অধ্যাপক ডা. মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ

আলোচনা, নাচ, গান, আবৃত্তিসহ সাংস্কৃতিক নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে বিষ্ময়কর প্রতিভা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মবার্ষিকী পালন করা হয়। কুষ্টিয়ার শিলাইদহের পাশাপাশি নওগাঁর পতিসরে সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর, ঢাকার শিল্পকলা একাডেমিসহ সারাদেশের সকল স্থানে রবীন্দ্র জয়ন্তী পালন করা হয় কিন্তু আমরা রবীন্দ্রনাথের চিন্তাচেতনা কতটুকু ধারণ করি তাহাই জাতির সামনে আলোচনার বিষয়। রবীন্দ্রনাথের কর্ম ও জীবন নিয়ে বলতে গেলে বলতে হয় তিনি শুধু একজন সাহিত্যিকই নন, তিনি ছিলেন গভীর মানবতাবাদী সমাজ সচেতন ও দূরদর্শী চিন্তাবিদ। তাঁর সাহিত্যে দর্শন ও চিন্তায় মানবতা, সত্য, শান্তি, শিক্ষা, বিজ্ঞান মনস্কতার পরিচয় পাওয়া যায়। এছাড়া তাঁর লেখায় সাম্প্রদায়িকতা ও অন্ধ জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে সতর্কবার্তা উঠে এসেছে। বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতেও রবীঠাকুরের চিন্তা ও দর্শন সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।
রবীন্দ্রনাথ উৎপাদনের সাথে বিশেষভাবে জড়িত বলে মনে করেন স্বাস্থ্যকে। সুস্বাস্থ্যের অধিকারীরাই বেশি উৎপাদন করতে পারে এবং বেশি সম্পদ সৃষ্টি করতে পারে। রবীন্দ্রনাথ স্বাস্থ্যকে সভ্যতা সৃষ্টির সঙ্গে অচ্ছেদ্য রূপে দেখেছেন। তাঁর মতে “শারীরিক দূর্বলতা থেকে মানসিক দূর্বলতা আসে। যার কেবল কোন রকম বেঁচে থাকা চলে, জীবনধারণের জন্য যা দরকার তার বেশি একটু উদ্বৃত্ত হয় না। তার প্রাণে বদান্যতা থাকে না। প্রাণের বদান্যতা না থাকলে বড় সভ্যতা সৃষ্টি হতে পারে না। সেখানে প্রাণের কৃপণতা, সেখানে ক্ষুদ্রতা আসবে।” তাই পল্লী সমাজকে স্বনির্ভর ও সমগ্র করে গড়ে তোলার জন্য স্বাস্থ্যকে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থান দিয়েছেন এবং নিছক সম্পদ সৃষ্টির তাড়নার চেয়েও স্বাস্থ্যকে কবি সমাজ সভ্যতা গড়ার মত মহৎ, আরো বিস্তৃত প্রাঙ্গনে নিয়ে এলেন।
উনিশ শতাব্দীতে বৃটিশ শাসকরা কেবল নিজেদের এবং খুব বেশি হলে সেনাবাহিনীর স্বাস্থ্য নিয়েই ব্যস্ত থাকছে — শ্রমিকেরত প্রশ্নই আসে না। তবুও ১৯ শতকের শেষে তারা কিছু নজর দেয় জনস্বাস্থ্যের দিকে এবং উপলব্ধি করে যে, শ্রমিকও বৃহত্তর সমাজ এবং তার পরিবেশসহ সুস্বাস্থ্যের ব্যবস্থা না হলে অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ক্রমোন্নতি সম্ভব নয়, তাই রবীন্দ্রনাথকেও ব্রিটিশ শাসনে ‘অন্ন চাই, প্রাণ চাই’ বলে চিৎকার করতে হয়েছে। যেমন আজও ভারতবাসীকে কবির মৃত্যুর পর সুস্থ সবল জীবনের জন্য দাবীর মিছিলে পথ মেলাতে হচ্ছে। রবীন্দ্রনাথ রাশিয়া ভ্রমণের পর একটি চিঠিতে ভারতে জনবিস্ফোরণ প্রসঙ্গে লিখেছেন —“কথাটার ভিতরকার ভাবটা এই যে, বাহির থেকে যে শোষণ চলছে তা দুঃসহ হত না, যদি স্বপ্ন অন্ন নিয়ে স্বপ্নালোকে হাঁড়ি চেঁচে পুছে খেত।” কবি জনবিস্ফোরণের তত্ত্ব খরিজ করেন ১৮৭১ থেকে ১৯২১ সাল পর্যন্ত ইংল্যান্ড ও ভারত বর্ষের জনসংখ্যার বৃদ্ধির হার উল্লেখ করে। ঐ সময়ের তথ্য বলছে যে, ভারতে যখন জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ৩৩ শতাংশ ইংল্যান্ড প্রজা বৃদ্ধির হার তখন ভারতের দ্বিগুণ ৬৬ শতাংশ। অথচ বিপুল জনবিস্ফোরণ স্বত্তেও ইংল্যান্ডের জনজীবনে ছিল স্বাচ্ছন্দ।
রবীন্দ্রচেতনাকে ধারণা করেই আমাদের দীর্ঘ সাংস্কৃতিক যাত্রা এগিয়ে যাচ্ছে। রবীন্দ্রনাথ শুধু একজন কবি বা সাহিত্যিক নন, সমাজ, অর্থনীতি, বিজ্ঞান ও মানবসভ্যতা সম্পর্কে তার ছিল গভীর দৃষ্টিভঙ্গি। রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে এক কথায় বলতে গেলে অনেকেই বলে —“শেষ হইয়াও হইল না শেষ।” রবীন্দ্র নাথ শুধু কবিতা, গান, গল্প, উপন্যাস, চিত্রকলা, শিক্ষা ও সংস্কৃতি নিয়েই ভাবেন নি। তিনি যেখানে যে বিষয়েই লিখেছেন, সেখানেই শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ দিয়েছেন। পৃথিবী জুড়ে যখন জাতীয়তাবাদের চর্চা চলে তখন তিনি তার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে বলেছেন, এই চেতনা পুরো পৃথিবীকে ধ্বংস করে ফেলবে। অতঃপর হয়ে গেল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। অনেকে মনে করেন, বরীন্দ্রনাথ কোমল হৃদয়ের মানুষ ছিলেন। তা তো ছিলেন বটেই কিন্তু সত্যের পথে ছিলেন দৃঢ়। জীবনের শেষ দিকে তিনি লিখে গেছেন- দেশে দেশে যুদ্ধ ও ফ্যাসিকদের বিরুদ্ধে তিনি লিখেছিলেন —
“নাগিনীরা চারিদিকে ফেলিতেছে বিষাক্ত
নিশ্বাস শান্তির ললিত বাণী শোনাইবে ব্যর্থ পরিহাস—
বিদায় নেবার আগে তাই
ডাক দিয়ে যাই
দানবের সাথে যারা সংগ্রামের তরে
প্রস্তুত হতেছে ঘরে ঘরে।”
রবীন্দ্রনাথকে বাদ দেওয়ার চেষ্টা ইতিহাসে বারবার বিভাজন ও সংকীর্ণতার জন্ম দিয়েছে। রবীন্দ্রনাথ বাংলাদেশের মানুষের সামাজিক সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও সাহিত্যিক চেতনার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। আজকের অশান্তি বিশ্বে রবীন্দ্রনাথ অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। তিনি শুধু সংস্কৃতির সেবক নন, বরং শান্তি ও মানবতার এক বলিষ্ট কন্ঠস্বর। যিনি সবসময় মানুষের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন এবং সমাজকে ঐক্য সহমর্মিতার আহ্বান জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, এক সময় বিশ্বজুড়ে কোন মানবিক বিপর্যয় বা যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হলে নাগরিক সমাজ, শিল্পী ও সাধারণ মানুষ প্রতিবাদে বাস্তবায়নমুখী। কিন্তু এখন সেই সামাজিক প্রতিক্রিয়া অনেকটা দূর্বল হয়ে গেছে, যা উদ্বেগজনক। তাঁর মতে, এই নীরবতা মানবিক সংকটকে আরও গভীর করছে। সমাজের উগ্রতা, সাম্প্রদায়িকতা ও অমানবিকতার বিরুদ্ধে রবীন্দ্রনাথ এক অনন্য আশ্রয়।
অধ্যাপক ডা. মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ: সাবেক অধ্যক্ষ, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ।

