প্রয়োজনের বাইরে রক্ত সঞ্চালন নয়

অধ্যাপক ডা. মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ
Thumbnail image

মানুষের শরীরে প্রবাহিত রক্তের কোনো ধর্ম নাই। একজনের রক্ত আরেকজনের জীবন বাঁচায়। মানুষের শরীরে শুধু মানুষেরই রক্ত দেয়া যায় অন্য কোনো প্রাণীর নহে। রক্তদান শুধু জীবন বাঁচায় না, মানুষের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা, সহমর্মিতা ও সম্প্রীতির সম্পর্কও শক্তিশালী করে। হাসপাতালে রক্ত দেয়ার সময় কেউ দেখে না সেটি হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ, জৈন কিংবা অন্য কোন ধর্মাবলম্বীর রক্ত। রক্তপরিসঞ্চালন বহু দশক ধরে জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা হিসাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে রক্তের বহুমুখী ব্যবহার শুরু হয়েছে। এখন বিভিন্ন ধরনের জটিল রক্তরোগ, ক্যান্সার চিকিৎসায়, অস্থিমজ্জার রোগে এবং বংশগতরোগ থেলাসেমিয়ার মতো রোগের চিকিৎসায় রক্তের উপাদান ও সম্পূর্ণ রক্তের প্রয়োজন হয়। বিশেষ করে থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত রোগীর অনেককেই বেঁচে থাকার জন্য নিয়মিত রক্ত পরিসঞ্চালনই একমাত্র নির্ভরযোগ্য চিকিৎসা। বর্তমানে অনেকক্ষেত্রে যে কোনো রোগীর রক্তস্বল্পতা দেখা দিলেই রক্ত দেয়াকে সহজ সমাধান হিসাবে বিবেচনা করা হয়। রক্তস্বল্পতার যথাযথ কারণ অনুসন্ধান, রোগ নির্ণয় এবং বিকল্প চিকিৎসার সুযোগ মূল্যায়ন না করেই অনেক সময় রক্ত পরিসঞ্চালন আরম্ভ করে দেয়। দেখা যায় অধিকাংশ রক্তস্বল্পতা হয় আয়রনের ঘাটতিতে, ভিটামিন বি১২ বা ফলিক এসিডের অভাবে, লং একটিং ইনফেকশন অথবা অন্যান্য চিকিৎসযোগ্য রোগের কারণে। এ সকল ক্ষেত্রে যথাযথ চিকিৎসা দিলে রোগী সুস্থ হয়ে যায়। ফলে রক্ত দেয়ার প্রয়োজন নাও হতে পারে। সুস্থ মানুষের স্বেচ্ছায় দান করা রক্তই একজনের জীবন বাঁচাতে পারে। মানুষের জন্য রক্তের একমাত্র উৎস হল আরেকজন মানুষ। এ কারণেই চিকিৎসাজগতে রক্তকে একটি অমূল্য ও সীমিত সম্পদ হিসাবে বিবেচনা করা হয়। দুঃখজনক হলেও সত্য আমাদের দেশে এ মূল্যবান সম্পদের ব্যবহার সবসময় যৌক্তিক ও প্রয়োজনভিত্তিক হচ্ছে না। রক্তপরিসঞ্চালনের সূচনা হয়েছিল মূলত আকস্মিক রক্তক্ষরণজনিত জীবন সংকট মোকাবিলার জন্য। যুদ্ধক্ষেত্রে আহত সৈনিক, সড়ক দুর্ঘটনার শিকার ব্যক্তি, সন্তান প্রসবকালে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে আক্রান্ত মা কিংবা বড় ধরনের রক্তক্ষরণ সম্ভাবনার অস্ত্রোপচারের রোগীদের জন্য। সত্যিকার অর্থে রক্তের প্রয়োজনীয়তা যেমন- থ্যালাসেমিয়া, ক্যান্সার বা গুরুতর রক্তক্ষরণে আক্রান্ত ব্যক্তি- তাদের জন্য রক্তের সংকট দেখা দিতে পারে। দ্বিতীয়ত, রক্ত নিজেও ঝুঁকিমুক্ত নয়। আধুনিক স্ক্রিনিং ব্যবস্থার পরও রক্ত পরিসঞ্চালনের সঙ্গে জ¦র, রক্ত সঞ্চালনের এলার্জিক প্রতিক্রিয়া, ফুসফুস সংক্রান্ত জটিলতা, রক্তে অতিরিক্ত আয়রন জমা হওয়া এবং অন্যান্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ও দূরবর্তী পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি থেকে যায়। ফলে অপ্রয়োজনীয় রক্ত দেয়া কখনোই রোগীর জন্য কল্যাণকর হয় না। উন্নত বিশ্বে বর্তমানে রোগীকেন্দ্রিক রক্ত ব্যবস্থাপনার ধারণা গুরুত্ব পাচ্ছে। এর মূল লক্ষ্য হচ্ছে, রোগীকে তখনই রক্ত দেয়া হবে, যখন তা সত্যিই প্রয়োজন হবে এবং বৈজ্ঞানিকভাবে উপকারী বলে মনে হবে। রক্তকে একটি মূল্যবান ও সীমিত সম্পদ হিসাবে বিবেচনা করে সর্বোচ্চ সতর্কতার সঙ্গে ব্যবহার নিশ্চিত করাই এ নীতির ভিত্তি। আমাদের দেশের জন্যও এটি জরুরি, এজন্য চিকিৎসকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, হাসপাতালভিত্তিক পরিসঞ্চালন নীতি, প্রমাণভিত্তিক গাইডলাইন অনুসরণ এবং রোগীদের সচেতনতাবৃদ্ধি জরুরি। একই সঙ্গে নিরাপদ ও স্বেচ্ছায় রক্তদানের সংস্কৃতিকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। মনে রাখতে হবে স্বেচ্ছায় সুস্থ শরীরে এক ইউনিট রক্তদান ওই ব্যক্তির জীবনের সবচেয়ে বড়দান। দেশে স্বেচ্ছায় রক্তদানের হার এখনও কম। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রোগীর পরিবারকে নিজেদের রক্ত জোগাড় করতে হয়। ভলান্টারি বা স্বেচ্ছায় দানের জন্য রক্ত ব্যাংকের স্টকে থাকে না। পশ্চিমাবিশ্বে যেখানে রক্তের চাহিদা ৯০ শতাংশ থেকে শতভাগ জোগাড় হয় স্বেচ্ছায় রক্তদাতাদের কাছ থেকে, সে স্থলে আমাদের দেশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চাহিদার মাত্র ৩০-৩২ শতাংশ রক্ত সংগৃহীত হয় স্বেচ্ছায় রক্তদাতাদের কাছ থেকে। চাহিদার বিপরীতে রক্তের সরবরাহ যেখানে সীমিত, সেখানে ওই রোগীর আসলেই রক্ত সঞ্চালনের প্রয়োজন আছে কিনা, তা দেখতে হবে। রক্ত জীবন বাঁচায় এ কথা যেমন সত্য, তেমনি এটাও সত্য অপ্রয়োজনীয় রক্ত পরিসঞ্চালন জীবনরক্ষার পরিবর্তে ক্ষতিকর কারণও হতে পারে। যে দেশে থ্যালাসেমিয়া রোগীদের অনেক সময় প্রয়োজনীয় রক্তের জন্য অপেক্ষা করতে হয়, সে দেশে অপ্রয়োজনীয় রক্ত পরিসঞ্চালন শুধু চিকিৎসাগত ভুল নয় বরং এটি একটি নৈতিক ও জনস্বাস্থ্য সমস্যা। উন্নত বিশ্বে বর্তমানে রোগীকেন্দ্রিক রক্ত ব্যবস্থাপনার ধারণা গুরুত্ব পাচ্ছে। এ লক্ষ্যে রোগীকে তখনই রক্ত দেয়া, যখন তা সত্যিই প্রয়োজন এবং বৈজ্ঞানিকভাবে উপকারী বলে প্রমাণিত। তাই রক্তের প্রতিটি ইউনিট ব্যবহার হওয়া উচিত প্রয়োজন, যৌক্তিক কারণ এবং রোগীর সর্বোত্তম স্বার্থ বিবেচনা করে। রক্তের অপচয় রোধ করা শুধু চিকিসাবিজ্ঞানের দায়িত্ব নয়, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পাবলিক হেলথ ওয়ার্ক।

অধ্যাপক ডা. মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ: সাবেক অধ্যক্ষ, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ

বিষয়:

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

সম্পর্কিত