• কুমিল্লা সিটি করপোরেশন
  • কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়
  • আদর্শ সদর
  • বরুড়া
  • লাকসাম
  • দাউদকান্দি
  • আরও
    • চৌদ্দগ্রাম
    • সদর দক্ষিণ
    • নাঙ্গলকোট
    • বুড়িচং
    • ব্রাহ্মণপাড়া
    • মনোহরগঞ্জ
    • লালমাই
    • চান্দিনা
    • মুরাদনগর
    • দেবীদ্বার
    • হোমনা
    • মেঘনা
    • তিতাস
  • সর্বশেষ
  • রাজনীতি
  • বাংলাদেশ
  • অপরাধ
  • বিশ্ব
  • বাণিজ্য
  • মতামত
  • খেলা
  • বিনোদন
  • চাকরি
  • জীবনযাপন
  • ইপেপার
  • ইপেপার
facebooktwittertiktokpinterestyoutubelinkedininstagramgoogle
স্বত্ব: ©️ আমার শহর

সম্পাদক ও প্রকাশক : মো. গাজীউল হক ভূঁইয়া ( সোহাগ)।

নাহার প্লাজা, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা-৩৫০০

ই-মেইল: [email protected]

ফোন: 01716197760

> মতামত

আম্রকুঞ্জে মঞ্জরী আজি

সফিকুল বোরহান
প্রকাশ : ০৩ জুন ২০২৬, ১৯: ৪৭
logo

আম্রকুঞ্জে মঞ্জরী আজি

সফিকুল বোরহান

প্রকাশ : ০৩ জুন ২০২৬, ১৯: ৪৭
Photo

মধুময় চক্রে জ্যৈষ্ঠ এক অনন্য অধ্যায়। আমের মিষ্টি সুবাস, কাঁঠালের সোনালি কোয়া, লিচুর রসালো স্বাদ, জামের বেগুনি আভা- সব মিলিয়ে জ্যৈষ্ঠ প্রকৃতি, সংস্কৃতি ও সমৃদ্ধ জীবনের প্রতীক। এই চিরায়ত ফলগুলো শুধু জিহŸার স্বাদই বাড়ায় না, বরং বাঙালির ঐতিহ্য, স্মৃতি ও আবেগকেও ধারণ করে।

মৌসুমি ফল উৎপাদনের একটি বড় অংশ জ্যৈষ্ঠকে কেন্দ্র করে। শুধু খাদ্য নয়, এটি বাংলার লোকজ ঐতিহ্যেরও অংশ। গ্রামবাংলায় আম-কাঁঠালের ছায়াঘেরা উঠান, লিচুর গন্ধমাখা বিকেল, কিংবা শিশুদের গাছে উঠে জাম পাড়ার দৃশ্য জ্যৈষ্ঠ মাসের চিরন্তন ছবি। মধুমাসের আগমন মানেই প্রকৃতির উদার দান এবং মাসনমননে অমলিন হাসি।

মধুমাসের নানা রকম সুস্বাদু, রসালো ও পুষ্টিকর ফলগুলো সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও গ্রামীণ জীবনের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত। ফলের রাজা আম মিষ্টি, সুগন্ধি, ভিটামিন এ ও সি সমৃদ্ধ। অসংখ্য জাতের মধ্যে ল্যাংড়া, হিমসাগর, আম্রপালি, ফজলি, গোপালভোগ ইত্যাদি। অতিথি আপ্যায়ন, পারিবারিক মিলনমেলা এবং নানা উৎসবে আম অপরিহার্য। আম ঋতুচক্র, গ্রামীণ জীবন, প্রেম, স্মৃতি, শৈশব এবং বাংলার প্রকৃতির এক অনন্য প্রতীক। মুকুলের গন্ধ থেকে পাকা আমের মাধুর্য- কবিতা, গান, গল্প ও উপন্যাসে বারবার ফিরে এসেছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বহু কবিতা ও গানে আম্রকুঞ্জ, আম্রমুকুল ও আমবনের উল্লেখ রয়েছে। তাঁর বিখ্যাত গানÑ

‘আম্রকুঞ্জে মঞ্জরী আজি

গন্ধে ভরিল বায়ু...।’ এখানে আমের মুকুল বসন্ত ও নবজাগরণের প্রতীক। রবীন্দ্রনাথের কাছে আমগাছ কেবল ফলদ বৃক্ষ নয়, বরং প্রকৃতির সৌন্দর্য ও জীবনের পুনর্জাগরণের চিহ্ন। কাজী নজরুল ইসলাম-এর প্রকৃতিবিষয়ক রচনায় আম্রকানন, কোকিলের ডাক ও মুকুলিত আমগাছ বারবার এসেছে। আমের বাগান তাঁর কবিতায় প্রেম, উচ্ছ¡াস এবং যৌবনের আবহ তৈরি করে।