আলোচনা, নাচ, গান, আবৃত্তিসহ সাংস্কৃতিক নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে বিষ্ময়কর প্রতিভা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মবার্ষিকী পালন করা হয়। কুষ্টিয়ার শিলাইদহের পাশাপাশি নওগাঁর পতিসরে সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর, ঢাকার শিল্পকলা একাডেমিসহ সারাদেশের সকল স্থানে রবীন্দ্র জয়ন্তী পালন করা হয় কিন্তু আমরা রবীন্দ্রনাথের চিন্তাচেতনা কতটুকু ধারণ করি তাহাই জাতির সামনে আলোচনার বিষয়। রবীন্দ্রনাথের কর্ম ও জীবন নিয়ে বলতে গেলে বলতে হয় তিনি শুধু একজন সাহিত্যিকই নন, তিনি ছিলেন গভীর মানবতাবাদী সমাজ সচেতন ও দূরদর্শী চিন্তাবিদ। তাঁর সাহিত্যে দর্শন ও চিন্তায় মানবতা, সত্য, শান্তি, শিক্ষা, বিজ্ঞান মনস্কতার পরিচয় পাওয়া যায়। এছাড়া তাঁর লেখায় সাম্প্রদায়িকতা ও অন্ধ জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে সতর্কবার্তা উঠে এসেছে। বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতেও রবীঠাকুরের চিন্তা ও দর্শন সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।
রবীন্দ্রনাথ উৎপাদনের সাথে বিশেষভাবে জড়িত বলে মনে করেন স্বাস্থ্যকে। সুস্বাস্থ্যের অধিকারীরাই বেশি উৎপাদন করতে পারে এবং বেশি সম্পদ সৃষ্টি করতে পারে। রবীন্দ্রনাথ স্বাস্থ্যকে সভ্যতা সৃষ্টির সঙ্গে অচ্ছেদ্য রূপে দেখেছেন। তাঁর মতে “শারীরিক দূর্বলতা থেকে মানসিক দূর্বলতা আসে। যার কেবল কোন রকম বেঁচে থাকা চলে, জীবনধারণের জন্য যা দরকার তার বেশি একটু উদ্বৃত্ত হয় না। তার প্রাণে বদান্যতা থাকে না। প্রাণের বদান্যতা না থাকলে বড় সভ্যতা সৃষ্টি হতে পারে না। সেখানে প্রাণের কৃপণতা, সেখানে ক্ষুদ্রতা আসবে।” তাই পল্লী সমাজকে স্বনির্ভর ও সমগ্র করে গড়ে তোলার জন্য স্বাস্থ্যকে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থান দিয়েছেন এবং নিছক সম্পদ সৃষ্টির তাড়নার চেয়েও স্বাস্থ্যকে কবি সমাজ সভ্যতা গড়ার মত মহৎ, আরো বিস্তৃত প্রাঙ্গনে নিয়ে এলেন।
উনিশ শতাব্দীতে বৃটিশ শাসকরা কেবল নিজেদের এবং খুব বেশি হলে সেনাবাহিনীর স্বাস্থ্য নিয়েই ব্যস্ত থাকছে — শ্রমিকেরত প্রশ্নই আসে না। তবুও ১৯ শতকের শেষে তারা কিছু নজর দেয় জনস্বাস্থ্যের দিকে এবং উপলব্ধি করে যে, শ্রমিকও বৃহত্তর সমাজ এবং তার পরিবেশসহ সুস্বাস্থ্যের ব্যবস্থা না হলে অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ক্রমোন্নতি সম্ভব নয়, তাই রবীন্দ্রনাথকেও ব্রিটিশ শাসনে ‘অন্ন চাই, প্রাণ চাই’ বলে চিৎকার করতে হয়েছে। যেমন আজও ভারতবাসীকে কবির মৃত্যুর পর সুস্থ সবল জীবনের জন্য দাবীর মিছিলে পথ মেলাতে হচ্ছে। রবীন্দ্রনাথ রাশিয়া ভ্রমণের পর একটি চিঠিতে ভারতে জনবিস্ফোরণ প্রসঙ্গে লিখেছেন —“কথাটার ভিতরকার ভাবটা এই যে, বাহির থেকে যে শোষণ চলছে তা দুঃসহ হত না, যদি স্বপ্ন অন্ন নিয়ে স্বপ্নালোকে হাঁড়ি চেঁচে পুছে খেত।” কবি জনবিস্ফোরণের তত্ত্ব খরিজ করেন ১৮৭১ থেকে ১৯২১ সাল পর্যন্ত ইংল্যান্ড ও ভারত বর্ষের জনসংখ্যার বৃদ্ধির হার উল্লেখ করে। ঐ সময়ের তথ্য বলছে যে, ভারতে যখন জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ৩৩ শতাংশ ইংল্যান্ড প্রজা বৃদ্ধির হার তখন ভারতের দ্বিগুণ ৬৬ শতাংশ। অথচ বিপুল জনবিস্ফোরণ স্বত্তেও ইংল্যান্ডের জনজীবনে ছিল স্বাচ্ছন্দ।
রবীন্দ্রচেতনাকে ধারণা করেই আমাদের দীর্ঘ সাংস্কৃতিক যাত্রা এগিয়ে যাচ্ছে। রবীন্দ্রনাথ শুধু একজন কবি বা সাহিত্যিক নন, সমাজ, অর্থনীতি, বিজ্ঞান ও মানবসভ্যতা সম্পর্কে তার ছিল গভীর দৃষ্টিভঙ্গি। রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে এক কথায় বলতে গেলে অনেকেই বলে —“শেষ হইয়াও হইল না শেষ।” রবীন্দ্র নাথ শুধু কবিতা, গান, গল্প, উপন্যাস, চিত্রকলা, শিক্ষা ও সংস্কৃতি নিয়েই ভাবেন নি। তিনি যেখানে যে বিষয়েই লিখেছেন, সেখানেই শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ দিয়েছেন। পৃথিবী জুড়ে যখন জাতীয়তাবাদের চর্চা চলে তখন তিনি তার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে বলেছেন, এই চেতনা পুরো পৃথিবীকে ধ্বংস করে ফেলবে। অতঃপর হয়ে গেল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। অনেকে মনে করেন, বরীন্দ্রনাথ কোমল হৃদয়ের মানুষ ছিলেন। তা তো ছিলেন বটেই কিন্তু সত্যের পথে ছিলেন দৃঢ়। জীবনের শেষ দিকে তিনি লিখে গেছেন- দেশে দেশে যুদ্ধ ও ফ্যাসিকদের বিরুদ্ধে তিনি লিখেছিলেন —
“নাগিনীরা চারিদিকে ফেলিতেছে বিষাক্ত
নিশ্বাস শান্তির ললিত বাণী শোনাইবে ব্যর্থ পরিহাস—
বিদায় নেবার আগে তাই
ডাক দিয়ে যাই
দানবের সাথে যারা সংগ্রামের তরে
প্রস্তুত হতেছে ঘরে ঘরে।”
রবীন্দ্রনাথকে বাদ দেওয়ার চেষ্টা ইতিহাসে বারবার বিভাজন ও সংকীর্ণতার জন্ম দিয়েছে। রবীন্দ্রনাথ বাংলাদেশের মানুষের সামাজিক সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও সাহিত্যিক চেতনার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। আজকের অশান্তি বিশ্বে রবীন্দ্রনাথ অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। তিনি শুধু সংস্কৃতির সেবক নন, বরং শান্তি ও মানবতার এক বলিষ্ট কন্ঠস্বর। যিনি সবসময় মানুষের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন এবং সমাজকে ঐক্য সহমর্মিতার আহ্বান জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, এক সময় বিশ্বজুড়ে কোন মানবিক বিপর্যয় বা যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হলে নাগরিক সমাজ, শিল্পী ও সাধারণ মানুষ প্রতিবাদে বাস্তবায়নমুখী। কিন্তু এখন সেই সামাজিক প্রতিক্রিয়া অনেকটা দূর্বল হয়ে গেছে, যা উদ্বেগজনক। তাঁর মতে, এই নীরবতা মানবিক সংকটকে আরও গভীর করছে। সমাজের উগ্রতা, সাম্প্রদায়িকতা ও অমানবিকতার বিরুদ্ধে রবীন্দ্রনাথ এক অনন্য আশ্রয়।
অধ্যাপক ডা. মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ: সাবেক অধ্যক্ষ, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ।