• কুমিল্লা সিটি করপোরেশন
  • কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়
  • আদর্শ সদর
  • বরুড়া
  • লাকসাম
  • দাউদকান্দি
  • আরও
    • চৌদ্দগ্রাম
    • সদর দক্ষিণ
    • নাঙ্গলকোট
    • বুড়িচং
    • ব্রাহ্মণপাড়া
    • মনোহরগঞ্জ
    • লালমাই
    • চান্দিনা
    • মুরাদনগর
    • দেবীদ্বার
    • হোমনা
    • মেঘনা
    • তিতাস
  • সর্বশেষ
  • রাজনীতি
  • বাংলাদেশ
  • অপরাধ
  • বিশ্ব
  • বাণিজ্য
  • মতামত
  • খেলা
  • বিনোদন
  • চাকরি
  • জীবনযাপন
  • ইপেপার
  • ইপেপার
facebooktwittertiktokpinterestyoutubelinkedininstagramgoogle
স্বত্ব: ©️ আমার শহর

সম্পাদক ও প্রকাশক : মো. গাজীউল হক ভূঁইয়া ( সোহাগ)।

নাহার প্লাজা, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা-৩৫০০

ই-মেইল: [email protected]

ফোন: 01716197760

> মতামত

সৌরভের সুবচন

জাতি গঠনে শিক্ষক: সংকট, সম্ভাবনা ও করণীয়

মো.আবু ছালেক সেলিম রেজা সৌরভ
প্রকাশ : ০৩ জুন ২০২৬, ১১: ১৯
logo

জাতি গঠনে শিক্ষক: সংকট, সম্ভাবনা ও করণীয়

মো.আবু ছালেক সেলিম রেজা সৌরভ

প্রকাশ : ০৩ জুন ২০২৬, ১১: ১৯
Photo

একটি স্বাধীন, সার্বভৌম ও স্বনির্ভর রাষ্ট্র হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর মূল চালিকাশক্তি হলো তার নাগরিক সমাজ। দক্ষ, সৎ ও দেশপ্রেমিক নাগরিক ছাড়া কোনো দেশের পক্ষেই টেকসই উন্নয়ন বা সমৃদ্ধি অর্জন করা সম্ভব নয়। আর এই কাঙ্ক্ষিত নাগরিক তৈরির কারিগর হলেন শিক্ষক। রাষ্ট্র ও সমাজের মেরুদণ্ড গড়ে তোলার দায়িত্ব যাদের কাঁধে, তারা যদি অবহেলা, অপদস্থতা আর বঞ্চনার শিকার হন, তবে সেই জাতির ভবিষ্যৎ অন্ধকারের দিকে ধাবিত হতে বাধ্য। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে শিক্ষা ক্ষেত্রে এবং শিক্ষকদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক মর্যাদার যে চিত্র ফুটে উঠেছে, তা গভীর উদ্বেগের জন্ম দেয়। একটি সুখী, সমৃদ্ধশালী ও উন্নত বাংলাদেশ বিনির্মাণের দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে যদি আমরা এগিয়ে যেতে চাই, তবে শিক্ষকতা পেশার আমূল সংস্কার এবং শিক্ষকদের যথাযথ সম্মান ফিরিয়ে দেওয়ার কোনো বিকল্প নেই।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের ওপর শারীরিক ও মানসিকভাবে লাঞ্ছিত করার ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। গণমাধ্যম ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিককালে দেশের বিভিন্ন স্তরে প্রায় তিন হাজার শিক্ষক নানাভাবে হেনস্তা, মারধর ও সামাজিকভাবে অপদস্থ হয়েছেন। কোথাও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে, কোথাও পরিচালনা পর্ষদের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে, আবার কোথাও খোদ শিক্ষার্থীদের একাংশের উগ্র আচরণের শিকার হতে হয়েছে শিক্ষকদের।

একটি সমাজের নৈতিক অবক্ষয় কতটা চরম পর্যায়ে পৌঁছালে শিক্ষকের গলায় জুতার মালা পরানো বা প্রকাশ্য দিবালোকে শিক্ষককে পিটিয়ে হত্যা করার মতো ঘটনা ঘটতে পারে, তা ভাববার সময় এসেছে। শিক্ষক লাঞ্ছনার এই সংস্কৃতি কেবল একজন ব্যক্তির ওপর আঘাত নয়, বরং এটি পুরো শিক্ষাব্যবস্থা ও সামাজিক মূল্যবোধের ওপর এক চরম চপেটাঘাত। এর ফলে শিক্ষকদের মনের মধ্যে এক ধরনের গভীর নিরাপত্তাহীনতা ও ভীতি তৈরি হচ্ছে, যা তাদের পাঠদানের স্বাভাবিক পরিবেশ ও মানসিকতাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে।

শিক্ষকদের এই সামাজিক নিরাপত্তাহীনতার পাশাপাশি আরেকটি বড় সংকট হলো তাদের অর্থনৈতিক দৈন্যদশা। বাংলাদেশে প্রাথমিক থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষা স্তর পর্যন্ত শিক্ষকদের বেতন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল। বিশেষ করে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের (এমপিওভুক্ত ও নন-এমপিও) শিক্ষকদের জীবনযাত্রার মান অত্যন্ত করুণ।

বর্তমান বাজারদরের ঊর্ধ্বগতির এই সময়ে সামান্য বেতনে একজন শিক্ষকের পক্ষে সপরিবারে সম্মানজনকভাবে জীবন ধারণ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। অনেক শিক্ষক বাধ্য হয়ে পরিবারের চিকিৎসাসেবা বা সন্তানের শিক্ষার খরচ মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন। অর্থনৈতিক এই টানাপোড়েন শিক্ষকদের সমাজে মাথা উঁচু করে বাঁচার আত্মবিশ্বাস কেড়ে নেয়। যখন একজন শিক্ষককে তার মৌলিক চাহিদা মেটানোর জন্য প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করতে হয়, তখন তার পক্ষে শতভাগ মনোযোগ ও আন্তরিকতা নিয়ে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করা কঠিন হয়ে পড়ে।

একটি দেশের শিক্ষাব্যবস্থার মান কেমন হবে, তা নির্ভর করে কারা শিক্ষকতা পেশায় আসছেন তার ওপর। উন্নত দেশগুলোতে সবচেয়ে মেধাবী ও মানবিক গুণসম্পন্ন ব্যক্তিরা শিক্ষকতা পেশাকে বেছে নেন। কারণ সেখানে এই পেশাকে সর্বোচ্চ সামাজিক মর্যাদা ও চমৎকার অর্থনৈতিক নিরাপত্তা দেওয়া হয়।

বিপরীতপক্ষে, বাংলাদেশে সামাজিক মর্যাদার অভাব এবং কম বেতনের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ মেধাবীরা সাধারণত শিক্ষকতা পেশায়, বিশেষ করে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে আসতে চান না। এই পেশাটি এখন অনেকের কাছেই ‘শেষ আশ্রয়স্থল’ বা অন্য কোনো ভালো চাকরি না পাওয়ার বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হয়। আত্মনিবেদিত, সৎ, মেধাবী ও পরিশ্রমী মানুষদের যদি শিক্ষকতায় আগ্রহী করা না যায়, তবে শিক্ষার গুণগত মান কোনোদিনই আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পৌঁছাবে না। উন্নত বাংলাদেশ গড়ার যে স্বপ্ন আমরা দেখছি, তা কেবল অবকাঠামোগত উন্নয়ন দিয়ে সম্ভব নয়; তার জন্য মানবসম্পদ উন্নয়ন প্রয়োজন, যা মেধাবী শিক্ষকদের ছাড়া অসম্ভব।

শিক্ষকতা পেশাকে আকর্ষণীয় এবং মর্যাদাপূর্ণ করতে হলে রাষ্ট্রকে সুনির্দিষ্ট ও দীর্ঘমেয়াদি কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে-

স্বাধীন শিক্ষা কমিশন গঠন: শিক্ষকদের নিয়োগ, পদোন্নতি ও বদলি প্রক্রিয়াকে শতভাগ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করতে একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী শিক্ষা কমিশন গঠন করা প্রয়োজন। মেধার ভিত্তিতে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় শিক্ষক নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।

আকর্ষণীয় বেতন স্কেল: শিক্ষকদের জন্য একটি পৃথক ও সম্মানজনক বেতন স্কেল ঘোষণা করা সময়ের দাবি। প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত প্রতিটি স্তরের শিক্ষকদের জীবনযাত্রার ব্যয় নির্বাহের জন্য পর্যাপ্ত বেতন ও অন্যান্য সামাজিক সুবিধা (যেমন: স্বাস্থ্য বীমা, আবাসন সুবিধা ইত্যাদি) নিশ্চিত করতে হবে।

নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ: কর্মক্ষেত্রে শিক্ষকদের শতভাগ নিরাপত্তা দিতে হবে। শিক্ষকদের ওপর যেকোনো ধরনের হামলা বা লাঞ্ছনার ঘটনায় দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে কেউ শিক্ষকদের গায়ে হাত তোলার সাহস না পায়।

সামাজিক মর্যাদা পুনরুদ্ধার: রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান ও নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে শিক্ষকদের অংশগ্রহণ ও মূল্যায়ন বাড়াতে হবে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করে সমাজ ও রাষ্ট্রে শিক্ষকের আসনটি সবার ওপরে স্থাপন করতে হবে।

অধিকার ও মর্যাদার দাবির পাশাপাশি শিক্ষকদেরও নিজেদের আত্মজিজ্ঞাসা ও আত্মশুদ্ধির প্রয়োজন রয়েছে। শিক্ষকতা কেবল একটি চাকরি বা জীবিকা নির্বাহের মাধ্যম নয়; এটি একটি ব্রত। সাম্প্রতিককালে শিক্ষকদের একটি অংশের আচরণ ও কর্মকাণ্ডও এই পবিত্র পেশার মর্যাদাকে ক্ষুণ্ন করেছে।

অনেক শিক্ষকের বিরুদ্ধে শ্রেণিকক্ষে ঠিকমতো না পড়িয়ে কোচিং সেন্টার বা প্রাইভেট টিউশনিতে মগ্ন থাকার অভিযোগ রয়েছে। এই শিক্ষা বাণিজ্য বন্ধ করতে হবে। শিক্ষাকে পণ্য বানানোর মানসিকতা থেকে শিক্ষকদের বের হয়ে আসতে হবে।

দলীয় রাজনীতির অন্ধ অনুসারী হয়ে শিক্ষকেরা যখন নিজেদের আদর্শ চ্যুত করেন, তখন তারা শিক্ষার্থীদের শ্রদ্ধা হারান। শিক্ষকদের প্রধান পরিচয় হবে তারা জ্ঞানপিপাসু ও নিরপেক্ষ। লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতি ও দলাদলি পরিহার করে নিজেদের জ্ঞানচর্চায় নিয়োজিত রাখতে হবে।

কর্মক্ষেত্রে ফাঁকিবাজি, দেরিতে আসা বা গবেষণায় অনীহা দূর করতে হবে। শিক্ষকদের প্রতিনিয়ত নিজেদের দক্ষতা ও জ্ঞানকে হালনাগাদ করতে হবে, যাতে তারা আধুনিক বিশ্বের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত করতে পারেন।

শিক্ষার আসল উদ্দেশ্য কেবল জিপিএ-৫ (GPA-5) বা ভালো ফলাফল নিশ্চিত করা নয়। বর্তমান যুগের সবচেয়ে বড় সংকট হলো মেধার প্রাচুর্য থাকলেও নৈতিকতার চরম অভাব। একজন শিক্ষার্থী প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় অনেক শিক্ষিত হতে পারে, কিন্তু সে যদি দুর্নীতিগ্রস্ত, অহংকারী ও মানবিকতাবর্জিত হয়, তবে সেই শিক্ষা দেশের কোনো কাজে আসে না।

শিক্ষকদের মূল কাজ হবে ভালো ছাত্র তৈরির পাশাপাশি একজন ভালো ও সংবেদনশীল মানুষ তৈরি করা। শ্রেণিকক্ষে পাঠ্যপুস্তকের পাশাপাশি সততা, পরমতসহিষ্ণুতা, দেশপ্রেম, নারীর প্রতি শ্রদ্ধা এবং মানবিক মূল্যবোধের শিক্ষা দিতে হবে। শিক্ষকের নিজের জীবন ও আচরণ হবে শিক্ষার্থীদের জন্য সবচেয়ে বড় রোল মডেল। একজন আদর্শ শিক্ষকের ব্যক্তিত্ব দেখেই যেন শিক্ষার্থীরা সততা ও পরিচ্ছন্ন জীবনের অনুপ্রেরণা পায়, সেই পরিবেশ তৈরি করতে হবে।

বাংলাদেশ আজ এক ঐতিহাসিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আমরা যদি সত্যিই একটি বৈষম্যহীন, সুখী, সমৃদ্ধ ও উন্নত বাংলাদেশ গড়তে চাই, তবে আমাদের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ হতে হবে শিক্ষা খাতে। আর সেই বিনিয়োগের মূল কেন্দ্রবিন্দু হতে হবে শিক্ষক। শিক্ষকদের অবহেলা করে, তাদের অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু রেখে এবং সামাজিকভাবে লাঞ্ছিত করে কোনো জাতি কোনোদিন বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারেনি।

তাই এখনই সময় শিক্ষকদের হারানো সম্মান ও মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়ার। তাদের জন্য একটি নিরাপদ, স্বাধীন ও অর্থনৈতিকভাবে স্বস্তিদায়ক পরিবেশ তৈরি করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। একই সাথে শিক্ষকদেরও নিজেদের পবিত্র দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হয়ে, সব ধরনের লোভ-লালসা ও দলাদলির ঊর্ধ্বে উঠে জাতি গঠনে আত্মনিয়োগ করতে হবে। রাষ্ট্র, সমাজ ও শিক্ষকের এই সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিকে প্রকৃত অর্থেই একটি আলোকিত, উন্নত ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্রে রূপান্তর করতে।

মো. আবু ছালেক সেলিম রেজা সৌরভ: অধ্যক্ষ, সোনার বাংলা কলেজ ও সাবেক সিনেটে সদস্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।

Thumbnail image

একটি স্বাধীন, সার্বভৌম ও স্বনির্ভর রাষ্ট্র হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর মূল চালিকাশক্তি হলো তার নাগরিক সমাজ। দক্ষ, সৎ ও দেশপ্রেমিক নাগরিক ছাড়া কোনো দেশের পক্ষেই টেকসই উন্নয়ন বা সমৃদ্ধি অর্জন করা সম্ভব নয়। আর এই কাঙ্ক্ষিত নাগরিক তৈরির কারিগর হলেন শিক্ষক। রাষ্ট্র ও সমাজের মেরুদণ্ড গড়ে তোলার দায়িত্ব যাদের কাঁধে, তারা যদি অবহেলা, অপদস্থতা আর বঞ্চনার শিকার হন, তবে সেই জাতির ভবিষ্যৎ অন্ধকারের দিকে ধাবিত হতে বাধ্য। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে শিক্ষা ক্ষেত্রে এবং শিক্ষকদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক মর্যাদার যে চিত্র ফুটে উঠেছে, তা গভীর উদ্বেগের জন্ম দেয়। একটি সুখী, সমৃদ্ধশালী ও উন্নত বাংলাদেশ বিনির্মাণের দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে যদি আমরা এগিয়ে যেতে চাই, তবে শিক্ষকতা পেশার আমূল সংস্কার এবং শিক্ষকদের যথাযথ সম্মান ফিরিয়ে দেওয়ার কোনো বিকল্প নেই।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের ওপর শারীরিক ও মানসিকভাবে লাঞ্ছিত করার ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। গণমাধ্যম ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিককালে দেশের বিভিন্ন স্তরে প্রায় তিন হাজার শিক্ষক নানাভাবে হেনস্তা, মারধর ও সামাজিকভাবে অপদস্থ হয়েছেন। কোথাও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে, কোথাও পরিচালনা পর্ষদের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে, আবার কোথাও খোদ শিক্ষার্থীদের একাংশের উগ্র আচরণের শিকার হতে হয়েছে শিক্ষকদের।

একটি সমাজের নৈতিক অবক্ষয় কতটা চরম পর্যায়ে পৌঁছালে শিক্ষকের গলায় জুতার মালা পরানো বা প্রকাশ্য দিবালোকে শিক্ষককে পিটিয়ে হত্যা করার মতো ঘটনা ঘটতে পারে, তা ভাববার সময় এসেছে। শিক্ষক লাঞ্ছনার এই সংস্কৃতি কেবল একজন ব্যক্তির ওপর আঘাত নয়, বরং এটি পুরো শিক্ষাব্যবস্থা ও সামাজিক মূল্যবোধের ওপর এক চরম চপেটাঘাত। এর ফলে শিক্ষকদের মনের মধ্যে এক ধরনের গভীর নিরাপত্তাহীনতা ও ভীতি তৈরি হচ্ছে, যা তাদের পাঠদানের স্বাভাবিক পরিবেশ ও মানসিকতাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে।

শিক্ষকদের এই সামাজিক নিরাপত্তাহীনতার পাশাপাশি আরেকটি বড় সংকট হলো তাদের অর্থনৈতিক দৈন্যদশা। বাংলাদেশে প্রাথমিক থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষা স্তর পর্যন্ত শিক্ষকদের বেতন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল। বিশেষ করে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের (এমপিওভুক্ত ও নন-এমপিও) শিক্ষকদের জীবনযাত্রার মান অত্যন্ত করুণ।

বর্তমান বাজারদরের ঊর্ধ্বগতির এই সময়ে সামান্য বেতনে একজন শিক্ষকের পক্ষে সপরিবারে সম্মানজনকভাবে জীবন ধারণ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। অনেক শিক্ষক বাধ্য হয়ে পরিবারের চিকিৎসাসেবা বা সন্তানের শিক্ষার খরচ মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন। অর্থনৈতিক এই টানাপোড়েন শিক্ষকদের সমাজে মাথা উঁচু করে বাঁচার আত্মবিশ্বাস কেড়ে নেয়। যখন একজন শিক্ষককে তার মৌলিক চাহিদা মেটানোর জন্য প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করতে হয়, তখন তার পক্ষে শতভাগ মনোযোগ ও আন্তরিকতা নিয়ে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করা কঠিন হয়ে পড়ে।

একটি দেশের শিক্ষাব্যবস্থার মান কেমন হবে, তা নির্ভর করে কারা শিক্ষকতা পেশায় আসছেন তার ওপর। উন্নত দেশগুলোতে সবচেয়ে মেধাবী ও মানবিক গুণসম্পন্ন ব্যক্তিরা শিক্ষকতা পেশাকে বেছে নেন। কারণ সেখানে এই পেশাকে সর্বোচ্চ সামাজিক মর্যাদা ও চমৎকার অর্থনৈতিক নিরাপত্তা দেওয়া হয়।

বিপরীতপক্ষে, বাংলাদেশে সামাজিক মর্যাদার অভাব এবং কম বেতনের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ মেধাবীরা সাধারণত শিক্ষকতা পেশায়, বিশেষ করে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে আসতে চান না। এই পেশাটি এখন অনেকের কাছেই ‘শেষ আশ্রয়স্থল’ বা অন্য কোনো ভালো চাকরি না পাওয়ার বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হয়। আত্মনিবেদিত, সৎ, মেধাবী ও পরিশ্রমী মানুষদের যদি শিক্ষকতায় আগ্রহী করা না যায়, তবে শিক্ষার গুণগত মান কোনোদিনই আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পৌঁছাবে না। উন্নত বাংলাদেশ গড়ার যে স্বপ্ন আমরা দেখছি, তা কেবল অবকাঠামোগত উন্নয়ন দিয়ে সম্ভব নয়; তার জন্য মানবসম্পদ উন্নয়ন প্রয়োজন, যা মেধাবী শিক্ষকদের ছাড়া অসম্ভব।

শিক্ষকতা পেশাকে আকর্ষণীয় এবং মর্যাদাপূর্ণ করতে হলে রাষ্ট্রকে সুনির্দিষ্ট ও দীর্ঘমেয়াদি কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে-

স্বাধীন শিক্ষা কমিশন গঠন: শিক্ষকদের নিয়োগ, পদোন্নতি ও বদলি প্রক্রিয়াকে শতভাগ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করতে একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী শিক্ষা কমিশন গঠন করা প্রয়োজন। মেধার ভিত্তিতে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় শিক্ষক নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।

আকর্ষণীয় বেতন স্কেল: শিক্ষকদের জন্য একটি পৃথক ও সম্মানজনক বেতন স্কেল ঘোষণা করা সময়ের দাবি। প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত প্রতিটি স্তরের শিক্ষকদের জীবনযাত্রার ব্যয় নির্বাহের জন্য পর্যাপ্ত বেতন ও অন্যান্য সামাজিক সুবিধা (যেমন: স্বাস্থ্য বীমা, আবাসন সুবিধা ইত্যাদি) নিশ্চিত করতে হবে।

নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ: কর্মক্ষেত্রে শিক্ষকদের শতভাগ নিরাপত্তা দিতে হবে। শিক্ষকদের ওপর যেকোনো ধরনের হামলা বা লাঞ্ছনার ঘটনায় দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে কেউ শিক্ষকদের গায়ে হাত তোলার সাহস না পায়।

সামাজিক মর্যাদা পুনরুদ্ধার: রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান ও নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে শিক্ষকদের অংশগ্রহণ ও মূল্যায়ন বাড়াতে হবে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করে সমাজ ও রাষ্ট্রে শিক্ষকের আসনটি সবার ওপরে স্থাপন করতে হবে।

অধিকার ও মর্যাদার দাবির পাশাপাশি শিক্ষকদেরও নিজেদের আত্মজিজ্ঞাসা ও আত্মশুদ্ধির প্রয়োজন রয়েছে। শিক্ষকতা কেবল একটি চাকরি বা জীবিকা নির্বাহের মাধ্যম নয়; এটি একটি ব্রত। সাম্প্রতিককালে শিক্ষকদের একটি অংশের আচরণ ও কর্মকাণ্ডও এই পবিত্র পেশার মর্যাদাকে ক্ষুণ্ন করেছে।

অনেক শিক্ষকের বিরুদ্ধে শ্রেণিকক্ষে ঠিকমতো না পড়িয়ে কোচিং সেন্টার বা প্রাইভেট টিউশনিতে মগ্ন থাকার অভিযোগ রয়েছে। এই শিক্ষা বাণিজ্য বন্ধ করতে হবে। শিক্ষাকে পণ্য বানানোর মানসিকতা থেকে শিক্ষকদের বের হয়ে আসতে হবে।

দলীয় রাজনীতির অন্ধ অনুসারী হয়ে শিক্ষকেরা যখন নিজেদের আদর্শ চ্যুত করেন, তখন তারা শিক্ষার্থীদের শ্রদ্ধা হারান। শিক্ষকদের প্রধান পরিচয় হবে তারা জ্ঞানপিপাসু ও নিরপেক্ষ। লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতি ও দলাদলি পরিহার করে নিজেদের জ্ঞানচর্চায় নিয়োজিত রাখতে হবে।

কর্মক্ষেত্রে ফাঁকিবাজি, দেরিতে আসা বা গবেষণায় অনীহা দূর করতে হবে। শিক্ষকদের প্রতিনিয়ত নিজেদের দক্ষতা ও জ্ঞানকে হালনাগাদ করতে হবে, যাতে তারা আধুনিক বিশ্বের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত করতে পারেন।

শিক্ষার আসল উদ্দেশ্য কেবল জিপিএ-৫ (GPA-5) বা ভালো ফলাফল নিশ্চিত করা নয়। বর্তমান যুগের সবচেয়ে বড় সংকট হলো মেধার প্রাচুর্য থাকলেও নৈতিকতার চরম অভাব। একজন শিক্ষার্থী প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় অনেক শিক্ষিত হতে পারে, কিন্তু সে যদি দুর্নীতিগ্রস্ত, অহংকারী ও মানবিকতাবর্জিত হয়, তবে সেই শিক্ষা দেশের কোনো কাজে আসে না।

শিক্ষকদের মূল কাজ হবে ভালো ছাত্র তৈরির পাশাপাশি একজন ভালো ও সংবেদনশীল মানুষ তৈরি করা। শ্রেণিকক্ষে পাঠ্যপুস্তকের পাশাপাশি সততা, পরমতসহিষ্ণুতা, দেশপ্রেম, নারীর প্রতি শ্রদ্ধা এবং মানবিক মূল্যবোধের শিক্ষা দিতে হবে। শিক্ষকের নিজের জীবন ও আচরণ হবে শিক্ষার্থীদের জন্য সবচেয়ে বড় রোল মডেল। একজন আদর্শ শিক্ষকের ব্যক্তিত্ব দেখেই যেন শিক্ষার্থীরা সততা ও পরিচ্ছন্ন জীবনের অনুপ্রেরণা পায়, সেই পরিবেশ তৈরি করতে হবে।

বাংলাদেশ আজ এক ঐতিহাসিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আমরা যদি সত্যিই একটি বৈষম্যহীন, সুখী, সমৃদ্ধ ও উন্নত বাংলাদেশ গড়তে চাই, তবে আমাদের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ হতে হবে শিক্ষা খাতে। আর সেই বিনিয়োগের মূল কেন্দ্রবিন্দু হতে হবে শিক্ষক। শিক্ষকদের অবহেলা করে, তাদের অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু রেখে এবং সামাজিকভাবে লাঞ্ছিত করে কোনো জাতি কোনোদিন বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারেনি।

তাই এখনই সময় শিক্ষকদের হারানো সম্মান ও মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়ার। তাদের জন্য একটি নিরাপদ, স্বাধীন ও অর্থনৈতিকভাবে স্বস্তিদায়ক পরিবেশ তৈরি করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। একই সাথে শিক্ষকদেরও নিজেদের পবিত্র দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হয়ে, সব ধরনের লোভ-লালসা ও দলাদলির ঊর্ধ্বে উঠে জাতি গঠনে আত্মনিয়োগ করতে হবে। রাষ্ট্র, সমাজ ও শিক্ষকের এই সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিকে প্রকৃত অর্থেই একটি আলোকিত, উন্নত ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্রে রূপান্তর করতে।

মো. আবু ছালেক সেলিম রেজা সৌরভ: অধ্যক্ষ, সোনার বাংলা কলেজ ও সাবেক সিনেটে সদস্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।

বিষয়:

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

১

আম্রকুঞ্জে মঞ্জরী আজি

২

জাতি গঠনে শিক্ষক: সংকট, সম্ভাবনা ও করণীয়

৩

আধুনিক বাংলাদেশের সাহসী নির্মাতা

৪

ঈদে বুঝে শুনে খান

৫

'জেগে উঠো মানুষ ফিরে আসুক মানবিকতা'

সম্পর্কিত

আম্রকুঞ্জে মঞ্জরী আজি

আম্রকুঞ্জে মঞ্জরী আজি

৪ ঘণ্টা আগে
আধুনিক বাংলাদেশের সাহসী নির্মাতা

আধুনিক বাংলাদেশের সাহসী নির্মাতা

৫ দিন আগে
ঈদে বুঝে শুনে খান

ঈদে বুঝে শুনে খান

৮ দিন আগে
'জেগে উঠো মানুষ
ফিরে আসুক মানবিকতা'

'জেগে উঠো মানুষ ফিরে আসুক মানবিকতা'

৮ দিন আগে