ভাস্কর মজুমদার

প্রকৃতির এক অদ্ভুত ঘটনার কথা ভাবুন। কিছু পরজীবী আছে, যারা কোনো কোনো পোকামাকড়ের শরীরে প্রবেশ করে তার স্বাভাবিক আচরণ বদলে দিতে পারে। বাইরে থেকে প্রাণীটিকে স্বাভাবিকই মনে হয়। সে হাঁটে, চলাফেরা করে, সামনে এগোয়। কিন্তু তার আচরণ আর পুরোপুরি নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকে না। যেন অদৃশ্য কোনো শক্তি তাকে এমন এক গন্তব্যের দিকে নিয়ে যাচ্ছে, যা সে নিজে বেছে নেয়নি। বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতার দিকে তাকালে কখনো কখনো এই দৃশ্যটি একটি শক্তিশালী রূপক হয়ে সামনে আসে। আমরা সবাই চলছি, কথা বলছি, তর্ক করছি, পক্ষ নিচ্ছি, প্রতিপক্ষ তৈরি করছি। কিন্তু একটি প্রশ্ন কি যথেষ্ট করছি, আমরা কি সত্যিই নিজের বিবেচনায় এগোচ্ছি, নাকি আমাদের আবেগ, ভয়, ক্ষোভ ও প্রতিশোধস্পৃহাকে ব্যবহার করে কেউ আমাদের কোনো নির্দিষ্ট দিকে ঠেলে দিচ্ছে?
একটি দেশকে নিয়ন্ত্রণ করতে সব সময় ট্যাংক, বন্দুক কিংবা সরাসরি দখলের প্রয়োজন হয় না। মানুষের চিন্তার জায়গাটি দখল করতে পারলেও অনেক কিছু নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। সমাজকে এমনভাবে ভাগ করে দেওয়া যায়, যেখানে ভিন্নমত মানেই শত্রæ, রাজনৈতিক মতপার্থক্য মানেই বিশ্বাসঘাতকতা, আর ধর্মীয় বা সামাজিক পার্থক্য মানেই সন্দেহ। একটি গুজব মুহূর্তে সত্য হয়ে যায়, একটি সম্পাদিত ভিডিও মানুষের বিচারবোধকে আচ্ছন্ন করে ফেলে, একটি উত্তেজক বক্তব্য হাজার মানুষের ক্ষোভকে একদিকে চালিত করতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমরা প্রায়ই এমন কিছু বিশ্বাস করি, যা যাচাই করার প্রয়োজনও অনুভব করি না। ধীরে ধীরে নিজের মাথা দিয়ে চিন্তা করার বদলে আমরা দল, গোষ্ঠী, নেতা কিংবা উত্তেজিত জনতার চোখ দিয়ে পৃথিবী দেখতে শুরু করি। তখন শরীরটি হয়তো আমাদেরই থাকে, কিন্তু সিদ্ধান্তটি কতটা আমাদের নিজের থাকে, সেই প্রশ্ন থেকে যায়।
আর সেই অদৃশ্য নিয়ন্ত্রক যে সব সময় বাইরের কোনো শক্তি হবে, তাও নয়। কখনো সেটি ক্ষমতার রাজনীতি, কখনো উগ্রতা, কখনো অর্থনৈতিক স্বার্থ, কখনো উদ্দেশ্যমূলক গুজব, আবার কখনো আমাদের নিজেদের জমে থাকা ঘৃণা ও প্রতিশোধের আকাক্সক্ষা। একটি জাতির জন্য বাইরের ষড়যন্ত্র যেমন বিপজ্জনক, তার চেয়ে কোনো অংশে কম বিপজ্জনক নয় ভেতরের অসহিষ্ণুতা। যখন আমরা মনে করতে শুরু করি যে প্রতিপক্ষকে ধ্বংস করাই দেশকে রক্ষা করা, তখনই বিপদের শুরু। কারণ বাংলাদেশ কোনো একটি রাজনৈতিক দল, ব্যক্তি কিংবা মতাদর্শের সম্পত্তি নয়। এই রাষ্ট্রের শক্তি তার প্রতিষ্ঠান, বিচারব্যবস্থা, অর্থনীতি, শিক্ষা, সামাজিক সম্প্রীতি এবং মানুষের পারস্পরিক আস্থায়। এগুলো দুর্বল হলে নির্বাচনে কে জিতল আর কে হারল, সেটি একসময় ছোট প্রশ্ন হয়ে যায়।
আমাদের ইতিহাসে রাজনৈতিক সংঘাত, প্রতিহিংসা ও বিভাজনের মূল্য কম দিতে হয়নি। তবু একটি ভুল আমরা বারবার করি। আমরা ভাবি, আগুনটা শুধু প্রতিপক্ষের বাড়ি পোড়াবে। অথচ আগুন কখনো রাজনৈতিক পরিচয় দেখে পোড়ায় না। বিচারব্যবস্থা দুর্বল হলে একদিন তার প্রভাব সবার ওপর পড়ে। মতপ্রকাশের জায়গা সংকুচিত হলে আজ যে পক্ষ নিরাপদ বোধ করছে, কাল তার কণ্ঠও বন্ধ হতে পারে। ব্যবসা ও বিনিয়োগের পরিবেশ অনিশ্চিত হলে ক্ষতিটা কোনো দলের নয়, দেশের। মেধাবী তরুণেরা যদি ভবিষ্যৎ নিয়ে আস্থা হারায়, উদ্যোক্তা যদি ঝুঁকি নিতে ভয় পায়, সাধারণ মানুষ যদি নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার নিয়ে সন্দিহান হয়ে পড়ে, তাহলে সেই ক্ষতি একটি প্রজন্মকে বহন করতে হয়। প্রতিপক্ষকে পরাজিত করতে গিয়ে যদি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোই দুর্বল হয়ে যায়, তাহলে শেষ পর্যন্ত বিজয়ীর হাতেও একটি দুর্বল দেশই এসে পৌঁছাবে।
তাই এখন কিছু প্রশ্ন খুব জরুরি। কে আমাদের এত রাগিয়ে দিচ্ছে? কে প্রতিবেশীকে প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে দাঁড় করাচ্ছে? কে আমাদের বিশ্বাস করাচ্ছে যে ভাঙাই পরিবর্তন, প্রতিশোধই বিচার, আর চিৎকারই সত্যের প্রমাণ? প্রশ্নগুলো কোনো একটি রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে নয়, বরং আমাদের সবার জন্য। অন্যায় হলে বিচার অবশ্যই চাইতে হবে, কিন্তু বিচার ও প্রতিশোধ এক নয়। সংস্কার চাইতে হবে, কিন্তু সংস্কার আর ধ্বংসও এক নয়। ভিন্নমতকে প্রতিহত করা যায় যুক্তি দিয়ে, আইনের মাধ্যমে, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায়। প্রতিপক্ষকে মানুষ হিসেবে অস্বীকার করে কোনো সমাজ দীর্ঘমেয়াদে শান্তি পায় না।
বাংলাদেশের সামনে সম্ভাবনার আলো আছে। আবার একই সঙ্গে আছে বিভাজন, গুজব, অসহিষ্ণুতা ও প্রতিহিংসার আগুন। দূর থেকে আলো আর আগুন দুটোকেই উজ্জ্বল দেখায়। তাই শুধু সামনে এগোলেই হবে না, কোন দিকে এগোচ্ছি সেটাও বুঝতে হবে। একটি জাতির সবচেয়ে বড় স্বাধীনতা শুধু তার পতাকা বা ভ‚খÐ নয়, নিজের বিবেক দিয়ে চিন্তা করার ক্ষমতা। যত দিন আমরা প্রশ্ন করতে পারব, যাচাই করতে পারব, ভিন্নমত শুনতে পারব এবং রাগের মুহূর্তেও বিবেককে সক্রিয় রাখতে পারব, তত দিন কোনো অদৃশ্য শক্তির পক্ষে আমাদের সহজে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না। বাংলাদেশের সামনে তাই আজ একটি খুব সাধারণ, অথচ গভীর প্রশ্ন দাঁড়িয়ে আছে: আমরা কি আলো চিনে তার দিকে হাঁটব, নাকি আলো ভেবে একদিন সবাই মিলে আগুনের দিকে ছুটে যাব?
ভাস্কর মজুমদার: জেনারেল ম্যানেজার, মার্চেন্ডাইজিং, ব্র্যাক আড়ং ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী।

প্রকৃতির এক অদ্ভুত ঘটনার কথা ভাবুন। কিছু পরজীবী আছে, যারা কোনো কোনো পোকামাকড়ের শরীরে প্রবেশ করে তার স্বাভাবিক আচরণ বদলে দিতে পারে। বাইরে থেকে প্রাণীটিকে স্বাভাবিকই মনে হয়। সে হাঁটে, চলাফেরা করে, সামনে এগোয়। কিন্তু তার আচরণ আর পুরোপুরি নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকে না। যেন অদৃশ্য কোনো শক্তি তাকে এমন এক গন্তব্যের দিকে নিয়ে যাচ্ছে, যা সে নিজে বেছে নেয়নি। বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতার দিকে তাকালে কখনো কখনো এই দৃশ্যটি একটি শক্তিশালী রূপক হয়ে সামনে আসে। আমরা সবাই চলছি, কথা বলছি, তর্ক করছি, পক্ষ নিচ্ছি, প্রতিপক্ষ তৈরি করছি। কিন্তু একটি প্রশ্ন কি যথেষ্ট করছি, আমরা কি সত্যিই নিজের বিবেচনায় এগোচ্ছি, নাকি আমাদের আবেগ, ভয়, ক্ষোভ ও প্রতিশোধস্পৃহাকে ব্যবহার করে কেউ আমাদের কোনো নির্দিষ্ট দিকে ঠেলে দিচ্ছে?
একটি দেশকে নিয়ন্ত্রণ করতে সব সময় ট্যাংক, বন্দুক কিংবা সরাসরি দখলের প্রয়োজন হয় না। মানুষের চিন্তার জায়গাটি দখল করতে পারলেও অনেক কিছু নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। সমাজকে এমনভাবে ভাগ করে দেওয়া যায়, যেখানে ভিন্নমত মানেই শত্রæ, রাজনৈতিক মতপার্থক্য মানেই বিশ্বাসঘাতকতা, আর ধর্মীয় বা সামাজিক পার্থক্য মানেই সন্দেহ। একটি গুজব মুহূর্তে সত্য হয়ে যায়, একটি সম্পাদিত ভিডিও মানুষের বিচারবোধকে আচ্ছন্ন করে ফেলে, একটি উত্তেজক বক্তব্য হাজার মানুষের ক্ষোভকে একদিকে চালিত করতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমরা প্রায়ই এমন কিছু বিশ্বাস করি, যা যাচাই করার প্রয়োজনও অনুভব করি না। ধীরে ধীরে নিজের মাথা দিয়ে চিন্তা করার বদলে আমরা দল, গোষ্ঠী, নেতা কিংবা উত্তেজিত জনতার চোখ দিয়ে পৃথিবী দেখতে শুরু করি। তখন শরীরটি হয়তো আমাদেরই থাকে, কিন্তু সিদ্ধান্তটি কতটা আমাদের নিজের থাকে, সেই প্রশ্ন থেকে যায়।
আর সেই অদৃশ্য নিয়ন্ত্রক যে সব সময় বাইরের কোনো শক্তি হবে, তাও নয়। কখনো সেটি ক্ষমতার রাজনীতি, কখনো উগ্রতা, কখনো অর্থনৈতিক স্বার্থ, কখনো উদ্দেশ্যমূলক গুজব, আবার কখনো আমাদের নিজেদের জমে থাকা ঘৃণা ও প্রতিশোধের আকাক্সক্ষা। একটি জাতির জন্য বাইরের ষড়যন্ত্র যেমন বিপজ্জনক, তার চেয়ে কোনো অংশে কম বিপজ্জনক নয় ভেতরের অসহিষ্ণুতা। যখন আমরা মনে করতে শুরু করি যে প্রতিপক্ষকে ধ্বংস করাই দেশকে রক্ষা করা, তখনই বিপদের শুরু। কারণ বাংলাদেশ কোনো একটি রাজনৈতিক দল, ব্যক্তি কিংবা মতাদর্শের সম্পত্তি নয়। এই রাষ্ট্রের শক্তি তার প্রতিষ্ঠান, বিচারব্যবস্থা, অর্থনীতি, শিক্ষা, সামাজিক সম্প্রীতি এবং মানুষের পারস্পরিক আস্থায়। এগুলো দুর্বল হলে নির্বাচনে কে জিতল আর কে হারল, সেটি একসময় ছোট প্রশ্ন হয়ে যায়।
আমাদের ইতিহাসে রাজনৈতিক সংঘাত, প্রতিহিংসা ও বিভাজনের মূল্য কম দিতে হয়নি। তবু একটি ভুল আমরা বারবার করি। আমরা ভাবি, আগুনটা শুধু প্রতিপক্ষের বাড়ি পোড়াবে। অথচ আগুন কখনো রাজনৈতিক পরিচয় দেখে পোড়ায় না। বিচারব্যবস্থা দুর্বল হলে একদিন তার প্রভাব সবার ওপর পড়ে। মতপ্রকাশের জায়গা সংকুচিত হলে আজ যে পক্ষ নিরাপদ বোধ করছে, কাল তার কণ্ঠও বন্ধ হতে পারে। ব্যবসা ও বিনিয়োগের পরিবেশ অনিশ্চিত হলে ক্ষতিটা কোনো দলের নয়, দেশের। মেধাবী তরুণেরা যদি ভবিষ্যৎ নিয়ে আস্থা হারায়, উদ্যোক্তা যদি ঝুঁকি নিতে ভয় পায়, সাধারণ মানুষ যদি নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার নিয়ে সন্দিহান হয়ে পড়ে, তাহলে সেই ক্ষতি একটি প্রজন্মকে বহন করতে হয়। প্রতিপক্ষকে পরাজিত করতে গিয়ে যদি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোই দুর্বল হয়ে যায়, তাহলে শেষ পর্যন্ত বিজয়ীর হাতেও একটি দুর্বল দেশই এসে পৌঁছাবে।
তাই এখন কিছু প্রশ্ন খুব জরুরি। কে আমাদের এত রাগিয়ে দিচ্ছে? কে প্রতিবেশীকে প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে দাঁড় করাচ্ছে? কে আমাদের বিশ্বাস করাচ্ছে যে ভাঙাই পরিবর্তন, প্রতিশোধই বিচার, আর চিৎকারই সত্যের প্রমাণ? প্রশ্নগুলো কোনো একটি রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে নয়, বরং আমাদের সবার জন্য। অন্যায় হলে বিচার অবশ্যই চাইতে হবে, কিন্তু বিচার ও প্রতিশোধ এক নয়। সংস্কার চাইতে হবে, কিন্তু সংস্কার আর ধ্বংসও এক নয়। ভিন্নমতকে প্রতিহত করা যায় যুক্তি দিয়ে, আইনের মাধ্যমে, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায়। প্রতিপক্ষকে মানুষ হিসেবে অস্বীকার করে কোনো সমাজ দীর্ঘমেয়াদে শান্তি পায় না।
বাংলাদেশের সামনে সম্ভাবনার আলো আছে। আবার একই সঙ্গে আছে বিভাজন, গুজব, অসহিষ্ণুতা ও প্রতিহিংসার আগুন। দূর থেকে আলো আর আগুন দুটোকেই উজ্জ্বল দেখায়। তাই শুধু সামনে এগোলেই হবে না, কোন দিকে এগোচ্ছি সেটাও বুঝতে হবে। একটি জাতির সবচেয়ে বড় স্বাধীনতা শুধু তার পতাকা বা ভ‚খÐ নয়, নিজের বিবেক দিয়ে চিন্তা করার ক্ষমতা। যত দিন আমরা প্রশ্ন করতে পারব, যাচাই করতে পারব, ভিন্নমত শুনতে পারব এবং রাগের মুহূর্তেও বিবেককে সক্রিয় রাখতে পারব, তত দিন কোনো অদৃশ্য শক্তির পক্ষে আমাদের সহজে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না। বাংলাদেশের সামনে তাই আজ একটি খুব সাধারণ, অথচ গভীর প্রশ্ন দাঁড়িয়ে আছে: আমরা কি আলো চিনে তার দিকে হাঁটব, নাকি আলো ভেবে একদিন সবাই মিলে আগুনের দিকে ছুটে যাব?
ভাস্কর মজুমদার: জেনারেল ম্যানেজার, মার্চেন্ডাইজিং, ব্র্যাক আড়ং ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী।