আফজাল হোসাইন

বাংলাদেশে একটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া এখনো বহু পরিবারের কাছে স্বপ্নপূরণের মতো ঘটনা। দীর্ঘ ও প্রতিযোগিতামূলক ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে একজন শিক্ষার্থী যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করেন, তখন পরিবার ও সমাজ ধরে নেয়-তার ভবিষ্যৎ অনেকটাই নিরাপদ। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতা বলছে, শুধু একটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয়, ভালো ফলাফল কিংবা একটি সনদপত্র দিয়ে ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা আর সম্ভব নয়।
প্রশ্নটি তাই গুরুত্বপূর্ণ- আগামী বিশ্বের জন্য আমাদের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কতটা প্রস্তুত? উচ্চশিক্ষার সুযোগ বাড়ছে। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক তরুণ স্নাতক হয়ে শ্রমবাজারে প্রবেশ করছেন। কিন্তু সেই অনুপাতে কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না। ফলে শিক্ষিত বেকারত্ব বাংলাদেশের অন্যতম বড় সামাজিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শিক্ষাব্যবস্থা ও শ্রমবাজারের চাহিদার মধ্যে বিদ্যমান দক্ষতার ব্যবধান।
অন্যদিকে বিশ্ব দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি, ডিজিটাল অর্থনীতি, দূরবর্তী কর্মসংস্থান এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা আগামী দিনের কাজের ধরনকে আমূল পরিবর্তন করছে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে না পারলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি অনেক ক্ষেত্রে কাক্সিক্ষত কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা দিতে পারবে না।
শুধু ভালো ফলাফল কি যথেষ্ট?
ভালো ফলাফল অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। এটি একজন শিক্ষার্থীর মেধা, অধ্যবসায় ও একাডেমিক সক্ষমতার পরিচায়ক। উচ্চশিক্ষা ও বিভিন্ন বৃত্তির ক্ষেত্রেও ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা রাখে। কিন্তু বর্তমান শ্রমবাজারে ফলাফল একাই যথেষ্ট নয়। একজন শিক্ষার্থী যদি ভালো ফলাফল করেও নিজের বক্তব্য স্পষ্টভাবে উপস্থাপন করতে না পারেন, পেশাগত চিঠি লিখতে না পারেন, তথ্য বিশ্লেষণ করতে না পারেন, প্রযুক্তি ব্যবহার করতে না পারেন কিংবা বাস্তব কোনো সমস্যা সমাধান করতে না পারেন-তাহলে তার একাডেমিক সাফল্য কর্মক্ষেত্রে কতটা কার্যকর হবে? নিয়োগদাতার প্রশ্ন এখন শুধু “আপনি কী পড়েছেন?” নয়; বরং “আপনি কী করতে পারেন?” তাই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হওয়ার সময় একজন শিক্ষার্থীর হাতে শুধু সনদ থাকলেই হবে না। তার সঙ্গে থাকা উচিত বাস্তব দক্ষতা, অভিজ্ঞতা, কাজের নমুনা, যোগাযোগের সক্ষমতা এবং আত্মবিশ্বাস।
সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয় যেন আত্মতুষ্টির কারণ না হয়
সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ নিঃসন্দেহে একটি বড় অর্জন। তুলনামূলকভাবে কম খরচে উচ্চশিক্ষা, দক্ষ শিক্ষক, গবেষণার সুযোগ, বিতর্ক, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এবং বিভিন্ন সংগঠনে কাজ করার সুযোগ-সব মিলিয়ে শিক্ষার্থীদের সামনে নিজেদের বিকশিত করার অনেক পথ খোলা থাকে। কিন্তু সুযোগ আর সাফল্য এক বিষয় নয়। শিক্ষাজীবনের কয়েকটি বছর শুধু শ্রেণিকক্ষ, পরীক্ষা ও ফলাফলের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়কে শুধু ডিগ্রি অর্জনের স্থান হিসেবে নয়, বরং নিজেকে তৈরি করার ক্ষেত্র হিসেবে দেখতে হবে। একজন শিক্ষার্থীকে ভাবতে হবে-বিশ্ববিদ্যালয়ের চার বছর বা পাঁচ বছর শেষে আমি শুধু একটি সনদ নিয়ে বের হব, নাকি এমন কিছু দক্ষতা নিয়ে বের হব, যা আমাকে অন্যদের থেকে আলাদা করবে?