জসীমউদ্দীনের পল্লিজীবন রচনায় গ্রামের উঠোন, আমগাছের ছায়া, শিশুদের আম কুড়ানো, কাঁচা আমের আচার- এসব তাঁর কাব্যজগতের স্বাভাবিক উপাদান। বিভ‚তিভ‚ষণের স্মৃতিময় আমগাছ প্রকৃতির এক জীবন্ত চরিত্র। পথের পাঁচালী-তে গ্রামীণ বাংলার যে চিত্র ফুটে উঠেছে, সেখানে আমবাগান, ফল কুড়ানো এবং গাছপালার সঙ্গে শিশুদের সম্পর্ক বিশেষভাবে লক্ষণীয়। আম এখানে শৈশবের আনন্দ ও প্রকৃতির অফুরন্ত দানের প্রতীক।

লোকসাহিত্যে আম নিয়ে কিছু প্রবাদ, ‘আমের আম, আঁটিরও দাম।’ ‘গাছে কাঁঠাল, গোঁফে তেল’ যদিও কাঁঠালের কথায় আছে, অনেক অঞ্চলে এর সঙ্গে আমের উদাহরণও যুক্ত হয়। ‘আম খাও, গাছ গুনো না।’ এসব প্রবাদে আম কখনও লাভের প্রতীক, কখনও বাস্তব বুদ্ধির, কখনও জীবনের সরল আনন্দের রূপক।

আম ও বাঙালির নস্টালজিয়া- গ্রীষ্মের দুপুরে কাঁচা আম পাড়া, ঝড়ের পর আম কুড়ানো, আমচুরি, দাদির বানানো আমের আচার, কিংবা উঠোনের পুরোনো আমগাছ- এসব দৃশ্য বাঙালির সাহিত্যিক কল্পনায় এক বিশেষ আবেগ সৃষ্টি করেছে। অনেক গল্প ও স্মৃতিকথায় আমগাছকে পরিবারের প্রবীণ সদস্যের মতো দেখানো হয়েছে- যে প্রজন্মের পর প্রজন্মকে ছায়া, ফল ও স্মৃতি দিয়ে যায়।

আম কখনও প্রেমের, কখনও প্রকৃতির, কখনও শৈশবের, কখনও গ্রামীণ জীবনের রূপক হয়ে উঠেছে। রবীন্দ্রনাথের আম্রমুকুল, নজরুলের আম্রকানন, জসীমউদ্দীনের পল্লিজীবন এবং বিভ‚তিভ‚ষণের প্রকৃতিচিত্র- সব মিলিয়ে আম বাংলা সাহিত্যকে দিয়েছে একটি স্বতন্ত্র গন্ধ, যা ঠিক পাকা আমের সুবাসের মতোই চিরপরিচিত এবং চিরমধুর।

কাঁঠাল বিশেষ আলোচিত ফলের একটি। আকারে বড় এবং সুগন্ধযুক্ত। কোয়া মিষ্টি ও রসালো। কাঁচা অবস্থায় সবজি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সাহিত্যে কাঁঠাল কেবল একটি ফল নয়; এটি গ্রামীণ জীবনের প্রাচুর্য, পারিবারিক অর্থনীতি, প্রকৃতির উদারতা এবং বাঙালির লোকজ সংস্কৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। জাতীয় ফল হিসেবে কাঁঠালের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব যেমন গভীর, তেমনি সাহিত্যে এর উপস্থিতিও অর্থবহ।

জসীমউদ্দীন-এর কাব্যজগতে কাঁঠাল একটি পরিচিত অনুষঙ্গ। কাঁঠালগাছ গ্রামের উঠোনে দাঁড়িয়ে থাকা এক নীরব অভিভাবকের মতো। তার ছায়ায় বসে গল্প হয়, শিশুরা খেলে, আর ফল ধরলে গোটা পরিবার আনন্দে মেতে ওঠে।

বিভ‚তিভ‚ষণ বন্দ্যোপাধ্যায়-এর পথের পাঁচালী এবং তাঁর অন্যান্য রচনায় কাঁঠালগাছও গ্রামীণ জীবনের স্বাভাবিক উপাদান হিসেবে উপস্থিত। কাঁঠালের গন্ধ, পাকাধরা ফল, কিংবা ঝড়ের পরে পড়ে থাকা কাঁঠাল- এসব দৃশ্য তাঁর প্রকৃতিচিত্রকে আরও বাস্তব ও জীবন্ত করে তোলে।

রবীন্দ্রনাথের কাছে গ্রামের উঠোনে দাঁড়ানো ফলভরা গাছ ছিল আত্মনির্ভরতা ও প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের প্রতীক। লোকসাহিত্য ও প্রবাদে- ‘গাছে কাঁঠাল, গোঁফে তেল।’ এই প্রবাদের অর্থ- কোনো কাজ সম্পন্ন হওয়ার আগেই তার ফল ভোগের আশা করা। ‘কাঁঠালের আমসত্ত¡ হয় না।’ অর্থাৎ, প্রত্যেক বস্তুর নিজস্ব স্বভাব ও সীমাবদ্ধতা আছে; সবকিছু দিয়ে সব কাজ হয় না। বাস্তবধর্মী ধারায় কাঁঠাল দরিদ্র গ্রামীণ পরিবারের খাদ্যনিরাপত্তার প্রতীক। একটি বড় কাঁঠাল বহু মানুষের খাবারের জোগান দিতে পারে। পাকা কাঁঠালের কোয়া যেমন খাদ্য, তেমনি বিচিও রান্নায় ব্যবহৃত হয়। খোসা গরুর প্রিয় খাদ্য।

আম যেখানে সৌন্দর্য ও রসনার রাজা, লিচু যেখানে শৈশবের দুরন্তপনা, সেখানে কাঁঠাল হলো বাংলার ঘরোয়া জীবনের এক নির্ভরযোগ্য সঙ্গী। কাঁঠাল সবচেয়ে আপন ফলগুলোর একটি। এর মধ্যে আছে গ্রামের উঠোনের উষ্ণতা, কৃষকের পরিশ্রমের ফল, সংসারের প্রাচুর্যের আনন্দ এবং লোকজ জীবনের সহজ সত্য।

জ্যৈষ্ঠ মাসের আরেক জনপ্রিয় ফল লিচু। অল্প সময়ের জন্য বাজারে এলেও এর চাহিদা অত্যন্ত বেশি। লালচে খসখসে খোসা ও সাদা রসালো শাঁস। মিষ্টি স্বাদ ও মনোরম সুবাস। লিচু বিশেষভাবে শৈশব, দুরন্তপনা, গ্রামীণ জীবন এবং গ্রীষ্মের আবেগের সঙ্গে যুক্ত। লিচুর রসালো স্বাদ, লালচে খোসা এবং স্বল্পস্থায়ী মৌসুম একে সাহিত্যিক কল্পনায় একটি আকর্ষণীয় প্রতীক। লিচুর কথা উঠলেই সবার আগে মনে আসে সুকুমার রায়-এর বিখ্যাত কবিতা ‘লিচু চোর’। কবিতাটি বাংলা শিশু-কিশোর সাহিত্যের অন্যতম জনপ্রিয় রচনা। এখানে এক কিশোরের লিচু চুরি করতে গিয়ে বিপাকে পড়ার হাস্যরসাত্মক কাহিনি বর্ণিত হয়েছে। কবিতার ভাষা, ছন্দ এবং ঘটনাপ্রবাহ এতটাই প্রাণবন্ত যে প্রজন্মের পর প্রজন্মের পাঠক এটি আনন্দের সঙ্গে পড়ে আসছে। ‘লিচু চোর’-এ লিচু কেবল একটি ফল নয়; এটি শৈশবের দুষ্টুমি, সাহসিকতা এবং নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি আকর্ষণের প্রতীক।

শৈশবস্মৃতির সাহিত্যে লিচু গ্রীষ্মের স্মৃতির অংশ। গ্রামের বাড়ির লিচুগাছ, বন্ধুদের সঙ্গে লিচু পাড়া, কিংবা বাগানের পাহারাদারের চোখ ফাঁকি দিয়ে ফল তোলার গল্প বহু লেখকের স্মৃতিচারণে দেখা যায়। লিচুর মৌসুম খুব অল্প সময়ের হওয়ায় এটি সাহিত্যিকভাবে ক্ষণস্থায়ী আনন্দেরও প্রতীক- যা আসে, মুগ্ধ করে, আবার দ্রæত বিদায় নেয়।

