ভাস্কর মজুমদার

চাকরি, বাচ্চাদের স্কুল, সংসারের বাস্তবতা আমাদের ঢাকায় বেঁধে রেখেছে। ভাড়া বাসার চার দেয়ালই এখন ঠিকানা। তবুও নাড়ির টান বলে একটা কথা আছে। সেই টানেই সপ্তাহের শেষে, সরকারি ছুটিতে কিংবা সামান্য কোনো উপলক্ষ পেলেই আমরা ছুটে যাই কুমিল্লার দিকে।
আমাদের মতো হাজারো কুমিল্লাবাসীর কাছে কুমিল্লা শুধু একটি জেলা নয়, এটি এক ধরনের মানসিক আশ্রয়। সপ্তাহে অন্তত একদিন কুমিল্লার বাতাস গায়ে না লাগলে যেন শরীরটাই খারাপ হয়ে যায়। মনে হয় জ্বর আসছে, সর্দি লেগেছে, মনটা কেমন অস্থির। পুরাতন চৌধুরীপাড়ার রাস্তায় একটু হাঁটা না হলে, ফৌজদারী মোড়ে বসে এক কাপ চা না খেলে, তিতাস মামা, বগলু ভাই কিংবা টিটুর সঙ্গে কিছুক্ষণ গল্প না হলে সপ্তাহটাই যেন অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
কিন্তু গত কয়েক মাস ধরে কুমিল্লা ফেরার আনন্দটা ধীরে ধীরে এক ধরনের আতঙ্কে পরিণত হয়েছে। কারণ একটাই, ভয়াবহ যানজট।
ঢাকা থেকে বের হওয়ার পর মনে হয় পুরো রাস্তা জুড়েই যেন অদৃশ্য কোনো শক্তি অপেক্ষা করছে। কাঁচপুরে বøক, মদনপুরে বøক,চান্দিনায় বøক, ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় বøক। ফেরার পথেও একই গল্প, ডেমরা হয়ে স্টাফ কোয়ার্টারের রাস্তা ধরলেও মেরাদিয়ার আগে বøক। সোজা গেলে যাত্রাবাড়ি। সেখানেও জ্যাম। এক রাস্তা এড়িয়ে আরেক রাস্তা ধরলে সেখানে আরও বড় জট।
ফলে দুই ঘণ্টার পথ কখনো চার ঘণ্টা, কখনো পাঁচ ঘণ্টা, কখনো তারও বেশি সময়ের যন্ত্রণায় পরিণত হয়। সম্প্রতি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমেও কুমিল্লা অংশে দীর্ঘ যানজট, সড়ক সংস্কার, টোল প্লাজা সংকট এবং যানবাহনের অতিরিক্ত চাপকে এই দুর্ভোগের প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষ করে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট, চান্দিনা, দাউদকান্দি ও গৌরীপুর এলাকা দীর্ঘদিন ধরেই যানজটের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে।
কিন্তু শুধু রাস্তার অবকাঠামোকে দোষ দিলেই পুরো সত্য বলা হবে না। আমাদের আচরণও সমানভাবে দায়ী। ওভারটেক করার প্রতিযোগিতা, যেখানে সেখানে গাড়ি থামানো, উল্টো পথে চলা, ট্রাফিক আইনকে পরামর্শ হিসেবে দেখা, নিয়মকে দুর্বল মানুষের জন্য ভেবে নেওয়া, এসব মিলিয়ে আমরা নিজেরাই এক ধরনের বিশৃঙ্খল সংস্কৃতি তৈরি করেছি।
আজকাল রাস্তায় বের হলে মনে হয় আইন আছে, কিন্তু মানার মানুষ নেই। ট্রাফিক সিগন্যাল আছে, কিন্তু অনুসরণের বাধ্যবাধকতা নেই। ফুটপাত আছে, কিন্তু হাঁটার জায়গা নেই। বাসস্টপ আছে, কিন্তু বাস দাঁড়ায় রাস্তার মাঝখানে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই বিশৃঙ্খলাকে আমরা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নিতে শুরু করেছি। কেউ আর অবাক হয় না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা জ্যামে বসে থাকা এখন যেন জীবনের অংশ। অথচ এটি কোনো স্বাভাবিক বিষয় নয়। এটি সময়ের অপচয়, জ্বালানির অপচয়, অর্থনীতির ক্ষতি এবং মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের উপর এক নীরব আঘাত।
আমরা প্রায়ই সরকারের দিকে তাকিয়ে থাকি। প্রশাসনের দিকে তাকাই। নতুন সড়ক, নতুন ফ্লাইওভার, নতুন প্রকল্পের অপেক্ষা করি। এগুলো অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু শুধুমাত্র অবকাঠামো দিয়ে এই সমস্যার সমাধান হবে না। কারণ সমস্যার একটা বড় অংশ আমাদের মধ্যেই বাস করে।
যে দিন একজন চালক নিজে থেকে লেন মেনে চলবে, যে দিন একজন যাত্রী রাস্তার মাঝখানে গাড়ি থামাতে বলবে না, যে দিন একজন পথচারী নিজে থেকে নিয়ম মেনে রাস্তা পার হবে, সে দিন থেকেই পরিবর্তন শুরু হবে।
কুমিল্লাবাসীর মুক্তি শুধু আরেকটি সড়ক প্রকল্পে নয়, বরং শৃঙ্খলার সংস্কৃতিতে। ট্রাফিক ব্যবস্থার উন্নয়ন জরুরি, আইন প্রয়োগ জরুরি, কিন্তু সবচেয়ে বেশি জরুরি নাগরিক দায়িত্ববোধ।
আমরা সবাই কুমিল্লায় ফিরতে চাই। মা-বাবার কাছে, শৈশবের স্মৃতির কাছে, বন্ধুদের আড্ডার কাছে। কিন্তু সেই ফেরা যদি প্রতি সপ্তাহে এক যুদ্ধ হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে সেটি শুধু একটি যাতায়াত সমস্যা নয়, এটি আমাদের জীবনযাত্রার মানের সংকট।
কুমিল্লার পথে আজ যে জ্যাম, তা শুধু রাস্তায় নয়। এটি আমাদের পরিকল্পনায়, আমাদের ব্যবস্থাপনায় এবং অনেক ক্ষেত্রে আমাদের মানসিকতায়ও জমে থাকা এক দীর্ঘস্থায়ী জট। সেই জট না কাটলে নতুন রাস্তা হবে, নতুন সেতু হবে, কিন্তু স্বস্তির পথ আর খুঁজে পাওয়া যাবে না।
ভাস্কর মজুমদার: জেনারেল ম্যানেজার, মার্চেন্ডাইজিং, ব্র্যাক আড়ং ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী।

চাকরি, বাচ্চাদের স্কুল, সংসারের বাস্তবতা আমাদের ঢাকায় বেঁধে রেখেছে। ভাড়া বাসার চার দেয়ালই এখন ঠিকানা। তবুও নাড়ির টান বলে একটা কথা আছে। সেই টানেই সপ্তাহের শেষে, সরকারি ছুটিতে কিংবা সামান্য কোনো উপলক্ষ পেলেই আমরা ছুটে যাই কুমিল্লার দিকে।
আমাদের মতো হাজারো কুমিল্লাবাসীর কাছে কুমিল্লা শুধু একটি জেলা নয়, এটি এক ধরনের মানসিক আশ্রয়। সপ্তাহে অন্তত একদিন কুমিল্লার বাতাস গায়ে না লাগলে যেন শরীরটাই খারাপ হয়ে যায়। মনে হয় জ্বর আসছে, সর্দি লেগেছে, মনটা কেমন অস্থির। পুরাতন চৌধুরীপাড়ার রাস্তায় একটু হাঁটা না হলে, ফৌজদারী মোড়ে বসে এক কাপ চা না খেলে, তিতাস মামা, বগলু ভাই কিংবা টিটুর সঙ্গে কিছুক্ষণ গল্প না হলে সপ্তাহটাই যেন অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
কিন্তু গত কয়েক মাস ধরে কুমিল্লা ফেরার আনন্দটা ধীরে ধীরে এক ধরনের আতঙ্কে পরিণত হয়েছে। কারণ একটাই, ভয়াবহ যানজট।
ঢাকা থেকে বের হওয়ার পর মনে হয় পুরো রাস্তা জুড়েই যেন অদৃশ্য কোনো শক্তি অপেক্ষা করছে। কাঁচপুরে বøক, মদনপুরে বøক,চান্দিনায় বøক, ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় বøক। ফেরার পথেও একই গল্প, ডেমরা হয়ে স্টাফ কোয়ার্টারের রাস্তা ধরলেও মেরাদিয়ার আগে বøক। সোজা গেলে যাত্রাবাড়ি। সেখানেও জ্যাম। এক রাস্তা এড়িয়ে আরেক রাস্তা ধরলে সেখানে আরও বড় জট।
ফলে দুই ঘণ্টার পথ কখনো চার ঘণ্টা, কখনো পাঁচ ঘণ্টা, কখনো তারও বেশি সময়ের যন্ত্রণায় পরিণত হয়। সম্প্রতি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমেও কুমিল্লা অংশে দীর্ঘ যানজট, সড়ক সংস্কার, টোল প্লাজা সংকট এবং যানবাহনের অতিরিক্ত চাপকে এই দুর্ভোগের প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষ করে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট, চান্দিনা, দাউদকান্দি ও গৌরীপুর এলাকা দীর্ঘদিন ধরেই যানজটের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে।
কিন্তু শুধু রাস্তার অবকাঠামোকে দোষ দিলেই পুরো সত্য বলা হবে না। আমাদের আচরণও সমানভাবে দায়ী। ওভারটেক করার প্রতিযোগিতা, যেখানে সেখানে গাড়ি থামানো, উল্টো পথে চলা, ট্রাফিক আইনকে পরামর্শ হিসেবে দেখা, নিয়মকে দুর্বল মানুষের জন্য ভেবে নেওয়া, এসব মিলিয়ে আমরা নিজেরাই এক ধরনের বিশৃঙ্খল সংস্কৃতি তৈরি করেছি।
আজকাল রাস্তায় বের হলে মনে হয় আইন আছে, কিন্তু মানার মানুষ নেই। ট্রাফিক সিগন্যাল আছে, কিন্তু অনুসরণের বাধ্যবাধকতা নেই। ফুটপাত আছে, কিন্তু হাঁটার জায়গা নেই। বাসস্টপ আছে, কিন্তু বাস দাঁড়ায় রাস্তার মাঝখানে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই বিশৃঙ্খলাকে আমরা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নিতে শুরু করেছি। কেউ আর অবাক হয় না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা জ্যামে বসে থাকা এখন যেন জীবনের অংশ। অথচ এটি কোনো স্বাভাবিক বিষয় নয়। এটি সময়ের অপচয়, জ্বালানির অপচয়, অর্থনীতির ক্ষতি এবং মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের উপর এক নীরব আঘাত।
আমরা প্রায়ই সরকারের দিকে তাকিয়ে থাকি। প্রশাসনের দিকে তাকাই। নতুন সড়ক, নতুন ফ্লাইওভার, নতুন প্রকল্পের অপেক্ষা করি। এগুলো অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু শুধুমাত্র অবকাঠামো দিয়ে এই সমস্যার সমাধান হবে না। কারণ সমস্যার একটা বড় অংশ আমাদের মধ্যেই বাস করে।
যে দিন একজন চালক নিজে থেকে লেন মেনে চলবে, যে দিন একজন যাত্রী রাস্তার মাঝখানে গাড়ি থামাতে বলবে না, যে দিন একজন পথচারী নিজে থেকে নিয়ম মেনে রাস্তা পার হবে, সে দিন থেকেই পরিবর্তন শুরু হবে।
কুমিল্লাবাসীর মুক্তি শুধু আরেকটি সড়ক প্রকল্পে নয়, বরং শৃঙ্খলার সংস্কৃতিতে। ট্রাফিক ব্যবস্থার উন্নয়ন জরুরি, আইন প্রয়োগ জরুরি, কিন্তু সবচেয়ে বেশি জরুরি নাগরিক দায়িত্ববোধ।
আমরা সবাই কুমিল্লায় ফিরতে চাই। মা-বাবার কাছে, শৈশবের স্মৃতির কাছে, বন্ধুদের আড্ডার কাছে। কিন্তু সেই ফেরা যদি প্রতি সপ্তাহে এক যুদ্ধ হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে সেটি শুধু একটি যাতায়াত সমস্যা নয়, এটি আমাদের জীবনযাত্রার মানের সংকট।
কুমিল্লার পথে আজ যে জ্যাম, তা শুধু রাস্তায় নয়। এটি আমাদের পরিকল্পনায়, আমাদের ব্যবস্থাপনায় এবং অনেক ক্ষেত্রে আমাদের মানসিকতায়ও জমে থাকা এক দীর্ঘস্থায়ী জট। সেই জট না কাটলে নতুন রাস্তা হবে, নতুন সেতু হবে, কিন্তু স্বস্তির পথ আর খুঁজে পাওয়া যাবে না।
ভাস্কর মজুমদার: জেনারেল ম্যানেজার, মার্চেন্ডাইজিং, ব্র্যাক আড়ং ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী।