সৌরভের সুবচন
মো.আবু ছালেক সেলিম রেজা সৌরভ

বুড়িচং উপজেলার ষোলনল ইউনিয়নের অধিবাসী হিসেবে পয়াতের জলাভূমি আমার জীবনের ক্যানভাসে একেকটি সময়ে ভেসে উঠেছে একেকটি নতুন রূপে। শৈশব থেকে পূর্ণবয়সে পা দেওয়া পর্যন্ত এই জলার তিনটি ভিন্ন রূপ আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি, যা আমার স্মৃতির পাতায় চিরকালের জন্য খোদাই হয়ে আছে।
প্রথম দেখা ১৯৭১ সালের উত্তাল মুক্তিযুদ্ধের সময়ে, সম্ভবত এপ্রিল মাসের শুষ্ক মৌসুমে। কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টের শেল বর্ষণ থেকে বাঁচতে সেদিন আমার বাবা-মা আমাদের পরিবারের সবাইকে নিয়ে ভিটেমাটি ছেড়ে পালাচ্ছিলেন নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে। শিমাইল খাড়া থেকে ভরাসার, ইছাপুরা পেরিয়ে যখন পয়াতের জলায় এসে পৌঁছালাম, চারিদিকে কেবল বৈশাখের তীব্র রোদ আর খাঁ-খাঁ করা শুষ্ক মাটি। কাঠফাঁটা রোদে জমিন ফেটে চৌচির হয়ে আছে। আতঙ্কিত মানুষের ছুটোছুটি আর যুদ্ধের বিভীষিকার মাঝে সেই প্রথম আমার দেখা এক ফসলহীন শুষ্ক বিস্তৃত মাঠ পয়াতের জলা। সেদিন পায়ে হেঁটে পয়াতের জলা পাড়ি দিয়ে আমরা আশ্রয় নিয়েছিলাম পানার পুকুর পাড়ে আত্মীয় বাড়িতে।

কয়েক বছর পর আবার ফিরে এলাম সেখানে, তবে এবার বর্ষাকালে। নৌকায় চড়ে পয়াতের জলা পার হওয়ার সময় চোখ জুড়িয়ে গেল-একসময়ের শুষ্ক প্রান্তর আজ রূপ নিয়েছে এক অসীম জলাধারে। চারপাশে পানি থইথই করছে, দিগন্তজোড়া সেই জলরাশি দেখে মনে হচ্ছিল যেন কোনো সমুদ্রের মাঝ দিয়ে ভেসে চলছি। তখন কোনো ফসল ছিল না, কিন্তু প্রকৃতির সেই উত্তাল, উন্মুক্ত বিশালতা মনকে এক অদ্ভুত আনন্দে ভরিয়ে দিয়েছিল।
কালের পরিক্রমায় সেই রূপেও নেমে এসেছিল অন্ধকার। পয়াতের জলাভ‚মি ধীরে ধীরে কচুরিপানা আর বন্য আগাছায় ভরে গিয়ে অনাবাদী হয়ে পড়ল। বর্ষায় জলাবদ্ধতা আর শুষ্ক মৌসুমে মাঠ চৌচির করা খরা-হাজার হাজার কৃষকের মুখে নেমে এল হতাশা। আমরা হাল ছাড়িনি। পয়াতের জলার প্রাণ ঘুঙ্গুর নদী, পাগলী নদী ও শাখা খালগুলো পুনঃখননের দাবিতে স্থানীয় মানুষকে সাথে নিয়ে শুরু হলো নিরবিচ্ছিন্ন লড়াই-সংগ্রাম।

অবশেষে জনপ্রতিনিধিদের প্রচেষ্টা, প্রশাসনের সদিচ্ছা ও কৃষি বিভাগের উদ্যোগে নদী ও খাল খনন করা হলো। এরপরের দৃশ্যটি এক অলৌকিক স্বপ্নের মতো। পয়াতের জলার বিশাল প্রান্তর এখন সোনালী ধানের শীষে চিকচিক করছে, আর বুক চিরে বয়ে চলা নতুন খালে বইছে জলের অবাধ ফোয়ারা।
একটি জলাভূমি, তিনটি সময় এবং তিনটি জীবনবোধ-ভয়, বিস্ময় আর বিজয়ের এই তিন রূপেই আমি দেখেছি আমাদের জনপদের শস্যভাণ্ডার খ্যাত পয়াতের জলাকে।
কুমিল্লা জেলার বুড়িচং উপজেলার পয়াতের জলা একটি পরিচিত কৃষিজমি ও জলাবদ্ধ এলাকা, যা দীর্ঘদিন জলাবদ্ধ থাকার পর পুনঃখননের মাধ্যমে চাষাবাদের উপযোগী করা হয়েছে। বুড়িচং উপজেলার অন্যতম প্রধান কৃষিজাত পণ্য তথা ধান উৎপাদনের প্রাণকেন্দ্র হলো পয়াতের জলা। বহুবছর ধরে এটি স্থানীয় কৃষি অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে আসছে। বিশেষ করে ধান ও বিভিন্ন শীতকালীন রবি শস্য উৎপাদনে এ জলার ভূমিকা অপরিসীম। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এই নীচু জলাভ‚মিটি বর্ষায় পানি ধরে রাখে এবং শুষ্ক মৌসুমে উর্বর পলিমাটির সুবাদে বিপুল পরিমাণ খাদ্যশস্যের জোগান দেয়। এই জলা এলাকাটি 'কুমিল্লার শস্য ভান্ডার' নামে পরিচিত। এখানকার হাজার হাজার একর জমিতে ধানসহ বিভিন্ন সোনালী ফসল ফলানো হয়। অতীতে দীর্ঘ সময় পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় এই এলাকার বিশাল জমি অনাবাদী ও জলাবদ্ধ ছিল। পরবর্তীতে খাল পুনঃখনন ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার মাধ্যমে কৃষকদের জন্য জমিগুলো চাষাবাদের উপযোগী করে তোলা হয়। স্থানীয় জনগণের দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রাম, আবেদন-নিবেদনের পর রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, জনপ্রতিনিধি, জেলা ও উপজেলা প্রশাসন সর্বোপরি বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের ফলে আজকের স্বস্তিদায়ক অবস্থানে পৌঁছেছে পয়াতের জলা।

পয়াতের জলার ভৌগোলিক বিস্তার ও কৃষি তথ্য
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, পয়াতের জলার মোট আয়তন প্রায় ২,৫০০ হেক্টর। এর মধ্যে প্রায় ২,১০০ হেক্টর জমি সরাসরি নিবিড় চাষাবাদের আওতাভুক্ত। বুড়িচং উপজেলার ষোলনল, বাকশীমূল, বুড়িচং সদর এবং রাজাপুর ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে এই জলা বিস্তৃত। এই জলার প্রধান শক্তি হলো এর উর্বর পলিযুক্ত মাটি, যা পলি সঞ্চয়ের কারণে প্রাকৃতিকভাবেই নাইট্রোজেন ও জৈব উপাদানে সমৃদ্ধ।
দুঃখভারাক্রান্ত অতীত: জলাবদ্ধতার সংকট ও কৃষকদের অর্থনৈতিক দুর্ভোগ
পয়াতের জলার অতীত ইতিহাস মূলত স্থানীয় কৃষকদের দীর্ঘশ্বাস ও সংগ্রামের ইতিহাস। একসময় এই জলায় বর্ষার পানি সময়মতো নিষ্কাশিত হতে পারত না। প্রাকৃতিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা বা খালগুলো পলি জমে ভরাট হয়ে যাওয়া, অবৈধ দখল এবং স্থানীয়ভাবে সঠিক সংস্কারের অভাবে সৃষ্টি হয় দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা।
কৃষি বিভাগের তথ্যানুসারে, আগে জলাবদ্ধতার কারণে প্রতি বছর পয়াতের জলার প্রায় ৮০০ থেকে ১,০০০ হেক্টর জমি বছরের পর বছর পুরোপুরি অনাবাদি পড়ে থাকত। সময়মতো বোরো ধান রোপণ করা যেত না, আবার সামান্য অসময়ের বৃষ্টিতে আমন ধান পানির নিচে তলিয়ে পচে যেত। প্রতি বছর আনুমানিক ১০,০০০ থেকে ১২,০০০ মেট্রিক টন ধান নষ্ট হতো, যার তৎকালীন বাজারমূল্য ছিল প্রায় ২৫ থেকে ৩০ কোটি টাকা। ফলে বুড়িচংয়ের শত শত কৃষক পরিবার চরম ঋণগ্রস্ততা ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হয়ে পড়েছিল। পয়াতের জলার মূল সমস্যাগুলো ছিল নিম্নরূপ-
অনাবাদি জমি: জলাবদ্ধতার কারণে হাজার হাজার একর আবাদি জমি বছরের পর বছর অনাবাদি পড়ে থাকত।
ফসল হানি: সময়মতো ধান রোপণ করা যেত না, আবার অনেক সময় সামান্য বৃষ্টিতেই কচি ধানগাছ পানির নিচে তলিয়ে পচে যেত। কোন কোন সময় কৃষকের শ্রমে-ঘামে ফলানো সোনালি রঙের পাকা ধানগুলো বৃষ্টি এবং ঢলের পানিতে চোখের সামনেই তলিয়ে যেতো।
অর্থনৈতিক ক্ষতি: বছরের পর বছর কষ্ট করে ফসল বুনেও তা ঘরে তুলতে না পেরে বুড়িচংয়ের শত শত কৃষক পরিবার চরম অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হয়ে পড়েছিল।
কৃষিনির্ভর এই অঞ্চলের হাজার হাজার মানুষের কাছে পয়াতের জলা তখন আশীর্বাদের বদলে দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। বছরের একটা সময়ে কৃষকের বুকভাঙা হাহাকার ও আর্তনাদে ভারী হয়ে উঠতো এ জনপদের আকাশ-বাতাস।
বর্তমান: খাল পুনঃখনন ও উৎপাদন চিত্র
দীর্ঘদিনের এই সংকট দূরীকরণে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি) এবং স্থানীয় পানি উন্নয়ন বোর্ডের উদ্যোগে পয়াতের জলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত প্রধান নদী ও খালগুলো, বিশেষ করে ঘুংঘুর ও পাগলী নদী এবং সংযুক্ত খালসমূহ পুনঃখনন করা হয়। খাল পুনরুদ্ধারের পর থেকে পয়াতের জলায় উৎপাদনে বিশাল পরিবর্তন আসে।
ধান উৎপাদন: বর্তমানে এই জলায় প্রতি বছর গড়ে ১৪,৫০০ মেট্রিক টন বোরো ধান এবং ৮,২০০ মেট্রিক টন আমন ধান উৎপাদিত হয়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, জলায় মোট বার্ষিক ধান উৎপাদনের পরিমাণ প্রায় ২২,৭০০ মেট্রিক টন। বর্তমান বাজারদরে এর মোট আনুমানিক মূল্য প্রায় ৭০ থেকে ৭৫ কোটি টাকা।
রবি শস্য ও শাকসবজি: শুধু ধান নয়, শুষ্ক মৌসুমে পানি নিষ্কাশন সহজ হওয়ায় এখানে প্রতি বছর প্রায় ৪,৫০০ মেট্রিক টন আলু, ১,২০০ মেট্রিক টন সরিষা এবং প্রায় ৬,০০০ মেট্রিক টন বিভিন্ন শীতকালীন শাকসবজি (টমেটো, ফুলকপি, বাঁধাকপি, বেগুন) উৎপাদিত হয়। এই রবি শস্যের আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ২৫ থেকে ৩০ কোটি টাকা।
সব মিলিয়ে পয়াতের জলা থেকে বর্তমানে প্রতি বছর প্রায় ১০০ কোটি টাকারও বেশি কৃষিজাত পণ্য জাতীয় অর্থনীতিতে যুক্ত হচ্ছে।

কৃষিজাত ফসল উৎপাদনে পয়াতের জলার সার্বিক গুরুত্ব
আঞ্চলিক খাদ্য নিরাপত্তা: পয়াতের জলা কেবল বুড়িচং উপজেলার চাহিদা মেটায় না, বরং কুমিল্লা জেলা ও রাজধানী ঢাকার বাজারে প্রতিদিন শাকসবজি ও চাল সরবরাহে প্রত্যক্ষ অবদান রাখছে।
