বিশ হাজার কিলোমিটার দূরের প্রেম
ড. হাসিব আহসান , কোপেনহেগেন, ডেনমার্ক থেকে

বিশ্বকাপের মাস জুড়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের বিশাল পর্দা নিভে গেছে, কিন্তু হাজারো মানুষ তখনো চিৎকার করছে, আর্জেন্টিনা, আর্জেন্টিনা, মেসি, মেসি। আকাশি-সাদা পতাকার সমুদ্রে ভেসে যাচ্ছে বুবুুজেলার শব্দ। দৃশ্যটি বুয়েনস আইরেসের হতে পারত, কিন্তু এটি বাংলাদেশ। যে দেশ কোনোদিন বিশ্বকাপে খেলেনি, ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে যাদের অবস্থান ১৮০ এর ঘরে, সেই দেশের ছাদে ছাদে, চরের টিনের চালায়, এমনকি ধানখেতের মাঝখানে বাঁশের মাথায় ওড়ে বিশ হাজার কিলোমিটার দূরের এক দেশের পতাকা। প্রশ্নটা তাই সরল কিন্তু উত্তরটা নয়; কেন?
ভাষার মিল নেই, ধর্মের মিল নেই, খাদ্যাভ্যাস মেলে না। আর্জেন্টিনা মূলত স্পেনীয় ও ইতালীয় অভিবাসীদের গড়া এক বসতি-উপনিবেশ, আমরা গাঙ্গেয় বদ্বীপের কৃষিজীবী মানুষ। তবু ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে যখন বাংলাদেশের উল্লাসের ভিডিও ভাইরাল হলো, খোদ আর্জেন্টাইনরা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেছিল, এরা কারা? উত্তরটা খুঁজতে হলে আমাদের যেতে হবে ইতিহাসে, টেলিভিশনের পর্দায়, উপনিবেশের ক্ষতে, আর সমাজতত্ত্বের কয়েকটি পুরোনো কিন্তু ধারালো তত্ত্বে।
টেলিভিশন যেভাবে আমাদের মাঠ হয়ে উঠল
গল্পের শুরুটা আসলে প্রযুক্তির। ১৯৬৪ সালের ২৫ ডিসেম্বর ঢাকার ডিআইটি ভবন থেকে যখন প্রথম টেলিভিশন সম্প্রচার শুরু হয়, দক্ষিণ এশিয়ার খুব কম শহরই তখন এই বিলাসিতা দেখেছে। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ টেলিভিশন এই অঞ্চলে প্রথম দিকেই পূর্ণাঙ্গ রঙিন সম্প্রচারে যায়, ১৯৮০ সালে। অর্থাৎ ১৯৮২ সালের স্পেন বিশ্বকাপ যখন বিটিভির পর্দায় এল, বাঙালি মধ্যবিত্ত পরিবার তখন সবেমাত্র রঙিন ছবিতে পৃথিবী দেখতে শিখছে। মহল্লায় হয়তো একটি বা দুটি টেলিভিশন, তার সামনে ভিড় করে বসেছে পঞ্চাশজন। খেলা দেখা তখন থেকেই আর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা নয়, সামাজিক অনুষ্ঠান।
এই সময়ক্রমটাই নিয়তি নির্ধারণ করে দিল। বাঙালি যখন প্রথমবার রঙিন পর্দায় বিশ্বফুটবল দেখছে, তখন ইউরোপীয় ক্লাব ফুটবলের কোনো সম্প্রচার নেই, ইন্টারনেট নেই, বিকল্প নেই। চার বছরে একবার আসা বিশ্বকাপই ছিল বৈশ্বিক ফুটবলের একমাত্র জানালা। আর সেই জানালা দিয়ে ১৯৮৬ সালে ঢুকে পড়ল পাঁচ ফুট পাঁচ ইঞ্চির এক ঝাঁকড়া চুলের জাদুকর।
ছিয়াশির সেই বিকেল: ঈশ্বরের হাত ও উপনিবেশের ক্ষত
১৯৮৬ সালের ২২ জুন, মেক্সিকো সিটির আসতেকা স্টেডিয়াম। কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ ইংল্যান্ড। মাত্র চার বছর আগে ফকল্যান্ড যুদ্ধে ব্রিটেনের কাছে হেরেছে আর্জেন্টিনা, প্রাণ গেছে তাদের ছয় শতাধিক তরুণের। সেই ম্যাচে চার মিনিটের ব্যবধানে ম্যারাডোনা করলেন ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে কুখ্যাত আর সবচেয়ে বিখ্যাত দুটি গোল। প্রথমটি হাত দিয়ে, যাকে তিনি নিজেই বললেন ঈশ্বরের হাত। দ্বিতীয়টিতে মাঝমাঠ থেকে একক দৌড়ে ছয়জনকে কাটিয়ে, যা শতাব্দীর সেরা গোল বলে মনে করা হয়।
এখানে একটি ন্যায্য প্রশ্ন উঠতে পারে যে ফকল্যান্ড যুদ্ধ আর্জেন্টিনা আর ইংল্যান্ডের ব্যাপার, তাতে বাংলাদেশের কী? উত্তরটা হলো, বাঙালি দর্শক সেদিন শুধু একটি ফুটবল ম্যাচ দেখেনি। দেখেছে প্রায় দুইশ বছর যারা এই বদ্বীপ শাসন করেছে, যাদের নীলকুঠি আর মন্বন্তরের স্মৃতি আমাদের সম্মিলিত অবচেতনে গেঁথে আছে, সেই ইংল্যান্ডকে খেলার সবচেয়ে বড় মঞ্চে পরাজিত হতে। এবং অপদস্থ করছে এমন এক দেশ, যে নিজেও সাম্রাজ্যের সঙ্গে সদ্য যুদ্ধ করে এসেছে। টাইম ম্যাগাজিনও যেভাবে বলে, বাংলাদেশে আর্জেন্টিনা-সমর্থনের একটি উপনিবেশবিরোধী চরিত্র আছে, কারণ ম্যারাডোনা ইংরেজদের ফুটবল ম্যাচে হারিয়েছিলেন।
ফ্রেঞ্চ দার্শনিক ফ্রানৎস ফানোঁ হলে হয়তো বিষয়টিকে বলতেন ঔপনিবেশিক মনস্তত্ত্বের মুক্তির মুহূর্ত। ফানোঁ লিখেছিলেন, উপনিবেশিত মানুষের ভেতরে জমে থাকা অপমান একটি বৈধ নিষ্কাশনপথ খোঁজে। যে প্রতিশোধ ইতিহাস আমাদের নিতে দেয়নি, ম্যারাডোনা সেটি নিয়ে দিলেন আমাদের হয়ে, নব্বই মিনিটের বৈধ, আনন্দময়, শাস্তিহীন এক প্রতিশোধ। হাত দিয়ে গোল করাটাও এখানে দোষ নয়, বরং মাধুর্য। কারণ উপনিবেশ তো কখনো নিয়ম মেনে খেলেনি; চতুরতার জবাব চতুরতায় দেওয়ার মধ্যে এক ধরনের কাব্যিক ন্যায়বিচার আছে, যা বাঙালির লোকজ নায়ক-কল্পনার সঙ্গেও মিলে যায়।
তত্ত্বের চোখে: প্রান্তের সঙ্গে প্রান্তের সংহতি
এডওয়ার্ড সাইদ দেখিয়েছিলেন, পশ্চিম কীভাবে প্রাচ্যকে নির্মাণ করে নিজের সুবিধামতো। কিন্তু বাংলাদেশের আর্জেন্টিনা-প্রেম এক অর্থে সাইদের ছকের বাইরের ঘটনা। এখানে দক্ষিণের এক জনগোষ্ঠী পশ্চিমের মধ্যস্থতা ছাড়াই দক্ষিণের আরেক জনগোষ্ঠীর সঙ্গে নিজের কাল্পনিক আত্মীয়তা তৈরি করেছে। এটি এক ধরনের দক্ষিণ-দক্ষিণ কল্পনার ভূগোল, যেখানে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সাবেক প্রজা খুঁজে নিয়েছে সাম্রাজ্যের আরেক প্রতিপক্ষকে।
মজার ব্যাপার হলো, বিশ্ব-অর্থনীতিতে কেন্দ্র আর প্রান্তের যে তত্ত্ব (centre-periphery model) দিয়ে আমরা বৈশ্বিক বৈষম্য বুঝি, সেই নির্ভরশীলতা তত্ত্বের জন্মও আর্জেন্টিনায়। অর্থনীতিবিদ রাউল প্রেবিশ, যিনি দেখিয়েছিলেন কাঁচামাল রপ্তানিকারক দেশগুলো কীভাবে কাঠামোগতভাবে পিছিয়ে থাকে আর প্রেবিশ ছিলেন ছিলেন আর্জেন্টাইন। আর্জেন্টিনা গম আর গরুর মাংস বিক্রি করে, বাংলাদেশ তখন বেচত পাট, এখন বেচে পোশাক আর শ্রম। দুটি দেশই বিশ্বব্যবস্থার সেই প্রান্তে, ইমানুয়েল ওয়ালারস্টাইন যাকে বলেন পেরিফেরি (প্রান্ত), যেখানে সমৃদ্ধি আসে-যায় কিন্তু কেন্দ্র (সেন্টার) হওয়া যায় না। কৃষিনির্ভরতার যে মিলের কথা অনেকে বলেন, তা তাই একেবারে ভিত্তিহীন নয়, তবে মিলটা ফসলে নয়, মিলটা বিশ্ব-অর্থনীতিতে অবস্থানে। উরুগুয়ের এদুয়ার্দো গালেয়ানো, যিনি লাতিন আমেরিকার কাটা শিরা-উপশিরার কথা লিখেছিলেন, তিনিই আবার লিখেছেন ফুটবল নিয়ে সবচেয়ে মায়াবী গদ্য। লাতিন আমেরিকায় ফুটবল বরাবরই ছিল প্রান্তের মানুষের শিল্প, গরিবের প্রতিভার একমাত্র অবাধ বাজার। বাংলাদেশের মানুষ সম্ভবত সেটাই চিনতে পেরেছিল, এই খেলাটা ওদের কাছে যা, আমাদের কাছেও তা-ই হতে পারত।
পতাকা, পরিবার, চায়ের দোকান: ভালোবাসা যেভাবে উত্তরাধিকার হয়
কিন্তু একটি বিকেলের মুগ্ধতা চল্লিশ বছর টেকে না, যদি না তা সামাজিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। এখানেই কাজে লাগে পিয়ের বুর্দিয়ের ‘হ্যাবিটাস’ ধারণা। আমরা অনেক কিছুই যুক্তি দিয়ে বেছে নিই না, উত্তরাধিকার সূত্রে গায়ে মেখে নিই, যেভাবে মেখে নিই ভাষার টান বা রান্নার স্বাদ। ছিয়াশিতে যে বাংলাদেশি কিশোর ম্যারাডোনাকে দেখেছিল, সে তার সন্তানকে দিয়েছে বাতিস্তুতা আর রিকেলমে, সেই সন্তান তার সন্তানকে দিচ্ছে মেসি। ঢাকার গবেষণাতেও উঠে এসেছে, বাংলাদেশে আর্জেন্টিনা-সমর্থন মূলত পারিবারিক উত্তরাধিকার; শিশুটি আগে জানে আর্জেন্টিনা আমাদের দল, পরে জানে কেন। প্রশ্নটা তাই ডিএনএ-র নয়, যেমনটা অনেকে আবেগে বলেন। জিনে ফুটবলপ্রেম লেখা থাকে না; থাকে সংস্কৃতিতে, যা জিনের চেয়ে কোনো অংশে কম জোরালোভাবে প্রজন্মান্তরে বাহিত হয় না।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বেনেডিক্ট অ্যান্ডারসন জাতিকে বলেছিলেন কল্পিত সম্প্রদায়, যেখানে ছাপাখানার কল্যাণে অচেনা মানুষেরা নিজেদের এক জাতি ভাবতে শেখে। বাংলাদেশের আর্জেন্টিনা-সমর্থকেরা তৈরি করেছেন তেমনই এক আশ্চর্য কল্পিত সম্প্রদায়, যার সদস্যরা কেউ কাউকে চেনে না, যাদের কেন্দ্র বিশ হাজার কিলোমিটার দূরে, কিন্তু যাদের পতাকা, রং, শোক আর উৎসব অভিন্ন। আর ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা বিভাজনটি এই সম্প্রদায়কে দিয়েছে তার সবচেয়ে জরুরি উপাদান, প্রতিপক্ষ। বাংলাদের জাতীয় দল যেহেতু ফুটবলের বিশ্বমঞ্চে নেই, বাঙালি নিজের ঘরের ভেতরেই আমদানি করে নিয়েছে একটি আস্ত এল ক্লাসিকো। চায়ের দোকানের তর্ক, ছাদে পতাকার দৈর্ঘ্য নিয়ে প্রতিযোগিতা, খেলার আগের রাতের খোঁচাখুঁচি। প্রতি চার বছরে একবার গোটা জাতি একসঙ্গে জেগে থাকে, একসঙ্গে কাঁদে বা হাসে। আধুনিক নাগরিক জীবনে এমন সম্মিলিত অনুভূতির উপলক্ষ খুব বেশি অবশিষ্ট নেই।
মনস্তত্ত্ব ও ক্রীড়াবিজ্ঞান কী বলে
সামাজিক মনোবিজ্ঞানী রবার্ট চালদিনি দেখিয়েছিলেন, মানুষ বিজয়ী দলের সাফল্যে নিজেকে জড়িয়ে আত্মমর্যাদা ধার করে; ইংরেজিতে একে বলে ‘বাস্কিং ইন রিফ্লেক্টেড গ্লোরি’। জয়ের পরদিন আমরা বলি আমরা জিতেছি, হারের পরদিন বলি ওরা হেরেছে। যে দেশের নিজের দল কখনো বিশ্বকাপের মূলপর্বে পৌঁছায়নি, সেখানে এই ধার করা গৌরবের মনস্তাত্ত্বিক মূল্য অপরিসীম। তার সঙ্গে যোগ করুন প্যারা-সোশ্যাল সম্পর্কের তত্ত্ব, পর্দার মানুষটিকে আমরা ব্যক্তিগতভাবে চেনার মতো করে ভালোবাসতে শিখি। ম্যারাডোনা ছিলেন বুয়েনস আইরেসের বস্তি থেকে উঠে আসা খর্বকায় ও বেপরোয়া এক অসামান্য প্রতিভা; মেসি রোজারিওর নিম্ন-মধ্যবিত্ত ঘরের শান্ত ছেলে, যাকে শৈশবে হরমোনের ওষুধ কেনার সামর্থ্য নিয়ে ভাবতে হয়েছে। দুজনের কেউই ইউরোপীয় আভিজাত্যের প্রতিনিধি নন। ক্রীড়া-মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এটিকে বলে ‘আন্ডারডগ আইডেন্টিফিকেশন’। আমরা তাদেরই বেছে নিই, যাদের গল্পে নিজের গল্পের ছায়া দেখি। ছোট শরীরের মানুষ বড়দের নাচিয়ে ছাড়ছে, এই দৃশ্যের চেয়ে জোরালো রূপক প্রান্তের কোনো জাতির জন্য আর কী হতে পারে?
ভালোবাসা যখন কূটনীতি
এই আবেগ শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রকেও নাড়িয়ে দিয়েছে। কাতার বিশ্বকাপে বাংলাদেশের রাস্তায় লাখো মানুষের উল্লাসের ভিডিও যখন ফিফার পাতায় ভাইরাল হলো, আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট নিজে কৃতজ্ঞতা জানালেন। এরপর ২০২৩ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি, দূতাবাস পঁয়তাল্লিশ বছর পর ঢাকায় আবার খুলল আর্জেন্টিনা। পররাষ্ট্রমন্ত্রী সান্তিয়াগো কাফিয়েরো ঢাকায় দাঁড়িয়ে বললেন, আমাদের দেশ যে ভালোবাসা পেয়েছে, বিনম্রভাবে তার প্রতিদান দিতেই এসেছি। ২০২৬-এর বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার রাষ্ট্রদূত ঢাকার বিভিন্ন ফুটবল প্রদর্শনীতে সাধারণ সমর্থকদের সঙ্গে বসে খেলা দেখছেন। পৃথিবীর কূটনৈতিক ইতিহাসে এমন নজির বিরল, যেখানে একটি দূতাবাস খোলার পেছনে বাণিজ্য বা ভূরাজনীতির আগে দাঁড়িয়ে আছে নিছক ভক্তদের ভালোবাসা।
শেষ কথা: পতাকাটা আসলে কার
তাহলে উত্তরটা দাঁড়াল এই, প্রযুক্তির কাকতাল (সঠিক সময়ে টেলিভিশন), ইতিহাসের ক্ষত (উপনিবেশের স্মৃতি ও ছিয়াশির প্রতীকী প্রতিশোধ), সমাজের কারিগরি (পারিবারিক উত্তরাধিকার, ঘরোয়া প্রতিদ্বন্দ্বিতা, সম্মিলিত উৎসব), মনের অঙ্ক (ধার করা গৌরব, আন্ডারডগের সঙ্গে একাত্মতা), আর মেসি বা ম্যারাডোনার অসামান্য স্কিল - এই পাঁচের মিশেলেই বাংলাদেশ হয়ে উঠেছে আর্জেন্টিনার দ্বিতীয় স্বদেশ। এর কোনো একটি উপাদান একা যথেষ্ট ছিল না; পাঁচটি একসঙ্গে মিলেছে বলেই আঠারো কোটির দেশে আকাশি-সাদার সমর্থক সম্ভবত খোদ আর্জেন্টিনার পাঁচ কোটি কোটি জনসংখ্যার চেয়েও বেশি।
ব্রহ্মপুত্রের চরে টিনের চালার ওপর যে ছেলেটি ঝড়ের মধ্যেও পতাকাটা বেঁধে রাখে, সে হয়তো ফানোঁ পড়েনি, প্রেবিশের নাম শোনেনি। কিন্তু সে যা অনুভব করে, তত্ত্ব শুধু তারই ব্যাখ্যা, প্রান্তের মানুষ প্রান্তের মানুষকে চিনে নেয়, মানচিত্র না দেখেই। ওই পতাকাটা আসলে আর্জেন্টিনার নয়। ওটা একটা স্বপ্নের পতাকা, যেখানে ছোটরাও একদিন বড়দের হারায়। আর সেই স্বপ্ন দেখার অধিকারে বাঙালির চেয়ে বেশি অংশীদার পৃথিবীতে আর কে আছে?
ড. হাসিব আহসান: সহকারী অধ্যাপক, আইটি ইউনিভার্সিটি অব কোপেনহেগেন, ডেনমার্ক । সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী। ইমেইল: [email protected]

বিশ্বকাপের মাস জুড়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের বিশাল পর্দা নিভে গেছে, কিন্তু হাজারো মানুষ তখনো চিৎকার করছে, আর্জেন্টিনা, আর্জেন্টিনা, মেসি, মেসি। আকাশি-সাদা পতাকার সমুদ্রে ভেসে যাচ্ছে বুবুুজেলার শব্দ। দৃশ্যটি বুয়েনস আইরেসের হতে পারত, কিন্তু এটি বাংলাদেশ। যে দেশ কোনোদিন বিশ্বকাপে খেলেনি, ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে যাদের অবস্থান ১৮০ এর ঘরে, সেই দেশের ছাদে ছাদে, চরের টিনের চালায়, এমনকি ধানখেতের মাঝখানে বাঁশের মাথায় ওড়ে বিশ হাজার কিলোমিটার দূরের এক দেশের পতাকা। প্রশ্নটা তাই সরল কিন্তু উত্তরটা নয়; কেন?
ভাষার মিল নেই, ধর্মের মিল নেই, খাদ্যাভ্যাস মেলে না। আর্জেন্টিনা মূলত স্পেনীয় ও ইতালীয় অভিবাসীদের গড়া এক বসতি-উপনিবেশ, আমরা গাঙ্গেয় বদ্বীপের কৃষিজীবী মানুষ। তবু ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে যখন বাংলাদেশের উল্লাসের ভিডিও ভাইরাল হলো, খোদ আর্জেন্টাইনরা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেছিল, এরা কারা? উত্তরটা খুঁজতে হলে আমাদের যেতে হবে ইতিহাসে, টেলিভিশনের পর্দায়, উপনিবেশের ক্ষতে, আর সমাজতত্ত্বের কয়েকটি পুরোনো কিন্তু ধারালো তত্ত্বে।
টেলিভিশন যেভাবে আমাদের মাঠ হয়ে উঠল
গল্পের শুরুটা আসলে প্রযুক্তির। ১৯৬৪ সালের ২৫ ডিসেম্বর ঢাকার ডিআইটি ভবন থেকে যখন প্রথম টেলিভিশন সম্প্রচার শুরু হয়, দক্ষিণ এশিয়ার খুব কম শহরই তখন এই বিলাসিতা দেখেছে। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ টেলিভিশন এই অঞ্চলে প্রথম দিকেই পূর্ণাঙ্গ রঙিন সম্প্রচারে যায়, ১৯৮০ সালে। অর্থাৎ ১৯৮২ সালের স্পেন বিশ্বকাপ যখন বিটিভির পর্দায় এল, বাঙালি মধ্যবিত্ত পরিবার তখন সবেমাত্র রঙিন ছবিতে পৃথিবী দেখতে শিখছে। মহল্লায় হয়তো একটি বা দুটি টেলিভিশন, তার সামনে ভিড় করে বসেছে পঞ্চাশজন। খেলা দেখা তখন থেকেই আর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা নয়, সামাজিক অনুষ্ঠান।
এই সময়ক্রমটাই নিয়তি নির্ধারণ করে দিল। বাঙালি যখন প্রথমবার রঙিন পর্দায় বিশ্বফুটবল দেখছে, তখন ইউরোপীয় ক্লাব ফুটবলের কোনো সম্প্রচার নেই, ইন্টারনেট নেই, বিকল্প নেই। চার বছরে একবার আসা বিশ্বকাপই ছিল বৈশ্বিক ফুটবলের একমাত্র জানালা। আর সেই জানালা দিয়ে ১৯৮৬ সালে ঢুকে পড়ল পাঁচ ফুট পাঁচ ইঞ্চির এক ঝাঁকড়া চুলের জাদুকর।
ছিয়াশির সেই বিকেল: ঈশ্বরের হাত ও উপনিবেশের ক্ষত
১৯৮৬ সালের ২২ জুন, মেক্সিকো সিটির আসতেকা স্টেডিয়াম। কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ ইংল্যান্ড। মাত্র চার বছর আগে ফকল্যান্ড যুদ্ধে ব্রিটেনের কাছে হেরেছে আর্জেন্টিনা, প্রাণ গেছে তাদের ছয় শতাধিক তরুণের। সেই ম্যাচে চার মিনিটের ব্যবধানে ম্যারাডোনা করলেন ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে কুখ্যাত আর সবচেয়ে বিখ্যাত দুটি গোল। প্রথমটি হাত দিয়ে, যাকে তিনি নিজেই বললেন ঈশ্বরের হাত। দ্বিতীয়টিতে মাঝমাঠ থেকে একক দৌড়ে ছয়জনকে কাটিয়ে, যা শতাব্দীর সেরা গোল বলে মনে করা হয়।
এখানে একটি ন্যায্য প্রশ্ন উঠতে পারে যে ফকল্যান্ড যুদ্ধ আর্জেন্টিনা আর ইংল্যান্ডের ব্যাপার, তাতে বাংলাদেশের কী? উত্তরটা হলো, বাঙালি দর্শক সেদিন শুধু একটি ফুটবল ম্যাচ দেখেনি। দেখেছে প্রায় দুইশ বছর যারা এই বদ্বীপ শাসন করেছে, যাদের নীলকুঠি আর মন্বন্তরের স্মৃতি আমাদের সম্মিলিত অবচেতনে গেঁথে আছে, সেই ইংল্যান্ডকে খেলার সবচেয়ে বড় মঞ্চে পরাজিত হতে। এবং অপদস্থ করছে এমন এক দেশ, যে নিজেও সাম্রাজ্যের সঙ্গে সদ্য যুদ্ধ করে এসেছে। টাইম ম্যাগাজিনও যেভাবে বলে, বাংলাদেশে আর্জেন্টিনা-সমর্থনের একটি উপনিবেশবিরোধী চরিত্র আছে, কারণ ম্যারাডোনা ইংরেজদের ফুটবল ম্যাচে হারিয়েছিলেন।
ফ্রেঞ্চ দার্শনিক ফ্রানৎস ফানোঁ হলে হয়তো বিষয়টিকে বলতেন ঔপনিবেশিক মনস্তত্ত্বের মুক্তির মুহূর্ত। ফানোঁ লিখেছিলেন, উপনিবেশিত মানুষের ভেতরে জমে থাকা অপমান একটি বৈধ নিষ্কাশনপথ খোঁজে। যে প্রতিশোধ ইতিহাস আমাদের নিতে দেয়নি, ম্যারাডোনা সেটি নিয়ে দিলেন আমাদের হয়ে, নব্বই মিনিটের বৈধ, আনন্দময়, শাস্তিহীন এক প্রতিশোধ। হাত দিয়ে গোল করাটাও এখানে দোষ নয়, বরং মাধুর্য। কারণ উপনিবেশ তো কখনো নিয়ম মেনে খেলেনি; চতুরতার জবাব চতুরতায় দেওয়ার মধ্যে এক ধরনের কাব্যিক ন্যায়বিচার আছে, যা বাঙালির লোকজ নায়ক-কল্পনার সঙ্গেও মিলে যায়।
তত্ত্বের চোখে: প্রান্তের সঙ্গে প্রান্তের সংহতি
এডওয়ার্ড সাইদ দেখিয়েছিলেন, পশ্চিম কীভাবে প্রাচ্যকে নির্মাণ করে নিজের সুবিধামতো। কিন্তু বাংলাদেশের আর্জেন্টিনা-প্রেম এক অর্থে সাইদের ছকের বাইরের ঘটনা। এখানে দক্ষিণের এক জনগোষ্ঠী পশ্চিমের মধ্যস্থতা ছাড়াই দক্ষিণের আরেক জনগোষ্ঠীর সঙ্গে নিজের কাল্পনিক আত্মীয়তা তৈরি করেছে। এটি এক ধরনের দক্ষিণ-দক্ষিণ কল্পনার ভূগোল, যেখানে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সাবেক প্রজা খুঁজে নিয়েছে সাম্রাজ্যের আরেক প্রতিপক্ষকে।
মজার ব্যাপার হলো, বিশ্ব-অর্থনীতিতে কেন্দ্র আর প্রান্তের যে তত্ত্ব (centre-periphery model) দিয়ে আমরা বৈশ্বিক বৈষম্য বুঝি, সেই নির্ভরশীলতা তত্ত্বের জন্মও আর্জেন্টিনায়। অর্থনীতিবিদ রাউল প্রেবিশ, যিনি দেখিয়েছিলেন কাঁচামাল রপ্তানিকারক দেশগুলো কীভাবে কাঠামোগতভাবে পিছিয়ে থাকে আর প্রেবিশ ছিলেন ছিলেন আর্জেন্টাইন। আর্জেন্টিনা গম আর গরুর মাংস বিক্রি করে, বাংলাদেশ তখন বেচত পাট, এখন বেচে পোশাক আর শ্রম। দুটি দেশই বিশ্বব্যবস্থার সেই প্রান্তে, ইমানুয়েল ওয়ালারস্টাইন যাকে বলেন পেরিফেরি (প্রান্ত), যেখানে সমৃদ্ধি আসে-যায় কিন্তু কেন্দ্র (সেন্টার) হওয়া যায় না। কৃষিনির্ভরতার যে মিলের কথা অনেকে বলেন, তা তাই একেবারে ভিত্তিহীন নয়, তবে মিলটা ফসলে নয়, মিলটা বিশ্ব-অর্থনীতিতে অবস্থানে। উরুগুয়ের এদুয়ার্দো গালেয়ানো, যিনি লাতিন আমেরিকার কাটা শিরা-উপশিরার কথা লিখেছিলেন, তিনিই আবার লিখেছেন ফুটবল নিয়ে সবচেয়ে মায়াবী গদ্য। লাতিন আমেরিকায় ফুটবল বরাবরই ছিল প্রান্তের মানুষের শিল্প, গরিবের প্রতিভার একমাত্র অবাধ বাজার। বাংলাদেশের মানুষ সম্ভবত সেটাই চিনতে পেরেছিল, এই খেলাটা ওদের কাছে যা, আমাদের কাছেও তা-ই হতে পারত।
পতাকা, পরিবার, চায়ের দোকান: ভালোবাসা যেভাবে উত্তরাধিকার হয়
কিন্তু একটি বিকেলের মুগ্ধতা চল্লিশ বছর টেকে না, যদি না তা সামাজিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। এখানেই কাজে লাগে পিয়ের বুর্দিয়ের ‘হ্যাবিটাস’ ধারণা। আমরা অনেক কিছুই যুক্তি দিয়ে বেছে নিই না, উত্তরাধিকার সূত্রে গায়ে মেখে নিই, যেভাবে মেখে নিই ভাষার টান বা রান্নার স্বাদ। ছিয়াশিতে যে বাংলাদেশি কিশোর ম্যারাডোনাকে দেখেছিল, সে তার সন্তানকে দিয়েছে বাতিস্তুতা আর রিকেলমে, সেই সন্তান তার সন্তানকে দিচ্ছে মেসি। ঢাকার গবেষণাতেও উঠে এসেছে, বাংলাদেশে আর্জেন্টিনা-সমর্থন মূলত পারিবারিক উত্তরাধিকার; শিশুটি আগে জানে আর্জেন্টিনা আমাদের দল, পরে জানে কেন। প্রশ্নটা তাই ডিএনএ-র নয়, যেমনটা অনেকে আবেগে বলেন। জিনে ফুটবলপ্রেম লেখা থাকে না; থাকে সংস্কৃতিতে, যা জিনের চেয়ে কোনো অংশে কম জোরালোভাবে প্রজন্মান্তরে বাহিত হয় না।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বেনেডিক্ট অ্যান্ডারসন জাতিকে বলেছিলেন কল্পিত সম্প্রদায়, যেখানে ছাপাখানার কল্যাণে অচেনা মানুষেরা নিজেদের এক জাতি ভাবতে শেখে। বাংলাদেশের আর্জেন্টিনা-সমর্থকেরা তৈরি করেছেন তেমনই এক আশ্চর্য কল্পিত সম্প্রদায়, যার সদস্যরা কেউ কাউকে চেনে না, যাদের কেন্দ্র বিশ হাজার কিলোমিটার দূরে, কিন্তু যাদের পতাকা, রং, শোক আর উৎসব অভিন্ন। আর ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা বিভাজনটি এই সম্প্রদায়কে দিয়েছে তার সবচেয়ে জরুরি উপাদান, প্রতিপক্ষ। বাংলাদের জাতীয় দল যেহেতু ফুটবলের বিশ্বমঞ্চে নেই, বাঙালি নিজের ঘরের ভেতরেই আমদানি করে নিয়েছে একটি আস্ত এল ক্লাসিকো। চায়ের দোকানের তর্ক, ছাদে পতাকার দৈর্ঘ্য নিয়ে প্রতিযোগিতা, খেলার আগের রাতের খোঁচাখুঁচি। প্রতি চার বছরে একবার গোটা জাতি একসঙ্গে জেগে থাকে, একসঙ্গে কাঁদে বা হাসে। আধুনিক নাগরিক জীবনে এমন সম্মিলিত অনুভূতির উপলক্ষ খুব বেশি অবশিষ্ট নেই।
মনস্তত্ত্ব ও ক্রীড়াবিজ্ঞান কী বলে
সামাজিক মনোবিজ্ঞানী রবার্ট চালদিনি দেখিয়েছিলেন, মানুষ বিজয়ী দলের সাফল্যে নিজেকে জড়িয়ে আত্মমর্যাদা ধার করে; ইংরেজিতে একে বলে ‘বাস্কিং ইন রিফ্লেক্টেড গ্লোরি’। জয়ের পরদিন আমরা বলি আমরা জিতেছি, হারের পরদিন বলি ওরা হেরেছে। যে দেশের নিজের দল কখনো বিশ্বকাপের মূলপর্বে পৌঁছায়নি, সেখানে এই ধার করা গৌরবের মনস্তাত্ত্বিক মূল্য অপরিসীম। তার সঙ্গে যোগ করুন প্যারা-সোশ্যাল সম্পর্কের তত্ত্ব, পর্দার মানুষটিকে আমরা ব্যক্তিগতভাবে চেনার মতো করে ভালোবাসতে শিখি। ম্যারাডোনা ছিলেন বুয়েনস আইরেসের বস্তি থেকে উঠে আসা খর্বকায় ও বেপরোয়া এক অসামান্য প্রতিভা; মেসি রোজারিওর নিম্ন-মধ্যবিত্ত ঘরের শান্ত ছেলে, যাকে শৈশবে হরমোনের ওষুধ কেনার সামর্থ্য নিয়ে ভাবতে হয়েছে। দুজনের কেউই ইউরোপীয় আভিজাত্যের প্রতিনিধি নন। ক্রীড়া-মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এটিকে বলে ‘আন্ডারডগ আইডেন্টিফিকেশন’। আমরা তাদেরই বেছে নিই, যাদের গল্পে নিজের গল্পের ছায়া দেখি। ছোট শরীরের মানুষ বড়দের নাচিয়ে ছাড়ছে, এই দৃশ্যের চেয়ে জোরালো রূপক প্রান্তের কোনো জাতির জন্য আর কী হতে পারে?
ভালোবাসা যখন কূটনীতি
এই আবেগ শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রকেও নাড়িয়ে দিয়েছে। কাতার বিশ্বকাপে বাংলাদেশের রাস্তায় লাখো মানুষের উল্লাসের ভিডিও যখন ফিফার পাতায় ভাইরাল হলো, আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট নিজে কৃতজ্ঞতা জানালেন। এরপর ২০২৩ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি, দূতাবাস পঁয়তাল্লিশ বছর পর ঢাকায় আবার খুলল আর্জেন্টিনা। পররাষ্ট্রমন্ত্রী সান্তিয়াগো কাফিয়েরো ঢাকায় দাঁড়িয়ে বললেন, আমাদের দেশ যে ভালোবাসা পেয়েছে, বিনম্রভাবে তার প্রতিদান দিতেই এসেছি। ২০২৬-এর বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার রাষ্ট্রদূত ঢাকার বিভিন্ন ফুটবল প্রদর্শনীতে সাধারণ সমর্থকদের সঙ্গে বসে খেলা দেখছেন। পৃথিবীর কূটনৈতিক ইতিহাসে এমন নজির বিরল, যেখানে একটি দূতাবাস খোলার পেছনে বাণিজ্য বা ভূরাজনীতির আগে দাঁড়িয়ে আছে নিছক ভক্তদের ভালোবাসা।
শেষ কথা: পতাকাটা আসলে কার
তাহলে উত্তরটা দাঁড়াল এই, প্রযুক্তির কাকতাল (সঠিক সময়ে টেলিভিশন), ইতিহাসের ক্ষত (উপনিবেশের স্মৃতি ও ছিয়াশির প্রতীকী প্রতিশোধ), সমাজের কারিগরি (পারিবারিক উত্তরাধিকার, ঘরোয়া প্রতিদ্বন্দ্বিতা, সম্মিলিত উৎসব), মনের অঙ্ক (ধার করা গৌরব, আন্ডারডগের সঙ্গে একাত্মতা), আর মেসি বা ম্যারাডোনার অসামান্য স্কিল - এই পাঁচের মিশেলেই বাংলাদেশ হয়ে উঠেছে আর্জেন্টিনার দ্বিতীয় স্বদেশ। এর কোনো একটি উপাদান একা যথেষ্ট ছিল না; পাঁচটি একসঙ্গে মিলেছে বলেই আঠারো কোটির দেশে আকাশি-সাদার সমর্থক সম্ভবত খোদ আর্জেন্টিনার পাঁচ কোটি কোটি জনসংখ্যার চেয়েও বেশি।
ব্রহ্মপুত্রের চরে টিনের চালার ওপর যে ছেলেটি ঝড়ের মধ্যেও পতাকাটা বেঁধে রাখে, সে হয়তো ফানোঁ পড়েনি, প্রেবিশের নাম শোনেনি। কিন্তু সে যা অনুভব করে, তত্ত্ব শুধু তারই ব্যাখ্যা, প্রান্তের মানুষ প্রান্তের মানুষকে চিনে নেয়, মানচিত্র না দেখেই। ওই পতাকাটা আসলে আর্জেন্টিনার নয়। ওটা একটা স্বপ্নের পতাকা, যেখানে ছোটরাও একদিন বড়দের হারায়। আর সেই স্বপ্ন দেখার অধিকারে বাঙালির চেয়ে বেশি অংশীদার পৃথিবীতে আর কে আছে?
ড. হাসিব আহসান: সহকারী অধ্যাপক, আইটি ইউনিভার্সিটি অব কোপেনহেগেন, ডেনমার্ক । সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী। ইমেইল: [email protected]