জসীমউদ্দীন-সহ গ্রামবাংলার জীবনচিত্র অঙ্কনকারীদের রচনায় বিভিন্ন ফলের পাশাপাশি লিচুরও উল্লেখ আছে। গ্রীষ্মের প্রকৃতিচিত্রে এর উপস্থিতি অনিবার্য। লালচে লিচুর থোকা, সবুজ পাতার ফাঁকে ঝুলে থাকা ফল, আর শিশুদের উৎসাহ- এসব দৃশ্য গ্রামীণ জীবনের প্রাণবন্ত অংশ। আধুনিক গল্প ও প্রবন্ধে লিচু অনেক নস্টালজিয়ার উপাদান। শহরে বেড়ে ওঠা মানুষ যখন গ্রাম, শৈশব বা হারিয়ে যাওয়া দিনগুলোর কথা স্মরণ করে, তখন লিচুর মৌসুম প্রায়ই সেই স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকে।

এক থোকা লিচু যেন ফিরিয়ে আনে- গরমের ছুটি, মামাবাড়ির দিনগুলো, বিকেলের খেলাধুলা আর ছেলেবেলার নির্ভার আনন্দ, গ্রীষ্মের সৌন্দর্য, গ্রামীণ স্মৃতি, নস্টালজিয়া ও হারানো সময়ের আকুলতা।

জাম বা কালো জাম গাঢ় বেগুনি বা কালো রঙের। হালকা টক-মিষ্টি স্বাদ। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সহায়ক, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ। বাংলা সাহিত্যে জাম (কালোজাম) গ্রামীণ প্রকৃতি, শৈশব, বর্ষার আগমনী বার্তা এবং জীবনের সরল আনন্দের এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। গাঢ় বেগুনি রঙ, টক-মিষ্টি স্বাদ এবং জিভে রঙ লাগার মজার বৈশিষ্ট্যের কারণে জাম বাঙালির স্মৃতি ও সাহিত্যের একটি স্বতন্ত্র স্থান।

প্রকৃতিনির্ভর লেখকদের রচনায় জামগাছ প্রায়ই দেখা যায়। বিশাল ছায়াময় জামগাছ গ্রামবাংলার পথ, পুকুরপাড়, স্কুলের মাঠ কিংবা বাড়ির আঙিনার অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। বিভ‚তিভ‚ষণ বন্দ্যোপাধ্যায়-এর প্রকৃতিবর্ণনামূলক লেখাগুলোতে গ্রামীণ বৃক্ষরাজির মধ্যে জামগাছের উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। বাংলা স্মৃতিকথা, ছোটগল্প এবং কিশোরসাহিত্যে জাম প্রায়ই শৈশবের আনন্দের প্রতীক। গ্রামের শিশুরা গাছে উঠে জাম পাড়ে, ঝড়ের পরে মাটিতে পড়া জাম কুড়ায়, জাম খেয়ে জিভ বেগুনি করে একে অপরকে দেখায়। এই দৃশ্যগুলো বহু লেখকের স্মৃতিচারণে ফিরে এসেছে। জাম তাই কেবল একটি ফল নয়; এটি হারিয়ে যাওয়া শৈশবের একটি রঙিন স্মৃতি।

জসীমউদ্দীন-এর পল্লিচিত্রে জামগাছ, বাগান, পুকুরপাড় এবং ফলভরা গ্রীষ্মের আবহ অনিবার্যভাবে উপস্থিত। জামগাছ সেখানে গ্রামীণ জীবনের নীরব সাক্ষী। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর প্রকৃতিনির্ভর রচনাগুলোতে বৃক্ষজগতের অংশ হিসেবে জামগাছও অন্তর্ভুক্ত।

শিশুদের ছড়ায় এবং ফলভিত্তিক লোকগানে জামের উপস্থিতি দেখা যায়। ‘জাম খেলে জিভ হয় কালো, তবু খেতে লাগে ভালো।’ লোকমুখে প্রচলিত এমন পঙ্ক্তিগুলো জামের জনপ্রিয়তা মনে করিয়ে দেয়।

জাম ও জামের গাছ গ্রামের পথের ধারে দাঁড়িয়ে থাকা এক শান্ত, ছায়াময় স্মৃতি। বাংলা সাহিত্যে বিশাল জাম ছায়ার মতোই তার উপস্থিতি গভীর, প্রশান্ত এবং স্মৃতিময়। জ্যৈষ্ঠের শেষ বিকেলে, যখন পাকা জাম টুপটাপ মাটিতে পড়ে, তখন মনে হয়- বাংলা সাহিত্যের অনেক না-বলা গল্পও যেন সেই জামগাছের ছায়াতেই লুকিয়ে আছে।

সফিকুল বোরহান: কথাসাহিত্যিক, অন্বেষা, রানির দিঘির পূর্ব পাড়, কুমিল্লা

Thumbnail image

মধুময় চক্রে জ্যৈষ্ঠ এক অনন্য অধ্যায়। আমের মিষ্টি সুবাস, কাঁঠালের সোনালি কোয়া, লিচুর রসালো স্বাদ, জামের বেগুনি আভা- সব মিলিয়ে জ্যৈষ্ঠ প্রকৃতি, সংস্কৃতি ও সমৃদ্ধ জীবনের প্রতীক। এই চিরায়ত ফলগুলো শুধু জিহŸার স্বাদই বাড়ায় না, বরং বাঙালির ঐতিহ্য, স্মৃতি ও আবেগকেও ধারণ করে।

মৌসুমি ফল উৎপাদনের একটি বড় অংশ জ্যৈষ্ঠকে কেন্দ্র করে। শুধু খাদ্য নয়, এটি বাংলার লোকজ ঐতিহ্যেরও অংশ। গ্রামবাংলায় আম-কাঁঠালের ছায়াঘেরা উঠান, লিচুর গন্ধমাখা বিকেল, কিংবা শিশুদের গাছে উঠে জাম পাড়ার দৃশ্য জ্যৈষ্ঠ মাসের চিরন্তন ছবি। মধুমাসের আগমন মানেই প্রকৃতির উদার দান এবং মাসনমননে অমলিন হাসি।

মধুমাসের নানা রকম সুস্বাদু, রসালো ও পুষ্টিকর ফলগুলো সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও গ্রামীণ জীবনের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত। ফলের রাজা আম মিষ্টি, সুগন্ধি, ভিটামিন এ ও সি সমৃদ্ধ। অসংখ্য জাতের মধ্যে ল্যাংড়া, হিমসাগর, আম্রপালি, ফজলি, গোপালভোগ ইত্যাদি। অতিথি আপ্যায়ন, পারিবারিক মিলনমেলা এবং নানা উৎসবে আম অপরিহার্য। আম ঋতুচক্র, গ্রামীণ জীবন, প্রেম, স্মৃতি, শৈশব এবং বাংলার প্রকৃতির এক অনন্য প্রতীক। মুকুলের গন্ধ থেকে পাকা আমের মাধুর্য- কবিতা, গান, গল্প ও উপন্যাসে বারবার ফিরে এসেছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বহু কবিতা ও গানে আম্রকুঞ্জ, আম্রমুকুল ও আমবনের উল্লেখ রয়েছে। তাঁর বিখ্যাত গানÑ

‘আম্রকুঞ্জে মঞ্জরী আজি

গন্ধে ভরিল বায়ু...।’ এখানে আমের মুকুল বসন্ত ও নবজাগরণের প্রতীক। রবীন্দ্রনাথের কাছে আমগাছ কেবল ফলদ বৃক্ষ নয়, বরং প্রকৃতির সৌন্দর্য ও জীবনের পুনর্জাগরণের চিহ্ন। কাজী নজরুল ইসলাম-এর প্রকৃতিবিষয়ক রচনায় আম্রকানন, কোকিলের ডাক ও মুকুলিত আমগাছ বারবার এসেছে। আমের বাগান তাঁর কবিতায় প্রেম, উচ্ছ¡াস এবং যৌবনের আবহ তৈরি করে।

জসীমউদ্দীনের পল্লিজীবন রচনায় গ্রামের উঠোন, আমগাছের ছায়া, শিশুদের আম কুড়ানো, কাঁচা আমের আচার- এসব তাঁর কাব্যজগতের স্বাভাবিক উপাদান। বিভ‚তিভ‚ষণের স্মৃতিময় আমগাছ প্রকৃতির এক জীবন্ত চরিত্র। পথের পাঁচালী-তে গ্রামীণ বাংলার যে চিত্র ফুটে উঠেছে, সেখানে আমবাগান, ফল কুড়ানো এবং গাছপালার সঙ্গে শিশুদের সম্পর্ক বিশেষভাবে লক্ষণীয়। আম এখানে শৈশবের আনন্দ ও প্রকৃতির অফুরন্ত দানের প্রতীক।

লোকসাহিত্যে আম নিয়ে কিছু প্রবাদ, ‘আমের আম, আঁটিরও দাম।’ ‘গাছে কাঁঠাল, গোঁফে তেল’ যদিও কাঁঠালের কথায় আছে, অনেক অঞ্চলে এর সঙ্গে আমের উদাহরণও যুক্ত হয়। ‘আম খাও, গাছ গুনো না।’ এসব প্রবাদে আম কখনও লাভের প্রতীক, কখনও বাস্তব বুদ্ধির, কখনও জীবনের সরল আনন্দের রূপক।

আম ও বাঙালির নস্টালজিয়া- গ্রীষ্মের দুপুরে কাঁচা আম পাড়া, ঝড়ের পর আম কুড়ানো, আমচুরি, দাদির বানানো আমের আচার, কিংবা উঠোনের পুরোনো আমগাছ- এসব দৃশ্য বাঙালির সাহিত্যিক কল্পনায় এক বিশেষ আবেগ সৃষ্টি করেছে। অনেক গল্প ও স্মৃতিকথায় আমগাছকে পরিবারের প্রবীণ সদস্যের মতো দেখানো হয়েছে- যে প্রজন্মের পর প্রজন্মকে ছায়া, ফল ও স্মৃতি দিয়ে যায়।

আম কখনও প্রেমের, কখনও প্রকৃতির, কখনও শৈশবের, কখনও গ্রামীণ জীবনের রূপক হয়ে উঠেছে। রবীন্দ্রনাথের আম্রমুকুল, নজরুলের আম্রকানন, জসীমউদ্দীনের পল্লিজীবন এবং বিভ‚তিভ‚ষণের প্রকৃতিচিত্র- সব মিলিয়ে আম বাংলা সাহিত্যকে দিয়েছে একটি স্বতন্ত্র গন্ধ, যা ঠিক পাকা আমের সুবাসের মতোই চিরপরিচিত এবং চিরমধুর।

কাঁঠাল বিশেষ আলোচিত ফলের একটি। আকারে বড় এবং সুগন্ধযুক্ত। কোয়া মিষ্টি ও রসালো। কাঁচা অবস্থায় সবজি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সাহিত্যে কাঁঠাল কেবল একটি ফল নয়; এটি গ্রামীণ জীবনের প্রাচুর্য, পারিবারিক অর্থনীতি, প্রকৃতির উদারতা এবং বাঙালির লোকজ সংস্কৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। জাতীয় ফল হিসেবে কাঁঠালের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব যেমন গভীর, তেমনি সাহিত্যে এর উপস্থিতিও অর্থবহ।

জসীমউদ্দীন-এর কাব্যজগতে কাঁঠাল একটি পরিচিত অনুষঙ্গ। কাঁঠালগাছ গ্রামের উঠোনে দাঁড়িয়ে থাকা এক নীরব অভিভাবকের মতো। তার ছায়ায় বসে গল্প হয়, শিশুরা খেলে, আর ফল ধরলে গোটা পরিবার আনন্দে মেতে ওঠে।

বিভ‚তিভ‚ষণ বন্দ্যোপাধ্যায়-এর পথের পাঁচালী এবং তাঁর অন্যান্য রচনায় কাঁঠালগাছও গ্রামীণ জীবনের স্বাভাবিক উপাদান হিসেবে উপস্থিত। কাঁঠালের গন্ধ, পাকাধরা ফল, কিংবা ঝড়ের পরে পড়ে থাকা কাঁঠাল- এসব দৃশ্য তাঁর প্রকৃতিচিত্রকে আরও বাস্তব ও জীবন্ত করে তোলে।

রবীন্দ্রনাথের কাছে গ্রামের উঠোনে দাঁড়ানো ফলভরা গাছ ছিল আত্মনির্ভরতা ও প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের প্রতীক। লোকসাহিত্য ও প্রবাদে- ‘গাছে কাঁঠাল, গোঁফে তেল।’ এই প্রবাদের অর্থ- কোনো কাজ সম্পন্ন হওয়ার আগেই তার ফল ভোগের আশা করা। ‘কাঁঠালের আমসত্ত¡ হয় না।’ অর্থাৎ, প্রত্যেক বস্তুর নিজস্ব স্বভাব ও সীমাবদ্ধতা আছে; সবকিছু দিয়ে সব কাজ হয় না। বাস্তবধর্মী ধারায় কাঁঠাল দরিদ্র গ্রামীণ পরিবারের খাদ্যনিরাপত্তার প্রতীক। একটি বড় কাঁঠাল বহু মানুষের খাবারের জোগান দিতে পারে। পাকা কাঁঠালের কোয়া যেমন খাদ্য, তেমনি বিচিও রান্নায় ব্যবহৃত হয়। খোসা গরুর প্রিয় খাদ্য।

আম যেখানে সৌন্দর্য ও রসনার রাজা, লিচু যেখানে শৈশবের দুরন্তপনা, সেখানে কাঁঠাল হলো বাংলার ঘরোয়া জীবনের এক নির্ভরযোগ্য সঙ্গী। কাঁঠাল সবচেয়ে আপন ফলগুলোর একটি। এর মধ্যে আছে গ্রামের উঠোনের উষ্ণতা, কৃষকের পরিশ্রমের ফল, সংসারের প্রাচুর্যের আনন্দ এবং লোকজ জীবনের সহজ সত্য।

জ্যৈষ্ঠ মাসের আরেক জনপ্রিয় ফল লিচু। অল্প সময়ের জন্য বাজারে এলেও এর চাহিদা অত্যন্ত বেশি। লালচে খসখসে খোসা ও সাদা রসালো শাঁস। মিষ্টি স্বাদ ও মনোরম সুবাস। লিচু বিশেষভাবে শৈশব, দুরন্তপনা, গ্রামীণ জীবন এবং গ্রীষ্মের আবেগের সঙ্গে যুক্ত। লিচুর রসালো স্বাদ, লালচে খোসা এবং স্বল্পস্থায়ী মৌসুম একে সাহিত্যিক কল্পনায় একটি আকর্ষণীয় প্রতীক। লিচুর কথা উঠলেই সবার আগে মনে আসে সুকুমার রায়-এর বিখ্যাত কবিতা ‘লিচু চোর’। কবিতাটি বাংলা শিশু-কিশোর সাহিত্যের অন্যতম জনপ্রিয় রচনা। এখানে এক কিশোরের লিচু চুরি করতে গিয়ে বিপাকে পড়ার হাস্যরসাত্মক কাহিনি বর্ণিত হয়েছে। কবিতার ভাষা, ছন্দ এবং ঘটনাপ্রবাহ এতটাই প্রাণবন্ত যে প্রজন্মের পর প্রজন্মের পাঠক এটি আনন্দের সঙ্গে পড়ে আসছে। ‘লিচু চোর’-এ লিচু কেবল একটি ফল নয়; এটি শৈশবের দুষ্টুমি, সাহসিকতা এবং নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি আকর্ষণের প্রতীক।

শৈশবস্মৃতির সাহিত্যে লিচু গ্রীষ্মের স্মৃতির অংশ। গ্রামের বাড়ির লিচুগাছ, বন্ধুদের সঙ্গে লিচু পাড়া, কিংবা বাগানের পাহারাদারের চোখ ফাঁকি দিয়ে ফল তোলার গল্প বহু লেখকের স্মৃতিচারণে দেখা যায়। লিচুর মৌসুম খুব অল্প সময়ের হওয়ায় এটি সাহিত্যিকভাবে ক্ষণস্থায়ী আনন্দেরও প্রতীক- যা আসে, মুগ্ধ করে, আবার দ্রæত বিদায় নেয়।

জসীমউদ্দীন-সহ গ্রামবাংলার জীবনচিত্র অঙ্কনকারীদের রচনায় বিভিন্ন ফলের পাশাপাশি লিচুরও উল্লেখ আছে। গ্রীষ্মের প্রকৃতিচিত্রে এর উপস্থিতি অনিবার্য। লালচে লিচুর থোকা, সবুজ পাতার ফাঁকে ঝুলে থাকা ফল, আর শিশুদের উৎসাহ- এসব দৃশ্য গ্রামীণ জীবনের প্রাণবন্ত অংশ। আধুনিক গল্প ও প্রবন্ধে লিচু অনেক নস্টালজিয়ার উপাদান। শহরে বেড়ে ওঠা মানুষ যখন গ্রাম, শৈশব বা হারিয়ে যাওয়া দিনগুলোর কথা স্মরণ করে, তখন লিচুর মৌসুম প্রায়ই সেই স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকে।

এক থোকা লিচু যেন ফিরিয়ে আনে- গরমের ছুটি, মামাবাড়ির দিনগুলো, বিকেলের খেলাধুলা আর ছেলেবেলার নির্ভার আনন্দ, গ্রীষ্মের সৌন্দর্য, গ্রামীণ স্মৃতি, নস্টালজিয়া ও হারানো সময়ের আকুলতা।

জাম বা কালো জাম গাঢ় বেগুনি বা কালো রঙের। হালকা টক-মিষ্টি স্বাদ। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সহায়ক, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ। বাংলা সাহিত্যে জাম (কালোজাম) গ্রামীণ প্রকৃতি, শৈশব, বর্ষার আগমনী বার্তা এবং জীবনের সরল আনন্দের এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। গাঢ় বেগুনি রঙ, টক-মিষ্টি স্বাদ এবং জিভে রঙ লাগার মজার বৈশিষ্ট্যের কারণে জাম বাঙালির স্মৃতি ও সাহিত্যের একটি স্বতন্ত্র স্থান।

প্রকৃতিনির্ভর লেখকদের রচনায় জামগাছ প্রায়ই দেখা যায়। বিশাল ছায়াময় জামগাছ গ্রামবাংলার পথ, পুকুরপাড়, স্কুলের মাঠ কিংবা বাড়ির আঙিনার অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। বিভ‚তিভ‚ষণ বন্দ্যোপাধ্যায়-এর প্রকৃতিবর্ণনামূলক লেখাগুলোতে গ্রামীণ বৃক্ষরাজির মধ্যে জামগাছের উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। বাংলা স্মৃতিকথা, ছোটগল্প এবং কিশোরসাহিত্যে জাম প্রায়ই শৈশবের আনন্দের প্রতীক। গ্রামের শিশুরা গাছে উঠে জাম পাড়ে, ঝড়ের পরে মাটিতে পড়া জাম কুড়ায়, জাম খেয়ে জিভ বেগুনি করে একে অপরকে দেখায়। এই দৃশ্যগুলো বহু লেখকের স্মৃতিচারণে ফিরে এসেছে। জাম তাই কেবল একটি ফল নয়; এটি হারিয়ে যাওয়া শৈশবের একটি রঙিন স্মৃতি।

জসীমউদ্দীন-এর পল্লিচিত্রে জামগাছ, বাগান, পুকুরপাড় এবং ফলভরা গ্রীষ্মের আবহ অনিবার্যভাবে উপস্থিত। জামগাছ সেখানে গ্রামীণ জীবনের নীরব সাক্ষী। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর প্রকৃতিনির্ভর রচনাগুলোতে বৃক্ষজগতের অংশ হিসেবে জামগাছও অন্তর্ভুক্ত।

শিশুদের ছড়ায় এবং ফলভিত্তিক লোকগানে জামের উপস্থিতি দেখা যায়। ‘জাম খেলে জিভ হয় কালো, তবু খেতে লাগে ভালো।’ লোকমুখে প্রচলিত এমন পঙ্ক্তিগুলো জামের জনপ্রিয়তা মনে করিয়ে দেয়।

জাম ও জামের গাছ গ্রামের পথের ধারে দাঁড়িয়ে থাকা এক শান্ত, ছায়াময় স্মৃতি। বাংলা সাহিত্যে বিশাল জাম ছায়ার মতোই তার উপস্থিতি গভীর, প্রশান্ত এবং স্মৃতিময়। জ্যৈষ্ঠের শেষ বিকেলে, যখন পাকা জাম টুপটাপ মাটিতে পড়ে, তখন মনে হয়- বাংলা সাহিত্যের অনেক না-বলা গল্পও যেন সেই জামগাছের ছায়াতেই লুকিয়ে আছে।

সফিকুল বোরহান: কথাসাহিত্যিক, অন্বেষা, রানির দিঘির পূর্ব পাড়, কুমিল্লা

বিষয়:

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

১

আম্রকুঞ্জে মঞ্জরী আজি

২

জাতি গঠনে শিক্ষক: সংকট, সম্ভাবনা ও করণীয়

৩

আধুনিক বাংলাদেশের সাহসী নির্মাতা

৪

ঈদে বুঝে শুনে খান

৫

'জেগে উঠো মানুষ ফিরে আসুক মানবিকতা'

সম্পর্কিত

জাতি গঠনে শিক্ষক: সংকট, সম্ভাবনা ও করণীয়

জাতি গঠনে শিক্ষক: সংকট, সম্ভাবনা ও করণীয়

১২ ঘণ্টা আগে
আধুনিক বাংলাদেশের সাহসী নির্মাতা

আধুনিক বাংলাদেশের সাহসী নির্মাতা

৫ দিন আগে
ঈদে বুঝে শুনে খান

ঈদে বুঝে শুনে খান

৮ দিন আগে
'জেগে উঠো মানুষ
ফিরে আসুক মানবিকতা'

'জেগে উঠো মানুষ ফিরে আসুক মানবিকতা'

৮ দিন আগে