ফসলের নিবিড়তা বৃদ্ধি: জলাবদ্ধতা নিরসনের ফলে জলার 'শস্য নিবিড়তা' (Cropping Intensity) ১৩০% থেকে বেড়ে বর্তমানে প্রায় ২২০%-এ উন্নীত হয়েছে। অনেক জমিতে এখন বছরে তিনটি ফসল ফলানো সম্ভব হচ্ছে।
গ্রামীণ কর্মসংস্থান: জলার আবাদি ক্ষেত্র সম্প্রসারিত হওয়ায় প্রতি মৌসুমে কৃষি শ্রমিক, পরিবহনকর্মী ও স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য প্রায় ১৫,০০০ মানুষের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও করণীয়
পয়াতের জলার বিদ্যমান সাফল্যকে আরও এগিয়ে নিতে দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত পরিকল্পনা দরকার-
আধুনিক স্মার্ট কৃষি প্রযুক্তি: উন্নত জাতের ধান চাষ, কৃষি ড্রোন ব্যবহার করে সুনির্দিষ্ট সারের মাত্রা নির্ধারণ, পরিমিত কীটনাশক প্রয়োগ এবং কম্বাইন হারভেস্টার প্রযুক্তির মাধ্যমে ধান কাটার খরচ ৩০% পর্যন্ত কমানো সম্ভব।
কৃষি প্রক্রিয়াকরণ ও কোল্ড স্টোরেজ: পয়াতের জলায় উৎপাদিত অতিরিক্ত আলু ও সবজি সংরক্ষণের জন্য বুড়িচং অঞ্চলে সরকারি-বেসরকারি যৌথ উদ্যোগে এগ্রো-প্রসেসিং হাব ও কোল্ড স্টোরেজ স্থাপন করা প্রয়োজন।
সমন্বিত মৎস্য ও কৃষি (Agri-Aquaculture): নিচু এলাকায় প্লাবনভ‚মির পানি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বর্ষার ৪ মাস নিয়ন্ত্রিত মৎস্য চাষ এবং পরবর্তী ৮ মাস ধান ও সবজি চাষের 'সমন্বিত মৎস্য-কৃষি মডেল' চালু করলে এই জলা থেকে অতিরিক্ত ২০-২৫ কোটি টাকার মৎস্য সম্পদ আহরণ সম্ভব।
টেকসই ড্রেজিং: খালগুলোর পানি প্রবাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখতে ৩ থেকে ৫ বছর পর পর পরিমিত ক্যাপিটাল ও মেইনটেন্যান্স ড্রেজিংয়ের ব্যবস্থা রাখতে হবে।
বুড়িচং উপজেলার পয়াতের জলা প্রমাণ করেছে যে সঠিক পরিকাঠামো উন্নয়ন ও সময়োপযোগী পদক্ষেপের মাধ্যমে একটি প্রান্তিক জলমগ্ন অঞ্চলকে সমৃদ্ধ কৃষি জোনে পরিণত করা যায়। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয় অব্যহত থাকলে পয়াতের জলা আগামী দিনে বৃহত্তর কুমিল্লা অঞ্চল তথা বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা জোরদারে আরও জোরালো ভূমিকা রাখতে পারবে। এছাড়াও পয়াতের জলায় বেশ কিছু সরকারি খাসজমি রয়েছে। জেলা শহরের সন্নিকটে অবস্থান এবং সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থা বিদ্যমান থাকায় পয়াতের জলার এসব খাসজমি কাজে লাগিয়ে এখানে কুমিল্লার মানুষের দীর্ঘদিনের কাক্সিক্ষত কুমিল্লা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা যেতে পারে। পয়াতের জলাটিকে গড়ে তোলা যেতে পারে কৃষির অন্যতম আধুনিক গবেষণা কেন্দ্রে।
মো. আবু ছালেক সেলিম রেজা সৌরভ: অধ্যক্ষ, সোনার বাংলা কলেজ, কুমিল্লা। সাবেক সিনেট সদস্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।

বুড়িচং উপজেলার ষোলনল ইউনিয়নের অধিবাসী হিসেবে পয়াতের জলাভূমি আমার জীবনের ক্যানভাসে একেকটি সময়ে ভেসে উঠেছে একেকটি নতুন রূপে। শৈশব থেকে পূর্ণবয়সে পা দেওয়া পর্যন্ত এই জলার তিনটি ভিন্ন রূপ আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি, যা আমার স্মৃতির পাতায় চিরকালের জন্য খোদাই হয়ে আছে।
প্রথম দেখা ১৯৭১ সালের উত্তাল মুক্তিযুদ্ধের সময়ে, সম্ভবত এপ্রিল মাসের শুষ্ক মৌসুমে। কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টের শেল বর্ষণ থেকে বাঁচতে সেদিন আমার বাবা-মা আমাদের পরিবারের সবাইকে নিয়ে ভিটেমাটি ছেড়ে পালাচ্ছিলেন নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে। শিমাইল খাড়া থেকে ভরাসার, ইছাপুরা পেরিয়ে যখন পয়াতের জলায় এসে পৌঁছালাম, চারিদিকে কেবল বৈশাখের তীব্র রোদ আর খাঁ-খাঁ করা শুষ্ক মাটি। কাঠফাঁটা রোদে জমিন ফেটে চৌচির হয়ে আছে। আতঙ্কিত মানুষের ছুটোছুটি আর যুদ্ধের বিভীষিকার মাঝে সেই প্রথম আমার দেখা এক ফসলহীন শুষ্ক বিস্তৃত মাঠ পয়াতের জলা। সেদিন পায়ে হেঁটে পয়াতের জলা পাড়ি দিয়ে আমরা আশ্রয় নিয়েছিলাম পানার পুকুর পাড়ে আত্মীয় বাড়িতে।

কয়েক বছর পর আবার ফিরে এলাম সেখানে, তবে এবার বর্ষাকালে। নৌকায় চড়ে পয়াতের জলা পার হওয়ার সময় চোখ জুড়িয়ে গেল-একসময়ের শুষ্ক প্রান্তর আজ রূপ নিয়েছে এক অসীম জলাধারে। চারপাশে পানি থইথই করছে, দিগন্তজোড়া সেই জলরাশি দেখে মনে হচ্ছিল যেন কোনো সমুদ্রের মাঝ দিয়ে ভেসে চলছি। তখন কোনো ফসল ছিল না, কিন্তু প্রকৃতির সেই উত্তাল, উন্মুক্ত বিশালতা মনকে এক অদ্ভুত আনন্দে ভরিয়ে দিয়েছিল।
কালের পরিক্রমায় সেই রূপেও নেমে এসেছিল অন্ধকার। পয়াতের জলাভ‚মি ধীরে ধীরে কচুরিপানা আর বন্য আগাছায় ভরে গিয়ে অনাবাদী হয়ে পড়ল। বর্ষায় জলাবদ্ধতা আর শুষ্ক মৌসুমে মাঠ চৌচির করা খরা-হাজার হাজার কৃষকের মুখে নেমে এল হতাশা। আমরা হাল ছাড়িনি। পয়াতের জলার প্রাণ ঘুঙ্গুর নদী, পাগলী নদী ও শাখা খালগুলো পুনঃখননের দাবিতে স্থানীয় মানুষকে সাথে নিয়ে শুরু হলো নিরবিচ্ছিন্ন লড়াই-সংগ্রাম।

অবশেষে জনপ্রতিনিধিদের প্রচেষ্টা, প্রশাসনের সদিচ্ছা ও কৃষি বিভাগের উদ্যোগে নদী ও খাল খনন করা হলো। এরপরের দৃশ্যটি এক অলৌকিক স্বপ্নের মতো। পয়াতের জলার বিশাল প্রান্তর এখন সোনালী ধানের শীষে চিকচিক করছে, আর বুক চিরে বয়ে চলা নতুন খালে বইছে জলের অবাধ ফোয়ারা।
একটি জলাভূমি, তিনটি সময় এবং তিনটি জীবনবোধ-ভয়, বিস্ময় আর বিজয়ের এই তিন রূপেই আমি দেখেছি আমাদের জনপদের শস্যভাণ্ডার খ্যাত পয়াতের জলাকে।
কুমিল্লা জেলার বুড়িচং উপজেলার পয়াতের জলা একটি পরিচিত কৃষিজমি ও জলাবদ্ধ এলাকা, যা দীর্ঘদিন জলাবদ্ধ থাকার পর পুনঃখননের মাধ্যমে চাষাবাদের উপযোগী করা হয়েছে। বুড়িচং উপজেলার অন্যতম প্রধান কৃষিজাত পণ্য তথা ধান উৎপাদনের প্রাণকেন্দ্র হলো পয়াতের জলা। বহুবছর ধরে এটি স্থানীয় কৃষি অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে আসছে। বিশেষ করে ধান ও বিভিন্ন শীতকালীন রবি শস্য উৎপাদনে এ জলার ভূমিকা অপরিসীম। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এই নীচু জলাভ‚মিটি বর্ষায় পানি ধরে রাখে এবং শুষ্ক মৌসুমে উর্বর পলিমাটির সুবাদে বিপুল পরিমাণ খাদ্যশস্যের জোগান দেয়। এই জলা এলাকাটি 'কুমিল্লার শস্য ভান্ডার' নামে পরিচিত। এখানকার হাজার হাজার একর জমিতে ধানসহ বিভিন্ন সোনালী ফসল ফলানো হয়। অতীতে দীর্ঘ সময় পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় এই এলাকার বিশাল জমি অনাবাদী ও জলাবদ্ধ ছিল। পরবর্তীতে খাল পুনঃখনন ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার মাধ্যমে কৃষকদের জন্য জমিগুলো চাষাবাদের উপযোগী করে তোলা হয়। স্থানীয় জনগণের দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রাম, আবেদন-নিবেদনের পর রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, জনপ্রতিনিধি, জেলা ও উপজেলা প্রশাসন সর্বোপরি বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের ফলে আজকের স্বস্তিদায়ক অবস্থানে পৌঁছেছে পয়াতের জলা।

পয়াতের জলার ভৌগোলিক বিস্তার ও কৃষি তথ্য
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, পয়াতের জলার মোট আয়তন প্রায় ২,৫০০ হেক্টর। এর মধ্যে প্রায় ২,১০০ হেক্টর জমি সরাসরি নিবিড় চাষাবাদের আওতাভুক্ত। বুড়িচং উপজেলার ষোলনল, বাকশীমূল, বুড়িচং সদর এবং রাজাপুর ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে এই জলা বিস্তৃত। এই জলার প্রধান শক্তি হলো এর উর্বর পলিযুক্ত মাটি, যা পলি সঞ্চয়ের কারণে প্রাকৃতিকভাবেই নাইট্রোজেন ও জৈব উপাদানে সমৃদ্ধ।
দুঃখভারাক্রান্ত অতীত: জলাবদ্ধতার সংকট ও কৃষকদের অর্থনৈতিক দুর্ভোগ
পয়াতের জলার অতীত ইতিহাস মূলত স্থানীয় কৃষকদের দীর্ঘশ্বাস ও সংগ্রামের ইতিহাস। একসময় এই জলায় বর্ষার পানি সময়মতো নিষ্কাশিত হতে পারত না। প্রাকৃতিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা বা খালগুলো পলি জমে ভরাট হয়ে যাওয়া, অবৈধ দখল এবং স্থানীয়ভাবে সঠিক সংস্কারের অভাবে সৃষ্টি হয় দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা।
কৃষি বিভাগের তথ্যানুসারে, আগে জলাবদ্ধতার কারণে প্রতি বছর পয়াতের জলার প্রায় ৮০০ থেকে ১,০০০ হেক্টর জমি বছরের পর বছর পুরোপুরি অনাবাদি পড়ে থাকত। সময়মতো বোরো ধান রোপণ করা যেত না, আবার সামান্য অসময়ের বৃষ্টিতে আমন ধান পানির নিচে তলিয়ে পচে যেত। প্রতি বছর আনুমানিক ১০,০০০ থেকে ১২,০০০ মেট্রিক টন ধান নষ্ট হতো, যার তৎকালীন বাজারমূল্য ছিল প্রায় ২৫ থেকে ৩০ কোটি টাকা। ফলে বুড়িচংয়ের শত শত কৃষক পরিবার চরম ঋণগ্রস্ততা ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হয়ে পড়েছিল। পয়াতের জলার মূল সমস্যাগুলো ছিল নিম্নরূপ-
অনাবাদি জমি: জলাবদ্ধতার কারণে হাজার হাজার একর আবাদি জমি বছরের পর বছর অনাবাদি পড়ে থাকত।
ফসল হানি: সময়মতো ধান রোপণ করা যেত না, আবার অনেক সময় সামান্য বৃষ্টিতেই কচি ধানগাছ পানির নিচে তলিয়ে পচে যেত। কোন কোন সময় কৃষকের শ্রমে-ঘামে ফলানো সোনালি রঙের পাকা ধানগুলো বৃষ্টি এবং ঢলের পানিতে চোখের সামনেই তলিয়ে যেতো।
অর্থনৈতিক ক্ষতি: বছরের পর বছর কষ্ট করে ফসল বুনেও তা ঘরে তুলতে না পেরে বুড়িচংয়ের শত শত কৃষক পরিবার চরম অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হয়ে পড়েছিল।
কৃষিনির্ভর এই অঞ্চলের হাজার হাজার মানুষের কাছে পয়াতের জলা তখন আশীর্বাদের বদলে দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। বছরের একটা সময়ে কৃষকের বুকভাঙা হাহাকার ও আর্তনাদে ভারী হয়ে উঠতো এ জনপদের আকাশ-বাতাস।
বর্তমান: খাল পুনঃখনন ও উৎপাদন চিত্র
দীর্ঘদিনের এই সংকট দূরীকরণে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি) এবং স্থানীয় পানি উন্নয়ন বোর্ডের উদ্যোগে পয়াতের জলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত প্রধান নদী ও খালগুলো, বিশেষ করে ঘুংঘুর ও পাগলী নদী এবং সংযুক্ত খালসমূহ পুনঃখনন করা হয়। খাল পুনরুদ্ধারের পর থেকে পয়াতের জলায় উৎপাদনে বিশাল পরিবর্তন আসে।
ধান উৎপাদন: বর্তমানে এই জলায় প্রতি বছর গড়ে ১৪,৫০০ মেট্রিক টন বোরো ধান এবং ৮,২০০ মেট্রিক টন আমন ধান উৎপাদিত হয়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, জলায় মোট বার্ষিক ধান উৎপাদনের পরিমাণ প্রায় ২২,৭০০ মেট্রিক টন। বর্তমান বাজারদরে এর মোট আনুমানিক মূল্য প্রায় ৭০ থেকে ৭৫ কোটি টাকা।
রবি শস্য ও শাকসবজি: শুধু ধান নয়, শুষ্ক মৌসুমে পানি নিষ্কাশন সহজ হওয়ায় এখানে প্রতি বছর প্রায় ৪,৫০০ মেট্রিক টন আলু, ১,২০০ মেট্রিক টন সরিষা এবং প্রায় ৬,০০০ মেট্রিক টন বিভিন্ন শীতকালীন শাকসবজি (টমেটো, ফুলকপি, বাঁধাকপি, বেগুন) উৎপাদিত হয়। এই রবি শস্যের আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ২৫ থেকে ৩০ কোটি টাকা।
সব মিলিয়ে পয়াতের জলা থেকে বর্তমানে প্রতি বছর প্রায় ১০০ কোটি টাকারও বেশি কৃষিজাত পণ্য জাতীয় অর্থনীতিতে যুক্ত হচ্ছে।

কৃষিজাত ফসল উৎপাদনে পয়াতের জলার সার্বিক গুরুত্ব
আঞ্চলিক খাদ্য নিরাপত্তা: পয়াতের জলা কেবল বুড়িচং উপজেলার চাহিদা মেটায় না, বরং কুমিল্লা জেলা ও রাজধানী ঢাকার বাজারে প্রতিদিন শাকসবজি ও চাল সরবরাহে প্রত্যক্ষ অবদান রাখছে।
ফসলের নিবিড়তা বৃদ্ধি: জলাবদ্ধতা নিরসনের ফলে জলার 'শস্য নিবিড়তা' (Cropping Intensity) ১৩০% থেকে বেড়ে বর্তমানে প্রায় ২২০%-এ উন্নীত হয়েছে। অনেক জমিতে এখন বছরে তিনটি ফসল ফলানো সম্ভব হচ্ছে।
গ্রামীণ কর্মসংস্থান: জলার আবাদি ক্ষেত্র সম্প্রসারিত হওয়ায় প্রতি মৌসুমে কৃষি শ্রমিক, পরিবহনকর্মী ও স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য প্রায় ১৫,০০০ মানুষের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও করণীয়
পয়াতের জলার বিদ্যমান সাফল্যকে আরও এগিয়ে নিতে দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত পরিকল্পনা দরকার-
আধুনিক স্মার্ট কৃষি প্রযুক্তি: উন্নত জাতের ধান চাষ, কৃষি ড্রোন ব্যবহার করে সুনির্দিষ্ট সারের মাত্রা নির্ধারণ, পরিমিত কীটনাশক প্রয়োগ এবং কম্বাইন হারভেস্টার প্রযুক্তির মাধ্যমে ধান কাটার খরচ ৩০% পর্যন্ত কমানো সম্ভব।
কৃষি প্রক্রিয়াকরণ ও কোল্ড স্টোরেজ: পয়াতের জলায় উৎপাদিত অতিরিক্ত আলু ও সবজি সংরক্ষণের জন্য বুড়িচং অঞ্চলে সরকারি-বেসরকারি যৌথ উদ্যোগে এগ্রো-প্রসেসিং হাব ও কোল্ড স্টোরেজ স্থাপন করা প্রয়োজন।
সমন্বিত মৎস্য ও কৃষি (Agri-Aquaculture): নিচু এলাকায় প্লাবনভ‚মির পানি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বর্ষার ৪ মাস নিয়ন্ত্রিত মৎস্য চাষ এবং পরবর্তী ৮ মাস ধান ও সবজি চাষের 'সমন্বিত মৎস্য-কৃষি মডেল' চালু করলে এই জলা থেকে অতিরিক্ত ২০-২৫ কোটি টাকার মৎস্য সম্পদ আহরণ সম্ভব।
টেকসই ড্রেজিং: খালগুলোর পানি প্রবাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখতে ৩ থেকে ৫ বছর পর পর পরিমিত ক্যাপিটাল ও মেইনটেন্যান্স ড্রেজিংয়ের ব্যবস্থা রাখতে হবে।
বুড়িচং উপজেলার পয়াতের জলা প্রমাণ করেছে যে সঠিক পরিকাঠামো উন্নয়ন ও সময়োপযোগী পদক্ষেপের মাধ্যমে একটি প্রান্তিক জলমগ্ন অঞ্চলকে সমৃদ্ধ কৃষি জোনে পরিণত করা যায়। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয় অব্যহত থাকলে পয়াতের জলা আগামী দিনে বৃহত্তর কুমিল্লা অঞ্চল তথা বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা জোরদারে আরও জোরালো ভূমিকা রাখতে পারবে। এছাড়াও পয়াতের জলায় বেশ কিছু সরকারি খাসজমি রয়েছে। জেলা শহরের সন্নিকটে অবস্থান এবং সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থা বিদ্যমান থাকায় পয়াতের জলার এসব খাসজমি কাজে লাগিয়ে এখানে কুমিল্লার মানুষের দীর্ঘদিনের কাক্সিক্ষত কুমিল্লা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা যেতে পারে। পয়াতের জলাটিকে গড়ে তোলা যেতে পারে কৃষির অন্যতম আধুনিক গবেষণা কেন্দ্রে।
মো. আবু ছালেক সেলিম রেজা সৌরভ: অধ্যক্ষ, সোনার বাংলা কলেজ, কুমিল্লা। সাবেক সিনেট সদস্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।