেকে শেষ করে। রেখে যায় পরিবারের জন্য দাগ। এক বুক হতাশা।
আত্নহত্যাকে সমাজ কোনভাবেই ভালো চোখে দেখে না। কিন্তু প্রত্যাশা পূরণ না হলে হুট করেই কাজ করে পেলে এ রোগীরা। কিশোর বয়সে এটা বেশি হয়। আমার চোখের সামনে দেখেছি কত মেধাবী মুখ ঝরে যেতে। তাদের বাবাদের করুণ আর্তনাদ দেখেছি। অনুশোচনা শুনেছি। বুক থাপড়ে কাঁদতে দেখেছি।
এর থেকে মুক্তির উপায় পারিবারিক আবহে বন্ধুর মতো রোগীর পাশে থাকে। পজেটিভ মানসিকতা তৈরি করা। মানবের মধ্যে বেঁচে থাকার প্রেরণা যোগানো। মনোলোভা পরিবেশে ঘুরতে যাওয়া। সন্তানের সামনে বাবা মায়ের ঝগড়া, হাতাহাতি ও মারামারি না করা। কাউকে তাচ্ছিল্য না করা। অন্যের সঙ্গে তুলনা না করা। কাউন্সিলিং করা। চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া। নৈতিক শিক্ষায় সম্পৃক্ত করা।
সাধারণত প্রেমে ব্যর্থ হওয়া, গেম খেলতে না দেওয়া, মাদক সেবনে বাধা, মুঠোফোন ব্যবহার করতে নিষেধ করা বা কিনে না দেওয়া, ঋন পরিশোধ করতে না পারা, বিয়ে করতে না পারা, অন্যের সাথে তুলনা করা, খোঁটা দেওয়া, ভীষন্নতা, অবৈধ, অনৈতিক সম্পর্ক মেনে না নেওয়া, লোক লজ্জামূলক কাজের কারণে আত্নহত্যার ঘটনা ঘটে।
কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলায় আত্নহত্যার ঘটনা বেশি। ওই উপজেলায় এক বছরে কেবল বিষপানে ২৩৩ জন আত্নহত্যার চেষ্টা করেছিল।
যে মেয়েটি চলে গেলো তাকে এ পর্যন্ত আনতে মা, বাবা ও পরিবারের সদস্যদের কতো পরিশ্রম করতে হয়েছে। প্রিয় কিশোর কিশোরী বাবা মার বুক খালি করে যাতনা দিয়ে যেও না। পৃথিবীটা আসলেই সুন্দর।
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে, মানবের মাঝে বাঁচিবার চাই।
নিজে বাঁচো, পরিবারকে বাঁচাও।
গাজীউল হক সোহাগ: সম্পাদক , আমার শহর

সম্প্রতি এক সকালে ঘুম ভাঙালেন বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের এক কর্মকর্তা। তিনি জানালেন, তাঁর বোনের দশম শ্রেণিতে পড়ুয়া মেয়েটি সুইসাইড করেছে। মেয়েটি রাজধানীর একটি নামকরা স্কুলের ছাত্রী। আমি ওনার কথা শুনে বিস্ময়ে হতবাক। ওই ছাত্রীর বাবা আমার পরিচিত। ভীষণ ভালো মানুষ। বাড়ি আমাদের উপজেলায়। কদিন আগে কাকরাইলে একটা অনুষ্ঠানে দেখা হল।
আমি ওই কর্মকর্তার কথা শুনছি, আর নিজেকে সামলে নিচ্ছি।
ওই কর্মকর্তা আমাকে আরও জানালেন, ওরা দুই বোন। বড় বোন একটি প্রাইভেট ভার্সিটিতে পড়ে, ভালো ছাত্রী, রেজাল্ট ভালো। যে মেয়েটি আত্নহনন করেছে, তার রেজাল্টও ভালো।
আত্নহননের আগে মেয়েটি তার কক্ষে ঢুকে শাড়ি পরে। সুন্দর করে সাজে। এরপর দরজা বন্ধ করে আত্নহনন করে। পরে পরিবারের সদস্যরা বিষয়টি টের পেয়ে দরজা ভেঙে তাকে উদ্ধার করে। ঘটনার সময় মেয়েটির বাবা দেশের অন্য একটি শহরে ছিলেন।
ওই কর্মকর্তার ভাষ্য মোতাবেক, বড় মেয়েটিও পৃথিবী নিয়ে হতাশ। জাগতিক বিষয় নিয়ে চরম হতাশ। এ অবস্থায় পুরো পরিবারের সদস্যরা দুই বোনকে চোখে চোখে রাখতেন। চিকিৎসা করাতেন। এরই মধ্যে ছোটটা চলে গেল। তারা এই পৃথিবী ভালো নয় বলে মনে করতো। জপতো।
