অধ্যাপক ড. আনোয়ারুল হক

১৯৬৯ সালে জিলা স্কুল থেকে মেট্রিক পাশ করে আমি কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজে উচ্চ মাধ্যমিকে পড়ি তখন আমাদের ইংরেজি ক্লাশ নিতেন লায়লা নূর ম্যাডাম। স্বপ্না রায় তখনও শিক্ষক হয়ে আসেননি। তাঁর বাবা প্রফেসর এন জি রায় স্যারও ছিলেন আমাদের ইংরেজির শিক্ষক।
লায়লা নূর ম্যাডাম, ছোটখাটো গড়নের, চমৎকার পরিচ্ছন্ন রুচির, সুন্দরের প্রতীক ছিলেন। কলেজে পা রাখার সময় থেকেই কান্দিরপাড়ের সুখেনের চায়ের দোকানের আড্ডার খাতায় ততদিনে নাম লিখিয়ে ফেলেছি। কিন্তু লায়লা আপার ইংরেজি ক্লাশ মিস নেই!
মিস্ করতাম না এনজি রায়, শাহদাত হোসেন, লুৎফুর রহমান রহমান স্যারের ক্লাশ। প্রত্যেকের পড়ানোর ভিন্ন স্টাইল।
লায়লা নূর ম্যাডাম একটু খুঁড়িয়ে হাঁটতেন মনে পড়ে। ক্লাশে ঢুকে ডায়াসে দাঁড়িয়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে মুখে হাসি ছড়িয়ে দিয়ে বলতেন, গুড মর্নিং বয়েজ! সারা ক্লশে তখন পিন পতন নীরবতা।
পড়ানো শুরু করলে মনে হতো, কথা তো বলতেন না, যেন মিস্টি মিস্টি ইংরেজি শব্দর ফল টুপটাপ করে সারা ক্লাশে ঝরে পড়ছে। আমার সকাল, সারাটা দিনের শুরু তখন ফুরফুরে হয়ে যেত।
থাকতেন প্রফেসর পাড়া। আমার বাসা উল্টো দিকের নতুন চৌধুরী পাড়ায়। দেখা হতোই। দুই বোন এক রিক্সায় চলতেন। একে অপরকে ডাকতেন, লাল-নীল বলে। মিথ্যে নয়, এঁদের মতো শিক্ষক পেয়ে, দেখে মুগ্ধতায় আমার আর অন্য কোন পেশায় যেতে ইচ্ছে হলো না।
এবার স্বপ্না রায় দিদির কথা বলি।
আমি যখন বাংলা অনার্স থার্ড ইয়ারে তখন তাঁকে শিক্ষক হিসাবে পেয়েছি। সার্টিফিকেট বয়সের হিসেবে তিনি আমার দুই বছরের বড় ছিলেন। ১৯৯০ সালে আমি যখন শিক্ষক হয়ে বাংলা বিভাগে যোগ দিয়েছি, তখন বাংলা বিভাগে আমি দিদির সহকর্মী হয়েছি। এর আগে থেকেই অবশ্য পারিবারিক ভাবেও আমি তাঁদের ঘনিষ্ঠ ছিলাম। দিদির মা আর আমার বড় বোন দুজনে ফয়জুন্নেসা গার্লস স্কুলে সহকর্মী শিক্ষক ছিলেন। সেই সুবাদে স্বপ্না দিদির মাকে আমি ডাকতাম, বৌদি। ওনার ছোট ভাই সুহাস আমাদের বন্ধু। ছোট তিন বোন শুক্লা, শোভনা, বেবি কচি কাঁচার মেলার ছোট বোন। এইসব মিলিয়ে সবশেষে স্বপ্না দিদি ডাকতাম। দিনে দিনে কোন সময় একদিন প্রকৃত কবিতার মর্ম অনধাবন, গবেষণার হাতেখড়ি আমার তাঁর কাছে।
ওনি যখন ক্যাম্পাসে আসতেন, দেখলে মিস্টি করে হাসতেন। হাঁটতেন না, যেন, নজরুলের 'মোমের পুতুল পরীর দেশের মেয়ে নেচে যায়'! এত সুন্দর করে শাড়ি পরতেন, ভাঁজ এক চুল সরতো না। চাঁপাকলি আঙুলে চায়ের কাপ ঠোঁটি তুলতেন। সামান্য সাজে, কপালের লাল টিপে তাঁকে আমার কাছে দেবী প্রতিমার মতো মনে হতো।
সত্যি কথা, সেই বয়সে যখন আমি তাঁর সহকর্মী, ঘরে বাইরে তাঁকে মুগ্ধ হয়ে দেখছি (তাঁকে দেখলে কোন ছাত্র, যুবক না মুগ্ধ হতো!) তখন আমার প্রথম কবিতার বইয়ের নাম দিলাম, লাবণ্য শুধু তোমার জন্য। এই লাবণ্য আর কেউ না, আমার দিদি প্রফেসর ড. স্বপ্না রায়।
শেষ করি, আমার সৌভাগ্য যে, প্রফেসর হওয়ার আগে আমি সহযোগী অধ্যাপক হিসাবে উপাধ্যক্ষ পদে নবীনগর সরকারি কলেজে ছিলাম। স্বপ্না রায় দিদি তখন ভিক্টোরিয়া কলেজে বাংলা বিভাগের প্রফেসর ও বিভাগীয় প্রধান। আমার মনে মনে ইচ্ছে নিজের কলেজ ও বিভাগে আসা। কিন্তু তাঁকে সরিয়ে আসার ইচ্ছে তো আমার নেই। সেই চেষ্টাও করবো না। ডিজি অফিসমুখো হলাম না। নবীনগরে অপেক্ষা করছি। কিন্তু প্রমোশনের চিঠি হাতে পেয়ে আমি ভীষণ অবাক! দিদি ভিক্টোরিয়া থেকে ইডেন কলেজে অধ্যক্ষ পদে বদলী হয়েছেন, আর তাঁর জায়গায় ভিক্টোরিয়াতে বাংলা বিভাগে আমি। পরে আমি নিশ্চিত হয়েছি, এতে দিদির ভূমিকা ছিল। ওঁর জন্যই আমার মনের আশা পূর্ণ হলো।
আজ আমার সমস্ত আন্তরিক শ্রদ্ধা অনুরাগ নিয়ে দিদির এবং নূর ম্যাডামের পরকালীন শান্তি কামনা করছি।
২৬.৮.২০২৬
অধ্যাপক ড. আনোয়ারুল হক: কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের সাবেক অধ্যাপক।

১৯৬৯ সালে জিলা স্কুল থেকে মেট্রিক পাশ করে আমি কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজে উচ্চ মাধ্যমিকে পড়ি তখন আমাদের ইংরেজি ক্লাশ নিতেন লায়লা নূর ম্যাডাম। স্বপ্না রায় তখনও শিক্ষক হয়ে আসেননি। তাঁর বাবা প্রফেসর এন জি রায় স্যারও ছিলেন আমাদের ইংরেজির শিক্ষক।
লায়লা নূর ম্যাডাম, ছোটখাটো গড়নের, চমৎকার পরিচ্ছন্ন রুচির, সুন্দরের প্রতীক ছিলেন। কলেজে পা রাখার সময় থেকেই কান্দিরপাড়ের সুখেনের চায়ের দোকানের আড্ডার খাতায় ততদিনে নাম লিখিয়ে ফেলেছি। কিন্তু লায়লা আপার ইংরেজি ক্লাশ মিস নেই!
মিস্ করতাম না এনজি রায়, শাহদাত হোসেন, লুৎফুর রহমান রহমান স্যারের ক্লাশ। প্রত্যেকের পড়ানোর ভিন্ন স্টাইল।
লায়লা নূর ম্যাডাম একটু খুঁড়িয়ে হাঁটতেন মনে পড়ে। ক্লাশে ঢুকে ডায়াসে দাঁড়িয়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে মুখে হাসি ছড়িয়ে দিয়ে বলতেন, গুড মর্নিং বয়েজ! সারা ক্লশে তখন পিন পতন নীরবতা।
পড়ানো শুরু করলে মনে হতো, কথা তো বলতেন না, যেন মিস্টি মিস্টি ইংরেজি শব্দর ফল টুপটাপ করে সারা ক্লাশে ঝরে পড়ছে। আমার সকাল, সারাটা দিনের শুরু তখন ফুরফুরে হয়ে যেত।
থাকতেন প্রফেসর পাড়া। আমার বাসা উল্টো দিকের নতুন চৌধুরী পাড়ায়। দেখা হতোই। দুই বোন এক রিক্সায় চলতেন। একে অপরকে ডাকতেন, লাল-নীল বলে। মিথ্যে নয়, এঁদের মতো শিক্ষক পেয়ে, দেখে মুগ্ধতায় আমার আর অন্য কোন পেশায় যেতে ইচ্ছে হলো না।
এবার স্বপ্না রায় দিদির কথা বলি।
আমি যখন বাংলা অনার্স থার্ড ইয়ারে তখন তাঁকে শিক্ষক হিসাবে পেয়েছি। সার্টিফিকেট বয়সের হিসেবে তিনি আমার দুই বছরের বড় ছিলেন। ১৯৯০ সালে আমি যখন শিক্ষক হয়ে বাংলা বিভাগে যোগ দিয়েছি, তখন বাংলা বিভাগে আমি দিদির সহকর্মী হয়েছি। এর আগে থেকেই অবশ্য পারিবারিক ভাবেও আমি তাঁদের ঘনিষ্ঠ ছিলাম। দিদির মা আর আমার বড় বোন দুজনে ফয়জুন্নেসা গার্লস স্কুলে সহকর্মী শিক্ষক ছিলেন। সেই সুবাদে স্বপ্না দিদির মাকে আমি ডাকতাম, বৌদি। ওনার ছোট ভাই সুহাস আমাদের বন্ধু। ছোট তিন বোন শুক্লা, শোভনা, বেবি কচি কাঁচার মেলার ছোট বোন। এইসব মিলিয়ে সবশেষে স্বপ্না দিদি ডাকতাম। দিনে দিনে কোন সময় একদিন প্রকৃত কবিতার মর্ম অনধাবন, গবেষণার হাতেখড়ি আমার তাঁর কাছে।
ওনি যখন ক্যাম্পাসে আসতেন, দেখলে মিস্টি করে হাসতেন। হাঁটতেন না, যেন, নজরুলের 'মোমের পুতুল পরীর দেশের মেয়ে নেচে যায়'! এত সুন্দর করে শাড়ি পরতেন, ভাঁজ এক চুল সরতো না। চাঁপাকলি আঙুলে চায়ের কাপ ঠোঁটি তুলতেন। সামান্য সাজে, কপালের লাল টিপে তাঁকে আমার কাছে দেবী প্রতিমার মতো মনে হতো।
সত্যি কথা, সেই বয়সে যখন আমি তাঁর সহকর্মী, ঘরে বাইরে তাঁকে মুগ্ধ হয়ে দেখছি (তাঁকে দেখলে কোন ছাত্র, যুবক না মুগ্ধ হতো!) তখন আমার প্রথম কবিতার বইয়ের নাম দিলাম, লাবণ্য শুধু তোমার জন্য। এই লাবণ্য আর কেউ না, আমার দিদি প্রফেসর ড. স্বপ্না রায়।
শেষ করি, আমার সৌভাগ্য যে, প্রফেসর হওয়ার আগে আমি সহযোগী অধ্যাপক হিসাবে উপাধ্যক্ষ পদে নবীনগর সরকারি কলেজে ছিলাম। স্বপ্না রায় দিদি তখন ভিক্টোরিয়া কলেজে বাংলা বিভাগের প্রফেসর ও বিভাগীয় প্রধান। আমার মনে মনে ইচ্ছে নিজের কলেজ ও বিভাগে আসা। কিন্তু তাঁকে সরিয়ে আসার ইচ্ছে তো আমার নেই। সেই চেষ্টাও করবো না। ডিজি অফিসমুখো হলাম না। নবীনগরে অপেক্ষা করছি। কিন্তু প্রমোশনের চিঠি হাতে পেয়ে আমি ভীষণ অবাক! দিদি ভিক্টোরিয়া থেকে ইডেন কলেজে অধ্যক্ষ পদে বদলী হয়েছেন, আর তাঁর জায়গায় ভিক্টোরিয়াতে বাংলা বিভাগে আমি। পরে আমি নিশ্চিত হয়েছি, এতে দিদির ভূমিকা ছিল। ওঁর জন্যই আমার মনের আশা পূর্ণ হলো।
আজ আমার সমস্ত আন্তরিক শ্রদ্ধা অনুরাগ নিয়ে দিদির এবং নূর ম্যাডামের পরকালীন শান্তি কামনা করছি।
২৬.৮.২০২৬
অধ্যাপক ড. আনোয়ারুল হক: কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের সাবেক অধ্যাপক।