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে নতুন প্রস্তুতি
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন আর ভবিষ্যতের বিষয় নয়; এটি ইতোমধ্যে শিক্ষা, গবেষণা, ব্যাংকিং, বিপণন, গণমাধ্যম, সফটওয়্যার, হিসাবরক্ষণ ও গ্রাহকসেবাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজের ধরন পরিবর্তন করছে। তাই শিক্ষার্থীদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে ভয় না পেয়ে এর কার্যকর ব্যবহার শিখতে হবে। তবে এর অর্থ নিজের চিন্তাশক্তি প্রযুক্তির হাতে তুলে দেওয়া নয়। আগামী দিনের গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা হবে- কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের সক্ষমতার সঙ্গে সমালোচনামূলক চিন্তা, সৃজনশীলতা, নৈতিক বিচারবোধ ও মানবিক যোগাযোগের সমন্বয়। অর্থাৎ প্রযুক্তিকে কাজে লাগাতে হবে, কিন্তু নিজের চিন্তাশক্তিকে প্রযুক্তির কাছে সমর্পণ করা যাবে না। কারণ প্রযুক্তি উত্তর দিতে পারে, কিন্তু কোন প্রশ্নটি করা উচিত- সেই বোধ মানুষেরই থাকতে হবে।
যোগাযোগ দক্ষতা ও ইংরেজির গুরুত্ব
বাংলাদেশের বহু মেধাবী শিক্ষার্থী জ্ঞানের অভাবে নয়, যোগাযোগের দুর্বলতার কারণে পিছিয়ে পড়েন। আন্তর্জাতিক উচ্চশিক্ষা, বৃত্তি, গবেষণা, বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান এবং বৈশ্বিক কর্মসংস্থানের জন্য নিজের জ্ঞান ও চিন্তাকে কার্যকরভাবে প্রকাশ করতে পারা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই বিশ্ববিদ্যালয় জীবনেই একাডেমিক লেখালেখি, উপস্থাপনা, জনসমক্ষে বক্তব্য, পেশাগত চিঠি লেখা এবং সাক্ষাৎকারে নিজেকে উপস্থাপনের দক্ষতা অর্জন করতে হবে। ভালো ইংরেজি মানে শুধু ব্যাকরণ জানা নয়; নিজের চিন্তা অন্যের কাছে পরিষ্কারভাবে পৌঁছে দিতে পারা। একইভাবে, বাংলা ভাষায়ও স্পষ্ট ও যুক্তিপূর্ণভাবে কথা বলা ও লেখার সক্ষমতা একজন শিক্ষার্থীর গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ।
একটি ডিগ্রির সঙ্গে একটি শক্তিশালী দক্ষতা
আগামী দিনের শিক্ষার্থীর জন্য একটি নীতি হতে পারে- একটি ডিগ্রি, অন্তত একটি শক্তিশালী দক্ষতা। বিপণনের শিক্ষার্থী ডিজিটাল বিপণন, বাজার গবেষণা, তথ্য বিশ্লেষণ বা ভোক্তা বিশ্লেষণ শিখতে পারেন। অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী তথ্য বিশ্লেষণ, পরিসংখ্যান বা অর্থনৈতিক মডেলিংয়ে দক্ষ হতে পারেন। ব্যবসায় শিক্ষার শিক্ষার্থী হিসাবরক্ষণ, আর্থিক বিশ্লেষণ কিংবা ব্যবসায়িক তথ্য ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা অর্জন করতে পারেন। বিষয় যাই হোক, একজন শিক্ষার্থীকে অন্তত একটি ক্ষেত্রে এমন দক্ষতা অর্জন করতে হবে, যার মাধ্যমে তিনি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলতে পারেন- “এই কাজটি আমি বাস্তবে করতে পারি।” এখানেই সনদ আর দক্ষতার পার্থক্য। সনদ বলে আপনি কোথায় পড়েছেন; দক্ষতা বলে আপনি কী করতে পারেন।
ব্যবহারিক অভিজ্ঞতার প্রয়োজন
আমাদের উচ্চশিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম দুর্বলতা হলো শ্রেণিকক্ষের শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রের বাস্তবতার মধ্যে দূরত্ব। একজন শিক্ষার্থী অনেক তাত্তি¡ক জ্ঞান অর্জন করলেও সেই জ্ঞান বাস্তবে প্রয়োগের সুযোগ অনেক সময় সীমিত থাকে। এ কারণে শিক্ষাজীবনেই শিক্ষানবিশি, গবেষণা প্রকল্প, স্বেচ্ছাসেবা, সামাজিক উদ্যোগ কিংবা বাস্তবভিত্তিক প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত হওয়া প্রয়োজন। কারণ কর্মক্ষেত্রে নিয়োগদাতা জানতে চাইবেন-আপনি কোনো দলের সঙ্গে কাজ করেছেন কি না, বাস্তব সমস্যা সমাধান করেছেন কি না, কোনো প্রকল্প সম্পন্ন করেছেন কি না এবং আপনার শেখা জ্ঞান বাস্তবে প্রয়োগ করতে পারেন কি না। এই অভিজ্ঞতাই একজন নতুন স্নাতককে অন্যদের থেকে আলাদা করতে পারে।
গবেষণার সঙ্গে যুক্ত হতে হবে
বিশ্ববিদ্যালয় শুধু চাকরির প্রস্তুতির জায়গা নয়; এটি জ্ঞান সৃষ্টি এবং সমাজের সমস্যা সমাধানের জায়গাও। তাই স্নাতক পর্যায় থেকেই শিক্ষার্থীদের গবেষণার পদ্ধতি, পূর্ববর্তী গবেষণা পর্যালোচনা, তথ্য বিশ্লেষণ এবং একাডেমিক লেখালেখি শেখা উচিত। একটি ভালো গবেষণা প্রকল্প, গবেষণা সম্মেলনে উপস্থাপনা কিংবা কোনো বাস্তব সমস্যা নিয়ে গবেষণা একজন শিক্ষার্থীর একাডেমিক ও পেশাগত পরিচিতিকে শক্তিশালী করতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগার, গ্রন্থাগার ও শিক্ষকদের গবেষণা অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে শিক্ষার্থীরা নিজেদের জন্য একটি শক্তিশালী একাডেমিক পোর্টফোলিও তৈরি করতে পারেন।
শুধু সরকারি চাকরির অপেক্ষায় কেন?
সরকারি চাকরি নিঃসন্দেহে সম্মানজনক ও আকর্ষণীয় একটি পেশা। কিন্তু জীবনের কয়েকটি বছর শুধু একটি পরীক্ষার অপেক্ষায় ব্যয় করা এবং পাশাপাশি কোনো বিকল্প দক্ষতা তৈরি না করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। সরকারি চাকরির প্রস্তুতি নেওয়া যেতে পারে, কিন্তু পাশাপাশি থাকতে হবে বিকল্প পরিকল্পনা- বেসরকারি চাকরি, উদ্যোক্তা হওয়া, উচ্চশিক্ষা, গবেষণা, আন্তর্জাতিক কর্মসংস্থান কিংবা দূরবর্তী কাজ। একটি পরীক্ষার ফলাফল যেন একজন তরুণের পুরো ভবিষ্যৎ নির্ধারণ না করে। একজন শিক্ষার্থীকে চাকরিপ্রার্থী হওয়ার পাশাপাশি নিজেকে দক্ষতাসম্পন্ন একজন পেশাজীবী হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়ও রয়েছে
সব দায় শিক্ষার্থীর ওপর চাপিয়ে দেওয়া যাবে না। বিশ্ববিদ্যালয়কেও ভাবতে হবে-পাঠ্যক্রম কতটা যুগোপযোগী, শিক্ষার্থীরা কতটা ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ পাচ্ছেন, শিল্প ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ কতটা কার্যকর এবং কর্মজীবনবিষয়ক পরামর্শ কতটা শক্তিশালী। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও নতুন প্রযুক্তির যুগে পাঠ্যক্রমের প্রয়োজনীয় পরিবর্তন এখন আর বিলাসিতা নয়; এটি সময়ের দাবি। বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং, শিল্প-প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সহযোগিতা, ইন্টার্নশিপ, গবেষণা ও দক্ষতা উন্নয়নমূলক কার্যক্রমকে আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। কারণ স্নাতকদের কর্মযোগ্যতা শুধু ব্যক্তিগত সমস্যা নয়; এটি জাতীয় অর্থনীতি ও মানবসম্পদ উন্নয়নের প্রশ্ন।
আগামী বিশ্বের প্রতিযোগিতা হবে বৈশ্বিক
সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি এখানেই। একজন বাংলাদেশি স্নাতকের প্রতিযোগী এখন শুধু তার পাশের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নন; তিনি বিশ্বের যেকোনো দেশের একজন দক্ষ তরুণের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে পারেন। ডিজিটাল অর্থনীতি ভৌগোলিক সীমারেখাকে অনেকটাই দুর্বল করে দিয়েছে। তাই ভবিষ্যতের প্রশ্ন হবে না- “আপনি কোন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করেছেন?” প্রশ্ন হবে- “আপনি কী করতে পারেন?” আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হবে- “আপনি নতুন কিছু কত দ্রুত শিখতে পারেন?” কারণ প্রযুক্তি বদলাবে, কাজের ধরন বদলাবে, শিল্প খাত বদলাবে। যে ব্যক্তি শেখার ক্ষমতা ধরে রাখতে পারবেন, তিনিই পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারবেন। আজকের সবচেয়ে মূল্যবান দক্ষতাগুলোর একটি তাই হলো শেখার সক্ষমতা-অর্থাৎ নতুন পরিস্থিতিতে নিজেকে দ্রুত মানিয়ে নেওয়া এবং নতুন জ্ঞান অর্জন করার মানসিকতা।
এখনই সময় প্রস্তুতি
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার তরুণ জনগোষ্ঠী। কিন্তু এই জনসংখ্যাগত সুবিধা তখনই অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হবে, যখন তরুণদের শিক্ষা, দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের মধ্যে কার্যকর সংযোগ তৈরি করা যাবে। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি শিক্ষার্থীর তাই মনে রাখা উচিত-বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া সাফল্যের শেষ ধাপ নয়; বরং এটি নিজেকে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করার শুরু। শিক্ষার্থীকে শুধু পরীক্ষায় ভালো করার চেষ্টা করলে হবে না। সমস্যা সমাধান করতে হবে, প্রযুক্তি শিখতে হবে, যোগাযোগ দক্ষতা বাড়াতে হবে, গবেষণায় যুক্ত হতে হবে, বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করতে হবে এবং প্রতিনিয়ত নিজেকে নতুন করে তৈরি করতে হবে। কারণ আগামী দিনের পৃথিবী শুধু সনদধারীদের জন্য অপেক্ষা করবে না। অপেক্ষা করবে দক্ষ, সৃজনশীল, অভিযোজনক্ষম এবং শেখার মানসিকতা সম্পন্ন মানুষের জন্য।
আজকের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীকে তাই নিজেকেই প্রশ্ন করতে হবে “আমি কি শুধু একজন স্নাতক হওয়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছি, নাকি আগামী বিশ্বের একজন দক্ষ ও প্রতিযোগিতামূলক পেশাজীবী হওয়ার জন্য?” এই প্রশ্নের উত্তর শুধু একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নয়, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎও নির্ধারণ করতে পারে। কারণ একটি দেশের বিশ্ববিদ্যালয় শুধু সনদ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠান নয়; বিশ্ববিদ্যালয় হলো ভবিষ্যৎ মানবসম্পদ তৈরির কারখানা। সেই মানবসম্পদ কতটা দক্ষ, সৃজনশীল ও বিশ্বমানের হবে-তার ওপরই অনেকাংশে নির্ভর করবে দেশের আগামী দিনের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতি। ভবিষ্যৎ আসছে না-ভবিষ্যৎ ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। আর সেই ভবিষ্যতে জায়গা করে নিতে হলে প্রস্তুতি নিতে হবে আজই।
আফজাল হোসাইন: প্রভাষক, মার্কেটিং বিভাগ, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়

বাংলাদেশে একটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া এখনো বহু পরিবারের কাছে স্বপ্নপূরণের মতো ঘটনা। দীর্ঘ ও প্রতিযোগিতামূলক ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে একজন শিক্ষার্থী যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করেন, তখন পরিবার ও সমাজ ধরে নেয়-তার ভবিষ্যৎ অনেকটাই নিরাপদ। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতা বলছে, শুধু একটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয়, ভালো ফলাফল কিংবা একটি সনদপত্র দিয়ে ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা আর সম্ভব নয়।
প্রশ্নটি তাই গুরুত্বপূর্ণ- আগামী বিশ্বের জন্য আমাদের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কতটা প্রস্তুত? উচ্চশিক্ষার সুযোগ বাড়ছে। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক তরুণ স্নাতক হয়ে শ্রমবাজারে প্রবেশ করছেন। কিন্তু সেই অনুপাতে কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না। ফলে শিক্ষিত বেকারত্ব বাংলাদেশের অন্যতম বড় সামাজিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শিক্ষাব্যবস্থা ও শ্রমবাজারের চাহিদার মধ্যে বিদ্যমান দক্ষতার ব্যবধান।
অন্যদিকে বিশ্ব দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি, ডিজিটাল অর্থনীতি, দূরবর্তী কর্মসংস্থান এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা আগামী দিনের কাজের ধরনকে আমূল পরিবর্তন করছে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে না পারলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি অনেক ক্ষেত্রে কাক্সিক্ষত কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা দিতে পারবে না।
শুধু ভালো ফলাফল কি যথেষ্ট?
ভালো ফলাফল অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। এটি একজন শিক্ষার্থীর মেধা, অধ্যবসায় ও একাডেমিক সক্ষমতার পরিচায়ক। উচ্চশিক্ষা ও বিভিন্ন বৃত্তির ক্ষেত্রেও ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা রাখে। কিন্তু বর্তমান শ্রমবাজারে ফলাফল একাই যথেষ্ট নয়। একজন শিক্ষার্থী যদি ভালো ফলাফল করেও নিজের বক্তব্য স্পষ্টভাবে উপস্থাপন করতে না পারেন, পেশাগত চিঠি লিখতে না পারেন, তথ্য বিশ্লেষণ করতে না পারেন, প্রযুক্তি ব্যবহার করতে না পারেন কিংবা বাস্তব কোনো সমস্যা সমাধান করতে না পারেন-তাহলে তার একাডেমিক সাফল্য কর্মক্ষেত্রে কতটা কার্যকর হবে? নিয়োগদাতার প্রশ্ন এখন শুধু “আপনি কী পড়েছেন?” নয়; বরং “আপনি কী করতে পারেন?” তাই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হওয়ার সময় একজন শিক্ষার্থীর হাতে শুধু সনদ থাকলেই হবে না। তার সঙ্গে থাকা উচিত বাস্তব দক্ষতা, অভিজ্ঞতা, কাজের নমুনা, যোগাযোগের সক্ষমতা এবং আত্মবিশ্বাস।
সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয় যেন আত্মতুষ্টির কারণ না হয়
সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ নিঃসন্দেহে একটি বড় অর্জন। তুলনামূলকভাবে কম খরচে উচ্চশিক্ষা, দক্ষ শিক্ষক, গবেষণার সুযোগ, বিতর্ক, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এবং বিভিন্ন সংগঠনে কাজ করার সুযোগ-সব মিলিয়ে শিক্ষার্থীদের সামনে নিজেদের বিকশিত করার অনেক পথ খোলা থাকে। কিন্তু সুযোগ আর সাফল্য এক বিষয় নয়। শিক্ষাজীবনের কয়েকটি বছর শুধু শ্রেণিকক্ষ, পরীক্ষা ও ফলাফলের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়কে শুধু ডিগ্রি অর্জনের স্থান হিসেবে নয়, বরং নিজেকে তৈরি করার ক্ষেত্র হিসেবে দেখতে হবে। একজন শিক্ষার্থীকে ভাবতে হবে-বিশ্ববিদ্যালয়ের চার বছর বা পাঁচ বছর শেষে আমি শুধু একটি সনদ নিয়ে বের হব, নাকি এমন কিছু দক্ষতা নিয়ে বের হব, যা আমাকে অন্যদের থেকে আলাদা করবে?
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে নতুন প্রস্তুতি
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন আর ভবিষ্যতের বিষয় নয়; এটি ইতোমধ্যে শিক্ষা, গবেষণা, ব্যাংকিং, বিপণন, গণমাধ্যম, সফটওয়্যার, হিসাবরক্ষণ ও গ্রাহকসেবাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজের ধরন পরিবর্তন করছে। তাই শিক্ষার্থীদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে ভয় না পেয়ে এর কার্যকর ব্যবহার শিখতে হবে। তবে এর অর্থ নিজের চিন্তাশক্তি প্রযুক্তির হাতে তুলে দেওয়া নয়। আগামী দিনের গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা হবে- কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের সক্ষমতার সঙ্গে সমালোচনামূলক চিন্তা, সৃজনশীলতা, নৈতিক বিচারবোধ ও মানবিক যোগাযোগের সমন্বয়। অর্থাৎ প্রযুক্তিকে কাজে লাগাতে হবে, কিন্তু নিজের চিন্তাশক্তিকে প্রযুক্তির কাছে সমর্পণ করা যাবে না। কারণ প্রযুক্তি উত্তর দিতে পারে, কিন্তু কোন প্রশ্নটি করা উচিত- সেই বোধ মানুষেরই থাকতে হবে।
যোগাযোগ দক্ষতা ও ইংরেজির গুরুত্ব
বাংলাদেশের বহু মেধাবী শিক্ষার্থী জ্ঞানের অভাবে নয়, যোগাযোগের দুর্বলতার কারণে পিছিয়ে পড়েন। আন্তর্জাতিক উচ্চশিক্ষা, বৃত্তি, গবেষণা, বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান এবং বৈশ্বিক কর্মসংস্থানের জন্য নিজের জ্ঞান ও চিন্তাকে কার্যকরভাবে প্রকাশ করতে পারা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই বিশ্ববিদ্যালয় জীবনেই একাডেমিক লেখালেখি, উপস্থাপনা, জনসমক্ষে বক্তব্য, পেশাগত চিঠি লেখা এবং সাক্ষাৎকারে নিজেকে উপস্থাপনের দক্ষতা অর্জন করতে হবে। ভালো ইংরেজি মানে শুধু ব্যাকরণ জানা নয়; নিজের চিন্তা অন্যের কাছে পরিষ্কারভাবে পৌঁছে দিতে পারা। একইভাবে, বাংলা ভাষায়ও স্পষ্ট ও যুক্তিপূর্ণভাবে কথা বলা ও লেখার সক্ষমতা একজন শিক্ষার্থীর গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ।
একটি ডিগ্রির সঙ্গে একটি শক্তিশালী দক্ষতা
আগামী দিনের শিক্ষার্থীর জন্য একটি নীতি হতে পারে- একটি ডিগ্রি, অন্তত একটি শক্তিশালী দক্ষতা। বিপণনের শিক্ষার্থী ডিজিটাল বিপণন, বাজার গবেষণা, তথ্য বিশ্লেষণ বা ভোক্তা বিশ্লেষণ শিখতে পারেন। অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী তথ্য বিশ্লেষণ, পরিসংখ্যান বা অর্থনৈতিক মডেলিংয়ে দক্ষ হতে পারেন। ব্যবসায় শিক্ষার শিক্ষার্থী হিসাবরক্ষণ, আর্থিক বিশ্লেষণ কিংবা ব্যবসায়িক তথ্য ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা অর্জন করতে পারেন। বিষয় যাই হোক, একজন শিক্ষার্থীকে অন্তত একটি ক্ষেত্রে এমন দক্ষতা অর্জন করতে হবে, যার মাধ্যমে তিনি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলতে পারেন- “এই কাজটি আমি বাস্তবে করতে পারি।” এখানেই সনদ আর দক্ষতার পার্থক্য। সনদ বলে আপনি কোথায় পড়েছেন; দক্ষতা বলে আপনি কী করতে পারেন।
ব্যবহারিক অভিজ্ঞতার প্রয়োজন
আমাদের উচ্চশিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম দুর্বলতা হলো শ্রেণিকক্ষের শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রের বাস্তবতার মধ্যে দূরত্ব। একজন শিক্ষার্থী অনেক তাত্তি¡ক জ্ঞান অর্জন করলেও সেই জ্ঞান বাস্তবে প্রয়োগের সুযোগ অনেক সময় সীমিত থাকে। এ কারণে শিক্ষাজীবনেই শিক্ষানবিশি, গবেষণা প্রকল্প, স্বেচ্ছাসেবা, সামাজিক উদ্যোগ কিংবা বাস্তবভিত্তিক প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত হওয়া প্রয়োজন। কারণ কর্মক্ষেত্রে নিয়োগদাতা জানতে চাইবেন-আপনি কোনো দলের সঙ্গে কাজ করেছেন কি না, বাস্তব সমস্যা সমাধান করেছেন কি না, কোনো প্রকল্প সম্পন্ন করেছেন কি না এবং আপনার শেখা জ্ঞান বাস্তবে প্রয়োগ করতে পারেন কি না। এই অভিজ্ঞতাই একজন নতুন স্নাতককে অন্যদের থেকে আলাদা করতে পারে।
গবেষণার সঙ্গে যুক্ত হতে হবে
বিশ্ববিদ্যালয় শুধু চাকরির প্রস্তুতির জায়গা নয়; এটি জ্ঞান সৃষ্টি এবং সমাজের সমস্যা সমাধানের জায়গাও। তাই স্নাতক পর্যায় থেকেই শিক্ষার্থীদের গবেষণার পদ্ধতি, পূর্ববর্তী গবেষণা পর্যালোচনা, তথ্য বিশ্লেষণ এবং একাডেমিক লেখালেখি শেখা উচিত। একটি ভালো গবেষণা প্রকল্প, গবেষণা সম্মেলনে উপস্থাপনা কিংবা কোনো বাস্তব সমস্যা নিয়ে গবেষণা একজন শিক্ষার্থীর একাডেমিক ও পেশাগত পরিচিতিকে শক্তিশালী করতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগার, গ্রন্থাগার ও শিক্ষকদের গবেষণা অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে শিক্ষার্থীরা নিজেদের জন্য একটি শক্তিশালী একাডেমিক পোর্টফোলিও তৈরি করতে পারেন।
শুধু সরকারি চাকরির অপেক্ষায় কেন?
সরকারি চাকরি নিঃসন্দেহে সম্মানজনক ও আকর্ষণীয় একটি পেশা। কিন্তু জীবনের কয়েকটি বছর শুধু একটি পরীক্ষার অপেক্ষায় ব্যয় করা এবং পাশাপাশি কোনো বিকল্প দক্ষতা তৈরি না করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। সরকারি চাকরির প্রস্তুতি নেওয়া যেতে পারে, কিন্তু পাশাপাশি থাকতে হবে বিকল্প পরিকল্পনা- বেসরকারি চাকরি, উদ্যোক্তা হওয়া, উচ্চশিক্ষা, গবেষণা, আন্তর্জাতিক কর্মসংস্থান কিংবা দূরবর্তী কাজ। একটি পরীক্ষার ফলাফল যেন একজন তরুণের পুরো ভবিষ্যৎ নির্ধারণ না করে। একজন শিক্ষার্থীকে চাকরিপ্রার্থী হওয়ার পাশাপাশি নিজেকে দক্ষতাসম্পন্ন একজন পেশাজীবী হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়ও রয়েছে
সব দায় শিক্ষার্থীর ওপর চাপিয়ে দেওয়া যাবে না। বিশ্ববিদ্যালয়কেও ভাবতে হবে-পাঠ্যক্রম কতটা যুগোপযোগী, শিক্ষার্থীরা কতটা ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ পাচ্ছেন, শিল্প ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ কতটা কার্যকর এবং কর্মজীবনবিষয়ক পরামর্শ কতটা শক্তিশালী। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও নতুন প্রযুক্তির যুগে পাঠ্যক্রমের প্রয়োজনীয় পরিবর্তন এখন আর বিলাসিতা নয়; এটি সময়ের দাবি। বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং, শিল্প-প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সহযোগিতা, ইন্টার্নশিপ, গবেষণা ও দক্ষতা উন্নয়নমূলক কার্যক্রমকে আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। কারণ স্নাতকদের কর্মযোগ্যতা শুধু ব্যক্তিগত সমস্যা নয়; এটি জাতীয় অর্থনীতি ও মানবসম্পদ উন্নয়নের প্রশ্ন।
আগামী বিশ্বের প্রতিযোগিতা হবে বৈশ্বিক
সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি এখানেই। একজন বাংলাদেশি স্নাতকের প্রতিযোগী এখন শুধু তার পাশের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নন; তিনি বিশ্বের যেকোনো দেশের একজন দক্ষ তরুণের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে পারেন। ডিজিটাল অর্থনীতি ভৌগোলিক সীমারেখাকে অনেকটাই দুর্বল করে দিয়েছে। তাই ভবিষ্যতের প্রশ্ন হবে না- “আপনি কোন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করেছেন?” প্রশ্ন হবে- “আপনি কী করতে পারেন?” আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হবে- “আপনি নতুন কিছু কত দ্রুত শিখতে পারেন?” কারণ প্রযুক্তি বদলাবে, কাজের ধরন বদলাবে, শিল্প খাত বদলাবে। যে ব্যক্তি শেখার ক্ষমতা ধরে রাখতে পারবেন, তিনিই পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারবেন। আজকের সবচেয়ে মূল্যবান দক্ষতাগুলোর একটি তাই হলো শেখার সক্ষমতা-অর্থাৎ নতুন পরিস্থিতিতে নিজেকে দ্রুত মানিয়ে নেওয়া এবং নতুন জ্ঞান অর্জন করার মানসিকতা।
এখনই সময় প্রস্তুতি
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার তরুণ জনগোষ্ঠী। কিন্তু এই জনসংখ্যাগত সুবিধা তখনই অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হবে, যখন তরুণদের শিক্ষা, দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের মধ্যে কার্যকর সংযোগ তৈরি করা যাবে। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি শিক্ষার্থীর তাই মনে রাখা উচিত-বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া সাফল্যের শেষ ধাপ নয়; বরং এটি নিজেকে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করার শুরু। শিক্ষার্থীকে শুধু পরীক্ষায় ভালো করার চেষ্টা করলে হবে না। সমস্যা সমাধান করতে হবে, প্রযুক্তি শিখতে হবে, যোগাযোগ দক্ষতা বাড়াতে হবে, গবেষণায় যুক্ত হতে হবে, বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করতে হবে এবং প্রতিনিয়ত নিজেকে নতুন করে তৈরি করতে হবে। কারণ আগামী দিনের পৃথিবী শুধু সনদধারীদের জন্য অপেক্ষা করবে না। অপেক্ষা করবে দক্ষ, সৃজনশীল, অভিযোজনক্ষম এবং শেখার মানসিকতা সম্পন্ন মানুষের জন্য।
আজকের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীকে তাই নিজেকেই প্রশ্ন করতে হবে “আমি কি শুধু একজন স্নাতক হওয়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছি, নাকি আগামী বিশ্বের একজন দক্ষ ও প্রতিযোগিতামূলক পেশাজীবী হওয়ার জন্য?” এই প্রশ্নের উত্তর শুধু একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নয়, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎও নির্ধারণ করতে পারে। কারণ একটি দেশের বিশ্ববিদ্যালয় শুধু সনদ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠান নয়; বিশ্ববিদ্যালয় হলো ভবিষ্যৎ মানবসম্পদ তৈরির কারখানা। সেই মানবসম্পদ কতটা দক্ষ, সৃজনশীল ও বিশ্বমানের হবে-তার ওপরই অনেকাংশে নির্ভর করবে দেশের আগামী দিনের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতি। ভবিষ্যৎ আসছে না-ভবিষ্যৎ ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। আর সেই ভবিষ্যতে জায়গা করে নিতে হলে প্রস্তুতি নিতে হবে আজই।
আফজাল হোসাইন: প্রভাষক, মার্কেটিং বিভাগ, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়