এর আগে সাইবার বুলিং ও নানাভাবে হেনস্তার শিকার হয়ে একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রী নিজ বাসায় আত্নহত্যা করেন। আত্নহত্যার পর সরকারি হাসপাতালে তাঁর মরদেহ দেখেছি। কয়েক বছর আগে এক বাসার কাজের মেয়ে আত্নহত্যা করেছে। আমি তার ঝুলন্ত লাশ দেখেছি। এ রকম অসংখ্য কেইস স্টাডি আছে।
আজ বিশ্ব আত্নহত্যা প্রতিরোধ দিবস। বাংলাদেশে প্রতিদিন গড়ে ৪০ জনের মতো আত্নহত্যা করে। সকালে একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলের স্কলে দেখেছি এ তথ্য। দেশে আত্নহত্যার এ প্রবণতা রুখতে হলে পারিবারিক সম্পর্ক জোরদার করতে হবে। পরিবারের সদস্যদের মানসিক স্বাস্থ্য দেখতে হবে।
আমি সমাজকর্মের স্টুডেন্ট ছিলাম। সাইকোলজি পড়েছি। আত্নহননের সম্ভাব্য কারণ বিশ্লেষণ করেছি। মানুষ নানা কারণে হতাশায় ভোগেন। এটা এক ধরণের মানসিক রোগ। এই রোগে আক্রান্তদের নানাভাবে বুঝা যায়। এইক্ষেত্রে তাকে পরম যত্নে রাখতে হয়। চোখে চোখে রাখতে হয়। চান্স পেলেই সে নির্জনতা, নিরাপদ জায়গা বেছে নিয়ে নিজেকে শেষ করে। রেখে যায় পরিবারের জন্য দাগ। এক বুক হতাশা।
আত্নহত্যাকে সমাজ কোনভাবেই ভালো চোখে দেখে না। কিন্তু প্রত্যাশা পূরণ না হলে হুট করেই কাজ করে পেলে এ রোগীরা। কিশোর বয়সে এটা বেশি হয়। আমার চোখের সামনে দেখেছি কত মেধাবী মুখ ঝরে যেতে। তাদের বাবাদের করুণ আর্তনাদ দেখেছি। অনুশোচনা শুনেছি। বুক থাপড়ে কাঁদতে দেখেছি।
এর থেকে মুক্তির উপায় পারিবারিক আবহে বন্ধুর মতো রোগীর পাশে থাকে। পজেটিভ মানসিকতা তৈরি করা। মানবের মধ্যে বেঁচে থাকার প্রেরণা যোগানো। মনোলোভা পরিবেশে ঘুরতে যাওয়া। সন্তানের সামনে বাবা মায়ের ঝগড়া, হাতাহাতি ও মারামারি না করা। কাউকে তাচ্ছিল্য না করা। অন্যের সঙ্গে তুলনা না করা। কাউন্সিলিং করা। চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া। নৈতিক শিক্ষায় সম্পৃক্ত করা।
সাধারণত প্রেমে ব্যর্থ হওয়া, গেম খেলতে না দেওয়া, মাদক সেবনে বাধা, মুঠোফোন ব্যবহার করতে নিষেধ করা বা কিনে না দেওয়া, ঋন পরিশোধ করতে না পারা, বিয়ে করতে না পারা, অন্যের সাথে তুলনা করা, খোঁটা দেওয়া, ভীষন্নতা, অবৈধ, অনৈতিক সম্পর্ক মেনে না নেওয়া, লোক লজ্জামূলক কাজের কারণে আত্নহত্যার ঘটনা ঘটে।
কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলায় আত্নহত্যার ঘটনা বেশি। ওই উপজেলায় এক বছরে কেবল বিষপানে ২৩৩ জন আত্নহত্যার চেষ্টা করেছিল।
যে মেয়েটি চলে গেলো তাকে এ পর্যন্ত আনতে মা, বাবা ও পরিবারের সদস্যদের কতো পরিশ্রম করতে হয়েছে। প্রিয় কিশোর কিশোরী বাবা মার বুক খালি করে যাতনা দিয়ে যেও না। পৃথিবীটা আসলেই সুন্দর।
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে, মানবের মাঝে বাঁচিবার চাই।
নিজে বাঁচো, পরিবারকে বাঁচাও।
গাজীউল হক সোহাগ: সম্পাদক , আমার শহর